![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
চেতনার নিজস্ব শিকড়ে তন্নিষ্ঠ কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত ও তাঁর কবিতা
প্রদীপ চক্রবর্তী
এক .
সদর স্ট্রিটের বারান্দা থেকে
কবি মনীন্দ্র গুপ্তের এই বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না | তিনি পঞ্চাশের কবিদের নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন , 'পঞ্চাশের কবিদের একটি ধারা বা গোষ্ঠী স্রেফ বন্ধুত্বের টানে একসঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন | তাদের ব্যক্তিগত জীবনের নানান ঘটনা ও ঘাতপ্রতিঘাত ছিল তাদের কবিতার অন্যতম উপজীব্য | এরজন্যে কবিতায় এনেছিলেন ঝরঝরে স্মার্ট সাংবাদিকের ভাষা বা ছন্দের নিখুঁত ব্যবহারে প্রেম মানসিক দ্বন্দ্ব ও বেঁচে থাকার অদম্য ঘটনার মিশ্রণ | প্রেম , দৈহিক কামনা , সামাজিক অব্যবস্থা , নানান ঘটনার পারস্পরিক তীব্রতা যেমন তাদের কবিতায় উঠে এসেছিলো তেমনি সঙ্গে ছিল দিলীপকুমার গুপ্তের মতো উদার সহায়ক , বুদ্ধদেব বসুর মতো বৎসল অনুগ্রাহক , সর্বোপরি আনন্দবাজার সংস্থার মতো পরিপালক ও দুর্গ |' সমকালীন উজ্বল কামধেনুগুলোকে সম্পূর্ণ দোহন করে নিয়েছিলেন তারা | '
কিন্তু এর মধ্যে ব্যতিক্রম তো কেউ কেউ ছিলেন | যেমন কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত | তিরিশের একছত্র কবি জীবনানন্দ দাশের বিস্তারবিন্দুর সঙ্গে অনেকটা মিললেও প্রণবেন্দুর পথ ধীরে ধীরে এক ও একক হয়ে পড়ে | হৃদয়ের নিগূঢ় বেদনার প্রগাঢ় অনুভবের সঙ্গে পাশাপাশি যুগপৎ বিশ্বপ্রসারী এবং কালপ্রসারী যে ঋদ্ধ মননের উপাদান জীবনানন্দের নিজস্ব শক্তির জায়গা তা প্রণবেন্দুর কবিতায় পাওয়া যায় না | সংঘ সমিতি বন্ধুকৃত্য থেকে তার মনন ও পৃথিবী প্রথম থেকেই আলাদা | জীবনানন্দের হেঁটে যাওয়া পথে চলতে চলতে ক্রমশ তিনি স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন , দিক পরিবর্তন করেন এবং আপন শিকড়ের নৈঃশব্দে একা একা চলতে থাকেন | প্রণবেন্দুই লিখতে পারেন , অমোঘ এই পংক্তি , "
যে আগুনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি তাতে যেন আমার পুণ্য হয় |"
প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের প্রথম কবিতার বই , এক ঋতু | শতভিষা থেকে প্রকাশিত হয় , ১৯৫৬ সালে | নাগরিক পণ্যসভ্যতার ঝাঁ চকচকে জৌলুশ সম্পর্কে প্রথম যৌবন থেকেই সতর্ক ছিলেন তিনি | সেই তরুণ বয়সেই কবির মনে হয়েছিল , ' তবু যত অনিয়মী , তত যেন মনে হয় পরে / আরেক বন্দর আছে ! ' ( ভরা আঠারোর গান , এক ঋতু ) | ছোট্ট ওই আরেক শব্দে যেন ভিন্ন দ্যোতনার স্বাদ পাই আমরা | সেই অস্পষ্ট আভাসের পিঠে আবারো একটু কুয়াশার চাদর বিছিয়ে দেয় ' মনে হয় ' শব্দের সংযোজন | যদিও প্রথম কবিতার বইয়ে স্বাভাবিক নিয়মে অন্য প্রভাব লক্ষ করা গেলেও , ১৯৬৩ সালে কৃত্তিবাস থেকে প্রকাশিত ' সদর স্ট্রীটের বারান্দা ' কবিতার বই থেকে আমরা প্রণবেন্দুর নিজস্ব স্বর ও শব্দ শুনতে পাই |
এর আগে দেখে নেওয়া যাক তাঁর জীবনের কিছু কিছু অংশ নিয়ে | কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত কলকাতাতেই ২৯ শে জুলাই ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে এম.এ পাস করেন। উত্তর ক্যারলিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ পাস করেন। মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচডি. ডিগ্ৰীলাভ করেন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলক সাহিত্যে বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে যত্ন সহকারে "অলিন্দ" পত্রিকার সম্পাদনা করতেন। কৃত্তিবাস পত্রিকা লেখালেখি করলেও , তিনি সম্পূর্ণ নতুন মেধাভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০৬ সালে "রবীন্দ্র পুরস্কার" এ পুরস্কৃত করেছেন। কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত আনন্দবাজার পত্রিকা , দ্য স্টেটসম্যান ও দেশ পত্রিকার আর্ট সমালোচক ছিলেন। কবি'র সময় ও সমাজে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভাঙ্গনের সূচনা পর্বে কবির মনে যে ভাব ও বিশ্বাস ফুটে উঠেছিল সেটাই সহজ সরল ভাষায় কবিতায় প্রয়োগ করেছেন।
২০০৭ সালে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কবি সাহিত্যিক প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ গুলি হল ঃ--
'এক ঋতু' ; 'সদর স্ট্রীটের বারান্দা' ; 'নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি' ;
'শুধু বিচ্ছিন্নতা নয় ' ; 'হাওয়া স্পর্শ করো' ; 'মানুষের দিকে' ; 'অন্ধ প্রাণ জাগো'; 'নিঃশব্দ শিকড় ; 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' ''কবিতা সমগ্র' ; 'এখন গুজব নেই' ; ' রৌদ্রের নখর ', ' বাধা পেরোনোর গান ', 'নির্বাচিত কবিতা ', প্রভৃতি |
দেশ সাহিত্য সংখ্যা ১৩৮৭ তে প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত আমাদের জানিয়েছিলেন, ‘আমার প্রথম কবিতার বই এক ঋতু তে অনেক বাসনা-বিধৃত, প্রেমের কবিতা ছিল। তারপরেও আমি অনেক প্রেমের কবিতা লিখেছি (দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ সদর স্ট্রিটের বারান্দা-তে ‘প্রেমিকাকে’-এই সিরিজে অনেক কবিতা আছে), কিন্তু প্রথম বইটির প্রেমের কবিতায় আমি শুধু প্রথানুগ শব্দসম্ভার ব্যবহার করেছি, নিজস্ব diction বা কণ্ঠস্বর তখনো আবিষ্কার করতে পারিনি। ‘এক ঋতু’-র শেষের দিকের কয়েকটি কবিতা ও সদর স্ট্রিটের বারান্দা-র কবিতা থেকেই আমি নিজস্ব ভূমি খুঁজে পেয়েছি মনে হয়।’ আবার শতভিষা-র এক সাক্ষাৎকারে আমরা তাঁকে বলতে শুনি, ‘হ্যাঁ ১৩৬৩। তখনো আমি নিজের ভাষা খুঁজে পাইনি এবং সে বিষয়ে আমি অবহিত ছিলাম। তখনো আমি ভালো কবিতা লিখছিলাম কখনো কখনো, কিন্তু নিজের ভাষায় নয়, কোনো বিবেকবান এবং জেদী কবির মতো আমিও চাইছিলাম নিজের ভাষা খুঁজতে। এবং একসময় যেমন ‘এক ঋতু’-র দ্বিতীয় পর্বের কবিতা যা ‘পূর্বপট’ থেকে শুরু হয়েছে। … তারপরে আমি নিজের কণ্ঠস্বর এবং ভাষা দুটোই খুঁজে পেলাম। … সেটা হয়ে গেল হঠাৎ, একটা শিমুলের বীজ ফেটে তুলো বেরিয়ে আসে যেরকম। দেখলাম চোখের সামনে আমার ভাষাকে আবিষ্কার করলাম, আমার ভঙ্গিকে আবিষ্কার করলাম। কিন্তু তার পেছনে ছিল একটা তাগিদ, একটা সচেতন তাগিদ যে আমি নিজের ভাষা খুঁজে পাবো।’ শুরুতে প্রত্যেক বড়ো কবিরই বোধহয় এইরকম একটা তাগিদ থাকে নিজের ভেতর। আর সেই তাগিদ থেকেই জন্ম হয় নতুন কাব্যভাষার। শুরু হয় কবিতার নতুন গতিপথ।
শতভিষা পত্রিকায় নিজের কবিতার ছন্দ প্রসঙ্গে প্রণবেন্দু জানিয়েছিলেন , ' আমি সব কবিতাই ছন্দে লিখি। গদ্যে মাত্র কয়েকটি কবিতা লিখেছি, ছন্দ বলতে যদি মাত্রাবৃত্ত বোঝাও বা অক্ষরবৃত্ত বোঝাও বা ছন্দ এবং মিল বোঝাও, তো আলাদা কথা।… তা যদি বলতে চাও, আমি একটা নিজস্ব ছন্দ, একটা প্রবহমান পয়ার আবিষ্কার করেছিলাম। নিজের কণ্ঠস্বরের একটা অন্তঃস্পন্দময় প্রক্ষেপ ঘটে, এটা অনেক কবির ক্ষেত্রেই ঘটে। আমার ক্ষেত্রেও ঘটেছে বলেই আমার ধারণা। ছন্দটা আমি আমার নিজের গলার প্রকৃতি অনুযায়ী বানিয়ে নিয়েছি। এখনো মাঝে মাঝে পাঁচ মাত্রার কবিতা লিখি। আসলে ছন্দটা কখনো কখনো প্রকট, প্রত্যক্ষভাবে থাকে, কখনো প্রচ্ছন্ন, গোপনভাবে। আমি এই প্রচ্ছন্ন ছন্দে বেশি কবিতা লিখেছি।’
গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে (১৯৫৭) বেরোয় তাঁর প্রথম কবিতাবই এক ঋতু। প্রকাশক ছিলেন শতভিষা পত্রিকা ও প্রকাশনীর পক্ষে দীপঙ্কর দাশগুপ্ত। তখন শতভিষা পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক তরুণ মিত্র বইটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘প্রথম দিকের কবিতার গঠনের নৈয়ায়িক বিশদতা এবং পরবর্তী কবিতাগুলির সাঙ্কেতিক সংক্ষিপ্ততায় অনুষঙ্গের দ্যোতনা—এই উভয় ক্ষেত্রেই কাব্যের প্রসাদ্গুণ বর্তমান।’ অর্থাৎ বইটির কবিতাগুলো দুটি ভাগে বা ভাষাভঙ্গিতে বিভক্ত। প্রথম অংশে নিজস্ব কণ্ঠস্বর নেই যদিও শেষ অংশে তার আভাস পাওয়া যায়। বইটির প্রথম কবিতাটি যদি পড়ি—
' ভীরুচোখ লুব্ধ হল জীবনের পণ্যবিপণিতে;
দূরের দ্বীপের ঘ্রাণ কাছের গভীর গূঢ় টানে
ভেসে এল এ-হৃদয়ে। তীব্রবহা প্রগাঢ় শোণিতে
মাতাল মাল্লার মোহ ভাষা পেল পাল-ছেঁড়া গানে,
তবু যত অনিয়মী, তত যেন মনে হয় পরে
আরেক বন্দর আছে, বিচ্ছুরিত আঙুরের আভা
বিলাসী আঙুলে, ঠোঁটে, দেহতটে নিভৃত নারীর
ঢেলে দেবে পাথেয় প্রচুর। জীবনের হিংস্রতম থাবা
সহসা লুকাবে ভয়ে,—দাহদীপ্ত এ-তরবারির
উজ্জ্বল শরীরে তারি জরাজয়ী মন্ত্র ঝরে পড়ে।'
(ভরা আঠারোর গান/ এক ঋতু)
নিঃসন্দেহে খুব ভালো এবং সার্থক একটি কবিতা। এবার নিচের কবিতাটি পড়ি—
'সে এসে দাঁড়ায় বুঝি আকাশের মতো,
তবু স্থির, আলোয় আনত
শরীরে কোথাও আমি চামেলি কি জুঁই
রাখি না কিছুই;
সে যদি হাওয়ায় সরে, জলে ভেসে যায়,
দাবানলে পোড়ে—
তার মৃতদেহে, নাকি স্মৃতির শরীর
ভীরুহাতে, চুপিচুপি ছুঁই।। '
(ভ্রষ্টপ্রেম/এক ঋতু)
শব্দ চয়ন ও তার ব্যবহারে পুরোনো সময়ের ছাপ আমরা লক্ষ করি প্রথম কবিতার বইয়ে | লুব্ধ, পণ্যবিপণী, তীব্রবহা, শোণিতে, মাল্লার, পাল-ছেঁড়া, বন্দর, দেহতট, দাহদীপ্ত, তরবারি, জরাজয়ী প্রভৃতি শব্দ সমূহের ব্যবহার প্রবণতা দেখা যেত ৩০-এর এমনকি ৫০-এর অনেক কবিদের কবিতায়। পরের কবিতাটিতে ভাষা অপেক্ষাকৃত অনেকটাই সহজ ও সাবলীল। সে এসে দাঁড়ায় বুঝি আকাশের মতো / তবু স্থির, আলোয় আনত। সহজ সাধারণ শব্দে বলা কবিতার লাইন। যে সব শব্দ আমরা দৈনন্দিন জীবনে হামেশাই ব্যবহার করে থাকি। সেই সব শব্দে গড়ে উঠেছে তাঁর কবিতার এই নতুন ভাষা। এখান থেকেই ৫০-এর শক্তি, সুনীল, শঙ্খ, প্রণব, শরৎ কিংবা তারাপদ রায়দের পাশাপাশি আমরা নতুন এক কবি প্রণবেন্দুকে দেখতে পাই কিছুটা। যদিও তাঁর নতুন কাব্যভাষার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ পাই আরও ৯ বছর পর, ১৯৬৬ তে। দ্বিতীয় কবিতাবই সদর স্ট্রিটের বারান্দা-য় এসে। এর কবিতাগুলো একেবারে অন্যরকম। বলা যায় এইখানেই প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের নতুন পথের শুরু। তিনি বলেন, ‘কোনো কবি যদি একই বিষয়ে সারাজীবন পুনরুক্তি করেন, তাঁর যদি কোনো উত্তরণ না হয়, তা যেমন দূষণীয়, কবি যদি ‘চরিত্রবান’ না হন, তাঁর যদি নিজস্ব কোনো পৃথিবী তৈরি না হয়ে ওঠে, তাঁর গলার স্বর যদি সহজে না চেনা যায়, তা-ও একইভাবে সমালোচনাযোগ্য। আমি কখনই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে চাইনি, আরও পাঁচজন অনুভূতিশীল মানুষের মতো আমিও বারবার কেঁপে উঠেছি, পাল্টে গেছি।’
এই বই থেকে কয়েকটি কবিতা আমরা
পড়ে নি |
এক.
'ভাঙা-ঘরে, মস্ত একটা হাওয়ায়,
মানুষ কাঁপছে;
একটা হাত পাশের মানুষীকে
ধরে আছে, আরেকটা হাত
কোথায় রাখবে—বুঝতে পারছে না,
পায়রা এসে বসেছে নিমগাছে।
সামনে শুধু রুদ্র এক পাহাড়
সামনে এক প্রচণ্ড ঝামরানো
সমুদ্রের ক্লান্ত অন্ধকার।
আড়াল করে দেখে নেবার মতো
কোথাও আর গোপন দৃশ্য নেই;
মস্ত একটা হাওয়ায়, ভাঙ্গা-ঘরে,
মানুষ কাঁপছে।।'
(মানুষ, ১৯৬১/সদর স্ট্রিটের বারান্দা )
দুই .
' এসো, এসো, এসো, তোমরা এসো, / এসে আমার চোখের সামনে দাঁড়াও, / বুকের ওপর সহজে হাত রাখো, / চড়ুইভাতির রঙিন গল্প বলো।/.... / এসো, তোমরা অনেকবার শূন্য ভরে এসো,/ এসে আমার জমিতে ঘর বাঁধো।' (তোমরা- সদর স্ট্রীটের বারান্দা)
তিন .
'আমি মিলনের রুটিনমাফিক সব কাজ করে গিয়ে দেখি / বড় দীর্ঘ ব্যবধান / একটি পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়, / এক তৃণসঙ্ঘ থেকে আরেক শ্যামলী,/ একটি হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়।' (নিরাশ্রয় - সদর স্ট্রীটের বারান্দা)
চার .
' খুব ভয়ে ভয়ে আমি
কবিতা লেখার দিকে চলে আসি।
এত ভীরু শিখা, তাকে
যে-কোনও জলের কাছে, যে-কোনও ঝড়ের কাছে
নিয়ে যেতে বড় দ্বিধা হয়,
যদি নিভে যায়, যদি তার
আঁধারে যাবার
কোনও অসুবিধা থাকে!
আমি কাকে যে বাঁচাবো, তাও
বুঝতে পারি না।'
(আমি কবিতার দিকে/সদর স্ট্রিটের বারান্দা)
সদর স্ট্রিটের বারান্দা-র শেষ কবিতাটির নাম ‘সদর স্ট্রিটের বারান্দা’। আসুন কবিতাটি পড়ি—
'বারান্দা, রেলিং সব কাছে ছিল;
আমি দাঁড়ালাম, আর
ভোর হয়ে এলো।
দেখলাম—
আর পাঁচজন বেশ সুস্থ, স্বাভাবিক,
চলার আদল যেন মূর্তিমান ছাঁচের আদল—
টান দিলে হাওয়ার ভেতর ভরে ওঠে।
শুনলাম—
মাতাল লোকটা নাকি মারধর করেনি মেয়েটিকে,
চটি উড়ে এসেছিল দৈবাৎ হাওয়ার জোরে
পাঁচিল ডিঙিয়ে,
আজ তার দু-নম্বর মেয়েটির কান্নার শ্রাবণ
এ পাড়ার সানাই।
বুঝলাম
যা কখনও ঠেকানো যাবে না,
তা এতোই একান্ত, সহজ,
তাকে নিয়ে জল্পনা করাও
যেন চোখ বেঁধে চলা।।'
দুই .
কবিতা ও আমি
ব্যক্তিগত প্রেমজীবনের আবর্ত থেকে , প্রেম ও বিচ্ছেদ , অনুরাগ অভিমান , ক্ষোভ দুঃখ বিরক্তি থেকেই ব্যক্তিগত জীবনের শিকড়ে যাত্রার যে সঞ্জীবন প্রগাঢ়তা কিংবা বহু অপেক্ষার সমস্ত উপেক্ষা বা লাঞ্ছনার উর্ধে , নগরকেন্দ্রিক জীবনে যান্ত্রিকতার নাগপাশে কবির ব্যক্তিক বিপন্নতা এবং তার উর্ধে যাবার সামগ্রিক প্রয়াসে অস্ফুট , অব্যক্ত বেদনার তরঙ্গ - বিস্ময় আমরা দেখি তাঁর কবিতায় | যা মর্মমূলের উৎকেন্দ্রকে নাড়া দিয়ে যায় খুব গভীর অতলে | হয়তো ব্যক্তিগত জীবনের বিশেষ মানুষী , ম্যারিয়ন ব্রাওয়ারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন বা মান অভিমানের অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে এইসব কবিতায় | প্রণবেন্দুর কবিজীবনের উত্থান-পতনের ইতিহাসের ভিতরেও কি লুকিয়ে নেই তাঁর ব্যক্তিজীবন? এই যে পঞ্চাশের আরো পাঁচজন কবির সঙ্গে নক্ষত্রের সম্ভাবনা নিয়ে জ্বলতে-জ্বলতে-চলতে-চলতেই প্রণবেন্দু পিছনে পড়ে গেলেন একসময়, কিংবা তাঁর এই উল্কাখণ্ডের মতো হু-হু জ্বলে উঠে তারপর একমুঠো ভস্মের মতো ছড়িয়ে-ফুরিয়ে যাবার পিছনে কি কোনো চক্রান্ত ছিল? না-কি, এর পিছনে তাঁর নির্জনতাসন্ধানী ,
ব্যক্তিস্বভাবেরই দায় ছিল কোনো? এমন নির্জনতাই কি সত্যি-সত্যি কাঙ্ক্ষিত ছিল প্রণবেন্দুর? এই হারিয়ে যাওয়ার নিয়তিকে (২০০৩-এ 'রৌদ্রের নখরে' রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিল, সে কথা মনে রেখেও বলছি) কি তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ নিরুত্তাপ ঔদাসীন্যে সহজিয়া সাধকের মতো সহজে স্বীকার করেন নিতে পেরেছিলেন? তাঁর কবিতায় কি সেই অভিমানের বা আত্মসমীক্ষার কোনো প্রতিফলন নেই ?
শতভিষায় প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত বলছিলেন, ‘আমি কবিতা লেখার সময়ে সচেতন মনটাকে হারিয়ে ফেলি না, আধোঘোরের মধ্যে কবিতা লিখি। ঘোর শব্দটা সদর্থে ব্যবহার করতে হবে, আমি বলতে চাই তখন আমার নিবিষ্টতা এত বেশি তীব্র থাকে, কনসেনট্রেশন, যেকোনো কিছুই আমাকে তখন বিচলিত করে না। তখন আমার সচেতন মন আর অচেতন মন এর মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি কবিতা লিখি। যাতে আমার মনে হয় যে অনেকসময় অচেতনের অবচেতনে উদ্ভিদ উঠে আসে আমার কবিতায়।’ অনেকেই তাঁর লেখায় এক ধরনের দিব্য উদ্ভাসনের কথা বলেন। তিনিও স্বীকার করেন এক ধরনের আধ্যাত্মিক আয়তন আমাদের জীবনে আস্তীর্ণ হয়ে থাকে, যে বিষয়ে আমরা অনবহিত হবার ভান করি। গুরুগম্ভীর কোনো ব্যাপার নয়। খুব ছোট ছোট বিষয়েও এই আয়তন আকীর্ণ হয়ে থাকে। যেমন সন্ধেবেলার কাক ছাদের কার্নিশে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে, তারপর নিস্তব্ধ নিরুদ্দেশের দিকে হঠাৎ ডানা মেলে দেয়; কিংবা শীতের দুপুরে একটা বিড়াল চকিতে পাঁচিল থেকে লাফ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল, বিকেল-সন্ধের সন্ধিক্ষণে কাচের জানালার পর্দা সরাতেই অলৌকিক রঙে ভরে গেল ঘরের দেয়াল, পার্কে এক তরুণী তার প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হেসে উঠল, রুমাল বিছিয়ে গাঢ়-সবুজ ঘাসের উপর বসে পড়ল, অথবা চলন্ত ট্রেন থেকে চোখে পড়ল, সাইকেলে চড়ে একদল যুবক উদাস রাস্তার আড়ালে হারিয়ে গেল;—এই ধরনের সমস্ত আপাত-তুচ্ছ, ছোট ছোট ঘটনায় কম্পমান হয়ে ওঠে অন্য একটি যবনিকা, আবরণ—যার আড়াল থেকে নির্গত হয় এক রকম রহস্যানুভূতি। এই অনুভূতিকেই কবি আধ্যাত্মিক বলছেন। এখান থেকেই তাঁর কবিতার উৎসার।
কবিতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা তিনি খুব সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর ‘কবিতা ও আমি’ গদ্যে। তাঁর মতে কবিতা ও সাহিত্য যত anthropocentric বা মানবমুখীন হবে ততই মঙ্গল। এই মানবমুখিনতার সাথে আধ্যাত্মিকতার বা ঈশ্বর বিশ্বাসের কোনো বিরোধিতা নেই। আধ্যাত্মিক অনুভূতি আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে। যেমন রবীন্দ্রনাথ, অমিয় চক্রবর্তী, আল মাহমুদ কিংবা ফ্রান্সের ক্লোদেল, ‘ফোর কোয়াট্রেটসের’ এলিয়ট। সেই সময়কার কবিতা পরিবেশ আর তাঁর কবিতা ভাবনা নিয়ে অলিন্দ পত্রিকায় লিখে যাচ্ছিলেন বেশ কিছু কবিতা-কথাও।
"একজন কবি প্রচার যন্ত্রের আনুকূল্য পান তখনই যখন তিনি যা লিখেছেন তা বাজারে চলে। "
(অলিন্দ/শারদ ১৩৯৬)
" কবিতাকেই শুধু সমাজ সচেতন হতে হবে তাই নয়, সমাজকেও হতে হবে কবিতা সচেতন। "
(অলিন্দ/ শরৎ ১৩৯৭)
তিন .
আপন মুদ্রাদোষে একা
জীবনের স্খলিত আলোয় তাৎক্ষণিকতার চেরা জিভে পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে কারোর কারোর কবিতার ঘর গেরস্থালি। কারোর কারোর জীবনের চেয়েও বড়ো হয়ে ওঠে কিছু সম্ভাবনা, কিছু চিরকালীন ভাবনার সবুজ আকর্ষ। নির্ভার-শান্ত- সাহজিক। শ্রমণের শান্ত পায়ে হেঁটে চলা কোন কোন কবি নিরবচ্ছিন্ন সৃজনবেদনায় উদাসীন অথচআত্মনিমগ্ন জীবন পরিক্রমায় বন্ধন-অসহিষ্ণু স্বেচ্ছাবিহারপ্রিয়। পার্থিব চাহিদার ক্ষণ-বিভ্রম তাকে বাইরে থেকে আক্রমণ করলেও কখনই সাহসী যোদ্ধার মতো একেবারে পেড়ে ফেলতে পারে না। জীবনরঙ্গের গভীর নিসর্গ হেলায় ভুলিয়ে দেয় এইসব প্রত্যক্ষবৎ তাৎক্ষণিকতাকে। তাকে ছাপিয়ে ওঠে কবির চেতনা-চল। কল্পনা বিশ্ব। কবি অনুভব করেন বহুদূর শতাব্দীর জনহীন পথে যে অজ্ঞাত জীবনধারা কালগ্রন্থি খুলে আশ্চর্য জগতের সম্ভার তুলে ধরে, তার কাছে সীমাবদ্ধ বাসনার প্রতিষ্ঠা, ছিদ্রান্বেষীদের গড্ডালিকা স্রোত, সমকালীন বিবর্ণ মদক্ষিপ্ত উৎসব, প্রাপ্তি, উদ্ধত শোণিত কোষে বাগ্ময় শূন্যতার উচ্ছ্বাস সবই স্নায়ুর প্রাণপণ তীব্র পিপাসার আর্তি মাত্র। তাতে কেবল মোহের পল্কা ফাঁদ ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায়। স্থিতপ্রজ্ঞ কবির কাছে তার কোন মূল্য নেই।মূল্য নেই বলেই প্রণবেন্দুর কবি সত্তা ও ব্যক্তিজীবনের গভীরতাকে বিশ্লেষণ করলে পাই কোনো গ্রিক ট্রাজেডির নায়কের ভাগ্যহত অমোঘ নিয়তি বা প্রারব্ধের মতো অনতিক্রম্য সত্তায় বিচ্ছিন্নতার কীট | এই বিচ্ছিন্নতা যেমন তাঁকে একটু একটু করে গ্রাস করেছিল , আপন মুদ্রাদোষে নির্বাসিত , তেমনি নির্বাসনের গহ্বর থেকে প্রাণপনে ফিরে আসতে চেয়েছেন সামাজিক আলোর বৃত্তে | একদিকে গড্ডালিকা প্রবাহ , ভন্ড সামাজিকতা , বন্ধুত্বের ছন্দবেশী মুখোশ এবং অবক্ষয়ী সমাজের আত্মধ্বংসী প্রকল্পনা , অন্যদিকে মুখোশহীন স্নেহপ্রবণ মনের স্পর্শ বা তিক্ত সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে এসে , শান্ত নির্জনতার আবাহন তাকে বিভক্ত করেছে সারাজীবন | আরও আপন মুদ্রাদোষে ছুটে গেছেন বারংবার নিজের গভীর মগ্ন অস্তিত্বের সংবেদনে | কবি লিখছেন --
' মানুষের পাশ থেকে সরে যায় সঠিক মানুষী, / ভাষা না-শেখার জন্য, ভাষা না-জানার জন্য, / শুধু ভাসাভাসা / চলেছে সকলেই, তবু কেন চলে... / ... / পার্কে ছাতা হেঁটে যায়, মানুষ-আড়াল-করা...' (এই সেই জায়গা শুধু বিচ্ছিন্নতা নয়)
কিংবা- 'শিকড ফুরিয়ে গেলে, বৃক্ষ আছড়ে পড়ে মাটির ওপরে। / তুষারে, সমস্ত জল হিম হয়ে যায়। / সাইকেল থেকে নেমে, নিঃসঙ্গ যুবক পথ হাঁটে।/ মানুষ যে চেষ্টা করে/ এই কথা / অন্য মানুষ মেনে নেয়? / কোনোমতে বেঁচে থেকে / একজায়গায় এসে, সমস্ত মানুষ ভেঙে যায়।' (মানুষ পারে না - মানুষের দিকে)
অথবা- 'মুখোশ, মুখোশ, শুধু মুখোশ লাফিয়ে ওঠে / মুখের ওপরে। / ... / হাত-পা দুমড়ে যায়, মুখের ভেতর থেকে ফেনা বাইরে আসে, / তবুও থামে না নাচ, ঘোর শব্দে পাখি উড়ে যায়'- (অন্ধ নাচ নিঃশব্দ শিকড়)
এমন অভিমান বা অনুযোগের উচ্চারণ আরো আছে- 'পৃথিবী, সর্বংসহা, তুমি খুব কুঁকড়ে গিয়ে / ছোটো হয়ে আসছো ক্রমশঃ।/.../ বিষ থেকে বাষ্প উঠে চরাচর আচ্ছন্ন, ধূসর / হয়ে আছে। / কাল ভোরে, হকার সাইকেলে চড়ে যে কাগজ / বারান্দায় ছুঁড়ে দিয়ে যাবে- / এই ব্যস্ত বিষক্রিয়া হেডলাইন হবে কি সেখানে?' (বিষ নিঃশব্দ শিকড়)
কিংবা- 'আমরা সবাই মিলে একদিন / প্রাণপণে সবাইকে স্পর্শ করেছি। / এখন আমরা আর স্পর্শ করি না / ... / তবু আমাদের নামে কানাঘুষো রটে যায় বলে / নাইলন মশারি কিনে, আমরা শুয়ে থাকি।' (মশারি নিঃশব্দ শিকড়)
চার .
প্রেম অপ্রেম
৬০ দশকের বিশিষ্ট কবি ভাস্কর চক্রবর্তী প্রণবেন্দুর কবিতা নিয়ে কি বলছেন
শোনা যাক -
'আমাদের এই সময়টা আমাদের চারপাশে একটা ছাইয়ের পাহাড় ছড়িয়ে দিয়েছে। দেখা, পথ চলা, আমাদের কথা বলা পর্যন্ত প্রায় একটা অসম্ভাব্যতার কাছে এসে পৌঁছেছে। এই ছাই, এই অর্থহীনতার পাশে আমরা সকলেই কম বেশি কাত হয়ে আছি। তবু, এই ছাই-ই তো শেষ কথা নয়। প্রণবেন্দু দাশগুপ্তকে দেখি এই ছাই সরিয়ে-সরিয়ে, কী সাবলীলভাবে, কী ব্যস্ততাহীন, কী শান্ত, কী নিশ্চিতভাবে এগিয়ে চলেছেন, আর লিখে রাখছেন যা-কিছু, শেষ পর্যন্ত তা বোধহয় আমাদের বাংলা কবিতার চিরকালীন একটা গর্বের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো।’
এই সাবলীল শান্ততা প্রণবেন্দুর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য |একবার সমস্ত বিশ্বাস-আশ্বাস-নির্ভরতা নির্মম ধাকায় চুরচুর ভেঙে যাওয়া, আবার কিছু সময়ের শুশ্রুষাতেই সেই ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে আশ্চর্য ওষধির গুণে
ভাঙাটুকরোগুলোকে একটা-একটা করে জোড়া লাগানোর আপ্রাণ চেষ্টা- প্রণবেন্দুর কবিতায় প্রতিনিয়ত এবং ধারাবাহিক। তাঁর এগারোটি কাব্যগ্রন্থ জুড়ে হৃদয়ের সেই একই ওঠা- নামার সাপলুডো খেলা |
তিনি একেবারে অকৃত্রিমভাবেই জীবনলগ্ন কবি। চুলচেরা হিসেব-নিকেশ করে মেপেজুকে পা ফেলে মুখের ওপর হাসি-হাসি সৌজন্য ও ভদ্রতার মুখোশ টাঙিয়ে প্রতিষ্ঠা ও সৌভাগ্যের দিকে পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে যাওয়ার বানানো জীবনে কোনোদিনই অভ্যস্ত ছিলেন না প্রণবেন্দু। কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের ছায়ায় চলারও অভ্যাস ছিলো না তাঁর। ছিলো না ঝাঁকে-চলার মনোবৃত্তিও। ফলে জীবনে প্রতিষ্ঠার অংকে তাঁকে শেষপর্যন্ত শূন্য পেতেই হয়েছে। কিন্তু তাঁর কবিতা কি সংবেদনশীল পাঠকের কানে শেষপর্যন্ত জীবনের কোনো গূঢ় নিবিড় মন্ত্র শুনিয়ে যায় না? হতে পারে সেই স্বর অত্যন্ত উদারা-সপ্তকে বাঁধা অনেকটা স্বগতোক্তির মতো; হতে পারে সেই ভাষা আসলে শিকড়ের নৈঃশব্দে আভাসিত, তবু সেই ভাষা এসে পৌঁছোয় আমাদের বিক্ষত প্রাণের বন্ধ দরজার কাছে |
তাই প্রণবেন্দুর মতে একজন কবি যখন জুতোর ফিতে বাঁধেন, তখনো তিনি কবি। তাঁর সুকুমার নিভৃত সত্তাটিকে তিনি যথাসাধ্য গোপন করে রাখেন, সমাজের ব্যবহারযোগ্য বা ব্যবহারোপোযোগী কোনো মুখোশ, তাকে পরে থাকতে হয় কখনো কখনো। হয়তো বা অধিকাংশ সময়। প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘আমার জীবনশৈলী আর জীবনবোধই আমার কবিতাকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত করেছে সবসময়।’ তিনি সাধারণত চারপাশের জীবন থেকেই কবিতার উপকরণ, চিত্রকল্প, উপমা ইত্যাদি আহরণ করতেন। কেননা, কবিতা জীবন থেকেই সবকিছু নেয়, আবার জীবনকে ফিরিয়েও দেয় তার ফলশ্রুতি। কবিতার ভেতরদিকের ভূগোলে অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার আবিষ্কার ঘটে। এই অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা মানে আজগবি ঘটনা নয়—এমন কোনো অভিজ্ঞতা যা অনেক ভেতর থেকে উঠে এসে আমাদের সমস্ত অস্তিত্ব সঞ্জীবিত করে। রেক্সরথের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, we react to things and we respond to persons, in the arts we respond to the living communication of a person, no matter how long gone the artist may be. তাই শিল্পের জন্যই শিল্প—এই তত্ত্বে এখন আর মন ভরে না। আপ্তবাক্যের মতো শোনাতে পারে যদিও, তবে এ কথাই ঠিক যে জীবনের জন্যেই শিল্পের অস্তিত্ব বা জীবনের জন্যেই শিল্প। '
শেষ করবো এই লেখাটি প্রণবেন্দুর দুটো কবিতা দিয়ে ---
এক .
' পাখি মরে আছে,
পাখি বরফের স্তুপের ভেতরে মরে আছে ।
ছিল কি কোথাও আগে? বাসা বেঁধেছিল
পোড়ো জমিটির নীল গাছে?
নাকি হাওয়ার ফিকিরে, ঘুরে ফিরে,
এসে মরে গেল এই দুনম্বর বাড়ির শিবিরে ।
মাথা গুঁজে আছে,
যেন বরফের ভেতরের ঘর,
সিঁদ কাটতে চায়; যেন ব্যালেরিনা,
ভার পালটাতে গিয়ে আস্তে থেমে আছে-
ঘুরে গিয়ে, এক ঝাপটায়
আবার ভরাবে শূন্য শব্দময় রঙিন ডানায় ।
কিন্তু বড় দেরি হয়ে গেছে, মনে হয় ।
কিছু আগে ঈশ্বরের শেষ ক্ষমা করবার সাধ
মিটে গেছে। আজ শুধু শীতের আলোয়
ধবল নিঃসঙ্গ পাল
মেঘ-ছিন্ন, জলে পড়ে আছে,
পাখি মরে আছে,
পাখি শীতের ভেতরে মরে আছে ।। ' ( একটি মৃত পাখি )
দুই .
আর কিছু নয়,শুধু পরিণামহীন ভালোবাসা
আমাদের সমস্ত জীবন ঘিরে থাকে।
একটি মেয়ের কাছ থেকে
আরেকটি মেয়ের কাছে গেলে
হৃদয় কি ভেঙে টুকরো হয়?
সমুদ্র উথাল হ'য়ে তাড়া করে ঘরের ভিতরে?
কয়েকটি মুহূর্ত শুধু ভালো লাগে, কয়েকটি প্রহর বড়োজোর,
তারপর ঘুরে ঘুরে পাতা ঝরে উঠোনের ঘাসের ওপরে,
ইঁটের পাঁজার মধ্যে চন্দ্রবোড়া এঁকেবেঁকে পথ খুঁজে নেয়,
বৃষ্টি থেমে গেলে , পার্কে গিয়ে বসা যায় প্রবীণের মতো।
কোন্ শাশ্বতী এসে এইসব এলোমেলো খেলা ভেঙে দেবে?
পরিণামহীন, শুধু পরিণামহীন ভালোবাসা
আমাদের সমস্ত জীবন ধ'রে ছায়া ফেলে ছাতিমের মতো॥
( প্রেম অপ্রেম )

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment