1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Friday, October 9, 2026

ইছামতীর জলরাক্ষস

 ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)


ইছামতীর জলরাক্ষস

সুদীপ চক্রবর্তী 


(১)

আকাশে আজ মেঘের ঘনঘটা। শ্রাবণের ঘনঘোর অমাবস্যায় ইছামতীর নোনা জল যেন তরল কালির মতো থমথম করছে। উত্তর চব্বিশ পরগনার হাসনাবাদের প্রান্তবর্তী গ্রাম হিঙ্গলগঞ্জ। নদীর ওপারেই বাংলাদেশের খাঁড়ি অঞ্চল, আর দক্ষিণ-পূর্বে দৃষ্টি বাড়ালে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের ঘন জঙ্গল। বাতাস ভিজে ভারী হয়ে আছে, আর সেই বাতাসে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত সোঁদা ও আঁশটে গন্ধ।

ভবেন মণ্ডলের মেছোভেড়ি ইছামতীর বাঁকেই অবস্থিত। মেছোভেড়ির বিস্তীর্ণ জলাশয়ে প্রতি বছর রুই, কাতলা আর ভেটকির চারা ছাড়া হয়। গত এক সপ্তাহ ধরে সেই ভেড়িতে অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটছে। প্রথম রাতে ভেড়ির টিনের চালের ওপর ভারী কিছু আছড়ে পড়ার বিকট শব্দ পেয়েছিল পাহাদাররা। পরদিন সকালে দেখা গেল, ভেড়ির পাহারাদার কালু মণ্ডলের পোষা অ্যালসেশিয়ান কুকুরটা নিখোঁজ। পরের রাতে নদীর কাদার ওপর মিললো কুকুরটার মৃতদেহ, তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে ছাল ছাড়িয়ে রাখা হয়েছে। মাংসের কোনো অংশ খাওয়া হয়নি, কেবল ঘাড়ের রগ দুটো কাটা!

ঘটনাটা কেবল পশুহত্যার মধ্যে আটকে থাকল না। মঙ্গলবার গভীর রাতে ভবেনের ছোট ভাই সনাতন মণ্ডল ভেড়ির বাঁধের ওপর টর্চ হাতে টহল দিচ্ছিল। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল থেকে থেকে। নদীর জলে ছপছপ শব্দ শুনে সনাতন যখন টর্চের তীব্র আলো ফেলে সে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখেছিল। হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিন-চার ফুট লম্বা একটি অদ্ভুত প্রাণী। অবয়বটা মানুষের শিশুর মতো হলেও তার চামড়া গাঢ় সবুজ ও কচ্ছপের মতো খসখসে আঁশযুক্ত। তার পিঠে বিশাল কচ্ছপের মতো খোলস, আর হাতের আঙুলের মাঝে ব্যাঙের মতো চামড়ার পর্দা!

সনাতন ভয়ে চিৎকার করে ওঠার আগেই প্রাণীটি অমানুষিক গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। সনাতনের বিকট চিল চিৎকার রাতের থমথমে বাতাসকে চিরে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। টর্চলাইটটা ছিটকে পড়ে যায় কাদার মধ্যে। চিৎকার শুনে ভেড়ির পাহারাদার ছুটে আসায় প্রাণীটা জলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পালিয়ে যায়। পাহারাদারকে প্রানীটার সম্পর্কে বলতে বলতেই সনাতন ইহনিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

পরদিন ভোরে যখন পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাল, তখন সনাতনের নিথর দেহটা নদীর চরে আধডোবা অবস্থায় পড়ে ছিল। গ্রামের লোক তাকে ঘিরে ছিল। সনাতনের ঘাড়ের পেছনে তিনটি গভীর ক্ষতের দাগ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন অতি ক্ষুরধার কোনো নখের আঘাত তার মাংস কেটে পেশি উপড়ে নিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো, সনাতনের সমস্ত শরীর ধবধবে সাদা ও রক্তশূন্য হয়ে গেছে! ঠিক যেন , কোনো রক্তচোষা জলজ দানব যেন ঘাড়ের ওই ক্ষত দিয়ে তার সমস্ত রক্ত এক ফোঁটাও না রেখে নিংড়ে চুষে নিয়েছে।

হাসনাবাদ থানার অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার প্রসূন বিশ্বাস সনাতনের মৃত্যুকে সহজভাবে নিতে পারছিলেন না। স্থানীয় গ্রামবাসীরা দাবি করছে, ওটা নদীর 'জলপিশাচ' বা 'মেছো-ভূত'। পুলিশ সুপারের কাছে ভূত-প্রেতের কোনো স্থান নেই, তাই তিনি বিষয়টিকে কোনো নতুন প্রজাতির নরখাদক সুন্দরবনের কুমির বা বিষাক্ত সাপের আক্রমণ বলেই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু পঞ্চায়েত সভাপতি ও স্থানীয়দের চাপে তিনি বাধ্য হয়ে যোগাযোগ করেন কলকাতার নৃতত্ত্ব ও প্রাক-ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ড. অমর্ত্য সেনের সাথে।

পরদিন সকালেই হাসনাবাদে এসে হাজির হলেন ড. অমর্ত্য সেন। তাঁর সাথে ছিলেন হাসনাবাদ হাইস্কুলের তরুণ ইতিহাস শিক্ষক শমীক ধর, যিনি স্থানীয় লোকগাথা নিয়ে গবেষণা করছিলেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার সময় অমর্ত্যবাবু একজোড়া রবারের গ্লাভস পরে কাদার মধ্যে বসে পড়লেন। সনাতনের দেহের আশেপাশে ভিজে মাটিতে কিছু অদ্ভুত ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। অমর্ত্যবাবু পকেট থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করে অতি সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করতে লাগলেন। "কী দেখছেন স্যার? কুমিরের পায়ের ছাপ?"—প্রসূনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন। অমর্ত্যবাবু মাথা নাড়লেন, "না প্রসূনবাবু। কুমিরের পাঁচটা আঙুল থাকে, আর তার থাবার ছাপ অনেক চওড়া হয়। ভালো করে দেখুন, এখানে মাত্র তিনটে আঙুলের ছাপ। আর প্রতিটি আঙুলের শেষে রয়েছে ব্লেডের মতো ধারালো নখের দাগ। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো, কচ্ছপের মতো খোলসের হালকা ঘষা লাগার দাগ রয়েছে। এর দৈর্ঘ্য তিন থেকে চার ফুটের বেশি নয়।"

শমীক ঝুঁকে পড়ে ছাঁচটি দেখে বলল, "স্যার, বাংলায় বা সুন্দরবনে এমন কোনো পরিচিত জলজ প্রাণী তো নেই! তবে কি এটা কোনো রূপান্তরিত প্রজাতি?"

অমর্ত্যবাবু ভিজে কাদা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে নিজের চামড়ার ব্যাগ বের করলেন। সেখান থেকে বের করলেন একটি প্রাচীন বই ও কয়েকটি স্কেচ। একটি পাতা খুলে তিনি শমীক ও প্রসূনবাবুর সামনে ধরলেন। ছবিটাতে দেখা যাচ্ছে, হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি অদ্ভুত সবুজ অবয়ব। তার চেহারা ছোট শিশুর মতো, পিঠে শক্ত খোলস, চিল-পাখির মতো বাঁকানো ঠোঁট, আর সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হলো তার সমতল মাথার তালুতে বাটির মতো এক গভীর গর্ত, যার ভেতরে জল ভর্তি।

ছবিটা দেখে শমীকের চোখ কপালে উঠল, "স্যার! হুবহু এই প্রাণীটার কথাই তো সনাতন মৃত্যুর আগে দেখে বর্ণনা করেছিল! কিন্তু এটা কিসের ছবি?"

অমর্ত্যবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, "এটি কোনো বাংলা বা ভারতীয় পৌরাণিক প্রাণী নয়। এটি জাপানি লোকগাথা ও পুরাণের অন্যতম ভয়ঙ্কর ও আদিম জল-দানব 'কপ্পা'। জাপানি ভাষায় এর অর্থ 'নদী-বালক'। এরা জল-দানব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাপানি পুরাণের এই জলরাক্ষস সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে থাকা ইছামতী নদীতে এলো কোথা থেকে?"

(২)

সন্ধ্যাবেলা হাসনাবাদের পুরোনো ডাকবাংলোয় অমর্ত্যবাবু, শমীক এবং প্রসূনবাবু আলোচনায় বসলেন। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। হ্যারিকেনের আলোয় দেয়ালজুড়ে বিশাল বিশাল ছায়া নাচছে। অমর্ত্যবাবু তাঁর ল্যাপটপে কিছু গোপন সামরিক নথি খুললেন। "তোমাদের মনে হতে পারে, জাপানি পুরাণ থেকে একটা কাল্পনিক প্রাণী কীভাবে ইছামতীতে জীবন্ত হয়ে উঠল? কিন্তু এর পেছনে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক কালো ও বৈজ্ঞানিক ইতিহাস।"

প্রসেঞ্জিৎবাবু সোজা হয়ে বসলেন, "কীসের ইতিহাস স্যার?" "১৯৪২ সাল," অমর্ত্যবাবু বলতে শুরু করলেন। "জাপানি বাহিনী যখন বার্মা আক্রমণ করে ভারতে ঢোকার ছক কষছিল, তখন তারা চাটগাঁ ও সুন্দরবনের গহীন ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে অতি গোপনে 'ইউনিট ৭৩১'-এর মতো একটি বায়োলজিক্যাল এক্সপেরিমেন্টাল ক্যাম্প তৈরি করেছিল। ব্রিটিশদের চোখ এড়িয়ে তারা স্থানীয় খাঁড়িতে কৃত্রিমভাবে কিছু জলজ বিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করছিল। জাপানি পৌরাণিক কপ্পার ধারণাকে কাজে লাগিয়ে তারা জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এক প্রকার জীবন্ত জলজ জৈব-অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেছিল, যা ডাঙ্গায় ও জলে সমান দক্ষতায় শত্রুপক্ষকে ধ্বংস করতে পারে।"

শমীক চমকে উঠল, "বলেন কী স্যার! তার মানে সেই যুদ্ধের সময় তৈরি করা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জীব সুন্দরবনের এই খাঁড়িতে আজও বেঁচে রয়েছে? "হ্যাঁ," অমর্ত্যবাবু বললেন। "সম্ভবত যুদ্ধের শেষে ক্যাম্প ধ্বংস হয়ে গেলেও এই জীবগুলোর কিছু জোড়া সুন্দরবনের গভীরে নোনা জলের গুহায় বেঁচে যায় এবং প্রজনন করে সংখ্যায় বাড়ে। এতকাল তারা গভীর ম্যানগ্রোভের হরিণ বা মাছ খেয়ে কাটাতো। কিন্তু ভেড়ির মিষ্টি জল আর মানুষের রক্ত তাদের আবার লোকালয়ে টেনে এনেছে।"

ঠিক এই সময় ডাকবাংলোর দরজায় সশব্দে টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকলেন গ্রামের প্রবীণতম মৎস্যজীবী রহিম শেখ। তাঁর গায়ে জড়ানো ভিজা চাদর, হাতে এক প্রাচীন পিতলের হারিকেন। রহিম শেখ ঘরে ঢুকে কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, "বাবু, আপনারা যার কথা বলছেন, আমরা তাকে 'নদীর পিশাচ' বলি। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগেও আমার বাপ-দাদারা হিঙ্গলগঞ্জের খালে এর উৎপাত দেখেছিল। ওটা সাধারণ জলজন্তু নয় বাবু, ওর মাথায় থাকে অলৌকিক জলের পাত্র!"

অমর্ত্যবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, "রহিম চাচা! তুমি ওই পাত্রের কথা জানলে কীভাবে?" রহিম শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আমার দাদু সুন্দরবনের বড় পীর ছিলেন। তিনি বলতেন, ওই নদীর বালকের মাথার তালুতে বাটির মতো গর্তে নাকি অলৌকিক জল থাকে। যতক্ষণ ওই জল শুকায় না, ততক্ষণ ওরে কাটলেও মরে না! ওর শরীরে দশটা মানুষের বল চলে আসে। আর ওরে শান্ত করার একটাই পথ ছিল..." "কী পথ?" শমীক ও প্রসেঞ্জিৎবাবু একসঙ্গে প্রশ্ন করে উঠলেন।

"শশা!" রহিম শেখ উত্তর দিলেন। "আমার দাদু বলতেন, ও নদীর পিশাচ হলেও শশার গন্ধ পেলে পাগল হয়ে যায়। আগেকার দিনে জেলেরা নদীতে নামার আগে শশার গায়ে নিজেদের পরিবারের নাম আর মন্ত্র লিখে জলে ভাসিয়ে দিত। ওটা খেলে নাকি ও শান্ত হত।

রহিম শেখের কথা শুনে অমর্ত্যবাবু নিজের খাতার সাথে মিলিয়ে নিতে লাগলেন। "অবিশ্বাস্য! জাপানি লোকগাথা আর সুন্দরবনের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা হুবহু এক! কপ্পাদের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য হলো শশা। প্রাচীন জাপানেও মানুষ নদীতে নামার আগে শশার গায়ে নাম লিখে জলে ভাসিয়ে দিত, যাতে কপ্পা সন্তুষ্ট হয়ে তাদের পরিবারকে ক্ষতি না করে।" "কিন্তু স্যার, আমরা কি কেবল শশা খাইয়ে একটা নরখাদক জীবকে আটকে রাখতে পারবো?"প্রসূনবাবু পিস্তলে গুলি ভরতে ভরতে বললেন। "আমার মনে হয় না নাইন এমএম বুলেট এর সামনে ব্যর্থ হবে।" "ভুলেও ও কাজ করবেন না প্রসেঞ্জিৎবাবু," অমর্ত্যবাবু সতর্ক করলেন। "কপ্পার গায়ের চামড়া কচ্ছপের খোলসের চেয়েও শক্ত ও আঁশযুক্ত। তার ওপর ডাঙ্গায় উঠলে তার মাথার বাটিতে থাকা জল তাকে অমানুষিক শক্তি ও দ্রুত পুনরুজ্জীবনের ক্ষমতা দেয়। বুলেটে তার কিছু হবে না। তাকে হারাতে হলে আমাদের কাজে লাগাতে হবে তার নিজস্ব শারীরিক দুর্বলতা ও এক অদ্ভুত প্রথাগত আচার।"

"কী আচার স্যার?" শমীক অধীর হয়ে জিজ্ঞেস করল। অমর্ত্যবাবু স্কেচের মাথার বাটি বা 'দ্য সারা'-র দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললেন, "কপ্পার শক্তির মূল উৎস হলো, তার মাথার তালুতে থাকা জলপূর্ণ বাটি। ডাঙ্গায় এলে এই জলই তাকে বেঁচে থাকতে ও শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। কোনোভাবে যদি বাটিটা জলশূন্য হয়ে পড়ে, তাহলে টপ্পা শক্তিহীন হয়ে পড়বে। প্রসূনবাবু হেসেই ফেললেন, "সেটা কীভাবে করবেন, স্যার?" "আমার একটা পরিকল্পনা আছে, প্রসূনবাবু," অমর্ত্যবাবু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন। "তবে এখনকার মত এটা নাহয় আমার মাথার ভিতরেই থাক। আসল সময়ে দেখা যাবে।"

(৩)

পরদিন অমাবস্যার দ্বিতীয় রাত। পুরো গ্রাম ফাঁকা করা হয়েছে। ইছামতীর বাঁকে ভবেন মণ্ডলের মেছোভেড়ির কাছে ওত পেতে বসেছেন অমর্ত্যবাবু, শমীক, প্রসূনবাবু এবং রহিম শেখ। চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। কেবল নদীর পাড়ে দুটো হ্যারিকেন মিটমিট করে জ্বলছে। অমর্ত্যবাবুর ঝুলিতে রয়েছে সদ্য গাছ থেকে তোলা এক ঝুড়ি তাজা শশা। প্রতিটি শশার ওপর রক্তচন্দন দিয়ে বিশেষ জাপানি শিন্টো চিহ্ন ও মন্ত্র আঁকা হয়েছে।

রাত তখন প্রায় দুটো বাজে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক হঠাৎ এক লহমায় বন্ধ হয়ে গেল। নদীর বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। থমথমে নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ, 'প্যাচ-প্যাচ, ছপ-ছপ'।

নদীর ভিজে কাদা ঠেলে কিছু একটা ওপরের দিকে উঠে আসছে। প্রসূনবাবু নিজের সার্ভিস রিভলভার শক্ত করে ধরলেন। শমীকের বুক দুরুদুরু করে কাঁপছে। হ্যারিকেনের ক্ষীণ আলোয় ডাঙ্গায় উঠে এল সেই ভয়াল প্রাণীটি!

দৈর্ঘ্যে তিন-চার ফুট। মানবশিশুর মতো বাঁকা গড়ন, কিন্তু সমস্ত গা গাঢ় সবুজ আঁশে ঢাকা, যা থেকে পিচ্ছিল রস ঝরছে। তার পিঠে এক বিশাল কুৎসিত খোলস। মুখে বিরাট বাঁকানো ঠোঁট, আর চোখদুটো রক্তবর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্য হলো তার মাথার তালু, সেখানে এক চ্যাপ্টা বাটির মতো গভীর গর্ত, আর তাতে কানায় কানায় ভরা রয়েছে এক অদ্ভুত নীলাভ জল, যা অন্ধকারে মৃদু জ্বলছে!

কপ্পাটি ডাঙ্গায় উঠেই বিকট তীব্র চিৎকার করে উঠল, যা মানুষের কানের পর্দা ছিঁড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! সে ক্ষিপ্র গতিতে তেড়ে এল ডাকবাংলোর দিকে। 

"প্রসূনবাবু, গুলি চালাবেন না!" অমর্ত্যবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন। অমর্ত্যবাবু এক মুহূর্তও দেরি না করে ঝুড়ি থেকে দুটো বড় শশা বের করে কপ্পাটির দিকে ছুঁড়ে দিলেন।

বাতাসে ভেসে আসা শশা দুটো দেখে কপ্পাটির চোখ চকচক করে উঠল। ডাঙ্গায় পড়ার আগেই সে বাতাসে লাফিয়ে উঠে দুটো হাতে শশা দুটো আঁকড়ে ধরলো। তার ক্ষুরধার দাঁত দিয়ে মড়মড় করে শশা দুটো চিবাতে লাগল সে। শশার রসে তার হিংস্রতা যেন এক মুহূর্তের জন্য শিথিল হয়ে পড়ল।

কিন্তু এই প্রশান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। শশা শেষ হতেই কপ্পাটি আবার রক্ত তৃষ্ণায় গর্জন করে উঠল। এবার তার লক্ষ্য অমর্ত্যবাবু। সে তার লিপ্তপদ ছিটকে বিকট লাফ দিল অমর্ত্যবাবুর বুকের ওপর! "স্যার! সরুন!" শমীক চিৎকার করে উঠল। কিন্তু অমর্ত্যবাবু সরলেন না। তিনি একদম স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। কপ্পাটি তার থেকে মাত্র তিন ফুট দূরে এসে যখন নখ উঁচিয়ে ঝাঁপ দিতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে অমর্ত্যবাবু হাত দুটো বুকের সামনে শক্ত করে জোড় করলেন। তারপর অত্যন্ত গম্ভীর ও বিনম্র ভঙ্গিতে নিজের কোমর থেকে শরীরটা ৯০ ডিগ্রি নুইয়ে কপ্পাকে উদ্দেশ্য করে জাপানি প্রথায় গভীর 'নমস্কার' জানালেন!

এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক দৃশ্য ঘটলো!

কপ্পাটির শূন্যে ওঠানো হাত দুটো থমকে গেল। তার ব্রেন ও আদিম বায়োলজিক্যাল কোডিংয়ে সঞ্চিত থাকা হাজার বছরের প্রাচীন শিষ্টাচার জেগে উঠল। সেও জাপানি কায়দায় প্রতি-নমস্কার না করে থাকতে পারল না। কপ্পাটি তার নিজের হাঁটু দুটো সামান্য ভেঙে, অমর্ত্যবাবুর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে নিজের সবুজ হিংস্র মাথাটি নীচু করতে শুরু করলো...

আর অমনি, 'ছলচ্ছল!' কপ্পার মাথার তালুর বাটিটি কাত হয়ে গেল! তার মাথার তালুতে থাকা সেই জাদুকরী নীলাভ অশুভ জল গড়িয়ে আছড়ে পড়ল ইছামতীর শুকনো কাদার ওপর! জল মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই যেন এক তীব্র ধোঁয়া উদগীরণ হলো। এক তীব্র, যন্ত্রণাদায়ক আর্তনাদ করে উঠল কপ্পাটি। মাথার জল শূন্য হওয়া মাত্রই তার গায়ের উজ্জ্বল সবুজ চামড়া কুঁকড়ে গিয়ে ছাইয়ের মতো ধূসর হতে শুরু করল। তার অমানুষিক শক্তি এক নিমেষে বাষ্পের মতো উবে গেল। কপ্পাটি কাদার ওপর আছড়ে পড়ে ডানা-ভাঙা পাখির মতো ছটফট করতে লাগল। আক্রমন তো দূরের কথা, নিজের হাত-পা নাড়ানোর শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেললো সে!

(৪)

সুযোগ নষ্ট না করে রহিম শেখ ও প্রসেঞ্জিৎবাবু মোটা নাইলনের জাল ও বিশেষ লোহার খাঁচা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। নিস্তেজ, শক্তিশূন্য কপ্পাটিকে অতি সহজেই শক্ত জালে পেঁচিয়ে স্টিলের শক্তিশালী খাঁচায় বন্দি করা হলো।

কপ্পাটি খাঁচার ভেতরে কঁকিয়ে উঠল। তার মাথার শূন্য বাটিটি তখন একদম শুকনো, নিঃশেষ। ভোর হওয়ার আগেই গোপন সঙ্কেত পেয়ে হাসনাবাদে এসে পৌঁছাল ভারত সরকারের বিশেষ সায়েন্টিফিক রিসার্চের সাঁজোয়া গাড়ি। কপ্পাটিকে বিশেষ তাপনিয়ন্ত্রিত জ্যান্ত কন্টেইনারে ভরে কলকাতা ও টোকিওর যৌথ বায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো।

ভোরের আলো ফুটছে ইছামতীর বুকে। পূব আকাশে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়েছে। পুবালি বাতাসে নদীর ঢেউগুলো ছলাৎ ছলাৎ শব্দে পাড়ে আছড়ে পড়ছে।

নদীর বাঁকে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালেন অমর্ত্যবাবু। শমীক পাশে এসে দাঁড়ালো। "স্যার," শমীক মৃদু স্বরে বলল, "কাদার মধ্যে কপ্পার মাথা নীচু করার ওই দৃশ্যটা আমি সারাজীবন ভুলব না। অলৌকিক আর বিজ্ঞান যে এভাবে একবিন্দুতে মিলতে পারে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতো না। কিন্তু আপনার মাথায় এই বুদ্ধি এলো কোথা থেকে?" অমর্ত্যবাবু বললেন, "আগেই বলেছিলাম, কপ্পারা যতই হিংস্র হোক না কেন, তাদের রক্তে ও মগজে এক অদ্ভুত প্রাতিষ্ঠানিক জাপানি শিষ্টাচার ও বাধ্যবাধকতা থাকে। কোনো মানুষের সামনে এলে, মানুষটি যদি কপ্পাকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মাথা নীচু করে জাপানি কায়দায় 'নমস্কার' করে, তবে কপ্পাও স্বভাবগত বাধ্যবাধকতার বশে মানুষকে মাথা নীচু করে প্রতি-নমস্কার করতে বাধ্য হবে। যে মুহূর্তে কপ্পা নিজের মাথা নীচু করে প্রতি-নমস্কার করতে যাবে, অমনি তার মাথার বাটিটা কাত হয়ে যাবে! আর সাথে সাথে তার মাথার সমস্ত অলৌকিক জল মাটিতে গড়িয়ে পড়ে যাবে। জল শূন্য হওয়া মাত্রই কপ্পা তার সমস্ত অমানুষিক শক্তি হারিয়ে একেবারে নিস্তেজ ও পঙ্গু হয়ে পড়বে। এটাই আমার পরিকল্পনা ছিল।" শমীক অমর্ত্যবাবুর এই পরিকল্পনার ভূয়সী প্রশংসা করে বললেন, " যদি আপনি না থাকতেন, কোনোভাবেই আজ কপ্পাকে ধরা সম্ভব হত না।"

অমর্ত্যবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইছামতীর অসীম জলরাশির দিকে তাকালেন। "শমীক, আজ আমরা যেটাকে বন্দি করলাম, সেটা হয়তো লোকালয়ে চলে আসা একটা কপ্পা ছিল। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই গোপন গবেষণাগারের স্মৃতি বহাল রেখে সুন্দরবনের এই হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত নোনা খাঁড়ি, ম্যানগ্রোভের দুর্গম গুহা আর নদীর অতলে, আরও কত শত কপ্পা যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বংশবৃদ্ধি করে চলেছে, তা আমরা কেউ জানি না! যেদিন আবার কোনো দুর্যোগ আসবে, যেদিন আবার মানুষ প্রকৃতির সীমানা লঙ্ঘন করবে... তারা আবার জেগে উঠবে।" 

দূর ইছামতীর জল থেকে হঠাৎ এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল,'ছপছপ'। একটা সবুজ ছায়া যেন জোয়ারের জলের সাথে গভীর ম্যানগ্রোভের দিকে মিলিয়ে গেল।


No comments:

Post a Comment