![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
বিদ্যুল্লতা
অভিষেক ঘোষ
(১)
স্বপ্ন
চাচা চৌধুরী, নন্টে ফন্টে, হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট - এ সবই সেই কবেই পাপ্পু পড়ে ফেলেছে। তাছাড়া সে আর মোটেও আগের মতো ছোট্টটি নেই... দু'হাতে দু'টো ইঁট নিয়ে সে এখন তুলতে আর নামাতে পারে। তাদের পাড়ার পুকুরের মধ্যিখান অবধি অনায়াসে সাঁতরে যেতে পারে। রাস্তার টিউবওয়েল থেকে প্রায়ই সে ছোটো বালতিতে করে জল আনে। এই তো সেদিন সে দশ বলে পনেরো রান করে শেষ মুহূর্তে ঐকতান মাঠে হারা ম্যাচটা জেতালো। এরপরেও তাকে ছেলেমানুষ ভাবলে, তার আর কিছুই বলার নেই! তার মাঝেমাঝেই মনে হয়, বাড়িতে বড়োরা ছোটোদের উপর অহেতুক জোর-জুলুম করে।
আচ্ছা, এরা কি কোনোদিনও ছোটো ছিল না! একদিনে নিশ্চই বড়ো হয়ে যায় নি ওরা! তবে? মাথায় ঢোকে না পাপ্পুর। সে যদি কোনোদিন প্রধান মন্ত্রী হতে পারে, আইন করে সব বদলে দেবে। তখন ছোটোরাও অনায়াসে অ্যানাকোন্ডা বা, টাইটানিক দেখতে পাবে, ওসব দেখার সময় বড়োরা কোনোমতেই তাদের হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে পারবে না। পয়সা নেই... এই অজুহাতে টিনটিনের কমিক্স কিনে দেবে না, এসবও তখন চলবে না।
এসব বিষয়ে কখনও কখনও অবশ্য বড়োরা গোলমাল করে ফেলে। গতবছর যখন জগদ্ধাত্রী পুজোয় ভাসানের রাতে সে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে নেচে রাত দশটায় বাড়ি ফিরল, তখন জেঠু তাকে আধা ঘন্টা কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল উঠোনে। বলেছিল, সে নাকি 'নিমস্তক' হয়ে গেছে। তাই সারা রাত সে অন্ধকারে ওই ভাবেই উঠোনের আম গাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকবে, এই শাস্তি দেওয়া হল। তারপর জেঠিমা এসে বুঝিয়ে জেঠুকে শান্ত করল। সেও উঠে ঘরে গেল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, পরদিনই সকালে যখন জেঠু বাজারে যাবে বলে রেডি হচ্ছে, তখন সেই জেঠুই তাকে কিনা বলে বসল, "অনেক বড়ো হয়ে গেছিস, চল্ তো আমার সাথে বাজারে। ব্যাগ বইবি।" বোঝো! রাতারাতি সে তবে বড়ো হয়ে গেল! মুখে মুখে তর্ক করলে বা বড়োদের কথার পিঠে কথা বললে শুনতে হবে, "যাও পড়তে বোসো... ছোটোদের সব কথা শুনতে নেই" অথবা, "ছোটো ছেলে ছোটোর মতো থাকো..."; কিন্তু অঙ্ক না পারলে কিম্বা সকালে ঘুম থেকে উঠে চাদর পাট্ করে না রাখলে, সেই বড়োরাই তোমায় বলবে, "দিন দিন মাথাতেই বড়ো হচ্ছিস, বুদ্ধি-সুদ্দি কিছুই হচ্ছে না" অথবা বলবে, "এত বড়ো হয়ে গেলি, আর কবে শিখবি!" এইজন্যই পাপ্পুর মাঝে মাঝে মনে হয়, বয়সে বড়ো হলে, মানুষের মাথা ভালো কাজ করে না।
পাপ্পুর মা কুসুমিতা আজকাল 'আমার গণিত' বইটা আগাগোড়া কষিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় পাপ্পুকে একেবারে জেরবার করে তুলেছে। পাপ্পু কোনোদিনও পরীক্ষায় অঙ্কে ভালো করতে পারে নি। তোমরা যারা অঙ্কে বরাবরই ভালো, তারা পাপ্পুর কষ্টটা ঠিক বুঝবে না। কিন্তু তাই বলে আট বছরের ধাড়ি ছেলে স্কুলের ইউনিট টেস্টে অঙ্কে কুড়িতে সাত নম্বরও তুলতে পারবে না, এতটা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি কুসুমিতা। তাই ঘটনার পর গোটা একদিন কেটে গেছে, কিন্তু মা পাপ্পুর সাথে কথা বলছে না! মুখটা সব সময় কেমন থমথমে আর গম্ভীর, দেখলেই ভয় লাগে। মনে হয় এক্ষুনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। ভয়ে বাবা পর্যন্ত বেশি কথা বলছে না মা'র সাথে। সুতরাং পাপ্পুর অবস্থা বলাই বাহুল্য। দুশ্চিন্তায় রাতে ভালো করে তাই ঘুমই হলো না পাপ্পুর, যেটুকু বা হল, তাও দুঃস্বপ্নই দেখল সে... তাই সকাল সকাল উঠে মাকে খুঁজতে লাগলো স্যরি বলবে বলে। সে ঠিকই করে নিয়েছিল, এবার থেকে সে খুব কষে অঙ্ক প্র্যাকটিস করবে আর স্যার যা যা হোমটাস্ক দেবেন, সব সে সময় মতো খাতায় করে রাখবে।
কিন্তু মুশকিল হল ঘুম থেকে উঠেই সে দেখতে পেল ঘরটা পুরো ফাঁকা, তিনজনের বিছানাটায় সে একাই শুয়ে আছে। পাশের ঘরে জেঠু জেঠিমাও নেই। বারান্দা টপকে ওদিকের ঘরে ঠাকুর্দা থাকেন, সেই ঘরটাও ফাঁকা, সকালে এই সময়টায় তিনি বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়েন, কিন্তু তাঁর বদলে ইজি চেয়ারে রোদের মধ্যে বসে আছে একটা ধবধবে সাদা বিড়াল।
বিড়ালটা বসে বসে নিজেরই থাবা চাটছে। কাউকে কোত্থাও দেখতে না পেয়ে বাধ্য হয়ে পাপ্পু বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। ঘুরতে ঘুরতে চটি পায়েই সে চলে যায় বাড়ির পিছনের দিকে। গিয়ে দেখে ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছটায় তাদের বাড়ির কাজের মাসি রত্নাদি উঠে বসে আছে! তাকে দেখেই মুখ বেঁকিয়ে রত্নাদি বলে উঠল, "তাল, তেঁতুল কুল, বংশ করে নির্মূল।"
পাপ্পু থতমত খেয়ে বলল, "আমার মাকে দেখেছো?"
রত্নাদি সে কথায় পাত্তাই না দিয়ে থোকা থোকা তেঁতুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাটিতে ফেলতে লাগল। তেঁতুল গাছটা তাদের বাড়িটাকে আড়াল করে রাখে পশ্চিম দিক বরাবর। তাই তেঁতুল গাছটাকে পিছনে ফেলে পাপ্পু যেই বাঁদিকে অনেকটা ঘুরে গেল, অমনি পিছন ফিরতেই দূর থেকে দেখতে পেল, বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে তার মা এক মনে কাপড় মেলছে। অমনি পাপ্পু ছুটল ছাদের সিঁড়ির দিকে। কিন্তু যতক্ষণে সে ছাদে উঠেছে, ততক্ষণে বোধহয় মা কাপড় শুকোতে দিয়ে নেমে চলে গেছে। কারণ ছাদে চারিদিক থেকে দড়িতে জামা কাপড় ঝুলছে বটে কিন্তু মা কোত্থাও নেই। হতভম্ব হয়ে পাপ্পু আবার বাড়ির ভিতরে যায়।
এবার গিয়ে দেখে বিছানায় বসে তার মা এক মনে তার ড্রয়িং খাতায় কী সব করছে! ব্যাপারটা কী দেখার জন্য পাপ্পু খাতার পাতার উপর ঝুঁকে পড়ে আর অবাক হয়ে দেখে, তার আঁকার খাতা ভর্তি করে মা রঙ্ পেনসিল দিয়ে অঙ্ক কষেছে। ভারি অবাক হয়ে যায় পাপ্পু। মনে হচ্ছে সবগুলোই সঠিক। তার মা যে এতো ভালো অঙ্ক পারে, সে তো জানতো না! এরপর খাতা থেকে মুখ তুলতেই অবশ্য সে আরো অবাক হয়ে যায়, দেখে উল্টো দিকে বসে আছে তার অঙ্ক স্যার।
স্যার মায়ের খাতায় অঙ্কগুলোয় শুধু রাইটই দিলেন না, নিচে ভেরি গুড লিখে, স্মাইলিও এঁকে দিলেন। দেখে তো পাপ্পু অবাক! স্মাইলি পেয়ে মা'র কেমন লাগছে দেখবে বলে যেই না সে মুখ ফিরিয়েছে মায়ের দিকে, দেখে - ওমা! শাড়ি কোথায়! মা তো ফ্রক পরে বসে আছে ছোট্ট একটা মেয়ে হয়ে। তবুও যে মেয়েটাকে মা বলে চেনা যাচ্ছে, এর কারণ আর কিছুই নয় - সে আলমারিতে তুলে রাখা মায়ের একটা পুরনো অ্যালবামে এই ছবিটা দেখেছে বহু বার। সেই ছবিটায় মা ঠিক এইরকম একটা ফ্রক পরে বসে আছে।
তাই মাকে চিনতে কোনোই অসুবিধা হয় না পাপ্পুুুর। কিন্তু মুশকিল হল মা তাকে মোটেও চিনতে পারে না। পাপ্পু ছোট্ট মেয়েটির পিছন পিছন যায়, গিয়ে দেখে মামার বাড়ির যে ঘরটায় দাদাই থাকে, সেই ঘরটায় পৌঁছে গেছে। সে যে কী করে নিজেদের বাড়ি থেকে চট্ করে মামার বাড়িতে পৌঁছে গেল, কিছুতেই মাথায় আসে না পাপ্পুর। পাপ্পুর সামনেই দাদাই তখন একটা বড়ো প্লেটে করে চারটে শিঙাড়া আর কয়েকটা বড়ো বড়ো জিলিপি খেতে দিচ্ছে মেয়েটাকে। মেয়েটা অর্থাৎ পাপ্পুর মাও তখন গপ গপ করে শিঙাড়াগুলো খেতে শুরু করেছে। পাপ্পুর জিভে জল এসে যায় আর সে ভাবে তাকে কেউ একবার একটা খেতেও বলছে না! একথা ভাবতে ভাবতে তার চোখেও জল চলে আসে। সামান্য কয়েকটা অঙ্ক পারে নি বলে, এত্ত কষ্ট পেতে হবে তাকে! মন খারাপ করে পাপ্পু যেই না ঘর থেকে বেরিয়েছে, অমনি দেখে সামনে বাঘের মতো লাফ্ দেওয়ার ভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে আছে তাদের পাশের বাড়ির গুঁফো বিজুকাকুদের পোষা অ্যালসেশিয়ান, এলসা।
অদ্ভুত ব্যাপার এলসা মারা গেছে গত বছরেই। কিন্তু পাপ্পুর সামনে সে ঠিক আগের মতোই দাঁড়িয়ে। তার গলায় বাঁধা সেই সবজেটে বেল্ট। পেটের কাছ থেকে লেজ অব্দি কালচে রঙ্, আবার চোখের নিচ থেকে নাকের ডগা অব্দি ওই একই রঙ্, বাকিটা বাদামি। জিভটা বের করে হ্যা-হ্যা করছে। পাপ্পু যেই তাকে পাশ কাটিয়ে এগোতে যায়, অমনি সে তার পিছু নেয়। লাল একটা বারান্দায় ওঠে পাপ্পু আর এলসা। এলসা তার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে থাকে। এমন সময় বাবার গলা শোনা যায়, "সাত-আষ্টে কত?"
পাপ্পু মনে করতে পারে না। অমনি এলসার গলায় কেমন গরগর্ শব্দ শোনা যায়। তারপরেই সে ভয়ানক জোরে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে শুরু করে আর ধীরে ধীরে পাপ্পুর দিকে এগোতে থাকে। এবার পাপ্পু সত্যিই ভয় পেয়ে যায়।
এবার আবার একটা গলা শোনা যায়, জেঠু প্রশ্ন করে - "লব ৩ আর হর ৮ হলে, ভগ্নাংশটি কত হবে?"
পাপ্পুর মাথায় কিছুই ঢোকে না। তারপরই সে বুঝতে পারে, এলসা তার সামনের দু'টো পা তুলে দিয়েছে তার বুকের উপর। বুক ঢিপ ঢিপ করে ওঠে পাপ্পুর। পিছু হঠতে হঠতে পাপ্পু তখন পৌঁছে গিয়েছে বারান্দায় পাশাপাশি রাখা বিশাল তিনটে অ্যাকোয়ারিয়ামের কাছে। এলসার চোখ দু'টো যেন রাগে জ্বলছে।
ওদিকের ঘরের দরজায় তখন দাদাইকে দেখতে পায় সে। দাদাই একটা হাত তুলে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে, "মনে করো, তুমি বাজারে গেছো পাঁচশো ছত্রিশ টাকা নিয়ে, সেখানে কুড়ি টাকা কিলো আলু কিনলে দু-কিলো, তিরিশ টাকা কিলো পেঁয়াজ কিনলে পাঁচশো, পঞ্চাশ টাকা কিলো আম কিনলে দু-কিলো আর..." - দাদাইয়ের কথা শেষ হয় না, তার আগেই এলসার শরীরের চাপে সে একটা অ্যাকোয়ারিয়ামের দেওয়ালে এত জোরে চাপ দিয়ে ফেলে যে সেটার ভিতরে পড়ে যায়। কাচের দেওয়াল ভেঙে অ্যাকোয়ারিয়ামের জল হুড়মুড়িয়ে নামতে থাকে তার চারপাশ দিয়ে। মাছগুলো ছটফট করে খাবি খেতে থাকে। একটা 'নিয়ন টেট্রা' লাফিয়ে পাপ্পুর মুখে ঢুকে পড়ে।
এমন সময় কুসুমিতাকে আবার স্ব-মূর্তিতে দেখা যায়। পাপ্পুর ডান কানটা জোরসে পেঁচিয়ে কুসুমিতা হুকুম করে, "তিন দিয়ে বিভাজ্য দু'টো সংখ্যা বল এক্ষুনি..."।
বেচারা পাপ্পু! এরপরও কী ঘুমিয়ে থাকা যায়! এ'রকম হবে জানলে, ভোর রাত নাগাদ সে কক্ষনো ঘুমাতো না। ঘুম থেকে জেগে উঠেই সে বুঝতে পারে বিছানাটা ভিজে, অবশ্য অ্যাকোয়ারিয়ামের জলে নয়... । হিসু হয়ে গেছে বিছানায়। আর সে মোটেই নিজের বাড়িতে নেই। সজল চোখে চার পাশে তাকাতেই তার মনে পড়ে যায়, এটা রাঙাপিসির বাড়ি, সে ক'দিনের জন্য বেড়াতে এসেছে।
(২)
ডিম
তোমরা কেউ কখনো ভুঁইপুকুর গ্রামের বাঁশবাগানে গিয়েছ? গেলে বুঝতে... সে এক তাজ্জব জায়গা! দুপুর রোদে পাপ্পু সেখানে গিয়ে আটকে পড়ে। মাটিতে নরম বাঁশপাতার গদি। পাতা ঝরে পড়ে পড়ে মাটি ঢাকা পড়ে গিয়েছে গাছগুলোর নীচে। রোদ আসছে পাতাদের ফাঁক-ফোকর দিয়ে। আর তাতেই যেন জাদুর খেলা চলছে বাঁশবাগানে। মৃদুমন্দ বাতাসে গাছের পলকা ডালগুলো দুলছে। কঞ্চির গায়ে ছোটো ছোটো বাঁশপাতা, মাথাগুলোয় খুব ধার। জমিতে তাদের ছায়া দেখলে সাহসী লোকেও ভয় পাবে! যেন কোনো ভূতের হাতের লম্বা লম্বা বেঁকা বেঁকা আঙুল এগিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে কেমন মচ্-মচ্ - কোঁচ-কোঁচ শব্দ!
এদিকটায় বোধহয় কেউ আসে না! রাঙাপিসির বাড়িতে একেবারে 'কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা...'; নিষেধ করার কেউ নেই। পিসে অফিস চলে গেল আর পিসি কানে হেডফোন দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এখন গ্রীষ্মের ছুটি, তাই জীবনে এই প্রথমবার পাপ্পু মায়ের শাসন থেকে দূরে, সক্কলের চোখের আড়ালে, এই দিকশূন্যপুরে একা। মা বলে দিয়েছে, "বড়ো জোর তিনদিন রাঙাদি। তার বেশি নয়। এমনিতেই পড়াশোনা করাতে হয় ধরে বেঁধে। বাড়ির বাইরে গেলে তো হয়েই গেল।"
"তোদেরও শাসন বলিহারি! বলি তুই যখন ছোটো ছিলি, সারাদিন পড়তি? তাহলে ওকে একটু খেলতে-ধুলতে দে-না বাপু! এর পর তো শুধু ইস্কুল আর কোচিং শুরু হবে।"
মাকে পিসি তুই-তোকারি করে। পিসি বড়ো, খুব ফর্সা বলে ওরা বলে রাঙাপিসি, মা-বাবা বলে রাঙাদি। রাঙাপিসির বর, পিসে গ্রামের পোস্টমাস্টার। ভুঁইপুকুরে চাকরি করতেই যাওয়া, তারপর কোনোদিন বদলি হয়ে গেলেই সব গুটিয়ে চলে আসতে হবে। একটা দোতলা বাড়ির উপরতলায় তিন কামরা নিয়ে ওরা ভাড়ায় থাকে। বাড়িওয়ালা বেহালার বাসিন্দা, গ্রামের বাড়ি ভাড়া দিয়ে আর জ্ঞাতি বসিয়ে আগলে রেখেছে।
জায়গাটা ভারি সুন্দর, তাই মা আর আপত্তি করে নি। দুপুরে ভাত, ডাল, আলু-পটলের তরকারি, চাটনি আর দই খেয়ে পাপ্পুকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পাশের ঘরে পিসিও শুয়ে পড়েছিল। কে জানবে যে পাপ্পু ঘুমিয়ে পড়ার অভিনয়টা ভালোই করে!
পা টিপে টিপে দোতলা থেকে নীচে নেমেই দে দৌড়। আরে নতুন জায়গাটা এক্সপ্লোর করতে হবে না! তারপর খালের পাড় ধরে সোজা এই বাঁশবাগান। ঢুকেই রোমাঞ্চিত পাপু আটকে পড়ে। এমন জায়গায় তো সে কখনো আসে নি! সুরুৎ করে কি ছুটে গেল ওটা! ইঁদুর না কি বেজি?
জন্তুটার পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে আধো অন্ধকার বনের গভীরে ঢুকে পড়ে পাপ্পু। গাছগুলো এখানে মোটা আর পাকা। কয়েকটা ভেঙে পড়ে গেছে। এক জায়গায় পরপর তিনটে বাঁশগাছ ভাঙা। আর তারই ফাঁপা কাণ্ড তিনটে জুড়ে রয়েছে তিনখানা পেল্লায় সাইজের ডিম! দেখে পাপ্পুর চোখদুটো গোলগোল হয়ে গেল। কীসের ডিম ওগুলো?
এরকম ডিম আবার হয় না কি! সাদা তো নয়ই, লালচে ডিম তিনটের উপরে গাছের শিকড়ের মতো নকশা! ভিতরে কি কোনো পাখির ছানা? জুরাসিক পার্ক সিনেমায় যেসব উড়ুক্কু পাখি দেখেছে, সেই রকম কিছু? ভয়ে ভয়ে পাপ্পু আরেকটু এগিয়ে যায়। ডিমগুলো যেন তাকে চুম্বকের মতো টানছে। হয়তো সে আবিষ্কার করে ফেলল কোনো অজানা প্রাণীর ডিম! কাগজে তার ছবিও বেরোতে পারে! ইস্! পিসির মোবাইলটা যদি হাতে করে আনতো! তবে এনেও লাভ হত না... পাসওয়ার্ড জানে না। তার নিজের তো এখনও ফোন হয় নি।
সাহস সঞ্চয় করে পাপ্পু পা বাড়ায়। একটা ডিম আলতো হাতে ছুঁয়ে দেখে। গায়ে শিরশিরানি নিয়ে পাপ্পু একটা ডিম হাতে তুলে নেয়। কী ভারি! উফ! এই জিনিস যদি সে ক্লাসের বন্ধুদের দেখাতে পারে... হিরো হয়ে যাবে সে! ভেবেই পুলকে পাপ্পুর মন নেচে ওঠে।
ডিম হাতে নিয়ে পাপ্পু একটু সময় নেয়। তিনটে ডিম। একটা নিলে ক্ষতি কি? এমনিতেই হয়তো গিরগিটি বা বেজিতে ভেঙে খেয়ে ফেলত। সে যদি একখানা নিয়ে যায় আর ছানা বেরোতে দেখে, তাতে তো ক্ষতি কিছু নেই। তারপর ছানা যদি পোষ মানে, পুষবে।
পাপ্পু ভালো করে ডিমটা দু'হাতে ধরে পায়ে পায়ে পিছিয়ে আসে। হঠাৎ চমকে ওঠে সে, পাতার স্তূপের উপর দিয়ে সরসর করে কী যেন চলে গেল! কোনো সরীসৃপ? কী? এদিক-ওদিকে সতর্ক চোখ বুলিয়ে কিছুই দেখতে পায় না পাপ্পু, তাকে হঠাৎ তীব্র ভয় পেয়ে বসে। গলা শুকিয়ে আসে তার। ডিম চুরি করছে সে, সাপ-টাপ হলে কামড়ে দেবে না তো? ওগুলো কি তবে ময়াল বা অজগরের? জানে না পাপ্পু... ছবি তুলে গুগল সার্চ দিলেই জানা যাবে। পাপ্পু ডিম চেপে ধরে দৌড়য়, বাঁশপাতা আর ঝুঁকে পড়া কঞ্চির ঘষা লেগে কয়েক জায়গায় ছড়ে যায় তার। দৌড়তে দৌড়তে একসময় বাঁশবাগানের বাইরে বেরিয়ে আসে সে, তারপর চারপাশে তাকিয়ে ভালো করে দেখে নেয়।
গ্রামে এ-সময় চারিদিকে নিস্তব্ধতা। কাউকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ডিমটাও বড্ড ভারি ভারি ঠেকছে। পাপ্পু ঘেমে গেছে, মার্চ মাস তাই সেরকম গরম এখনও পড়ে নি। তবে এই ডিম আর হাতে রাখা যাবে না। সে সাবধানে দোতলায় পিসির ঘরে ঢুকে দেখে, পিসি ঘুমাচ্ছে। নিজের ঘরে যায় সে। ব্যাগ থেকে সব কিছু বের করে খাটের এক কোণে রাখে। আর তারপর ডিমটাকে ওই ব্যাগে ঢুকিয়ে, চেন অর্ধেক খোলা রেখে দেয়। তারপর হাত ধুয়ে, বিছানায় উঠেই ভালো ছেলের মতো শুয়ে পড়ে। জানতেও পারে না, পিসি তার থেকেও ভালো ঘুমের অভিনয় পারে। তার অজান্তেই পিসি তাকে বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছে। ভুঁইপুকুরে বিপদ কিছু নেই... যদি একটু এদিক-ওদিক ঘুরে আসে, আসুক না। লোকজন ভালো, বেশি দূর চলে গেলে কেউ না কেউ ঠিকই বাড়ি পৌঁছে দেবে। পোস্ট-মাস্টার রতন হাজরাকে তো সকলেই চেনে।
কিন্তু আধ ঘন্টা হয়ে গেলেও পাপ্পু ফিরছে না দেখে, রাঙাপিসিও টেনশনে পড়ে যায়। খাট থেকে নামবে বলে উঠতে যাবে, এমন সময় সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পায় রাঙাপিসি। এ নিশ্চই পাপ্পু, ভেবেছে পিসি কিছু জানে না। তাই হোক্, পিসি তেমনি শুয়ে থাকে বিছানায়। ডিম হাতে পাপ্পুকে দেখে এক ঝলক। তারপর চুপিসারে উঠে এসে দাঁড়ায় পাপ্পুর ঘরের দরজার পাশটিতে। নিজের ছেলেপুলে হয় নি। বড়ো মমতা হয় পুঁচকেটাকে দেখে। কিন্তু ওইটুকু ছেলে এতটুকু সময়ের মধ্যে অতো বড়ো ডিমখানা পেল কী করে! তাছাড়া সাপ-টাপ নাকি কীসের ডিম কে জানে বাপু! নাহ্ এ জিনিস তো দেখেও অদেখা করা যায় না। পিসে ফিরলেই বলতে হবে।
(৩)
বিশুবাবু
"হ্যাঁ গো, তুমি কি কিছুই করবে না? কেবল গালে হাত দিয়ে বসেই থাকবে?" - রাঙাপিসির প্রশ্নে রাগের আভাস পেয়ে পিসে নড়েচড়ে বসে।
পিসে এমনিতে বড্ড ভালো মানুষ। বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন জায়গায় হরেক রকম ঠাকুরের ছবি ফ্রেমে ঝুলছে, তাছাড়া আছে ঠাকুরঘর। পিসে ঘুম থেকে উঠে, স্নান সেরে, ভাত খেয়ে অফিসে যাওয়ার আগে প্রত্যেক দিন সমস্ত ঠাকুরের উদ্দেশ্যে বারংবার প্রণাম করতে থাকে। মনে মনে বিড়বিড় করে কী যে বলে, তা অবশ্য শোনা যায় না! তা এরকম ধর্মপ্রান মানুষ হয়ে যখন আশ্চর্য ডিমের বিবরণ শোনে ও ভুঁইপুকুরে প্রথমবার আসা পাপ্পুর দুঃসাহসী অভিযানের বিষয়ে জানে, পিসে একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। পিসে অর্থাৎ গ্রামের পোস্টমাস্টার রতনবাবু মাথায় এত ধকল একেবারেই নিতে পারেন না।
অবশেষে জল-টল খেয়ে, চাপা গলায় পিসে বলে, "ডিমটা কোথায়? একবার দেখতে পারি?"
"দেখাতেই পারি... কিন্তু আমার ভাইপোটি যে কেমন রিঅ্যাক্ট করবে, সেটা বুঝতে পারছি না। বাচ্চা ছেলে, না বুঝে কী না কী এনে ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছে। এখন যদি ওই ডিম সাপ-খোপ বেরিয়ে আসে?"
"তুমি তো সমস্যাই বলছ কেবল... সমাধানটা বলো!"
"সবই আমি বলব? তুমিও একটু চেষ্টা করো না..."!
অতঃপর দু'জনে মিলে একসাথে ডিম উদ্ধারে যায়। পাপ্পু মোটেও বোকা না। সেও বুঝে গেছে, সে ধরা পড়তে চলেছে। তাই ভালো-মানুষের মতো সেই ব্যাগ থেকে ডিম বের করে সামনে আনে।
ডিম গরমও না, ঠান্ডাও নয়। তার গায়ের লালচে রঙ্ ঘরের আলোয় আরেকটু গাঢ় বলেই মালুম হয়। শিকড়ের মতো যে ডিজাইন, সেটা ঈষৎ হালকা লাগে তাতে। পিসি আর পিসে দু'জনেই সেই বিকট দর্শনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
প্রায় দু'মিনিট পর পিসে সম্বিত ফিরে পায়। পিসিকে বলে, "একমাত্র উপায় বিশুবাবু।"
"কে বিশুবাবু?"
"আরে ওই তো কাঁচা-পাকা চুল, বৃদ্ধ মানুষ, শৈবালবাবুর বাবা, কলেজে পড়াতেন... মনে নেই? শৈবালবাবুর ছেলের অন্নপ্রাশনে গিয়ে আলাপ হল! শুনেছি ওনার বিষয় ছিল অ্যান্থ্রপোলজি।"
"হ্যাঁ মনে পড়েছে! কিন্তু বয়স হয়েছে, উনি কি এসব ফালতু ঝুট-ঝামেলায় আসবেন?"
"ফালতু! না মনে হয়... বয়স হলেও লোকটার এখনো পড়াশোনায় যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। রতনপুর সাধারণ পাঠাগারে নিয়মিত যান বলে শুনেছি। আমার তো মনে হয় এই অদ্ভূতুড়ে ডিমখানি দেখলে উনি নিজেই আগ্রহ বোধ করবেন!"
"ডাকো তাহলে... আর একটু ভালো মিষ্টি কিছু কিনে এনো।"
"ধুর্! পাগল হলে? বয়স্ক মানুষ। সুগারের পেশেন্ট। বাড়িতে এলে ভাজাভুজি কিছু করে দিও।"
কথাবার্তা তখনকার মতো ওইটুকুই এগোয়। রাঙাপিসি যায় রান্নাঘরে। সন্ধ্যা হয়েছে, গ্রামের পথে স্ট্রীট লাইটের বালাই নেই। পিসে হাতে টর্চ নিয়ে, বিশুবাবুর সন্ধানে বেরিয়ে যায়। পাপ্পু একা ডিমের দিকে তাকিয়ে বসে বসে ভাবতে থাকে, বিশুবাবু এসে না জানি এই রহস্যের কী সমাধান বের করবেন!
ঠিক এ'সময় পাড়ায় বিদ্যুৎ চলে যায়। লোডশেডিং-এ ঘরে অন্ধকার হয়ে উঠতেই একেবারে আঁতকে ওঠে পাপ্পু। তার হঠাৎই মনে হয় ডিমটায় যেন চিড় ধরছে। কোনো বিদঘুটে বিকট সরীসৃপ না জানি এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ওর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে চলেছে। মায়ের থেকে ওকে আলাদা করেছে পাপ্পু, ও কি আর পাপ্পুকে ছেড়ে দেবে!
(8)
মধ্যরাত্রির বিভীষিকা
রাত তখন দু'টো হবে। পাপ্পুর ঘুম এমনিতে গভীর হলেও রাঙাপিসির বাড়িতে আসার পরই তার ঘুমের সমস্যা হচ্ছে। বারবার ঘুম ভেঙে যায়, দুঃস্বপ্ন দেখে। প্রথম রাতেই বিছানায় হিসু করে ফেলে যাচ্ছেতাই লজ্জায় পড়তে হয়েছিল পাপ্পুকে, তারপর থেকে সে ভয়ে জল কম খাচ্ছে। রাঙাপিসি অবশ্য খুবই ভালো, বিছানার একটা পাশ ভিজে দেখেও কিছুই বলে নি। একবার শুধু চোখ পাকিয়ে বলেছে, "তুই কী রে! ধেড়ে ছেলে!" ব্যাস ওটুকুই। মা থাকলে হয়তো ওকে দিয়েই সব চাদর-তোষক কাচাতো! এই জন্যই পাপ্পুর গতকাল থেকে মনে হচ্চে, ভুঁইপুকুরে থেকে যেতে পারলে কতই না ভালো হতো।
ওদিকে বিশুবাবু রাতে আসেন নি। পিসে গিয়েছিল, সব কথা খুলেও বলেছে। কিন্তু বিশুবাবু নাকি ব্যাপারটায় অতটা গুরুত্বই দিতে চান নি। প্রথমে সব শুনে শেষে হেসে বলেছেন, "ছেলেমানুষের ব্যাপার। দেখুন হয়তো স্কুল প্রজেক্টের জন্য বানিয়েছে, রঙ-টঙ করা আর আকারে একটু বড়ো বলে আপনারাও মিছিমিছি ভয় পেয়ে গেছেন। এতটা সিরিয়াস হওয়ার মতো কিছু হয় নি। ঠিক আছে, সকাল হোক, যাবো খন।"
বুড়ো মানুষ, নিজে থেকে যেতে চাইছেন না। তাছাড়া কারেন্টও চলে গেল, অন্ধকারে কোথাও পড়ে গেলে রতনবাবু কাকে কী জবাব দেবেন? তাই তিনিও আর জোর করেন নি। বিদায় নিয়ে বাড়ি চলে এসেছেন।
তারপর রাত হয়েছে। সবাই এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া সেরে শুতে যাওয়ার সময় রাঙাপিসি বলল, "কী রে! একা শুবি নাকি আমি তোর সাথে শোব?"
পাপ্পু বলেছে, "না না আমি একাই শুতে পারব..."
পিসিও আর জোর করে নি। যে যার মতো শুয়ে পড়েছে।
রাত গভীর হয়েছে। জানালার কাছে ব্যাগ, ব্যাগের ভিতর আশ্চর্য সেই ডিম। আকাশে তারার দেখা নেই। গরম যে খুব, তা নয়। ঠান্ডা বাতাস বইছে মাঝে মাঝে। একটা জানালা খোলা, ঘরে বাতাস আসছে। রাতে বিদ্যুৎ যদিও ঘন্টা দেড়েক পরেই চলে এসেছিল। উপরে ফ্যানও ঘুরছে। পাপ্পুর শীত করে, সে পাতলা চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নেয় গায়ে। তার ঘুম আজ খুব পাতলা, খালি কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। ঘরে একটা নীলচে নাইট বাল্ব জ্বলছে। তার আলোয় জানালা অবধি ভালো করে দেখা যায় না। আকাশের চাঁদও বোধহয় মেঘে ঢাকা পড়ে গিয়েছে।
জানালায় গাছেদের ছায়া নাচছে, বাতাসে যেন কোনো অশরীরীর দীর্ঘশ্বাস। পাপ্পুর আচমকা ঘুম ভেঙে যায়। জানালার কাছে ওটা কী! নাহ্ চোখের ভুল মনে হয়।
পাপ্পু আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ জানালার নীচে একটা মৃদু শব্দ, যেন কিছু ফাটল... চমকে জেগে উঠল পাপ্পু। তারপরই ঘটনাটা ঘটল। প্রায় ঝড়ের গতিতে ঘরের মধ্যে একটা কিছু দৌড়ে গেল। ঠিক দৌড়েও বলা চলে না, যেন বাতাসে ভেসে ভেসে পাক খেল। এত জোরে অন্ধকারে পাক খেল যে সেটা কী বা কেমন দেখতে, কোনোটাই বুঝে উঠতে পারল না পাপ্পু। ভয়ে তার হাত-পা শক্ত হয়ে গেছে। বিছানা থেকে নামতেই ভয় লাগছে। তার মিনিট পাঁচেক পর জানালার বাইরে একটা ঝটপট শব্দ। ওদিকটায় কয়েকটা টব রাখা আছে, একটায় তুলসী গাছ আর অন্যগুলোয় অর্কিড। মনে হল যেন কিছুটা বাতাস ওইখানে আটকা পড়েছে। নির্ঘাৎ খানদুই টব ভাঙল। তারপর সব চুপচাপ। থমথমে ছোটো ঘরটায় পাপ্পু বুকের কাছে দুই হাঁটু জড়ো করে অনেকক্ষণ চুপটি করে বসে রইল। তার খুব মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছিল তখন।
তারপর কখন সে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম থেকে জেগে উঠল অনেকগুলো লোকের কথার শব্দে। ছোটো ঘরটায় তখন পিসে ছাড়াও আরও তিনজন লোক, যাদের কাউকেই পাপ্পু চেনে না। তবে ঘুম চোখেও কাঁচা-পাকা চুলের সবচেয়ে বুড়ো মানুষটিকে দেখেই পাপ্পু আন্দাজ করল, এই নিশ্চই বিশুবাবু। জানালার কাছে ভাঙা ডিমের চটচটে খোলাটা হাতে তুলে ধরে তেরচা রোদ্দুরে খানিকক্ষণ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে নিয়ে, আনুমানিক বিশুবাবু মন্তব্য করলেন, "মধ্যরাতের বিভীষিকা"!
(৫)
হলো আর্থ
পাপ্পু মুখ-টুখ ধুয়ে এসে, ফ্রুট জুস্ আর শিঙাড়া খেতে খেতে রাতের অভিজ্ঞতা বিস্তারিত বলল। শৈবালবাবু আর বিশুবাবু ততক্ষণে শৈবালকাকু আর বিশুদাদুতে পরিণত হয়েছেন পাপ্পুর কাছে। দুজনেই অমায়িক, তাই পাপ্পু নিশ্চিন্তে তাঁদের কাছে মনের কথা খুলে বলতে পেরেছে।
বিশুদাদু সঙ্গে করে এনেছেন তাঁরই সমবয়সী প্রফুল্ল মন্ডলকে। দু'জনে প্রতিদিন মর্নিং ওয়াকে বের হন ভোর ছ'টা - সাড়ে ছ'টা নাগাদ। কিন্তু সকাল সাতটা নাগাদ পিসের ফোনটা পেয়ে আর আতঙ্কিত গলা শুনেই শৈবাল কাকু ছুটেছিলেন হতদন্ত হয়ে দু'জনকে ডাকতে। ভুঁইপুকুরের নামকরণ যে জলাশয়কে কেন্দ্র করে, সেই বিরাট পুকুরটার পাশে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ছেলে শৈবালকে ছুটে আসতে দেখে সত্যিই বিচলিত হয়েছিলেন বিশুদাদু। তারপর সব শুনে ছেলেকে জানিয়েছিলেন, আর যেন কোনোভাবেই লোক-জানাজানি না হয়। তারপরে প্রফুল্লদাদুকে সঙ্গে নিয়ে বাবা-ছেলে মিলে সোজা চলে আসেন পিসের এখানে। পিসেই সকালে উঠে সবকটা জানালা খুলতে গিয়ে প্রথম দেখে যে ডিমটা ফাটা, তার ভিতরে আর বাইরে কেমন নীলচে-সবুজ চটচটে জেলি জেলি জিনিস পড়ে আছে। আর ঘরের দেওয়ালে যেন সেই জেলি দিয়েই মোটা ব্রাশে কেউ দৌড়ে এক টান মেরে দিয়েছে। কয়েকটা একই রকম পায়ের অস্পষ্ট ছাপও উদ্ধার করেছেন পরে দাদুরা মিলে। সে'সবের ছবিও তোলা হয়েছে মোবাইলে। কিন্তু বিশুদাদু বারবার বলছেন, এসব কথা যেন জানাজানি না হয়।
এরপর শৈবালকাকু বেরিয়ে গেলেন, তাঁর অফিসে অডিট চলছে। পিসে ছুটি নিলেন আর রাঙাপিসি গেলেন সকলের জন্য লুচি ভাজতে। তারপর তিন সিনিয়র ও এক জুনিয়র মিলে বসল গোলটেবিল বৈঠকে।
বিশুদাদু বললেন, "কী হে প্রফুল্ল এতদিন তো জীববিদ্যা নিয়ে মাস্টারি করলে। কী মনে হচ্চে?"
"আমরা আর কতটুকুই বা জানি! তাছাড়া গ্রামের প্রবীণদের মুখে মুখে কিছুকাল আগেও যেসব কথাবার্তা বা গপ্পো শোনা যেত, সেও তো তোমার অজানা নয়।"
পিসে কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, "কোন্ গল্পের কথা বলছেন বলুন তো?"
প্রফুল্লদাদু হেসে বললেন, "পোস্টমাস্টার, সেসব বললেও কি তোমার বিশ্বাস হবে?"
বিশুদাদু বললেন, "আমিই বলছি শোনো... গ্রামের পুরোনো লোকশ্রুতিতে জানা যায় এক বিশাল আকারের গিরগিটির কথা। তার মাথা যেমন বড়ো, তেমনি বড়ো লেজ। বছর তিনেক হল এ গাঁয়ে আছো, তাই হয়তো তুমিও খেয়াল করে থাকবে, ওই বাঁশবাগানের ওপারে কেউ যায় না। আর তোমাদের কাছে যতটুকু শুনলাম তোমার ভাইপো শ্রীমান পাপ্পু ওইখানেই গিয়েছিলেন এবং সম্ভবত সেই বিচিত্র গিরগিটির কোনো বংশধরের একখানি ডিম চুরি করে এনেছেন। সুতরাং এই ভেবে নিশ্চিন্ত হও যে, সে আপদ নিজেই বিদায় হয়েছে আর পাপ্পুর কোনো ক্ষতিও হয় নি।"
চা এল, সঙ্গে জলখাবার। চা তুলে নিয়ে পিসে নিশ্চিন্ত মুখে বলল, "আপনি সত্যিই বিশ্বাস করেন এমন কিছু এখনও আছে?"
"থাকবে নাই বা কেন? পরশু রাতে আমার ঘরে টিউবলাইটের উপরে একটা বিচিত্র মথ বসেছিল, আকারে অনেকখানি বড়ো। হালকা সবজেটে রঙ্, স্বচ্ছ পাতলা দু'টো ডানা পিঠের উপর পাতা আর আরো দু'টো ডানা দুইপাশে মেলে দেওয়া। ওই জিনিস আমার জীবনে আমি প্রথম দেখলাম। এবার বলো, সে এল কোথা থেকে?"
প্রফুল্লদাদু নিজের মোবাইলের গ্যালারি থেকে খুঁজে শিয়ালের মতো একটা প্রাণীর ছবি দেখালেন। বললেন, "বছর পাঁচেক আগের কথা। তোমরা তখনো এখানে আসো নি... সে'বার এই জন্তুটি দাসপাড়ায় মুরগির পোল্ট্রিতে ঢুকে আটকে পড়েছিল তারের জালে। শিয়াল বলে মনে হলেও এ জিনিস কিন্তু শিয়াল নয়, খেয়াল করে দেখো এর মাথায় দু'টো ঢিবি, ঠিক যেন শিং গজাবে। আর ছোটো লেজটা চেরা। ছবিতে নেই, কিন্তু জিভ ছিল সবুজ রঙের। ক'দিন বাবলা দাস ওর উঠোনে জন্তুটাকে বেঁধে রাখল। আশপাশের বহু গ্রামের লোক ভিড় জমিয়েছিল তাকে দেখতে। তারপর খবর পেয়ে বনদপ্তরের লোকেরা এল, নিয়ে চলেও গেল। তারপর জানা গেল, সেটা বাঁচে নি, মারা গেছে।"
"আমাদের থিওরি হচ্চে, এরা হলো আর্থের বাসিন্দা।" - বিশুদাদু মন্তব্য করলেন।
"হলো আর্থ? সেটা আবার কী?" - উত্তেজিত পাপ্পু জিজ্ঞেস না করে পারল না।
"সেটা বলতে হলে তো অনেক কথা বলতে হয়..." - গম্ভীর মুখে মন্তব্য করলেন বিশুদাদু।
এই সময় সভায় এসে যোগ দিল রাঙাপিসি। কোনো প্রশ্ন না করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।
বিশুদাদু লুচি - সাদা আলুর তরকারি মুখে পুরে শুরু করলেন, "দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে তখন। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, ব্রিটিশদের জায়গাটা ক্রমশ দখল করছে তারা। অপারেশন হাইজাম্প অর্থাৎ যার পোশাকি নাম 'দ্য ইউনাইটেড নেভি আন্টার্টিক ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম', সেটি আমেরিকা এই সময় শুরু করে। আটষট্টি নম্বর আমেরিকান নেভি টাস্ক ফোর্স এই পুরো অপারেশনের দায়িত্বে ছিল। আন্টার্কটিকায় অর্থাৎ দক্ষিণ মেরুতে লিটল আমেরিকা ফোর নামের একটা রিসার্চ বেস, যেখানে মূলত গবেষকরাই থাকেন, সেখানেই প্রাথমিকভাবে শুরু হবে এই অপারেশন... এমনটাই ঠিক ছিল। বুঝতে হবে সেখানে এই মার্চেই দিনে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে চল্লিশ ডিগ্রী, রাতে আরও অনেকখানি শীত। সবসময় ঝোড়ো ঠান্ডা বাতাস বইছে আর হাড় অব্দি কাঁপিয়ে দিচ্ছে। অথচ সে'খানেই ৪৭০০ জন মিলিটারি, ৭০টা জাহাজ ৩৩টা এয়ারক্রাফট্ রওনা দিল।"
প্রফুল্লদাদু বাধা দিলেন, "অনেকের মতে ১৩টা জাহাজ, ২৩টা এয়ারক্রাফট্। মানুষের সংখ্যা নিয়ে যদিও কোনো মতভেদ নেই।"
বিশুদাদু হেসে বললেন, "তা ঠিক। যাই হোক এবার বলি... অ্যাডমিরাল রিচার্ড বার্ড সাহেবের তত্ত্বাবধানে মিশন শুরু হল সাউথ পোলে। অ্যাডমিরাল রিচার্ড বার্ড প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, অসম সাহসী। তিনি ঠিক করলেন, একাই একটা প্লেনে চেপে উড়ে বেড়াবেন আর খতিয়ে দেখবেন সেইখানকার হাল-হকিকত। অপারেশন হাইজাম্প ছাব্বিশে অগাস্ট, ১৯৪৬ থেকে প্রায় এক বছর কাল অবধি চলেছিল। উদ্দেশ্য কেবল জ্ঞানের প্রসারই নয়, নানা যন্ত্রপাতির প্রয়োগ ক্ষমতার পরীক্ষা নিরীক্ষাও বটে। বলাই বাহুল্য নিউক্লিও অস্ত্রও ছিল আমেরিকা হাতে। ১৯৪৮ সালে একাডেমি আওয়ার্ড জেতা একটা ডকুমেন্টারিও তৈরি হয়েছিল ওই ঘটনা নিয়ে। মিলিটারির ফটোগ্রাফাররা মিলে ওই 'সিক্রেট ল্যান্ড' নামক ডকুমেন্টারিটা শুট করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে অ্যাডমিরাল বার্ড ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সার্ভিসকে দেওয়া একটা ইন্টারভিউতে জানান, তিনি দক্ষিণ মেরুতে এমন কিছু দেখেছেন যা আমেরিকার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম। খুব স্পষ্ট করে না বললেও, তিনি যা বলেছিলেন তার থেকে মনে হতেই পারে তিনি ইউ.এফ.ও. দেখেছেন। তিনি বলেছিলেন দক্ষিণ মেরুতে এমন কিছু দেখেছেন তিনি, যার গতি আমাদের কল্প বিজ্ঞানের গল্পের সামিল। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর মধ্যে যাতায়াতের কোনো অত্যাধুনিক পথ সম্পর্কে মতামত জানিয়েছিলেন বার্ড, সেই পথ দিয়ে মুহুর্তের মধ্যে ওই যানগুলি চলাচল করে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।"
"তারপর? তারপর কী হল?" - এতক্ষণে পিসেও উত্তেজিত।
ডিমের খোলাটা রাখা ছিল টেবিলের নীচে একটা চুবড়িতে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বিশুদাদু বললেন, "অ্যাডমিরাল বার্ড নাকি ক্রিস্টাল-নির্মিত রামধনু-রঙা একটা গোটা শহর পৃথিবীর পেটের ভিতর দেখেছিলেন, অন্তত তাঁর ব্যক্তিগত ডায়রিতে তাই লিখেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পরে ব্যক্তিগত কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে তাঁর ছেলে সেটি আবিষ্কার করেছিল। তাঁর কথা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা ভবিষ্যতের বিজ্ঞান বলবে। তবে প্লেন থেকে সাউথ পোলের উপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে কোনো এক দুর্গম স্থানে বরফের আস্তরণের মধ্যে আচমকা তিনি একটা বড়ো গর্ত দেখতে পান। তাঁর মাথা বিপদ সংকেত বুঝলেও মন চাইছিল রহস্য ভেদ করতে। তিনি আরো নীচে নেমে আসেন এবং আবিষ্কার করেন ওই গর্তের ভিতর দিয়ে অনায়াসে তিনি প্লেন সমেত চলে যেতে পারেন। দুঃসাহসী মানুষ, করলেনও তাই। সেই ফাইটার প্লেনে চেপে তিনি ভিতরে চলে গেলেন আর একেবারে চমকে গেলেন। একেই আমরা হলো আর্থ বলছি। এই থিওরি অবশ্য আরো অনেক অনেক প্রাচীন। ডেভিড স্ট্যান্ডিস-এর বইও আছে এর উপরে। নানা দেশের কিংবদন্তি, ধর্ম, পুরাণ ও লোককথায় এর উল্লেখ আছে। কেল্টিক মাইথোলজিতে গুহার কথা জানা যায়, যেটা নাকি নরকে যাওয়ার প্রবেশদ্বার। অনুমান করতে পারো, কী বলতে চাওয়া হচ্ছে! হিন্দুদের পুরাণে যে পাতাললোক, নাগলোক ইত্যাদির কথা আছে, সেগুলোই বা কোথায়? যদি হলো আর্থ থিওরি মেনে নাও, তাহলে দেখবে সব সমস্যার সমাধান বেরিয়ে গেছে। রামায়ণে অহিরাবণের কাহিনি যারা জানে তারাও এটা মানবে, থাইল্যান্ডের পুরাণে তাকে মাইয়ারাপ বলা হয়।হনুমান সে যাত্রায় রাম-লক্ষ্মণকে অহিরাবণের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছিলেন। ১৬৯২ সালে এডমন্ড হ্যালি একটা বিচিত্র তত্ত্ব খাড়া করেন। সেখানে তো আবার পৃথিবীর পেটের ভিতর, পেটের ভিতর আরো অনেক পেট। লে ক্লার্ক মিলফোর্ট নামক এক অভিযাত্রী বিশ্বাস করতেন এবং বলতেন, সেকালের এক নেটিভ আমেরিকান জনজাতি নাকি হলো আর্থ থেকেই উঠে এসেছিল ভূপৃষ্ঠে। জন ক্লিভস্ নামক এক আমেরিকান আর্মি অফিসার পরে দাবি করেছিলেন, পৃথিবীর দুই মেরুপ্রদেশেই নাকি হলো আর্থ-এ যাওয়ার প্রাকৃতিক সুরঙ্গ রয়েছে। সেখান থেকে ইউ.এফ.ও. বেরিয়ে আসে আর মাঝ রাতে তাদের উপর হামলা চালায়। এখন ঘটনা হলো পাপ্পুবাবুর উপরেও হামলা চালানো হয়েছে মাঝরাতে। তবে যেটি হামলা চালিয়েছে, সেটি নির্ঘাত ওই ডিমের মধ্যে বসবাসকারী কোনো গিরগিটি জাতীয় প্রাণী। তবে তার গতি এবং শক্তি - দু'টোই প্রমাণ করে সে আমাদের এই চেনা পৃথিবীর কেউ নয়। হয়তো তারা নিরাপদে হলো আর্থেই থাকতে চায়। কিন্তু আমরা শান্তিতে থাকতে দিচ্ছি কই? আমাদের চারপাশেই দেখ না কত পরিবর্তন... গাছ কেটে ফেলছো বন ধ্বংস করছো... কেউ ভাবছো না যে জঙ্গলের প্রাণীগুলো যাবে কোথায়! পৃথিবীটা যে কেবল মানুষের একার নয়, তা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে যাই। এর প্রভাব যেমন পড়ছে ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের উপর; হয়তো আমাদের অজান্তেই এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর নীচে বসবাসকারী হলো আর্থের উপরেও। তাই তারা মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসতে চাইছে বা বলা ভালো বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। আশা করি বোঝাতে পারলাম।"
"যেমন গডজিলা?" - পাপ্পু প্রায় চিৎকার করে উঠল।
প্রফুল্লদাদু বললেন, "দাদুভাই মনে রাখবে যে কোনো গল্পই তৈরি হয় কল্পনা থেকে। কিন্তু কল্পনারও তো একটা শিকড় থাকে, মনে করো এই গল্পের শিকড় আছে হলো আর্থে। 'কাইজু' বা গডজিলা তেমনি এক কল্পনা, যার মূল এখনও মানুষের অধরা। অথবা এক সময় হয়তো মানুষ তা জানতো, এখন সেই জ্ঞান হারিয়ে গেছে।"
"নাও অনেক কথা হলো। এবার উঠি। আর বৌমা, ওই ডিমের খোলাটা আমি নিয়ে গেলাম। ওই জিনিস ঘরে রেখে দিলে আবার সেই সরীসৃপ এসে উপদ্রব করতে পারে। তার থেকে ওটাকে মাটিতে পুঁতে ফেলাই ভালো। চলো হে প্রফুল্ল।" - বলতে বলতে উঠে উঠে পড়লেন বিশুদাদু। প্রফুল্লদাদুও তাই শুনে উঠে পড়লেন। হাত-টাত ধুয়ে নিয়ে, বোতল থেকে জল খেতে খেতে বিশুদাদু বললেন, "মনে রেখো খোকা, একা একা যেখানে সেখানে যেতে নেই। ছোটো ছেলে, বিপদ হতে পারে তো। আর কখনোই ওই বাঁশবাগানে ঢুকতে যেও না একা একা। বলা যায় না আবার কোন অজানা জিনিসে হাত দেবে, আর কী থেকে কী হয়ে যাবে! স্যার আইজ্যাক নিউটন কী বলেছিলেন জানো? বলেছিলেন, আমরা যা জানি তা হল বিন্দু; আর যা জানি না তা হল এক সিন্ধু। বড়ো হও, তারপর বুঝবে। চলি গো বৌমা, চলি হে রতন। তোমার সকলে সাবধানে থেকো।"
(৬)
উপসংহার
আজকালকার দিনে কোনো কথাই চাপা থাকে না। পাপ্পুর অ্যাডভেঞ্চার আর বাড়িতে ডেকে আনা বিপদের সমস্ত গল্পই রাঙামাসি সকাল সকাল ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে কুসুমিতা অর্থাৎ পাপ্পুর মাকে। ব্যাস্ আর যায় কোথা! বিকেল হতে না হতেই বাবা-মা দুজনেই এসে হাজির। কুসুমিতা ঘরে এসে প্রথমেই পাপ্পুর বাঁ-কানটা সজোরে মুলে দিল। মুখে বলল, "এই শেষবার। আর কখনো যদি তোমাকে একলা কোথাও ছেড়েছি।"
তারপর রাঙাপিসি বা পিসের কোনো আপত্তিই টিকলো না। বিশেষত বাবা-মা এসেছিল গাড়ি ভাড়া করে, সুতরাং রাতেই তাদের চলে যেতে হতো। বেচারা পাপ্পু! তাকেও যেতে হল ব্যাগ গুছিয়ে। বাড়ি গেলেই শুরু হবে হোম টাস্ক। গিরগিটির বিভীষিকা থেকে শুরু হতে চলেছে 'আমার গণিত' -এর বিভীষিকা।
এদিকে পরের দিন সাত সকালে বাঁশবাগানের পথে দুই বুড়োকে চলে যেতে দেখা গেল। গ্রামের কেউ ওই পথে না গেলেও, দুই বুড়ো প্রায়ই ওই পথে যায়। কেউ জানে না, কেন?
ঘন্টাখানেক পরে একটা ছোট্ট জলাশয়ের পাশে দু'জনকে দেখা গেল। চারপাশে জঙ্গল আর তার মধ্যে ছোট্ট একটা জলাশয়। বিশুদাদু সেই বিরাট ডিমের খোলাটা একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে বের করে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন পুকুর পাড়ে। প্রফুল্লদাদু এক টিপ নস্যি নিলেন। তারপর একগাল হেসে বললেন, "ওই দেখো... সে এয়েচে!"
বিশুদাদু চশমাটা ভালো করে চোখে এঁটে নিয়ে ঝুঁকে তাকালেন পুকুরের ঠিক মাঝখানটাতে। সেখানে তখন জল চক্রাকারে পাক খাচ্চে। তিনটে কিম্ভুত প্রাণী। ঠিক যেন তিনটে চিনা ড্রাগন! লম্বাটে, একাধিক পা পেটের নীচে। লালচে শরীরে নীল আর সবুজ ছোপ-ছোপ। তবে যে গতিতে তারা তিনটেয় জলে পাক খেয়ে চলেছে, তাতে ভালো করে বোঝা দায়!
বিশুদাদু তাদের কলরবমুখর চক্রাবর্তনের দিকে তাকিয়ে আপন মনে মন্তব্য করলেন, “ভালো থেকো বিদ্যুল্লতারা... তোমাদের কথা আমরা বেঁচে থাকতে কেউ জানতে পারবে না... তোমরা নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকো।”



No comments:
Post a Comment