![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
প্রতিশোধ
প্রসূন নস্কর
1
বিকেলের নরম সোনাঝরা আলো ড্রয়িংরুমের জানলা দিয়ে এসে পড়েছে ঘরের কোণে। ছোট্ট ছিমছাম সংসারটি যেন এক টুকরো শান্তির নীড়। টেবিলে রাখা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর নিমকির প্লেট থেকে নোনতা সুবাস চুইয়ে পড়ছে। আজ এ বাড়িতে উৎসবের মেজাজ, কারণ অনী ক্লাস সিক্সের পরীক্ষায় অভাবনীয় ফলাফল করেছে।
অনীর বাবা প্রোগ্রেস কার্ডটার ওপর বারবার চোখ বোলাচ্ছেন। তাঁর চোখেমুখে আজ এক অপার্থিব তৃপ্তি। ব্যাংকের সারাদিনের হিসেব-নিকেশের ক্লান্তি যেন এক লহমায় ধুয়ে-মুছে গেছে। চশমার কাঁচটা একবার মুছে নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, "শুনেছ অনীর মা? আমাদের ছেলে কিন্তু শুধু ক্লাসেই প্রথম হয়নি, অঙ্কে এবারও ১০০-তে ১০০ পেয়েছে! এ নিয়ে টানা তিন বছর ও অঙ্কে পূর্ণ মান ধরে রাখল।"
অনীর মা রেখা দেবী রান্নাঘর থেকে পায়েসের বাটি হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। ছেলের সাফল্যে তাঁর মুখটাও আজ পূর্ণিমার চাঁদের মতো ঝলমল করছে। পায়েসের বাটিটা সযত্নে টেবিলে নামিয়ে রেখে তিনি পরম স্নেহে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
রেখা: "জানি তো! অঙ্কের প্রতি ওর এই টান তো তোমার থেকেই পাওয়া। আমি তো ভেবেছিলাম এবার প্রশ্ন খুব কঠিন হয়েছে, অনী পারবে কি না। কিন্তু ছেলে আমার ঠিক বাজিমাত করে দিয়েছে।"
অনী সোফায় বাবার গা ঘেঁষে বসে ছিল। বাবার গর্বিত মুখটা দেখে তার বুকটা ভরে উঠছে। সে লাজুক হেসে বলল, "বাবা, জ্যামিতির ওই কঠিন উপপাদ্যটা তুমি আগের দিন বুঝিয়ে দিয়েছিলে বলেই তো অত সহজে মেলাতে পারলাম।"
ছেলের কথায় বাবার মনটা আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠল। তিনি অনীর কাঁধে হাত রেখে একটু উদাস গলায় বললেন, "আমি তো সামান্য ব্যাংকের কর্মচারী রে, সাধারণ যোগ-বিয়োগের হিসেবেই দিন কেটে যায়। আমি চাই তুই অনেক বড় হ। তোর মেধা যেন শুধু একটা অফিসের ডেস্কে বন্দি হয়ে না থাকে।"
অনী উজ্জ্বল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে দৃঢ়ভাবে বলল, "তুমি ভেবো না বাবা। আমি ঠিক করে নিয়েছি, বড় হয়ে মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার হব। বড় বড় ব্রিজ আর সব অদ্ভুত সুন্দর বাড়ি তৈরি করব। তোমার আর মায়ের নাম উজ্জ্বল করবই।"
রেখা ছেলের গালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বললেন, "হবি বাবা, তুই নিশ্চয়ই হবি। তোর মতো পরিশ্রমী ছেলে আর ক’জন আছে? আজ তোর পছন্দের সব রান্না করেছি। এখন হাত-মুখ ধুয়ে আয়, আগে একটু পায়েস মুখে দে।"
একজন মধ্যবিত্ত বাবার কাছে সন্তানের এই স্বপ্ন আর মেধার চেয়ে বড় সম্পদ আর কী-ই বা হতে পারে? তিনি জানতেন, তাঁর ছেলে একদিন আকাশছোঁয়া সাফল্য পাবে। সংসারের এই নিটোল সুখের মায়া যেন সারাজীবন এভাবেই অটুট থাকে—এটাই ছিল তাঁর প্রার্থনা।
অনীর রেজাল্টের পর দিনগুলো যেন বসন্তের দখিনা বাতাসের মতো বয়ে যেতে লাগল। অভাব হয়তো মধ্যবিত্তের নিত্যসঙ্গী, কিন্তু ভালোবাসার প্রাচুর্যে তা ঢাকা পড়ে যায়। পরের রবিবার সকালে বাবা-ছেলে মিলে তাঁদের দীর্ঘদিনের নিয়মে পুরোনো জ্যামিতি বক্স নিয়ে বসলেন।
বাবা: "অনী, ইঞ্জিনিয়ার হতে গেলে কিন্তু শুধু বইয়ের অঙ্ক করলে হবে না। তোকে কল্পনা করতে শিখতে হবে। এই যে আমাদের এই ছোট ঘরটা, এটা যদি তোকে নতুন করে নকশা করতে দেওয়া হয়, তুই কী করবি?"
অনী সোৎসাহে স্কেল আর পেন্সিল নিয়ে কাগজে আঁকিবুঁকি শুরু করল। সে সোফার বদলে বিশাল এক লাইব্রেরি আর জানলার পাশে বসার নান্দনিক জায়গার নকশা দেখাল। বাবা মুগ্ধ হয়ে দেখলেন, বারো বছরের এই কিশোরের ভাবনার মধ্যে এক অদ্ভুত পরিপক্বতা রয়েছে।
বাবা: "চমৎকার! জানিস অনী, আমি যখন তোর বয়সী ছিলাম, আমারও খুব ইচ্ছে ছিল সৃষ্টিশীল কিছু করার। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে ব্যাংকের খাতা-কলমে আটকে গেলাম। তুই যখন বড় বড় ব্রিজের ডিজাইন করবি, আমি তোর হাত ধরে সেই ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটব। সেই দিনটা হবে আমার জীবনের সবথেকে বড় প্রাপ্তি।"
রান্নাঘর থেকে তখন ডাল আর আলুপোস্তর ঘ্রাণে ঘর ম ম করছে। রোববারের দুপুর মানেই একটু বিশেষ আয়োজন। রেখা দেবী দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
মা: "বাবা-ছেলে মিলে তো অনেক আকাশ-কুসুম ভাবা হলো। এবার একটু বাজারে যাও তো? অনী কাল থেকে বলছিল ও ইলিশ মাছ খাবে।"
বাবা পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে একটু হাসলেন। মাসকাবারি সময়, বাজেটে টান পড়েছে ঠিকই, কিন্তু ছেলের ওই উজ্জ্বল চোখের আবদার মেটাতে তিনি অসাধ্য সাধন করতে পারেন।
বাবা: "অবশ্যই যাব! আজ শুধু ইলিশ নয়, অনীর জন্য সেই মেকানো কিটটাও (Engineering Kit) নিয়ে আসব যেটা ও অনেকদিন ধরে দোকানের শো-কেসে দেখছিল।"
অনী আনন্দে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। রেখা দেবী আড়াল থেকে স্বামীর দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অভাব থাকলেও তাঁদের সংসারে সুখ উপচে পড়ে।
বিকেলে ছাদে গিয়ে তারা তিনজনে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বাবা অনীর মাথায় হাত রেখে বললেন, "মনে রাখিস অনী, জীবনে অনেক ঝোড়ো হাওয়া আসবে, কিন্তু লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, তবে কোনো কিছুই তোকে টলাতে পারবে না। আমরা তো আছিই।"
অনী বাবার হাতটা শক্ত করে ধরল। সে তখনো জানত না, এই সুখের দিনগুলো কতটা ক্ষণস্থায়ী ছিল। সে বুঝতেও পারেনি, সামনের দিগন্তে কোন ভয়ানক অন্ধকার তাদের এই ছোট্ট শান্তির নীড়কে গ্রাস করতে ওত পেতে আছে।
সেই সোনালী দিনগুলো কোনো এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হতে হতে স্মৃতির অতলে মিলিয়ে যাচ্ছে। যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা তারা ভেবেছিল, তার ওপর এক পুরু কুয়াশার চাদর ঢেকে দিচ্ছে সবকিছু।
2
বাইরে কালবৈশাখীর পূর্বাভাস, আকাশটা স্লেট রঙের হয়ে আছে। কিন্তু অনিকের ড্রয়িংরুমের ভেতরের আবহাওয়া বাইরের চেয়েও বেশি তপ্ত। দামী ক্রিস্টাল ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় অনিকের মুখটা আজ চেনা যাচ্ছে না—সেখানে কোনো আভিজাত্য নেই, আছে কেবল এক হিংস্র অহংকার।
সায়নী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল, কিন্তু সেটা ভয়ে নয়, তীব্র ঘৃণায়। ওর পরনের সাধারণ কুর্তাটা অনিকের এই বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদে বড্ড বেমানান।
"চান্স তো তুমি ঠিকই পেয়েছ সায়নী," অনিক হাতে ধরা হুইস্কির গ্লাসে বরফ নাড়তে নাড়তে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল। "বড় বড় ডিরেক্টরদের ডিনার টেবিলে বসার সুযোগ কি কম কথা? ওটাই তো তোমার আসল ক্যারিয়ারের শুরু ছিল।"
সায়নী চিৎকার করে উঠল, "কেরিয়ার নয় অনিক, ওটা ছিল ব্যবসা! তুমি আমাকে শিখণ্ডী হিসেবে খাড়া করে নিজের কালো টাকার লেনদেন করেছ। ফিল্মের হিরোইন হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে তুমি আমাকে ড্রাগ র্যাকেটের কানাগলিতে ঠেলে দিয়েছ। আমি ভাবতেও পারিনি তুমি এত নীচ হতে পারো।"
অনিক ধীর পায়ে এগিয়ে এল। ওর দামি পারফিউমের গন্ধটা সায়নীর নাকে বিষের মতো লাগল। অনিক ওর থুতনিটা জোরে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, "শোনো সায়নী, ক্ষমতার ডিকশনারিতে 'নীচ' বলে কোনো শব্দ নেই। আমি তোমাকে সুযোগ দিয়েছি, আর বদলে তুমি আমায় আনন্দ দিয়েছ। দ্যাট ওয়াজ আ ফেয়ার ডিল।"
সায়নী ঝটকা দিয়ে হাতটা সরিয়ে দিল। ওর চোখের জল শুকিয়ে এখন আগ্নেয়গিরি। "ফেয়ার ডিল? আর সেই অসামাজিক কাজগুলো? তোমার ওই প্রভাবশালী বাবার ছত্রছায়ায় বসে তুমি যে সিন্ডিকেট চালাচ্ছ, তার সব প্রমাণ এখন আমার ফোনে। আমি আজই সব ফাঁস করে দেব। মিডিয়া, পুলিশ... কেউ বাদ থাকবে না।"
অনিকের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে সোফায় হেলান দিয়ে বসে বলল, "প্রমাণ? তুমি কি সত্যিই মনে করো আমার মতো লোক কোনো প্রমাণ ফেলে রাখে? আর যদি কিছু থেকেও থাকে, তবে মনে রেখো—এই শহরটা আমার বাবার পকেটে থাকে। তুমি জাস্ট একটা সাধারণ মেয়ে, যে কাল সকালে নিখোঁজ হয়ে গেলে কেউ একটা এফআইআরও লিখবে না।"
অনিকের এই উদ্ধত স্বভাবের উৎস আসলে তার বাবা অমরেন্দ্র চৌধুরীর তৈরি করা এক দুর্ভেদ্য ও অন্ধকার দুর্গ। সায়নী যখন অনিকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের কথা বলছে, তখন অনিকের আত্মবিশ্বাসের মূলে ছিল তার বাবার সেই অদৃশ্য ক্ষমতা, যা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে।
অমরেন্দ্র চৌধুরীর মূল ব্যবসা ছিল রিয়েল এস্টেট এবং লজিস্টিকস। কিন্তু শহরের বড় বড় ফ্লাইওভার আর শপিং মল তৈরির আড়ালে চলত সিন্ডিকেট রাজ। সরকারি টেন্ডার দখল করা থেকে শুরু করে বিরুদ্ধপক্ষকে সরিয়ে দেওয়া—সবই হতো তাঁর ইশারায়। সায়নী জানত না যে, যে ফিল্মি পার্টিগুলোতে অনিক তাকে নিয়ে যেত, সেগুলো আসলে ছিল বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে নিষিদ্ধ ড্রাগস এবং 'মানি লন্ডারিং'-এর গোপন আস্তানা।
অমরেন্দ্র চৌধুরী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করতেন কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং কালো টাকা সাদা করার জন্য। সায়নীর মতো ডজন ডজন উঠতি মডেলকে তিনি ব্যবহার করতেন প্রভাবশালী আমলা ও মন্ত্রীদের 'তুষ্ট' করার হাতিয়ার হিসেবে। সায়নী বুঝতে পেরেছিল, অনিক আসলে তার বাবার এই অন্ধকার ব্যবসার একজন 'এজেন্ট' মাত্র, যার কাজ হলো রঙিন স্বপ্নের টোপ দিয়ে শিকার ধরে আনা।
শহরের পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে বিচার ব্যবস্থার ওপরের স্তরেও অমরেন্দ্রর লোক বসানো ছিল। সায়নী যখন প্রমাণ ফাঁসের কথা ভাবছিল, তখন অনিকের মনের কোণে ভেসে উঠছিল বাবার সেই কুখ্যাত উক্তি— "আইন হলো মাকড়সার জালের মতো, যাতে কেবল ছোট পতঙ্গরাই ধরা পড়ে, বড় শিকার জাল ছিঁড়ে ঠিক বেরিয়ে যায়।" অনিকের কাছে সায়নী ছিল কেবল একটি তুচ্ছ ধূলিকণা।
“শোনো সায়নী,” অনিক ঠান্ডা গলায় বলল, “আমার বাবার সাম্রাজ্য তাসের ঘর নয় যে তোমার একটা ফুঁয়ে পড়ে যাবে। এই শহরে এমন কোনো আদালত নেই যেখানে চৌধুরী পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা টেকানো যায়। আর যে প্রমাণের কথা বলছ? ওই প্রমাণ নিয়ে তুমি লালবাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে তো?”
"ভুল করছ অনিক," সায়নী ফোনটা উঁচিয়ে ধরল। আমি এখন আর হিরোইন হতে চাই না, আমি শুধু তোমার ধ্বংস দেখতে চাই।"
বাইরে তখন প্রচণ্ড শব্দে বিদ্যুৎ চমকাল। অনিকের হাতের গ্লাসটা স্থির হয়ে গেল। সে প্রথমবার সায়নীর চোখে এমন কিছু দেখল যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না—তীব্র প্রতিশোধের আগুন।
অনিকের অভিজ্ঞ চোখ বুঝতে পারল, সায়নীকে ভয় দেখিয়ে বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আর হারানো যাবে না। যে মেয়ে একবার নিজের জীবন বাজি রেখে ধ্বংসের পথে পা বাড়াতে পারে, তাকে বশ করার একমাত্র অস্ত্র হলো—আবেগ। অনিকের চেনা অহংকারী মুখোশটা মুহূর্তেই খসে পড়ল, সেখানে জায়গা নিল এক বিষণ্ণ ও বিধ্বস্ত প্রেমিকের অবয়ব।
সে ধীরে ধীরে সায়নীর দিকে কয়েক পা এগিয়ে এল। গলার স্বরটা একদম খাদে নামিয়ে করুণ সুরে বলল, "সায়নী, তুমি কি সত্যিই মনে করো এই অট্টালিকা আর ক্ষমতা আমাকে শান্তি দেয়? আমি আসলে হাঁপিয়ে উঠেছি সায়নী। প্রতিটা মুহূর্তে এই পাপের সাম্রাজ্য রক্ষা করতে করতে আমি নিজের সত্তাটাই হারিয়ে ফেলেছি।"
সায়নী অবাক হয়ে অনিকের দিকে তাকাল। অনিকের চোখের ওই টলটলে জল দেখে ওর হাতটা সামান্য শিথিল হয়ে এল।
অনিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালা দিয়ে দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, "আমার বাবাও তো একদিন খুব সাধারণ চাকরিজীবী ছিলেন। তারপর ক্ষমতার লোভে আর এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ার নেশায় তিনি কীভাবে যেন পাথর হয়ে গেলেন। আজ অর্থ আছে, বৈভব আছে, কিন্তু এই রাজপ্রাসাদে একটুও মায়া নেই। বিশ্বাস করো, নিজের অজান্তেই কখন যে তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি, সেটা বুঝতে পারিনি। হয়তো আমার প্রকাশের ধরনটা ভুল ছিল, হয়তো আমি সমাজবিরোধী কার্যকলাপের আবর্তে পড়ে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম।"
সে সায়নীর আরও কাছে এসে দাঁড়াল। ওর দুটে হাত আলতো করে ধরে মিনতির সুরে বলল, "তোমার বুকের ওপর মাথা রেখে আমি একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে চাই সায়নী। এই নোংরা জগত থেকে আমি মুক্তি চাই। আমাকে একটু জায়গা দেবে তোমার মনে? এই ঘৃণা কি কোনোভাবেই ভালোবাসায় বদলে যেতে পারে না?"
সায়নী নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর মনের ভেতরে যে ঘৃণার পাহাড় গড়ে উঠেছিল, অনিকের এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সামনে তা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে লাগল। ওর মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিনের কথা, যখন অনিকের হাসিতে ও মুগ্ধ হয়েছিল। অনিকের প্রতিটি শব্দ যেন সায়নীর হৃদয়ের কোনো এক গোপন সিন্দুকে আটকে থাকা পুরনো ভালোবাসার দরজাটা সজোরে ধাক্কা দিয়ে খুলে দিল।
সায়নীর চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। ও কি তবে স্বপ্ন দেকছে? অনিক কি সত্যিই অনুতপ্ত? নাকি এটা অন্য কোনো মরণফাঁদ? কিন্তু ভালোবাসার টান বড় অদ্ভুত; সায়নী অনুভব করল ওর সমস্ত জেদ আর প্রতিশোধের স্পৃহা ধীরে ধীরে এক অজানা মায়ায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অনিকের চোখের অতলে সে আজ ধ্বংস নয়, বরং আশ্রয় খুঁজছে।
অনিক আর সায়নীর মধ্যকার সেই উত্তপ্ত আবহাওয়া এখন এক মায়াবী নিস্তব্ধতায় রূপ নিয়েছে। অনিকের গলার স্বরে এমন এক জাদু ছিল যে, সায়নী ভুলেই গেল কয়েক মুহূর্ত আগে এই মানুষটাই তাকে হুমকি দিচ্ছিল।
অনিক সায়নীর খুব কাছে এসে ওর কাঁপা কাঁপা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার আঙুলের ছোঁয়া ছিল ভীষণ শীতল, কিন্তু সায়নীর মনে হলো সেই শীতলতা ওর ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে শান্ত করে দিচ্ছে।
অনিক বলতে লাগল, "জানো সায়নী, লোকে আমার বাবার ক্ষমতা দেখে ভয় পায়, কিন্তু কেউ জানে না আমরা এই ক্ষমতার খাঁচায় কতটা বন্দি। ছোটবেলা থেকে আমি কেবল ষড়যন্ত্র আর হিসাব-নিকাশ দেখে বড় হয়েছি। ভালোবাসা কী জিনিস, সেটা তোমার ওই সাধারণ ঘরের সহজ-সরল হাসিতে আমি প্রথমবার চিনেছিলাম। তাই হয়তো তোমাকে হারানোর ভয়ে আমি ভুল পথে হেঁটেছি, তোমাকে ফিল্মের নাম করে আগলে রাখতে চেয়েছি। যদিও সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।"
সায়নী বিড়বিড় করে বলল, "কিন্তু ওই অসামাজিক কাজগুলো? ওগুলো কি তোমার ভুলের অংশ ছিল অনিক?"
অনিক সায়নীর চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। তার চোখে এখন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। সে সায়নীর কপালে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "বাবার চাপে অনেক কিছু করতে হয়েছে সায়নী। কিন্তু আজ যখন তুমি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে, তখন বুঝলাম—এই রাজপ্রাসাদ, এই ক্ষমতা সব তুচ্ছ যদি তুমি পাশে না থাকো। আমি সব ছেড়ে দিতে রাজি আছি। চলো না, আমরা অনেক দূরে কোথাও চলে যাই? যেখানে কোনো চৌধুরী সাম্রাজ্য থাকবে না, থাকবে না কোনো গ্ল্যামার দুনিয়ার হাতছানি। শুধু তুমি আর আমি।"
সায়নীর হৃদপিণ্ড আজ অস্বাভাবিক দ্রুততায় স্পন্দিত হচ্ছে। যে অনিককে সে গত কয়েক মাস ধরে এক নিষ্ঠুর শিকারি হিসেবে জানত, সেই অনিকের এমন শিশুসুলভ আর্তি ওকে দিশেহারা করে দিল। সায়নীর মনে পড়ে গেল সেই বৃষ্টির বিকেলের কথা, যখন অনিক প্রথমবার ওর হাত ধরেছিল। সেই দিনের সেই একই টান সে আজ আবারও অনুভব করছে।
ওর মনে জমে থাকা পাহাড়প্রমাণ ঘৃণা যেন বরফের মতো গলতে শুরু করল। ও হাত বাড়িয়ে অনিকের গালটা ছুঁলো। অনিক আলতো করে সায়নীকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। সায়নী শুনতে পাচ্ছিল অনিকের হৃদস্পন্দন—তা কি সত্যিই প্রেমের জন্য ধুকপুক করছে, নাকি কোনো আসন্ন ষড়যন্ত্রের ঢাক বাজছে, তা বোঝার ক্ষমতা সায়নী তখন হারিয়ে ফেলেছে।
সে শুধু এটুকুই বুঝতে পারল, অনিকের বুকের সেই ওম তাকে এক অদ্ভুত নেশায় আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সে অনিকের শার্টের কলারটা খামচে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এই কান্না অনেক দিনের বঞ্চনার, আবার এই কান্না এক হারানো ভালোবাসাকে ফিরে পাওয়ার।
অনিক সায়নীর চুলে বিলি কাটতে কাটতে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অশুভ হাসি ফুটিয়ে তুলল, যা সায়নীর অগোচরেই থেকে গেল। অন্ধকারে অনিকের চোখ দুটো তখন শিকারি বিড়ালের মতো জ্বলজ্বল করছে।
অনিকের বাহুবন্ধনে সায়নী যখন ধরা দিল, তখন বাইরের কালবৈশাখী শান্ত হয়ে এসেছে, কিন্তু প্রকৃতির সেই নিস্তব্ধতা যেন কোনো বড় ঝড়ের পূর্বাভাস। অনিকের ভালোবাসা সায়নীর কাছে মনে হচ্ছিল মরুভূমির তপ্ত বালিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো, যা মুহূর্তের জন্য শীতলতা দিলেও মাটির নিচের দহনকে মেটাতে পারে না।
অনিক সায়নীর চুলে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলতে লাগল, "আমরা একটা নতুন জীবন শুরু করব সায়নী। যেখানে শুধু ভোরের আলো থাকবে, কোনো অন্ধকার অতীতের ছায়া থাকবে না।"
অনিকের চোখের দিকে তাকালে এখন মনে হয় গভীর কোনো স্বচ্ছ সরোবর, যার জল দেখে তেষ্টা মেটাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেই জলের নিচেই লুকিয়ে আছে হিংস্র কুমিরের মতো কোনো এক গোপন ষড়যন্ত্র। সায়নী সেই সরোবরের কানায় দাঁড়িয়ে আছে, এক পা বাড়ালেই অতল তলে তলিয়ে যাওয়ার নিশ্চিত হাতছানি।
সে অনিকের বুকে মাথা রেখে ভাবছিল, হয়তো এই মানুষটাই তার জীবনের ধ্রুবতারা। কিন্তু সে বুঝতেই পারল না, সে যাকে ধ্রুবতারা ভাবছে, তা আসলে এক উল্কা, যা তাকে সঙ্গে নিয়ে ধ্বংসের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।
"বিশ্বাস করো সায়নী," অনিক তার হাত দুটো সায়নীর গলার কাছে আলতো করে ছুঁয়ে বলল, "তোমাকে ছাড়া আমার এই বিশাল সাম্রাজ্য যেন একটা সোনার খাঁচা, যেখানে দম বন্ধ হয়ে মরে যাচ্ছি আমি।"
সায়নী চোখ বুজে সেই মিথ্যে আশ্বাসের ঘ্রাণ নিচ্ছিল। ওর মনে হচ্ছিল, বছরের পর বছর ধরে চলা ওর এই সংগ্রাম যেন আজ এক শান্ত বন্দরে এসে নোঙর ফেলেছে। কিন্তু সে জানত না, এই বন্দরটা আসলে এক পরিত্যক্ত দ্বীপ, যেখানে পৌঁছানোর পর ফিরে আসার আর কোনো নৌকা অবশিষ্ট থাকে না।
অনিকের ঠোঁটের কোণে তখন ফুটে উঠেছে এক বিষাক্ত হাসির রেখা, যা অমাবস্যার রাতে ফুটে থাকা কোনো জংলি ফুলের মতো—দেখতে সুন্দর, কিন্তু তার গন্ধে অবশ হয়ে যায় শরীর আর বিবেক।
সায়নীর কণ্ঠে এই করুণ আর্তি ঝরে পড়ার পর ড্রয়িংরুমের বিশাল শূন্যতা যেন হঠাৎ এক গভীর নিস্তব্ধতায় ভরে গেল। সায়নীর দুচোখ উপচে জল পড়ছে, কিন্তু তাতে এখন আর আগের মতো ক্ষোভ নেই; আছে কেবল নিঃস্ব হওয়া এক হৃদয়ের শেষ আশ্রয় খোঁজার আকুলতা।
অনিক সায়নীর আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুল ঢুকিয়ে আলতো করে ধরে অস্ফুট স্বরে বলল, "আজ তোমার সাথে, আমার এই বিশাল অট্টালিকা ছেড়ে কিছুটা শান্তির সময় কাটাতে চাই। থাকতে দেবে? থাকতে দেবে তোমার সাথে, তোমার হয়ে, তোমার মতো করে?"
অনিকের বুকে মাথা রেখে সায়নী যেন এক পথহারা নাবিকের মতো, যে দিগন্ত বিস্তৃত সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে হঠাৎ একটা তীরের দেখা পেয়েছে। কিন্তু সে জানে না, এই তীরটা কোনো সবুজ ভূখণ্ড নাকি এক বিপজ্জনক পাথুরে চড়া।
অনিকের ঠোঁটে তখন এক পৈশাচিক বিজয়ের হাসি, কিন্তু তার স্পর্শে রইল কেবল মায়া। সে সায়নীর থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে তার চোখের জল মুছে দিল। ঠিক যেন কোনো দক্ষ চিত্রকর তার ক্যানভাসে রঙের প্রলেপ দিচ্ছে, যাতে আসল দাগগুলো ঢেকে যায়।
3
ডানকুনির সেই নির্জন বাগানবাড়িটা এখন যেন একটা থমথমে দ্বীপ। চারিদিকে পুলিশের লাল-সাদা ক্রাইম সিন ফিতা দিয়ে ঘেরা। গেটের বাইরে ওসির জিপ আর দুটো ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরের দেবদারু গাছে ঘেরা বাগানটায় দিনের বেলাতেও রোদের তেজ পৌঁছায় না, চিরস্থায়ী এক ছায়া ভরে থাকে সেখানে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝে মাঝে পুলিশের ওয়াকিটকির কর্কশ আওয়াজ ভেসে আসছে।
বিখ্যাত শিল্পপতি অমরেন্দ্র চৌধুরীর একমাত্র ছেলে অনিক চৌধুরীর নিথর দেহটা যখন স্ট্রেচারে করে বেরিয়ে এল, তখন সাদা চাদরের ওপর রক্তের কালচে দাগগুলো রোদে আরও বীভৎস দেখাচ্ছিল।
ডানকুনি থানার ছোট অন্ধকার ঘরে দুজনকে মুখোমুখি বসিয়ে রাখা হয়েছে। একদিকে জাঁকজমকপূর্ণ সাজে থাকা সীমা রায়। চোখের কাজল জলে মিশে গাল বেয়ে নেমে এসেছে। চোখের জলের কারণটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।এটা কি দুঃখ, অভিনয় না কি ফেঁসে যাওয়ার ভয় থেকে এই অশ্রুধরা?উল্টোদিকে কুঁকড়ে বসে আছে প্রৌঢ় কেয়ারটেকার বিশু পাল।
তদন্তকারী দলের প্রধান ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জি টেবিলের ওপর একটা ফাইল ছুড়ে দিয়ে সীমার দিকে তাকালেন। "সীমা দেবী, আপনি কি অনিক বাবুর বান্ধবী? অনিক চৌধুরীর মতো হাই-প্রোফাইল ক্লায়েন্টের সাথে কাল রাতে আপনি এখানে ছিলেন। অনিকবাবু আপনার বেশ ঘনিষ্ঠ, তাই না?"
সীমা কাঁপাকাঁপা হাতে রুমাল দিয়ে ঘাম মুছলেন। চ্যাটার্জি আবার প্রশ্ন করলেন, "কতদিন থেকে চেনেন আপনি ওনাকে?"
সীমা ক্ষীণ স্বরে বললেন, "মাস দুয়েক আগে এক নাইট ক্লাবে আলাপ। এর আগে দু-একবার বাইরে দেখা হয়েছে, কিন্তু এই বাগানবাড়িতে কালই প্রথম আসি। সন্ধ্যা সাতটায় পার্ক স্ট্রিট থেকে উনি আমাকে পিক-আপ করেন।"
তারমানে আপনি পেইড বান্ধবী।পয়সার বিনিময়ে যেকোনো ঘনিষ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন। তা সে যাইহোক, আসল কথায় আসা যাক।
চ্যাটার্জি চোখ ছোট করে তাকালেন। "গতকাল রাতে কী হলো? বিস্তারিত বলুন।"
সীমার গলার স্বর বসে গেছে। "অনিক বাবু প্রচুর ড্রিঙ্কস করেছিল। ওনার মেজাজ একদম ঠিক ছিল না। ফোনে কারও সাথে তুমুল কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। আমারও সিচুয়েশনটা ঠিক ভালো লাগছিল না। খুব ওড লাগছিল। পেট চালানোর জন্য অনেক সময় আমাদের থেকে খারাপ সিচুয়েশন কে ও মেনে নিতে হয়। জীবনে টাকা খুব দরকারি। বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ,মুদির দোকানে ধার, ঘর ভাড়ার টাকা, ইলেকট্রিকের বিল, এই সব কিছুর জন্য টাকার খুব দরকার।বাবার ক্যান্সার সর্বস্বান্ত করে রাস্তায় নামিয়ে দিল।একটা চাকরির জন্য দরজায় দরজায় ঘুরে কোনো ব্যবস্থা করতে না পেরে শেষমেশ বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে এই প্রফেশনে আসা। কারো ব্যক্তিগত কথোপকথন শোনা উচিত নয়। অনিচ্ছাকৃতভাবে কথাগুলো কানে এলো। হয়তো এই কথাগুলো আপনাদের তদন্তের কাজে লাগবে। তাই বলছি।কেউ একজন বারবার জানতে চাইছিল উনি ঠিক কোথায় আছে। এইটুকু বুঝতে পারছিলাম উনি খুব চেপে আছে।অনিক বাবু আমাকে ইশারায় পাশের গেস্ট রুমে চলে যেতে বলে। আমি বিরক্ত হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম, কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না। সকালে উঠে ওকে ডাকতে গিয়ে দেখি—" সীমা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। স্যার বিশ্বাস করুন এই খুনের সাথে আমি কোনো ভাবেই জড়িত নই।বাড়িতে আমার অসুস্থ মা আছে।আমি না পৌঁছেলে ওনাকে ওষুধ খাবার দেওয়ার কেউ নেই।
ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জি একটু বাঁকা স্বরে বললেন,সে সব ঠিক আছে।আমরা সব প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর পেলে আপনাকে ছেড়ে দেবো।"এবার কান্নাকাটি থামলে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনি বললেন সকালে অনিককে ঘরে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে বাগানে গেলেন এবং সেখানে ওকে গলাকাটা অবস্থায় দেখলেন। তারপর কী হলো?"
সীমা নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, "আমার ফেরার তাড়া ছিল। সকালে ওকে ঘরে না পেয়ে এদিক ওদিক খোঁজা খুঁজি করলাম , বাথরুমেও খুঁজলাম, কোথাও নেই। দু-তিনবার ওর নম্বরে ফোন করলাম। দেখলাম রিংটোনের শব্দ বাগানের দিক থেকে আসছে। আমি সেদিকে এগোতেই দেখলাম— অনিক বাবু মাটিতে পড়ে আছে, চাপচাপ রক্ত চারদিকে। আমি 'হেল্প হেল্প' বলে চিৎকার করতেই বিশুদা দৌড়ে এল। এইরকম সিচুয়েশনে অনিক বাবুকে পড়ে থাকতে দেখে বিশুদা প্রায় অজ্ঞান পড়ল তারপর একটু সুস্থ হলে আমিই ওকে বললাম পুলিশে খবর দিতে।"
ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জী সীমা দেবীর শুকিয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো "সকাল থেকে পেতে তো কিছু পরেনি?"
সীমা মাথা নীচু করে ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জির কথার জবাব দিলো।
চ্যাটার্জি এবার সীমাকে ব্রেকফাস্টের অছিলায় কনস্টেবল অনিন্দ্যর সাথে পাঠিয়ে দিয়ে একা বিশু পালের মুখোমুখি হলেন। বিশুর গেঞ্জিটা ঘামে ভেজা, সে থরথর করে কাঁপছে।
"বিশু, তুমি তো বাইরেই ছিলে। কোনো চিৎকার, ধস্তাধস্তি বা গাড়ির শব্দ শোনোনি?"
বিশু তোতলাতে তোতলাতে বলল, "না স্যার। সাহেব বলে দিয়েছিলেন রাতে যেন আউটহাউস থেকে না বেরোই। রান্নাবান্না শেষ করে আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দিদিমণির চিৎকার শুনেই শুধু ছুটে এসেছি।"
চ্যাটার্জি পেন দিয়ে টেবিলে একটা ছন্দহীন শব্দ তুলছিলেন। হঠাৎ থেমে গিয়ে বললেন, "বিশু, লাশের পাশে অনিকের মোবাইল পাওয়া যায়নি। সীমা ফোন করে লাশের হদিশ পেলেন, অথচ পুলিশ যাওয়ার আগেই ফোন উধাও? ফোনটা কি তুমি সরিয়েছ?"
বিশুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "না হুজুর! ভগবানের কসম, আমি ফোন ছুঁইনি।"
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে ঢুকলেন কনস্টেবল রতন লাল। হাতে একটা প্লাস্টিক ব্যাগ, ভেতরে একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ি আর কিছু খুচরো পয়সা। "স্যার, এগুলো লাশের পাশেই পড়ে ছিল।"
চ্যাটার্জি ইশারায় সেগুলো টেবিলের উপরে রাখতে নির্দেশ দিল।
চ্যাটার্জি এবার সরাসরি বিশুর দিকে ঝুঁকে এলেন। তার গলার স্বরে হিমশীতল ধার। এই অনিক চৌধুরী লোকটা কেমন ছিলো?"
বিশু মাথা নীচু করে উত্তর দিলো "এমিতে ছোটবাবু লোকটা ভালো টাকা পয়সার ব্যাপারে কখনও কার্পণ্য করতেন না,তবে একটু খামখেয়ালি আর বদমেজাজি।
কখনও রান্না বান্না করতে বলে আসতেন না।আবার কখনও হঠাৎ করে চলে এসে খাবার দাবারের ফরমাইস করত। এখানে শহরের মত রাতদুপুরে দোকান খোলা পাওয়া যায় না।তখন খুব মুশকিল পড়তে হতো।
বিশু, অনিক চৌধুরী তোমাকে খুব মারধর করত না?"
বিশু চমকে উঠল। "না... মানে... বড় লোক তো স্যার, একটু মেজাজ ছিল গালমন্দ করতো কিন্তু গায়ে হাত কখনও দেয়নি।"
রতন লাল মৃদু হেসে বললেন, "স্যার, বিশুর প্যান্টের ওপর হাঁটুর কাছে কাদা লেগে আছে। ওই নির্দিষ্ট কাদা শুধু বাগানের সেই কোণাতেই আছে যেখানে লাশটা পাওয়া গেছে। ও উপুড় হয়ে সেখানে কিছু করছিল।"
চ্যাটার্জি কাদার দাগটা ভালো করে লক্ষ করল।
চ্যাটার্জি গর্জিয়ে উঠলেন, "বিশু! সত্যি কথা বল, নয়তো এই ডান্ডা পিঠে পড়লে তখন কিন্তু কথা বেরোবে না!"
বহু আচ্ছা আচ্ছা লোক এই ডান্ডার ভয়ে কল কল করে সত্যি কথা স্বীকার করেছে। এই ডান্ডার প্রচুর গুন।
বিশু এবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে চ্যাটার্জির পা জড়িয়ে ধরল। "স্যার, বিশ্বাস করুন আমি কিছু করিনি!
অনেক দিন থেকে আমার মেয়েটা একটা ফোনের জন্য খুব বিরক্ত করছিল।আমি গরীব মানুষ একটা ফোন কিনে দেওয়ার মতো পয়সা আমার নেই।বাগেনের ঘাসের ওপরে একটা চকচকে ফোন পড়ে থাকতে দেখে খুব লোভ হলো। টুক করে ফোনটা তুলে পাশের দেবদারু গাছের পাশে একটা গর্তে ফেলে রেখেছি।ভেবেছিলাম ফোনটা যদি কেউ খুঁজে না পায় তবে ওটা আমি নিয়ে নেবো। স্যার খুব ভুল হয়ে গেছে । মাপ করে দিন।এই কান ধরছি আর কোনোদিন এরম কাজ করব না।
বিশু হাঁপাতে হাঁপাতে স্বীকারউক্তি করল।
ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জি রতন লালের দিকে তাকিয়ে বলল অনিক চৌধুরীর ফোনটা বিশুর বলেদেওয়া জায়গা থেকে উদ্ধার করতে।তিনি জানতেন, ওই ফোনটাই এই রহস্যের শেষ চাবিকাঠি। অনিক চৌধুরী ফোনের ওপাশে কার সাথে জীবনের শেষ তর্কে জড়িয়েছিলেন, তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।না কি আর কেউ ছিলো ফোনের ওপর প্রান্তে,যার ফোন রাতে বাগেন বেরিয়ে ছিলেন!
4
ডানকুনির সেই নির্জন বাগানবাড়িটা এখন যেন এক বিষণ্ণ আর থমথমে দ্বীপ। চারপাশ পুলিশের লাল-সাদা 'ক্রাইম সিন' ফিতায় ঘেরা। গেটের বাইরে ওসির জিপ আর দুটো ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরের দেবদারু গাছে ঘেরা বাগানটায় দিনের বেলাতেও রোদের তেজ পৌঁছায় না; এক চিরস্থায়ী শীতল ছায়া যেন সেখানে বাসা বেঁধেছে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝে মাঝে পুলিশের ওয়াকিটকির কর্কশ আওয়াজ ভেসে আসছে।
বিখ্যাত শিল্পপতি অমরেন্দ্র চৌধুরীর একমাত্র ছেলে অনিক চৌধুরীর নিথর দেহটা যখন স্ট্রেচারে করে বেরিয়ে এল, তখন সাদা চাদরের ওপর রক্তের কালচে দাগগুলো রোদে আরও বীভৎস দেখাচ্ছিল।
ডানকুনি থানার ছোট অন্ধকার ঘরে দুজনকে মুখোমুখি বসিয়ে রাখা হয়েছে। একদিকে জাঁকজমকপূর্ণ সাজে থাকা সীমা রায়। চোখের কাজল জলে মিশে গাল বেয়ে নেমে এসেছে। তবে এই অশ্রুধারার উৎস ঠিক কী—শোক, অভিনয়, নাকি ফেঁসে যাওয়ার ভয়—তা বোঝা দায়। তার উল্টোদিকে কুঁকড়ে বসে আছে প্রৌঢ় কেয়ারটেকার বিশু পাল।
তদন্তকারী দলের প্রধান ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জি টেবিলের ওপর একটা ফাইল ছুড়ে দিয়ে সীমার দিকে তাকালেন। "সীমা দেবী, আপনি কি অনিক বাবুর বান্ধবী? ওনার মতো হাই-প্রোফাইল ক্লায়েন্টের সাথে কাল রাতে আপনি এখানে ছিলেন। অনিক বাবু আপনার বেশ ঘনিষ্ঠ, তাই না?"
সীমা কাঁপাকাঁপা হাতে রুমাল দিয়ে ঘাম মুছলেন। চ্যাটার্জি আবার প্রশ্ন করলেন, "কতদিন থেকে চেনেন আপনি ওনাকে?"
সীমা ক্ষীণ স্বরে বললেন, "মাস দুয়েক আগে এক নাইট ক্লাবে আলাপ। এর আগে দু-একবার বাইরে দেখা হয়েছে, কিন্তু এই বাগানবাড়িতে কালই প্রথম আসি। সন্ধ্যা সাতটায় পার্ক স্ট্রিট থেকে উনি আমাকে পিক-আপ করেন।"
"তার মানে আপনি পেইড বান্ধবী? টাকার বিনিময়ে যেকোনো ঘনিষ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন। তা সে যাই হোক, আসল কথায় আসা যাক," চ্যাটার্জি চোখ ছোট করে তাকালেন, "গতকাল রাতে কী হয়েছিল? বিস্তারিত বলুন।"
সীমার গলার স্বর বসে গেছে। "অনিক বাবু প্রচুর ড্রিঙ্ক করেছিলেন। ওনার মেজাজ একদম ঠিক ছিল না। ফোনে কারও সাথে তুমুল কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। আমারও পরিস্থিতিটা ঠিক ভালো লাগছিল না, খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। আসলে পেট চালানোর জন্য আমাদের অনেক সময় অনেক খারাপ পরিস্থিতিও মেনে নিতে হয়। জীবনে টাকা খুব দরকারি স্যার। বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ, মুদির দোকানের ধার, ঘর ভাড়া, ইলেকট্রিক বিল—সব কিছুর জন্যই টাকার প্রয়োজন। বাবার ক্যানসার আমাদের সর্বস্বান্ত করে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছিল। একটা চাকরির জন্য দরজায় দরজায় ঘুরে কোনো ব্যবস্থা করতে না পেরে শেষমেশ বাধ্য হয়ে এই পেশায় আসা।"
তিনি একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন, "কারও ব্যক্তিগত কথা শোনা উচিত নয়, তবু অনিচ্ছাকৃতভাবে কথাগুলো কানে আসছিল। হয়তো আপনাদের তদন্তে কাজে লাগবে। ফোনের ওপাশ থেকে কেউ একজন বারবার জানতে চাইছিল উনি ঠিক কোথায় আছেন। বুঝতে পারছিলাম উনি খুব চাপে আছেন। অনিক বাবু আমাকে ইশারায় পাশের গেস্ট রুমে চলে যেতে বলেন। আমি বিরক্ত হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম, কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না। সকালে উঠে ওকে ডাকতে গিয়ে দেখি—" সীমা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। "স্যার বিশ্বাস করুন, এই খুনের সাথে আমি জড়িত নই। বাড়িতে আমার অসুস্থ মা আছেন, আমি না পৌঁছালে ওনাকে ওষুধ দেওয়ার কেউ নেই।"
ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জি একটু বাঁকা স্বরে বললেন, "সে সব ঠিক আছে। আমরা সব প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর পেলে আপনাকে ছেড়ে দেব। এবার কান্নাকাটি থামলে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনি বললেন সকালে অনিককে ঘরে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে বাগানে গেলেন এবং সেখানে ওকে গলাকাটা অবস্থায় দেখলেন। তারপর কী হলো?"
সীমা নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, "আমার ফেরার তাড়া ছিল। সকালে ওকে ঘরে না পেয়ে এদিক-ওদিক খুঁজলাম, বাথরুমেও দেখলাম, কোথাও নেই। দু-তিনবার ওর নম্বরে ফোন করলাম। দেখলাম রিংটোনের শব্দ বাগানের দিক থেকে আসছে। আমি সেদিকে এগোতেই দেখলাম—অনিক বাবু মাটিতে পড়ে আছেন, চারদিকে চাপচাপ রক্ত। আমি 'বাঁচাও বাঁচাও' বলে চিৎকার করতেই বিশুদা দৌড়ে এল। এই অবস্থা দেখে বিশুদা প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। পরে ও একটু সুস্থ হলে আমিই ওকে বললাম পুলিশে খবর দিতে।"
ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জি সীমার শুকিয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি তো?" সীমা মাথা নিচু করে নিরুত্তর রইলেন।
চ্যাটার্জি এবার সীমাকে ব্রেকফাস্টের অছিলায় কনস্টেবল অনিন্দ্যর সাথে পাঠিয়ে দিয়ে বিশু পালের মুখোমুখি হলেন। বিশুর গেঞ্জিটা ঘামে ভেজা, সে থরথর করে কাঁপছে।
"বিশু, তুমি তো বাইরেই ছিলে। কোনো চিৎকার, ধস্তাধস্তি বা গাড়ির শব্দ শোনোনি?"
বিশু তোতলাতে তোতলাতে বলল, "না স্যার। সাহেব বলে দিয়েছিলেন রাতে যেন আউটহাউস থেকে না বেরোই। রান্নাবান্না শেষ করে আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দিদিমণির চিৎকার শুনেই শুধু ছুটে এসেছি।"
চ্যাটার্জি পেন দিয়ে টেবিলে একটা ছন্দহীন শব্দ তুলছিলেন। হঠাৎ থেমে গিয়ে বললেন, "বিশু, লাশের পাশে অনিকের মোবাইল পাওয়া যায়নি। সীমা ফোন করে লাশের হদিশ পেলেন, অথচ পুলিশ যাওয়ার আগেই ফোন উধাও? ফোনটা কি তুমি সরিয়েছ?"
বিশুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "না হুজুর! ভগবানের কসম, আমি ফোন ছুঁইনি।"
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে ঢুকলেন কনস্টেবল রতন লাল। হাতে একটা প্লাস্টিক ব্যাগ, ভেতরে একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ি আর কিছু খুচরো পয়সা। "স্যার, এগুলো লাশের পাশেই পড়ে ছিল।" চ্যাটার্জি ইশারায় সেগুলো টেবিলের ওপর রাখতে বললেন।
চ্যাটার্জি এবার সরাসরি বিশুর দিকে ঝুঁকে এলেন। তার গলার স্বরে হিমশীতল ধার— "অনিক চৌধুরী লোকটা কেমন ছিল?"
বিশু মাথা নিচু করে উত্তর দিল, "এমনিতে ছোটবাবু লোক ভালো ছিল, টাকা-পয়সার কার্পণ্য করতেন না। তবে খুব খামখেয়ালি আর বদমেজাজি ছিলেন। কখনও রান্নাবান্না করতে বারণ করতেন, আবার কখনও হঠাৎ এসে খাবারের ফরমাশ করতেন। এখানে তো শহরের মতো রাতদুপুরে দোকান খোলা থাকে না, তখন খুব মুশকিলে পড়তাম।"
"বিশু, অনিক চৌধুরী তোমাকে খুব মারধর করত, না?"
বিশু চমকে উঠল। "না... মানে... বড়লোক তো স্যার, একটু মেজাজ ছিল। গালমন্দ করত ঠিকই, কিন্তু গায়ে হাত কখনও দেয়নি।"
রতন লাল মৃদু হেসে বললেন, "স্যার, বিশুর প্যান্টের হাঁটুর কাছে কাদা লেগে আছে। ওই নির্দিষ্ট কাদা শুধু বাগানের সেই কোণাতেই আছে যেখানে লাশটা পাওয়া গেছে। ও উপুড় হয়ে সেখানে কিছু একটা করছিল।"
চ্যাটার্জি গর্জিয়ে উঠলেন, "বিশু! সত্যি কথা বল, নয়তো এই ডান্ডা পিঠে পড়লে তখন কিন্তু কথা বেরোবে না! বহু আচ্ছা আচ্ছা লোক এই ডান্ডার ভয়ে সত্যি কথা স্বীকার করেছে।"
বিশু এবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে চ্যাটার্জির পা জড়িয়ে ধরল। "স্যার, বিশ্বাস করুন আমি কিছু করিনি! অনেক দিন থেকে আমার মেয়েটা একটা ফোনের জন্য খুব বিরক্ত করছিল। আমি গরিব মানুষ, ফোন কিনে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। বাগানের ঘাসের ওপর ওই চকচকে ফোনটা পড়ে থাকতে দেখে খুব লোভ হয়েছিল। টুক করে তুলে নিয়ে পাশের দেবদারু গাছের নিচে একটা গর্তে ফেলে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম কেউ যদি খুঁজে না পায়, তবে ওটা আমি নিয়ে নেব। স্যার, খুব ভুল হয়ে গেছে। মাপ করে দিন, আর কোনোদিন এমন কাজ করব না।"
ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জি রতন লালের দিকে তাকিয়ে বললেন ফোনটা উদ্ধার করতে। তিনি জানতেন, ওই ফোনটাই এই রহস্যের শেষ চাবিকাঠি। অনিক চৌধুরী ফোনের ওপাশে কার সাথে জীবনের শেষ তর্কে জড়িয়েছিলেন, নাকি আর কেউ ছিল—যার ফোন পেয়ে তিনি রাতে বাগানবাড়ির বাইরে বেরিয়েছিলেন, তা জানা এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
5
ডানকুনি থানার নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাতই টেবিলের ওপর রাখা ল্যান্ডফোনটা তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল। ফাইলের স্তূপ থেকে মুখ তুলে ইন্সপেক্টর চ্যাটার্জি রিসিভারটা কানে তুললেন। বাইরে তখন বিকেলের আলো মরে আসছে।
"হ্যালো, ডানকুনি থানা।"
"চ্যাটার্জি, আমি আইসি সঞ্জয় রক্ষিত বলছি," ওপাশ থেকে ভেসে এল এক গম্ভীর এবং ভারী কণ্ঠস্বর।
চ্যাটার্জি সোজা হয়ে বসলেন। গলার স্বরে বাড়তি সতর্কতা নিয়ে বললেন, "বলুন স্যার।"
"অনিক চৌধুরীর খুনের তদন্ত কতদূর এগুলো? কাজের কাজ কিছু হলো?" আইসির প্রশ্নে একটা প্রচ্ছন্ন তাগাদা ছিল।
চ্যাটার্জি সংক্ষেপে কিন্তু গুছিয়ে উত্তর দিলেন, "স্যার, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অনিক চৌধুরীর মোবাইল ফোনটা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ওটা লকড অবস্থায় ছিল। আমি ফোনটা পাসওয়ার্ড ব্রেক করার জন্য ইতিমধ্যেই সাইবার সেলে পাঠিয়ে দিয়েছি। আশা করছি দ্রুত ওটা অন করা যাবে।"
একটু থেমে তিনি যোগ করলেন, "ওই রাতে অনিক বাবুর সাথে সীমা রায় নামে এক মহিলা ছিলেন, তাকে আমরা ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। ওনার বয়ানে কিছু অসঙ্গতি থাকলেও আপাতত উনি আমাদের হেফাজতেই আছেন। এছাড়া কেয়ারটেকার বিশু পালকেও জেরা করা হয়েছে। বডি ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে আর ফরেনসিক এক্সপার্টরা ঘটনাস্থল থেকে যা যা নমুনা পেয়েছে—সব ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।"
ফোনের ওপ্রান্ত থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। সঞ্জয় রক্ষিত বললেন, "চ্যাটার্জি, তুমি তো জানোই এটা কতটা হাই-প্রোফাইল কেস। শিল্পপতি অমরেন্দ্র চৌধুরীর ছেলের খুন বলে কথা! ওপর মহল থেকে ক্রমাগত চাপ আসছে। তার ওপর মিডিয়া একদম উঠেপড়ে লেগেছে, থানার বাইরে ভিড় উপচে পড়ছে। আমাদের হাতে সময় খুব কম।"
চ্যাটার্জি আশ্বস্ত করে বললেন, "আমি বুঝতে পারছি স্যার। আমরা আমাদের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করছি। ফোনটার ভেতরেই আসল রহস্য লুকিয়ে আছে বলে আমার ধারণা।"
"ঠিক আছে। ফোনের রিপোর্ট আসা মাত্রই দেখো সেখান থেকে কী ক্লু বের করা যায়। ওই সীমা রায় আর বিশু পাল—এই দুজনকে কড়া নজরে রাখবে। তদন্তের প্রয়োজনে যা যা লাগবে আমাকে জানিও, আমি ওপর থেকে সব ব্যবস্থা করে দেব। কিন্তু রেজাল্ট চাই চ্যাটার্জি, খুব দ্রুত!"
"ইয়েস স্যার, একদম। আমি প্রতি মুহূর্তের আপডেট আপনাকে রিপোর্ট করব।"
ফোনটা নামিয়ে রাখতেই চ্যাটার্জি অনুভব করলেন ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে এক অদৃশ্য শত্রু। আইসির কথাগুলো যেমন পেশাদার, তেমনি তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল একটা চাপা উদ্বেগ। এই রহস্যের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ডানকুনির এই থমথমে পরিবেশ কাটার কোনো লক্ষণ নেই।
চ্যাটার্জি আর দেরি করলেন না। রতন লালকে সঙ্গে নিয়ে জিপ ছুটিয়ে দিলেন ফরেনসিক ল্যাবের উদ্দেশ্যে। ডানকুনির ঘিঞ্জি রাস্তা পেরিয়ে যখন ল্যাবের সামনে গাড়িটা থামল, তখন আকাশের মুখ ভার। কাঁচের ভারি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে এল রাসায়নিকের সেই পরিচিত তীব্র গন্ধ।
সামনে এগিয়ে এলেন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। চ্যাটার্জি সরাসরি কাজের কথায় এলেন, "দেবব্রত বাবু, অনিক চৌধুরীর পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা নিয়ে একটু বিশদে বলুন তো। কী পেলেন?"
দেবব্রত বাবু চ্যাটার্জি এবং রতন লালকে সামনে রাখা দুটি চেয়ারে বসার ইঙ্গিত করলেন। টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা খুলে তিনি শুরু করলেন, "চ্যাটার্জি বাবু, খুনি এখানে খুব অদ্ভুত এক অস্ত্র ব্যবহার করেছে। প্রথম দর্শনে আমাদের মনে হয়েছিল কোনো ধারালো কাঁচের টুকরো দিয়ে হয়তো গলা কাটা হয়েছে। কিন্তু পরে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করার পর আমরা নিশ্চিত হলাম যে, এটা কোনো কাঁচ বা সাধারণ ধাতব ছুরি নয়।"
চ্যাটার্জি ভুরু কুঁচকে তাকালেন, "তবে?"
"গলার শ্বাসনালি কাটার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে মাঞ্জা দেওয়া সুতো," দেবব্রত বাবুর গলায় বিস্ময়। "খুব নিপুণ হাতে মাঞ্জা সুতো দিয়ে টান দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত ঘর্ষণ আর গতি বাড়ানোর জন্য কোনো মোটরচালিত লাটাই ব্যবহার করা হয়েছে। আততায়ী এতটাই ধুরন্ধর যে, এক্ষেত্রে ওর কোনো হাতের ছাপ বা সরাসরি এভিডেন্স পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।"
চ্যাটার্জি স্থির হয়ে শুনছিলেন। দেবব্রত বাবু চালিয়ে গেলেন, "সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভিকটিমের শরীরে কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। অর্থাৎ অনিক চৌধুরীকে অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্রমণ করা হয়েছে। আর মৃত্যুর সময় কাল রাত ১টা ৩০ মিনিট থেকে ২টোর মধ্যে। মৃতদেহের পাশ থেকে পাওয়া সেই বন্ধ ঘড়ি আর খুচরো পয়সাগুলো আমি দেখেছি, ওখানেও কোনো রহস্যময় আঙুলের ছাপ মেলেনি।"
রতন লাল পাশে বসে সবটা শুনছিলেন। এবার তিনি নিচু স্বরে চ্যাটার্জির দিকে তাকিয়ে বললেন, "তার মানে স্যার, খুনি কিন্তু সাধারণ কেউ নয়। সে শুধু বুদ্ধিমানই নয়, রীতিমতো মাথা খাটিয়ে এই 'মার্ডার উইপেন' বা খুনের অস্ত্র তৈরি করেছে। এটা অনেকটা পারফেক্ট মার্ডারের মতো পরিকল্পনা।"
চ্যাটার্জির চোখে তখন এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। তিনি বুঝতে পারছেন, ডানকুনির এই রহস্য যতটা সহজ মনে হয়েছিল, জট আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর।
রতন লাল আর চ্যাটার্জি আর সময় নষ্ট না করে সরাসরি পৌঁছে গেলেন সাইবার ক্রাইম বিভাগের তরুণ অফিসার আয়নের কাছে। অনিক চৌধুরীর উদ্ধার হওয়া ফোনটি ছিল এই রহস্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
আয়নকে দেখতেই চ্যাটার্জি প্রশ্ন করলেন, "কী আয়ন, ফোনটা কি কথা বলতে শুরু করেছে? পাসওয়ার্ড ব্রেক করা গেল?"
আয়ন হাসিমুখে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে বলল, "হ্যাঁ স্যার, জাস্ট মিনিট দশেক আগেই সফল হয়েছি। বেশ কড়া সিকিউরিটি ছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ফোনটা এখন একদম আনলকড।"
চ্যাটার্জি তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, "চমৎকার! আয়ন, আমার অনিক চৌধুরীর খুনের ঠিক আগের কয়েক ঘণ্টার কল লিস্ট এবং মেসেজ ডিটেইলস চাই। বিশেষ করে ইন্টারনেটে ও শেষ কী সার্চ করেছিল বা কোনো থার্ড পার্টি অ্যাপ ব্যবহার করেছিল কি না, সেটা খুব জরুরি। ওই ফোনের ভেতরেই হয়তো খুনি নিজের অজান্তেই কোনো চিহ্ন রেখে গেছে।"
আয়ন কি-বোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতে বলল, "আমি ডেটা এক্সট্রাক্ট করছি স্যার। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সব তথ্য আপনার কাছে পৌঁছে যাবে।"
আয়নের ঘর থেকে বেরিয়ে চ্যাটার্জি রতন লালের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তোমাকে থানায় নামিয়ে আমি একবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসব। মাথাটা বড্ড জ্যাম হয়ে আছে, একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার।"
জিপ চলতে শুরু করল। ডানকুনি থেকে থানার পথে আজ অসহ্য যানজট। চ্যাটার্জি বিরক্ত হয়ে জানলার বাইরে তাকালেন। গত এক বছর ধরে রাস্তার এই এক বেহাল দশা। নতুন জলের পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে তো চলছেই—রাস্তা খুঁড়ে একাকার। ধুলো আর যান্ত্রিক আওয়াজে শহরটা যেন আরও ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে।
রতন লালকে থানার মোড়ে নামিয়ে দিয়ে চ্যাটার্জি যখন নিজের বাড়ির সামনে পৌঁছালেন, তখন ঘড়িতে বিকেল সাড়ে পাঁচটা। কলিংবেলের তীক্ষ্ণ শব্দে দরজা খুলে দিলেন স্ত্রী সুমিত্রা। চ্যাটার্জির চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
ভেতরে পা দিয়েই চ্যাটার্জি জিজ্ঞেস করলেন, "বাবাই স্কুল থেকে ফিরেছে?"
সুমিত্রা উদ্বেগের স্বরে বললেন, "হ্যাঁ, ও তো সেই পাঁচটায় ফিরেছে। কিন্তু তোমার মুখটা এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন? কোনো বড় কেস?"
চ্যাটার্জি সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বললেন, "কেসটা একটু গোলমেলে সুমিত্রা। মাঞ্জা সুতো দিয়ে খুন, অথচ কোনো প্রমাণ নেই। আয়নের রিপোর্টটা পেলে হয়তো অন্ধকার কিছুটা কাটবে। বাবাইকে একবার ডেকে দাও তো, ওর সাথে একটু কথা বলি।"
চ্যাটার্জি সোফায় বসে ভাবছিলেন অনিক চৌধুরীর খুনেরহস্য নিয়ে। ঠিক সেই সময় সুমিত্রার ডাকে বাবাই ঘরে ঢুকল। বাবাই ক্লাস সেভেনের ছাত্র, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। চ্যাটার্জি ছেলেকে কাছে টেনে নিলেন। খুনের বীভৎসতা আর তদন্তের জটিলতার মাঝে এইটুকু সময় তিনি নিজের মতো করে কাটাতে চান।
চ্যাটার্জি ছেলের মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, "কী বাবাই, তোর পড়াশোনা কেমন চলছে রে?"
বাবাই মুখটা একটু কাঁচুমাচু করে বলল, "এমনিতে সব ঠিকঠাকই আছে বাবা, কিন্তু অংকটা নিয়ে একটু চাপে আছি। সব কেমন ধাঁধার মতো লাগে।"
চ্যাটার্জি হেসে বললেন, "অংক আসলে কোনো কঠিন বিষয় নয়, খুব সহজ। শুধু ফর্মুলাগুলো মনে রাখা চাই। আর একটু বুদ্ধি খাটালে দেখবি কোনো অংকই কঠিন মনে হচ্ছে না। জীবনটাও তো একটা অংক, মেলাতে পারলেই সহজ।"
বাবাই একটু অভিমানের সুরে বলল, "অংক করতে আমার একদম ভালো লাগে না বাবা। স্যার সবসময় বলেন—প্র্যাকটিস করো, প্র্যাকটিস করো আর প্র্যাকটিস করো! কিন্তু সারাদিন কত প্র্যাকটিস করব? তাহলে খেলব কখন?"
ছেলের কথা শুনে চ্যাটার্জি হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, "খেলাধুলা তো করতেই হবে, খেলাধুলা করলে মন ও শরীর দুই ভালো থাকে। কিন্তু বাবাই, সঙ্গে পড়াশোনাটাও জরুরি। এখন তোর জীবনের সেরা সময়। এই সময় একবার চলে গেলে আর ফেরত পাবি না।"
তিনি জানালার বাইরের গাছটার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, "এই সময়টা জীবন অনেকটা গাছের বীজের মতো। বীজ যখন অঙ্কুরিত হয়, তখন তাকে মাটির অন্ধকারে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়। সে তার শেকড়কে মাটির গভীরে প্রবেশ করায় যাতে সেখান থেকে পর্যাপ্ত খনিজ আর রস সংগ্রহ করে নিজেকে মহীরুহ করে তুলতে পারে। তোদের জীবনটাও এখন ঠিক তেমন। এখন যত বেশি পরিশ্রমের গভীরে নামতে পারবি, তোদের ভবিষ্যৎ মহীরুহ তত বেশি সুন্দর আর শক্তিশালী হবে।"
বাবাই বাবার কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল। চ্যাটার্জি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "তা, তোদের পরীক্ষা আবার কবে থেকে শুরু?"
বাবাই উত্তর দিল, "আর মাসখানেক পর থেকেই পরীক্ষা শুরু হবে বাবা।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই চ্যাটার্জির ফোনে একটা ইমেল ঢোকার সিগন্যাল বাজল। চ্যাটার্জি দ্রুত ফোনটা হাতে নিয়ে মেলটা চেক করলেন। আয়ন অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠিয়েছে। চ্যাটার্জি আর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে সেই ডিটেইলসগুলো রতন লালকে ফরওয়ার্ড করে দিলেন।
ফোনে রতন লালকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, "রতন, আমি তোমাকে একটা মেল পাঠালাম। অনিক চৌধুরীর কল লিস্টে যে কটা সন্দেহজনক নম্বর আছে, তাদের প্রত্যেকের সিডিআর (CDR) আর ফুল ডিটেইলস আমার এক্ষুনি চাই। দেখো তো এই নম্বরগুলোর মধ্যে কমন কোনো লিঙ্ক পাওয়া যায় কি না।"
তদন্তের চাকা আবার ঘুরতে শুরু করেছে। চ্যাটার্জি বুঝতে পারছেন, অন্ধকারের গভীরে শেকড় ছড়ানোর সময় এবার তাঁর নিজেরও এসেছে।
বাইরে গোধূলির আলো ম্লান হয়ে আসছে। ড্রয়িংরুমে চ্যাটার্জি আর তাঁর স্ত্রী সুমিত্রা বেশ আয়েশ করে সান্ধ্য চায়ের আসর জমিয়েছেন। ঘরটি পরিপাটি, ঝকঝকে। আসবাবপত্রের গায়ে আঙুল ছোঁয়ালে বিন্দুমাত্র ধুলো পাওয়া যাবে না; সুমিত্রার নিপুণ হাতের ছোঁয়া প্রতিটি কোণে স্পষ্ট। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে বাবাইয়ের গৃহশিক্ষকের মৃদু কণ্ঠস্বর। এক শান্ত, স্নিগ্ধ পারিবারিক আবহ।
সুমিত্রা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আলগোছে বললেন, "হ্যাঁ গো, মনে আছে তো? সামনের মাসের তিন তারিখ মিলির বিয়ে। ছুটিটা কিন্তু ম্যানেজ করতেই হবে।"
মিলি চ্যাটার্জির খুড়তুতো শালী। সম্পর্কে বেশ মিষ্টি একটা টান থাকলেও চ্যাটার্জি জানেন, তাঁর পেশায় 'ছুটি' শব্দটা অভিধানে ডুমুরের ফুলের মতো। তিনি একটু হেসে রসিকতা করে বললেন, "নিশ্চয়ই! শালীর বিয়ে বলে কথা, না গেলে তো ক্যারাটে প্যাঁচ দিয়ে হাড়গোড় গুঁড়ো করে দেবে।"
মুখে বললেও চ্যাটার্জি মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর প্রফেশনে ডিউটি আর ডেসটিনি কখন কোথায় আছড়ে পড়বে, তা আগে থেকে বলা অসম্ভব। কাজের পাহাড় না কমলে ছুটির আশা করা বাতুলতা মাত্র।
সুমিত্রা এবার অনুযোগের সুরে বললেন, "তা ঠিক করেছ কিছু? উপহার হিসেবে কী দেওয়া যায়? শেষমেশ তো সেই আমাকেই দৌড়ঝাঁপ করতে হবে, তুমি তো শুধু চেকটা কেটেই খালাস!"
চ্যাটার্জি চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে বিজ্ঞের মতো বললেন, "আর যাই হোক, অন্তত সোনার কথা ভুলেও ভেবো না। দামটা দেখেছ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? মধ্যবিত্তের নাগাালের বাইরে চলে যাচ্ছে সব।"
সুমিত্রা একটু ম্লান হেসে সায় দিলেন, "তা যা বলেছ। দশ বছর আগেও তো সোনার দর বেশ হাতের নাগালে ছিল। এখন আকাশছোঁয়া! সত্যিই তো, মধ্যবিত্তের কাছে ওসব এখন টক আঙুর ফল।"
স্বামীর সাথে স্ত্রীর এই মিষ্টি বিতর্কের মাঝেই ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঝনঝন করে বেজে উঠল চ্যাটার্জির ফোন। স্ক্রিনে নামটা ফুটে উঠতেই চ্যাটার্জির চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। ফোনের ওপারে রতন লাল।
"হ্যালো, রতন? কী খবর?"
রতন লালের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল, "স্যার, একটা মারাত্মক লিড পাওয়া গেছে। আপনি দয়া করে যত দ্রুত সম্ভব অফিসে চলে আসুন ।
চ্যাটার্জির হাতের চায়ের কাপটা টেবিলে রাখা মাত্রই তাঁর পারিবারিক মেজাজ নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সুমিত্রার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিলেন তিনি। কোনো কথা না বললেও সুমিত্রা বুঝে গেলেন—তিন তারিখের ছুটির সম্ভাবনাটা বোধহয় ওই চায়ের বাষ্পের মতোই মিলিয়ে গেল।
7
অফিসে পা রাখা মাত্রই রতন লাল একটা নীল রঙের ফাইল চ্যাটার্জির সামনে বাড়িয়ে দিল। ফাইলের ভেতর রাখা ছবি আর সাইবার সেলের রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে চ্যাটার্জির চোখের মণি যেন স্থির হয়ে গেল। তাঁর অভিজ্ঞ চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময়। রিপোর্টটা খুব খুঁটিয়ে পড়ার পর তিনি রতন লালের দিকে তাকিয়ে বললেন, "রতন, আমাদের হাতে সময় একদম কম। এক্ষুনি একবার অনিক চৌধুরীর বাড়ি যাওয়া প্রয়োজন।"
মুহূর্তের মধ্যে পুলিশি তৎপরতা শুরু হলো। সাদা রঙের জিপটা সাইরেন বাজিয়ে ডানকুনি ছাড়িয়ে শ্যামবাজারের ঘিঞ্জি রাস্তা ধরে ছুটল। বালিগঞ্জ প্লেসে পৌঁছাতে যতটা সময় লাগার কথা ছিল, ট্রাফিক কিছুটা কম থাকায় তার আগেই গাড়িটা এসে দাঁড়াল অনিক চৌধুরীর বিশাল সদর দরজার সামনে।
ভারী লোহার গেট খুলে দিতেই গাড়িটা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। চারপাশটা যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা। বাড়ির সামনের বাগানটা অদ্ভুত সুন্দর। সেখানে নানা রঙের মরশুমি ফুল আর অর্কিডের মেলা। বাগানের বিভিন্ন কোণে দাঁড়িয়ে আছে সাদা বেলে পাথরের গ্রিক স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি কিছু মূর্তি। মাঝখান দিয়ে পিচঢালা রাস্তাটা সরাসরি চলে গেছে বিশাল এক সাদা প্রাসাদের মতো বাড়ির গাড়ি-বারান্দায়।
কলিং বেলের সুইচ টিপতেই দরজা খুলে দিলেন একজন মাঝবয়সী মহিলা, সম্ভবত এই বাড়ির বহু পুরনো পরিচারিকা। চ্যাটার্জি আর রতন লাল ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই এক আভিজাত্যের ঘ্রাণ নাকে এল। ঘরের কোণে রাখা দামী শো-পিস থেকে শুরু করে সোফার গদি—সবকিছুতেই রুচিশীল উচ্চবিত্ত পরিবারের ছোঁয়া স্পষ্ট।
পরিচারিকা তাঁদের সোফায় বসার অনুরোধ করলেন। চ্যাটার্জি গম্ভীর গলায় বললেন, "আমরা অনিক চৌধুরীর আকস্মিক মৃত্যুর তদন্তের ব্যাপারে আপনাদের পরিবারের সাথে কথা বলতে চাই। বাড়ির বড়দের একটু খবর দিন।"
মহিলা মাথা নিচু করে সম্মতি জানিয়ে ভেতরের অন্দরমহলের দিকে পা বাড়ালেন। বিশাল হলঘরটায় চ্যাটার্জি আর রতন লাল একা বসে রইলেন। চারদিকের স্তব্ধতা যেন এই রহস্যময় মৃত্যুর জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলেন ষাটোর্ধ্ব অমরেন্দ্র চৌধুরী। বার্ধক্য থাবা বসালেও তাঁর আভিজাত্যের জৌলুস বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। পরনে পাজামার ওপর একটি দামী সিল্কের হাউস কোট। গলার কাছে দেখা যাচ্ছে একটি মোটা সোনার চেইনের ঝিলিক, চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা আর হাতে জ্বলজ্বল করছে দামী রত্নখচিত আংটি। পুত্রশোকের মতো চরম আঘাতও যেন তাঁর দীর্ঘদিনের আভিজাত্যকে পুরোপুরি দমাতে পারেনি।
সোফায় বসার আগেই তিনি চ্যাটার্জির দিকে সরাসরি তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করলেন, "অফিসার, আমার ছেলের মৃত্যুর তদন্ত কতদূর এগোল? আমার ছেলেকে কে এভাবে খুন করার সাহস পেল একবার আমাকে শুধু তার নামটা বলুন, তারপর আমি দেখে নেব তাকে কী করতে হয়!"
তাঁর গলার স্বরে একপ্রকার চাপা হুঙ্কার মিশে ছিল। ক্ষমতার দম্ভ আর শোক মিলে অমরেন্দ্র চৌধুরীর অবয়বটি বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছিল। চ্যাটার্জি খুব শান্তভাবে জবাব দিলেন, "কিছু প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ বা এভিডেন্স আমাদের হাতে এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো আপনার পরিবারের সঙ্গে কথা না বলে আমরা চূড়ান্ত করতে পারছি না। মিস্টার চৌধুরী, এই মুহূর্তে কি আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে একটু বিশদে কথা বলা সম্ভব?"
অমরেন্দ্র চৌধুরী হাতের আংটিটা একবার নাড়াচাড়া করে বললেন, "হ্যাঁ, বলুন। কী জানতে চান আপনি?"
চ্যাটার্জি সোজা হয়ে বসে অমরেন্দ্র চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "অনিক চৌধুরীর সঙ্গে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক কারণে কারও কি কোনো শত্রুতা ছিল?"
এক মুহূর্তের মৌনতা। তারপর অমরেন্দ্র চৌধুরী তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে জবাব দিলেন, "দেখুন অফিসার, আমাদের ব্যবসার ধরনটাই এমন যে এখানে অনেক মানুষের ঈর্ষা আমাদের ওপর লেগেই থাকে। এই প্রতিযোগিতার বাজারে আমরা সবসময় যে একেবারে সোজা রাস্তায় কাজ করি, তা নয়। অনেক সময় অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেক্ষেত্রে শত্রুর সংখ্যা আমাদের নেহাত কম নয়। কিন্তু আমার ছেলেকে এইভাবে সরানোর সাহস কারও হবে, সেটা ভাবিনি।
চ্যাটার্জি অমরেন্দ্র চৌধুরীর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। লোকটার আভিজাত্যের আড়ালে একটা চাপা অস্থিরতা যেন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চ্যাটার্জি পকেট থেকে একটা ছোট প্লাস্টিকের জিপ-লক ব্যাগ বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। সেটির ভেতরে পড়ে আছে একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া সাধারণ হাতঘড়ি আর কিছু খুচরো পয়সা।
ব্যাগটা অমরেন্দ্র চৌধুরীর দিকে সামান্য এগিয়ে দিয়ে চ্যাটার্জি জিজ্ঞেস করলেন, "একটু দেখে বলুন তো, এই ঘড়িটা কি অনিক চৌধুরীর?"
অমরেন্দ্র চৌধুরী চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে ঘড়িটার দিকে একবার নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর অবজ্ঞার সুরে বললেন, "অনিক ঘড়ির ব্যাপারে ভীষণ সৌখিন ছিল। ওর কালেকশনে রোলেক্স বা ওমেগার নিচে কোনো ঘড়ি ছিল না। এই সস্তার ঘড়ি অনিকের হতেই পারে না।"
চ্যাটার্জি ঘড়িটা সরিয়ে নিয়ে আবার পকেটে রাখলেন। "বুঝলাম। আচ্ছা, অনিকবাবু যে ধরনের ব্যবসা বা কাজ করতেন, সেখানে কি বিশেষ কেউ আছে যাকে এই মুহূর্তে আপনার সন্দেহ হতে পারে?"
অমরেন্দ্র চৌধুরী একটু বিরক্ত হয়েই জবাব দিলেন, "আমি তো আগেই বললাম অফিসার, ব্যবসার দুনিয়ায় শত্রু গুনে শেষ করা যায় না। ঈর্ষা আর প্রতিহিংসা আমাদের ছায়ার মতো অনুসরণ করে।"
চ্যাটার্জি এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বসলেন, গলার স্বর কিছুটা নিচু করে বললেন, "ব্যবসার কথা এখন থাক। অনিকবাবুর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু বলুন। তাঁর কি এমন কোনো গোপন সম্পর্ক বা লেনদেন ছিল যা নিয়ে পরিবারে কোনো অশান্তি চলছিল?"
এই প্রশ্নে অমরেন্দ্র চৌধুরীর চোয়াল মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। তিনি হাতকাঁপানি আড়াল করতে চশমাটা খুলে আবার মুছতে শুরু করলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, "অনিক বিবাহিত ছিল। আমাদের এক ব্যবসায়িক পার্টনারের মেয়ে টিনার সাথেই ওর বিয়ে হয়েছিল। টিনা ভালো মেয়ে। আর পাঁচটা সংসারে যেমন হয়, ওদের মধ্যেও টুকটাক দাম্পত্য কলহ ছিল। তবে তেমন কোনো বড় অশান্তি বা ঝগড়াঝাটি কখনও আমাদের চোখে পড়েনি। ওদের একমাত্র ছেলে এখন দার্জিলিংয়ের হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে।"
চ্যাটার্জি মনে মনে নোট নিলেন—'টুকটাক দাম্পত্য কলহ'। উচ্চবিত্ত পরিবারে এই শব্দগুলোর আড়ালে অনেক সময় বড় কোনো ঝড়ের সংকেত লুকানো থাকে। তিনি ভাবলেন, এই টিনা চরিত্রের সাথে একবার কথা বলা দরকার।
চ্যাটার্জি অমরেন্দ্র চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "মিস্টার চৌধুরী, আমি এবার অনিকবাবুর স্ত্রী টিনা দেবীর সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই।"
অমরেন্দ্র চৌধুরী মাথা নেড়ে সায় দিলেন। তারপর এক পরিচারিকাকে টিনাকে ডেকে আনার নির্দেশ দিয়ে ভারী পদক্ষেপে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরেই অন্দরমহল থেকে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন টিনা চৌধুরী। নিখুঁত সুন্দরী বলতে যা বোঝায় তিনি হয়তো তা নন, কিন্তু তাঁর দীর্ঘ শরীরের গঠন ও সুশ্রী চেহারায় একটা সহজাত গাম্ভীর্য আছে। একটু স্থূলকায় হলেও তাঁর বুদ্ধিবাদী চোখ দুটি যেন অনেক না বলা কথা বলে দেয়। পরনে জৌলুসহীন কিন্তু অত্যন্ত দামী এক অভিজাত পোশাক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর চোখেমুখে শোকের কোনো ভাঙন বা বিলাপের চিহ্ন স্পষ্ট নয়।
তিনি নমস্কার জানিয়ে ধীরস্থিরভাবে সোফায় বসলেন। "আমি টিনা চৌধুরী। বলুন অফিসার, কী জানতে চান?"
বলেই তিনি ক্ষিপ্রতার সাথে পরিচারিকাকে ডেকে অনুযোগ করলেন, "কী ব্যাপার? ওনাদের এখনো চা-কফি কিছু দাওনি কেন?" চ্যাটার্জি মৃদু হেসে বললেন, "আপনি ব্যস্ত হবেন না, আমরা তো কাজের জন্য এসেছি..."
টিনা বাধা দিয়ে বললেন, "তা হয় না। বাড়িতে অতিথি এসেছেন, আপ্যায়নটুকু না করলে চলে না।"
চা আসার ফাঁকে চ্যাটার্জি সরাসরি কাজের কথায় এলেন। "টিনা দেবী, অনিকবাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে আপনি কি কাউকে বিশেষভাবে সন্দেহ করেন?"
টিনা একটু থামিয়ে দিয়ে বললেন, "আমাকে ম্যাডাম বলবেন না, টিনা বলেই ডাকতে পারেন।" চ্যাটার্জি সম্মতিসূচক হাসলেন। টিনা কয়েক মুহূর্ত মাথা নিচু করে কী যেন ভাবলেন, তারপর শান্ত স্বরে বললেন, "অনিক খুব একটা ভালো মানুষ ছিল না অফিসার। টাকার জোর আর রাজনৈতিক ক্ষমতা খাটিয়ে ও প্রচুর অন্যায় কাজ করেছে। বহু বেআইনি কারবারে ওর হাত ছিল, কিন্তু আইনের দীর্ঘ হাত কখনও ওকে ছুঁতে পারেনি।"
ঠিক এই সময় মধ্যবয়সী পরিচারিকা ফার্স্ট ফ্লাশ চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। দামী চায়ের গন্ধে পুরো ঘর মো মো করে উঠল। টিনা আপ্যায়নের সুরে বললেন, "আগে চা খেয়ে নিন, তারপর কথা হবে।"
চ্যাটার্জি আর রতন লাল চায়ের কাপ হাতে নিলেন। চ্যাটার্জি চায়ের সুগন্ধে মন না দিয়ে প্রশ্ন করলেন, "অনিকবাবুর সাথে আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্কটা ঠিক কেমন ছিল?"
টিনা ছোট করে উত্তর দিলেন, "ঠিকঠাক।"
চ্যাটার্জি এবার মোক্ষম চালটা চাললেন। "আপনি কি জানতেন অনিকবাবু তাঁর বাগানবাড়িতে একজন বান্ধবীর সঙ্গে রাত কাটাচ্ছিলেন?"
টিনার চেহারায় কোনো বিষ্ময় বা উত্তেজনা ফুটল না। তিনি জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বললেন, "বিয়ের প্রথম দিকে ওর বাড়ির বাইরে থাকাটাকে ব্যবসার কাজ বলেই ভাবতাম। ওর চরিত্রের এই কদর্য দিকটা বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। ততদিনে 'তাতান' আমাদের জীবনে চলে এসেছে। আমি চাইনি আমার ছেলে এমন একটা নোংরা পরিবেশে বড় হোক, তাই ওকে এখান থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিয়েছি। ও দার্জিলিংয়ের একটা হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে।"
টিনার এই নিস্পৃহ উত্তর চ্যাটার্জির মনে এক নতুন সন্দেহের বীজ বপন করল। একজন স্ত্রীর গলায় স্বামীর মৃত্যুসংবাদে এতখানি নির্লিপ্ততা কি স্বাভাবিক? নাকি এই শান্ত স্বভাবের আড়ালেই লুকিয়ে আছে কোনো গভীর নীল নকশা?
এবার চ্যাটার্জি গম্ভীর স্বরে টিনার উদ্দেশ্যে বলল খুনের রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?
টিনা চুপ করে রইলো।
অনিক চধুরীর ফোনের তথ্য অনুযায়ী খুনের রাতে অনিক চৌধুরীর রাতে আপনার সঙ্গে অনিক চৌধুরীর দীর্ঘক্ষণ কথা বাত্রা হয়।আপনি অনুমান করেছিলেন বা খবর পেয়েছিলেন অনিক চৌধুরী বান্ধবীর সঙ্গে ডানকুনির বাগানবাড়িতে রাত কাটাচ্ছেন।
এবারেও টিনার মুখে কোনো কথা নেই।
চ্যাটার্জি এবার কড়া সুরে বলল আপনি যদি আমাদের সাথে কো অপারেট না করেন আপনাকে হেফাজতে নিতে বাধ্য হবো।
এবার রুষ্ঠ কণ্ঠে টিনা বললো আপনাদের কাছে কি প্রমাণ আছে যার ভিত্তিতে আপনারা আমাকে হেফাজতে নিতে পারেন?
চ্যাটার্জি এবার শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বলল আপনার ফোনের জিপিএস লোকেশন অনুযায়ী খুনের রাতে আপনি ডানকুনির বাগান বাড়িতে গিয়ে ছিলেন।
স্বামীর পরকীয়া হাতেনাতে ধরতে বা সাজা দিতে আপনি কলকাতা থেকে দানকুনির বাগানবাড়ি আসেন।আপনার সঙ্গে তর্ক বিতর্ক হয়।রাগের মাথায় বাগানে পড়ে থাকা মাঞ্জা সুতো আপনার হাতে চলে আসে আর সঙ্গে সঙ্গে ওই মাঞ্জা সুতো অনিক চৌধুরীর গলায় চেপে ধরে টান দেন। হঠাৎ এই আকস্মিক ঘটনায় আপনি প্রথমে ভয় পেয়ে যান।একটু পরে ঘটনার পরিণাম বুঝে ওখান থেকে পালিয়ে কলকাতায় এই বাড়িতে ফিরে আসেন।
আপনাকে গ্রেপ্তার করার জন্য এইটুকুই যথেষ্ঠ।
এবার টিনা বলল যত সব বাজে বাজে কথা বলছেন। আপনার এই মন গড়া কথার উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই। আমি আমার ল ইয়ার ছাড়া আপনাদের একটা প্রশ্নের উত্তর দেবো না। আইন অনুযায়ী আপনার সে অধিকার আছে চ্যাটার্জি বললো। এখন আমরা উঠি তাহলে আর আপনি আপনার ল ইয়াl
নিয়ে থানায় হাজির হবেন সেখানেই আপনার সাথে কথা হবে।
চ্যাটার্জি এবার চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে সরাসরি টিনার চোখের দিকে তাকালেন। ড্রয়িংরুমের শান্ত পরিবেশটা মুহূর্তেই তপ্ত হয়ে উঠল। চ্যাটার্জি জিজ্ঞেস করলেন, "খুনের রাতে আপনি ঠিক কোথায় ছিলেন?"
টিনা কোনো উত্তর দিলেন না। তাঁর পাথুরে মুখচ্ছবি দেখে বোঝার উপায় নেই মনের ভেতর কী চলছে।
চ্যাটার্জি তাঁর নীরবতা ভেঙে আবার বলতে শুরু করলেন, "অনিক চৌধুরীর ফোনের কল লিস্ট অনুযায়ী, খুনের রাতে তাঁর সঙ্গে আপনার দীর্ঘক্ষণ বাদানুবাদ হয়। আপনি কোনোভাবে খবর পেয়েছিলেন যে অনিকবাবু সেই রাতে তাঁর বান্ধবীর সঙ্গে ডানকুনির বাগানবাড়িতে সময় কাটাচ্ছেন, তাই তো?"
এবারেও টিনা নিরুত্তর। তাঁর এই নীরবতা চ্যাটার্জির ধৈর্য চ্যুত করল। তিনি এবার বেশ কড়া সুরে বললেন, "দেখুন টিনা দেবী, আপনি যদি আমাদের তদন্তে সহযোগিতা না করেন, তবে আপনাকে পুলিশি হেফাজতে নিতে আমি বাধ্য হব।"
এই প্রথম টিনার শান্ত চোখে আগুনের ফুলকি দেখা দিল। তিনি রুষ্ট কণ্ঠে পালটা প্রশ্ন করলেন, "আপনাদের কাছে এমন কী প্রমাণ আছে যার ভিত্তিতে আপনারা আমাকে হেফাজতে নেওয়ার কথা ভাবছেন? শুধু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কাউকে গ্রেফতার করা যায় না।"
চ্যাটার্জি এবার শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে তুরুপের তাসটি চাললেন। "শুধু অনুমান নয় ম্যাডাম, আপনার ফোনের জিপিএস লোকেশন বলছে খুনের রাতে আপনি ওই ডানকুনির বাগানবাড়িতেই উপস্থিত ছিলেন। স্বামীর পরকীয়া হাতেনাতে ধরতে আপনি কলকাতা থেকে গাড়ি চালিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে আপনাদের মধ্যে প্রচণ্ড তর্কাতর্কি হয়। রাগের মাথায় হাতের কাছে বাগানে পড়ে থাকা মজবুত মাঞ্জা সুতো আপনার হাতে চলে আসে এবং হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আপনি সেটি অনিক চৌধুরীর গলায় পেঁচিয়ে টান দেন। আকস্মিক এই ঘটনায় আপনি প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও, পরে পরিস্থিতি সামলে নিয়ে সেখান থেকে চম্পট দেন এবং কলকাতায় এই বাড়িতে ফিরে আসেন।"
চ্যাটার্জি এক মুহূর্ত থেমে যোগ করলেন, "আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য আপাতত এইটুকুই যথেষ্ট।"
টিনা এবার ক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। "সব বাজে কথা! এইসব মনগড়া গল্পের কোনো উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই। আমার আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে আমি আর একটি প্রশ্নেরও উত্তর দেব না।"
চ্যাটার্জি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, "আইন অনুযায়ী সেই অধিকার আপনার নিশ্চয়ই আছে। আজ তবে আমরা উঠি। আপনি আপনার আইনজীবীকে নিয়ে আগামীকাল সময়মতো থানায় হাজির হবেন, সেখানেই বাকি কথা হবে।"
চ্যাটার্জি আর রতন লাল যখন ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন চ্যাটার্জির মনে হচ্ছিল—ঘটনাটা যতটা সহজ মনে হচ্ছে, হয়তো ততটা নয়।
8
চৌরঙ্গির অফিসে শীতের দুপুরের ম্লান আলো এসে পড়েছে পলাশের টেবিলের এক কোণে। জানুয়ারির শেষ, কলকাতায় এবার জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। পলাশ ও নীহারিকা ডিটেকটিভ এজেন্সির পসার এখন তুঙ্গে। মন্তেশ্বরের রায়চৌধুরী বাড়ির সেই হাড়হিম করা রহস্য আর প্রাচীন পুঁথি উদ্ধারের পর থেকে তাদের দম ফেলার সময় নেই।
নীহারিকা শেলফ থেকে কফি কাপ দুটো নামাতে নামাতে আলগোছে জিজ্ঞেস করল, "কফি খাবি পলাশ?"
পলাশ ফাইলের ওপর থেকে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আরাম করে বসল। "সত্যি রে, তুই তো পুরো অন্তর্যামী! মনটা কখন থেকে কফি কফি করছিল।"
ঠিক তখনই দরজার বেলটা বেজে উঠল। নীহারিকা কফির কাপ দুটো টেবিলে নামিয়ে রেখে দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকল এক দীর্ঘদেহী যুবক। কৌশিক সেন— তিতলি রায়চৌধুরীর হবু বর। রায়চৌধুরী বাড়ির কেসটা সমাধান করতে গিয়েই কৌশিকের সঙ্গে তাদের আলাপ।
পলাশ সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল, "আরে কৌশিক! ভেতরে এসো, ভেতরে এসো। খবর কী?"
কৌশিক হেসে বসল। "খবর ভালো। আপনারা রায়চৌধুরী বাড়ির কেসটা যেভাবে সামলেছেন, তাতে আপনাদের নাম এখন মুখে মুখে। ওই জটিল খুনের রহস্য ভেদ না হলে তো প্রাচীন পুঁথিটাই বেহাত হয়ে যেত।"
নীহারিকা হেসে বলল, "সে সব তো পুরনো কথা। কফি চলবে তো?"
"অবশ্যই! কদিন ধরেই আসব ভাবছিলাম, আজ সুযোগ পেয়ে চলে এলাম," বলতে বলতে ব্যাগ থেকে একটা ঝকঝকে নিমন্ত্রণপত্র বের করে পলাশের সামনে রাখল কৌশিক। "আমার আর তিতলির বিয়ে। আপনাদের কিন্তু আসতেই হবে।"
পলাশ আর নীহারিকা তাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাল। পলাশ চট করে ফোনটা তুলে পাশের বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে একটা অর্ডার দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু কৌশিক বাধা দিয়ে বলে উঠল, "আরে না না পলাশদা, মিষ্টি একদম নয়। এই বয়সে ফিট থাকতে হবে তো!"
পলাশ ফোনটা নামিয়ে রেখে একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলল, "তোমরা আজকের দিনের ছেলেরা মিষ্টি খেতে চাও না কেন, বুঝি না! কৌশিক, তুমি ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করো, আর জানো না এই মিষ্টির পেছনেও কত বড় ইতিহাস লুকিয়ে আছে? আজ তোমাকে ইতিহাসবিখ্যাত এক দোকানের মিষ্টি না খাইয়ে ছাড়ছি না।"
কৌশিক কাঁচুমাচু মুখে হাসল, "ঠিক আছে, মিষ্টি খেতে পারি, তবে একটা শর্ত— ওই মিষ্টির ইতিহাসটা কিন্তু আগে বলতে হবে!"
পলাশ কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করল:
"উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের কলকাতা। বাগবাজারের অলিগলি তখন নবীনচন্দ্র দাশের তৈরি ধবধবে সাদা রসগোল্লার রসে মজে আছে। ১৮৬৯ সালে সেই নবীনচন্দ্রের ঘরেই জন্ম নিলেন এক অনন্য প্রতিভা— কৃষ্ণচন্দ্র দাশ, যাঁকে আজ দুনিয়া চেনে কে. সি. দাশ নামে।
কৃষ্ণচন্দ্রের রক্তে ছিল সৃজনশীলতা আর বৈজ্ঞানিক জেদ। একদিকে তিনি 'রসগোল্লার জনক' নবীনচন্দ্রের পুত্র, অন্যদিকে তাঁর মাতামহ ছিলেন কিংবদন্তি কবিয়াল ও মিষ্টান্নশিল্পী 'ভোলা ময়রা'। এমন দুই ঘরানার উত্তরাধিকার পেয়ে কৃষ্ণচন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন সত্যিকারের বহুমুখী মানুষ।
তবে তাঁর মনটা পড়ে থাকত যন্ত্রপাতিতে। বড় হয়ে তিনি চাইলেন মিষ্টির সাবেকি ব্যবসায় বিজ্ঞানের ছোঁয়া দিতে। বাগবাজারে একটা যন্ত্রপাতির দোকানও খুলেছিলেন তিনি। তাঁর মাথায় ঘুরত অদ্ভুত সব বৈপ্লবিক চিন্তা— বৈদ্যুতিক তাঁত তৈরি করা, সোডা ফাউন্টেন মেশিন বানানো, এমনকি হোমিওপ্যাথি আর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত নিয়েও ছিল তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য।
কিন্তু পথটা মসৃণ ছিল না। তাঁর মা ক্ষীরোদমণি দেবী ছিলেন ভীষণ রক্ষণশীল। ছেলের এই 'বিজ্ঞান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা' তিনি মেনে নিতে পারেননি। মায়ের সঙ্গে এই আদর্শগত সংঘাতের জেরেই কৃষ্ণচন্দ্র বাবার প্রতিষ্ঠিত দোকান থেকে বেরিয়ে নিজের স্বতন্ত্র পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর এল ১৯৩০ সাল। কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর ছোট ছেলে সারদা চরণ দাশকে সঙ্গে নিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মিষ্টিকে শুধু থালায় নয়, পৌঁছে দিতে হবে দেশ-বিদেশের মানুষের ঘরে ঘরে। আর এখানেই তিনি প্রয়োগ করলেন তাঁর বৈজ্ঞানিক মেধা।
তিনিই প্রথম ভাবলেন মিষ্টি সংরক্ষণের জন্য 'ভ্যাকুয়াম প্যাক' বা টিনজাতকরণের কথা। সেই যুগে এটি ছিল এক অভাবনীয় চিন্তাধারা। এই পদ্ধতির সাহায্যেই রসগোল্লা তার স্বাদ আর গুণাগুণ ঠিক রেখে পাড়ি দিতে পারল হাজার হাজার মাইল। কৃষ্ণচন্দ্রের এই জেদ আর উদ্ভাবনী শক্তিই রসগোল্লাকে বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারতের 'জাতীয় মিষ্টি'র মর্যাদায় বসিয়ে দিল।"
গল্প শেষ করে পলাশ মুচকি হেসে বলল, "বুঝলে কৌশিক, সব রহস্য কেবল পুঁথিতে থাকে না, কিছু রহস্য আর ইতিহাস মিষ্টির রসেও মিশে থাকে।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় কড়া নাড়ল ডেলিভারি বয়।
নীহারিকা দরজা খুলে মিষ্টির প্যাকেটটা হাতে নিল। কিন্তু টাকা মিটিয়ে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে সে লক্ষ্য করল, পিছনে আরও একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রলোকের পরনে সাধারণ পোশাক হলেও চোখেমুখে একটা গভীর উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট।
নীহারিকা বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?"
আগন্তুক একটু ইতস্তত করে বললেন, "আজ্ঞে, আমি কি পলাশবাবুর ডিটেকটিভ এজেন্সির সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি? বিশেষ প্রয়োজন ছিল।"
"ও আচ্ছা, ভেতরে আসুন। এটাই এজেন্সির অফিস," বলে নীহারিকা তাঁকে ভেতরে পথ দেখিয়ে নিয়ে এল।
ঘরের ভেতরে পা রেখেই লোকটা দেখল পলাশ ও কৌশিক গভীর আলোচনায় মগ্ন। তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে থমকে দাঁড়ালেন। নমস্কার জানিয়ে বললেন, "আমি অমিয় সেনগুপ্ত। আসলে একটা জরুরি বিষয়ে আলোচনা করতে এসেছিলাম। আপনারা ব্যস্ত থাকলে আমি না হয় বাইরে একটু অপেক্ষা করছি।"
পলাশ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্মিত হেসে বলল, "আরে না না অমিয়বাবু, একদম ব্যস্ত নই। বসুন আপনি। নীহারিকা, অমিয়বাবুর জন্য এক কাপ কফি বল।"
মিষ্টি আর কফি পর্ব চলল কিছুক্ষণ। তারপর কৌশিক বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে পলাশের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "নতুন ক্লায়েন্ট মনে হচ্ছে! এবার নতুন কোনো রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। কেসটা সলভ করলে কিন্তু গল্পটা শোনা চাই-ই চাই।" পলাশ শুধু রহস্যময় এক চিলতে হাসল।
কৌশিক চলে যাওয়ার পর ঘরের দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিয়ে পলাশ অমিয়বাবুর মুখোমুখি বসল। "বলুন অমিয়বাবু, আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?"
অমিয়বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের পরিচয় দিলেন। "আমি পেশায় একজন আইনজীবী। আমার এক বিশেষ মক্কেল আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।"
পলাশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, "এবারে একটু খুলে বলুন ব্যাপারটা কী?"
অমিয়বাবু গলাটা সামান্য খাদে নামিয়ে বললেন, "আপনি নিশ্চয়ই খবরে শুনেছেন, বিখ্যাত শিল্পপতি অমরেন্দ্র চৌধুরীর ছেলে অনিক চৌধুরী তাঁর বাগানবাড়িতে খুন হয়েছেন।পলাশ বলল খবরের কাগজে পড়েছি।অমিয় সেনগুপ্ত বলে চলল, ডানকুনি থানার পুলিশ তদন্তে নেমেছে। এখন যা পরিস্থিতি, পুলিশ অনিকবাবুর স্ত্রী টিনা চৌধুরীকে হেফাজতে নিতে চাইছে।"
পলাশ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল, "পুলিশ কি নিশ্চিত যে স্ত্রী-ই খুনি?"
"পুলিশের কাছে যে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ এসেছে, তার ভিত্তিতে টিনা চৌধুরী খুব বাজেভাবে ফেঁসে যেতে পারেন," অমিয়বাবু রুমালে কপাল মুছে বললেন, "কিন্তু আমি ভেতর থেকে জানি, তিনি এই খুনের সাথে কোনোভাবেই জড়িত নন। আপনি যদি সাহায্য না করেন, তবে একজন নিরপরাধ মানুষ সারা জীবনের জন্য শেষ হয়ে যাবে।"
পলাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে টেবিলে আঙুল দিয়ে তবলার টুংটাং শব্দ করল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, "সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু সত্যিটা জানতে হলে আমার টিনা দেবীর সঙ্গে কথা বলা খুব জরুরি।"
অমিয়বাবু কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে বললেন, "আপনি যদি কেসটা হাতে নেন, তবে কথা বলার ব্যবস্থা আমি সব করে দেব। পুলিশ এখনও ওনাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি, তবে এই পরিস্থিতি বেশিক্ষণ সামলানো যাবে না। ওদের কাছে হয়তো বড় কোনো মোক্ষম প্রমাণ আছে।"
পলাশ সোজা হয়ে বসল। তার চোখে এখন গোয়েন্দাসুলভ সেই পরিচিত ঝিলিক। "ঠিক আছে অমিয়বাবু। উনি যদি আমার কাছে সমস্ত কথা খোলাখুলি বলেন এবং আমার যদি মনে হয় যে তিনি সত্যিই নির্দোষ, তবেই আমি এই কেসটা লড়ব।"
অমিয়বাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "আপনার ওপর আমার পূর্ণ ভরসা আছে পলাশবাবু। আমি শীঘ্রই আপনাদের দেখা করার ব্যবস্থা করছি।"
গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে পলাশের হাত থাকলেও তার মন পড়ে ছিল আজকের কেসটার ওপর। রাস্তার ট্র্যাফিকের দিকে চোখ রেখে সে পাশে বসা নীহারিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "নীহারিকা, অমিয় বাবুকে একবার ফোন কর তো। ওনার কালীঘাট মেট্রো স্টেশনের কাছে থাকার কথা ছিল। পৌঁছলেন কি না জেনে নে।"
নীহারিকা ফোন করে নিশ্চিত হয়ে জানালো, "হ্যাঁ, উনি নির্দিষ্ট জায়গাতেই আছেন।"
কালীঘাট মেট্রো স্টেশন এলাকাটি সকালের এই সময়ে যেন এক জীবন্ত জনসমুদ্র। অফিসযাত্রীদের দ্রুত পায়ে চলা, অটোচালকদের বিরামহীন হাঁকডাক আর ফুটপাতে হকারদের পসরা সাজানোর ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশ। মেট্রোর গুহাপথ থেকে দলে দলে মানুষ বেরিয়ে আসছে, আবার একদল মানুষ সেই অন্ধকারের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। পলাশের গাড়িটা যখন মেট্রো স্টেশনের কাছে পৌঁছাল, ভিড়ের মাঝে অমিয় বাবুকে খুঁজে পেতে বিশেষ বেগ পেতে হলো না। রাস্তার ধারেই তিনি উদ্বেগের সাথে অপেক্ষা করছিলেন। পলাশ গাড়ি থামাতেই তিনি দ্রুত পেছনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটা আবার ব্যস্ত রাস্তার মূল স্রোতে মিশে গেল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামল চৌধুরী বাড়ির বিশাল ফটকের সামনে। বাড়ির রাজকীয় গাম্ভীর্য আজও অমলিন। তবে আজ বৈঠকখানায় নয়, বরং বাড়ির ভেতরের দিকে একটি নির্জন স্টাডি রুমে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেন আজ কোনো গোপন আলোচনা হতে চলেছে যা দেয়ালের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ।
ঘরের ভেতরটা রুচিশীল আর রাজকীয় আভিজাত্যে ঘেরা। দেয়াল জোড়া আলমারিতে শোভা পাচ্ছে প্রাচীন ও দামী দামী সব মূর্তি। মাথার ওপরের সুদৃশ্য ঝাড়লন্ঠন থেকে মৃদু আলো ঝরে পড়ছে ঘরের আসবাবের ওপর। ঘরের মাঝখানে একটি বড় কাঠের টেবিল, যাকে ঘিরে সাজানো কয়েকটি আরামদায়ক চেয়ার।
সবাই বসতেই একজন পরিচারিকা রূপোর থালায় গরম লুচি, আলুর তরকারি আর মিষ্টি দিয়ে গেল। খাবারের ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধে ঘর ভরে উঠলেও নীহারিকার মন সেদিকে ছিল না। সে একদৃষ্টিতে ঘরের সাজসজ্জা দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই শিল্পমন্ডিত ঘরের দেওয়ালগুলো যেন কোনো এক গূঢ় রহস্য চেপে রেখেছে।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন টিনা চৌধুরী। সামনে রাখা ফাঁকা চেয়ারটাতে এসে বসলেন তিনি। তাঁকে ভীষণ বিধ্বস্ত এবং আতঙ্কিত দেখাচ্ছে। নীরবতা ভেঙে পলাশই কথা শুরু করল, "বলুন টিনা দেবী, আমরা আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?"
দীর্ঘশ্বাস ফেলে টিনা বললেন, "আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন, অমিয়বাবু হয়তো আপনাদের বলেছেন যে দুদিন আগে আমার স্বামী অনিক চৌধুরী খুন হয়েছেন। পুলিশ এ ব্যাপারে আমাকেই প্রধান সন্দেহভাজন মনে করছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি অনিককে খুন করিনি। এই খুনের সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই, অথচ খুব বাজেভাবে ফেঁসে গেছি।"
পলাশ সোজা হয়ে বসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "আপনি পুরো ঘটনাটা আমাকে খুলে বলুন। তাহলেই আমি বুঝতে পারব এই কেসটাতে আপনাকে আদৌ সাহায্য করতে পারব কি না।"
টিনা চৌধুরী এবার সবিস্তারে বলতে শুরু করলেন—
"অনিকের সাথে আমার বিয়েটা ছিল স্রেফ একটা বিজনেস ডিল। আমাদের বিয়ের মাধ্যমেই দুটো বড় কোম্পানির কোলাবরেশন সম্পন্ন হয়। প্রথম প্রথম আমি অনিককে খুব ভালো মানুষ বলেই ভেবেছিলাম। কিন্তু আস্তে আস্তে ওর আসল রূপটা বেরিয়ে আসে। ও একটা মুখোশ পরে থাকত, ওর ভেতরটা ছিল ভীষণ কুৎসিত। নানা নোংরা কাজের সঙ্গে ও জড়িত ছিল। আমি বারবার এই বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছি, কিন্তু ও কখনোই আমাকে মুক্তি দেয়নি। আসলে এই বিয়ে ভেঙে গেলে কোম্পানির ব্যবসায়িক বোঝাপড়া নষ্ট হয়ে যেত, যা অনিক কখনোই হতে দিতে চায়নি।
আমি ওই মানুষটার হাত থেকে মুক্তির পথ খুঁজছিলাম। ঠিক এমন সময় একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনে বলা হয়, অনিক আজ রাতে ডানকুনির বাগানবাড়িতে নিজের বান্ধবীর সাথে সময় কাটাচ্ছে। অথচ অনিক আমাকে বলেছিল ও ব্যবসায়িক কাজে ঝাড়খণ্ড যাচ্ছে। আমি তৎক্ষণাৎ ওকে ফোন করি এবং ফোনে আমাদের প্রচণ্ড কথা কাটাকাটি হয়।
ওকে হাতেনাতে ধরার জন্য আমি তখনই ডানকুনির ওই বাগানবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিই। যখন সেখানে পৌঁছলাম, তখন রাত প্রায় পৌনে দুটো। গেট দিয়ে ঢুকে ফার্ম হাউসের দিকে যাওয়ার পথে আবছা আলোয় দেখলাম ঘাসের ওপর কিছু একটা পড়ে আছে। কাছে গিয়ে মোবাইলের টর্চ জ্বালাতেই আমার বুক কেঁপে উঠল—ওটা অনিকের নিথর দেহ!
আমার শরীর গুলিয়ে উঠছিল, ভীষণ অস্বস্তি আর ভয়ে আমি ওখান থেকে তৎক্ষণাৎ পালিয়ে আসি। সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারিনি। সকালে বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার বিশু আমাকে ফোন করলে আমি ওকে বলেছিলাম অনিকের মোবাইলটা ওখান থেকে সরিয়ে ফেলতে। এর বিনিময়ে আমি ওকে অনেক টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলাম। বিশু গরিব মানুষ, ওর কোনো দোষ নেই। আসলে কাল রাতে ফোনে অনিকের সাথে আমার যে ঝগড়া হয়েছিল, তার কোনো রেকর্ড যদি পুলিশের হাতে পড়ে, তবে আমি ফেঁসে যেতে পারি—এই ভয়েই আমি মোবাইলটা সরাতে বলেছিলাম।
কিন্তু পুলিশ বিশুকে জেরা করে মোবাইলটা উদ্ধার করেছে। এখন সব প্রমাণ আমার বিরুদ্ধেই যাচ্ছে। বিশ্বাস করুন পলাশবাবু, আমি ওকে ঘৃণা করতাম ঠিকই, কিন্তু খুনটা আমি করিনি।"
পলাশ শান্ত গলায় বলল, "আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি। পরিস্থিতি আপনার বিরুদ্ধে হলেও আসল খুনি নিশ্চয়ই অন্য কেউ। এখন আমাদের কাজ হলো সেই প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা। তাহলেই আপনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন।"
9
অমিয় বাবু চৌধুরী বাড়িতেই থেকে গেলেন। পলাশ আর নীহারিকা বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে পলাশ নীহারিকার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমাদের এখনই একবার লালবাজারে ডিআইজি প্রবীর হাজরার সঙ্গে দেখা করতে হবে। উনি যদি একবার ডানকুনি থানায় ফোন করে দেন, তবে এই কেসের তথ্যগুলো পেতে আমাদের অনেক সুবিধা হবে।"
লালবাজারে পৌঁছাতেই দেখা গেল ডিআইজি প্রবীর হাজরা বেশ তাড়াহুড়ো করছেন। তাঁদের দেখেই তিনি বললেন, "পলাশ, কিছু মনে করো না, আমি আজ খুব ব্যস্ত। আমাদের এক সহকর্মী হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে একটা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক, তাই আমাকে একবার এখনই যেতে হবে। অবশ্য তোমরা যদি আমার সাথে চলো, তবে পথে কথা হতে পারে।"
পলাশ রাজি হয়ে গেল, "নিশ্চয়ই স্যার, কোনো সমস্যা নেই।"
গাড়িতে যেতে যেতে প্রবীর বাবু পলাশের মুখ থেকে অনিক চৌধুরী খুনের ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ শুনলেন। তিনি আশ্বস্ত করে বললেন, "ঠিক আছে, আমি ডানকুনি থানায় বলে দিচ্ছি যাতে ওরা তোমাকে সবরকম সাহায্য করে। এর আগেও অনেক জটিল রহস্য সমাধানে লালবাজার তোমার ক্ষুরধার মস্তিষ্কের সাহায্য পেয়েছে, আমি বলে দিচ্ছি ওরা আপত্তি করবে না।"
গাড়িটা এসে থামল দক্ষিণ কলকাতার এক নামী বেসরকারি হাসপাতালের সামনে। সেখানে পৌঁছাতেই দেখা হলো ডিএসপি রঞ্জন পালের স্ত্রী ও মেয়ের সাথে। প্রবীর বাবু তাঁদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
মিসেস পাল আক্ষেপের সুরে বলতে লাগলেন, "আগের দিন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। আজ সকাল থেকে যে কী হলো, কিছুই বুঝতে পারছি না!"
পলাশ এগিয়ে এসে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল, "আগে ওনার কোনো শারীরিক সমস্যা ছিল কি?"
মিসেস পাল উত্তর দিলেন, "না, একদমই সুস্থ ছিলেন। এই তো কিছুদিন আগে ফুল বডি চেকআপ করালেন, রিপোর্টে সব ঠিক ছিল।"
পলাশ আবার প্রশ্ন করল, "ঠিক কী সমস্যা দেখা দিল ওনার?"
"সকালে ছাদে আমরা একসাথে বসে চা খাচ্ছিলাম। সংসারের নানা বিষয়ে কথা হচ্ছিল। তখন উনি পুরোপুরি সুস্থ। কিন্তু ছাদ থেকে নিচে নামার পর থেকেই ওনার প্রবল জ্বর এল, গা পুড়ে যাচ্ছিল। বারবার বমি করতে শুরু করলেন। আমাদের প্রতিবেশী একজন ডাক্তারকে ডাকতেই তিনি বললেন প্রেসার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, ইমিডিয়েট হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। আধঘণ্টা আগে সুস্থ থাকা মানুষটা হঠাৎ কেন এমন হলেন, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।"
পলাশ গম্ভীর হয়ে জানতে চাইল, "ডাক্তাররা কি কোনো রোগ ধরতে পেরেছেন?"
"ওনারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, কিন্তু এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলছেন না।"
পলাশ প্রবীর বাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, "একবার ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলা যায়?" প্রবীর বাবু জানালেন, ডাক্তারবাবু এখন রাউন্ডে আছেন, ওপিডি-তে ফিরলেই দেখা করা যাবে। ডিআইজি সাহেব পলাশের চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন, "পলাশ, তুমি কি কিছু সন্দেহ করছ?"
পলাশ শান্ত গলায় বলল, "রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না, তবে খটকা একটা লাগছে।"
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার অনিল সামন্ত রাউন্ড শেষ করে ওপিডি-তে ফিরলে প্রবীর বাবু, পলাশ এবং মিসেস পাল তাঁর চেম্বারে ঢুকলেন। ডাক্তারবাবু ক্লান্ত স্বরে বললেন, "আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। রিপোর্ট এখনো আসেনি, তাই উপসর্গ দেখে চিকিৎসা চলছে।"
মিসেস পাল উদ্বেগের সঙ্গে জানতে চাইলেন, "উনি এখন কেমন আছেন ডাক্তারবাবু?"
ডাক্তারবাবু মাথা নাড়িয়ে বললেন, "ভালো নয়। শরীরের দ্রুত অবনতি হচ্ছে, তাই ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। তবে একটা ব্যাপার অদ্ভুত। ওনাকে যখন আনা হয়, উনি বারবার নিজের পিঠের দিকে ইশারা করছিলেন। আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, পিঠে একটা ছোট ক্ষত আছে এবং চারপাশটা কালো হয়ে গেছে।"
পলাশ নিজের পরিচয় দিয়ে ডাক্তারবাবুকে অনুরোধ করল, "ডক্টর সামন্ত, ওনার রক্তে 'এলাইজা' (ELISA) টেস্ট করানোটা কি খুব প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে না?"
ডক্টর সামন্ত কিছুটা অবাক হয়ে পলাশের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, "আমিও ঠিক সেটাই ভাবছিলাম।
9
সকাল ঠিক সাতটা। পলাশ ও নীহারিকা ডানকুনি থানায় প্রবেশ করল। ডিউটি অফিসার রতনলাল তাদের কিছুটা অপেক্ষা করতে বললেন, কারণ ইনস্পেক্টর চ্যাটার্জি তখনও এসে পৌঁছাননি। থানার হাজতে দুজন কয়েদি বন্দি। কিছু পুলিশকর্মী সকালে রিপোর্ট করে যে যার ডিউটিতে বেরিয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতাল আর থানার চরিত্র একই—এখানে ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা চলে, ছুটি বা বন্ধ বলে কিছু নেই।
খানিক পরেই ইনস্পেক্টর চ্যাটার্জি থানায় ঢুকলেন। পলাশ ও নীহারিকাকে দেখে নিজের চেয়ারে বসতে বসতে রতনলালকে জিজ্ঞেস করলেন, "এঁরা লালবাজারের সুপারিশে এসেছেন, এঁদের চা-জলখাবারের ব্যবস্থা হয়েছে তো?" পলাশ ও নীহারিকা উঠে দাঁড়াতেই চ্যাটার্জি সাহেব হেসে বললেন, "আপনারা বসুন। লালবাজার থেকে ডিআইজি (DIG) স্যার ফোন করেছিলেন, আপনাদের সব রকম সাহায্য করতে বলেছেন।"
ধন্যবাদ জানিয়ে চেয়ারে বসল পলাশ। চ্যাটার্জি সাহেব সরাসরি প্রসঙ্গে এলেন, "বলুন, কী জানতে চান?"
পলাশ বলল, "ইনস্পেক্টর চ্যাটার্জি, আপনি জানেন যে আপনি এখন একটি হাই-প্রোফাইল মার্ডার কেস নিয়ে কাজ করছেন। বিখ্যাত শিল্পপতি অমরেন্দ্র চৌধুরীর ছেলে অনিক চৌধুরীর খুনের ব্যাপারে আমরা কিছু আলোচনা করতে চাই।"
চ্যাটার্জি সাহেব একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, "আরে মশাই, এই কেস সমাধান করতে গোয়েন্দার প্রয়োজন নেই, পুলিশের ক্ষমতাতেই তা সম্ভব। আমরা প্রায় সব প্রমাণ জোগাড় করে ফেলেছি, দ্রুত চার্জশিটও জমা দিয়ে দেব।"
পলাশ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, "খুব ভালো কথা। অনিক চৌধুরীর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কি এসেছে?"
"হ্যাঁ," চ্যাটার্জি জানালেন, "রিপোর্ট অনুযায়ী মৃত্যুর কারণ হলো কোনো ধারালো সুতো বা মাঞ্জা দিয়ে গলা কাটা। অতিরিক্ত রক্তপাতেই মৃত্যু হয়েছে। সময়টা রাত দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যে। শরীরে ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন নেই। আমরা মোবাইল লোকেশন ও কললিস্ট ঘেঁটে জেনেছি, সেদিন রাতে তাঁর স্ত্রী টিনা চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে ঝগড়া হয়েছিল। স্বামী অন্য নারীর সঙ্গে রাত কাটাবে—এটা কোনো স্ত্রী মেনে নিতে পারেন না। টিনা চৌধুরীর জিপিএস লোকেশন বলছে, রাত একটার সময় তিনি ডানকুনিতেই ছিলেন।"
তিনি আরও যোগ করলেন, "সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, ওই বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার বিশু পালকে টাকা দিয়ে প্রমাণ লোপাট করতে চেয়েছিলেন টিনা। তিনি বিশু পালকে অনিকবাবুর মোবাইল সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন, যা বিশু জেরায় স্বীকার করেছে। এরপরেও কি আপনাদের তদন্তের প্রয়োজন আছে?"
পলাশ মুচকি হেসে বলল, "পুলিশ সত্যিই প্রশংসনীয় কাজ করেছে। তবে আমাদেরও তো পেট চালাতে হয়, আর সত্যের অনুসন্ধানই আমাদের পেশা। তা, অনিকবাবুর পাশ থেকে সংগৃহীত ফরেনসিক এভিডেন্সগুলো কি একবার দেখা যাবে?"
ডিআইজি সাহেবের নির্দেশে চ্যাটার্জি সাহেব রতনলালকে বললেন সব প্রমাণ দেখাতে। পলাশ খুব নিপুণভাবে জিনিসগুলো পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। সেখানে কিছু খুচরো পয়সা আর একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া হাতঘড়ি ছিল। ঘড়ির কাঁটা দুটোই ১২-র ঘরে স্থির, আর ক্যালেন্ডারের ঘরে লেখা ছিল— 'Sat 9'।,
পলাশ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "অনিক চৌধুরী কবে খুন হয়েছেন? সেদিন কী বার ছিল?"
চ্যাটার্জি উত্তর দিলেন, "এই তো ৩ তারিখ, রবিবার।"
ঠিক সেই মুহূর্তে পলাশের ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশে ডিআইজি সাহেব জানতে চাইলো তোমার কাজ হোয়েছে। পলাশ জানাল, "স্যার, যা তথ্য খুঁজছিলাম তা অনেকটাই পেয়েছি।"
ডিআইজি সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, "পলাশ, একটা ব্যাড নিউজ (Bad News) আছে..."
ফোনের ওপ্রান্তে ডিআইজি প্রবীর হাজরার গম্ভীর কণ্ঠস্বর।
“পলাশ, ডিএসপি রঞ্জন পাল কাল রাতে মারা গেছেন। খবরটা শুনেছ?”
পলাশ থমকে গেল। “কী বলছেন স্যার?
প্রবীর বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “হাসপাতাল থেকে ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয়েছে— ‘আননোন ফিভার অ্যান্ড মাল্টি অর্গান ফেইলিওর’। কিন্তু আসল রহস্য অন্য জায়গায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলেছি। উনিও ধন্দে আছেন। শরীরে কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার চিহ্ন মেলেনি। তবে রঞ্জনের পিঠের ওপর একটা অদ্ভুত কালো ক্ষত দেখা গেছে। আমার সন্দেহ হচ্ছে পলাশ। তুমি কি একবার লালবাজারে আসতে পারবে? আমরা একবার ওনার বাড়ি যাব।”
পলাশ পেশাদার ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “স্যার, আমারও ঠিক তাই মনে হচ্ছে। যদি সম্ভব হয়, ওনার দেহটা দ্রুত ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। শরীরে কোনো রাসায়নিক বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, সেটা জানা খুব জরুরি।”
ডিআইজি জানালেন যে তিনি ইতিমধ্যেই দেহ ফরেনসিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন এবং পলাশকে দ্রুত পৌঁছাতে বললেন।
গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে পলাশ তার সঙ্গী নীহারিকার দিকে তাকিয়ে বলল, “খুব অবাক লাগছে নীহারিকা। আধঘণ্টা আগে পর্যন্ত যে মানুষটা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল, তার সাথে এমন কী ঘটল যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল? এটা কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু হতেই পারে না।”
নীহারিকা জানলার বাইরে তাকিয়ে বিষণ্ণ সুরে বলল, “এই আকস্মিক মৃত্যুগুলো সত্যিই অদ্ভুত। এই হয়তো একটা মানুষ হাসছে, কথা বলছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে—পরক্ষণেই সে নিথর এক পিণ্ড। কার জীবনের ঘড়ি কখন থমকে যাবে, কেউ জানে না।”
গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে পলাশ আপনমনেই বলল, “সময়ই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা সময়ের হাতের পুতুল মাত্র। সে যেভাবে আমাদের নাচায়, আমরা সেভাবেই চলি।”
মৃত্যুই হয়তো আমাদের জীবনের চরম ও অমোঘ পরিণতি। কিন্তু এই পরিণতির বীজ বপন করা থাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে, বিস্মৃতির অতল গহ্বরে—আমাদেরই ফেলে আসা কোনো ধূসর অতীতের অন্ধকারে।
অজান্তেই সেই রোপিত বীজ কালক্রমে এক মহীরুহের রূপ নেয়। অতীতের সেই বিষবৃক্ষ যখন ডালপালা বিস্তার করে ধীরে ধীরে বর্তমানকে গ্রাস করতে থাকে, আমরা তখনো তার মারণক্ষমতা টের পাই না। একদিন সেই বিষাক্ত আলিঙ্গন আমাদের সমগ্র জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে এবং নিঃশব্দে টেনে নিয়ে যায় মৃত্যুর অতল গহ্বরে। যা আজ দৃশ্যমান পরিণতি, তার মূল আসলে লুকিয়ে ছিল বহুকাল আগে ঘটে যাওয়া কোনো এক অদৃশ্য প্রেক্ষাপটে।
অফিস টাইমের ব্যস্ততা ঠেলে ডানকুনি থেকে শ্যামবাজারের রাস্তা পার হতে বেশ খানিকটা সময় লাগল। তবে শ্যামবাজার পেরোনোর পর যানজট কিছুটা কম ছিল। দ্রুত গতিতে গাড়ি এসে থামল লালবাজারের সামনে। সেখান থেকে ডিআইজি প্রবীর হাজরার গাড়িতে করে পলাশ ও নীহারিকা রওনা হলো রঞ্জন পালের বাড়ির উদ্দেশ্যে—এক অজানা রহস্যের জট খুলতে।
রঞ্জন পালের যাদবপুরের বাড়িটা বেশ ছিমছাম আর সাজানো-গোছানো। রাস্তার ধারেই সাধারণ কিন্তু সুন্দর দোতলা বাড়ি। পুলিশের কাজ করেন বলে কি না কে জানে, নিরাপত্তার খাতিরেই হয়তো বাড়ির সামনে-পেছনে চারিদিকে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো।
প্রধান দরজার পরেই পেল্লাই এক ড্রয়িং রুম। সেখানে রাখা দুটো সোফা আর দেওয়ালে টাঙানো একটা বড় এলইডি টিভি। ঘরে প্রবেশ করতেই পলাশ, নিহারিকা আর প্রবীরবাবু দেখলেন—ছলছলে চোখে মিসেস পাল এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর পাশে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোরী।
রঞ্জনের ভাই নীরেশ পাল ভেজা গলায় প্রবীরবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “কী করে যে এমন হয়ে গেল বুঝতেই পারছি না স্যার। আধঘণ্টা আগে পর্যন্ত যে মানুষটা সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল ছিল, হঠাৎ এমন কী হলো যে তিনি আর পৃথিবীতেই রইলেন না!”
পলাশ শোকাতুর মিসেস পালের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “আচ্ছা, আপনারা শেষবার ঠিক যে জায়গাটিতে বসে গল্প করছিলেন, সেই জায়গাটা কি একবার দেখা যেতে পারে?”
নিহারিকা এই অবসরে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটির দিকে ফিরে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী মা?”
মেয়েটি খুব ছোট করে উত্তর দিল, “স্নিগ্ধা।”
“কোন ক্লাসে পড়ো?”
“ক্লাস নাইনে,” ধরা গলায় জানাল মেয়েটি।
সবাই যখন ছাদে এসে পৌঁছাল, দেখল দু-তিনটে গার্ডেন চেয়ার তখনও ওলটপালট হয়ে পড়ে আছে। নিহারিকা চারপাশটা তীক্ষ্ণ নজরে দেখতে দেখতে হঠাৎ এক জায়গায় থমকে গেল। মেঝেতে পড়ে আছে একটি খেলনা বন্দুক, আর ঠিক তার পাশেই পড়ে আছে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া হাতঘড়ি।
নিহারিকা ঘড়িটার দিকে হাত বাড়াতে যেতেই পলাশ বাধা দিয়ে বলল, “না, এটা ফরেনসিক এভিডেন্স হতে পারে।” পকেট থেকে রুমাল বের করে পলাশ সাবধানে ঘড়ি আর খেলনা বন্দুকটা তুলে নিল।
খুব খুঁটিয়ে দেখে পলাশের ভুরু কুঁচকে গেল। এই ঘড়িটা হুবহু কয়েক দিন আগে মৃত অন্য এক ব্যক্তি— অনিক চৌধুরীর কাছ থেকে পাওয়া ঘড়িটার মতো। বারোটার ঘরে স্থির হয়ে আছে সব কটা কাঁটা, আর তারিখের ঘরে লেখা: Mon 18।
ডিআইজি প্রবীর হাজরা পলাশের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “কী ভাবছ পলাশ?”
পলাশ সংক্ষেপে উত্তর দিল, “হয়তো এটা কোনও স্বাভাবিক মৃত্যু নয় স্যার। এর পেছনে গভীর কোনও রহস্য আছে। এই বাড়ির আর আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজগুলো খুব ভালো করে দেখা দরকার। আর এই জিনিসগুলো এখনই ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো প্রয়োজন।”
প্রবীরবাবু আর দেরি না করে তৎক্ষণাৎ কাউকে ফোন করে রঞ্জন পালের বাড়ির সব ফুটেজ সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন।
ফেরার পথে গাড়িতে বসে পলাশ প্রবীর হাজরাকে বলল, “স্যার, এই দুটো খুনের মধ্যে অবশ্যই কোনও লিংক আছে। প্যাটার্ন হয়তো এক নয়, কিন্তু লাশের পাশ থেকে পাওয়া ঘড়ি দুটো হুবহু এক। আর এটাই সবচেয়ে বড় সংকেত।”
সে একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল, “দুটো ক্ষেত্রেই ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে স্থির এবং ঘড়িটা বন্ধ। শুধু তারিখগুলো আলাদা। এই তারিখগুলোই কি তবে খুনি বা তার উদ্দেশ্যের কোনও গোপন সংকেত?”
রাতের নিস্তব্ধ রাস্তায় গাড়ির হেডলাইট অন্ধকার চিরে এগোতে লাগল, আর পলাশের মনে ঘুরপাক খেতে লাগল সেই বন্ধ ঘড়ির রহস্য।
চৌরঙ্গীর ধোঁয়াটে অফিস ঘরে পলাশ অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। একটা সিগারেট শেষ করে সে জানলার দিকে তাকাল। পলাশ যখনই কোনো গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকে, পায়চারি করা তার পুরনো স্বভাব। সহকর্মী নীহারিকা দীর্ঘক্ষণ ওর গতিবিধি লক্ষ্য করছিল। শেষমেশ সে নীরবতা ভেঙে বলল, "পলাশ, তুই কি কিছু ভাবছিস?"
পলাশ ঘুরে দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, "হ্যাঁ।"
তার দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা। সে যোগ করল, "অনিক চৌধুরী আর রঞ্জন পালের মৃত্যুর মধ্যে কোথাও একটা অদৃশ্য যোগসূত্র আছে। এই প্যাটার্নটা খুঁজে পাওয়া এখন সবথেকে জরুরি।"
নীহারিকা টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল, "মার্ডার সাইট থেকে পাওয়া সেই ঘড়িটা কি কোনো ক্লু হতে পারে? 9 Sat আর Mon 11—এর মধ্যে কি কোনো সংকেত লুকিয়ে আছে?"
পলাশ জবাব দিল না। তার মাথায় তখন অন্য অঙ্ক চলছে। সে ধীর গলায় বলল, "তদন্তের গভীরে পৌঁছাতে হলে বিশু পাল, সীমা রায় আর টিনা চৌধুরীকে আমাদের কড়া নজরে রাখতে হবে।"
নীহারিকা কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, "তুই কি টিনা চৌধুরীকেও সন্দেহ করছিস?"
"এখানে কেউই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়, নীহারিকা," পলাশ জানাল। "সেদিন যখন টিনার বাড়ি গিয়েছিলাম, ও ওর আঙুলের একটা কাটা দাগ আড়াল করার চেষ্টা করছিল। সেটা আমার চোখ এড়ায়নি।"
"তাহলে এখন আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?"
পলাশ চটজলদি সিদ্ধান্ত নিল, "তুই এখনই তোর সোর্স কাজে লাগিয়ে বিশু পাল আর সীমা রায়ের নাড়িনক্ষত্র খুঁজে বের কর। আমি টিনা চৌধুরীর ব্যাপারটা দেখছি।"
সকালের দিকে সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের কফি শপগুলো বেশ ফাঁকাই থাকে। পলাশের অনুরোধে টিনা চৌধুরী সেখানে দেখা করতে রাজি হয়েছে। কফি শপে ঢুকতেই পলাশ দেখল টিনা এক কোণের টেবিলে বসে আছে। পলাশকে দেখে টিনা মৃদু আপ্যায়নের সুরে বলল, "আসুন, বসুন। কফি নেবেন তো?"
পলাশ মাথা নেড়ে সায় দিতেই সে ওয়েটারকে কফির অর্ডার দিল। এরপর কোনো ভূমিকা না করেই পলাশ সরাসরি প্রসঙ্গে এল, "আপনার কাছে আমার কিছু বিষয় জানার আছে।"
"হ্যাঁ, বলুন?" টিনার কণ্ঠে অদ্ভুত শীতলতা।
পলাশ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "অনিক চৌধুরী মারা গেলে সবথেকে বেশি লাভবান তো আপনিই হবেন। এত বড় সাম্রাজ্য, ব্যবসা, অবাধ স্বাধীনতা—সবই আপনার অধীনে চলে আসবে।"
টিনা চৌধুরী ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল, "আইন তো অন্তত তাই বলে।"
"অর্থাৎ, খুন করার সবথেকে জোরালো মোটিভ আপনারই আছে," পলাশ পাল্টা দিল।
টিনা এবার শব্দ করে হাসল। "আপনি কি আমাকেই সন্দেহ করছেন?"
"সন্দেহের তালিকা থেকে কাউকেই বাদ দিচ্ছি না। আচ্ছা, আপনার আঙুলটা কাটল কী করে?"
টিনা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল, "ফুটপাথে ঘুরি ওড়ানো মাঞ্জা সুতোয় নয়, ফল কাটার সময় অসাবধানতাবশত ছুরি লেগে কেটে গেছে।"
পলাশ একটা রহস্যময় হাসি হাসল। সেই হাসির অর্থ উদ্ধার করা সাধারণ মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য। সে আবার প্রশ্ন করল, "অনিক চৌধুরীর এমন কোনো গোপন কুকীর্তি বা শত্রুতার কথা আপনি জানেন, যার জন্য কেউ এভাবে প্রতিশোধ নিতে পারে?"
টিনা কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "সেটা খুঁজে বের করা তো আপনাদের কাজ, আমার নয়। আর আমার এরকম কিছু মনেও পড়ছে না।"
পলাশ এবার গলার স্বর কিছুটা গম্ভীর করে বলল, "মনে করার চেষ্টা করুন টিনা দেবী। কারণ পরিস্থিতির যা গতি, তাতে আপনাকে বাঁচানো মুশকিল হতে পারে। সমস্ত প্রমাণ আপনার বিরুদ্ধেই যাচ্ছে।"
পলাশ তার ভিজিটিং কার্ডটা টেবিলের ওপর টিনার দিকে এগিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। "এখানে আমার নম্বর আছে। কিছু মনে পড়লে দ্রুত জানাবেন। আজ আমার একটু তাড়া আছে, আসছি।"
দ্রুত পায়ে কফি শপ থেকে বেরিয়ে এল পলাশ। তার শিকারি চোখ তখন অন্য কিছু খুঁজছে।
10
হঠাৎ ফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোনে পলাশের ঘোর কাটল। পকেট থেকে ফোন বের করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল নামটা— প্রবীর হাজরা। পলাশ রিসিভ করে বলল, "বলুন স্যার, কী ব্যাপার?"
ওপাশ থেকে প্রবীর হাজরার গম্ভীর স্বর ভেসে এল, "যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একবার লালবাজারে চলে এসো। খুব জরুরি দরকার।" পলাশ পাল্টা কিছু জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পাওয়ার আগেই ফোনটা কেটে গেল। অমিয় বাবু আর নীহারিকার দিকে একবার তাকিয়ে পলাশ দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে এজেসি বোস রোড ধরল। তার বুকের ভেতর একটা কু ডাকছে।
লালবাজারে গাড়ি পার্ক করে পলাশ সোজা ডিআইজি প্রবীর হাজরার ঘরে প্রবেশ করল। ঘরের থমথমে পরিবেশ আর স্যারের চিন্তিত মুখ দেখে পলাশ বুঝল জল অনেকদূর গড়িয়েছে।
"বলুন স্যার, কোনো বিশেষ খবর?" পলাশ উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করল।
ডিআইজি প্রবীর হাজরা একদলা ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, "বালিগঞ্জ থানা থেকে খবর এসেছে। অ্যাডভোকেট অবিনাশ গাঙ্গুলী খুন হয়েছেন। সেই একই প্যাটার্ন পলাশ! লাশের পাশে পাওয়া গেছে একটা ব্যারিস্টার ব্যান্ড আর একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া হাতঘড়ি। তবে এবার খুনি শুধু খুন করেনি, আমাদের ওপেন চ্যালেঞ্জ দিয়ে গেছে।"
পলাশ অবাক হয়ে বলল, "ওপেন চ্যালেঞ্জ? ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন তো স্যার।"
প্রবীর হাজরা সিসিটিভি ফুটেজের দিকে ইশারা করে বললেন, "অবিনাশবাবুর বাড়ি যেতে হলে মেইন রোড থেকে একটা গলি পেরোতে হয়। প্রায় দিনই তিনি ক্লাব থেকে মদ্যপ অবস্থায় টলতে টলতে বাড়ি ফেরেন। আজ সিসিটিভিতে দেখা গেছে, এক অদ্ভুত লোক ওনাকে ধরে ধরে বাড়ির দরজা পর্যন্ত নিয়ে এল। তারপর সিসিটিভি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা মাথায় ওনার পিঠের মাঝখানে কিছু একটা পরপর তিনবার ইনজেক্ট করল। কাজ শেষে একটা ব্যারিস্টার ব্যান্ড আর বন্ধ ঘড়িটা ক্যামেরার সামনে প্রদর্শন করে লোকটা মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। পলাশ, একটা লোক আমাদের পুরো সিস্টেমকে এভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছি না!"
পলাশ এবার কৌতূহলী চোখ নিয়ে হাজরার কাছে জিজ্ঞেস করল ঘড়ির ডায়েলে তারিখ আর সময় কি ছিল?
হাজরা ফাইল থেকে একটা ফটোকপি বের করে পলাশের দিকে এগিয়ে দিল , পলাশ মিয়ারিকা দূষণই হুমরি খেয়ে দেয়ে ডেট তারিখ গুলো দেখছিল করে কাটা সেই আগের মতই বারোটার ঘরে । আর তারিখের ঘরে Fri 15.
পলাশ চেয়ারে বসে পড়ে বলল, "এই তিনটে খুনের মধ্যে একটা অদৃশ্য সুতোর টান আছে স্যার, সেটা খুঁজে বের করতেই হবে। ওই ঘড়ির কাঁটা আর তারিখগুলো স্রেফ সময় নয়, ওগুলো এক একটা সংকেত। আচ্ছা স্যার, রঞ্জন পালের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কি এসেছে?"
প্রবীর হাজরা পাশ থেকে ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, "হ্যাঁ, রিপোর্ট চলে এসেছে। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে—ইটস্ আ মার্ডার। রঞ্জনের শরীরে 'রিসিন' (Ricin) নামক এক মারাত্মক বিষ পাওয়া গেছে।"
"মাই গড!" পলাশ সোজা হয়ে বসল। "রিসিন? স্যার, যে এই বিষ প্রয়োগের কৌশল জানে, সে কোনো সাধারণ অপরাধী হতে পারে না। ভেষজ বিষের ওপর তার অগাধ পাণ্ডিত্য আছে। ফরেনসিক রিপোর্ট কী বলছে?"
কবিরাজ সাহেব নোটবই দেখে বললেন, "ডাক্তাররা জানিয়েছেন রিসিন হলো একটি সাইটোটক্সিন। এটি কোষের প্রোটিন তৈরির ক্ষমতা চিরতরে বন্ধ করে দেয়। রক্তে সরাসরি ইনজেক্ট করা হলে এটি পটাশিয়াম সায়ানাইডের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী। সুইয়ের ছিদ্র এতই সূক্ষ্ম হয় যে মাথার চুলে বা পায়ের তালুর নিচে পুশ করলে ময়নাতদন্তে ধরা পড়া অসম্ভব। অবিনাশবাবুর ক্ষেত্রে বিষটা দেওয়া হয়েছে ঠিক পিঠের মাঝখানে, মেরুদণ্ডের পাশে।"
পলাশ জানালার দিকে তাকিয়ে আনমনে বলতে লাগল, "রিসিনের ইতিহাস বড়ই ভয়ঙ্কর স্যার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা 'W-Bomb' প্রজেক্টে এই বিষ নিয়ে কাজ করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল 'Compound W' নামের বোমা। ৫০০০ কেজি রিসিন মজুত করা হয়েছিল কয়েক লক্ষ মানুষকে নিকেশ করার জন্য। তবে সবচেয়ে কুখ্যাত ঘটনা ১৯৭৮ সালের জর্জি মার্কভ হত্যাকাণ্ড।"
পলাশ থামল না, সে ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমানের খুনিকে খোঁজার চেষ্টা করছিল। "লন্ডনের ওয়াটারলু ব্রিজে দাঁড়িয়ে থাকা মার্কভকে একটা সাধারণ ছাতার ডগায় লুকানো এয়ার-গান দিয়ে ০.৫ মিলিমিটারের একটি ছোট বিষাক্ত দানা বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিন দিন পর অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি মারা যান। আমাদের এই খুনিও সেই একই 'সাইলেন্ট কিলার' মেথড ব্যবহার করছে।"
পলাশের চোখে এক তীব্র জেদ ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, "রিসিন, বন্ধ ঘড়ি আর ব্যারিস্টার ব্যান্ড... খুনি আমাদের কোনো এক পুরনো ইতিহাসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে না তো?"
দিনের পর দিন শহরটা যেন এক মায়াবী মাকড়সার জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি গলি, প্রতিটি মোড় এখন আতঙ্কের সমার্থক। প্রশ্নটা পলাশের মগজে বিঁধছে কাঁটার মতো—এই খুনি কি শুধুই রক্তপিপাসু কোনো ‘সিরিয়াল কিলার’, নাকি এই নিছক খুনের নেশার আড়ালে লুকিয়ে আছে হিমশীতল কোনো মোটিভ? লাশের পাশে ফেলে যাওয়া ওই অদ্ভুত চিহ্নগুলো কি স্রেফ খেয়ালিপনা, নাকি কোনো গূঢ় সংকেত? কোনো পুরনো হিসাব কি তবে রক্ত দিয়ে চোকানো হচ্ছে?
পলাশ ওর অফিসের ধবধবে সাদা হোয়াইট বোর্ডটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাতে মার্কার পেন। বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে সে বোর্ডে লিখল তিনটি তারিখ:
Sat 9
Mon 11
Fri 15
পলাশ পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে রইল লেখাগুলোর দিকে। নিহারিকা ঘরটা গুছিয়ে দিচ্ছিল, পলাশের এই স্তব্ধতা দেখে কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, “পলাশ, এই তারিখগুলোর মধ্যেই কি কোনো রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে?”
পলাশ কোনো উত্তর দিল না। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে পায়চারি শুরু করল। ওর চোখের মণি দুটো তখন বোর্ডের লেখাগুলোকে বিশ্লেষণ করছে। ধীর স্বরে বলল, “এখনো নিশ্চিত নই নিহারিকা, তবে মগজাস্ত্র ব্যবহার করার সময় এসে গেছে। খুনি আমাদের চোখের সামনেই ক্লু রেখে যাচ্ছে, আমরাই হয়তো অন্ধ হয়ে আছি।”
নিহারিকা বোর্ডের কাছে এগিয়ে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বলল, “একটা জিনিস লক্ষ্য করছিস? তারিখগুলো কিন্তু সব বিজোড় সংখ্যা।”
পলাশ থামল। মার্কার দিয়ে বোর্ডে অংক কষতে শুরু করল সে:
11 - 9 = 2
15 - 11 = 4
? - 15 = ?
11+9=20
15+11=26
?+16=?
9=I
11=k
15=o
“এটা কি স্রেফ গাণিতিক প্রগতি, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সমীকরণ কাজ করছে?” পলাশ বিড়বিড় করতে করতে আবার বোর্ডে নামগুলো লিখল:
অনিক চৌধুরী = ৬ তারিখ
রঞ্জন পাল = ৯ তারিখ
অবিনাশ গাঙ্গুলী = ১১ তারিখ
সিগারেটের ফিল্টারটা অ্যাসট্রেতে পিষে নিহারিকার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল পলাশ। “তোকে যে কাজে পাঠিয়েছিলাম, সেই খবর কী?”
নিহারিকা এক মুহূর্ত দম নিয়ে বলতে শুরু করল, “খবর এনেছি বস। বিশু পালের কথা বলি প্রথমে। হুগলির গরলগাছা গ্রামে ওর বাড়ি। এক ছেলে, এক মেয়ে আর বউ নিয়ে ভরা সংসার ছিল। লোকটা মূলত চাষী, কিন্তু সেই জমিগুলো এখন আর লাঙল দেওয়ার উপযুক্ত নেই। সেখানে এখন গড়ে উঠেছে ছোটখাটো ফ্যাক্টরি, রিসর্ট আর আকাশছোঁয়া বহুতল।”
নিহারিকার গলায় চাপা ক্ষোভ ফুটে উঠল, “চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ নামের এক প্রভাবশালী সংস্থা বিশু পালের মতো শত শত ছোট চাষির জমি নামমাত্র মূল্যে গায়ের জোরে দখল করে নিয়েছে। প্রতিবাদ করার ক্ষমতা ওই সাধারণ মানুষগুলোর ছিল না। সর্বস্ব হারিয়ে কেউ চায়ের দোকান দিয়েছে, কেউ ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজে চলে গেছে, আর কেউ বা স্রেফ ভিখারি হয়ে স্টেশনে স্টেশনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশু পাল অনেক কান্নাকাটি আর দৌড়ঝাঁপ করে শেষমেশ ডানকুনির বাগানবাড়িতে কেয়ারটেকারের চাকরিটা পেয়েছে।”
পলাশের ধোঁয়াটে ঘরের ভেতর রহস্যের পারদ তখন তুঙ্গে। নীহারিকার দেওয়া তথ্যগুলো ঘরের স্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলল।
নীহারিকা বলতে শুরু করল, "এবার আসা যাক সীমা রায়ের প্রসঙ্গে। বেলেঘাটা বস্তিতে অসুস্থ মায়ের সঙ্গে থাকে মেয়েটা। পুলিশকে ও বলেছিল ওর বাবা ক্যানসারে মারা গেছেন, কিন্তু তথ্যটা ডাহা মিথ্যে। আসলে সীমার বাবা ছিলেন চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের এক প্রজেক্ট সুপারভাইজার। দশ বছর আগে কর্মীদের বকেয়া বেতনের দাবিতে তিনি একাই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। প্রভাবশালী চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ প্রথমে তাকে টাকার লোভ দেখায়, তারপর চলে ভয়ভীতি। কোনো কিছুতেই কাজ না হওয়ায় শেষমেশ চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে চরম অপমান করে বের করে দেওয়া হয়। লোকলজ্জা আর অভিমানে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এরপর সীমা আর তার মা অথৈ জলে পড়ে। ক্ষুধার জ্বালায় টিকে থাকতে সীমা শেষমেশ এক অন্ধকার পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়।"
পলাশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "তার মানে বিশু পাল আর সীমা রায়—দুজনেই চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের নিষ্ঠুরতার শিকার। শুধু এরা দুজন নয় নীহারিকা, এমন হাজার হাজার মানুষের চোখের জল জড়িয়ে আছে ওই রাজপ্রাসাদের ইটে। তবে আপাতত বিশু আর সীমাকে আমাদের কড়া নজরে রাখতে হবে।"
কথাটা শেষ করেই পলাশ ডিআইজি প্রবীর হাজরাকে ফোন লাগাল।
"বলুন স্যার, অবিনাশ গাঙ্গুলীর খুনের সিসিটিভি ফুটেজে কি আততায়ীর লিঙ্গ বোঝা গেছে? ও কি পুরুষ না মহিলা?"
ওপার থেকে প্রবীরদার গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "না পলাশ, আততায়ী একটা কালো ঢিলেঢালা হুডি পরে ছিল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা, মুখ দেখারও কোনো উপায় নেই।"
পলাশ এক মুহূর্ত ভেবে জিজ্ঞেস করল, "আর একটা কথা স্যার, খুনে সময় বিষ প্রয়োগের জায়গা এক ছিল?"
"হ্যাঁ, ফরেনসিকের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে, ঠিক পিঠের মাঝখানে তিনবার পুশ করা হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কাল সকালের মধ্যে হাতে চলে আসবে, তুমি একবার লালবাজারে এসো।" প্রবীর হাজরা ফোনটা কেটে দিলেন।
ফোনটা রেখে পলাশ আবার পায়চারি শুরু করল। ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ। "নীহারিকা, অঙ্কটা ঠিক মিলছে না। অনিক চৌধুরীকে মারার জন্য টিনা চৌধুরী, বিশু পাল বা সীমা রায়ের জোরালো মোটিভ থাকতে পারে। কিন্তু বাকি দুজন—রঞ্জন পাল আর অবিনাশ গাঙ্গুলী কেন খুন হলেন? এই তিনজনের মৃত্যুর প্যাটার্ন যখন হুবহু এক, তখন খুনি নিশ্চিতভাবে একজনই।"
পলাশ হোয়াইট বোর্ডে লেখা তারিখ আর নামগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। হঠাৎ ওর মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। চোখের মণি দুটো বড় বড় হয়ে উঠল ওর।
"নীহারিকা! একটা জিনিস খেয়াল করেছিস?" পলাশ চিৎকার করে উঠল।
নীহারিকা চমকে তাকিয়ে বলল, "কী হলো?"
"প্যাটার্নটা দেখ! অনিক চৌধুরীর মরদেহের পাশে যে বন্ধ ঘড়িটা পাওয়া গিয়েছিল, তাতে তারিখ ছিল ৯। আর ৯ তারিখে খুন হলেন রঞ্জন পাল। আবার রঞ্জন পালের বাড়ির ছাদ থেকে যে ঘড়িটা আমরা উদ্ধার করেছি, তাতে তারিখ দেওয়া ছিল ১১। আর সেই ১১ তারিখেই প্রাণ হারালেন আইনজীবী অবিনাশ গাঙ্গুলী!"
নীহারিকা লাফিয়ে উঠে বলল, "তার মানে... অবিনাশবাবুর লাশের পাশে ফেলে যাওয়া ঘড়িটার তারিখই কি পরবর্তী খুনের দিন?"
পলাশ বোর্ডের ওপর মার্কার দিয়ে বড় করে লিখল— '১৫'। ওর গলার স্বর এখন বরফের মতো ঠান্ডা। "একদম তাই। খুনি আমাদের ওপর তাস ছেড়ে দিয়ে খেলা দেখছে। আগামী ১৫ তারিখে সে আবার আঘাত হানবে। যদি ঘাতককে এবার হাতেনাতে ধরতে হয়, তবে আমাদের দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে ১৫ তারিখের ওই সম্ভাব্য শিকার বা 'ভিকটিম' আসলে কে!"
বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে তখন শিকার ধরার নীল নকশা আঁকছে অদৃশ্য কোনো হাত। পলাশ জানে, সময় বালির মতো হাত থেকে ফুরিয়ে যাচ্ছে।
11
সকাল দশটা। লালবাজারের সদর দপ্তরে তখন রোদ চনমনে, কিন্তু ভেতরের করিডোরগুলোতে এক চাপা উত্তেজনা। পলাশ আর নীহারিকা ভেতরে ঢোকার মুহূর্তেই সামনে পড়ল সব্যসাচী। কলকাতা পুলিশের এই ডাকাবুকো অফিসারকে দেখেই নীহারিকা হেসে বলল, "সব্যসাচীদা, কেমন আছো?"
সব্যসাচী একটা ফাইল বগলে নিয়ে ক্লান্ত হাসল। "এই চলছে রে, প্রচুর প্রেশার! তার মধ্যেই ভালো থাকতে হয়। তোদের খবর কী? জার্নালিজম ছেড়ে এখন তো পলাশদার যোগ্য সাগরেদ হয়েছিস দেখছি। এখন কি কেসের তদ্বিরে লালবাজারে?"
নীহারিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আর বোলো না! শহরে একটার পর একটা রহস্যজনক খুন হয়ে চলেছে। মাথা ঠিক রাখা দায়।"
সব্যসাচীর মুখটা গম্ভীর হলো। "কানে এসেছে খবরটা। রঞ্জনদার মৃত্যুটা যে আসলে খুন, সেটা শুনে খারাপ লাগল। দেশে অপরাধীর সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে কী বলব! এখনকার অপরাধীরা আবার ক্রাইম থ্রিলার সিরিজ দেখে অনেক বেশি স্মার্ট হয়ে গেছে। নিত্যনতুন অপরাধের কৌশল বের করছে আর পুলিশকে নাকের জলে চোখের জলে করে ছাড়ছে।"
নীহারিকা এবার একটু রসিকতা করে বলল, "অপরাধীরা একটু স্মার্ট না হলে আমাদের প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি চলবে কী করে সব্যসাচীদা? আমাদেরও তো ডাল-ভাত জোগাড় করতে হবে, নাকি?" কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
হাসি থামলে পলাশ নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, "আচ্ছা সব্যসাচী, তোমাদের এই রঞ্জন পাল লোকটা কেমন ছিল?"
সব্যসাচী একটু ইতস্তত করে বলল, "এমনিতে লোকটা ভালই। তবে কিছু মোটা টাকার বিনিময়ে নয়কে ছয় আর ছয়কে নয় করার অনেক গুজব শোনা যেত। শ্যামপুকুর থানা থেকে সোজা লালবাজারে পোস্টিং হয়েছিল ওর, মাথার ওপরে অনেক বড় বড় লোকেদের হাত ছিল তো!" এরপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে বলল, "আজ একটু তাড়া আছে রে, তোরা পরে একদিন আয়, জমিয়ে গল্প করা যাবে।" এই বলে সব্যসাচী দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।
ওরা এবার সোজা ডিআইজি প্রবীর হাজরার ঘরে গিয়ে ঢুকল। হাজরা সাহেব ওদের দেখে দু-কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে ইশারায় বসতে বললেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তিনি শুরু করলেন, "কাল ডানকুনি থানার চ্যাটার্জির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ও টিনা চৌধুরীকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার অনুমতি চাইছে। চ্যাটার্জির ধারণা, পুলিশি কায়দায় একবার চাপ দিলেই সব সত্যি গড়গড় করে বেরিয়ে আসবে।"
পলাশ ভ্রু কুঁচকে শুনছিল। হাজরা সাহেব আবার বললেন, "আমি বারণ করলাম। ঠিকঠাক প্রমাণ ছাড়া এসব রাঘব বোয়ালদের ধরা মানে নিজেদের বিপদ ডেকে আনা। টিনা চৌধুরীর বয়ান অনুযায়ী, রাতে ওর ফোনে কেউ খবর দিয়েছিল যে অনিক চৌধুরী ডানকুনির বাগানবাড়িতে কোনো বান্ধবীর সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। এখন কোন নম্বর থেকে সেই ফোন এসেছিল, সাইবার ক্রাইম বিভাগ আজ সন্ধ্যার মধ্যেই তার ডিটেইলস আমাকে জানাবে।"
কথাটা শেষ করে প্রবীর হাজরা পলাশের দিকে তাকালেন। "আর পলাশ, তোমার তদন্ত কতদূর?"
পলাশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, "অনেকটাই এগিয়েছে স্যার। পরবর্তী খুনের তারিখটাও আমরা জানতে পেরেছি।"
ডিআইজি সাহেব চমকে উঠলেন। "বলো কী! আবার খুন হবে?"
পলাশ ধীরস্থিরভাবে বলল, "প্যাটার্ন যা বলছে, তাতে আগামী ১৫ তারিখ আরও একটা খুন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।"
হাজরা সাহেব অস্থির হয়ে উঠলেন। "কিন্তু ১৫ তারিখ কে খুন হতে পারে?"
পলাশ একটু সময় নিয়ে বলল, "এটাই এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। অনিক চৌধুরী, রঞ্জন পাল আর অবিনাশ গাঙ্গুলী—এই তিনজনের নামের মধ্যে কোনো এক অদৃশ্য সুতো আছে। পরবর্তী শিকার কে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।"
কথা বলতে বলতেই পলাশ টেবিলের ওপর থাকা ফরেনসিক রিপোর্টটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে লাগল। হঠাৎ ও থমকে গেল। ওর চোখের মণি বড় হয়ে উঠল। "ও মাই গড! স্যার, রিপোর্টটা দেখেছেন?"
পলাশ উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগল, "রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ লেখা হয়েছে হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু রক্তে পটাশিয়ামের লেভেল তো অস্বাভাবিকভাবে বেশি! তার মানে তো—"
হাজরা সাহেব মাথা নাড়লেন। "হ্যাঁ, ঠিক যা ভাবছ তা-ই। রিপোর্টে 'ওলেয়ান্ড্রিন'-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। খুনি এটাই ব্যবহার করেছে।"
পলাশ রিপোর্টটা রেখে দিয়ে জানালার দিকে তাকাল। ধীর স্বরে বলল, "রিসিন থেকে ওলেয়ান্ড্রিন... এই খুনি তো বিষের ওপরে রীতিমতো পিএইচডি করে বসে আছে স্যার।
প্রবীর হাজরা ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে পলাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
"পলাশ, তোমার জন্য একটা দারুণ খবর আছে। ডিপার্টমেন্ট আর ওপর মহলে যথেষ্ট আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, এই রহস্যজনক খুনের তদন্তভার তোমাদের এজেন্সিকেই দেওয়া হবে। আমরা সব ধরনের সাহায্য করব, তবে আমার একটাই শর্ত—১৫ তারিখের মধ্যে খুনিকে খাঁচায় পুরতে হবে।"
পলাশ কিছুটা বিনয়ের সাথে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, "অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার। তবে এই মামলার গভীরে যেতে আমার আরও কিছু তথ্যের প্রয়োজন।"
প্রবীর হাজরা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ব্যস্তভাবে উঠে দাঁড়ালেন। "আমি এখনই বালিগঞ্জ থানায় ফোন করে দিচ্ছি। ওখানে অফিসার অভিমন্যু রায় আছে। ওর সাথে দেখা করো, অবিনাশ গাঙ্গুলীর খুনের সব এভিডেন্স ওর কাছেই পাবে। আজ ধর্মতলায় একটা বড় সমাবেশ আছে, আমাকে এখনই বেরোতে হবে। অল দ্য বেস্ট, পলাশ!"
বালিগঞ্জ থানা: মিনিট কুড়ি পরে পলাশ আর নিহারিকা থানায় পৌঁছাতেই অভিমন্যু রায় উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানালেন।
"আসুন, আসুন! ডিআইজি স্যার আগেই ফোন করে আপনাদের কথা বলে রেখেছেন। তদন্তে যা যা লাগবে, সব সাহায্য আপনারা আমাদের থেকে পাবেন।"
পলাশ প্রতি-নমস্কার জানিয়ে সরাসরি কাজের কথায় এল, "ধন্যবাদ অভিমন্যু বাবু। আচ্ছা, অবিনাশ গাঙ্গুলী যে রাতে খুন হন, সিসিটিভি ফুটেজে কি নতুন কিছু পাওয়া গেছে?"
অভিমন্যু রায় কিছুটা হতাশ হয়ে মাথা নাড়লেন, "না স্যার। আশেপাশের গলিতে কোথাও ক্যামেরা ছিল না। শুধু অবিনাশ বাবুর বাড়ির দরজায় একটা ক্যামেরা ছিল। তাতে খুনিকে দেখা যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শরীরটা কালো চাদরে এমনভাবে মোড়া ছিল যে চেনার উপায় নেই। তবে লোকটা বেশ লম্বা-চওড়া।"
"ফুটেজটা কি একবার দেখা যাবে?" পলাশের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি।
"নিশ্চয়ই।" অভিমন্যু রায় ল্যাপটপটা ঘুরিয়ে ফুটেজটা প্লে করলেন।
পলাশ আর নিহারিকা রুদ্ধশ্বাসে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। দেখা গেল, খুনি অবিনাশ গাঙ্গুলীকে প্রায় অচেতন অবস্থায় ধরে ধরে বাড়ির সামনে নিয়ে এল। তারপর সিসি ক্যামেরার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত এক কাণ্ড করল! পকেট থেকে ড্রপারের মতো দেখতে সূক্ষ্ম নিডল লাগানো একটা বস্তু বের করে অবিনাশের পিঠের তিন জায়গায় দ্রুত তিনবার পুশ করল। মুহূর্তের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে এল অবিনাশ গাঙ্গুলীর শরীর। যাওয়ার আগে খুনি পকেট থেকে একটা ব্যারিস্টারি ব্যান্ড আর একটা পুরানো দিনের পকেট ঘড়ি লাশের পাশে ফেলে রেখে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
পলাশ বারবার ফুটেজটা রিওয়াইন্ড করে দেখল, কিন্তু খুনির মুখটা আড়ালেই রয়ে গেল। সে চোখ সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "এই অবিনাশ গাঙ্গুলী লোকটা ঠিক কেমন ছিলেন?"
অভিমন্যু রায় একটু বাঁকা হাসলেন, "পেশায় নামী আইনজীবী, কিন্তু বদনামের শেষ নেই। শোনা যায়, উনি কেস হারার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন। অন্য পক্ষের উকিলের থেকে টাকা খেয়ে নিজের ক্লায়েন্টকে এমনভাবে ডোবাতেন যে বোঝার উপায় থাকত না। অর্থাৎ, হেরে গিয়ে জেতার চেয়েও বেশি রোজগার করতেন উনি।"
পাশ থেকে নিহারিকা ফিসফিস করে বলে উঠল, "তার মানে উনি কেস হেরে গিয়েই কোটিপতি হচ্ছিলেন! বাঃ, এ তো দেখি উপার্জনের এক অভিনব আর ভয়ংকর পদ্ধতি!"
পলাশ ব্যরিস্টারি ব্যান্ডের দিকে তাকিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। তদন্তের মোড় এবার কোন দিকে ঘোরে, সেটাই দেখার।
পলাশ ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সোজা তাকাল অভিমন্যু রায়ের দিকে। তার চোখে তখন গভীর চিন্তার ছাপ। ঘরের স্তব্ধতা ভেঙে পলাশ প্রশ্ন করল, "অভিমন্যু বাবু, একটা ব্যাপার কি লক্ষ্য করেছেন? খুনি যে ধরনের বিষ প্রয়োগ করেছে, তাতে একবার পুশ করলেই অবিনাশ বাবুর মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। কিন্তু খুনি তিনবার বিষ প্রয়োগ করল কেন? এই 'তিন' সংখ্যার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় রহস্য বা সংকেত লুকিয়ে আছে।"
অফিসার অভিমন্যু রায় একটু ভেবে উত্তর দিলেন, "হতে পারে খুনি কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। তিনবার বিষ প্রয়োগ করে সে হয়তো মৃত্যুটাকে একশ শতাংশ নিশ্চিত করতে চেয়েছিল।"
পলাশ মাথা নাড়ল। তার যুক্তিবাদী মন এই সহজ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারল না। সে ধীর গলায় বলল, "না, আমার মনে হয় না এটা শুধু নিশ্চিত হওয়ার জন্য। এই তিনবার বিষ প্রয়োগের আড়ালে নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ ইঙ্গিত বা সংকেত আছে যা আমাদের বুঝতে হবে। খুনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই কাজটা করেছে। সে পকেটে করে ব্যারিস্টারি ব্যান্ড আর ঘড়ি নিয়ে এসেছিল ফেলে যাওয়ার জন্য, তার মানে সে আমাদের সঙ্গে একটা খেলা খেলছে।"
পলাশ পায়চারি করতে করতে বলতে লাগল, "খুনির এই মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে এই সংকেতগুলোর মানে উদ্ধার করা খুব জরুরি। সে অবিনাশ গাঙ্গুলীর লাশের পাশে যা যা চিহ্ন রেখে গেছে এবং যেভাবে খুনটা করেছে—তার প্রতিটি পদক্ষেপের আড়ালে কোনো না কোনো গল্প বা প্রতিশোধের আগুন লুকিয়ে আছে। এই 'তিন' সংখ্যাটিই হয়তো আমাদের আসল অপরাধীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে।"
নিহারিকা মুগ্ধ হয়ে পলাশের বিশ্লেষণ শুনছিল। রহস্যের জট যেন ক্রমশ আরও জটিল হয়ে উঠছে।
12
শহরের ব্যস্ত রাস্তার কোলাহল পেছনে ফেলে নীল রঙের সেডান গাড়িটা তখন রঞ্জন পালের বাড়ির নির্জন গলির দিকে নিঃশব্দে এগোচ্ছে। স্টিয়ারিংয়ে পলাশের হাত দুটো শক্ত করে ধরা, যেন কোনো অদৃশ্য শত্রুর টুঁটি চেপে ধরেছে সে। তার দৃষ্টি সামনের রাস্তায় থাকলেও মন পড়ে আছে রহস্যের এক গোলকধাঁধায়। পাশে বসা নীহারিকা নিঃশব্দে লক্ষ্য করছিল পলাশের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ।
পলাশ: (গম্ভীর, ভারী গলায়) "জানিস নীহারিকা, আমার বারবার মনে হচ্ছে খুন করার এই অদ্ভুত ধরন, ফেলে যাওয়া ঘড়ির সময় আর তারিখ—সবই আসলে একটা নিখুঁত সংকেত। ঘড়ির তারিখটা যে পরবর্তী খুনের দিনক্ষণ, সেটা আমরা আগেই উদ্ধার করেছি। কাঁটাগুলো ১২টার ঘরে স্থির থাকার মানেও পরিষ্কার—অভাগা মানুষটার সময় ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু..."
গাড়ির গিয়ার পাল্টাতে পাল্টাতে পলাশের মাথায় হাজারটা প্রশ্ন বনবন করে ঘুরতে লাগল।
পলাশ: "...কিন্তু এই 'বার' গুলোর রহস্যটা এখনো মাথায় খেলছে না। সময়, বার আর তারিখের এই জটিল সমীকরণ খুনি কেন সাজিয়েছে?"
গাড়িটা এসে থামল রঞ্জন পালের আধুনিক স্থাপত্যের সুদৃশ্য বাড়ির সামনে। চারপাশটা বড্ড বেশি শান্ত। কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুললেন রঞ্জন পালের স্ত্রী। তার চোখেমুখে তখনও টাটকা শোক আর আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।
রঞ্জন পালের স্ত্রী: (ম্লান স্বরে) "আসুন, ভেতরে আসুন।"
ড্রয়িং রুমে বসেই পলাশ কোনো ভণিতা না করে সরাসরি আসল কথায় চলে এল। তার ধারালো চোখ দুটো রঞ্জন পালের স্ত্রীর মুখের ওপর স্থির।
পলাশ: "আমাদের কয়েকটা জরুরি প্রশ্ন আছে। আপনার স্বামী রঞ্জন পালের অতীত জীবন সম্বন্ধে আমরা একটু বিস্তারিত জানতে চাই।"
রঞ্জন পালের স্ত্রী: (খানিকটা হকচকিয়ে) "হঠাৎ উনার অতীত নিয়ে কেন?"মানুষটাই যখন নেই......
পলাশ: "তদন্তের খাতিরে। আমাদের ধারণা, এই খুনের শেকড় অনেক গভীরে, অতীতের কোনো অন্ধকার ঘটনায় লুকিয়ে আছে। কোনো পুরনো প্রতিশোধের আগুনে আপনার স্বামী হয়ত প্রাণ হারিয়েছেন। আপনি যদি সবটা খুলে না বলেন, আমরা খুনিকে কোনোদিনই নাগাল পাব না। শ্যামপুকুর থানার একজন সাধারণ সাব-ইন্সপেক্টর থেকে এত দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে লালবাজারে পৌঁছানো, এই রাজকীয় বাড়ি, দামী গাড়ি... সাধারণ পুলিশের চাকরিতে কি এগুলো আদৌ সম্ভব? উনি কি কোনো বড় অসাধু চক্রের সাথে যুক্ত ছিলেন?"
প্রশ্নগুলো শুনে রঞ্জন পালের স্ত্রী মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ পাথর হয়ে বসে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য দৃষ্টিতে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন।
রঞ্জন পালের স্ত্রী: "মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। একদিকে সততা, মনুষ্যত্ব আর আদর্শ, আর অন্যদিকে দারিদ্র্যের চরম কষাঘাত। সেই দ্বন্দ্বে অধিকাংশ সময় কালো দিকটাই জিতে যায়। আজ থেকে কুড়ি বছর আগের কথা। তখন আমরা শ্যামবাজারে একটা ছোট ভাড়া বাড়িতে খুব কষ্টে থাকতাম। হঠাৎ একদিন রঞ্জন উত্তেজিত হয়ে ফিরে এসে বলল, 'আমাদের কপাল খুলে গেছে! একটা খুনের কেস হাতে এসেছে। অপরাধীকে যদি কোনোভাবে বাঁচানো যায়, তবে আমাদের আর কোনো অভাব থাকবে না।' আমি বারবার বারণ করেছিলাম, বলেছিলাম আমাদের ওসব রক্তমাখা সুখ চাই না। কিন্তু ও তখন টাকার লোভে মত্ত। শেষ পর্যন্ত প্রমাণের অভাবে আসল অপরাধী ছাড়া পেয়ে গেল, আর ফেঁসে গেল একজন সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষ।"
পলাশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
পলাশ: "সেই নিরপরাধ মানুষটার নাম মনে আছে আপনার? সালটা কত ছিল?"
রঞ্জন পালের স্ত্রী: (স্মৃতি হাতড়ে) "নামটা ঠিক মনে পড়ছে না... তবে সালটা সম্ভবত ২০০২।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই পলাশের পকেটে ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল টিনা চৌধুরীর নাম। পলাশ ফোনটা কানে নিতেই ওপার থেকে ফিসফিসানি ভেসে এল।
টিনা চৌধুরী: "পলাশবাবু, আমি টিনা। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল, ভাবলাম আপনাকে জানানো দরকার। মাস দুয়েক আগে আমি অফিস থেকে ফিরে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন পাশের ঘর থেকে শ্বশুরমশাই আর অনিকেতবাবুর ঝগড়ার শব্দ কানে এল। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে যা শুনলাম, তাতে আমার রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল।"
পলাশ: "কী শুনেছিলেন?"
টিনা চৌধুরী: "শ্বশুরমশাই অনিকেতকে ধমক দিয়ে বলছিলেন—'বয়স তো অনেক হলো, এবার একটু ম্যাচিওর হ! কাউকে সরাতে হলে এজেন্সি আছে, লোক ভাড়া করা যায়। সব কাজ নিজের হাতে করতে নেই। ভুলে গেছিস, কুড়ি বছর আগে তোর এই সব কাঁচা হাতের কাজের জন্য আমাকে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছিল? তোরা একটা একটা করে ভুল করবি আর আমাকে পুলিশ-মাসল কিনতে হবে কোটি টাকা দিয়ে? সেই টাকা কি গাছ থেকে পড়ে?''
পলাশ চুপ করে সবটা শুনল। ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা কথাগুলো যেন একটা অদৃশ্য পাজলের শেষ টুকরোটা বসিয়ে দিল। কুড়ি বছর আগের সেই প্রভাবশালী 'অপরাধী' আর আজকের এই জটিল পরিস্থিতির যোগসূত্রটা পলাশের চোখের সামনে বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল।
পলাশ: "ধন্যবাদ টিনাদেবী, আপনি অন্ধকার পথে একটা মশাল জ্বেলে দিলেন।"
পলাশ রঞ্জন পালের স্ত্রীকে প্রশ্ন করলো আপনি অমরেন্দ্র চৌধুরীকে চেনেন?
উত্তর এলো রঞ্জনের মুখে এই নাম বহুবার শুনেছি।খুব প্রভাবশালী লোক।
ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে পলাশ সোজা হয়ে বসল। তার চোখে তখন শিকারি তৃপ্তি। সে ধীরস্থিরভাবে পাশে বসা নীহারিকার দিকে তাকাল।
পলাশ: "পুরো ছকটা মিলে গেছে নীহারিকা। ২০০২ সাল, একটা মিথ্যে তদন্ত, আর টাকার জোরে কেনা বিচার। সেই বিচারের বলি হওয়া মানুষটাই আজ যমদূত হয়ে ফিরে এসেছে... তবে একদম অন্য রূপে।"
চোখেমুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। নিহারিকা তখনও কিছুটা বিভ্রান্ত। পলাশ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্রুত গলায় বলল, "নীহারিকা, তুই এক্ষুনি একবার শ্যামপুকুর থানায় যা। ২০০২ সালে অমিত নামে এক ব্যক্তির খুনের সাজা হয়েছিল, খবরটা তোকে কনফার্ম করতে হবে। আমি হাজরা স্যারের সঙ্গে কথা বলে সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, ওখানে ফাইল পেতে তোর কোনো অসুবিধা হবে না।"
নীহারিকা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, "কিন্তু হঠাৎ করে এই অমিত নামটা তুই কোথায় পেলি?"
পলাশ রহস্যময় হাসল। "পুরোটাই অংকের খেলা রে! এখন সময় নেই, পরে বুঝিয়ে বলব। আমায় এখন অমরেন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে একবার দেখা করতে হবে। আমি ওখান থেকে সোজা থানায় আসছি, তুই ততক্ষণ অমিতের ডিটেইলস বের করে রাখ।"
সন্ধ্যা ছটা। বাইরের আকাশটা তখন কালচে হয়ে এসেছে। পলাশ যখন শ্যামপুকুর থানায় পৌঁছাল, নিহারিকা তখন ধুলোমাখা পুরনো ফাইলের স্তূপে নিমগ্ন। পলাশকে দেখেই সে মুখ তুলল।
"পেয়েছিস?" পলাশের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন।
নীহারিকা খাতা এগিয়ে দিয়ে বলল, "হ্যাঁ, নাম অমিত সেন। অ্যাড্রেসটাও নোট করে নিয়েছি।"
"দারুণ! আমাদের হাতে সময় খুব কম, এখনই বেরোতে হবে," পলাশ ফাইলটা একবার দেখে নিয়ে বলল।
থানার ওসি শুভজিৎ সামন্ত এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলেন। এবার তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, "পলাশবাবু, আপনাদের একা ছাড়া কি ঠিক হবে? যাকে আপনারা সন্দেহ করছেন, সে কিন্তু যথেষ্ট ধূর্ত আর বিপজ্জনক। কেউ তাকে সন্দেহ করে তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এটা টের পেলে সে কিন্তু ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজনে আমরা আপনাদের সাথে ফোর্স পাঠাতে পারি।"
পলাশ একটু ভেবে বলল, "সরাসরি পুলিশ ভ্যান দেখলে ও সতর্ক হয়ে যাবে সামন্তবাবু। তার চেয়ে বরং একটা কাজ করুন— আপনারা এই অ্যাড্রেসটার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায় পজিশন নিয়ে থাকুন। কোনো বিপদ দেখলে বা প্রয়োজন পড়লে আমি ফোন করব। আপনারা যাতে দ্রুত পৌঁছাতে পারেন, সেটুকুই নিশ্চিত করুন।"
শুভজিৎ সামন্ত মাথা নাড়লেন। "ঠিক আছে, তাই হবে। সাবধানে থাকবেন।"
থানার গেট দিয়ে বেরোনোর সময় পলাশের হাতে ধরা অমিত সেনের সেই পুরনো ফাইল। অন্ধকার রাতে এক নতুন রহস্যের কিনারা করতে রওনা দিল দুই সঙ্গী।
উত্তর কলকাতার সেই ঘিঞ্জি গলির ভেতরে পুরোনো স্থাপত্যের বাড়িগুলো যেন একেকটা ইতিহাসের সাক্ষী। পলাশ আর নীহারিকা যখন নির্দিষ্ট ঠিকানায় এসে পৌঁছাল, দেখল লোহার ভারি দরজায় একটা বড় তালা ঝুলছে। ধুলোর আস্তরণ দেখে বোঝা যায়, অনেকদিন ওটা খোলা হয়নি। যুগ যুগ ধরে তালা খুলে ভেতরে কেউ ঢুকেনি তা কিন্তু নয়।
তবে উত্তর কলকাতার রকে বসা আড্ডাধারীদের কাছে খবরের অভাব হয় না। বাড়ির অদূরেই একটা রকে বসে চার-পাঁচজন প্রবীণ ব্যক্তি জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন। পলাশ এগিয়ে গিয়ে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা জেঠুমণি, এই বাড়িটাতে কি এখন কেউ থাকেন না?"
এক চশমা পরা বৃদ্ধ কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললেন, "দেখতেই তো পাচ্ছ বাপু তালা মারা, তবে আবার জিজ্ঞেস করছ কেন?"
পলাশ মুহূর্তের মধ্যে নিজের উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগাল। গলার স্বরে কিছুটা বিষণ্ণতা মিশিয়ে বলল, "আসলে আমার বাবা ছিলেন অমিত সেনের বন্ধু। ছোটবেলায় কতবার এই বাড়িতে এসেছি! বাবা বিদেশে থাকার সময় অমিত কাকুর সেই দুর্ঘটনার খবর পান, কিন্তু তখন ফেরার মতো পরিস্থিতি ছিল না। বাবার একটা গচ্ছিত জিনিস ওনাকে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল, তাই ভাবলাম কলকাতায় যখন এসেছি এই সুযোগে একবার দেখা করে যাই। কিন্তু কেউ যখন নেই, তখন আর কী করা! ফিরে যাওয়াই ভালো।"
পলাশের কথা শুনে অন্য এক বৃদ্ধের মুখভঙ্গি নরম হলো। তিনি বললেন, "ওরে বাবা! তুমি অমিতের বন্ধুর ছেলে? তা অমিত তো চলে গেল, তারপর ওর পরিবার আর টেকেনি এখানে। ওরা সব নদিয়ায় অনিকেতের মামার বাড়ি চলে গিয়েছিল। তারপর শুনলাম ওর মা তো শোক সইতে না পেরে আত্মহত্যাই করলেন। ছেলেটা, একদম একা হয়ে গেল। মামার বাড়ির লোক ওকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল।"
পলাশ উৎসুক হয়ে শুনছিল। ভদ্রলোক আবার বলতে শুরু করলেন, "বছর দুয়েক আগে হঠাৎ একদিন অনিকেত এসে উদয় হলো। বলল— ‘জেঠু চিনতে পারছেন?’ সেই ছোট্টবেলার অনিকেত! পড়াশোনায় বরাবর ভালো ছিল, ক্লাবের ফাংশানে কী চমৎকার আবৃত্তি করত ছেলেটা! ভাগ্যের পরিহাসে সব তছনছ হয়ে গেল। এখন তো সাউথ কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট কিনেছে, সেখানেই থাকে।"
পলাশ সুযোগ বুঝে জিজ্ঞেস করল, "অনিকেত এখন কী করছে জেঠু? মানে ওর ঠিকানাটা কি পাওয়া যেতে পারে?"
বৃদ্ধ পকেট থেকে একটা পুরনো ডায়েরি বের করে বললেন, "হ্যাঁ, ও তো আমায় ঠিকানাটা দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল বিদেশে বড় চাকরি পেয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই চলে যাবে। তার আগে পৈত্রিক ভিটেটায় কটা দিন সময় কাটিয়ে যেতে চায়।এখানে মাঝে মাঝে এসে একান্ত সময় কাটিয়ে যায় যতই হোক বাবার ভিটে বলে কথা।"
ঠিকানাটা নোট করে নিয়ে পলাশ আর নিহারিকা পা বাড়াল। গলি থেকে বেরোনোর সময় পলাশ নীহারিকার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, "এখন যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আজ রাতেই আবার এই বাড়িতে আমাদের ফিরতে হবে।"
নীহারিকা অবাক হয়ে বলল, "কেন? এখানে কি আর কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা আছে?"
পলাশ আঙুল দিয়ে পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে দেখা যাওয়া একটা ছোট বাগান দেখাল। সেখানে অযত্নে বেড়ে ওঠা সারিবদ্ধ রেঁড়ি আর রক্তকরবী গাছ দাঁড়িয়ে আছে। পলাশ ধীর গলায় বলল, "এখানেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। এখানেই সব অংক মিলে দুয়ে দুয়ে চার হচ্ছে।।"
নীহারিকা চোখ কপালে তুলে বলল, "আমি কিছুই বুঝতে পারছি না পলাশ! একটু খুলে বলবি?"
পলাশ রহস্যময় হাসল। "সবই বলব, তবে সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য।
এখন শুধু রাত নামার অপেক্ষা। চারপাশের নিস্তব্ধতা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। পলাশ নিহারিকার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আমি এখানেই অপেক্ষা করছি, তুই এবার ফিরে যা।"
নিহারিকার চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। সে কিছুটা ইতস্তত করে বলল, "তুই কি এখানে এই অন্ধকার গলির আড়ালে একা লুকিয়ে থাকবি? যদি কোনো বিপদ হয়?"
পলাশ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তার চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা। "আশা করি এখানে বিপদের তেমন সম্ভাবনা নেই। তবে আমার বিশ্বাস, আজ রাত কাটলে এখান থেকেই রহস্যের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য আর প্রমাণ পাওয়া যাবে। তোকে এখন ফিরতেই হবে নিহারিকা, কারণ তোকে একটা বিশেষ কাজ করতে হবে।"
"কী কাজ?" নিহারিকা জানতে চাইল।
"তোর যত রকম সোর্স আছে সব কাজে লাগিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দীপঙ্কর বসুর বর্তমান ঠিকানাটা তোকে খুঁজে বের করতে হবে। হাতে একদম সময় নেই।"
নিহারিকা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, "কে এই দীপঙ্কর বসু? হঠাৎ ওঁর কথা আসছে কেন?"
পলাশ এবার গলার স্বর আরও নামিয়ে আনল। অত্যন্ত গম্ভীরভাবে বলল, "হয়তো খুনির চতুর্থ এবং শেষ শিকার। যেকোনো মূল্যে আমাদের ওঁকে বাঁচাতেই হবে।"
নিহারিকার বিস্ময় যেন আকাশ ছোঁয়। সে হতবাক হয়ে বলল, "আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! আমি তো আর সাসপেন্স ধরে রাখতে পারছি না। কি করে এই রহস্য ভেদ হলো? করা এই অমিত সেন, অনিকেত সেন, আর এখন এই বিচারপতি... ? হঠাৎ এরা কি করে এই রহস্যের মাঝে ঢুকে গেল?এই রহস্যের জালটা ঠিক কতটা গভীরে? আমাকে সবটা খুলে বল পলাশ!"
পলাশ শুধু আলতো করে নিহারিকার কাঁধে হাত রাখল। "এখন কথা বলার সময় নয়। তুই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঠিকানাটা জোগাড় করে কাল সকালে অফিসে চলে আয়। তখন সব কথা হবে, কথা দিচ্ছি।"
13
নিহারিকা পলাশকে খুব ভালোই চেনে। ও এরকমই—সঠিক সময় না এলে পেটের কথা সহজে বের করা যায় না। মনের মধ্যে একরাশ কৌতুহল আর আশঙ্কা চেপে রেখে সে পলাশকে 'গুড লাক' জানিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে পা বাড়াল। পিছন ফিরে একবার দেখল, টিমটিমে আলোয় পলাশ একাকী দাঁড়িয়ে আছে।
নিহারিকা চলে যাওয়ার পর পলাশ আর এক মুহূর্তও কালক্ষেপ করল না। পকেট থেকে ফোনটা বের করে সরাসরি ডিআইজি হাজরাকে ডায়াল করল সে। ফোনের ওপার থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই পলাশ দ্রুত গলায় বলল, "হ্যালো স্যার, আমি পলাশ বলছি। আমার জরুরি ভিত্তিতে কয়েকজন সাদা পোশাকের পুলিশ অফিসার লাগবে।"
ডিআইজি হাজরা কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন, "হঠাৎ সাদা পোশাকের পুলিশ কেন? কী ব্যাপার পলাশ?"
"স্যার, অনিকেত সেন নামে এক ব্যক্তির ওপর আমাদের কড়া নজরদারি চালাতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থাটা করুন।" পলাশের গলায় এক অদ্ভুত তাড়না।
ডিআইজি হাজরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, "অনিকেত সেন? কে এই লোকটা?"
"অমিত সেনের ছেলে," সংক্ষেপে উত্তর দিল পলাশ।
কে এই অমিত সেন? আর .......
কথাটা শেষ করতে না দিয়েই পলাশ বিনীত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, "স্যার, সবটা আপনাকে পরে সবিস্তারে খুলে বলব। এখন শুধু এটুকু জানুন যে আমাদের হাতে সময় একদম কম। আপনি দয়া করে এই অনিকেতের ওপর নজরদারির ব্যবস্থাটা এক্ষুনি করুন। আমার হাতে এখানে একটা জরুরি কাজ আছে, সেটা শেষ করেই আমি ফিরে আসছি। তারপর আপনাকে পুরো বিষয়টা রিপোর্ট করব।"
ডিআইজি হাজরা পলাশের কাজের ধরন জানেন। সে কোনো অকাট্য যুক্তি ছাড়া এভাবে অনুরোধ করে না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, "ঠিক আছে পলাশ, আমি বুঝতে পারছি। আমি এখনই লোক পাঠাচ্ছি। তুমি তোমার কাজ শেষ করো।"
ফোনটা কেটে দিয়ে পলাশ গভীর অন্ধকারের দিকে তাকাল। দাবার ঘুঁটিগুলো এবার এক এক করে নড়তে শুরু করেছে।
লালবাজারের সিআইডি সদর দপ্তরের হল ঘরটিতে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। ঘড়ির কাঁটায় সকাল দশটা। এপ্রিলের তপ্ত রোদেও ঘরের ভেতরটা এসি-র কল্যাণে বেশ শীতল, কিন্তু উপস্থিত আধিকারিকদের মনের উত্তেজনা সেই শীতলতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। বালিগঞ্জ থানার অভিমন্যু রায়, শ্যামপুকুরের শুভজিৎ সামন্ত আর ডানকুনির প্রলয় চ্যাটার্জী—তিনজনেই তাকিয়ে আছেন ডিআইজি প্রবীর হাজরার দিকে।
দরজা খোলার শব্দে সবার নজর সেদিকে গেল। ঘরে ঢুকলেন দুঁদে গোয়েন্দা পলাশ এবং তার ছায়াসঙ্গী নিহারিকা। পলাশের চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন এক দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছেন তিনি।
ডিআইজি হাজরা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "পলাশ, তোমার নির্দেশমতো শ্যামবাজারের সেই আস্তানায় ফরেনসিক টিম পৌঁছে গেছে। আর দুর্ধর্ষ বিষ বিশেষজ্ঞ অনিকেত সেনকে অ্যারেস্ট করে লালবাজারের পথে রওনা দিয়েছে স্পেশাল ফোর্স। এখন শুধু তোমার মুখ থেকে এই রহস্যের জট খোলার অপেক্ষা।"
পলাশ গম্ভীর গলায় সতর্ক করল, "স্যার, অনিকেত সেন সাধারণ অপরাধী নয়। ও বিষ নিয়ে খেলা করে। ওর ওপর কড়া নজর রাখবেন, ও যেকোনো মুহূর্তে খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।"
ইতিমধ্যে নিহারিকার আমন্ত্রণে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন সব্যসাচী। পলাশ মৃদু হেসে সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে টেবিলের ওপর একটা পুরনো আমলের পকেট ঘড়ি রাখল। শুরু হলো রহস্য উন্মোচনের সেই শ্বাসরুদ্ধকর আখ্যান।
লালবাজারের সেই নিস্তব্ধ হলঘরে পলাশ যখন বলতে শুরু করল, তখন উপস্থিত দুঁদে পুলিশ অফিসারদের চোখেমুখে বিস্ময়। পলাশ টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো সরিয়ে দিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলতে শুরু করল অপরাধীর মনস্তত্ত্ব আর সংকেতের সেই জটিল জাল।
অপরাধীর মনস্তত্ত্ব ও সংকেতের ভাষা
পলাশ গম্ভীর গলায় বলল, "যেকোনো অপরাধের কিনারা করতে গেলে অপরাধীর মনস্তত্ত্ব বোঝাটা সবথেকে জরুরি। এই খুনি কেবল খুন করেই ক্ষান্ত হয়নি, সে মৃতদেহের পাশে কিছু চিহ্ন রেখে আমাদের সাথে একটা খেলা খেলছিল। সে নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছিল এই খুনের মাধ্যমে। প্রতিটি মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকা বস্তুগুলো আসলে ছিল এক একটা প্রতিবাদ আর পরবর্তী খুনের আগাম বার্তা।"
প্রথম সূত্র: অনিক চৌধুরী ও স্তব্ধ সময়
পলাশ বলতে লাগল, "প্রথমেই আসি অনিক চৌধুরীর কথায়। তাঁর দেহের পাশে পাওয়া গিয়েছিল কিছু খুচরো পয়সা আর একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়ি। ঘড়িটির কাঁটা ১২টার ঘরে স্থির ছিল, আর তারিখের ঘরে লেখা ছিল SAT 9। অনিকের গলায় ছিল দুটি কাটিং মার্ক।
এখানে খুচরো পয়সার অর্থ হলো—অর্থের জোরে আইনের জাল কেটে বেরোনো গেলেও শেষ রক্ষা হয় না। ঘড়ির ১২টার কাঁটা নির্দেশ করছিল যে তাঁর আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু আসল রহস্য ছিল ওই SAT কোডে। অনেক ক্যালকুলেশনের পর আমি বুঝলাম, অনিকের গলার ওই দুটো কাটিং মার্ক আসলে একটা নির্দেশ। অর্থাৎ, SAT-এর দ্বিতীয় অক্ষর 'A' আমাদের নিতে হবে। আর ৯ তারিখ ছিল পরবর্তী খুনের দিন।"
দ্বিতীয় সূত্র: রঞ্জন পাল ও খেলনা বন্দুক
পলাশ এবার রঞ্জন পালের ফাইলটা খুলল। "রঞ্জন পালের খুনের জায়গায় পাওয়া গেল একটি খেলনা বন্দুক আর একইভাবে ১২টার ঘরে থমকে যাওয়া একটি ঘড়ি। সেখানে তারিখ ছিল MON 11।
এখানে খেলনা বন্দুকের প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত গভীর। ক্ষমতার জোরে একজন নিরপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেও আসল মৃত্যুর সামনে সত্যিকারের বন্দুকও খেলনায় পরিণত হয়। রঞ্জন পালের পিঠে ছিল একটিমাত্র আঘাতের চিহ্ন। তাই আমি MON-এর প্রথম অক্ষর 'M' বেছে নিলাম। আর ১১ তারিখ ছিল অবিনাশ গাঙ্গুলীর খুনের দিন।"
তৃতীয় সূত্র: অবিনাশ গাঙ্গুলী ও ব্যারিস্টারি ব্যান্ড
"সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছিল অবিনাশ গাঙ্গুলীর খুনের ঘটনাটি," পলাশ বলতে থাকল। "সেখানে খুনি ফেলে গিয়েছিল একটি ব্যারিস্টারি ব্যান্ড। এর অর্থ স্পষ্ট—আইন রক্ষার শপথ নিলেও তিনি তা পালন করেননি। ঘড়িতে তারিখ ছিল FRI 15। এবার খুনি রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে সিসিটিভির সামনেই অবিনাশের পিঠে পরপর তিনবার বিষ প্রয়োগ করল।
এই 'তিন' সংখ্যাটিই ছিল সংকেত। FRI-এর তিন নম্বর অক্ষর অর্থাৎ 'I' নিতে হবে আমাদের। আর আজকের তারিখ অর্থাৎ ১৫ তারিখ হলো তার শেষ চালের দিন।"
শব্দছক ও অমিত সেনের রহস্য
পলাশ একটু থেমে সবার দিকে তাকাল। "এখনও পর্যন্ত পাওয়া অক্ষরগুলো সাজালে দাঁড়ায় 'AMI'। কিন্তু এর কোনো পূর্ণাঙ্গ অর্থ মিলছিল না। আমি তখন ছোটবেলার শব্দছক বা সুডোকু মেলানোর ছন্দে ভাবতে শুরু করলাম। দেখলাম, যদি এর শেষে একটি 'T' অক্ষর যোগ করা যায়, তবে নামটা দাঁড়ায় 'AMIT'।
এই ধরণের ঘড়িতে 'T' অক্ষরটি সাধারণত TUE (মঙ্গলবার) বা THU (বৃহস্পতিবার) থেকে আসতে পারে। এই অমিত সেন নামটাই ছিল আমাদের তুরুপের তাস, যা আমাদের শেষ পর্যন্ত সেই দুর্ধর্ষ বিষ বিশেষজ্ঞ অনিকেত সেনের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিল।"
পুরো হলঘর তখন নিথর। ডিআইজি হাজরা মুগ্ধ হয়ে বললেন, "অসাধারণ বিশ্লেষণ পলাশ! স্রেফ একটা নাম থেকে তুমি পুরো খুনিকে ছেঁকে তুললে!"
সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল পলাশের পরবর্তী কথার জন্য। ঘরে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। পলাশ বলতে শুরু করল:
"আমার মনে বারবার একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল—এই প্রতিটি খুনের মধ্যে কোনো না কোনো অদৃশ্য সুতো জড়িয়ে আছে। খুনি প্রতিটি লাশের পাশে একটি করে বন্ধ ঘড়ি রেখে যাচ্ছে। এই ঘড়িগুলো কেবল সময়ের প্রতীক নয়, বরং কোনো এক থমকে যাওয়া সময়ের সংকেত। এই সংকেতটুকু ব্রেক করতে পারলেই খুনির আসল উদ্দেশ্য বোঝা সম্ভব ছিল।
তদন্তের খাতিরে যখন রঞ্জন পালের স্ত্রীর সাথে কথা বলছিলাম, তখনই প্রথম আঁচ পাই যে আজ থেকে ঠিক কুড়ি বছর আগে এমন কিছু ঘটেছিল, যা ঘটা উচিত ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সব কটা খুন হওয়া ব্যক্তির সঙ্গে চৌধুরী পরিবারের একটা গভীর যোগসূত্র আছে। শুরুতে অনিক চৌধুরীর খুনের ঘটনায় আমার সন্দেহের তালিকায় বিশু পাল আর সীমা রায় ছিল; কারণ তাদের যথেষ্ট মোটিভ ছিল। কিন্তু টিনা চৌধুরীর একটা ফোন আমার ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দিল।
রঞ্জন পালের হঠাৎ পদোন্নতি আর হাতে আসা প্রচুর টাকা, অবিনাশ গাঙ্গুলীর কুড়ি বছর আগে থেকে শুরু করা এক অদ্ভুত কৌশল—কেস ছেড়ে দিয়ে উকিলদের চেয়েও বেশি আয় করা, আর অনিক চৌধুরীর বিশ বছর আগের ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে তার বাবার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ—এই সবকটি বিন্দু যোগ করলে একটাই ছবি ফুটে ওঠে। কুড়ি বছর আগে শ্যামপুকুর থানায় ঘটে যাওয়া কোনো এক ভয়ংকর অন্যায়ের হিসাব মেলাতেই আজকের এই রক্তপাত।
যখন সেই মৃতদেহের পাশে পাওয়া ঘড়ির খাপ থেকে একটি নাম উদ্ধার হলো এবং শ্যামপুকুর থানার পুরনো রেকর্ডেও সেই নামের হদিস মিলল, তখন আর কোনো সংশয় রইল না।"
পলাশ একটু থেমে নিহারিকার দিকে তাকাল, তারপর বলতে লাগল:
"নিহারিকাকে শ্যামপুকুর থানায় পাঠিয়ে আমি সোজা চলে গিয়েছিলাম অমরেন্দ্র চৌধুরীর বাড়ি। প্রথমে তিনি সব অস্বীকার করলেও, নিজের ছেলের খুনের প্রকৃত বিচার পাওয়ার আশায় শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়লেন। তাঁর মুখ থেকেই বেরিয়ে এল কুড়ি বছর আগে ক্ষমতার দম্ভে ঢাকা পড়া এক ঘৃণ্য অপরাধের কাহিনী।
সময়টা ছিল ২০০২ সাল। অনিক চৌধুরী তখন টগবগে যুবক। তার বান্ধবী সায়নীকে সিনেমার হিরোইন করার প্রলোভন দেখিয়ে সে নানা অসামাজিক কাজে লিপ্ত করেছিল। কিন্তু সায়নী যখন সব বুঝতে পেরে অনিকের সমস্ত কুকীর্তি ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেয়, তখন অনিক রূপ বদলে ফেলে। ভালোবাসার অভিনয় করে নিজের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে গিয়ে সে সায়নীকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে গলা টিপে হত্যা করে।"
"অনিক যখন ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে পালাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সেখানে হাজির হন অমিত সেন নামে এক ব্যাংক কর্মী। সায়নীর ইন্স্যুরেন্সের কিছু কাগজে সই করাতেই তাঁর আসা। ঘরে ঢুকে সায়নীর নিথর দেহ দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তৎকালীন শ্যামপুকুর থানার পুলিশ অফিসার রঞ্জন পাল ছিলেন নীতিভ্রষ্ট। অমরেন্দ্র চৌধুরীর কাছ থেকে মোটা টাকার প্রলোভন আর পদোন্নতির টোপ পেয়ে তিনি নির্দোষ অমিত সেনকেই খুনি হিসেবে সাজিয়ে দিলেন। আইনের রক্ষক হয়েও তিনি ভক্ষকের ভূমিকা নিলেন। এই সাজানো মামলাকে পূর্ণতা দিতে এবং অমিত সেনের বিরুদ্ধে নকল সাক্ষ্য-প্রমাণ সাজাতে সবরকম সাহায্য করেছিলেন ধূর্ত আইনজীবী অবিনাশ গাঙ্গুলী এবং তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব দীপঙ্কর বসু।
টাকার জোরে আর ক্ষমতার বলে একজন নিরপরাধ মানুষকে তিলে তিলে শেষ করে দেওয়া হয়েছিল। আর ঠিক এই কারণেই আমার বুঝতে বাকি ছিল না যে, চতুর্থ ভিকটিম আর কেউ নন—স্বয়ং প্রাক্তন বিচারপতি দীপঙ্কর বসু।"
শ্যামপুকুর থানা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যখন আমি সেই রহস্যময় বাড়ির সামনে পৌঁছলাম, তখন চারপাশ নিস্তব্ধ। বাড়ির অবয়বটাই যেন জানান দিচ্ছিল, এর ভেতরে কোনো এক অশুভ পরিকল্পনা দানা বেঁধেছে। বাড়িটিতে ঢোকার সরাসরি কোনো পথ না পেয়ে কৌশলে অনিকেত সেনের হদিস বের করলাম। এখন শুধু সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা।
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকলাম। হাতে থাকা 'মাস্টার কি' দিয়ে নিঃশব্দে সদর দরজা খুলতেই এক অদ্ভুত গুমোট গন্ধ নাকে এল। কিন্তু ভেতরের দৃশ্য দেখে আমি রীতিমতো তাজ্জব! ড্রয়িংরুমের কোণের একটা ডাস্টবিনে পড়ে আছে স্তূপাকার রেড়ি আর রক্তকরবীর বীজের খোসা। নীহারিকা আর বাকিদের চোখেমুখে তখন হাজারো প্রশ্ন—সামান্য বীজের খোসা নিয়ে এত উত্তেজনা কেন?
তাদের কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে পলাশ একে একে রহস্যের জট খুলতে শুরু করল। তার কণ্ঠস্বর তখন কোনো দক্ষ বিষবিজ্ঞানীর মতো শোনাল।
পলাশ বলতে শুরু করল, "শুনতে সাধারণ মনে হলেও এগুলো পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী জৈব বিষের উৎস।"
প্রাচীন মিশরে প্রদীপ জ্বালানোর কাজে রেড়ির তেল ব্যবহৃত হলেও, ১৮৮৮ সালে জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হারমান স্টিলমার্ক প্রথম এই বীজের বিষাক্ত প্রোটিনটি আলাদা করেন। তিনি দেখেন এটি রক্তকণিকাকে জমাট বাঁধিয়ে দেয়। তার নামানুসারেই এর নাম রাখা হয় 'রিসিন'।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা 'W-Bomb' প্রজেক্টের মাধ্যমে আকাশ থেকে রিসিনের গুঁড়ো ছড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশরা প্রায় ৫০০ কেজি রিসিন উৎপাদন করেছিল, যা দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে নিঃশব্দে শেষ করে দেওয়া সম্ভব ছিল।
এটি এতটাই বিপজ্জনক যে কোনো লাইসেন্স ছাড়াই প্রকৃতি থেকে এর কাঁচামাল সংগ্রহ করা যায়। আক্রান্ত রোগীর শরীরে সাধারণ ভাইরাল ফিভার বা ফুড পয়জনিংয়ের লক্ষণ দেখা দেয়, ফলে ডাক্তাররা বিভ্রান্ত হন আর খুনি পালানোর সুযোগ পায়।
অনিকেত সেন তার বাড়ির গোপন ল্যাবরেটরিতে এই রিসিন তৈরি করত। রঞ্জন পালকে মারার জন্য সে এক অভিনব পদ্ধতি বেছে নিয়েছিল। একটি ছোট ড্রোন ব্যবহার করে দূর থেকে বিষ প্রয়োগ করায় সিসিটিভি ফুটেজে কোনো মানুষের আনাগোনা ধরা পড়েনি। সেই বিশেষ ড্রোনটি আমি এই বাড়ি থেকেই উদ্ধার করেছি।
পলাশ শান্ত স্বরে বলল, "রক্তকরবীর বিষ বা ওলেয়ান্ডার আরও মারাত্মক। মাত্র একটা বা দুটো বীজ একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।"
এই বিষ শরীরে প্রবেশ করলে প্রথমে বমি ও ঝাপসা দৃষ্টির সৃষ্টি হয়। এরপর শুরু হয় 'ব্র্যাডিকার্ডিয়া' (Bradycardia)—অর্থাৎ হৃদস্পন্দন অবিশ্বাস্যভাবে কমে যায়। হৃদপিণ্ড তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ঘটে।
পশ্চিমা সাহিত্যে একে 'হোয়াইট ওলেয়ান্ডার' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর লক্ষণগুলো সাধারণ হার্ট অ্যাটাকের মতো হওয়ায় ফরেনসিক সার্জনরা যদি বিশেষভাবে 'টক্সিকোলজি স্ক্রিনিং' না করেন, তবে এটি স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই ধামাচাপা পড়ে যায়।
অবিনাশ গাঙ্গুলীর খুনে এই বিষই ব্যবহার করা হয়েছে। ইনজেকশনের সিরিঞ্জে লেগে থাকা গাঢ় সবুজ বা হলুদাভ চটচটে রসের অবশিষ্টাংশই তার প্রমাণ। এই বাড়িতে সেই বিশেষ ধরনের সিরিঞ্জও পাওয়া গেছে।
পলাশ থামল। কিন্তু চমক তখনও বাকি ছিল। ঘরের এক কোণে পড়ে ছিল একটি মোটরচালিত লাটাই। অনিক চৌধুরীকে মারার জন্য যে সুক্ষ্ম মাঞ্জা সুতোর ফাঁদ পাতা হয়েছিল, এই লাটাইটিই ছিল তার মূল চালিকাশক্তি।
14
লালবাজারের করিডোরে তখন ভারী বুটের শব্দ আর চাপা উত্তেজনা। হাই সিকিউরিটি প্রিজন ভ্যান থেকে যখন অনিকেত সেনকে নামানো হলো, তখন তাকে একবার দেখার জন্য ভিড় জমে গেছে। কিন্তু সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে অনিকেত হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। যে মানুষের সব ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেছে, যার হাতে হাতকড়া, তার এই পৈশাচিক হাসি উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের মেরুদণ্ড দিয়ে হিমস্রোত বইয়ে দিল।
পলাশ তখন স্মোকিং জোনে শেষ টান দিয়ে ছাইদানিতে সিগারেটটা নিভিয়ে ধীরপায়ে অনিকেতের সামনে এসে দাঁড়াল। অনিকেত হাসতে হাসতেই পলাশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কোনোদিন আমার অসমাপ্ত কাজ শেষ না করে ছাড়ি না।"
মুহূর্তে ঘরে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল। ডিআইজি হাজরা ভ্রু কুঁচকে বললেন, "অসমাপ্ত কাজ মানে? আধঘণ্টা আগেই দীপঙ্কর বসুর বাড়ির সিকিউরিটি কনফার্ম করেছে তিনি নিজের ঘরে সুরক্ষিত আছেন। আর আপনি তো কাল রাত থেকে আমাদের কড়া নজরদারিতে। পাগলের মতো প্রলাপ বকছেন কেন?"
পলাশের বুকের ভেতরটা তখন কু ডাকছে। সে দায়িত্বরত পুলিশ অফিসারকে জেরা করতে শুরু করল, "এখানকার আসার পথে ওর গতিবিধি কেমন ছিল? ও কি কারও সাথে যোগাযোগ করেছে?"
অফিসার আমতা আমতা করে বললেন, "না স্যার, ওকে পুরো জামাকাপড় চেঞ্জ করিয়ে ভ্যানে তোলা হয়েছিল। শুধু এখানে পৌঁছে ও একবার ওর লয়ারকে ফোন করতে চেয়েছিল। আমাদের অফিসের ল্যান্ডলাইন থেকে ও একটা নম্বর ডায়াল করে, কিন্তু ওপাশে কেউ ফোন তোলার আগেই ও হাসতে হাসতে রিসিভার নামিয়ে রাখে। কোনো কথা হয়নি।"
পলাশ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চিৎকার করে উঠল, "ডিআইজি স্যার! ইমিডিয়েট দীপঙ্কর বাবুর সিকিউরিটিকে ফোন করুন। ভেতরে গিয়ে ওনাকে চেক করতে বলুন!"
ফোন করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডিআইজি হাজরার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ওপাশ থেকে আসা খবরটা শুনে তার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তিনি রুদ্ধস্বরে বললেন, "দীপঙ্কর বসু মারা গেছেন... ওনার ঘরের ব্যারিস্টারি হাতুড়িটা পাশেই পড়ে আছে। আর একটা বন্ধ ঘড়ি পাওয়া গেছে—কাঁটাগুলো বারোটার ঘরে স্থির, বারের ঘরে লেখা 'Tue' (মঙ্গলবার)।"
অনিকেত এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "আমাকে এভাবে ধরে আনার মানে কী?
একজন পুলিশ অফিসার বলল এত গুলো খুনের অপরাধে।
আমি তো পুলিশের ঘেরাটোপে ছিলাম। আমি কি 'মিস্টার ইন্ডিয়া' যে অদৃশ্য হয়ে খুন করে এলাম?"
পলাশ দুহাত টেবিলের ওপর ভর দিয়ে ঝুকে এল অনিকেতের চোখের ওপর। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, "না, আপনি অদৃশ্য হননি। আপনি ওই ফোন কলটা ব্যবহার করেই খুনটা করেছেন।"
অনিকেত আবার হাসল, "অসম্ভব! ফোন করে কাউকে খুন করা যায় নাকি?"
"আপনার কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই," পলাশ বলতে শুরু করল। "আপনার মেধা আর টেকনোলজিকে আপনি শুধু প্রতিহিংসার আগুনে পুড়িয়েছেন। কুড়ি বছর আগে আপনার বাবা অমিত সেনকে মিথ্যে খুনের মামলায় ফাঁসিয়েছিল এই চারজন—অনিক চৌধুরী, রঞ্জন পাল, অবিনাশ গাঙ্গুলী আর দীপঙ্কর বসু। আপনার নিরপরাধ বাবা অপমানে জেলে আত্মহত্যা করেছিলেন, মা দুঃখে পাগল হয়ে মারা গেলেন। সেই থেকেই আপনি এই ব্লু-প্রিন্ট সাজাচ্ছিলেন।"
পলাশ একটু থেমে যোগ করল, "বাকি তিনজনের খুনের এভিডেন্স আপনার বাড়ি থেকে পেয়েছি। কিন্তু দীপঙ্কর বসুকে কীভাবে মারলেন সেটা না বললে আপনার বাবার নামের সেই শেষ ক্লু-টা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।"
মুহূর্তে অনিকেতের পাথুরে মুখটা ভেঙে পড়ল। চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে নামল তার। দীর্ঘ কুড়ি বছরের চাপা কান্না আর আক্রোশ যেন বাঁধ মানল না। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতার পর সে ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল:
"একটা বাচ্চার আকাশছোঁয়া স্বপ্নগুলোকে ওরা ছিঁড়ে ফেলেছিল স্রেফ নিজেদের স্বার্থে। সমাজের লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে আমার বাবা চলে গেলেন। সেইদিন থেকেই আমি আর বাচ্চা ছিলাম না, আমি হয়ে উঠেছিলাম এক একটা বিষাক্ত প্রতিশোধের বীজ। কুড়ি বছর অপেক্ষা করেছি এই দিনটার জন্য।"
অনিকেত মাথা উঁচু করে পলাশের দিকে তাকাল, "দীপঙ্কর বসুর ঘরের ঠিক নিচের তলাটা একবার চেক করতে বলুন আপনাদের টিমকে। তাহলেই বুঝবেন ফোন কলটা কেন জরুরি ছিল।"
লালবাজারের নির্দেশে একটি বিশেষ ফরেনসিক টিম দ্রুত পৌঁছে গেল দীপঙ্কর বসুর ঠিক নিচের তলার ঘরটিতে। সেখানে তল্লাশি চালাতেই বেরিয়ে এল এক অভাবনীয় এবং হাড়হিম করা চক্রান্তের প্রমাণ। পলাশের অনুমানই সত্যি হলো—অনিকেত সেন খুনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে নিঃশব্দ শব্দতরঙ্গকে।
পুলিশের সেই দল থেকে পলাশের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট আসতেই সে রহস্যের শেষ পরতটি উন্মোচন করল।
পলাশ ডায়েরিটা বন্ধ করে অনিকেতের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল, "সবই তো সাজিয়েছিলেন নিখুঁতভাবে। আমরা নিচের ঘরে কার্পেটের নিচে পাতলা তামার তারের কুণ্ডলী (Coil) পেয়েছি, যা সরাসরি এসি ভেন্টের সাথে যুক্ত ছিল। আপনার পরিকল্পনাটি ছিল মূলত 'ইনফ্রাসাউন্ড' (Infrasonic Sound) এবং 'রেজোনেন্স' (Resonance)-এর এক মারাত্মক মেলবন্ধন।"
পলাশ একে একে পয়েন্টগুলো ব্যাখ্যা করতে লাগল:
ঘরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল একটি কাস্টম-মেড স্পিকার। এটি এমন এক কম্পাঙ্ক (২০ হার্টজের নিচে) তৈরি করে, যা মানুষের কানে শোনা যায় না, কিন্তু পেসমেকারের ওপর তার প্রভাব হয় মারাত্মক।
আপনি জানতেন দীপঙ্কর বসুর হৃদযন্ত্রে একটি পেসমেকার বসানো আছে। আপনি কৌশলে ওই পেসমেকারের নির্দিষ্ট অপারেটিং ফ্রিকোয়েন্সি জেনে নিয়েছিলেন।
নিচের ঘরের সিলিংয়ে লুকানো সেই হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ভাইব্রেটিং ডিভাইসটি যখন সক্রিয় হয়, তখন তার ইনফ্রাসাউন্ড বিচারকের পেসমেকারের ফ্রিকোয়েন্সির সাথে 'রেজোনেন্স' তৈরি করে। এর ফলে পেসমেকারটি হয় অচল হয়ে যায়, নয়তো সম্পূর্ণ ভুল ছন্দে স্পন্দন তৈরি করতে শুরু করে।
ল্যান্ডলাইন থেকে করা ওই ফোন কলটি আসলে কোনো কথা বলার জন্য ছিল না। ওটা ছিল একটি নির্দিষ্ট ওয়াইফাই সিগন্যাল ট্রিগার করা, যা দূর থেকে ওই ডিভাইসটিকে অ্যাক্টিভেট করে দেয়। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিচারকের হৃদযন্ত্র তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়।
"বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে স্বাভাবিক হার্ট অ্যাটাক," পলাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "কিন্তু আসলে এটা ছিল ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে করা এক ঠান্ডা মাথার খুন।"
অনিকেত সেনের চোখের জল ততক্ষণে শুকিয়ে এসেছে। তার মুখে এখন এক বিষণ্ণ তৃপ্তির হাসি। সে ধীর গলায় বলল, "আইন যখন অন্ধ হয়ে নিরপরাধকে সাজা দেয়, তখন নিজের জন্য ন্যায় বিচার নিজেকেই এভাবে ছিনিয়ে নিতে হয়। আমার বাবার হৃদপিণ্ড অপমানে থেমে গিয়েছিল, আজ ওদেরটাও থেমে গেল। হিসাব এখন বরাবর।"
লকার রুমের অন্ধকারে অনিকেতকে নিয়ে যাওয়ার সময় পলাশ জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকাল। প্রতিশোধের এই রক্তক্ষয়ী উপন্যাসের আজ সমাপ্তি ঘটল ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞানের এই মারণ-ব্যবহার পলাশকে এক গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত করে রাখল।
বিচারকের ঘরে পড়ে থাকা সেই বন্ধ ঘড়িটি যেন এখনো চিৎকার করে বলছে—অন্যায়ের বিচার দেরিতে হলেও, তার পরিণাম বড় ভয়ঙ্কর।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment