 |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
নীলিমার দুর্গাপূজা
শুক্লা কর
(১)
দুর্গামন্দিরে ওঠার সিঁড়ির একপাশে ভাইকে নিয়ে
বসেছিল নীলিমা। মন্দিরের বারান্দায় মা দুর্গার মূর্তি তে সাদা রঙের উপর রঙ ধরানো হচ্ছে।
দুর্গার পাশে ইয়াব্বড় ভুঁড়ি নিয়ে শিবঠাকুর বসে আছেন। নীলিমার হাসি পায় শিবঠাকুরের
ভুঁড়িখান দেখে। মনে মনে বলে, "মা দুগ্গা কত সোন্দর! ইরকম মোটকা বরটাকে বিয়া কইরেছে কেনে কে জানে!" পরক্ষণেই
মনে হল, তার মাও তো কত সুন্দর। অমন
বাপটাকে বিয়ে করার কী দরকার ছিল?
নীলিমারা দুই বোন
এক ভাই।সে আর বড় দিদি সুলেখা আগে ইস্কুল যেত।দিদিটা বড় ইস্কুলে ভর্তিও হয়েছিল। কী
একটা রোগ এল দেশে। তারপর থেকে ইস্কুল বন্ধই আছে।দিদি এখন মায়ের সাথে বাবুদের বাড়িতে
কাজ করতে যায় রোজ। আর সে ভাইকে সামলায়। ইস্কুলের বই খাতা কোথায় আছে নীলিমা জানে
না।
মা দুর্গার গায়ে
রঙ দিচ্ছে বলাই। যাবত প্রতিমা তৈরি হচ্ছে নীলিমা রোজ আসে বলে বলাইয়ের সাথে বেশ ভাব
হয়ে গেছে। এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরে বলাইয়ের বাড়ি। একটা পুরানো ঝড়ঝড়ে সাইকেলে
চড়ে আসে। বলাই আসার আগেই ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে সিঁড়ির একপাশে চুপ করে বসে থাকে নীলিমা।
বলাই ঠাকুর গড়তে আসে সকাল আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ। প্রতিদিনই এসে দেখে নীলিমা বসে আছে।
বলাইয়ের বড় মায়া হয় মেয়েটাকে দেখে।কোলে থাকা অপুষ্টিতে ভোগা ভাইটাকে দেখে মন খারাপ
হয়ে যায় বলাইয়ের। ছেলেটার পেটটা ফোলা। হাত পা গুলো সরু সরু। নীলিমা বলছিল কী যেন
একটা অসুখ আছে ওর ভাইয়ের। রক্ত দিতে শহরের হাসপাতালে যেতে হয় প্রতিমাসে। গরীবের ঘরে
এমন কঠিন রোগ ভগবান যে কেন দেয়!
বলাই ঠাকুর গড়তে গড়তে কথা বলছে নীলিমার সাথে।
ওপাশে একদল ছেলে মেয়ে হৈ হুল্লোড় করছে। কোলের ভাইটা কেঁদে উঠতেই নীলিমা মা দুর্গার
দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ঐ দেখ ভাই,
দুগ্গা ঠাকুর। দেখ কী সোন্দর!
মা দুগ্গার সামনে কাইনদতে নাই।
নীলিমার দু'বছর বয়সী ছোট্ট ভাইটা কী বুঝল কে জানে! মা দুগ্গার
মূর্তির দিকে তাকিয়ে কান্না ভুলে গেল।
বলাই বলল,
ই মাসে ভাইকে হাসপাতালে লিয়ে
গেইছল?
এই কদিনেই বলাই যেন
ছোট্ট মেয়েটির সুখ দুঃখের সঙ্গী হয়ে গেছে। নীলিমা মূর্তি রঙ করা দেখতে দেখতে ছোট্ট
করে উত্তর দিল "হুঁ"।
বলাই কালো রঙটা মাটির
ছোট ভাঁড়ে গুলতে লাগল। সেদিকে তাকিয়ে নীলিমা প্রশ্ন করল, পূজার আর ক'দিন দেরি আছে বলাইকাকু?
--- আর সাতদিন। পূজার
লাগ্যে লতুন জামা কিনা হইয়েছে তদের?
সাত বছরের নীলিমা
উদাস হয়ে যায় বলাইয়ের প্রশ্নে। নতুন জামা! শেষ কবে নতুন জামা পরেছে মনে পড়ল না
নীলিমার। তার মা চারটা বাড়িতে বাসন ধোয়ার কাজ করে। বাবুদের বাড়ি থেকে কখনো কখনো
পুরানো জামা সোয়েটার দেয়। নীলিমার খুব আনন্দ হয় তখন। ব্যাগে করে মা নিয়ে আসা মাত্রই
সে বাছতে বসত কোনটা নিজে নেবে আর কোনটা দিদিকে দেবে। এখন যে জামাটা পরে আছে সেটাও মায়ের
নিয়ে আসা পুরানো জামা। যখন নিয়ে এসেছিল টকটকে লাল রঙের সাথে হলুদ ফুল ছাপ ছিল জামাটায়।
এখন আর সে রঙ নেই। কাঁধের কাছে সেলাই খুলে গেছে। মা বলেছে পুজোর আগে বাবুদের ঘর ঝাড়ামোছা
হবে। তখন এরকম জামা আবার দেবে।
বলাই মিস্ত্রির লতুন
জামার কথায় একটু দুঃখ পেল নীলিমা। তাদের পাশের বাড়িতে তনু থাকে। ওর বাবা বাইরে কাজ
করে। ক'দিন আগে বাড়ি এসেছে।তনু বলছিল
ওর বাবা নতুন জামা নিয়ে এসেছে ওর জন্য। একটা নয়; দুটো। একটা ফ্রক। আর একটা চুড়িদার। নীলিমার খুব
ইচ্ছে করছিল একটা চুড়িদার পেতে। দিদির পুরানো চুড়িদারটা মাঝে মাঝে পরে নীলিমা। ঢলঢলে
হয়। তবু পরে।
বলাইয়ের প্রশ্নের
উত্তরে নীলিমা একটু ক্ষীণ গলায় বলল, না কাকু, ই বছর লতুন জামা হবেক
নাই। মা বল্যেছে ইবার দিতে লাইরবেক। ভাইয়ের
অষুদের জন্যে অনেক টাকা লাইগবেক।
--- তোর বাবা কাজে যায়
নাই?
--নাহ্
বলাই আর কিছু বলে
না। নীলিমা একদিন বলেছিল বাপটা নাকি একদিন কাজে যায় তো দশদিন আর যায় না। যেটুকু টাকা
আয় করে, মদ খেয়ে শেষ করে
দেয়। সংসারে একটি টাকাও দেয় না। ওর মা কিছু বলতে গেলেই মারধোর করে।
বলাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল,
বছর বাদে দেশ থেকে বাপের বাড়ি
আইসছ মা জননী। সবাইকে আনন্দ দিঅ মা আনন্দময়ী।
ছোট ভাইটা ফের কাঁদতে
শুরু করেছে। নীলিমা বলছিল ওর ভাইয়ের নাকি তিন বছর বয়স। কিন্তু চেহারা দেখলে মনে হয়
দু'বছরও হয়নি এখনও। সরু সরু
হাত পা, মাথাটা বড়। হাঁটতে পারে না।
কথা বলতেও পারে না। তবে কেউ কথা বললে বুঝতে পারে বোধহয়।
ভাইকে কাঁদতে দেখে
নীলিমা বলে, ইবার ঘর যাই কাকু।
ভাইয়ের বোধহয় খিদ্যা লাগ্যেছে।
বলাই কাজ থামিয়ে পকেট হাতড়ে একটা পাঁচ টাকার কয়েন
বের করে বলে, ই লে, ফটক্যার গুমটি থাক্যে ভাইটার লাগ্যে একটা বিস্কুট
প্যাকেট কিনবি।
নীলিমার দু'চোখে কৃতজ্ঞতা ঘনিয়ে আসে। একটু ইতস্তত করে হাত
বাড়ায় টাকাটার দিকে।
(২)
পুজোর আর চারদিন বাকি।
গাঁয়ের দুর্গা মন্ডপে প্যান্ডেল তৈরির কাজ চলছে। হৈ হৈ, চেঁচামেচি, লোকজনের আসা যাওয়া মন্দির প্রাঙ্গণকে প্রাণবন্ত
করে তুলেছে। মন্দিরের ভেতরে দুর্গা ঠাকুরের গায়ে তেলরং দিচ্ছে বলাই। এরপর শাড়ি পরানো
হবে। তারপর ডাকের সাজ। অনেক কাজ বাকি আছে এখনও। নীলিমা ভাইকে কোলে নিয়ে মন্দিরের সিঁড়ির
একপাশে বসে আছে। মা দুর্গার কোলে বসে থাকা গণেশ ঠাকুরের গায়ে রঙ দিচ্ছে বলাই। নীলিমা
একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। গণেশ ঠাকুরের পেটটা তার অসুস্থ ভাইয়ের ফোলা পেটটার
মতো মনে হয়। আচ্ছা, তার মা যখন ভাইকে
কোলে নিয়ে বসে থাকে তখন কি এরকমই দেখতে লাগে?
হঠাৎ নীলিমার মনে হয়, মা দুর্গার মুখখানি আস্তে আস্তে তার মায়ের মুখের
মতো হয়ে যাচ্ছে। দুই মা যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। মা দুর্গার কোলে বসে থাকা
গণেশ যেন তার রুগ্ন, পেটফোলা ছোট ভাইটি।
গতকালই তার ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল। রক্ত পায়নি। পঞ্চমীর দিন আবার যেতে
হবে। বিকেলে বাড়ি ফিরে এসে মা কাঁদছিল। ডাক্তার নাকি বলেছে ভাইটা আর বেশিদিন বাঁচবে
না।
কথাটা মনে পড়তেই ছোট্ট নীলিমার বুকের ভেতর একটা
কান্না দলা পাকিয়ে ওঠে। ঠাকুরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। দু'চোখ ঝাপসা হয়ে আসে নীলিমার। ছোট্ট দুই অপুষ্ট হাত
দিয়ে বুকের ভেতর আঁকড়ে ধরে রুগ্ন, মৃত্যুপথযাত্রী ভাইটিকে। দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে
পড়ে। পাছে কেউ দেখে ফেলে! বাম হাতের তালু দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলে নীলিমা।
পঞ্চমীর দিন ভাইকে
নাকি আবার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। গতকাল রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে নীলিমা শুনতে পাচ্ছিল
মা বারবার বাপটাকে বলছিল, সারাদিন নেশা করে
পইড়ে থাইকছ। সংসারের খোঁজ খবরটুকু লিছ নাই। পরশু আবার হাসপাতাল যাত্যে হবেক। সব বার
ত একাই যাই। ই বারটা সংগে চলঅ। ছিলাটা আর বেশিদিন বাঁচবেক নাই গ। এত কঠিন হইঅ না। ইবার
দুজনে মিলেই খোকাকে লিয়ে যাব। ইবারটাই বধহয় শ্যাষ....
কথাগুলো বলতে বলতে জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল
নীলিমার মা। নীলিমারও কান্না চলে এসেছিল। ভাই আর বাঁচব্যাক নাই! মনে মনে কথাগুলো উচ্চারণ
করে আধো অন্ধকারে পাশে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিল। কী নিশ্চিন্তে
ঘুমোচ্ছে ভাইটা! অনেক রাত পর্যন্ত নীলিমার ঘুম আসেনি। আগের বছর দুর্গাঠাকুরকে জলে ভাসিয়ে
দেওয়ার সময় নীলিমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। এত সুন্দর ঠাকুরকে জলে ফেলে দিচ্ছে দেখে চোখে
জল এসেছিল। সেইরকম একটা কষ্ট অনেক রাত পর্যন্ত তার শিশুবুককে তোলপাড় করেছিল।
ভাইটা মা দুর্গার
দিকে তাকিয়ে আছে। নীলিমা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে, ভাই আর বেশিদিন বাঁচবেক নাই! ভাইয়ের মুখে হাত বোলাতে
বোলাতে আস্তে আস্তে বলে, ভাই, এ ভাই। একবার বল, দিদিইইই। মা দুর্গার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নীলিমার
মুখের দিকে তাকিয়ে রুগ্ন, অপুষ্ট ভাইটি খিলখিল
করে হেসে ওঠে।
(৩)
বলাই ঠাকুরের গায়ে
রঙ দিতে দিতে হাত ছেড়ে নীলিমার দিকে তাকায়। বলাইয়ের দুই ছেলে। মেয়ে নেই। ইচ্ছে
ছিল একটা মেয়ে হোক। মা লক্ষ্মী ঘরে আসুক। কিন্তু সব ইচ্ছে তো পূরণ হবার নয়। পরপর
দুই ছেলেই হল। কার্তিক আর গণেশ। মেয়ে নেই বলে এই ক'দিনে নীলিমার উপর বড্ড মায়া পড়ে গেছে বলাইয়ের।
মাঝে মাঝে মনে হয় এরকম একটা মেয়ে থাকলে বেশ হত।
আজ মেয়েটার মুখের
দিকে তাকিয়ে কেমন কেমন যেন লাগল বলাইয়ের।মনমরা ভাব চোখেমুখে। নীলিমার ঘরের অবস্থা
বলাই জানে।বাগদি পাড়ায় এমন দুরবস্থা অনেক ঘরেই। তবে এমন অসুখ নিয়ে বেঁচে থাকা শিশু
এ গাঁয়ে আর নেই।
নীলিমা চুপ রে বসে
আছে। বলাইয়ের কাজ দেখছে একমনে। কাজ করতে করতেই বলাই বলল, পূজা ত চল্যে আল্য। তদের ত লতুন জামা হয় নাই?
নীলিমা আস্তে আস্তে
ঘাড় নেড়ে না বলে। বলাই চুপচাপ রঙ গুলতে থাকে।সাদা রঙের সাথে লাল রঙ গুলে গোলাপী রঙ
তৈরি করছে বলাই। রঙ গুলতে গুলতে বলল, তর লাগ্যে কাইল একটা লতুন জামা লিয়ে আইসব। লিবি?
লতুন জামা শুনেই আনন্দের
ঢেউ খেলে যায় ছোট বালিকার মনে। চোখগুলো চকচক করে ওঠে। পরক্ষণেই কোলের ছোট ভাইটার কথা
মনে হয়।
বলাই জিজ্ঞাসা করে,
কী লিবি-- চুড়িদার না টু
কাট?
নীলিমা উত্তর দেয়
না। বলাই ভাবে, বাইরের লোক বলে মেয়েটা
হয়ত লজ্জা পাচ্ছে। একটু হেসে বলাই বলে, তুই আমার বিটির মতন। বেশি দামী দিতে লাইরব। যা দুব তাই লিবি। মা আইসছে। এতবড় পূজা।
লতুন জামা পইরতে হয়। লিবি নাই আমার কাছে?
নীলিমা আস্তে আস্তে
বলে, লুবঅ।
বলাই বলে,
কাইল আইনব থাইলে।
নীলিমা একটু সময়
চুপ করে থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, আমার লতুন জামা লাইগবেক নাই বলাইকাকু। ঐ ট্যাকাটায় আমার ভাইয়ের লাগ্যে একটা লাল
গেঞ্জি আন্যে দিবে? ডাক্তার বইলেছে ভাই
আর বেশিদিন বাঁইচবেক নাই।ভাই ইবার মরি যাবেক....ভাই....
কথাগুলো শেষ করতে পারে না ছোট্ট নীলিমা। ফুঁপিয়ে
কেঁদে ওঠে। বলাই রঙ দেওয়া ভুলে নীলিমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এক গভীর যন্ত্রণায়
ভারী হয়ে আসে বলাইয়ের পিতৃহৃদয়। মনে মনে বলে, গরীবদিকে এত দুখখু ক্যানে দাও মা?
(৪)
টুকটুকে লাল গেঞ্জি
প্যান্ট এনে দিয়েছে বলাই। পঞ্চমীর দিন নীলিমার ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে নীলিমার
বাবা মা। নতুন লাল গেঞ্জিটা ভাইকে পরিয়ে দিয়েছে নীলিমার মা। নীলিমা দুখী মুখে ভাইয়ের
মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর মা দাওয়ায় বসে ভাইকে কোলে নিয়ে আদর করছে। এই ক'দিনে ভাইটা আরো কাহিল হয়ে পড়েছে। খাবার খেতেও
চায় না আর।
ভাইটা আর বেশিদিন বাঁচবেক নাই!
বিড়বিড় করে নীলিমা। কান্না আসে।
লাল টুকটুকে গেঞ্জি
প্যান্ট পরা ভাইকে কোলে নিয়ে এক টুকরো উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে নীলিমার মা। সেদিকে তাকিয়ে নীলিমার মনে হল, মা দুগ্গা কৈলাস থেকে এসে গেছেন। গণেশ ঠাকুরকে কোলে
নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের এক টুকরো উঠোনে।