![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
উলটচণ্ডাল (গ্লোরিওসা লিলি)
বাঞ্ছারাম
প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যের এক বিস্ময়কর নিদর্শন হলো উলটচণ্ডাল। ইংরেজি বলয়ে এটি ‘গ্লোরি লিলি’ (Glory Lily), ‘ফ্লেম লিলি’ (Flame Lily) বা ‘ক্রিপিং লিলি’ নামে সমাদৃত। বাংলা লোকায়ত পরিমণ্ডলে এর পরিচিতি ‘উলটচণ্ডাল’, ‘অগ্নিশিখা’ কিংবা সংস্কৃত সাহিত্যে ‘কালিহারী’ ও ‘লাঙ্গলী’ হিসেবে। ফুলটির পাপড়িগুলোর অনন্য বিন্যাস—যা প্রস্ফুটিত অবস্থায় উল্টো দিকে বাঁকানো থাকে এবং জ্বলন্ত অগ্নির লেলিহান শিখার মতো দেখায়—তার থেকেই এর এমন নামকরণ। এটি কেবল তার রূপমাধুর্যের জন্য বাগানের শোভাবর্ধক হিসেবেই সমাদৃত নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং আধুনিক ফার্মাকোলজিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ঔষধি উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচিত।
উদ্ভিদতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস ও পরিচয়
উলটচণ্ডাল কোলচিসিয়েসি (Colchicaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি কন্দযুক্ত বহুবর্ষজীবী লতানো উদ্ভিদ। পূর্বে একে লিলিয়েসি (Liliaceae) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও আধুনিক আধুনিক টেক্সোনমিতে একে পৃথক কোলচিসিয়েসি পরিবারে স্থান দেওয়া হয়েছে।
দ্বিপদ বৈজ্ঞানিক নাম: Gloriosa superba L.
জগৎ: Plantae
শ্রেণি: Liliopsida
বর্গ: Liliales
পরিবার: Colchicaceae
গণ: Gloriosa
প্রজাতি: G. superba
ভৌগোলিক বিস্তার ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল
উলটচণ্ডাল মূলত ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ। এটি আফ্রিকা মহাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব দেশীয় প্রজাতি। ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় এটি স্বাভাবিকভাবেই জন্মায়।
ভারতে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অসম, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বনাঞ্চলে এদের প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর দেখা মেলে। এটি জিম্বাবুয়ের জাতীয় ফুল এবং ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজ্য ফুল হিসেবে স্বীকৃত।
প্রকৃতিতে এরা সাধারণত পলিমাটিযুক্ত মাঝারি আর্দ্র জমি, ঝোপঝাড়ের ধার, বনের প্রান্তদেশ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের বালুকাময় মাটিতে সবচেয়ে ভালো জন্মায়। এদের মাটির নিচের কন্দটি অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না; তাই উত্তম নিষ্কাশনযুক্ত মাটি এদের বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।
বাহ্যিক গঠন ও রূপতত্ত্ব
কাণ্ড ও লতা: এটি একটি লতানো উদ্ভিদ, যা অন্য কোনো গাছ বা অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে ৩ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত ওপরে উঠতে পারে। এর কাণ্ড সাধারণত নরম, নলাকার ও সবুজ বর্ণের হয়।
পাতা: পাতাগুলো উজ্জ্বল সবুজ, উজ্জ্বল মসৃণ এবং বর্শাফলাকৃতির (Lanceolate)। পাতার বিন্যাস সাধারণত একান্তর বা চক্রাকার। উলটচণ্ডালের পাতার শীর্ষভাগ রূপান্তরিত হয়ে পেঁচানো আকর্ষীতে (Tendril) পরিণত হয়, যা উদ্ভিদটিকে কোনো আশ্রয়কে আঁকড়ে ধরে উপরে উঠতে সাহায্য করে।
ফুল: ফুলগুলো উদ্ভিদের মূল আকর্ষণ। এই ফুল উভয়লিঙ্গ এবং আকারে বেশ বড়। ফুলের পাপড়ি সংখ্যা ছয়টি, যা প্রান্তে তরঙ্গায়িত এবং ফোটার সাথে সাথে চমৎকারভাবে পেছনের দিকে বাঁকানো থাকে। পাপড়ির রঙ পরিবর্তনের বিন্যাস অত্যন্ত মনোরম; কুঁড়ি অবস্থায় সবুজাভ-হলুদ, ফোটার পর উজ্জ্বল হলুদ এবং ধীরে ধীরে শিখার মতো গাঢ় লাল বা সিঁদুরে রঙে রূপান্তরিত হয়। পুংকেশরগুলো পাপড়ি থেকে আনুভূমিকভাবে বাইরে প্রসারিত থাকে এবং গর্ভমুণ্ডটি প্রায় নব্বই ডিগ্রি কোণে বেঁকে অবস্থান করে।
কন্দ (Tuber): মাটির নিচে থাকে এর পরিবর্তিত মাংসল কন্দ বা রাইজোম, যা সাধারণত ইংরেজি ‘V’ বা ‘L’ অক্ষরের মতো দেখতে হয়। এটি শ্বেতসার এবং অত্যন্ত সক্রিয় অ্যালকালয়েডসমৃদ্ধ।
ফল ও বীজ: পরাগায়নের পর গাছে তিন প্রকোষ্ঠযুক্ত ক্যাপসুল বা ফল উৎপন্ন হয়। ফল পাকলে তা বিদীর্ণ হয়ে বহুসংখ্যক লালচে-বাদামি গোলাকার বীজ বের হয়ে আসে।
রাসায়নিক উপাদান ও বিষাক্ততার প্রকৃতি
উলটচণ্ডালের সৌন্দর্য যেমন মোহময়, তেমনি এটি অত্যন্ত তীব্র বিষাক্ত প্রকৃতির। উদ্ভিদের সমস্ত অংশ—বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ কন্দ এবং পরিপক্ব বীজ—উচ্চমাত্রার সক্রিয় জৈব অ্যালকালয়েডে পরিপূর্ণ।
উদ্ভিদটির প্রধান বায়োঅ্যাক্টিভ যৌগগুলো হলো:
কোলচিসিন (Colchicine): এটি সবচেয়ে প্রধান উপাদান, যার পরিমাণ বীজে প্রায় ০.৬% থেকে ০.৯% পর্যন্ত হতে পারে।
- গ্লোরিওসিন (Gloriosine)
- লুমিওকোলচিসিন (Lumicolchicine)
- কোলচিকোসাইড (Colchicoside)
কোলচিসিন কোষ বিভাজনের সময় স্পিন্ডল ফাইবার গঠনে বাধা দেয়, যার ফলে মাইটোসিস বিভাজন মেটাফেজ দশায় আটকে যায়। অসাবধানতাবশত এই কন্দ খেয়ে ফেললে মানুষের তীব্র বিষক্রিয়া ঘটে। প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড পেটে ব্যথা, বমি, তীব্র ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং জটিল ক্ষেত্রে শ্বাসতন্ত্রের পক্ষাঘাত ও বহু-অঙ্গ অকেজো (Multiple Organ Failure) হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। তাই ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় এটি ব্যবহারের পূর্বে কঠোরভাবে শোধন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
ভেষজ ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহার
বিষাক্ত হওয়া সত্ত্বেও প্রাচীন আয়ুর্বেদ, ইউনানি ও লোকচিকিৎসায় নির্দিষ্ট মাত্রায় উলটচণ্ডালের বহুমুখী প্রয়োগ রয়েছে:
১. বাত ও গেঁটেবাতের উপশম (Gout):
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোলচিসিন মূলত তীব্র গেঁটেবাত (Acute Gout) উপশমের প্রামাণ্য ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি ইউরিক অ্যাসিড জমা হওয়ার ফলে সৃষ্ট তীব্র প্রদাহ হ্রাস করে। বৈশ্বিক বাজারে কোলচিসিনের একটি বড় প্রাকৃতিক উৎস হলো এই উলটচণ্ডালের বীজ।
২. প্রদাহনাশক ও বেদনানাশক:
আয়ুর্বেদে কালিহারীর কন্দ থেকে তৈরি তেল বা প্রলেপ দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা, আমবাত ও সাইটিকার ব্যথায় বাহ্যিকভাবে মালিশের জন্য ব্যবহৃত হয়।
৩. কৃমিনাশক ও চর্মরোগের চিকিৎসা:
এর পাতার রস বা মূলের সূক্ষ্ম নির্যাস নির্দিষ্ট অনুপাতে কুষ্ঠ, একজিমা, খোসপাঁচড়া এবং অন্যান্য ফাঙ্গাল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে কার্যকর জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে। উকুন নাশে এর পাতার রসের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত।
৪. প্রসব বেদনা ও স্ত্রীরোগ:
প্রাচীনকালে প্রসবের বিলম্ব দূর করতে এর কন্দের পেস্ট নাভির নিচে বা প্রসবদ্বারের চারপাশে বাহ্যিকভাবে প্রয়োগ করা হতো, যা জরায়ুর পেশির সংকোচনকে ত্বরান্বিত করত (তবে অভ্যন্তরীণ প্রয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ)।
৫. ক্যানসার গবেষণা:
কোলচিসিনের কোষ বিভাজন প্রতিরোধী গুণের কারণে বিভিন্ন টিউমার ও ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের গবেষণায় এর ডেরিভেটিভস নিয়ে ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে।
জেনেটিক্স ও উদ্ভিদ প্রজননে ভূমিকা
জীববিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে এবং উদ্ভিদ প্রজনন বিদ্যায় কোলচিসিনের গুরুত্ব যুগান্তকারী। এটি উদ্ভিদের কোষের ক্রোমোজোম দ্বিগুণ বা বহুগুণ করার (Polyploidy induction) কাজে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে উদ্ভিদের আকার, ফলনের পরিমাণ এবং ফুলের আকার বৃদ্ধি পায়। কৃষি গবেষণায় বীজহীন ফল বা উন্নত জাতের খাদ্যশস্য তৈরিতে এই রাসায়নিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চাষাবাদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক কোলচিসিনের বিশাল চাহিদা থাকায় ভারতসহ বিভিন্ন দেশে উলটচণ্ডালের বাণিজ্যিক চাষাবাদ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর ডিন্ডিগুল, তিরুপুর ও সালেম জেলায় কয়েক হাজার একর জমিতে এর চাষ হয়।
বংশবৃদ্ধি: সাধারণত বীজের মাধ্যমে বা ‘V’ আকৃতির কন্দ কেটে জমিতে রোপণ করা হয়।
পরিচর্যা: লতানো স্বভাবের কারণে বাঁশের মাচা বা তারের জাল দিয়ে ট্রেলিস তৈরি করে লতাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সঠিক মাত্রায় সূর্যরশ্মি ও পরিমিত জল এর বৃদ্ধির সহায়ক।
অর্থনৈতিক মূল্য: প্রতি একর জমি থেকে কয়েকশ কেজি শুকনো বীজ পাওয়া যায়, যা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি হয়। এটি কৃষকদের জন্য একটি অত্যন্ত লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিগণিত।
সংরক্ষণ ও উপসংহার
অতিরিক্ত মাত্রায় বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ, প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস এবং কন্দের যথেচ্ছ উত্তোলনের কারণে কোনো কোনো অঞ্চলে উলটচণ্ডাল সংকটাপন্ন প্রজাতির তালিকায় পৌঁছে গেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN) এবং বোটানিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই উদ্ভিদের অবাধ আহরণে নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছে। উলটচণ্ডাল একাধারে প্রকৃতির এক অপরূপ অলঙ্কার, অন্যদিকে এক নীরব বিষবৃক্ষ এবং একইসাথে মানবজাতির বহু যন্ত্রণার উপশমকারী মহৌষধ। প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও টেকসই চাষাবাদের মাধ্যমেই এই অনন্য ভেষজ সম্পদটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (References)
Jana, S., & Shekhawat, G. S. (2011). Critical review on medicinally potent plant Gloriosa superba: An endangered useful medicinal plant. Journal of Medicinal Plants Research, 5(11), 2119–2128.
Kirtikar, K. R., & Basu, B. D. (1935). Indian Medicinal Plants (Vol. 4). Lalit Mohan Basu, Allahabad. (ভারতে প্রাপ্ত ভেষজ উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাস ও ব্যবহার সম্পর্কিত মৌলিক গ্রন্থ)।
Chopra, R. N., Nayar, S. L., & Chopra, I. C. (1956). Glossary of Indian Medicinal Plants. Council of Scientific & Industrial Research (CSIR), New Delhi.
Senthilkumar, M. (2007). Phytochemical and ethnobotanical studies of Gloriosa superba L. Ph.D. Thesis, Bharathidasan University, Tiruchirappalli, Tamil Nadu. (তামিলনাড়ুতে বাণিজ্যিক চাষ ও কোলচিসিন আহরণ সংক্রান্ত গবেষণা)।
Mendonça, D., et al. (2014). Colchicine-induced polyploidy in plants: mechanisms, effects, and applications. Plant Breeding Reviews.
Duke, J. A. (2002). Handbook of Medicinal Herbs. CRC Press, Boca Raton. (উলটচণ্ডালের রাসায়নিক উপাদান ও বিষক্রিয়ার বিবরণ)।

.png)
.png)