1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

অফ্-সাইডে গোল

 ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা/অর্কজ্যোতি চক্রবর্ত্তী(Artificial Intelligence)

অফ্-সাইডে গোল

অর্কজ্যোতি চক্রবর্ত্তী

ফ্রান্সের উত্তর প্রান্তে, বেলজিয়ামের সীমান্তের কাছাকাছি লিল্ শহরে বসবাস করেন পৃথিবীর অন্যতম সেরা ক্রীড়া সাংবাদিক নিকোলা পেতি। অসম্ভব রূপসী এই ফরাসী শহরটিতে ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটেছে। শহরটির প্রতিটি রাস্তা, পুরোনো ভবন এবং চত্বর যেন অতীতের গৌরবগাথা বহন করে। সরু পাথরের রাস্তা, রঙিন ফ্লেমিশ ধাঁচের বাড়ি, কারুকার্যময় বারান্দা এবং ছোট ছোট ক্যাফে শহরটিকে এক স্বপ্নময় আবহ এনে দিয়েছে। সন্ধ্যার আলোয় যখন সেই ঐতিহাসিক ভবনগুলো আলোকিত হয়, তখন মনে হয় যেন কোনো রূপকথার শহরে এসে পৌঁছেছি।

নিকোলা পেতির বান্ধবী অবিশ্যি একজন বাঙালী ভদ্রমহিলা রোহিণী দাশ। বছর কয়েক আগে আলাপ হয়েছিল ফুটবল বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে। তখন থেকেই প্রেমানুরাগের স্নিগ্ধ বন্ধনে তাঁরা আবদ্ধ। লিল্ শহরের আলোকিত গির্জা, ঐতিহাসিক ভবন এবং শান্ত রাস্তা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে রোমান্টিকতায় ভরিয়ে দেয়। সুতরাং নিকোলার জীবনে এখন দুই ভালোবাসা: রোহিণী ও ফুটবল। 

যাইহোক, একদিন সেখানকার একটি বিলাসবহুল ক্যাফেতে বসে, রোহিণী নিকোলার কাছে আবদার করে বসলেন, “সামনের অক্টোবরে দুর্গাপূজাতে আমরা কলকাতা যাব।” শুনে নিকোলা তো একপায়ে খাড়া। কারণ দেশ-বিদেশ ঘোরা ও সেখানকার স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করা, তাঁর পেশা ও নেশা দুই-ই বলা যেতে পারে। এরপর যথারীতি নিকোলা ও রোহিণী ভারত-যাত্রার প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। নিকোলা সোশ্যাল মিডিয়ায় বাঙালীর শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা নিয়ে বিভিন্ন লেখা ও ভিডিও সার্চ করতে লাগল, আর সাথে সাথে উপলব্ধি করল, দুর্গাপূজা শিল্প ও সৃজনশীলতারও এক অনন্য প্রকাশ। কুমোরটুলির শিল্পীদের নিপুণ হাতে মাটির প্রতিমা যেন প্রাণ পায়। মণ্ডপশিল্পীরা ইতিহাস, সাহিত্য, পরিবেশ কিংবা সমসাময়িক নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে অসাধারণ শিল্পকর্ম নির্মাণ করেন। প্রতিটি পূজামণ্ডপ যেন এক একটি ক্ষণস্থায়ী শিল্পগ্যালারি হয়ে ওঠে। নতুন পোশাক, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ান, ধুনুচি নাচ, অঞ্জলি, ঢাকের বাদ্য, আর ভোগের খিচুড়ির স্বাদ— সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। 

এইভাবে দুর্গাপূজা সংক্রান্ত হোম-ওয়ার্ক সেরে নিয়ে আর রোহিণীর মুখে শোনা গল্পগুলো মনে গেঁথে নিয়ে, নিকোলা ও রোহিণী রওয়ানা দিলেন কলকাতার উদ্দেশ্যে। রোহিণীর বাবা-মায়ের সাথে সাক্ষাৎ ও তাঁদের সঙ্গে সুসময় কাটানোর জন্য দুর্গাপূজার দিন পনেরো আগেই তাঁরা পৌঁছলেন কলকাতায়। ঘটনাচক্রে, সেখানে তাঁদের সাক্ষাৎ হল প্রখ্যাত বাঙালী ক্রীড়া সাংবাদিক পূর্ণেন্দু করের সাথে। পূর্ণেন্দুবাবু তাঁকে বললেন, “সুস্বাগতম্! রোহিণী ও আপনি এখানে দুর্গাপূজা দেখতে আসছেন, আগেই শুনেছিলাম।” তারপর কথায় কথায় বললেন, “আমাদের এখানে যুবভারতীতে একটা জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা চলেছে; ফেডারেশন কাপ। আপনি যদি সেখানে অনুগ্রহ করে আসেন, তাহলে আমরা বাধিত হব।” একজন ফরাসী হিসাবে ভারতীয় ফুটবল নিয়ে নিকোলার সম্যক্ ধারণা নেই। কিলিয়াঁ এম্ব্যাপে-দেম্বেলে বা জিদানের মতো ফুটবলারের দেশের লোক হিসাবে নিকোলার ভারতীয় ফুটবল নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মনোভাব থাকাটাই স্বাভাবিক। সুতরাং, তিনি শুরুতে খানিক ইতস্তত: করলেও শেষে যেতে রাজী হয়ে গেলেন। রোহিণীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কোন দলের সাপোর্টার?” বিদেশে বসবাস করলেও বঙ্গললনা রোহিণী কিছুটা হলেও ভারতীয় ফুটবল নিয়ে খবরা-খবর রাখতেন। তিনি নির্দ্বিধায় বলে দিলেন তাঁর প্রিয় দলটির নাম: ‘সেরুলিয়ান স্পোর্টস’, আর দলের সেরা খেলোয়াড়: অনিকেত বসু।

নিকোলা আবার যথারীতি সোশ্যাল মিডিয়া খুলে সেরুলিয়ান স্পোর্টসের ও অনিকেত বসুর খেলার ভিডিওগুলো দেখলেন, খুব একটা খারাপ নয়; যদিও ‘প্যারি স্যাঁ-জ্যার্ম্যাঁ’ ফুটবল দলের পর্যায়ে পড়ে না কখনই। যাইহোক, দু’দিন পর নিকোলা তাঁর জীবনের প্রথম ভারতীয় ফুটবল ম্যাচ দেখতে গেলেন, সঙ্গে নিলেন রোহিণীকে। খেলাটা ছিল ফেডারেশন কাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের: সেরুলিয়ান স্পোর্টস বনাম ভাস্কো। খেলা শুরু হল, দাপটে খেলতে লাগল সেরুলিয়ানের ছেলেরা। অনিকেতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল সব আক্রমণ। কিন্তু গোল হল না। জলপানের বিরতির সময় নিকোলা যুবভারতীর গ্যালারিতে একটা কোকা-কোলা খেতে খেতে তাঁর বান্ধবী রোহিণীকে বললেন, “সেরুলিয়ানের ছেলেরা খেলছে ভাল, কিন্তু ওদের খেলায় ব্যাকরণগত ত্রুটি রয়েছে।” রোহিণী নাক-সিটকে বলে উঠলেন, “এটা ফরাসী লীগের খেলা নয়! তবে দেখ, অনিকেত নিশ্চয়ই কিছু না কিছু একটা অঘটন ঘটাবে।” নিকোলার দৃষ্টি তৎক্ষণাৎ খেলার মাঠে অনিকেতের ওপর গিয়ে পড়ল। দেখল, অনিকেত আরো তিনজন খেলোয়াড়কে ঈশারা করে কিছু একটা বোঝাচ্ছে। জলপানের বিরতির পর খেলা শুরু হতেই সে এক অদ্ভুত গোল। সেরুলিয়ানের সেন্টার ব্যাক্ ভীম একটু ওভারল্যাপে এসে বাঁ-পায়ে একটা লং-বল খেলল পেনাল্টি বক্সের মধ্যে। অনিকেত নিমেষের মধ্যে অফ্-সাইড ট্র্যাপ কাটিয়ে ভাস্কোর ডিফেন্ডারের পেছন দিয়ে দৌড়ে বলটাকে বাঁ-পায়ের ছোট্ট টোকায় নিয়ন্ত্রণ করে, একটা দৃষ্টিনন্দন ‘চীপে’ বলটা গোলকীপারের মাথার ওপর দিয়ে জালে জড়িয়ে দিল। রোহিণী আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন; নিকোলা দারুণ একটা গোল দেখে মনে মনে খুশী হলেও, আনন্দের বহি:প্রকাশ ঘটালেন না। শেষমেষ খেলার ফলাফল দাঁড়াল ১-০, সেরুলিয়ান পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে।

দুর্গাপূজার আর দিন-দশেক বাকি। এর মধ্যেই টুর্নামেন্টও শেষ হয়ে যাবে। তাই নিকোলার ‘কলকাতা প্ল্যানের’ মধ্যে কলকাতা ফুটবলটাও অবধারিতভাবে জায়গা নিয়ে নিল। দুর্গাপূজায় প্যান্ডেলে দাপাদাপি করার আগে, কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবলের ওপর ছোটখাটো ‘কভার-স্টোরি’ লেখারও পরিকল্পনাও তিনি করে ফেললেন। সেই স্টোরিটা যদি কোনভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে ভারতীয় ফুটবলের জন্য ভালো কিছু আশা করা যেতেই পারে।

শুরু হল কোয়ার্টার-ফাইনাল খেলা। নিকোলা যথারীতি রোহিণীকে নিয়ে অনান্য লক্ষাধিক জনতার সাথে যুবভারতীতে উপস্থিত হলেন। বলা বাহুল্য, তাঁদের দর্শকাসন কিন্তু সেই যুবভারতীর ভিআইপি বক্সে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলা তথা ভারতবর্ষের বহু প্রখ্যাত প্রাক্তন খেলোয়াড়,  এবং অবশ্যই সুযোগ ও মনোযোগ সন্ধানী কিছু বিত্তশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা। নিকোলার লক্ষ্য এবং আগ্রহ কেন্দ্রিত কিন্তু সেই অনিকেত বসুতেই -সেরুলিয়ানের ‘নাম্বার টেন’। খেলা শুরু হল, সেরুলিয়ানের প্রতিপক্ষ রিয়াল মুম্বই দল। কিন্তু, এবার খেলাতে সবই ওলট-পালট হয়ে গেল। রিয়াল মুম্বই দল কাউন্টার-অ্যাটাকে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে দু-দুটি গোল দিল সেরুলিয়ানকে। খেলার ৭০ মিনিটে জলপানের বিরতির সময়ে ভিআইপি বক্সে একজন তথাকথিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলে উঠলেন, “সেরুলিয়ান টীমটার অতি-আত্মবিশ্বাসের জন্যই ভরাডুবি হল।” নিকোলা যদিও তাঁদের কথাবার্তা কিছুই বুঝছিলেন না, তবে তাঁর সে উদ্দেশ্যও ছিল না। তাই রোহিণীকে তাঁদের আলোচনার মর্মার্থ বোঝাবার জন্য বিরক্ত করলেন না। যাইহোক, এরপরে কিন্তু যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে দৃষ্টিগোচর হল এক অকল্পনীয় ফুটবল। অনিকেতের বাঁকানো ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে খেলার ফল ১-২ করল চীমা। গোটা গ্যালারি উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। খেলার তখন বাকী আরও পাঁচ মিনিট ও ইনজুরি টাইমের কিছুটা সময়। নিকোলা তখন তাঁর নিজের জগতে, তিনি তাঁর ফুটবলে পরিপক্ক মগজ খাটিয়ে বেশ বুঝতে পারলেন, এই ম্যাচটাও সেরুলিয়ানরা জিতে যেতে পারে। হ্যাঁ, তাই হল। পরপর দুটি গোল হল, একটা করল ও একটা করাল অনিকেত। অনিকেতের গোলার মতো শটে রিয়াল মুম্বইয়ের গোলের জাল প্রায় ছিঁড়ে গেল। খেলার ফল হল ৩-২। সেরুলিয়ান সেমি-ফাইনালে পৌঁছে গেল।

আর এক সপ্তাহ পর মা দুর্গা আসছেন। তার তিন দিন আগেই শেষ হয়ে যাবে ফেডারেশন কাপ। যাইহোক, রোহিণীর সাথে এখন নিকোলাও সেরুলিয়ান ফুটবল ক্লাবের সমর্থক বলা যেতে পারে। সেমিফাইনাল খেলা শুরু হল। সেরুলিয়ান বনাম টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দাবীদার ইউরেকা স্পোর্টস ইউনাইটেড। শুরু থেকেই ইউরেকা স্পোর্টস সংঘবদ্ধ ফুটবল খেলতে লাগল। সেরুলিয়ান বল দখলের লড়াইয়ে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে থাকল, পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাদের বল পসেশন গিয়ে দাঁড়াল ২০ শতাংশে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তাদের অবধারিত গোল হজম করতে হল। ইউরেকা স্পোর্টসের রাইট উইঙ্গার দারুণ গতিতে ওভারল্যাপে গিয়ে গোলের সামনে একটা গড়ানে ক্রস করতেই, বাঁ দিক থেকে তাদের এক তরুণ মিড-ফিল্ডার দৌড়ে এসে বলে পা ঠেকিয়ে গতিমুখ পরিবর্তন করে সেরুলিয়ানের গোলের জালে জড়িয়ে দিল। সেরুলিয়ানের লেফ্ট-ব্যাক সাবির ভ্যাবা-চ্যাকা খেয়ে লাইন্সম্যানের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল- যদি কোন কারণে অফ-সাইডে গোলটা নাকচ হয়ে যায়! না, সেটা হল না। সুতরাং, একগোলে পিছিয়ে থাকা সেরুলিয়ান ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ শুরু করে দিল। সব আক্রমণ কেন্দ্রিত থাকল অনিকেতকে ঘিরে। খেলা ৮০ মিনিট গড়িয়ে গেলেও সেরুলিয়ানের মরিয়া প্রচেষ্টা তখনও কার্যকর হয় নি। নিকোলা তখন মনে মনে প্রার্থনা করে চলেছেন, যেন সেরুলিয়ান আবার ফিনিক্সের মতো জেগে ওঠে। খেলা চলল। অনিকেত শর্ট কর্নার নিয়ে বলটা বাড়িয়ে দিল পেনাল্টি বক্সের একটু বাইরে থাকা মানিকের দিকে, মানিক আবার বলটা বাড়িয়ে দিল অনিকেতকে, সে ততক্ষণে নেমে এসেছে অন্-সাইডে। অনিকেত এইবার তীব্র বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বলটা বাড়িয়ে দিল মানিকের পাশে থাকা প্রদীপের দিকে। প্রদীপের পায়ের শট্ গোলার মতো; সে তীব্র গতিতে শট্ মেরে ইউরেকার গোলের জাল ছিঁড়ে ফেলল। খেলার ফলাফল হয়ে গেল ১-১। যুবভারতীর গ্যালারি সেরুলিয়ানের সমর্থকদের উল্লাসে ফেটে পড়ল। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার মুহূর্তে আবার চমক। অনিকেত এবার তার ডান পায়ের ভেলকি দেখাল। তার তোলা নিঁখুত ক্রসে এবার মাথা ছুঁইয়ে গোল করল স্ট্রাইকার তুষার। ইউরেকার আর খেলায় ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই, কারণ অন্তিমলগ্নে এই গোল তাদেরকে অবধারিতভাবে ফেডারেশন কাপ থেকে ছিটকে দিল। আর সেরুলিয়ান পৌঁছে গেল ফাইনালে। নিকোলার চোখে-মুখে তখন আনন্দের ছাপ, রোহিণী উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে দর্শকাসন ছেড়ে লাফালাফি শুরু করলেন।

এরপর নিকোলা রোহিণীকে বললেন, “আমাকে একটু অনিকেতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবে চল।” রোহিণী বললেন, “চল। লেট’স গো। আমিও উদগ্রীব ওর সাথে কথা বলার জন্য।” এইভাবে, প্রথিতযশা ফরাসী সাংবাদিক নিকোলা রোহিণীকে সঙ্গে করে সেরুলিয়ানের সুপারস্টার অনিকেতের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। ছোট্ট বেঁটে-খাটো অমায়িক মানুষটি ধীরে ধীরে তাঁদের দিকে এগিয়ে এল। নিকোলা অনিকেতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভাঙা-ভাঙা ইংরাজীতে বললেন, “আামি তোমার খেলা দেখে রীতিমতো মুগ্ধ। তুমি কী ইউরোপের ক্লাবে খেলতে ইচ্ছুক? তাহলে আমাকে জানিও। এটা আমার ই-মেল।” এই বলে তিনি অনিকেতকে তাঁর কার্ডটা দিলেন। স্বনামধন্য ক্রীড়া সাংবাদিক হিসাবে ইউরোপীয় লীগের বহু ক্লাবের সুপ্রিমোদের সাথে তাঁর ওঠা-বসা আছে। যাইহোক, একজন প্লেয়ার হিসেবে নিজের কোনো আবেগ অনিকেত যদিও প্রকাশ করে না, কিন্তু নিকোলার এই প্রস্তাবে সে যৎপরোনাস্তি উৎফুল্ল হয়ে উঠল। তার চোখটা জ্বলে উঠল, তার উত্তর অবশ্যই ‘হ্যাঁ’।

দুর্গাপূজার আর বাকি মাত্র চারদিন। আজই যবনিকা পতন ঘটে যাবে ফেডারেশন কাপের। ফাইনালে মুখোমুখি আগের বারের চ্যাম্পিয়ন বেঙ্গালুরু লায়ন্স আর সেই সেরুলিয়ান স্পোর্টস। আজ নিকোলা মনে মনে ছকে রেখেছেন, সেরুলিয়ান টুর্নামেন্ট জেতার পর তিনি রোহিণীর সাথে ভালোভাবে সেই জয় উদযাপন করবেন -হয়ত রোহিণীকে নিয়ে যাবেন কলকাতার বিখ্যত কোনো দামী রেস্তোঁরায়, সেখানে আনন্দ-উল্লাসে কাটাবেন সারারাত। কিন্ত, এ কী! খেলা শুরু হতেই সেই অঙ্কটা পাল্টে গেল চট্ করে। বেঙ্গালুরু লায়ন্স নিজেদের মধ্যে প্রচুর ছোট-ছোট পাস খেলে মাঝমাঠের দখল নিয়ে নিল। অনিকেতকে একটা বলও ছুঁতে দিল না। সে বল ধরলেই তাকে একটা ত্রিভুজ তৈরী করে বেঙ্গালুরুর খেলোয়াড়রা বারবার বল কেড়ে নিতে লাগল। বেঙ্গালুরু সেরুলিয়ানের গোলে অগুনতি শট্ নিতে থাকল, অন্যদিকে সেরুলিয়ান বেঙ্গালুরুর পেনাল্টি বক্স পর্যন্ত পৌঁছতেও পারল না। খেলা দেখে নিকোলার ফুটবল মস্তিষ্কে কোথায় যেন একটা খটকা লাগল। তাঁর মনে স্বভাবত:ই প্রশ্ন জাগল, সেরুলিয়ানকে তাদের কোচ চেনা ৪-৪-২ ছকে খেলাচ্ছেন না কেন? এটাই তো তাদের সেরা ফর্মেশন, যেটা দিয়ে তারা ভারতের যেকোনো দলের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে নাস্তানাবুদ করে দিতে পারে! ম্যাচ গড়ালেও পরিসংখ্যানের কিছু পরিবর্তন হল না এবং সেরুলিয়ান বেঙ্গালুরুর কাছে ৫-০ গোলে ম্যাচ হেরে গেল। নিকোলা তাঁর দেখা প্রথম ভারতীয় টুর্নামেন্টের শেষটা খুব একটা উপভোগ করতে না পেরে বিষণ্ণ মনে রোহিণীকে নিয়ে কলকাতায় তাঁদের আবাসে এলেন। তবে মনে মনে একটা বিষয় তাঁকে ক্রমাগত নাড়া দিতে থাকল, ‘সেরুলিয়ান ম্যাচ হারল, না ছেড়ে দিল?’

সেদিন রাত্রে নিকোলা তাঁর বন্ধু ফ্রান্সের বোর্দো-নিবাসী রোমাঁকে ফোন করলেন, যিনি ড্যাসল্ট কোম্পানীর ‘সাইবার সেলে’ কাজ করেন। নিকোলা তাঁর করিতকর্মা বন্ধুটিকে অনুরোধ করলেন, সেরুলিয়ানের কিছু খেলোয়াড় ও তাদের কোচের ‘কল রেকর্ডস’ ও ‘লোকেশন ট্রেস’ করতে হবে। কারণ তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, ম্যাচ গড়াপেটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। রোমাঁ বললেন, ভারতের সাইবার সিকিউরিটির নিশ্ছিদ্র জাল ছিঁড়ে, কয়েকজনের কুকর্মের হদিস পাওয়া খুবই দুষ্কর। তাই তাঁর প্রয়োজন একজন স্থানীয় হ্যাকারের সাহায্য। নিকোলার মতো ধুরন্ধর ব্যক্তির পক্ষে কলকাতার শহরতলীতে সেরকমই কাউকে খুঁজে নেওয়া অসম্ভব ছিল না- বাইশ-তেইশ বছরের একটি ছেলে যার ডাকনাম দেবু, ইঞ্জিনীয়ারীং ড্রপ-আউট। রোঁমা ও দেবুর যৌথ প্রচেষ্টায় সেরুলিয়ানের কোচ সহ তিনজন খেলোয়াড়ের ‘কল রেকর্ডস’ ও ‘লোকেশন ট্রেস’ করা গেল বটে, কিন্তু তাতে ম্যাচ গড়াপেটা সংক্রান্ত কোন তথ্যই মিলল না। সুতরাং, নিকোলা এবার তাঁর সাংবাদিকতার গভীর অন্তর্দৃষ্টিকে কাজে লাগালেন- ফুটবলের যাবতীয় আবেগকে দূরে সরিয়ে রোমাঁকে শেষবারের মতো অনুরোধ করলেন, সেরুলিয়ানের সেরা খেলোয়াড় অনিকেতের ‘কল রেকর্ডস’ অনুসন্ধান করতে। এখানেও সেরকম কিছু পাওয়া না গেলেও, রোমাঁ একটা ‘অডিও ক্লিপ’ নিকোলাকে পাঠালেন এবং তাঁকে সেটা শুনতে অনুরোধ করলেন।

অডিও ক্লিপটিতে রয়েছে অনিকেত ও তার মায়ের কথোপকথন। নিকোলা রোহিণীকে বললেন সেটি অনুবাদ করে বলতে। অনিকেত তার মাকে সেদিন যা বলেছিল, তার সারমর্মটি হল, “মা আমি পারলাম না….. বেঙ্গালুরুতে আমার ফুটবল জীবনের শুরু। তাই সে দলের কোচ যখন বললেন, এই ম্যাচে আমি যদি আন্ডার-পার্ফম করি, তাহলে ওরা আবার আমাকে ওদের দলে নেবে। আর আমাকে ভারতের বাইরেও খেলার সুযোগ করে দেবে। তখন আমি আর দু’বার চিন্তা করতে পারলাম না। ওদের কাছে আমার জন্য প্রচুর টাকার কন্ট্র্যাক্ট পেপারও তৈরী আছে…..সেরুলিয়ান ক্লাবকে আমি খুব ভালোবাসি। কিন্তু এই সুযোগ হাতছাড়া করি কি করে!” অডিও ক্লিপটি শোনার পর নিকোলা মাথায় হাত দিয়ে এবার নিজেকে ঘরের সোফার ওপর ছুঁড়ে দিলেন। এটা তো তিনি একেবারেই মেনে নিতে পারছেন না। এ তো বেঙ্গালুরুর সেরুলিয়ানের বিরুদ্ধে করা অফ্-সাইডে গোল। তিনি শিউরে উঠলেন, তাঁর দেশের খেলোয়াড় এম্ব্যাপে বা জিদান কী পারতেন, ভবিষ্যতের লোভনীয় প্রস্তাবের কথা ভেবে নিজের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ক্লাবের প্রতি বিশ্বাস-ঘাতকতা করতে? একজন খেলোয়াড়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, স্পোর্টসম্যান স্পিরিটকে জলাঞ্জলি দিয়ে, নিজের ১০০ শতাংশ না দিয়ে খেলতে? নিশ্চয়ই না। ভারতীয় ফুটবল নিয়ে যে আশার আলো তিনি দেখেছিলেন, এ সত্যোদ্ঘাটনের সাথে সাথে তা দপ্ করে নিভে গেল। কারণ, সেরুলিয়ান তথা ফেডারেশন কাপের সেরা খেলোয়াড় অনিকেত নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছে বিপুল রাশির অঙ্কের অর্থের প্রলোভনে। যাইহোক, নিকোলা ম্যাচ গড়াপেটার সূত্র আবিষ্কারের জন্য বন্ধু রোমাঁ ও কলকাতার তরুণ হ্যাকার দেবুকে ধন্যবাদ জানাতে ভুললেন না। 

আর মাত্র দুদিন পরেই দুর্গাপূজা শুরু হয়ে যাবে। সুদূর ফ্রান্সের লিল্ থেকে দুর্গাপূজা দেখার জন্যই তো নিকোলা রোহিণীর সাথে কলকাতায় এসেছেন। এই ফুটবল প্রতিযোগিতা ও তার সম্পর্কিত ঘটনাবলী তো তাঁদের হিসাবের মধ্যে মোটেও ছিল না। তবুও মনে হয় ভারতীয় ফুটবলের এই অন্ধকার দিকটি সর্বসমক্ষে আনতে দেবী দুর্গা তাঁকেই হয়তো দূত হিসাবে পাঠিয়েছেন। তাহলে তিনি এবার কী করবেন? সংবাদমাধ্যমে গেলে হয়তো অনিকেতের ক্যারিয়ারটাই শেষ হয়ে যেতে পারে। এক অভাবনীয় ফুটবল প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটে যেতে পারে। তাই তিনি শেষপর্যন্ত ঠিক করলেন, অনিকেতের সঙ্গে দেখা করবেন। সঙ্গে অবশ্যই থাকবেন রোহিণী, কারণ তিনিই নিকোলার একমাত্র বিশ্বস্ত অনুবাদক। অনিকেতের বাড়ির ঠিকানা পেতে অসুবিধা হল না। সুতরাং, বিশ্বের খ্যাতনামা ক্রীড়া সাংবাদিক নিকোলা এবার রোহিণীর সাথে উপস্থিত হলেন অনিকেতের হাওড়ার বাড়িতে। সেখানে অনিকেত থাকে তার বিধবা মায়ের সাথে। বৈঠকখানায় অনিকেত ও নিকোলার মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বাক্যালাপ হল। অনিকেত শুরুতে তার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করল। তখন রোহিণী বললেন, “দেখ অনিকেত। আমরা সবাই তোমার খেলা দেখে মুগ্ধ। নিকোলা মনে করেন, তুমি ইউরোপের যেকোনো ক্লাবের বি-টিমে এখনই সুযোগ পেতে পার এবং তারপর সেখান থেকে ক্লাব-ফুটবলের যেকোনো স্তরে তোমার উত্তরণ ঘটতে পারে। তোমার ফুটবল ক্যারিয়ার অন্য একটা মাত্রা পেতে পারে।” এটা শোনার পর অনিকেত হাউহাউ করে কেঁদে উঠল, “দিদি বিশ্বাস করুন, আমার টাকার ভীষণ দরকার। মায়ের ওপেন-হার্ট সার্জেরিটা তাড়াতাড়ি করাতে হবে বলেছেন ডাক্তারবাবু। তাছাড়া আমার মায়ের ওষুধপত্র কেনা ও চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দেনা হয়ে গেছে, সেগুলো শোধ দিতে হবে।” রোহিণী তাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বললেন, “তুমি ফুটবলে বিপক্ষের বিরুদ্ধে যেরকম গোল শোধ দাও, সেরকমভাবে তোমার সব ঋণ পরিশোধও তুমি করতে পারবে; তোমার মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আমরা তোমাকে দেব। কিন্তু তার বদলে তোমাকে আমাদের কিছু প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।” অনিকেত লজ্জা ও ভয়-মিশ্রিত চাহনিতে তাঁদের দিকে চেয়ে রইল। তখন নিকোলা ভাঙা-ভাঙা বাংলায় বললেন, “তুমি অর্থ বা অন্য কোনো কিছুর জন্যই তোমার ফুটবলার সত্তা তথা স্পিরিটটা বিসর্জন দিতে পারবে না- এটা আমাদের প্রথম শর্ত। আর তোমাকে আমাদের সঙ্গে ইউরোপে যেতে হবে ফুটবল খেলতে, তোমার মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা আমরা সেখানেই করে দেব। তুমি যদি ভারতের জাতীয় দলে নির্বাচিত হও, তবে নির্দ্বিধায় এখানে খেলেতে আসতে পারবে।” এটা শোনার পর, অনিকেত আবার কেঁদে ফেলল- তবে সেটা যে আনন্দাশ্রু। সে নিকোলার সঙ্গে উষ্ণ করমর্দন করে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ্ স্যার।”

এইভাবে ভারতের তথা বঙ্গের এক অনির্বচনীয় ফুটবল প্রতিভাকে নির্ঘাত অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে নিকোলা পেতি বান্ধবী রোহিণীর সাথে মহাসপ্তমীর দিন দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে-প্যান্ডেলে ঘুরতে বের হলেন। মহাঅষ্টমী ও মহানবমীর দিন তাঁর ও রোহিণীর ধুনুচি নৃত্যের ছবি ইন্স্টাগ্রামে আপলোড করতেই ইউনেসকো তাদের হ্যান্ডেলে সেটা রিপোস্ট করল। মহাসপ্তমীর দিন দেবীর আগমন থেকে দশমীর বিসর্জনের সব ছবিই নিকোলার মনের ক্যানভাসে আঁকা রয়ে গেল। তাঁদের ভারত ও কলকাতা ভ্রমনের উদ্দেশ্য সফল হল, তিনি রোহিণীকে সাথে করে আবার লিল্-এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন। আর অনিকেত? সে কিছুদিন পর বেঙ্গালুরু লায়ন্সের অফিসিয়াল কন্ট্রাক্ট প্রত্যাখ্যান করে তার মাকে নিয়ে পাড়ি দিল ইউরোপের উদ্দেশ্যে। শেষ পাওয়া খবর, সে এখন পর্তুগীজ লীগের একটি ফুটবল দলে দুর্দান্ত ফুটবল খেলছে। কিছুদিনের মধ্যে ভারতের জাতীয় দলেও হয়তো ডাক পেয়ে যাবে সে।।  


No comments:

Post a Comment