![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
উৎসবের অন্তরালে
সমিত মজুমদার
মামার বাড়ির পুজোয় এবার রাত্রি অনেক বছর পর যাচ্ছে। সেই মাধ্যমিক দেওয়ার পর আর যাওয়া হয়নি। তার আগে ছোটবেলায় প্রায় প্রতিবছরই যেত। এই পরীক্ষার যাঁতাকলে পড়ে আর যাওয়া হয়নি বারাসাতের মামার বাড়িতে সাতটা বছর। কলেজ পর্ব শেষ করেছে এবার। তাই এবার সময় হয়েছে, এখন মাস্টার্সে চাপ কম। কিন্তু একা আসতে হবে, বাবার পুজোতে স্পেশাল ডিউটি পড়েছে, আর মায়ের পক্ষেও হবে না।
শিলিগুড়ি থেকে রাতে ট্রেনে চেপে ভোরবেলায় শিয়ালদহ, তারপর লোকাল ট্রেনে বারাসাত। রাত্রির মামার বাড়ি বারাসাত শহরের বুকে নয়, একটু ভেতরে। এখনও জায়গাটা ঠিক শহুরে পরিবেশ নয়। মামারা বনেদী বংশ, অনেক জমিজমা, বিশাল একটা প্রায় প্রাসাদসম বাড়ি। এখনও তিন মামাই থাকে এই বাড়িতে, যদিও হাঁড়ি আলাদা হয়েছে, তবে মিলেমিশে আছে। ওঁদের বহু বছরের পুরনো দুর্গোপুজো। অনেক লোক সমাগম হয় পুজোর দিনগুলোতে।
এবার চতুর্থীর দিন সকালেই পৌঁছে গেছে রাত্রি। সারাদিন ধরে শুধু এ ঘর আর ও ঘর করে বেড়াচ্ছে মেয়েটা। তবে ওর সবচেয়ে প্রিয় এই বাড়ির ছাদটা। উঠলেই মনে হয় মাথার উপর কত্ত বড় একটা আকাশ, আর চারদিকে সবুজ।
পঞ্চমীর দিন নিউটাউনে এক বন্ধুর বাড়িতে যাবে রাত্রি। ওর এই বাড়িতে সবচেয়ে বেশি ওঠাবসা যার সাথে সে হল সেজদা। যদিও মাত্র দু’বছরের বড়। তবুও ও ওকে সেজদাই ডাকে। কিন্তু দেখলে কেউ বলবে না, ও দাদা। সারাক্ষণই এ ওর পেছনে লেগে আছে। হাসাহাসি থেকে রাগারাগি, সবই সেজদা। কাল যাবে নিউটাউনে, সেজদা বলেছে গাড়ি ঠিক করে দেবে।
আটটা বাজলে রাত্রি প্রস্তুতি নিতে থাকে। স্নান সেরে আসাতেই ছোটমামী হাজির সকালের জলখাবার নিয়ে। ছোটমামী এবিষয়ে দারুণ চটপটে, খুব খেয়াল রাখে।
- কি রে সেজদা, ন’টা তো বেজে গেল। তোর গাড়ির লোক কোথায় রে?’
- আসবে, আসবে, খুব পাঞ্চুয়াল ছেলে। তুই কাল বলেছিস সাড়ে ন’টা, দেখবি ঠিক পাঁচ মিনিট আগে এসে হাজির হয়ে যাবে।
- তা ছেলে ঠিকঠাক তো?
- আরে আমি বুঝেই দিয়েছি তোকে। এই পুজোর সময় ঠিকঠাক গাড়ি পাওয়া সমস্যার হয়। পাড়ার ছেলে, বন্ধু হলেও এই আমার থেকে বছর দুই-তিনেকের বড়। ছেলে একেবার ঝাক্কাস।
- তা কোন দিক দিয়ে ঝাক্কাস শুনি!
- দারুণ হ্যান্ডসাম ছেলে রে, দেখলে বুঝতেই পারবি না ড্রাইভারের কাজ করে। বেশ নায়কসুলভ কিন্তু। তবে কথা একটু কম বলে।
- আচ্ছা !!
আর কথা এগোনোর সুযোগ নেই। সেজদার ঠিক করা গাড়ি বাড়ির সামনে এসে হর্ন দিয়ে দিল।
- নে রেডি হয়ে নে। তোর গাড়ি এসে গেছে।
- আমি রেডিই আছি। ব্যাগটা নিয়েই আসছি।
রাত্রি ব্যাগ নিয়ে চলে আসে। এক দৃষ্টিতে অনিকেতকে দেখে স্তম্ভিত হয়। কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে সোজা গাড়িতে উঠে বসে।
- অনি, তুই ওকে নিউটাউনে নিয়ে যা, তারপর বিকেলের দিকে একটু নিয়ে আসিস। যদি তোর অন্য কাজ নিতে চাস, নিতে পারিস। তবে চারটে নাগাদ আবার নিয়ে আসিস কিন্তু।
- ঠিক আছে।
- তুই অনির নম্বরটা রেখে দিস। প্রয়োজনে ফোন করে নিস।
রাস্তায় বিশেষ একটা কথা হয়নি ওঁদের। রাত্রি নামার আগে অনিকেতের নম্বর চেয়ে নিল।
- আমি সময় মতো চলে আসব। দেখি যদি এই সময়ের মধ্যে দু’একটা ভাড়া পাওয়া যায়। চিন্তা করবেন না।
- না, ঠিক আছে। একটু সময়ও যদি আপনার বেশি লাগে, সমস্যা নেই। তেমন হলে কথা বলে নেব।
- ঠিক আছে। আমি আগে এলে আপনাকে ফোন করে নেব। আমার নম্বরে একটা মিস কল দিন।
রাত্রি প্রথম এল ওর বান্ধবীর ফ্ল্যাটে। যদিও ও এখানে ভাড়া থাকে। দু’জনে একসাথে স্কুল-কলেজে পড়ে এসেছে। এখন মাস্টার্স করার জন্য কলকাতায় থাকছে। আজ সারাদিন ধরে দুজনে গল্প, খাওয়াদাওয়ায় মশগুল। এদিকে ঘড়ির কাঁটা চারটে ছুঁইছুঁই। অনিকেতের কথা ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠল।
- আমি আপনার ফ্ল্যাটের নিচে রাস্তায় আছি।
- আমাকে দশ মিনিট সময় দিন, আমি আসছি।
বান্ধবীকে জানিয়ে রাস্তায় নেমে এল রাত্রি। অনিকেত গাড়ি রেডি করল।
- আপনি তো ভীষণ রকমের পাঞ্চুয়াল।
- আমাদের তো সময়ের সাথেই চলতে হয়।
- বুঝতে পারছি।
ঘন্টা খানেক লেগে গেল বাড়ি পৌঁছাতে।
- আপনার কত হয়েছে?
- লাগবে না। আপনার দাদা দিয়ে দিয়েছে আগেই।
- সে কি! সেজদার তো দেখছি অনেক উন্নতি হয়েছে!
দেখতে দেখতে পুজো কেটে গেল। এবারের পুজোর দিনগুলোতে ভীষণ ভালো কাটিয়েছে রাত্রি। গতকাল দশমী ছিল, আজ একটু যেন বাড়িটা থমথমে। হইহুল্লোরে চারটে দিন কেটে গেছে। কিন্তু বিসর্জন হয়ে গেলে বাড়ির সব একটু মনমড়াই হয়ে যায়। রাত্রি দুপুরে শুয়ে শুয়ে ফোন করে অনিকেতকে।
- হ্যালো, আপনি আগামীকাল ফ্রী আছেন। আমাকে নিয়ে একটু বের হতে পারবেন।
- হ্যাঁ, ঠিক আছে। কখন? কোথায়?
- এই দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর। কোথায় জানি না।
- মানে? কোথায় যাবেন, জানেন না!
- সে পরে ঠিক করব। যাবেন তো!
- ঠিক আছে। তিনটে নাগাদ?
- আড়াইটা, রাখছি।
রাত্রি এই পাঁচটা দিন হইহুল্লোরে কাটিয়ে দিলেও অনিকেতের কথা বারে বারে মনে করেছে। বুঝতে পারছে ও একটা মায়ায় পড়েছে। যথা সময়ে হাজির অনিকেত। বাড়িতে আবার বান্ধবীর বাড়ি যাবে বলে চলে এসেছে, বলে এসেছে আজ একটু দেরি হতে পারে।
- চলুন।
- সে নয় এগোচ্ছি, কিন্তু আপনি যাবেন কোথায়? নিউটাউন?
- না, আজ একটু একা থাকতে ইচ্ছে করছে। একটু নিরিবিলি কোথাও যাওয়া যায়?
- হুমম। তা কখন ফিরতে চান?
- সাতটার মধ্যে। আচ্ছা, এখানে নদী নেই? একটা নদীর পাড়ে নিয়ে চলুন, একটু কোলাহল কম যেখানে।
অনিকেত গাড়ি নিয়ে চলল টাকির দিকে। ঘন্টা দুয়েকের পথ। পথে কিছু ট্টুকটাক কথা হয়। গাড়ি সোজা গিয়ে থামল নদীর পাড়ে।
- নিন। আপনার নিরিবিলি নদী। ওপারে বাংলাদেশ।
- হ্যাঁ। জানি। এসেছি, আগে। সেজদা নিয়ে এসেছিল। সেবার বাবা মাও এসেছিল। পাড়ের ওই বসার জায়গায় বসা যেতে পারে। আপনিও আসুন।
- আমি !
- হ্যাঁ, আসবেন, সমস্যা?
- না তেমন কিছু সমস্যা নেই।
বসে পড়ে দু’জনে। পরপর দুটি বসার জায়গা।
- আপনি কি ইতস্তত বোধ করছেন?
- না, কেন?
- এত কম কথা বলেন কেন?
- তা ঠিক, আমি একটু কথা কমই বলি।
- কিছু মনে করবেন না, আপনাকে দেখে মনে হয় না, আপনি এই কাজ করেন।
- আসলে সময় মানুষকে এক এক সময়ে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
- তা আপনি গাড়ি না চালিয়ে তো অন্য কিছুও করতে পারতেন।
- ওই যে বললাম, সময়। আসলে আমি তখন কলেজে পড়ি, বিকম সেকেন্ড ইয়ার। বাবা হঠাৎ করে চলে গেলেন। সংসারে তখন মা, দিদি। দিদির বিয়েও ঠিক হয়েছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর আমরা দিশেহারা হয়েছিলাম। দিদির বিয়েটা হল না। গ্রাজুয়েশনটা করার পর আর পড়া হল না, ইচ্ছে ছিল মাস্টার্স কমপ্লিট করব।
- তারপর?
- তার আর পর কি! সংসারের দায়িত্ব। কিছু টাকা পয়সা ছিল, তাই দিয়ে এই গাড়িটা কিনি। আজ ছ’টা বছর হতে চলল। দিদির বিয়েটা দিতে পেরেছি। কিছু ধারও হয়ে গেছে।
- বাড়িতে কে আছে ?
- আপাতত মা আর আমি।
এভাবে বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। অনেক কথায় হয়ে যায় ইছামতীর তীরে। এই নিরিবিলি নদীর পাড়ে বসে দুটি অচেনা মানুষের গল্প বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারল না। লাল আকাশে সূর্যদেব জানান দিয়েছেন আজকের মতো তার ছুটি।
- চলুন, এবার আমাদের ফেরা দরকার। আপনার বাড়িতে চিন্তা করবে।
- হুমম। চলুন। পরশু রাতে আমার হাওড়া থেকে ট্রেন। আমাকে সন্ধ্যায় নিয়ে যাবেন। ভুলে যাবেন না কিন্তু।
রাত্রি সন্ধ্যায় বেড়িয়ে পরে, আজ ফিরতে হবে। অনিকেত রাস্তায় অপেক্ষা করে। বাড়ির সবাই ওকে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। ছোটমামী রাতের খাবার তুলে দেয় রাত্রির হাতে। গাড়ি ছাড়ে অনিকেত।
- তাহলে চললেন?
- হুমম।
- আবার আসবেন কবে?
- জানি না। আপনার ভাড়াটা অনলাইনে দিয়ে দিলাম।
অনিকেত চুপ করে থাকে, রাত্রিও। এমন সময় আর কখনও আগে কাটায়নি রাত্রি। এই দুটো দিনে সে অনিকেতকে যেন খুব কাছ থেকে দেখেছে। সবসময় যেন ঘিরে রেখেছে তাঁকে। কিছুই বলতে পারে না অনিকেতকে। ষ্টেশনে এসে গাড়ি থামায় অনিকেত। চুপ করে রাত্রি নামে। কিছু না বলেই এগিয়ে যায় প্ল্যাটফর্মের দিকে। অনিকেত একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে রাত্রির দিকে। তাঁরও যেন কিছু বলার ছিল রাত্রিকে। হঠাৎ করে ঘুরে অনিকেতের দিকে তাকায় রাত্রি।
- শুনুন। আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরব। আমার জন্য অপেক্ষা করবেন।
ঘুরে প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে যায় রাত্রি। এক দৃষ্টে বহুক্ষণ ধরে রাত্রির দিকে তাকিয়ে থাকে অনিকেত। ধীরে ধীরে ভীড়ে মানুষের মধ্যে রাত্রি মিলিয়ে যাচ্ছে।



No comments:
Post a Comment