1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label ছোটগল্প. Show all posts
Showing posts with label ছোটগল্প. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

জীবন-ঢেউ ও ক্রমশঃ

ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

জীবন-ঢেউ ও ক্রমশঃ

জনা বন্দ্যোপাধ্যায় 

"বাড়ির চাবিগুলো কোথায় রেখেছ?"

শুভর কথায় তিন্নি হাত পা ধুতে ধুতে বাথরুম থেকে চেঁচিয়ে উত্তর দেয়, "আমার ডায়েরির ওপর"।

"ও তাই বল, আমি সুটকেশ থেকে জামাকাপড় বের করে খুঁজে পাচ্ছিলাম না!" শুভর যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। স্বামী স্ত্রী মিলে দুবলাগরির সৈকতে সূর্যোদয় দেখতে গেছিল। তিন্নি প্রচুর ঝিনুক কুড়িয়েছে। ঢেউ এর রূপকথা তিন্নির কল্পনাকে ছুঁয়ে যায়! ঢেউ যেন ওর বাল্যসখি! দৈনন্দিন কাজের মধ্যে তিন্নির সমুদ্রধারে যাওয়ার কথা মনে হওয়ায় শুভ দুবলাগরিতে আসার প্ল্যানটা করেছিল!        

 হোটেলের ঘরের বিছানায় তিন্নির ডায়েরি, যা লেখা তিন্নির প্রতিদিনের অভ্যাস, পেন, শুভর ঘড়ি, এছাড়া দুটি কবিতার বই, তার নিচে তিন্নির শাড়ি, আর ডায়েরির ওপর নিজেদের বাড়ির চাবি ও কয়েকটি ঝিনুক দেখে শুভ মনে মনে হেসে বলে, "পাগলী"।

 শুভর স্পষ্ট মনে আছে হাওড়া স্টেশনে ভিড় কামরায় উঠতে গিয়ে তিন্নির সঙ্গে ধাক্কা লাগার দিনটি, তিন্নির হাত থেকে তার ব্যাগটা ছিটকে পড়ে যায়, শুভ তুলে দেয়। গল্পটা সিনেমার মতো হলেও আসল গল্পটা ছিল অন্যরকম! তিন্নি যে এনজিওতে কাজ করে, সেখানে মানসিকভাবে অসুস্থ মহিলাদের কাউন্সেলিং করা হয়। তিন্নিকে শুভ অকপটে তার প্রেমিকা নীরার মানসিক অসুস্থতার কথা বলেছিল। কলেজ থেকে যে তাদের সম্পর্ক সে কথা জানিয়েছিল। তিন্নি নীরাকে ভালো করার প্রতিশ্রুতি দেয়। সে সময় শুভর সহানুভূতির প্রয়োজন ছিল!

 এক সপ্তাহের মধ্যেই তিন্নি নীরার আত্মহত্যার খবর পায়। নীরার বাবা মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ নীরাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছিল। এটাই ছিল নীরার মানসিক অসুস্থতার কারণ! নীরার কাজল কালো ভ্রমরের মতো চোখে বিষাদের ছায়া দেখে শুভর কষ্ট হত। নীরা মায়ের কাছে থাকলেও বাবাকে খুব ভালোবাসতো। উনি ব্যস্ত ডাক্তার হলেও ফোনে মেয়ের আবদার না রেখে পারতেন না! কিন্তু নীরা যেদিন বাবার দ্বিতীয় বিয়ের কথা শোনে, সেদিন থেকেই শুরু হয় পাগলামি, অসংলগ্ন কথা। নীরা আশা করেছিল একদিন না একদিন নীরা তার মাকে নিয়ে বাবার কাছে ফিরে যাবে। কিন্তু সবই বৃথা হয়ে যায়!

তিন্নিকে বিয়ে করার পর থেকে তিন্নি প্রায়ই নীরার কথা বলে! শুভ জানে ঝিনুক, বালির আলপনা, উত্তাল ঢেউ তিন্নিকে হয়তো কটা দিন অন্যমনস্ক রাখবে! তিন্নির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে নীরা তাদের মাঝে ছায়ার মতো আছে। নীরা চলে যাওয়ার পর শুভর মনের অবস্থা তিন্নি বুঝতে পারে। তিন্নির বড় মায়া হত। একদিন তিন্নিই শুভকে বলে, "তোমার বিয়ে করা উচিত।" তিন্নি সুন্দরী না হলেও তিন্নির এক ঢাল চুল ও নরম চোখের চাহনির মধ্যে মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা আছে। শুভর মনে হয়েছিল তিন্নির মতো উদার মনের মেয়ে সে দেখেনি। তাই স্ত্রী হিসাবে তিন্নিকে পাওয়া ভাগ্যের! 

তিন্নি শুভর কাছে নীরার এত গল্প শুনেছে, কিন্তু সবই যেন অসমাপ্ত থেকে গেল! তিন্নি জানে নীরার অভাব সে পূরণ করতে পারবে না, এক ধরণের হতাশা মনের অবচেতনে থেকেই যায়!

হঠাতই একদিন কৌতূহলে তিন্নির ডায়েরির পাতা উল্টে শুভ অবাক হয়ে যায়! শুভর কাছে সে নীরার মতো হতে পারবে না সে কথা লেখা! শুভ তখন থেকে তিন্নির বিষয়ে সতর্ক হয়। নীরা মেধাবী ছাত্রী হওয়ায় এমবিএ তে চান্স পেয়েছিল, শুভ এসব প্রসঙ্গ তিন্নিকে আর কোনোদিনই তুলতে দেয় না। তিন্নি যাতে মানসিক অসুস্থতার দিকে না যায় শুভ সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে শুরু করে! 

তিন্নির বাড়ির অবস্থা সেরকম ভালো ছিল না। বাবা মারা যাবার পর তার মা হাসপাতালে আয়ার কাজ করে দুই ভাই বোনকে পড়িয়েছে। তাই শুভর মতো কর্পোরেট সেক্টরে চাকরিওয়ালা জামাই তিন্নির মায়ের স্বপ্নের অতীত ছিল। শুভ প্রথমে তিন্নির মাকেই তিন্নিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। 

দুবলাগরিতে জোয়ারের জলে নুলিয়াদের একটি পাঁচ বছরের শিশু ভেসে যাচ্ছিল, শুভ তাকে বাঁচায়! তিন্নির জেদ এই বাচ্চাটিকে সঙ্গে নিয়ে যাবে ছেলের মতো মানুষ করবে। কিন্তু শুভ চায় না। সে তিন্নি আর তার মাঝে আর কাউকে আসতে দিতে চায় না। কিন্তু তিন্নিও ছাড়ে না, কারণ শিশুটির মা নেই, বাবা দেখে না, মাছ ধরতে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত শুভ তিন্নির জেদের কাছে হার মানে। 

শুভ বোঝে জীবন কোনো রোদ, ছায়া, বৃষ্টির গল্প নয়, জীবন এক অনাবিল ধারাবাহিকতা, যা অনির্ণেয়!

 

অমরত্বের সন্ধানে

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

অমরত্বের সন্ধানে 

মিঠুন মুখার্জী

কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের একমাত্র ছেলে দিবাকর বোস। বয়স পঞ্চাশ বছর। বাবা - মা মারা গিয়েছেন অনেক বছর হয়েছে। জীবনে নাম - যশ - অর্থ যথেষ্ট উপার্জন করেছেন তিনি। বিয়ে করেও সুখী হন নি । সন্তান না হওয়ায় এবং নিজের ব্যবসা দেখতে গিয়ে সংসারে মন না দিতে পারায়, পত্নী সংসার ত্যাগ করে চলে গেছেন। তাছাড়া দোষের মধ্যে প্রতিদিন মদ খাওয়ার নেশা ছিল তার। কলিকালে মদ খেলে দোষ নেই। ঘরে ঘরে মদের আসর বসে। তার মধ্যে মৃত্যু ভয় সব সময় কাজ করে। তিনি মরতে চান না। যে করেই হোক অমর হতে চান তিনি। অমৃত পান করে দেবতারা হয়েছিলেন অমর। কিন্তু কলিকালে অমৃত পাওয়া যায় না, শুধুই বিষ। বাড়িতে চাকর - বাকর কোম্পানির কিছু কর্মচারীরা থাকেন। তাই একাকীত্ব তেমন একটা অনুভব করেন না তিনি।  এই মানব জনম বারবার হয় না, তাই এ জনম ও এই সুন্দর পৃথিবীকে তিনি ছেড়ে যেতে চান না। তার সমস্ত সম্পত্তি ও অর্থ যদি অমরত্বের জন্য দিয়ে দিতে হয়, তাও তিনি দিতে রাজি।

     একদিন রাত্রে গলা পর্যন্ত মদ খেয়ে দিবাকর বোস খাটের উপর ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখেন-- একটি অজানা অচেনা দেশে তিনি এসেছেন। কিছুটা হাটার পর একটা রাজপ্রাসাদ দেখতে পান। সিংহাসনে বসে আছেন  একজন। তার পায়ের কাছে একজন অতি বৃদ্ধ বড় একটা খাতা নিয়ে কি যেন দেখছেন। তার সামনে থেকে প্রাসাদের দরজা পর্যন্ত মানুষের লাইন। কারো বয়স সত্তরের কম হবে না। প্রাসাদের ভিতরে ঢোকার পর তিনি বুঝতে পারেন এটা যমালয়। সিংহাসনে যিনি বসে আছেন, তিনি যমরাজ। আর তার পায়ের কাছের ব্যক্তিটি চিত্রগুপ্ত। সকল বৃদ্ধরা লাইনে দাঁড়িয়ে কি করছেন তা বুঝতে না পেরে দিবাকর বোস একজনকে জিজ্ঞাসা করেন---"এই লাইনটি কিসের জন্য দাদা ?" তখন ওই বৃদ্ধটি ভাঙা গলায় দাঁতহীন মুখে বলেন--- "আজ্ঞে আমরা প্রত্যেকে আমাদের আয়ু বাড়ানোর জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। যমরাজ হঠাৎ বেশিদিন বাঁচার একটা ছাড়পত্র দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। তার জন্য অবশ্য টাকা অথবা সুন্দরী নৃত্য পটীয়সি পত্নীদের দান করতে হবে। নতুবা মর্ত্যে যেতে দেবেন না। এখানে যাদের দেখছো তাদের প্রত্যেকের বয়স সত্তর পার হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের সুন্দরী নৃত্য পটীয়সি পত্নীদের বয়স কুড়ি থেকে চল্লিশের মধ্যে। আমরা মরার আগে দীর্ঘায়ু কামনা করায় যমরাজ আমাদের সঙ্গে আমাদের কচি বউদেরও যমালয়ে তুলে এনেছেন। ওদের যমালয়ে বন্দী করে রাখা হয়েছে। যার যার নৃত্য যমরাজের ভালো লাগবে কেবলমাত্র তাদের স্বামীর আয়ু রিনিউ করা হবে। নতুবা পত্নীকে মর্ত্যে পাঠিয়ে স্বামীর ইহকালের পাপ- পুণ্যের যথাযথ বিচার হবে। আমরা সবাই ইহকালে দরিদ্র থাকায় অর্থ আমাদের ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল সুন্দরী পত্নী। তাই ওদের দিয়েই আমাদের মনোবাসনা পূর্ণ হতে পারে। ওই আগন্তুক বৃদ্ধকে এরপর দিবাকর বোস বলেন--- " আমিও তো অমর হতে চাই। পত্নী আমার ছিল, কিন্তু অভিমানে বাপের বাড়ি চলে গেছে। আমি পত্নীর বদলে প্রচুর অর্থ দিতে পারি। আমার ভালো লাগছে এই ভেবে যে আমি এখনই পৃথিবী ত্যাগ করবো না।" এরপর দিবাকর বোস বুড়োটির পর লাইনে দাঁড়ায়।

     কিছুক্ষণ পর চিত্রগুপ্ত খাতা হাতে নিয়ে এক একজন করে বুড়োর নাম ধরে ডাকেন এবং তারা স্কুলে উপস্থিত দেওয়ার মতো বলেন উপস্থিত মহাশয়। তারপর তার পত্নীকে যমরাজের সামনে নৃত্যের পোশাক পরিয়ে উপস্থিত করা হয়। যমরাজের সামনে তারা নাচতে লজ্জা পেলেও স্বামীর মূল্যবান জীবনের জন্য মনের মতো করে তারা নৃত্য পরিবেশন করেন। যমরাজ সুরা পান করেন এবং তাদের নৃত্য পরিবেশন দেখেন। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে পনেরো - ষোলো জনের নৃত্য দেখে যমরাজ দশ জনের নৃত্যকে সার্টিফিকেট দেন। বলেন ---"এই দশ জন নারী আমায় মুগ্ধ করেছে। আমি এদের   নৃত্যে খুবই খুশি। এদের পতি দেবতাদের দশ বছর করে আয়ু বাড়িয়ে দেওয়া হোক চিত্র গুপ্ত। তাদের দশ বছর কমিয়ে মর্ত্যে পাঠিয়ে দাও। সৃষ্টিকর্তা জিজ্ঞাসা করলে বলে দেবে ওদের এখনো সময় হয়নি। আর ওদের এই দশ জন সুন্দরী নৃত্য পটিয়সী পত্নীকে এই দশ বছর যমালয়ে রেখে দাও। আমাদের মনোরঞ্জন করবে এরা। যমরাজের কথা শুনে চিত্রগুপ্ত বলেন---" যমরাজ এটা করা কি ঠিক হবে? ব্রহ্মাদেব জানতে পারলে আমাদের ক্ষমা করবেন না।" এই কথা শুনে যমরাজ  বলেন--- "আরে আমরা না বললে উনি জানবেন কিভাবে। তাছাড়া মর্ত্যে দুর্নীতির শেষ নেই। ওদের ধরতে ধরতে আমরাও একটু দুর্নীতি করতে শিখেছি বাবা। তুমি একেবারে চিন্তা করো না।"

      চিত্রগুপ্ত যমরাজের কথামতো নৃত্যে পাশ করা দশ জন নারীর স্বামীদের দশ বছর করে বয়স কমিয়ে দিয়ে মর্ত্যে পাঠিয়ে দিলেন। এদের পাঠানোর আগে বললেন -- " এই দশ বছর পূর্ণ করে তোমরা পুনরায় যমালয়ে ফিরে আসবে বাছাধনরা। বন্ধক স্বরূপ তোমাদের পত্নীরা এখানে থাকলো। তোমাদের ইহকালের কর্ম শেষ হলে এদের মুক্ত করে মর্ত্যে পাঠানো হবে। বুঝলে তো সকলে?" সকলে একসাথে বললেন-- " আচ্ছা ঠিক আছে।"  বয়স কমে যাওয়ার আনন্দে, আরও দশ বছর আয়ু বাড়ার খুশিতে মর্ত্যে পদার্পণ করেন সকলে। একে অপরকে বলেন, এই দশ বছর বউয়ের অত্যাচার থেকে মুক্ত থাকা যাবে, খুব ভালোই হলো।

     যাদের পত্নীরা নৃত্য পরিবেশন করে যমরাজকে খুশি করতে পারেননি, তাদের গরম তেলে ভাজার জন্য, জ্বলন্ত চুল্লিতে ফেলে দেওয়ার জন্য যমরার চিত্রগুপ্তকে আদেশ দিলেন। শাস্তি পাওয়া বৃদ্ধ লোকেরা শাস্তি কমের জন্য চিত্রগুপ্তের হাতে লুকিয়ে কিছু কিছু অলংকার ঘুষ স্বরূপ দিলেন। চিত্রগুপ্ত তাদের শাস্তি যমরাজকে না জানিয়ে কিছুটা কমিয়ে দিলেন। এরপর চিত্রগুপ্ত যমরাজকে বলেন --- "এদের সহধর্মীনিদের কি করা হবে মহারাজ?" এদের বৈধব্য দশা ভোগ করার জন্য এখনই মর্ত্যলোকে পাঠিয়ে দেওয়া হোক বোলে আদেশ দেন তিনি। যমরাজের কথামতো তাদের মর্ত্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক মুহূর্ত পর যমরাজ দিবাকর বোসকে দেখতে পেয়ে  চিত্রগুপ্তকে বলেন--- " চিত্রগুপ্ত এই প্রৌঢ় ব্যক্তিটি কে? ওকে দেখে তো মনে হচ্ছে ওর এখনো যমালয়ে আসার সময় হয়নি। তাহলে ও এখানে এলো কি করে? ব্রহ্মাদেব জানতে পারলে ভীষণ কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।" যমরাজের কথা শুনে চিত্রগুপ্ত দিবাকর বোসকে জিজ্ঞাসা করেন---" কে ভাই তুমি? এখানে কি করছ? তোমাকে তো আমরা কেউ এখানে নিয়ে আসিনি। তবে এখানে তুমি এলে কিভাবে?" চিত্রগুপ্তের প্রশ্নের উত্তরে দিবাকর বোস বলেন---" আজ্ঞে এখানে আমি কিভাবে এলাম তা আমি নিজেও জানিনা। তবে আমার মনে হচ্ছে আমি উচিত জায়গায় এসেছি। আসলে আমার না মরার কথা চিন্তা করলে খুব কষ্ট হয়। আমি মর্ত্যে মোটামুটি সবই পেয়েছি, শুধু পত্নী ও সন্তান সুখ পায়নি। তাতে আমার আফসোস নেই। তবে আমি অমর হতে চাই। তার জন্য কী কোন ব্যবস্থা  করা যায় না? যত টাকা লাগে আমি দিয়ে দেব। আমার বাড়ি গাড়ি কোম্পানি সব আপনাদের নামে লিখে দেবো। শুধু আমায় অমরত্বের বর দিতে হবে। পারবেন না আপনারা? দরকার হলে আমার বউকে মর্ত্য থেকে তুলে এনে ওর নাচ দেখুন। ও খুব বড় নৃত্যশিল্পী। যেভাবেই হোক আমায় অমরত্ব দিতেই হবে। এই মহা মূল্যবান মানব জনম ও সুন্দর পৃথিবীটা আর দশজন মানুষের মত আমি ছেড়ে যেতে চাই না।" দিবাকর বোসের কথা শুনে যমরাজ বলেন---" চিত্রগুপ্ত এতো ভয়ানক মানুষ। এ মরতে চায়না। সৃষ্টির নিয়মকে লঙ্ঘন করে এ অমর হতে চায়। এবার বোধয় আমাদের চাকরিটাই ও খাবে। ওকে এখনই মর্ত্যে পাঠাও। ত্রি-দেব জানার আগে এই কাজ করো। তা না হলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। কেন যে দশ বছর করে ছাড় দিতে গেলাম! মর্ত্যে সব কিছুতে ছাড় দেখে আমারও মনে হলো যমালয়ে একটা দিন আয়ু ছাড়ের অফার দিই। কিন্তু এমন বিপদে পড়বো তা কে জানে।" যমরাজের কথা শুনে চিত্রগুপ্ত দিবাকর বোসকে বলেন---" আপনার মাথার ঠিক নেই, আপনি মর্ত্যে ফিরে যান। জন্ম-মৃত্যু নিয়ে জীবের জীবন। তাদের অমরতার বর দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। আপনি এখন আসেন ভাই।" চিত্রগুপ্তের কথা শুনে দিবাকর বোস রেগে যান এবং বলেন--- " যতক্ষণ না আমি অমরতার বর পাচ্ছি, ততক্ষণ আমি যমালয় ছেড়ে যাব না। তাছাড়া আমি জেনে গেছি নিয়মের বাইরে গিয়ে যমরাজ দশ জনের দশ বছর করে বয়স কমিয়েছে। আপনি বাকিদের থেকে ঘুষ নিয়ে তাদের শাস্তি কমিয়েছেন। এসব যমালয়ে হচ্ছে কি?" এইবার যমরাজ ও চিত্রগুপ্ত ভারী বিপদে পড়ে যান। খুব রেগে যমালয়ে চিৎকার শুরু করেন। জোর করে প্রহরী দিয়ে দিবাকর বোসকে চ্যাংদোলা করে মর্ত্যে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। এমন সময় সেখানে উপস্থিত হন ব্রহ্মাদেব। তিনি যমরাজকে বলেন--- " কি চলছে এখানে?  এত চিৎকার কেন? চিত্রগুপ্ত সব নিয়ম অনুযায়ী চলছে তো?" চিত্রগুপ্ত ব্রহ্মাদেবকে বলেন---" হ্যাঁ প্রভু। আপনি আবার দেবলোক ছেড়ে এখানে এলেন কেন! আমাদের স্মরণ করতে পারতেন।" এমন সময় দিবাকর বোস ব্রহ্মাদেবকে প্রণাম করে বললেন---" প্রণাম ব্রহ্মাদেব। আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই। এরপর একে একে তার অমরত্বের বর দানের কথা পর্যন্ত সব বলেন তিনি। ব্রহ্মাদেব তার সব কথা শুনে বলেন---" সৃষ্টির সবচেয়ে উন্নতশীল প্রাণী হল মানুষ। তাদের বুদ্ধির দ্বারা তারা করছে না এমন কিছুই নেই। তবে যার প্রাণ আছে তার মৃত্যু আছে। তার জন্য কষ্ট পাওয়ার কিছুই নেই। আত্মা অবিনশ্বর, তার ধ্বংস নেই। এক শরীর থেকে অন্য শরীরে সে যাত্রা করে। পুরাতন জীর্ণ শরীর না ছাড়লে নতুন শরীর পাবে কি করে? পৃথিবীর সব প্রাণেরই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। নতুন করে সৃষ্টির জন্য এই চক্রাকার পরিবর্তন।  মানুষ তার অবদানের দ্বারা ভালো কাজের দ্বারা সকল মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবে। শরীর নাই থাকলো, তোমার ভালো কাজ তোমাকে অমর করে রাখবে। যাও বৎস মর্ত্যে ফিরে গিয়ে তোমার যা আছে তা মানুষের সেবায় নিয়োজিত কর। মানুষ তোমাকে অমর করে রাখবে।"

          এরপর যমরাজ তাকে মর্ত্যে ফিরিয়ে দিয়ে যান। হঠাৎ দিবাকর বোসের ঘুম ভেঙে যায়। সে বুঝতে পারে এই নশ্বর শরীর একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু যা কখনো ধ্বংস হবে না তা হলো ভালো কর্ম। মানুষ ও সমাজের জন্য এমন কিছু করতে হবে যার মাধ্যমে তাদের মাঝে আমি চিরকাল বেঁচে থাকবো। তার জীবনের একটা বিরাট পরিবর্তন হয়। তিনি একটা স্কুল খোলেন এবং সেখানে গরিব বাচ্চাদের বিনা পয়সায় পড়ার ও খাবারের ব্যবস্থা করেন। একটা অনাথ আশ্রম ও একটা বৃদ্ধাশ্রম খোলেন, সেখানে অনাথ ও অসহায় শিশুদের ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করেন। এইসব করার জন্য প্রচুর লোক নিয়োগ করেন তিনি। রাস্তার মানুষদের বিনা পয়সায় প্রতিদিন খাওয়ানোর জন্য একটা হোটেল খোলেন। যে টাকা ও সম্পত্তি দিয়ে দিবাকর বোস অমরত্ব কিনতে চেয়েছিলেন, সেই টাকায় মানুষের জীবন বাঁচিয়ে তাদের কাছে নিজেকে একজন দেবতুল্য মানুষের পরিণত করেন। জীবনে যত অন্যায় তিনি করেছিলেন সব তার পুন্য কর্মের দ্বারা ধুয়ে যায়। মানুষ তার সমাজসেবা ও উপকার পেয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। সকলকে তার প্রশংসা করতে দেখে ও তার নাম ধরে জয়ধ্বনি দিতে দেখে খুব খুশি হন তিনি। এরপর তার মায়ের নামে একটা ট্রাস্টি খোলেন তিনি। তার সমাজ সেবা দিনকে দিন বেড়ে যায়। তার নাম এলাকার ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক বছর পর সমগ্র দেশের মানুষের কাছে একজন প্রকৃত সমাজসেবক হিসাবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। প্রত্যেক বছর এক লক্ষ করে গাছের চারা তিনি মানুষকে বিনামূল্যে বিতরণ করেন। তার ট্রাস্টির বাৎসরিক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন---" গাছ আমাদের পরম বন্ধু। তার সমস্ত কিছু দিয়ে আমাদের সে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই সকলে আজ থেকে প্রতীজ্ঞা করুন, গাছ কাটা নয় গাছ লাগানো হবে জীবনের লক্ষ্য। মানুষের ক্ষতি নয়, উপকার করাই আমাদের পরমধর্ম । "

কয়েক মাস পর একদিন হঠাৎ করে ঘুমের ঘোরে স্ট্রোক হয়ে দিবাকর বোস ইহলোক ত্যাগ করেন। এবার সত্যি সত্যি যমরাজ তার আত্মাকে যমালয়ে নিয়ে যান। যমালয়ে যাওয়ার আগে তিনি দেখেন তার মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকশো মানুষ খুব কাঁদছে। তিনি দেখে মনে করেন তারা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। কিন্তু পরক্ষণে তিনি ভাবেন কারো জন্যই এই পৃথিবী থেমে যায় না। একটু অসুবিধা হলেও পুনরায় সবই কারো হাত ধরে ঠিকঠাকই চলবে। এরপর তিনি দেখেন হাজার হাজার মানুষ তার মরদেহ নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শ্মশানে যাচ্ছে। কেউ বলছে "বড্ড ভালো মানুষ ছিল। খুব কম বয়সে চলে গেল।" আবার কেউ বলছে "এরকম দেবতুল্য মানুষ পৃথিবীতে খুবই কম আসে। মানুষ চিরকাল তাকে মনে রাখবে।" এসব শুনে তিনি খুবই খুশি হন। এরপর যমালয়ে যমরাজ চিত্রগুপ্তকে খাতা দেখে দিবাকর বোসের পাপ-পুণ্যের হিসাব কষতে বলেন। চিত্রগুপ্ত হিসাব কষে বলেন--- " মহারাজ, এর জীবনে যা পাপকর্ম ছিল, তা শেষ দশ বছরের পুন্যে ঢাকা পড়ে গেছে। এখন এর পুণ্যের ভাগ বেশি।" চিত্র গুপ্তের কথা শুনে যমরাজ দিবাকর বোসকে তার পুন্য কর্মের জন্য স্বর্গে প্রেরণ করেন। তিনি স্বর্গ থেকে দেখেন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে তার স্ট্যাচু বসেছে। তার সমাজ সেবামূলক কাজকে দায়িত্ববান কর্মচারীরা আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। জায়গায় জায়গায় তার নামে সাইনবোর্ড বসেছে। এক কথায় দেশের মানুষ তাকে অমর করে দিয়েছে।


মহালয়া

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

মহালয়া

কৌশিক দরিপা

আদালতে আজ নিয়তির শেষ বিচার পর্ব।দীর্ঘ পাঁচ বছর বিচার চলার পর আজ আদালত শেষে নিয়তি কে নিঃশর্ত ভাবে মুক্তি দিয়েছে।এই পাঁচ বছর তাকে বিচার চলাকালীন জেল খাটতে হয়েছে।আদালত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নিয়তির মনে পড়ে যায় সেই অভিশপ্ত রাতের কথা।

নিয়তি সর্দার এক ছোট গ্রামের মেয়ে।স্বামী আর সন্তানকে নিয়ে তার সুখের সংসার।স্বামী বাঁশের তৈরী জিনিসের কারিগর।বাঁশের ঝুড়ি,কুলো,ধামা এই সব তৈরী করে শহরে সরবরাহ করে তাদের সংসার চলে।নিয়তি জঙ্গল থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে আসে।বাড়ির বাইরের উঠোনে তার স্বামী সেই বাঁশ কেটে,ছুলে,আঁশ ছাড়িয়ে তৈরী করে ওই সব জিনিস।বাজারের চাহিদা বেশি থাকলে নিয়তিও স্বামীর সাথে হাত লাগাতো। নিয়তির কাজ ছিলো বাজারে সেই সব মাল দোকানে সরবরাহ করে পয়সা নিয়ে আসা।

এবারের দুর্গা পূজায় শহরের এক প্যান্ডেল ডেকোরেটার্স এক বিশাল পরিমান ঝুড়ি ও কুলোর অর্ডার দিয়েছিলো।পুজোর আগে সেই মাল তৈরী করতে নিয়তি আর তার স্বামী হিমসিম খেয়ে যায়।একটু একটু মাল তৈরী করে,মণ্ডপে সেই মাল সাপ্লাই দিয়ে আসতো নিয়তি।তাদের হাতের তৈরী ঝুড়ি ও কুলোতে শহরের মণ্ডপ একটু একটু করে সেজে উঠছিলো।

আজ মহালয়ার আগের দিন।তাদের অর্ডারের শেষ কিস্তির মাল আজ ডেলিভারী দেওয়ার কথা।ডেকোরেটার্স সকালেই গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলো।সেই গাড়িতে মাল লোড করে নিয়তি শহরে সেই মাল নিয়ে যায়।গ্রাম থেকে সেই মাল শহরে নিয়ে যাওয়া,সেখানে মাল নামানো,গুনে সব মাল চেক করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়।সব কাজ মিটিয়ে টাকা নিয়ে নিয়তি তারপর রওনা দেয় গ্রামের উদ্দেশ্যে।

সন্ধ্যা প্রায় সাতটা বেজে যায়।বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে সে দেখে কোনো বাস নেই।শেষ বাস সন্ধ্যা ছটায় চলে গেছে।কি করবে না বুঝতে পেরে সে বাসস্ট্যান্ডেই অপেক্ষা করতে থাকে।রাত প্রায় নটা বেজে যায়।অনেক খোঁজ খবর নেওয়ার পর সে এক মালগাড়ির খোঁজ পায়।সেই গাড়িটা শহরে কোনো মাল সাপ্লাই দিয়ে,নিয়তির গ্রামের দিকে ফিরে যাচ্ছিল।অনেক অনুরোধের পর তারা নিয়তিকে গাড়িতে নিয়ে যেতে রাজি হয়।

রাত দশটায় সেই গাড়ি নিয়তিকে নিয়ে রওনা দেয় তাদের গ্রামের দিকে।প্রায় এক ঘন্টা গাড়ি চলার পর গাড়ির ড্রাইভার ও খালাসি এক লাইন হোটেলে গাড়ি দাঁড় করায় রাতের খাবার খাওয়ার জন্য।নিয়তি সারাদিন সেভাবে কিছু খায়নি।সেও টেবিলে বসে রুটি সবজি খায়।নিয়তি লক্ষ্য করে ড্রাইভার ও খালাসি ভিতরে রুমে গিয়ে খাবার খায়।নিয়তির এই জিনিসটা খুব অবাক লাগে,কিন্তু সে বেশি মাথা ঘামায় না ব্যাপার টা নিয়ে। 

রাত প্রায় বারোটা বেজে যায় গাড়ি আবার তার যাত্রা পথে রওনা দিতে।গাড়িতে চাপার পরই নিয়তি গাড়িতে কেমন এক গন্ধ পায়,তার বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে গন্ধটা মদের।তার বুক টা কেমন যেন ভয়ে শুকিয়ে যায়।সে তাদের অনুরোধ করে,তাকে এখুনি গাড়ি থেকে নামিয়ে দিতে।কিন্তু গাড়ি চলতে থাকে তার নিজস্ব গতিতে এঁকে বেঁকে,টলমল হাতে স্টিয়ারিং ধরে।

নিয়তি লক্ষ্য করে গাড়ি তাদের গ্রামের রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।সে চিৎকার করে,গাড়ি থামাও,কিন্তু গাড়ি আর থামে না।অন্ধকার নির্জন রাস্তায় তার চিৎকার শোনার কেও ছিলো না।জঙ্গলের মাটির রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে গাড়ি গিয়ে থামে গভীর জঙ্গলের মাঝখানে।দূর থেকে দূরে কেও নেই সেখানে তারা ওই তিনজন ছাড়া।গাড়ি থামতেই নিয়তি দরজা খুলে নেমে দৌড়াতে থাকে অচেনা পথে।

দুটি মাতাল ধাওয়া করে তার পিছন পিছন,দৌড়তে দৌড়তে নিয়তির ক্লান্ত পা থেমে যেতে চায়,হাঁপিয়ে ওঠে সে।কিন্তু তাকে তো থামা যাবে না,থামলেই থেমে যাবে তার জীবন।অবশেষে দুই মাতাল ধরে ফেলে তাকে।তার হাত পা ধরে কোলে তুলে নিয়ে আসতে থাকে গাড়ির দিকে।গাড়ির হেড লাইট জ্বালিয়ে দুটি পশু ছিঁড়ে ফেলতে থাকে তার গায়ের কাপড়।দুটি পশু ঝাঁপিয়ে তার শরীরের উপর আঁচড় কাটতে থাকে।করুন আর্তনাদে রাতের কালো আকাশ নির্বাক শ্রোতা হয়ে নিশ্চুপ হয়ে দেখতে থাকে নিয়তির করুন পরিণতি।

ধীরে ধীরে নিয়তির চোখের জল শুকিয়ে আসতে থাকে,মনের ভয় শেষ হয়ে ক্রোধে গর্জন করতে থাকে।নিয়তি দুটি পশুর হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গাড়ির ভিতর তার ব্যাগে কি যেনো খুঁজতে থাকে।মাতাল গুলো টলতে টলতে গাড়ির ভিতর নিয়তির কাছে এসে টানাটানি করতে গেলে,সে ব্যাগ থেকে বার করে কাঠ কাটার কাটারি টা,যেটাকে সে নিয়ে যেতো সবসময়।কোনো ঝুড়ি গাড়িতে আসতে আসতে ভেঙে গেলে,ওই কাটারি দিয়ে কেটে মেরামতির জন্য।কাটারি হাতে নিয়ে রণচন্ডি রূপে সে নেমে আসে গাড়ি থেকে।দুই মাতাল তাকে দেখে ভয় পেয়ে দৌড়াতে থাকে।দুই মাতালের পিছনে নিয়তি দৌড়াতে থাকে কাটারি নিয়ে।নেশার ঘোরে খালাসি মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই নিয়তি কাটারি দিয়ে তার শরীর থেকে মাথা আলাদা করে দেয়।কাঁপতে থাকা ড্রাইভার গতি বাড়িয়ে আরো জোরে ছুটতে থাকে।কিন্তু নিয়তি তাকেও ধরে ফেলে,কোপাতে থাকে কাটারি দিয়ে।ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় তার শরীর কে,সেও লুটিয়ে পড়ে মাটির উপর।নিয়তি তারও মাথা আলাদা করে দেয় শরীর থেকে।

কয়েক ঘন্টার পথ পেরিয়ে নিয়তি ছুটে ছুটে যখন গ্রামে ঢুকে,তার শরীরের এলোমেলা কাপড়ে রক্তের দাগ,এলোমেলো উড়ন্ত চুল,হাতে কাটারি- যাতে টাটকা রক্তের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।গ্রামের লোক অবাক হয়ে ছুটে এসে তাকে দেখতে থাকে।ভোরের আলো একটু একটু করে চোখ খুলে আকাশে লাল কালোর আবেশ ছড়িয়েছে।ক্লাবের ছেলেরা মাইক লাগিয়েছে,যাতে মুখরিত হয়ে চলেছে,বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের- 'যা দেবী সর্ব ভূতেশু,শক্তি রূপেণ সংস্কিতা,,,,,,,,'।চারিদিকে আতশ বাজির আওয়াজে হঠাৎ নিয়তির মনে পড়ে আজ তো মহালয়া।আজ তো দেবীর মর্তে আগমন,যে দেবী অসুরের বুকে ত্রিশূল ঢুকিয়ে মুক্তি দিয়েছিলো নিরীহ মানুষদের।সেও তো ওই পশুর বেশ ধারী অসুর বধ করে নিজেকে মুক্তি দিয়েছে,,,ভেঙে দিয়েছে অন্যায়ের কালো হাত কে।

নিয়তির স্বামী তাকে ধরে নিয়ে যায় বাড়িতে।একটু পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাকে থানায় নিয়ে যায়।থানায় বড় বাবু তার মুখ থেকে সব ঘটনা শুনে বলেন,তিনি কিছু ভুল করেন নি,কিন্তু তিনি আইন যেহেতু নিজের হাতে তুলেছেন, তারা চেষ্টা করবেন আত্মরক্ষার কারন দেখিয়ে যাতে তার শাস্তি কম করানো যায়।


ভোমরাবাবার আংটি

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

ভোমরাবাবার আংটি

সন্দীপ চৌধুরী

সেদিন অফিসে পৌঁছে গোবর্ধনবাবু নিঃসন্দেহ হলেন যে আজকের দিনটা ওনার পক্ষে তেমন সুবিধের নয়। 

তবে ইঙ্গিত সকাল থেকেই ছিল। ঘুম থেকে উঠে চোখ খুলেই মশারির ভেতর বসে থাকা দুটো হৃষ্ট-পুষ্ট মশা দেখে উনি বুঝেছিলেন যে ব্যাটারা গোটা রাত ধরে ওনার রক্তে ফিষ্টি করেছে। তারপর মুখ ধোওয়ার জন্যে পেস্ট বের করতে গিয়ে সড়াৎ করে অনেকটা পেস্ট বেসিনে পড়ে গেল। আর হবি তো হ সেটা ওনার গিন্নি দেখেও ফেলল। তারপর যা হওয়ার তাই হোল – ওনার অকর্মণ্যতার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হোল ওনার দুই ছেলে আর কাজের মেয়ে জ্যোৎস্নার সামনেই। 

বাজার করতে গিয়েও তেমন সুবিধে করতে পারেন নি। বাড়িতে ফিরে উনি রিয়ালাইজ করলেন যে দোকানদারেরা ওনাকে ‘আলতামুখি’ শিম, ‘পায়রাটুলির’ বেগুন আর ‘বারুইপুরের’ পেয়ারা বলে যে মালগুলি গছিয়েছে তা অতিশয় নিম্নমানের। অথচ জিনিসগুলি কেনার সময় ওনার মনে হয়েছিল যে বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য জিনিস নিয়ে উনি আজ ফিরছেন। শেষে ওনার মা মাথায় আলতো চাঁটি মেরে বললেন, ‘বুবলুটা এখনও বেয়াক্কেলেই রয়ে গেল। লোকে যা নয় তাই জিনিস ওকে গছিয়ে দেয় আর সে তাই বেশি দাম দিয়ে সোনামুখ করে নিয়ে আসে।‘ 

এ ঘটনাটাও সকলের সামনেই ঘটল। 

তারপর স্নান করার সময় দু দু বার হাত পিছলে সাবান পড়ে যাওয়া না হয় উনি ধর্তব্যের মধ্যে আনছেন না কিন্তু যখন ওনার মাথাভর্তি শ্যাম্পু আর মুখভর্তি সাবান, সেই মুহূর্তে শাওয়ারের শুকিয়ে যাওয়ার কী ব্যাখ্যা দেওয়া যায়?  

এসবের পর তাড়াহুড়োতে ভাত খাবার সময়ও প্রায় ফুটন্ত ডাল ঢালতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা খেলেন। রাস্তায় অটোওয়ালার কাছে ধমক আর মেট্রোতে চাপতে গিয়ে এক ভদ্রলোকের কাছে কনুইয়ের গোঁত্তা খেয়ে অফিসে ঢুকতে না ঢুকতেই ওনাকে দেখে সরখেল সাহেব হাঁ হাঁ করে উঠলেন।  

‘এত দেরি করলেন গোবর্ধনবাবু? ওদিকে সহায় সাহেব দু দুবার আপনার খোঁজ করে গেছেন।‘ 

সহায় সাহেব ওনার চেয়ে চার কাঠি ওপরের অফিসার, দু মাসে একবার দেখা হয় কি হয় না। সেই সহায় সাহেব সব দিন ছেড়ে আজকেই ওনার খোঁজে কেন হন্যে হয়ে উঠলেন – এই প্রশ্নের একটাই উত্তর হয় – ওনার আজকের দিনটা শুভ নয়। 

কিছুক্ষন গোঁজ হয়ে বসে সহায় সাহেবের চেম্বারে গিয়ে গোবর্ধনবাবু জানতে পারলেন যে উনি মিটিঙের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছেন। 

তিনি নিজের চেয়ারে ফিরে এলে সরখেল সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে শুনছি আমাদের আন্দামান ব্রাঞ্চে একটা লোক পাঠানো হবে। ভয় হচ্ছে শেষে আপনার নামটা না উঠে আসে।‘ 

কথাটা শুনে গলা শুকিয়ে গেল গোবর্ধনবাবুর। আন্দামান মানে তো দ্বীপান্তর! একসময় বেশ বড় মাপের অপরাধ করলে অপরাধীদের আন্দামানে শাস্তিস্বরুপ পাঠানো হত। মাত্র একদিন দেরি করে অফিসে আসার দরুন ওনাকে সেই শাস্তি পেতে হবে? 

গত সন্ধের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল গোবর্ধনবাবুর। ওনার পাড়ার বন্ধু অনিমেষ প্রায় জোর করেই গতকাল বিকেলে ওনাকে এক আশ্রমে নিয়ে যায় ভোমরাবাবা নামের কোন এক অত্যাধিক ক্ষমতাশালী বাবাকে দেখাতে। গোবর্ধনবাবু এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু অনিমেষের কাছে উনি কিছুতেই প্রমান করতে পারলেন না যে ওনার অন্য কোনো জরুরী কাজ আছে। 

এইসব বাবা-টাবাদের উনি বরাবরই এড়িয়ে চলেন। শুকনো জ্ঞান ওনার সহ্য হয় না কারণ ও বস্তু উনি রোজই ওনার মা আর গিন্নির কাছ থেকে ভুরি ভুরি পান। ওনার নিজের অতীত উনি জানেন, আর ভবিষ্যৎ জানার তেমন ইচ্ছে নেই। তাছাড়া পাথর-টাথর পরে যে কোনো সমস্যার সুরাহা হয়, সেই ব্যাপারেও ওনার তেমন আস্থা নেই। তবে গোবর্ধনবাবু নাস্তিক নন, ভগবানকে উনি মানেন। ভালো কাজের ফল ভালো হয় আর খারাপ কাজের ফল খারাপ – এ বিশ্বাসও ওনার আছে।  কিন্তু যখন তিনি দেখেন কিছু ধান্দাবাজ লোক আংটি বা যজ্ঞের বিনিময়ে বড়সড় অপকর্ম থেকে মানুষকে উদ্ধার করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন তার গা পিত্তি জ্বলে ওঠে।  

তাই গতকাল যখন ভোমরাবাবা ওনাকে দেখে চিন্তিত হয়ে বলেছিলেন, ‘গ্রহরাজের কোপে পড়েছিস; কঠিন সময় শুরু হতে চলল। একটু সাবধানে থাকিস!‘, গোবর্ধনবাবু তেমন উদ্বিগ্ন হননি। বরং ওনার চিমটিকে উপেক্ষা করে অনিমেষটাই করুন মুখ করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তাহলে উপায় বাবা?’ 

বাবা মুচকি হেসে নিজের ঝোলা থেকে একটা তামার আংটি বের করে বলেছিলেন, ‘একে ‘কল্যাণী আংটি’ বলে রে বেটা। এটা ধারন করার কিছুদিন পর থেকেই দেখবি সব ফাঁড়া কেটে যাচ্ছে।‘ 

বস্তুটির দাম শুনে গোবর্ধন বাবু জোর বিষম খেয়েছিলেন – সাত হাজার সাতশো! ভোমরাবাবা ওনাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘সঙ্গে ক্যাশ না থাকলেও চিন্তা নেই, আমাদের কাছে ক্রেডিট কার্ডের মেশিন আছে।‘ 

কোনোরকমে আশ্রম থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন গোবর্ধনবাবু। 

কিন্তু আজকে দ্বীপান্তরের সম্ভাবনার কথা মাথায় আসতেই সব সঙ্কল্প ফুস করে উবে গেল। গ্রহের ফের তো ছিলই, তার সঙ্গে ভোমরাবাবার কোপেরও প্রভাবও কি পড়ছে ওনার ওপর? 

বাকি দিনটাও খুবই চিন্তায় কাটল ওনার। বারবার মনে হতে লাগল হয়ত এই মুহূর্তেই ওনার আন্দামানে বদলির চিঠি টাইপ করা হচ্ছে। অথবা ওনার নামে নালিশ করে সহায় সাহেবের মন আরও বিষিয়ে দিচ্ছে ওনার সহকর্মীরা।  

অফিস থেকে বেরিয়েই সোজা ট্যাক্সি ধরে আশ্রমের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন গোবর্ধনবাবু। আশ্রমে পৌঁছেই বুকটা ধক করে উঠল ওনার – চারদিকে এত নিঃশব্দতা কেন? গতকাল তো মানুষের মেলা বসেছিল এই সময়ে। তবে কি বাবা অলরেডি সদলবলে হিমালয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন? 

‘বাবা আছেন কিন্তু আজকে আর দেখা হবে না। কয়েকজন বিশেষ বিশেষ ভক্তদের সঙ্গে ওনার এপয়েন্টমেন্ট করা আছে – তাদেরই শুধু দর্শন দেবেন।‘ 

‘কিন্তু আমার ওনাকে আজ বিশেষ দরকার প্রভু! সেই কল্যাণকারী আংটিটি না পেলে একেবারে মারা পড়ে যাব।‘ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠেছিলেন গোবর্ধনবাবু। 

লোকটি যে পরোপকারী তার প্রমান হাতেনাতেই পেয়েছিলেন। ওনাকে সেখানেই বসতে বলে সে কয়েক মিনিটের জন্যে ভেতরে ঢুকে হাসি মুখে সেই অমুল্য আংটি হাতে ফিরে এসেছিল। কিন্তু গোবর্ধনবাবুকে বেশ কিছু টাকা বেশি দিতে হোল। গতকাল বাবার বলা দামটা নাকি ট্যাক্স বাদ দিয়ে, তার সঙ্গে ১৮% জিএসটি যোগ হবে। 

দাম মিটিয়ে গোবর্ধনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রভু, বাবার সঙ্গে কি একবার শেষবারের মত দেখা হবে না?’ 

শান্ত গলায় লোকটি বুঝিয়ে দিয়েছিল যে বাবার সমস্ত আশীর্বাদ এই আংটির ভেতরেই ঢুকে রয়েছে, এরপরও বাবাকে দেখতে চাওয়া এই দিব্য আংটির অপমান। শেষে একটা কার্ড ওনার হাতে ধরিয়ে লোকটি বলেছিল, ‘প্রয়োজন হলে ফোন করবেন। এটা আমারই নাম্বার।‘ 

আর কথা বাড়ান নি গোবর্ধনবাবু।   

পরের দিন সকালেই সহায় সাহেবের কাছে আবার তলব পড়ল গোবর্ধনবাবুর। আংটিটিকে কপালে ঠেকিয়ে দুরু দুরু বুকে সাহেবের ঘরে ঢুকলেন গোবর্ধনবাবু। 

‘গতকাল কয়েকটা ইনফরমেশনের জন্যে আপনাকে খুঁজছিলাম, ছুটিতে ছিলেন?’ রাশভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন সহায় সাহেব। 

‘আজ্ঞে না স্যার, একটু দেরি হয়ে গেছিল। অন্যদিন হয় না স্যার, শুধু কালকেই……’ 

একটা চিরকুট এগিয়ে সাহায় সাহেব বললেন, ‘আধ ঘণ্টার মধ্যে এই ইনফরমেশনগুলি নিয়ে আসুন।‘  

‘সিওর স্যার!’ বলে কাঁপতে কাঁপতে রুম থেকে বেরিয়ে এসে দু গেলাস ঠাণ্ডা জল খেয়ে ফাইল ঘেঁটে ইনফরমেশনগুলি খুঁজতে লেগে পড়লেন গোবর্ধনবাবু। সবগুলি খুঁজে না পেলেও মোটামুটি একটা ফাইল দাঁড় করালেন। কিন্তু ফাইল নিয়ে সহায় সাহেবের চেম্বারে গিয়ে দেখলেন উনি আবার বেরিয়েছেন। গোবর্ধনবাবু কাগজগুলি ওনার সেক্রেটারিকে দিয়ে বলে রাখলেন সহায় সাহেব এলেই যেন ওনাকে ডেকে পাঠানো হয়। 

সেদিন আর ডাক এলো না বটে কিন্তু গোটা দিনটাই টেনশনে কাটল। বাড়ি ফেরার পথে অটো থেকে নামতে গিয়ে জোর হোঁচটও খেলেন তিনি। বাড়িতে ঢুকে শুনলেন ওনার বড় ছেলে চিরন্তন অঙ্কের টেস্টে একশোতে একচল্লিশ পেয়েছে। কিন্তু তাকে যে বকবেন সেই কনফিডেন্সও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। শুধু হাতের আংটিটার দিকে তাকিয়ে একবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। 

একটু রাতের দিকে কার্ডে লেখা নাম্বারে ফোন করলেন গোবর্ধনবাবু। সব শুনে লোকটা বলল, ‘শুনুন, গ্রহরাজের কোপে পড়লে একটা মানুষের যে কী হাল হতে পারে সেটা সম্বন্ধে আপনার কোনো ধারনাই নেই। আপনি বাবার কৃপায় রাজার হালে আছেন। আংটিটা সব বিপদ থেকে আপনাকে ক্রমাগত প্রোটেক্ট করে চলেছে। ছেলে তো আর ফেল করে নি। আর কার অফিসের বসই বা সবসময় খুশি থাকে? ওসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে একটু মন দিয়ে লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন যে এরপর থেকে কতকিছু পজিটিভ ঘটনা ঘটবে আপনার জীবনে।‘ 

লোকটার কথাটা ভুল নয়। আংটির কল্যাণকারী শক্তির কিছু কিছু আঁচ গোবর্ধনবাবু পাচ্ছেন ইদানিং। সেদিন হাড় কিপটে গোবিন্দ তাকে নিজে ডেকে চা-বিস্কুট কিনে খাইয়েছে। তারপর খাটের তলায় রাখা ট্রাঙ্কটার চাবি যেটা বেশ কয়েকদিন ধরে খুঁজে পাচ্ছিলেন না সেটা আচমকাই খুঁজে পেয়ে গেলেন। একদিন গোবর্ধনবাবুর আনা ফুলকপির প্রশংসা করেছে ওনার স্ত্রী। উনি দু দিন অল্প দেরি করে অফিসে যাওয়া সত্বেও সেই দিনগুলোয় সহায় সাহেব ওনার খোঁজ করেন নি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এখনও তাঁর আন্দামানে বদলি হয় নি। 

অবশ্য মাঝে মাঝে যে বাড়িতে, পথে বা অফিসে হেনস্থা সহ্য করতে হয় না সেটা নয়। এখনও ওনার কেনা শশা প্রায়ই তেতো আর বেগুন বুড়ো বেরোয়। খুচরো না থাকলে অটোওয়ালারা ধমক দেয়। গতমাসে বাথরুমে জোর আছাড় খেয়ে তিনদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। এ বছর ওনাকে টপকে ওনার চেয়ে তিন বছরের জুনিয়র বড়াল প্রমোশন পেয়ে গেল। সেদিন তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে নিজের জিভ কামড়ে ফেলে বেশ যন্ত্রণা পেয়েছেন। আর ওনার ছেলেরও পড়াশোনায় তেমন কিছু উন্নতি হয় নি। 

তবে এসব ছোটখাটো ব্যাপার। এতসবের মধ্যেও তার মোটামুটি চলে যাচ্ছিল বলে ভোমরাবাবার আংটির প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা-ভক্তি ছিল গোবর্ধনবাবুর। কিন্তু এর মধ্যে একদিন খবরের কাগজের প্রথম পাতার নিচের দিকে একটা খবর চোখে পড়ল, “প্রতারণার অভিযোগে পুলিসের হেফাজতে ভোমরাবাবা”। পুরো খবরটা ভেতরের পাতায় দেওয়া হয়েছে, ভোমরাবাবার ছবি সমেত। 

খবর পড়ে জানতে পারলেন ভোমরাবাবার আসল নাম প্রহ্লাদ মণ্ডল। একসময় ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার ছিলেন, সেখানে টাকা তছরুপের অভিযোগে চাকরি যায়। এরপর উনি গুরুগিরি আরম্ভ করেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই তার বেশ কিছু ভক্ত জুটে যায়। মোটা টাকার বিনিময়ে ভক্তদের বিভিন্ন রকমের আংটি, পাথর ইত্যাদি দিতেন ভোমরাবাবা। কিছুদিন আগে পুলিসের এক অফিসারকে প্রমোশনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেড় লাখ টাকার বিনময়ে একটি পেতলের আংটি দিয়েছিলেন। ভদ্রলোকের প্রমোশন না হওয়ায় তিনি তার কাছের শিষ্যদের চেপে ধরেন এবং তার ফলে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে পড়ে। জানা যায়, শুধু নকল পাথর এবং আংটি দিয়ে লোক ঠকানোই নয়, সঙ্গে মাদকদ্রব্য কেনা – বেচার কাজও হত তার আশ্রমে। 

খবরটা বার দুয়েক পড়লেন গোবর্ধনবাবু। তারপর নিজের আংটির দিকে তাকিয়ে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ঠিক করলেন কালকে ভোরেই এটাকে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে আসবেন।            




নীলিমার দুর্গাপূজা

ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

নীলিমার দুর্গাপূজা

শুক্লা কর

(১)

      দুর্গামন্দিরে ওঠার সিঁড়ির একপাশে ভাইকে নিয়ে বসেছিল নীলিমা। মন্দিরের বারান্দায় মা দুর্গার মূর্তি তে সাদা রঙের উপর রঙ ধরানো হচ্ছে। দুর্গার পাশে ইয়াব্বড় ভুঁড়ি নিয়ে শিবঠাকুর বসে আছেন। নীলিমার হাসি পায় শিবঠাকুরের ভুঁড়িখান দেখে। মনে মনে বলে, "মা দুগ্গা কত সোন্দর! ইরকম মোটকা বরটাকে বিয়া কইরেছে কেনে কে জানে!" পরক্ষণেই মনে হল, তার মাও তো কত সুন্দর। অমন বাপটাকে  বিয়ে করার কী দরকার ছিল?

নীলিমারা দুই বোন এক ভাই।সে আর বড় দিদি সুলেখা আগে ইস্কুল যেত।দিদিটা বড় ইস্কুলে ভর্তিও হয়েছিল। কী একটা রোগ এল দেশে। তারপর থেকে ইস্কুল বন্ধই আছে।দিদি এখন মায়ের সাথে বাবুদের বাড়িতে কাজ করতে যায় রোজ। আর সে ভাইকে সামলায়। ইস্কুলের বই খাতা কোথায় আছে নীলিমা জানে না।

মা দুর্গার গায়ে রঙ দিচ্ছে বলাই। যাবত প্রতিমা তৈরি হচ্ছে নীলিমা রোজ আসে বলে বলাইয়ের সাথে বেশ ভাব হয়ে গেছে। এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরে বলাইয়ের বাড়ি। একটা পুরানো ঝড়ঝড়ে সাইকেলে চড়ে আসে। বলাই আসার আগেই ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে সিঁড়ির একপাশে চুপ করে বসে থাকে নীলিমা। বলাই ঠাকুর গড়তে আসে সকাল আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ। প্রতিদিনই এসে দেখে নীলিমা বসে আছে। বলাইয়ের বড় মায়া হয় মেয়েটাকে দেখে।কোলে থাকা অপুষ্টিতে ভোগা ভাইটাকে দেখে মন খারাপ হয়ে যায় বলাইয়ের। ছেলেটার পেটটা ফোলা। হাত পা গুলো সরু সরু। নীলিমা বলছিল কী যেন একটা অসুখ আছে ওর ভাইয়ের। রক্ত দিতে শহরের হাসপাতালে যেতে হয় প্রতিমাসে। গরীবের ঘরে এমন কঠিন রোগ ভগবান যে কেন দেয়!

       বলাই ঠাকুর গড়তে গড়তে কথা বলছে নীলিমার সাথে। ওপাশে একদল ছেলে মেয়ে হৈ হুল্লোড় করছে‌। কোলের ভাইটা কেঁদে উঠতেই নীলিমা মা দুর্গার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ঐ দেখ ভাই, দুগ্গা ঠাকুর। দেখ কী সোন্দর! মা দুগ্গার সামনে কাইনদতে নাই।

 নীলিমার দু'বছর বয়সী ছোট্ট ভাইটা কী বুঝল কে জানে! মা দুগ্গার মূর্তির দিকে তাকিয়ে কান্না ভুলে গেল।

বলাই বলল, ই মাসে ভাইকে হাসপাতালে লিয়ে গেইছল?

এই কদিনেই বলাই যেন ছোট্ট মেয়েটির সুখ দুঃখের সঙ্গী হয়ে গেছে। নীলিমা মূর্তি রঙ করা দেখতে দেখতে ছোট্ট করে উত্তর দিল "হুঁ"।

বলাই কালো রঙটা মাটির ছোট ভাঁড়ে গুলতে লাগল। সেদিকে তাকিয়ে নীলিমা প্রশ্ন করল, পূজার আর ক'দিন দেরি আছে বলাইকাকু?

--- আর সাতদিন। পূজার লাগ্যে লতুন জামা কিনা হইয়েছে তদের?

সাত বছরের নীলিমা উদাস হয়ে যায় বলাইয়ের প্রশ্নে। নতুন জামা! শেষ কবে নতুন জামা পরেছে মনে পড়ল না নীলিমার। তার মা চারটা বাড়িতে বাসন ধোয়ার কাজ করে। বাবুদের বাড়ি থেকে কখনো কখনো পুরানো জামা সোয়েটার দেয়। নীলিমার খুব আনন্দ হয় তখন। ব্যাগে করে মা নিয়ে আসা মাত্রই সে বাছতে বসত কোনটা নিজে নেবে আর কোনটা দিদিকে দেবে। এখন যে জামাটা পরে আছে সেটাও মায়ের নিয়ে আসা পুরানো জামা। যখন নিয়ে এসেছিল টকটকে লাল রঙের সাথে হলুদ ফুল ছাপ ছিল জামাটায়। এখন আর সে রঙ নেই। কাঁধের কাছে সেলাই খুলে গেছে। মা বলেছে পুজোর আগে বাবুদের ঘর ঝাড়ামোছা হবে। তখন এরকম জামা আবার দেবে।

বলাই মিস্ত্রির লতুন জামার কথায় একটু দুঃখ পেল নীলিমা। তাদের পাশের বাড়িতে তনু থাকে। ওর বাবা বাইরে কাজ করে। ক'দিন আগে বাড়ি এসেছে।তনু বলছিল ওর বাবা নতুন জামা নিয়ে এসেছে ওর জন্য। একটা নয়; দুটো। একটা ফ্রক। আর একটা চুড়িদার। নীলিমার খুব ইচ্ছে করছিল একটা চুড়িদার পেতে। দিদির পুরানো চুড়িদারটা মাঝে মাঝে পরে নীলিমা। ঢলঢলে হয়। তবু পরে।

বলাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে নীলিমা একটু ক্ষীণ গলায় বলল, না কাকু, ই বছর লতুন জামা হবেক নাই। মা বল্যেছে ইবার  দিতে লাইরবেক। ভাইয়ের অষুদের জন্যে অনেক টাকা লাইগবেক।

--- তোর বাবা কাজে যায় নাই?

--নাহ্

বলাই আর কিছু বলে না। নীলিমা একদিন বলেছিল বাপটা নাকি একদিন কাজে যায় তো দশদিন আর যায় না। যেটুকু টাকা আয় করে, মদ খেয়ে শেষ করে দেয়। সংসারে একটি টাকাও দেয় না। ওর মা কিছু বলতে গেলেই মারধোর করে।

   বলাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল, বছর বাদে দেশ থেকে বাপের বাড়ি আইসছ মা জননী। সবাইকে আনন্দ দিঅ মা আনন্দময়ী।

ছোট ভাইটা ফের কাঁদতে শুরু করেছে। নীলিমা বলছিল ওর ভাইয়ের নাকি তিন বছর বয়স। কিন্তু চেহারা দেখলে মনে হয় দু'বছরও হয়নি এখনও। সরু সরু হাত পা, মাথাটা বড়। হাঁটতে পারে না। কথা বলতেও পারে না। তবে কেউ কথা বললে বুঝতে পারে বোধহয়।

ভাইকে কাঁদতে দেখে নীলিমা বলে, ইবার ঘর যাই কাকু। ভাইয়ের বোধহয় খিদ্যা লাগ্যেছে।

  বলাই কাজ থামিয়ে পকেট হাতড়ে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করে বলে, ই লে, ফটক্যার গুমটি থাক্যে ভাইটার লাগ্যে একটা বিস্কুট প্যাকেট কিনবি।

   নীলিমার দু'চোখে কৃতজ্ঞতা ঘনিয়ে আসে। একটু ইতস্তত করে হাত বাড়ায় টাকাটার দিকে।

(২)

পুজোর আর চারদিন বাকি। গাঁয়ের দুর্গা মন্ডপে প্যান্ডেল তৈরির কাজ চলছে। হৈ হৈ, চেঁচামেচি, লোকজনের আসা যাওয়া মন্দির প্রাঙ্গণকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। মন্দিরের ভেতরে দুর্গা ঠাকুরের গায়ে তেলরং দিচ্ছে বলাই। এরপর শাড়ি পরানো হবে। তারপর ডাকের সাজ। অনেক কাজ বাকি আছে এখনও। নীলিমা ভাইকে কোলে নিয়ে মন্দিরের সিঁড়ির একপাশে বসে আছে। মা দুর্গার কোলে বসে থাকা গণেশ ঠাকুরের গায়ে রঙ দিচ্ছে বলাই। নীলিমা একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। গণেশ ঠাকুরের পেটটা তার অসুস্থ ভাইয়ের ফোলা পেটটার মতো মনে হয়। আচ্ছা, তার মা যখন ভাইকে কোলে নিয়ে বসে থাকে তখন কি এরকমই দেখতে লাগে?

   হঠাৎ নীলিমার মনে হয়, মা দুর্গার মুখখানি আস্তে আস্তে তার মায়ের মুখের মতো হয়ে যাচ্ছে। দুই মা যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। মা দুর্গার কোলে বসে থাকা গণেশ যেন তার রুগ্ন, পেটফোলা ছোট ভাইটি। গতকালই তার ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল। রক্ত পায়নি। পঞ্চমীর দিন আবার যেতে হবে। বিকেলে বাড়ি ফিরে এসে মা কাঁদছিল। ডাক্তার নাকি বলেছে ভাইটা আর বেশিদিন বাঁচবে না।

     কথাটা মনে পড়তেই ছোট্ট নীলিমার বুকের ভেতর একটা কান্না দলা পাকিয়ে ওঠে। ঠাকুরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। দু'চোখ ঝাপসা হয়ে আসে নীলিমার। ছোট্ট দুই অপুষ্ট হাত দিয়ে বুকের ভেতর আঁকড়ে ধরে রুগ্ন, মৃত্যুপথযাত্রী ভাইটিকে। দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। পাছে কেউ দেখে ফেলে! বাম হাতের তালু দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলে নীলিমা।

পঞ্চমীর দিন ভাইকে নাকি আবার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। গতকাল রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে নীলিমা শুনতে পাচ্ছিল মা বারবার বাপটাকে বলছিল, সারাদিন নেশা করে পইড়ে থাইকছ। সংসারের খোঁজ খবরটুকু লিছ নাই। পরশু আবার হাসপাতাল যাত্যে হবেক। সব বার ত একাই যাই। ই বারটা সংগে চলঅ। ছিলাটা আর বেশিদিন বাঁচবেক নাই গ। এত কঠিন হইঅ না। ইবার দুজনে মিলেই খোকাকে লিয়ে যাব। ইবারটাই বধহয় শ্যাষ....

    কথাগুলো বলতে বলতে জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল নীলিমার মা। নীলিমারও কান্না চলে এসেছিল। ভাই আর বাঁচব্যাক নাই! মনে মনে কথাগুলো উচ্চারণ করে আধো অন্ধকারে পাশে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিল। কী নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে ভাইটা! অনেক রাত পর্যন্ত নীলিমার ঘুম আসেনি। আগের বছর দুর্গাঠাকুরকে জলে ভাসিয়ে দেওয়ার সময় নীলিমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। এত সুন্দর ঠাকুরকে জলে ফেলে দিচ্ছে দেখে চোখে জল এসেছিল। সেইরকম একটা কষ্ট ‌অনেক রাত পর্যন্ত তার শিশুবুককে তোলপাড় করেছিল।

ভাইটা মা দুর্গার দিকে তাকিয়ে আছে। নীলিমা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে, ভাই আর বেশিদিন বাঁচবেক নাই! ভাইয়ের মুখে হাত বোলাতে বোলাতে আস্তে আস্তে বলে, ভাই, এ ভাই। একবার বল, দিদিইইই। মা দুর্গার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নীলিমার মুখের দিকে তাকিয়ে রুগ্ন, অপুষ্ট ভাইটি খিলখিল করে হেসে ওঠে।

(৩)

বলাই ঠাকুরের গায়ে রঙ দিতে দিতে হাত ছেড়ে নীলিমার দিকে তাকায়। বলাইয়ের দুই ছেলে। মেয়ে নেই। ইচ্ছে ছিল একটা মেয়ে হোক। মা লক্ষ্মী ঘরে আসুক। কিন্তু সব ইচ্ছে তো পূরণ হবার নয়। পরপর দুই ছেলেই হল। কার্তিক আর গণেশ। মেয়ে নেই বলে এই ক'দিনে নীলিমার উপর বড্ড মায়া পড়ে গেছে বলাইয়ের। মাঝে মাঝে মনে হয় এরকম একটা মেয়ে থাকলে বেশ হত।

আজ মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন কেমন যেন লাগল বলাইয়ের।মনমরা ভাব চোখেমুখে। নীলিমার ঘরের অবস্থা বলাই জানে।বাগদি পাড়ায় এমন দুরবস্থা অনেক ঘরেই। তবে এমন অসুখ নিয়ে বেঁচে থাকা শিশু এ গাঁয়ে আর নেই।

নীলিমা চুপ রে বসে আছে। বলাইয়ের কাজ দেখছে একমনে। কাজ করতে করতেই বলাই বলল, পূজা ত চল্যে আল্য। তদের ত লতুন জামা হয় নাই?

নীলিমা আস্তে আস্তে ঘাড় নেড়ে না বলে। বলাই চুপচাপ রঙ গুলতে থাকে।সাদা রঙের সাথে লাল রঙ গুলে গোলাপী রঙ তৈরি করছে বলাই। রঙ গুলতে গুলতে বলল, তর লাগ্যে কাইল একটা লতুন জামা লিয়ে আইসব। লিবি?

লতুন জামা শুনেই আনন্দের ঢেউ খেলে যায় ছোট বালিকার মনে। চোখগুলো চকচক করে ওঠে। পরক্ষণেই কোলের ছোট ভাইটার কথা মনে হয়।

বলাই জিজ্ঞাসা করে, কী লিবি-- চুড়িদার না টু কাট?

নীলিমা উত্তর দেয় না। বলাই ভাবে, বাইরের লোক বলে মেয়েটা হয়ত লজ্জা পাচ্ছে। একটু হেসে বলাই বলে, তুই আমার বিটির মতন। বেশি দামী দিতে লাইরব। যা দুব তাই লিবি। মা আইসছে। এতবড় পূজা। লতুন জামা পইরতে হয়। লিবি নাই আমার কাছে?

নীলিমা আস্তে আস্তে বলে, লুবঅ।

বলাই বলে, কাইল আইনব থাইলে।

নীলিমা একটু সময় চুপ করে থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, আমার লতুন জামা লাইগবেক নাই বলাইকাকু। ঐ ট্যাকাটায় আমার ভাইয়ের লাগ্যে একটা লাল গেঞ্জি আন্যে দিবে? ডাক্তার বইলেছে ভাই আর বেশিদিন বাঁইচবেক নাই।ভাই ইবার মরি যাবেক....ভাই....

   কথাগুলো শেষ করতে পারে না ছোট্ট নীলিমা। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। বলাই রঙ দেওয়া ভুলে নীলিমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এক গভীর যন্ত্রণায় ভারী হয়ে আসে বলাইয়ের পিতৃহৃদয়। মনে মনে বলে, গরীবদিকে এত দুখখু ক্যানে দাও মা?

(৪)

টুকটুকে লাল গেঞ্জি প্যান্ট এনে দিয়েছে বলাই। পঞ্চমীর দিন নীলিমার ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে নীলিমার বাবা মা। নতুন লাল গেঞ্জিটা ভাইকে পরিয়ে দিয়েছে নীলিমার মা। নীলিমা দুখী মুখে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর মা দাওয়ায় বসে ভাইকে কোলে নিয়ে আদর করছে। এই ক'দিনে ভাইটা আরো কাহিল হয়ে পড়েছে। খাবার খেতেও চায় না আর।

 ভাইটা আর বেশিদিন বাঁচবেক নাই!

বিড়বিড় করে নীলিমা। কান্না আসে।

লাল টুকটুকে গেঞ্জি প্যান্ট পরা ভাইকে কোলে নিয়ে এক টুকরো উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে নীলিমার মা। সেদিকে তাকিয়ে  নীলিমার মনে হল, মা দুগ্গা কৈলাস থেকে এসে গেছেন। গণেশ ঠাকুরকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের এক টুকরো উঠোনে।