![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
বিজয়ায় আবাহন
জয়ন্ত দত্ত
শান্ত ইছামতীর বুকে তখনো খান পাঁচেক নৌকো। হালকা হাওয়ায় পার ঘেঁষে দু একটি ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছে। খানিক আগে ঝির ঝির করে দু এক পশলা বৃষ্টি পাড়ের কাছের মাটিকে আরো সিক্ত করে তুলেছে। এই মাটি দিয়েই মায়ের শরীর গড়া হয়। আজ সেই মাটিতেই মিশে যাবে মায়ের কঠিন দেহ।
আজ বিকেলের পর থেকেই তির তির করে ইছামতীর বুকের ওপর দিয়ে একটা হিমেল হাওয়া মাঝে মধ্যেই ভেসে আসছে। ইতিহাস বদলেছে। পরম্পরা মেনে আজ আর এপার ওপার এক হয়না। এইতো কদিন আগেও নদীর বুকে দুকুলের মানুষ এক হত। তারপর নিরঞ্জনের পর্ব সেরে যে যার বাড়ি ফিরে যেত। কড়া নিরাপত্তা মেনে এবছর ভারত বাংলাদেশ একে অপরকে আড়াল করেই বিসর্জন ক্রিয়া সম্পন্ন করছে। হতাশ দর্শনার্থী পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছে বিভেদ বিসর্জন। ওদিকে জলের তলায় চলছে মাটির মিলন। মানুষ বদলেছে। তাই তারা আটকেছে। কিন্তু হাওয়া। এপার থেকে ওপার সন্ সন্ করে বইছে।
নৌকার ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে আতশ বাজি আকাশকে প্রায় ফাটিয়ে ফেলছে যেন! পাড়ে বসে বাঁশের মাচায় রহিম গুনছে কটা মাথা হলো। ওরা গ্রামের ছেলে। বছরে এই একটা দিন ওরা জলের থেকে কাঠামো তুলে কুমোর পাড়ায় বিক্রি করে। এদের মধ্যে রহিম আলি সব থেকে ছোট কিন্তু সাঁতারে বেশ পটু। আচ্ছা আচ্ছা সাঁতারুকে পিছনে ফেলে আগে গিয়ে কাঠামো তুলতে ওস্তাদ। আর যদি দেখে কোনো মূর্তি কলকাতার নামি পালের গড়া, তাহলে সেই মূর্তি জলে গলার আগেই মট করে ভেঙে নিয়ে পাড়ে চলে আসে। গাঁয়ের কুমোর পাড়ায় ওসব মডেল ছাঁচ মোটা টাকায় বিক্রি হয়। রহিমরা জানে কোনটার মুন্ডু লাগবে আর কোনটার ধর। সেই বুঝেই তারা জলে নামে।
এই বছর বিজয়াঘাটা সর্বজনীন ক্লাবের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে চায়না পালের থেকে ঠাকুর এনে পূজা করা হয়েছে। অপূর্ব সেই মূর্তি দেখতে গাঁয়ের বহু দুর থেকে লোক এসেছিল। আহা তুলির কি অপূর্ব টান। বিলু, আকিল, রহিম সবাই মিলে প্রায় শকুনের মতো পাড়ের কাছে বসে আছে। বিজয়া সংঘের মূর্তি জলে পড়া মাত্রই তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে ইছামতীর বুকে। প্রয়োজনে জলের তলায় তারা মারপিট করবে। একে অপরকে টেক্কা দিয়ে সাঁতার কাটবে। অন্তত এই বেলায় তারা পুলিশকেও মানবেনা। জলপুলিশ আজকাল বড্ড বেশিই জ্বালাতন করে!
বিজয়া সংঘের প্রতিমা নৌকায় চাপলো। এখন প্রায় ঘন্টা খানেক ইছামতীর বুকে পরিক্রমা চলবে। বুকের কাছে হাঁটু নিয়ে খালি গায়ে হাফ প্যান্ট পরে রহিম বসে এক দৃষ্টিতে প্রতিমার দিকে চেয়ে আছে। সারা গায়ে কাদা শুকিয়ে খড়ি উঠে গেছে। পায়ের কাছে সরস্বতী গনেশ মিলিয়ে দুটো ছোট কাঠামো। এখনো অব্দি বড় একটাও জোটেনি। বড়ো যারা তারা দূর্গা কাঠামো বাগাতে পারে।ছোট হাতে যতটুকু এসেছে রহিম সেগুলো আগলেই বসে আছে। কিন্তু দৃষ্টি তার অপলক বিজয়া সংঘের মূর্তির ওপরেই।
কর্পোরেশনের আলোতে আজ ইছামতীর অন্য এক রুপ। কোনায় কোনায় আলো একেবারে উপচে পড়ছে। কিন্তু মাঝ নদীতে হালকা অন্ধকার। মাঝে মধ্যে আতসবাজির আলোয় সিঁদুর মাখা মায়ের মুখ গুলো রাঙা হয়ে উঠছে। বিজয়া সংঘের মূর্তির সামনে নৌকার পাঁজরে বাঁশ গেঁথে একটা এমারজেন্সি আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকের তালে ধুনোর ধোঁয়ায় সে এক মায়াময় শোভা। সত্যিই যেন দুর থেকে বিজয়া সংঘের প্রতিমার রূপ ঠিকরে পড়ছে। রহিমের আজ আম্মির কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে। সেবার বন্যায় ইছামতীর দুকুল ছাপিয়ে তার নিজের গর্ভধারিণী আম্মির বিসর্জন হয়েছিল এই নদীতেই। বাণ এসেছিল ভরা গাঙে। রাত্রি কেটে ভোরের আলোয় সর্বনাশী ইছামতীর বুকে ভেসে উঠেছিল তার আম্মির মৃতদেহ। সেবার রহিম ছিল বকুল ডাঙায় খালার বাড়িতে। দুকুল ভাসিনী ইছামতীর তাণ্ডবে সেবার পাড়ের একটিও ঝুপড়ি রক্ষে পাইনি!
রহিম এক দৃষ্টিতে
চেয়ে রইল বিজয়া সংঘের মূর্তির দিকে। সত্যিই যেন তার মনে হল তার আম্মির মুখ হুবহু এক।
ঠিক ওই রকম একেবারে কেটে বসানো। সাঁট করে আরেকটা আতশ বাজি ঠিকরে পড়ল আকাশের বুকে। লাল
আলোয় ভরে গেল প্রতিমার সমস্ত মুখ। ঠিক ওইরকম; গনগনে চুলোর সামনে রহিমের আম্মি বসে রান্না করত।
শীতের রাতে আগুন টাকে আরো উসকে দিত কঞ্চি দিয়ে। গনগনে আগুনের ফুলকি উড়ত বাতাসে। ঠিক
হুবহু ওই রকম আগুনের সামনে রহিমের আম্মির মুখ রাঙা হয়ে উঠত। হালকা হাওয়ায় কপালের কোঁকড়ানো
চুল গুলো উড়ত ইছামতীর বাতাসে।
ও চুপটি করে বসে থাকত
চুলোর পাশে। আর আম্মি গরম গরম ভাত, ঢেলে দিত রহিমের পাতে।
সেই মোটা চালের গন্ধ এখনো উড়ছে বাতাসে। খিদেও পেয়েছে। সেই দুপুর থেকে চলছে জলের কাজ।
মা থাকলে এতক্ষণ হয়তো কান ধরে টেনে নিয়ে যেত ঘরে। ওপার দিয়ে বিলু চেঁচাচ্ছে।
"ও রহিম, তোর কটা হলো রে? "
"ও বিলু দাদা,
এই মোটে তিনটে। তার মধ্যে
একটা মুণ্ডু। তা তোমার.... ?"
বিলু দাদা কি যেন বলছে, ঢাকের আওয়াজে আর শোনা যাচ্ছে না!
অন্যমনস্ক রহিমের এক মন আবার নিবন্ধ হলো বিজয়া সংঘের প্রতিমার মুখে। অন্ধকারে মায়ের মুখটা এবার খুব বিষন্ন দেখাচ্ছে! হিন্দুরা তো তাই বলে। বরণের পরে মায়ের চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। সত্যিই যেন তাই। সিঁদুর মাখা অগোছালো মুখটাতে বিষন্নতার এক গাঢ় ছাপ। সারা দিন অন্যের বাড়ির বাসন মেজে রহিমের আম্মি যখন ঘরে ফিরত ঠিক ওই রকম একটা রুক্ষ মুখ, অনেক সময় খিদেতে ফ্যাকাসে হয়ে আসত। কখনো বা ঘামে চকচক করে উঠত। ঠিক ওইরকম দুগ্গা ঠাকুরের মতো। তবে আশেপাশে অতগুলো ভাইবোন রহিমের ছিল না। শুধু ছিল তার দাদা। তবে গণেশের থেকে অনেক রোগা।
ইছামতীর হাওয়ায় মায়ের আঁচলটা সিংহের কান ঘেঁসে ফুরফুর করে উড়ছে। সত্যিই কি শান্তি। দেখলেও ভরসা আসে বুকে। দশাশাহী রূপ নিয়ে যেন রহিমকে আগলে দাঁড়িয়ে আছে তার আম্মি। এটাই তো রহিমের আম্মি। ওর দুচোখ ছলছল করে উঠল। জমাট বাঁধা বুকের কাছটা অদ্ভূত এক প্রাপ্তি বেদনায় ভরে গেল। শোল মাছের মতো ঝপাত করে লাফিয়ে পড়ল ইছামতীর বুকে। ওদিকে পাড়ে তখন বিজয়া সংঘের সকলের চোখে জল। এ বছরের মতো মা বিদায় নিয়ে চললেন কৈলাশে। এই এক মুহূর্তে যখন পূজা কমিটির উদ্যোক্তাদের মাকে বিদায় দিতে মন চায়না, তখন রহিমদের আনন্দের আর সীমা থাকেনা। তাদের জীবনে আর কি আছে? এই জলেই তাদের পুজো। এই জলেই তাদের ষষ্ঠী থেকে বিজয়া। তাইতো একদিকে যখন ছাড়তে না চাওয়া মন বিষন্ন হয়ে ওঠে, তখন অন্য দিকে রহিমদের বুকে চলে বিসর্জনের অপেক্ষা। দুগ্গার বুকে চেপে একেবারে মট করে ভেঙে নেবে মুণ্ডুটা। সেটাই তাদের পূজার সর্বোত্তম আনন্দ।
রহিম সাঁতরে গেল বিজয়া সংঘের নৌকার কাছে। ওদিকে পুলিশের বাঁশির শব্দ, ঢাকের আওয়াজ, সব মিলিয়ে কানে তালা লাগিয়ে দেওয়ার উপক্রম। আজ জলটাও বেশ ঠান্ডা। দূর্গা ঘুরছে তিনপাকে। এবার জলে পড়বে জল কাঁপিয়ে ঝপাত করে। বলো দুগ্গা মাইকি......
বিজয়া সংঘের প্রতিমা জলে পড়তেই বিলু, আলিম ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে তার অনেক আগে রহিম পৌঁছে গেছে প্রতিমার কাছে। আরেকটু হলে মহামায়া তার বিশাল শরীর নিয়ে তার ঘাড়েই পড়ত! আলিম জলের তলায় রহিমের পা টেনে ধরে রেখেছে। এক লাথি মেরে পা টাকে ছিনিয়ে রহিম একেবারে চড়ে বসল দুগ্গার বুকের ওপরে। মাটি বেশি গলে যাওয়ার আগেই কাজটা সেরে ফেলতে হবে। কোমর দিয়ে লোহার ছেনিটা বের করে দুগ্গার গলার দু ধারে প্রাণ পনে গোঁতা মারল। ওদিকে পুলিশ চিৎকার করছে। বিলুকে প্রায় ধরেই ফেলেছে। রহিম কিছু দেখেও যেন দেখছে না। তারপরেই এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দুটান মারতেই ছাঁচ একেবারে দুহাতের মধ্যে চলে এলো। ঝাঁপ কেটে জলের মধ্যে ডুব সাঁতারে উঠল এলো পাড়ের কাছে। হাঁটু জল পেরিয়ে দুহাতে মূর্তিটা টেনে তুলল জলের উপরে। তখনো একটুও রং ওঠেনি প্রতিমার মুখ থেকে। শুধু চুলটুকু খুলে গেছে মাথার থেকে। দুহাতের মাঝখানে রহিম মাতৃ মূর্তিটিকে রেখে ভালো করে চেয়ে দেখল। আলো আঁধারীর মাঝে ছোট্ট দুটি চোখ আবারো খুঁজে পেল হুবহু তার আম্মিকে। অবাক হয়ে গেল ও। কুমোর কি করে জানল যে তার আম্মিকে দেখতে হুবহু এমন ছিল! রহিম মূর্তিটিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। অভাবে রং খসে গেলেও ওমন মিষ্টি হাসি সর্বদা তার আম্মির মুখে লেগেই থাকত।
এ এক পরম পাওয়া। বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক ভালো লাগা। বিজয়াতে সবার যখন আনন্দ মরে যায় জলের পাড়ে। তখন এভাবেই কারো বুকে আগমনীর সুর বেজে ওঠে বিষাদের উল্লাসে। রহিম আর এই মূর্তিটা কোথাও বেচবেনা। এটাকে সে ঘরে নিয়ে গিয়ে তার মতো করে সাজাবে। তারপর সেটাকে পূজো করবে নাকি তার সামনে নামাজ পড়বে এসব ভাবতে ভাবতেই সে ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
যে ইছামতী একদিন তার
মাকে কেড়ে নিয়েছিল জলের তলায়। আজ সেই ইছামতীই তার মাকে ফিরিয়ে দিল সমাদরে। ইছামতীর
জলেই সে খুঁজে পেল তার হারিয়ে যাওয়া আম্মুকে। এবার সে তার আম্মুকে আর কোথাও হারিয়ে
যেতে দেবেনা। এটাই তার আম্মু ।এই নিয়ে রহিমের মনে আর কোনো সংশয় নেই। কোনো সংশয় নেই...।



No comments:
Post a Comment