1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

অর্কিড ওল্ড এজ হোম

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

 অর্কিড ওল্ড এজ হোম

স্বর্ণাভ চক্রবর্তী

দক্ষিণ কলকাতার একটা শান্ত পাড়ার গলি। সেই গলির মুখেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ‘অর্কিড ওল্ড এজ হোম’। নামটা ওল্ড এজ হোম হলেও, ভেতরের পরিবেশটা কিন্তু একেবারেই বুড়োটে নয়। জনা আঠাশেক আবাসিক থাকেন সেখানে। সকাল হলেই ছাদের ওপর বুড়োদের ক্রিকেট খেলা, বারান্দায় বসে সোরগোল তুলে চা খাওয়া, রাজনৈতিক তর্ক, আর কোনো না কোনো আবাসিকের জন্মদিন কিংবা বিশেষ দিন উদ্‌যাপন করা—এসব নিয়েই তাদের দিন কেটে যায়। যেন একেকজন দুরন্ত কিশোর-কিশোরী!

জানুয়ারির এক কুয়াশা-মাখা সকালে এই বাড়ির ঠিক গা ঘেঁষে পাশের বাড়িতে এসে উঠলেন গৌরী দেবী ও তাঁর পরিবার। বয়স পঁয়ষট্টি, চোখে সরু চশমা, শাড়ির আঁচলটা কাঁধে ফেলা পরিপাটি বাঙালি গিন্নির মতো ধরন। গৌরী দেবীর স্বামী মারা গেছেন প্রায় ১১ বছর হয়ে গেছে। পরিবার বলতে সঙ্গে ছেলে পুলক, বউমা দেবজানী—দুজনেই আইটি কোম্পানির ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ কর্মচারী, ল্যাপটপে মুখ গুঁজে সারাদিন মিটিংয়ে ব্যস্ত। আর আছে তেরো বছরের নাতি পিন্টু।

গৌরী দেবী আসার পর থেকেই অর্কিড ওল্ড এজ হোমের প্রবীণ যুবকদের মধ্যে কেমন জানি একটা আলোড়ন তৈরি হতে লাগল। প্রথম দিন যখন গাড়ি থেকে আসবাবপত্র নামানো হচ্ছিল, তখন ওল্ড এজ হোমের নিতাই ঘোষ প্রথম দেখেন গৌরী দেবীকে। বারান্দা থেকে দেখেই তিনি হোমের কমন রুমে এসে সবাইকে খবর দিলেন—"এই পাশের বাড়িতে একজন এসেছে রে, পুরো রেখা!" ব্যস! অমনি সবাই মিলে দৌড়ে গেল বারান্দাতে।

৭০ বছরের তারাকনাথ বাবুরও সেদিনই প্রথম দেখা গৌরী দেবীকে। আর দেখা মাত্রই যাকে বলে "লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট"! ব্যস, তারপর থেকেই তাঁর দিনযাপনের ছন্দটা কেমন যেন বদলে গেল। বারান্দায় বসে সকালের রোদে চা খেতে খেতে পাশের বাড়ির বারান্দায় চশমার ওপর দিয়ে চোখ রাখাটা তাঁর রোজকার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেল। কখনো কখনো তো রুমমেট স্বরূপবাবুর পুরোনো দূরবীনটা দিয়েও পাশের বাড়ির বারান্দায় চোখ রাখতেন।

শুধু দূরবীন নয়, তারাকবাবুর চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না! ছাদে শুকোতে দেয়া কাপড় ইচ্ছা করেই পাশের বাড়ির ছাদ বা উঠোনে ফেলে দিয়ে সেটা কুড়ানোর নাম করে গৌরী দেবীর মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করতেন। গৌরী দেবীও সব বুঝতেন। বারান্দায় শাড়ি শুকাতে দেওয়ার ফাঁকে তারাকবাবুর এই চঞ্চলতা দেখে মুখের কোণে মিটিমিটি হাসতেন। মনে মনে হয়তো ভালোই লাগত এই পরিণত বয়সের মিষ্টি অনুরাগ।

একদিন বিকেলে তো গৌরী দেবী দেখলেন, তাঁদের পাশের বাড়ির বারান্দা ভর্তি বুড়োদের মাঝে দাঁড়িয়ে চোখে সানগ্লাস পরে তারাকবাবু 'পড়োশন' সিনেমার গান গাইছেন আর একটু পর পর তাঁর দিকে তাকাচ্ছেন—

“জিস রোজ সে দেখা হ্যায় উসকো, হম শমা জ্বালানা ভুল গয়ে... দিল থাম কে অ্যায়সে বৈঠে হ্যায়, কহি আনা জানা ভুল গয়ে...”

লজ্জায় গৌরী দেবী ঘরে চলে যেতেই শুনতে পেলেন, পাশের বাড়ির বুড়োগুলো সবাই এক সাথে হো হো করে হেসে উঠল!

কিন্তু পথের আসল কাঁটা ছিল গৌরী দেবীর ছেলে পুলক। অতি-সচেতন আর কড়া শাসনের ছেলে সে। মাকে কোনো কারণেই বাড়ির বাইরে বের হতে দেয় না। ‘বাইরে ধুলাবালি’, ‘বয়স হয়েছে’, ‘শরীর খারাপ করবে’—হাজারটা বাহানায় গৌরী দেবীকে বলতে গেলে ঘরবন্দী করেই রেখেছিল।

সেদিন সকালেই বারান্দায় চা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন গৌরী দেবী। উল্টো দিকের বারান্দায় তখন খবরের কাগজ হাতে তারাকনাথ বাবু। গৌরী দেবী একবার সোজাসুজি তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসি দিলেন —দেখা মাত্রই খবরের কাগজ পড়ে গেল হাত থেকে!

"ও মশাই, কাগজ পড়ে যাচ্ছে!"—পাশ থেকে হেসে বললেন হোমের আরেক বাসিন্দা নিবারণবাবু।

তারাকনাথ বাবু কাগজ তুলতে তুলতে বিড়বিড় করলেন, " চুপ কর! কী একটা তীর এসে লাগল রে বুকে, বুকটা ধক করে উঠল রে নিবারণ!"

বারান্দায় বসে ল্যাপটপে কাজ করতে করতে পুলক খেয়াল করল, পাশের ওল্ড এজ হোমের বুড়োটা বারবার তাদের বারান্দার দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ পিন্টু এসে হেসে বলল, "জানো বাবা! পাশের বাড়ির ওই বুড়োটা কিন্তু ঠাম্মিকে হেব্বি লাইন মারে!"

কথাটা শুনে পুলক চটে গিয়ে ছেলেকে এক ধমক দিয়ে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিল। গৌরী দেবীও নাতির দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু পুলকের মনে মনে একটা তীব্র অসন্তোষ জমা হলো। মায়ের ওপর নজরদারি আরও কড়া হয়ে উঠল।

এর দুদিন পর তারাকনাথ বাবু এক মোক্ষম বুদ্ধি বার করলেন—ইচ্ছে করে ক্রিকেট বল ছুঁড়ে দিলেন গৌরী দেবীদের ছাদে, যাতে বল আনার ছুতোয় একবার অন্তত সিঁড়ি ভেঙে গিয়ে দুটো কথা বলা যায়। কিন্তু বল আনতে গিয়ে দরজা খুললেন খোদ পুলক, চোখে সন্দেহের ছায়া।

"কাকু, আপনি বলটা কীভাবে ঠিক আমাদের ছাদেই ফেললেন? রোজ রোজ তো একই জিনিস হচ্ছে!"

"আরে বাবা, বয়স হয়েছে তো, হাত আর কথা শোনে না..."—অপ্রস্তুত তারাকনাথ বাবু হাসিমুখে লজ্জাটা ঢাকতে চাইলেন, কিন্তু পুলকের তীক্ষ্ণ চোখ তা এড়ালো না।

সেই রাতে খাবার টেবিলে পুলক গম্ভীর মুখে বলল, "মা, তুমি বারান্দায় বেশিক্ষণ দাঁড়িও না তো।"

"কেন রে, বারান্দায় দাঁড়ালে কী হয়?"—গৌরী দেবী নিরীহ মুখ করে জিজ্ঞেস করলেন, যদিও মনে মনে বেশ ভালোই বুঝছিলেন কিসের ভয়।

"কিছু না, এমনিই। ওই হোমের বুড়োরা বড্ড অসভ্য।"—পুলক থমথমে গলায় বলল।

দেবজানী পাশ থেকে মুচকি হেসে বলল, "থাক না গো, বুড়ো মানুষ, একটু বন্ধুত্ব হলে ক্ষতি কী!"

"তুমি চুপ করো তো!"—পুলক ধমকে উঠল।

গৌরী দেবী চুপচাপ ভাত মাখতে মাখতে মনে মনে হাসলেন। এই বুড়ো বয়সেও যে কারও মন কাড়া যায়, এই কথাটা ভাবতেই কেমন একটা লজ্জা-মেশানো ভালোলাগা এসে ভর করল তাঁর মনে।

এরপর থেকে পুলকের পাহারা আরও কড়া হলো। গৌরী দেবীর বাইরে বেরোনো প্রায় বন্ধ। সরস্বতী পূজোর দিন হোম থেকে সবাই ঠাকুর দেখতে বেরোলেন, তারাকনাথ বাবু আশায় আশায় রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিন্তু গৌরী দেবীর টিকিও দেখা গেল না। ১৫ই আগস্ট হোমে পতাকা তোলা হলো, মিষ্টি বিতরণ হলো, তবুও ওই বারান্দাটা রইল ফাঁকা।

"নিবারণ, আজকাল বড় মন খারাপ লাগে রে..."—এক সন্ধ্যায় ছাদে বসে বললেন তারাকনাথ বাবু।

"তা তো লাগবেই! প্রেমে পড়েছ যে!"—নিবারণবাবু খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠলেন।

"প্রেম না ছাই! শুধু... একটু কথা বলতে ইচ্ছে করে। ওই মহিলার হাসিটা না, ঠিক আমার স্ত্রীর মতো।"

এদিকে গৌরী দেবীও কম কষ্টে ছিলেন না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে উল্টো দিকের ফাঁকা বারান্দার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন মাঝে মধ্যে।

অবশেষে, ভাগ্যদেবতা হয়তো এই প্রেমের গল্পে অন্য একটা মোড় আনতে চেয়েছিলেন।

সেদিন সেপ্টেম্বরের এক চড়া রোদের দুপুর। হঠাৎ করেই চারপাশটা কেঁপে উঠল। ৩.৮ মাত্রার একটি ভূকম্পন! থালাবাসন নড়ে উঠল, দেয়ালের ছবি দুলতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো গলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

“ভূমিকম্প! ভূমিকম্প!” চিৎকার করতে করতে ওল্ড এজ হোমের সব আবাসিকরা রাজপথে নেমে এলেন। পাশের বাড়ি থেকে পুলক, দেবজানী আর পিন্টুও হাঁপাতে হাঁপাতে নিচে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল।

গোটা পাড়া তখন রাস্তায়। সবার চোখে-মুখে ভয় আর আতঙ্ক, সবাই সবার ভূমিকম্প অনুভব করার মুহূর্তের গল্প একে অপরকে শোনাতে ব্যস্ত।

একটু সামলে ওঠার পর পুলকের হঠাৎ খেয়াল হলো—‘মা কোথায়?’

এদিকে ওল্ড এজ হোমের গোলমালের মাঝে সবাই খেয়াল করল—‘আরে, তারাকবাবু কোথায়?’

দুটি বাড়ির লোকই হুড়মুড় করে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। চারদিকে চিৎকার, হাঁকাহাঁকি—কিন্তু কোথাও তাঁদের দেখা নেই!

ঠিক তখনই, শহরের ট্রাফিকের কোলাহল পেরিয়ে ধর্মতলার ময়দানের জ্যামে আটকে থাকা একটা হলুদ ট্যাক্সির পেছনের সিটের জানালার কাচে একটা বাচ্চা মেয়ে টোকা দিল। তার হাতে গোলাপ ফুল। তারাকবাবু একটা গোলাপ কিনে নিয়ে পাশে বসে থাকা গৌরী দেবীর হাতে দিলেন। গৌরী দেবীর মুখে তখন দীর্ঘদিনের বন্দী দশা কাটিয়ে উঠে আসার এক অদ্ভুত স্বাধীনতার হাসি!

ট্যাক্সির ড্রাইভার ওপরের লুকিং গ্লাসে একবার তাঁদের দেখলেন। সিগন্যালের রঙ সবুজ হলো, গাড়ি এগোতে লাগল। তারাকনাথ আর গৌরী দেবী পাশাপাশি বসে চুপচাপ কলকাতার দিকে তাকিয়ে আছেন—কোনো তাড়া নেই, কোনো কড়া শাসনের ভয় নেই। ভূমিকম্পের এক ঝটকায় যে প্রাচীর ভেঙেছে, তা এখন হলুদ ট্যাক্সির চাকায় ভর করে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে...

আর ট্যাক্সির রেডিওতে তখন ধীরলয়ে বেজে চলেছে সেই চিরচেনা গান—

“খোয়াব হো তুম ইয়া কোই হকীকত, কৌন হো তুম বাতলাও... দের সে কিতনি দূর খড়ি হো, অউর করীব আ যাও...”


No comments:

Post a Comment