![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
নাহাগন্ডার তেলেভাজা
তাপস রায়
একটা
অভাব সেই থেকে খচখচ করছে। কীসের অভাব! খুব খারাপ রাস্তা ছিল ওই ৩৪ কিলোমিটার । গাড়ি
পাহাড়ের ছোটো ছোটো খাদের ভেতর নেমে আবার ঠেলে উঠছে। তিন জায়গায় এরকম ঘটেছে রাইকিয়া
দাড়িংবাড়ি সড়কে। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসতে অভ্যস্ত মৌলি বেশ ভয় পেয়েছে। এই পাহাড়ি
প্রান্তরে সুজুকি ডেজায়ারের মতো সাদা-মাটা গাড়ির মটকা যে কোনো সময়ে গরম হয়ে খারাপ হতে
পারে। ড্রাইভার প্রশান্ত প্রধান বার বার নিজের জামার ভেতরে থুত্থুড়ি কেটে ভয় তাড়াচ্ছে।
১নং গিয়ারে ফেলে চাকা তোলা ছাড়া উপায় নেই। আর তা করতে ইঞ্জিনের উপর যা চাপ পড়ে তা কহতব্য নয়। মটকা গরম হতে হতে বসেও
যায়।
মৌলি নিজেও জানে তার মটকা কেমন গরম হয়।
আর গরম হলে সে কেমন ডিপ্রেশনে চলে যায়। গতকাল মন্দাসুরের সিনিক বিউটি দেখে মন ভরে গেছিল
বলেই আর লাভারস পয়েন্ট বা এমু পার্কের বৃষ্টিকাতর দেখা-না-দেখার অপর্যাপ্ততা তেমন করে
তাকে মুষড়ে ফেলতে পারেনি। তা ছাড়া মন্দাসুর থেকে বাহারী পাতার গাছ আনতে পেরে সে বেজায়
খুশি হয়েছে। গাছগুলি বাড়ির ব্যালকনিতে যখন বড় হবে, তখন মৌলির মনে পড়বে এই ট্যুরের কথা।
কার কথা সে গোপন করেও সামনা সামনি রাখতে চায় পাতাবাহারি গাছের অনুষঙ্গ দিয়ে!
গতকালের ভালোলাগার ভেতর ঘুম ভাঙতে ভাঙতে
সকাল সাতটা। উঠে দেখল রিমিল পালের চান করা হয়ে গেছে। কথা ছিল সাতটার ভেতর দারিংবাড়ি
থেকে বেরিয়ে পড়বে ভূবনেশ্বরের দিকে। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লে দুপুর দুপুর ভূবনেশ্বরে
পৌঁছে যাবে। ভূবনেশ্বরে বিস্তর হোটেল রেস্তোরাঁ। লাঞ্চের চিন্তা নেই।
মৌলি ঘড়ি দেখে নিয়ে লম্বা একটা জিভ কেটে
ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। নিজেকে রেডি করতে খানিকটা সময় লাগে তার। এমনিতে বিশেষ সাজ-গোজ করে
না। দরকার হয় না। একঢাল চুল। ভেজাবে না সে। চূড়ো করে উপরে তুলে একে একে নিজেকে নির্ভার
করল। বাথরুমের লম্বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করল। “ এখনো আমি যথেষ্ট সুন্দরী।”
“ কেন এখনো বলছ! আর যথেষ্ঠ বলছ!”
আয়নার ভেতর থেকেই কি বিস্ময়টা বেরিয়ে এল! মৌলি
তো তো করে আবার বিড়বিড় করল। “ না, মানে আমার তো খানিকটা বয়স হলো। এই বয়সে অনেক ফুলই
ঝরে যায়, বা যাবার মতো করে ঢলে পড়ে। আমার আজকাল বয়সের কথা মনে পড়ে যায় যে।”
আয়না মিটিমিটি করে হাসছে দেখে মৌলি কৈফিয়তের স্বরে
বিড়বিড় করে, “ আমার বয়স এখন ছেচল্লিশ। মনে কিন্তু কিন্তু ঢুকবে না বলছ! আমি পাঁচ ফুট
সাত ইঞ্চি। অনেক মামুলি সুন্দরীদের চেয়ে ঢ্যাঙা, রাস্তায় কখনো হাঁটলে ত্যারচা তাকিয়েই
বুঝি ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে আমাকে ঝাড়ি মারছে।
এই বুক না-ঊঁচু, না-নিচু। পেটে মেদ জমেনি। ডাবল চিন আমার কোনো কালেই হবে না বলে বিশ্বাস।
আর কোমর তো দুই মুঠোর ভেতর আঁটিয়ে নেয় দেবচান গুহ নিয়োগী।”
দেবচানের কথা মনে পড়তেই মৌলি নিজত্বে ফেরে। না,
আজ আর ঘন্টাখানেক চান ঘরে থাকার বিলাসিতা করা যাবে না। রিমিলি তো শাড়ি-টাড়ি পরে চুল
আঁচড়ে একেবারে রেডি হয়ে গেছে। এক্ষুনি হোটেলের রুমে চা আর বাটার টোস্ট নিয়ে আসবে রুমবয়।
মৌলি চানের আগের ক্রিমের টিউব নিয়ে কমোডে বসল। ওই সময়েই সারা গায়ে কৃম ঘষবে। তার মোমের
মতো সব অঙ্গ। শান্তনূ প্রধান বিছানায় মৌলির সারা গায়ে মুখ ঘষেই পাগল হয়ে যায়।
বিয়ে না করলেও মৌলির বিছানা সুখ পেতে তেমন কোনো
অসুবিধে হয় না। শরীর নিয়ে তার কোনো ট্যাবু নেই।
ইন্ড্রাস্ট্রিতে হাঁটুর বয়সী ছেলেরা ওর বন্ধুত্ব পেতে মুখিয়ে থাকে। তবে মৌলি
ছুঁক ছুঁক করা ছেলেদের একদম পছন্দ করে না। শান্তনুর ব্যক্তিত্বই তাকে শান্তনু করেছে।
ডিরেক্টররাও ওকে ভয় পায়। ও ফ্লোর ম্যানেজার।
জে কে স্টুডিওর চারটে ফ্লোর ওর তত্বাবধানে। ওর ইয়েস ছাড়া ফ্লোর পাওয়া মুশকিল।
আর শান্তনু ইয়েস করা মানে পরিচালকের কাজ প্রায় নেই হয়ে যায়।এইসময়ের ছ’টাজনপ্রিয় বাংলা
সিরিয়াল এই স্টুডিওতে শ্যুটিং হয়। তিনটে শিফট। শান্তনু ফ্লোর দেবার আগে প্রত্যেকের
কাছ থেকে অন্তত বারোটা এপিসোডের স্ক্রিপ্ট হাতে নেয়। নিজে পড়ে। তারপর ডিরেক্টর, গল্প
লেখক, আর নিজের ডিজাইনার নিয়ে মিটিং-এ বসে। বড় জোর দু’ঘন্টা।
ওই মিটিং-এই প্রথম আলাপ শান্তনুর সঙ্গে মৌলির।
মৌলি যেমন ডিরেকটরের সামনে কেমন পার্সোনালিটি লুজ করে। কিন্তু সেদিন দেখেছিল
ডিরেক্টর অম্বরিশ শান্তনুর সামনে সারাক্ষণ তো তো করে গেল। আরেব্বাস! মনে ধরল মৌলির।
তারপর তো মৌলি টার্গেট করে তাকে তুলে নিল। মানে বন্ধুত্ব হলো।
সিঁয়াংগবালির ঢাল পেরিয়ে পাহাড়ের বাঁকে একটু ফাঁকা
জায়গা। নাহাগণ্ডা। নাহাগণ্ডা সম্ভবত একটা গাঁ। একটা রাস্তা চলে গেছে অন্য একটা পাহাড়ের
বুকে। কাঁকুরে মাটি আর জঙ্গলের লকড়ি দিয়ে হাত তিনেকের দৈর্ঘ্য প্রস্থের দোকান। দোকানের
সামনে বাঁশের চটার বেঞ্চ। ড্রাইভার প্রধান গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করল। “এইঠি চা অছি?”
“ হব।”
নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। মৌলি ড্রাইভারকে বলে রেখেছিল,
পাহাড়ের ঝুপড়ি দোকান থেকে চা খাবে। মোমো খাবে। এই দোকানে সকাল সকাল পেঁয়াজি ভাজা হচ্ছে
দেখে মৌলির মন খুশ হয়ে গেল। বড় বড় হোটেল আর রেস্তোঁরায় ওকে সারা বছর খেতে হয়। বাইরের
ট্রিপে এলে কেমন মুক্তির স্বাদ। একেবারে নিজের মতো করে খেতে পারে।
নেমে এলো গাড়ি থেকে। লুঙ্গি আর হাফ শার্ট পরা দোকানদার
তো গদগদ। তার দোকানে এরকম সুন্দরী কাস্টমার এসেছে! এই সুন্দরীর গল্প করেই তো কয়েকটা
বছর দোকানের গুরউইল বাড়িয়ে নেবে।
অক্টোবরের
মাঝামাঝি। দারিংবাড়ি দারিংবাড়ি হয়ে ওঠেনি। ঝুড়ো বরফ আর অক্লান্ত ঝরনার জন্য যে দারিংবাড়ি
উড়িশ্যার কাশ্মীর নাম পেয়েছে, সেই নামের নখের
যোগ্যও হয়ে ওঠেনি। তাহলেও মন্দ লাগেনি মৌলির । নির্জনতার যে অকপট সৌন্দর্য আছে তা মন
মজিয়েছে।
এই সময় মনে হলো, আচ্ছা তার জীবনে কেউ একজন এমন
কি আছে যে তাকে আবিষ্ট করে আছে! মানে সে কি কোনো একজনও পুরুষের জন্য আকুলতা পোষণ করে!
কই না। এই সব প্রশ্ন মনের কাছে যে নিজে পাঠায়নি। ঘন্টা খানেক আগে দাড়িংবাড়ি থেকে নিচে
নামতে নামতে রিমলি বলছিল। পাহাড়ের সহজ সৌন্দর্যে মৌলির উচ্ছ্বাস এর একটু বাড়াবাড়ি নজরে
পড়ায় রিমলি তিরটা ছুঁড়েছিল।
রিমিলি মৌলির অনেকটা জানে আবার বেশ অনেকটা জানে
না। একই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে। পে-ডিগ্রিতে অনেক নিচে হলেও রিমলি-র সঙ্গে বন্ধুত্বটা
খুব নিখাদ। মৌলি খানিকটা নির্ভরও করে রিমলির উপর। এদিক-ওদিক যাবার সময় রিমলিকে সঙ্গে
নেয়। আউটডোর স্যুটিং থাকলে যদি মৌলির যাবার দরকার হয় তো রিমলিও সঙ্গে যাবে। পরিচালক
মেনে নেয়। কিন্তু রিমলির সমস্যা ছেলেটিকে ছেড়ে থাকতে। যতই স্বামীর সমর্থন পাক না সে
দিনের শেষে ফুটফুটে ছেলেটির মুখ একবার না দেখতে পারলে ভেতরে ভেতরে রিমলি অস্থির হয়ে
ওঠে। স্বামী ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ভিডিও কল করে
দুধের স্বাদ ঘোলে মেটায়।
সোজা সরকের পাশে দুটো পাহাড়ি রাস্তা একটু আগে আর
পরে ডানে, বাঁয়ে দু’দিকে চলে গেছে। ফলে জায়গাটা খানিকটা প্রশস্ত। ড্রাইভার প্রধানকে
বলে রাখা ছিল সকালের চা তারা খাবে রাস্তার পাশের কোনো চায়ের দোকানে। যে নির্মলতা চোখে
মেখেছে এই দারিংবাড়ি সফরে, তা জিভেও কিছু নেবে।
নাহাগন্ডা গ্রামের মোড়ে এই সামান্য চায়ের ঝুপড়ি
দেখেই কলকল করে উঠেছে মৌলি, “ প্রধান, এখানেই দাঁড়াও।”
ড্রাইভার গাড়ি পিছিয়ে এনে উড়িয়া ভাষায় জিজ্ঞাসা
করেছে, “ এই দুকানী, চা হেবা?”
বেশ ফর্সা মাঝ বয়সী মহিলাকে খানিকটা নেপালীদের
মতো লাগে। সে মাথা নেড়ে জানিয়েছে হবে। প্রধান গাড়ি সাইড করে দাঁড় করিয়ে দিতেই সবাই
নেমে আসে। ঝুপড়ি থেকে ছোটো কাচের গ্লাসে চা খাবার ইচ্ছে অনেকদিন ধরে হয়ে উঠছে না। টিমের
সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া-শোয়া-বসা সব হাই-ফাই জায়গায়। সেসব করতে করতে মৌলির মনে হয় সে হাঁপিয়ে
যাচ্ছে। আরও একটা হাঁপ ধরেছে জীবন কেমন যেন একঘেয়ে। কি যেন একটা শূন্যতা তাকে গ্রাস
করতে দুই হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে।
আজ গণ্ডির বাইরের এই টুকুস সহজতায় সে স্বভাবতই
উল্লসিত। ভাঙাচোরা দোকানের কাছে সেইই সবচে আগে গেছে। সেখানে গিয়ে দেখে ভেতরে একটা ছোট
মাটির উনুন জ্বলছে, তার উপর লোহার কড়াই আর তাতে কালো তেল। সেখানে সকাল সকাল চপ ভাজছে,
বেগুনি ভাজছে একজন প্রৌঢ়। তার মুখে খোঁচা খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি। বেশ ময়লা গায়ের রং।
একটা সাধারণ ফুল শার্ট জামা কনুই পর্যন্ত গোটানো। হাঁটুর নিচ পর্সন্ত গোটানো ফুল প্যান্টও
পরেছে সে।
উবু হয়ে ভাজছিল চপ। মৌলি চপ ভাজা দেখেই বলে উঠল,
“ আমরা কি চপ কিনতে পারি?”
বাংলা বোঝে না সে। তার চোখ করুণ ও সুন্দর সহজ।
মৌলি ড্রাইভার প্রধানকে বলল, “ প্রধান জিজঙাসা করতো, এখন চায়ের সঙ্গে আমরা চপ খেতে পারব কিনা?”
প্রধান সেই ফর্সা মহিলাকে জিজ্ঞাসা করল, “ এবা
চা সহ আমে চপ খাই পারিবা?”
দোকানদার মহিলা, যে টেবিলের উপর রাখা স্টোভে একটা
সসপ্যানে চায়ের জন্য গরম জল চাপিয়ে দিয়েছিল, নিচে মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। অল্প
স্বর মেরে বলল, “ হ্যাঁ হ্যাঁ হেবা। তবে মিনট দশক অপেক্ষা করিবাকু পারিবা।”
মৌলি বুঝে ফেলল। সে বলল, “ হ্যাঁ দশ মিনিট লাগলে
লাগুক। আমরা আজ ব্রেকফাট এই চা আর চপ দিয়ে সারব। ভুবনেশ্বরে ফিরে লাঞ্চ।
প্রধান গাঁয়ের রাস্তার ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল।
সে সিগারেট খাবে। আর কোনো গাছের আড়ালে হিস্যু করবে। রিমলি আর মৌলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
দেখছিল চপ ভাজা। কেমন করে চায়ের গ্লাসের পেছন দিয়ে একটা প্লাস্টিকের কাগজের উপর মাখা
আলুর মণ্ড রেখে চেপে গোলাকার করছে দোকানদার। তারপর ব্যাসন গোলার ভেতর ছেড়ে দিয়ে তা
চার আঙুলে তুলে আস্তে করে ফুটন্ত তেলের উপর ছাড়ছে, নিবিষ্ট মনে দেখল। দেখল কী যত্ন
কী যত্ন!
এই
যত্ন একটুকু কম হলে বুঝি জিনিসটা সঠিক হবে না!
সামনে দিদিমণি দু’জন ঝুঁকে চপ ভাজা দেখছে।
দোকানদার মহিলা চায়ের জল চাপিয়ে চপের কড়াইয়ের দিকে একটু তাকাল। তারপর নিজে উবু হয়ে
বসে মাটির উনুনের ভেতর আরো দুটি শুকনো কাঠ গুঁজে দিল। আগুন হাই হাই করে লাফিয়ে উঠেছে
এবার। চপ ভাজতে থাকা লোকটা ঝাঝরি হাতা দিয়ে চপগুলো উল্টোতে লেগেছে। এবার তাড়াতাড়ি হয়ে
যাবে।
মৌলি দেখল মহিলার কাণ্ডজ্ঞান যেন পুরুষটির
তুলনায় একটু বেশি। মৌলি আরও দেখেছে কাঠ গুঁজে উঠবার সময় ফর্সা মহিলাটি সেই প্রায় প্রৌঢ়
পুরুষটির পিঠে ভর দিল। দু’জনে দু’জনের চোখে তাকিয়ে হাসল।
কী সুন্দর! কী সহজ! মৌলি গলে গেল! মুখ
থেকে একটা শব্দ একটু জোরেই বের হলো। “ আহা!” তার মনে হলো এই তাকানো সে যেন কোথায় দেখেছে!
হ্যাঁ দেখেছে, নাহলে চেনা লাগবে কেন! বুকের ভেতর ধাক্কা দিচ্ছে মেঘ। কোথায়, কোথায়!
আর কয়েক মুহূর্ত বাদেই ডান হাতের আঙুলে একটা তুড়ি তুলে মৌলি তার হিল তোলা জুতোর উপর আধ পাক ঘুরে রিমিলির
মুখোমুখি।
রিমিলি বলল, “ কী হলো? আহা বললে যে! চপ
ভাজা দেখে খুব খেতে ইচ্ছে করছে?”
“ চপ তো খেতে ইচ্ছে করছেই। আহা বেরিয়েছে
আমার প্রাণ থেকে।”
মৌলি রিমিলি-র হাত ধরে টেনে নিয়ে বলল,
“ চলো চলো একটু ওই দিকে ফাঁকায় দাঁড়াই। এখনও খানিকটা সময় লাগবে চা আর চপ তৈরি হয়ে উঠতে।”
মৌলির মন ফুরফুরে এক ভালোলাগা এসেছে। সেই
ভালোলাগা সে রিমিলির সঙ্গে শেয়ার করতে চায়। দোকান থেকে খানিকটা দূরে সরে এসে একটা অজানা
গাছের মোটা গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে মৌলিই বলল, “ পাহাড়ি মানুষেরা কেমন সহজ হয়, সুন্দর
হয়, অকপট হয়, তা এতদিন শুনেছি। আজ নিজের চোখে দেখলাম। এই প্রকৃতির মতোই এই দোকানী দু’জনকে
দেখে আমার মন ভরে গেছে।”
রিমিলি বলল, “ কেমন! একজন হতকুচ্ছিত পুরুষের
পাশে সুন্দরী মহিলাকে বড় বেমানান লাগছিল কিন্তু।”
একটু ত্যারচা করে জঙ্গলের দিকে তাকাল মৌলি।
পাশের রাস্তায় গাড়ি নামছে পাহাড় থেকে। দু-একটা উঠছেও। মৌলি তার দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে
গেয়ে উঠল, “ ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশের পাখি,/ নয়নে দেখেছি তব নূতন আকাশ।।/ দু’খানি
আঁখির পাতে কী রেখেছ ঢাকি,/ হাসিলে ফুটিয়া
পড়ে উষার আভাস।।”
সুরেই গেয়েছে মৌলি। রিমিলির কানে গান এলেও তা ঢেকে
যেন বেশি করে মনে ধরল, দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দেয়ায় মৌলির দুটি স্তন চূড়া যেন আকুল হয়েছে। কারও আলিঙ্গন
পেতে চাইছে। একটু ছেলেমানুষি কি ভর করেছে! রিমিলি সন্দেহের চোখে তাকাল মৌলির চোখে।
চোখ ও ভ্রু একসঙ্গে নাচিয়ে শুধোল, ব্যাপারটা কী?”
গান থামিয়ে সে বলল, “ আমি বিয়ে করব?”
রিমিলির মুখ হাঁ হয়ে গেছে। এই গত নয় বছরে
কতবার যে রিমিলি বুঝিয়েছে। বলেছে, বয়স বাড়লে তখন এই সিংগল থাকার গোঁ গোত্তা খাবে। বারবার
নিজেকে হেরে যাওয়া পাবলিক মনে হবে। নিজের উপর অসন্তোষ বেড়ে ডিপ্রেসন দুয়ারে হাজির হবে।
সময় থাকতেই এতসব বন্ধুদের ভেতর যেকোনো একজনকে পার্মানেন্ট বন্ধু করে নেয়া ভালো। কিন্তু
মৌলি ‘ধ্যুস’ বলে একটা তুচ্ছতা ছুঁড়ে দিয়ে এড়িয়ে গেছে। আজ হলো কী!
রিমিলি এক মুখ আকাশ থেকে পড়া নিয়ে মৌলির
মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “কাকে বিয়ে করবে? ভাগ্যবানটি কে?”
রিমিলিকে আরো আশ্চর্যের খাদে ফেলে দিয়ে
মৌলি বলল, “ শম্ভুনাথ ডেকা কে। ”
“ কে শম্ভুনাথ! স্টুডিও-র ফ্লোর ম্যানেজার
ছেলেটি! ওরকম অতগুলো স্মার্ট বয়ফ্রেন্ডদের মনে ধরল না, ওই ক্যাবলাকান্ত, কালোকুলো,
গোবেচারা শম্ভুনাথ! যাহ! ইয়ার্কি মেরো না তো!”
“ না রে। ইয়ার্কি না। একটু আগে ওই যে চপ
ভাজছেন দোকানদার, সে যেমন করে সুন্দরী দোকানীর চোখের ভেতর নিজের সরল চোখখানি গুঁজে
দিল আর মুখে এক চিলতে চাঁদের হাসি, সত্যি বলছি, আমি শম্ভুনাথ ডেকার চোখে তেমন মন খুলে
দেয়া তাকানো দেখেছি। কিন্তু উত্তর দিইনি। দিতে পারিনি। বলতে পারিস উপেক্ষাই করেছি।
ওই তাকানোতে যেমন সমর্পন লেখা আছে, তেমন একবুক সমুদ্রের গর্জন আছে। মহিলা দোকানী ওই
পুরুষ তাকানোকে মর্যাদা দিয়ে ছুঁয়ে দিল লোকটিকে। আশ্বস্ত করল। মনে হল বলছে, আমি তোমার।”
রিমিলি মৌলির সাদা মুখের উপর এসময় আবিষ্কারের আলো দেখল যেন। সে আলোর কোনো রূপ বর্ণনা
হয় না। রিমিলি ইন্ডাস্ট্রির একজন প্রধান বিউটিসিয়ান। সে বুঝে উঠতে পারল না, কী কী রঙ
মিশিয়ে এমন আশর্য আলোর ছটা ও শেড মুখে মেলা যায়। কলকাতায় ফিরে গিয়ে, তাদের নতুন সিরিয়ালের
নায়িকার প্রেমিকা মুখে অমন আশ্চর্য রং এর খেলা ধরে দেয়ার চেষ্টা সে করবে বটে, কিন্তু
পারবে কি ওই সহজ উদ্ভাস এঁকে দিতে!



No comments:
Post a Comment