![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
জীবন-ঢেউ ও ক্রমশঃ
জনা বন্দ্যোপাধ্যায়
"বাড়ির চাবিগুলো কোথায় রেখেছ?"
শুভর কথায় তিন্নি হাত পা ধুতে ধুতে বাথরুম থেকে চেঁচিয়ে উত্তর দেয়, "আমার ডায়েরির ওপর"।
"ও তাই বল, আমি সুটকেশ থেকে জামাকাপড় বের করে খুঁজে পাচ্ছিলাম না!" শুভর যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। স্বামী স্ত্রী মিলে দুবলাগরির সৈকতে সূর্যোদয় দেখতে গেছিল। তিন্নি প্রচুর ঝিনুক কুড়িয়েছে। ঢেউ এর রূপকথা তিন্নির কল্পনাকে ছুঁয়ে যায়! ঢেউ যেন ওর বাল্যসখি! দৈনন্দিন কাজের মধ্যে তিন্নির সমুদ্রধারে যাওয়ার কথা মনে হওয়ায় শুভ দুবলাগরিতে আসার প্ল্যানটা করেছিল!
হোটেলের ঘরের বিছানায় তিন্নির ডায়েরি, যা লেখা তিন্নির প্রতিদিনের অভ্যাস, পেন, শুভর ঘড়ি, এছাড়া দুটি কবিতার বই, তার নিচে তিন্নির শাড়ি, আর ডায়েরির ওপর নিজেদের বাড়ির চাবি ও কয়েকটি ঝিনুক দেখে শুভ মনে মনে হেসে বলে, "পাগলী"।
শুভর স্পষ্ট মনে আছে হাওড়া স্টেশনে ভিড় কামরায় উঠতে গিয়ে তিন্নির সঙ্গে ধাক্কা লাগার দিনটি, তিন্নির হাত থেকে তার ব্যাগটা ছিটকে পড়ে যায়, শুভ তুলে দেয়। গল্পটা সিনেমার মতো হলেও আসল গল্পটা ছিল অন্যরকম! তিন্নি যে এনজিওতে কাজ করে, সেখানে মানসিকভাবে অসুস্থ মহিলাদের কাউন্সেলিং করা হয়। তিন্নিকে শুভ অকপটে তার প্রেমিকা নীরার মানসিক অসুস্থতার কথা বলেছিল। কলেজ থেকে যে তাদের সম্পর্ক সে কথা জানিয়েছিল। তিন্নি নীরাকে ভালো করার প্রতিশ্রুতি দেয়। সে সময় শুভর সহানুভূতির প্রয়োজন ছিল!
এক সপ্তাহের মধ্যেই তিন্নি নীরার আত্মহত্যার খবর পায়। নীরার বাবা মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ নীরাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছিল। এটাই ছিল নীরার মানসিক অসুস্থতার কারণ! নীরার কাজল কালো ভ্রমরের মতো চোখে বিষাদের ছায়া দেখে শুভর কষ্ট হত। নীরা মায়ের কাছে থাকলেও বাবাকে খুব ভালোবাসতো। উনি ব্যস্ত ডাক্তার হলেও ফোনে মেয়ের আবদার না রেখে পারতেন না! কিন্তু নীরা যেদিন বাবার দ্বিতীয় বিয়ের কথা শোনে, সেদিন থেকেই শুরু হয় পাগলামি, অসংলগ্ন কথা। নীরা আশা করেছিল একদিন না একদিন নীরা তার মাকে নিয়ে বাবার কাছে ফিরে যাবে। কিন্তু সবই বৃথা হয়ে যায়!
তিন্নিকে বিয়ে করার পর থেকে তিন্নি প্রায়ই নীরার কথা বলে! শুভ জানে ঝিনুক, বালির আলপনা, উত্তাল ঢেউ তিন্নিকে হয়তো কটা দিন অন্যমনস্ক রাখবে! তিন্নির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে নীরা তাদের মাঝে ছায়ার মতো আছে। নীরা চলে যাওয়ার পর শুভর মনের অবস্থা তিন্নি বুঝতে পারে। তিন্নির বড় মায়া হত। একদিন তিন্নিই শুভকে বলে, "তোমার বিয়ে করা উচিত।" তিন্নি সুন্দরী না হলেও তিন্নির এক ঢাল চুল ও নরম চোখের চাহনির মধ্যে মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা আছে। শুভর মনে হয়েছিল তিন্নির মতো উদার মনের মেয়ে সে দেখেনি। তাই স্ত্রী হিসাবে তিন্নিকে পাওয়া ভাগ্যের!
তিন্নি শুভর কাছে নীরার এত গল্প শুনেছে, কিন্তু সবই যেন অসমাপ্ত থেকে গেল! তিন্নি জানে নীরার অভাব সে পূরণ করতে পারবে না, এক ধরণের হতাশা মনের অবচেতনে থেকেই যায়!
হঠাতই একদিন কৌতূহলে তিন্নির ডায়েরির পাতা উল্টে শুভ অবাক হয়ে যায়! শুভর কাছে সে নীরার মতো হতে পারবে না সে কথা লেখা! শুভ তখন থেকে তিন্নির বিষয়ে সতর্ক হয়। নীরা মেধাবী ছাত্রী হওয়ায় এমবিএ তে চান্স পেয়েছিল, শুভ এসব প্রসঙ্গ তিন্নিকে আর কোনোদিনই তুলতে দেয় না। তিন্নি যাতে মানসিক অসুস্থতার দিকে না যায় শুভ সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে শুরু করে!
তিন্নির বাড়ির অবস্থা সেরকম ভালো ছিল না। বাবা মারা যাবার পর তার মা হাসপাতালে আয়ার কাজ করে দুই ভাই বোনকে পড়িয়েছে। তাই শুভর মতো কর্পোরেট সেক্টরে চাকরিওয়ালা জামাই তিন্নির মায়ের স্বপ্নের অতীত ছিল। শুভ প্রথমে তিন্নির মাকেই তিন্নিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়।
দুবলাগরিতে জোয়ারের জলে নুলিয়াদের একটি পাঁচ বছরের শিশু ভেসে যাচ্ছিল, শুভ তাকে বাঁচায়! তিন্নির জেদ এই বাচ্চাটিকে সঙ্গে নিয়ে যাবে ছেলের মতো মানুষ করবে। কিন্তু শুভ চায় না। সে তিন্নি আর তার মাঝে আর কাউকে আসতে দিতে চায় না। কিন্তু তিন্নিও ছাড়ে না, কারণ শিশুটির মা নেই, বাবা দেখে না, মাছ ধরতে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত শুভ তিন্নির জেদের কাছে হার মানে।
শুভ বোঝে জীবন কোনো রোদ, ছায়া, বৃষ্টির গল্প নয়, জীবন এক অনাবিল ধারাবাহিকতা, যা অনির্ণেয়!



No comments:
Post a Comment