![]() |
| ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
ভজহরির ভুজুং ভাজুং
ডঃ শশাংক শেখর মণ্ডল
ভজহরি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। তার বয়স যতই কম হোক, আত্মবিশ্বাসের কোনো অভাব নেই। তার মতে পৃথিবীতে তিন ধরনের মানুষ আছে—এক, যারা ডায়লগ দেয়; দুই, যারা ডায়লগ শোনে; আর তিন, যারা ডায়লগ শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। ভজহরি নিজেকে প্রথম শ্রেণীর মানুষ বলে মনে করত। তার স্কুলের বাংলা শিক্ষক নরহরি পুতুতুন্ডুও ছিলেন এক বিচিত্র মানুষ। বাংলা পড়াতে পড়াতে হঠাৎ কবিতা আবৃত্তি শুরু করে দিতেন, আবার মাঝে মাঝে এমন সব ডায়লগ মারতেন যে ছাত্ররা পড়ার কথা ভুলে যেত।
একদিন ক্লাসে নরহরি স্যার বললেন,
—মানুষের জীবনে শৃঙ্খলা খুব দরকার।
ভজহরি সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলল।
—স্যার, শৃঙ্খলা থাকলে কি প্রেমে সফল হওয়া যায়?
পুরো ক্লাস হো হো করে হেসে উঠল।
স্যার বললেন,
—তুই সপ্তম শ্রেণীতে পড়িস নাকি প্রেম বিষয়ক গবেষণা করিস?
ভজহরি গম্ভীর মুখে বলল,
—গবেষণা এখনো শুরু করিনি স্যার, তবে মাঠ জরিপ চলছে।
এবার স্যারও হাসি চেপে রাখতে পারলেন না।
ভজহরির একাধিক নিজের তৈরি করা ডায়ালগ তার মুখস্থ। অন্যদিকে তারই স্কুলের বাংলা শিক্ষক নরহরি পুতুতুন্ডু তিনিও সব সময় প্রচুর ডায়লগবাজি করেন। এই ছাত্র আর শিক্ষক দুই ডায়লগবাজকে নিয়ে প্রতিদিন কিছু না কিছু মজাদার ঘটনা ঘটে এবং দুজনেই ডায়লগবাজি করতে থাকে। পুরো ক্লাসের হাসতে হাসতে পেটে খিল লেগে যায়। ভজহরি যদিও পড়াশোনার পাশাপাশি ডায়লগ মারা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে আগে এগিয়ে যায়। তাই শিক্ষক তাকে বলে,
—ভজা, তুই তো এত ছোটবেলা থেকে সবদিকেই ওস্তাদ। তুই যেমন ভালো মারপিট করতে পারিস, তুই ভালো ডায়লগ মারতে পারিস, তুই এই বয়সে মেয়েদের লাইন মারা শুরু করে দিয়েছিস। তুই কি ছোটবেলা থেকে ট্রেনিং নিয়েছিস?
ভজহরি তখন স্যারকে বলল,
—"made in canning no training, কেলিয়ে দিলে কলির কেষ্ট, ফাটিয়ে দিলে ফাটাকেষ্ট!"
শুনে স্যার বলল,
—বাহ বাহ ভজা! তুই তো দারুণ ডায়লগ দিলি!
শুনে ক্লাসের সকলেই হেসে উঠল।
এরপর থেকে স্কুলে একটা নতুন খেলা শুরু হলো। কেউ কোনো কথা বললেই ভজহরি তার জবাবে ডায়লগ দেবে।
একদিন অঙ্কের স্যার বললেন,
—সাতে সাত কত?
ভজহরি বলল,
—পরিস্থিতি বুঝে উত্তর দেব স্যার।
—মানে?
—পরীক্ষার হলে ঊনপঞ্চাশ, আর পাশের খাতায় তাকালে বাহাত্তরও হতে পারে।
অঙ্কের স্যার চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
—বের হয়ে যা!
ভজহরি বের হতে হতে বলল,
—জ্ঞানীরা ক্লাসে থাকে, কিংবদন্তিরা বাইরে দাঁড়ায়!
সেদিন পুরো স্কুলে খবর ছড়িয়ে গেল।
ভজহরির সঙ্গে মাঝে মাঝে তার বন্ধু-বান্ধবদের ঝামেলা বেঁধে যায়। সেখানেও সে ডায়লগবাজি করতে ছাড়ে না। ছেলেদেরকে একটাই ডায়লগ দেয়,
—"ক্যালানে কেল্টু ঢিলা নাট বল্টু!"
আর মেয়েদেরকে একটাই ডায়লগ দেয়,
—"কেলানে কেল্টি ছেঁড়া ভেলটি!"
শুনে কেউ কেউ রেগে যায় আবার কেউ হেসে উড়িয়ে দেয়। সত্যিকারের অর্থে ভজহরি কিন্তু দুষ্টুমি করে, বদমাইশি করে, কিন্তু বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে কোনোদিন মারপিট করে না। তবে মারের উপরে যতগুলো ডায়লগ আছে সব ডায়লগই ঝেড়ে দেয়। একবার টিফিনে স্কুলের সামনে ফুচকার দোকানে ভজহরি দাঁড়িয়ে আছে।
দোকানদার বলল,
—কত টাকার ফুচকা দেব?
ভজহরি বলল,
—দশ টাকার ফুচকা, কিন্তু স্বাদ হবে পঞ্চাশ টাকার।
দোকানদার বলল,
—তাহলে পঞ্চাশ টাকাই দাও।
ভজহরি উত্তর দিল,
—স্বপ্ন দেখতে ট্যাক্স লাগে নাকি?
চারপাশের সবাই আবার হেসে উঠল।
জামাইষষ্ঠীতে তো স্কুল ছুটি থাকে না। কিন্তু এক সপ্তাহ আগে থেকে ভজহরি স্যারের কাছ থেকে ছুটি নেওয়ার জন্য বারবার রিকোয়েস্ট করছে।
স্যার বলছেন,
—কোনো রকম ছুটি দেওয়া যাবে না।
তখন ভজহরি বলল,
—আমাকে যদি ছুটি না দেন আমি জোর করেই মামার বাড়ি পালিয়ে যাব।
এইবার স্যার একটা ডায়লগ দেওয়ার সুযোগ পেলেন।
স্যার বললেন,
—ভজা, তোর "কেলিয়ে কাঁঠাল ফাটিয়ে দেবো, তোর বাপের জামাইষষ্ঠী খাইয়ে দেবো!"
ভজহরি বলল,
—আপনি যা খুশি বলুন, আমি এবার জামাইষষ্ঠীতে যাবোই যাবো। এবারে আমার দিদিমা আমার জন্য অনেক কিছু গিফট এনেছে। আমি সেগুলো কোনো মতেই ছাড়তে পারব না।
শেষে কী করা যায়! ভজহরি এত জেদ করল যে স্যার বললেন,
—ঠিক আছে, এক সপ্তাহ ছুটি দেওয়া যাবে না। তোকে তিন দিন ছুটি দিতে পারি। তুই একদিন যাবি, একদিন আসবি, আর আজ জামাইষষ্ঠীর দিনটা থেকে আসবি। শুনে ভজহরি খুব খুশি হয়ে গেল। সে স্যারকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে দিল।
জামাইষষ্ঠীর সময় ভজহরি মামার বাড়িতে তিন দিন বিশাল আনন্দ করল। পাতিখালি গ্রামে তার মামার বাড়ি। গ্রামটা যেমন সুন্দর, তেমনি সেখানে মানুষজনও বেশ রসিক। তবে একটা ব্যাপারে সবাই একমত ছিল—ভজহরির মতো ডায়লগবাজ দ্বিতীয়টি নেই। মামার বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই ভজহরি যেন ভিআইপি হয়ে গেল। দিদিমা সকালে ঘুম থেকে উঠেই বললেন,
—ভজা, কি খাবি?
ভজহরি বলল,
—যা দেবে তাই খাবো, তবে পরিমাণটা যেন আমার ভবিষ্যতের মতো বড় হয়।
দিদিমা বললেন,
—তোর ভবিষ্যৎ কত বড়?
ভজহরি উত্তর দিল,
—এখনও জানি না, তবে পেটটা অনেক বড়।
সবাই হেসে উঠল।
তিনদিন ধরে ভজহরির রাজত্ব চলল। সকালে লুচি, দুপুরে মাছ-মাংস, বিকেলে পায়েস, রাতে আবার বিশেষ রান্না। ভজহরি একদিন খেতে খেতে বলল,
—দিদিমা, তোমার রান্না খেলে মনে হয় পৃথিবীর সব হোটেল বন্ধ হয়ে যাবে।
দিদিমা খুশি হয়ে বললেন,
—তাই নাকি?
ভজহরি মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ। কারণ সবাই হাসপাতালে ভর্তি হবে অতিরিক্ত খেয়ে!
দিদিমা সঙ্গে সঙ্গে কানের কাছে চিমটি কাটলেন।
কিন্তু বাড়ি আসার দিন মামার বাড়ির পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে কি সব ঝামেলা বেঁধে গেল।
ছেলেগুলো ভীষণ রোগাটে, লিকলিকে, খ্যাংরার কাঠির মত চেহারা। যেন এক একটা ঢাল ছাড়া তলোয়ার, আর তলোয়ার ছাড়া নিধিরাম সর্দার।
একজন এসে বলল,
—এই, তুই কি সেই ভজহরি?
ভজহরি বলল,
—হ্যাঁ। কেন? অটোগ্রাফ লাগবে?
আরেকজন বলল,
—তোর অনেক নাম শুনেছি।
ভজহরি উত্তর দিল,
—সব ভালো কথা তো?
—না।
—তাহলে খারাপগুলো বাদ দিয়ে ভালো কথাগুলো মনে রাখ।
ছেলেগুলো রেগে গেল।
শেষে একপ্রকার ভজহরির সঙ্গে তাদের মারপিট বেঁধে গেল। ভজহরি একাই সবাইকে সামলে নিল।
আর সবাই যখন মাটিতে পড়ে ধুলোতে গড়াগড়ি খাচ্ছে তখন ভজহরি সেই কমন ডায়লগটা দিল—
"চার আনার চেহারা বারো আনার বডি, দাদুর সঙ্গে হাডুডু আর দিদিমার সঙ্গে কবাডি!"
ছেলেরা মার খেলোই, সেইসঙ্গে ডায়লগ শুনে কাঁদতে কাঁদতে হাসতেও শুরু করল।
ভজহরি ভাবল,
—এই সুযোগে পালানোই ভালো। নাহলে এদের বাবা-মা এলে আমাকেই ভাজা ভাজা করে দেবে।
সত্যিই সেই ঘটনার পর ভজহরি বহু বছর জামাইষষ্ঠীতে মামার বাড়ি যায়নি। কিন্তু এবারে দিদিমা অনেক রিকোয়েস্ট করলেন।
আর নরহরি স্যারও বললেন,
—ঠিক আছে ভজা, অনেকদিন তো যাসনি। এবার একটু ঘুরে আয়।
ভজহরি খুশি হলো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটু চিন্তাও করছিল।
কয়েক বছর আগে যাদের পিটিয়েছিল তারা যদি আবার সুযোগ খোঁজে?
তারপর নিজেই নিজেকে সাহস দিল।
—আমার মামারা আছে, মাসিরা আছে, দিদারা আছে। প্রয়োজনে পুরো পাতিখালি রিজার্ভ ফোর্স নেমে যাবে। বুক ফুলিয়ে সে আবার পাতিখালিতে গেল। মামার বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখল সেই ছেলেগুলো দূর থেকে কেমন যেন সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
ভজহরি মনে মনে বলল,
—তাকিয়ে থাক। বাঘ দেখলে যেমন তাকায়, তেমনই তাকাচ্ছে।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সে মা, মামা, মাসি, দিদা—সবার কাছে আগের ঘটনার গল্প বলল।
শুনে তার বড়মামা টেবিলে চাপড় মেরে বললেন,
—আমাদের পাতিখালিতে আমাদের গায়ে হাত দেবে এমন বুকের পাটা এখানে কারও নেই!
মেজমাসি বললেন,
—কে মেরেছে বল!
ছোটমামা বললেন,
—হাত ভেঙে পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেব!
ভজহরি মনে মনে ভাবল,
—আমার আত্মীয়স্বজনদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে বাঘও নিরামিষ খাওয়া শুরু করবে।
দুদিন ভীষণ আনন্দে কেটে গেল। তারপর বাড়ি ফেরার দিন এল। নতুন জামা পরে, ব্যাগ গুছিয়ে, মায়ের সঙ্গে রাস্তায় বের হয়েছে। হঠাৎ ঝোপের ভেতর থেকে কয়েকজন ছেলে বেরিয়ে এল।
ভজহরি চিনতে পারল। এরা সেই পুরোনো শত্রুপক্ষ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তাকে কাদার মধ্যে ফেলে দিল। জামা ছিঁড়ে দিল। সারা গায়ে কাদা মেখে দিল। তারপর দৌড়ে পালিয়ে গেল। ভজহরি উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—বাহ! প্রতিশোধ নেবার এটাই নতুন ফ্যাশন নাকি?
ভজহরির বাড়ি যাওয়া হলো না। সে আবার মামার বাড়িতে ফিরে গেল। তার সেই অবস্থা দেখে সবাই ছুটে এল। মামারা, মাসিরা, দিদারা—যে যেখানে ছিল। ভজহরিকে দেখে বড়মামা বললেন,
—এ কী অবস্থা!
ভজহরি বলল,
—আমাকে মানুষ থেকে কাদামানব বানিয়ে দিয়েছে। শুনে সবাই আরও রেগে গেল। তারপর দল বেঁধে সবাই বেরিয়ে পড়ল। পাড়ার ছেলেদের খোঁজ শুরু হলো। রিকশা স্ট্যান্ডের কয়েকজন সব দেখে ফেলেছিল। তারা ছেলেগুলোর নাম বলে দিল। তারপর শুরু হলো মহা হুলস্থূল। ভজহরির মামা-মাসিরা ছেলেদের বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই তাদের বাবা-মায়েরা বেরিয়ে এল।
মুহূর্তের মধ্যে দুই পক্ষের ঝগড়া। তারপর ধাক্কাধাক্কি। তারপর একেবারে মহাযুদ্ধ। শেষে পাতিখালির সমস্ত লোক হেরে পালিয়ে গেল।
ভজহরি দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। হঠাৎ তার মাথায় পুরোনো ডায়লগটা এল।
সে চিৎকার করে বলল—
"পাতিখালির পাতি মাল, একটু খাবি বাংলা মাল, বেশি দিবি গালাগাল!"
ডায়লগ শুনে আশেপাশের সবাই এমন হাসল যে কিছুক্ষণ আগে যারা মারামারি করছিল তারাও হাসতে শুরু করল। এরপর ভজহরি আবার বাড়ি ফিরে এলো। পড়াশোনা চলতে থাকল। কিন্তু স্কুলে ফিরে নতুন বিপদ শুরু হলো। খিচুড়ির বিপদ। প্রতিদিন মিড-ডে মিলের সময় ভজহরি এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। কারও খিচুড়ি থেকে এক চামচ, কারও থালা থেকে দুই চামচ। এভাবে তার নিজের থালার চেয়ে অন্যের থালা থেকেই বেশি খাওয়া হয়ে যায়। একদিন সে ক্লাস এইটের এক ছেলের খিচুড়ি কেড়ে খেল। ছেলেটার ভীষণ খিদে পেয়েছিল। সে রেগে আগুন হয়ে গেল।
ভজহরি বলল,
—রাগ করিস না। খাবার ভাগ করে খেলে ভালোবাসা বাড়ে। ছেলেটা বলল,
—আজ তোকে ভাগ করে দেব।
তারপর সত্যিই ভজহরিকে এমন পেটাল যে ভজহরি আকাশে সূর্য, চাঁদ, তারা সব একসঙ্গে দেখতে লাগল। ছেলেটা শুধু মারল না। ভজহরির পুরো খিচুড়িটাও খেয়ে নিল। তারপর জীবনে প্রথমবার একটা ডায়লগ দিল—
"ফাউকা মাল বহুৎ কামাল!"
ভজহরি হতভম্ব। সে মনে মনে বলল,
—এ তো আমার থেকেও বড় ডায়লগবাজ!
আমাকে ধরে পিটিয়েছে, খিচুড়ি খেয়েছে, উল্টে আমার ওপরেই ডায়লগ দিয়ে দিল! এখানে আর থাকা ঠিক হবে না। তারপর সে যতটা পারে উর্ধ্বশ্বাসে দিল ছুট।
খিচুড়ি-কাণ্ডের পর কয়েকদিন ভজহরি স্কুলে খুব শান্ত হয়ে গেল। অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ভজহরিকে যারা চিনত তারা জানত, ভজহরি শান্ত মানেই নিশ্চয়ই কোনো বড়সড় পরিকল্পনা চলছে। নরহরি স্যার একদিন ক্লাসে ঢুকেই বললেন,
—কী রে ভজা, তুই আজকাল এত চুপচাপ কেন?
ভজহরি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—স্যার, জীবনের অনেক কিছু শিখে গেছি।
—কী শিখলি?
—যার খিচুড়ি, খিচুড়ি তার।
পুরো ক্লাস হো হো করে হেসে উঠল।
স্যার বললেন,
—অবশেষে তোর জ্ঞানচক্ষু খুলেছে।
ভজহরি বলল,
—না স্যার, চোখ খুলেছে ওই ক্লাস এইটের ছেলেটা।
সময় কেটে যেতে লাগল।
ভজহরি সপ্তম শ্রেণী থেকে অষ্টম, তারপর নবম শ্রেণীতে উঠল। কিন্তু তার ডায়লগবাজি একটুও কমল না। বরং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ডায়লগের ভাণ্ডারও বাড়তে লাগল। একদিন স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। হেডস্যার ঘোষণা করলেন,
—যারা গান, কবিতা, আবৃত্তি করবে তারা নাম লেখাও। ভজহরি গিয়ে নাম লিখিয়ে দিল। নরহরি স্যার জিজ্ঞেস করলেন,
—তুই কী করবি?
ভজহরি বলল,
—আমি ডায়লগ আবৃত্তি করব।
—ডায়লগ আবার আবৃত্তি হয় নাকি?
—আজ থেকে হবে।
অনুষ্ঠানের দিন মঞ্চে উঠে ভজহরি বলল,
—সম্মানিত শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রিয় বন্ধুগণ, আর যারা টিফিনের সময় আমার খিচুড়ি খেয়েছো, সবাইকে শুভেচ্ছা। সঙ্গে সঙ্গে হাততালি। তারপর সে একের পর এক ডায়লগ বলতে শুরু করল।
পাঁচ মিনিট পরে দর্শকরা হাসতে হাসতে কাহিল।
দশ মিনিট পরে হেডস্যার নিজের চশমা খুলে চোখের জল মুছছেন। পনেরো মিনিট পরে মাইক বন্ধ করে দিতে হলো। কারণ অনুষ্ঠান আর এগোচ্ছিল না। এরই মধ্যে ভজহরির জীবনে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রবেশ করল। প্রেম।
ভজহরি তো ছোটবেলা থেকেই অনেক মেয়ের পেছনে লাগত। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফলাফল ভালো হতো না। একবার এক মেয়েকে সে বলেছিল,
—তোমার চোখ দুটো খুব সুন্দর।
মেয়েটি বলেছিল,
—ধন্যবাদ।
ভজহরি খুশি।
পরদিন আবার বলল,
—তোমার হাসিটাও খুব সুন্দর।
মেয়েটি বলল,
—ধন্যবাদ।
তৃতীয় দিন সে সাহস করে বলল,
—তোমাকেও খুব সুন্দর লাগে।
মেয়েটি উত্তর দিল,
—চোখ দেখাও।
—কেন?
—তোমার চোখে সমস্যা হয়েছে কিনা দেখি।
তারপর ভজহরি এক সপ্তাহ মন খারাপ করে ছিল। তবুও সে হাল ছাড়েনি। তার বিশ্বাস ছিল—
"যে ডায়লগ দেয়, সে একদিন না একদিন সফল হবেই।"
যদিও বাস্তবতা অন্য কথা বলছিল। বড় হয়ে একটা মেয়ের সঙ্গে তার বেশ ভাব হয়ে গেল।
মেয়েটা সত্যিই ভজহরিকে ভালোবাসত।
ভজহরিও ভাবল,
—এইবার বুঝি ভাগ্য খুলল।
কিন্তু ভজহরি ভুলে গিয়েছিল যে তার জীবনে কোনো ঘটনা কখনোই সোজা পথে যায় না।
একদিন তারা মাঠের ধারে বসে গল্প করছে।
ভজহরি খুব রোমান্টিক গলায় বলল,
—তুমি কি আমাকে সারাজীবন ভালোবাসবে?
মেয়েটি বলল,
—হ্যাঁ।
ভজহরি খুশিতে আত্মহারা।
দুই সপ্তাহ পর মেয়েটি বলল,
—আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।
ভজহরি আকাশ থেকে পড়ল।
—কেন?
মেয়েটি হেসে বলল,
—তোমার কাছ থেকেই তো ডায়লগ শিখেছি।
তারপর বলল,
—আমি অনেককে "ঝালাক দিক লাজা" গান শুনিয়ে প্রেমের জালে ফাঁসিয়েছি।
ভজহরি হতবাক।
মেয়েটি আবার বলল—
"ঝালাক দিক... অর নিকলা যা!"
বলে হেঁটে চলে গেল।
ভজহরি স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
মনে মনে বলল,
—হায় রে! নিজের অস্ত্রেই আজ নিজেই ঘায়েল হলাম!
এমন ঘটনা অবশ্য একবারই ঘটেনি। আরও কয়েকজন মেয়ে তার কাছ থেকে ডায়লগ শিখে উল্টে তাকে ডায়লগ শুনিয়ে কেটে পড়েছে।
একজন বলেছিল,
—তুমি ভালো ছেলে, কিন্তু আমি আরও ভালো ছেলে পেয়ে গেছি।
আরেকজন বলেছিল,
—তোমার ডায়লগ ভালো, কিন্তু আমার ধৈর্য কম।
তৃতীয়জন তো সরাসরি বলেছিল,
—তোমাকে ভালোবাসার চেয়ে তোমার গল্প শুনে হাসা বেশি মজার।
এরপর ভজহরি একটা গভীর দর্শন আবিষ্কার করল।
সে আগে শুনেছিল—
"কষ্ট করলে কেষ্ট পাওয়া যায়।"
কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সে নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছাল।
সে ঘোষণা করল—
"কষ্ট দেখে কেষ্ট পালিয়ে যায়!"
এই ডায়লগ শুনে তার বন্ধুরা হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ল। এদিকে নরহরি স্যারও বুড়ো হচ্ছেন। কিন্তু ডায়লগবাজি একটুও কমেনি। একদিন স্কুলের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে ভজহরি অতিথি হিসেবে এল। এখন সে বড় হয়েছে।
তবুও আগের মতোই চঞ্চল। নরহরি স্যার তাকে দেখে বললেন,
—কী রে ভজা, এখনও ডায়লগ মারিস?
ভজহরি বলল,
—স্যার, মাছ জল ছাড়া বাঁচতে পারে?
—না।
—আমি ডায়লগ ছাড়া বাঁচতে পারি?
স্যার বললেন,
—না।
তারপর শুরু হলো বহু প্রতীক্ষিত ডায়লগ-যুদ্ধ।
স্যার বললেন,
—জীবনে সফল হতে হলে পরিশ্রম করতে হয়।
ভজহরি বলল,
—পরিশ্রম করেছি স্যার, কিন্তু ফলাফল অন্য কেউ নিয়ে গেছে।
স্যার বললেন,
—ধৈর্য ধরতে হয়।
ভজহরি বলল,
—ধৈর্য ধরেছিলাম, ততক্ষণে প্রেমিকা অন্য কাউকে ধরে ফেলেছে।
স্যার বললেন,
—জ্ঞানই শক্তি।
ভজহরি বলল,
—ঠিক কথা। কিন্তু পরীক্ষার হলে পাশের বেঞ্চের জ্ঞান আরও শক্তিশালী। এবার পুরো মাঠ হাততালিতে ফেটে পড়ল। স্যার হেসে বললেন,
—ভজা, তুই বদলাইনি।
ভজহরি মাথা নেড়ে বলল,
—আপনিও না স্যার।
সন্ধ্যাবেলা অনুষ্ঠান শেষ হলো। ভজহরি স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে রইল। এই মাঠে সে কত দৌড়েছে, কত মার খেয়েছে, কত ডায়লগ দিয়েছে, কত হাসিয়েছে। নরহরি স্যার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
বললেন,
—জানিস ভজা, তোর সব ডায়লগের মধ্যে সবচেয়ে বড় কথা কী?
—কী স্যার?
—তুই যেখানে গিয়েছিস, সেখানে হাসি নিয়ে গিয়েছিস। ভজহরি একটু চুপ করে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
—স্যার, হাসি ফ্রি। তাই বিলি করতে কোনো সমস্যা নেই। নরহরি স্যারও হেসে উঠলেন। আর সেই হাসির শব্দ যেন ছড়িয়ে পড়ল পুরো স্কুলে, পুরো গ্রামে, পুরো পাতিখালিতে। কারণ ভজহরি শুধু একজন ডায়লগবাজ ছিল না। সে ছিল এমন একজন মানুষ, যে বিপদে, অপমানে, মারপিটে, প্রেমে ব্যর্থতায়—সবকিছুর মধ্যেও হাসতে জানত, আর অন্যদেরও হাসাতে জানত। আর সেই কারণেই আজও লোকজন বলে—
"ভজহরির ডায়লগের জবাব নেই, আর ভজহরির ভুজুং-ভাজুংয়ের শেষ নেই!"

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment