![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
রক্তছায়ার কলকাতা
রণিত ভৌমিক
তখন বাজে রাত দুটো, কলকাতার এক পুরোনো গুদামের সামনে বাতাস যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। দূরে গঙ্গার দিক থেকে ভেসে আসছে হালকা কুয়াশা। গুদামের ভেতরে কোনও আলো নেই, শুধু গাঢ়, নিঃশব্দ অন্ধকার।
আর সেই অন্ধকারের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ। মুখটা অচেনা কিন্তু ভঙ্গিতে অস্বাভাবিক এক স্থিরতা, যেন নড়াচড়া তার প্রয়োজনই নেই। তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক যুবক। হাত-পা শক্ত করে বাঁধা, মুখে গুঁজে দেওয়া কাপড়। তার চোখে জমে আছে ভয়, ঠিক ঠাণ্ডা কাচের মতো, নিঃশব্দ অথচ ভেঙে পড়ার মুখে।
ছায়ার মানুষটি ধীরে বলে ওঠে,
- মানুষ চিৎকার করে। আর সেই চিৎকারেই আমি ঈশ্বরের ভাষা শুনি। আমি সেই কণ্ঠস্বর।
কয়েক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এলো। তারপর ছুরির ধার অন্ধকারে ঝলসে ওঠে এবং সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ থেমে গেল। অন্ধকার গিলে নিল আরও একটি মানুষের শেষ শব্দ।
(১)
কলকাতার বুকে শীতের রোয়া তখন নিঃশব্দে নেমে আসছে। সময় ভোর সাড়ে পাঁচটা, রাস্তার ধারে চা-ওয়ালার কেটলিতে ফুটন্ত জলের শব্দ আর কালো চায়ের গন্ধে গোটা মোড়টা কুয়াশার সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করেছে। কলকাতা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।
কিন্তু লালবাজারের ওই লম্বা করিডোরে ভোর বলে কিছু নেই। সেখানে কখনো ঘুম আসে না, রাতও শেষ হয় না। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় আমার ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ডিসিপি সাহেবের নম্বর।
ফোনটা ধরতেই ওদিকে কোনও প্রাথমিক সৌজন্য না রেখেই উনি বললেন,
- ধর, তুমি কোথায়?
আমি বললাম,
- স্যার, বাড়ি থেকে এখনই বেরোচ্ছি। কোনও জরুরি কাজ?
উনি আমাকে কথা বলার আগেই থামিয়ে দিলেন। গলায় ছিল এক ধরনের চাপা উত্তেজনা, যে সুরটা আমি গত তিন বছরে ওনার কাছে খুব কমই শুনেছি।
- ভেরি আর্জেন্ট, খুব খারাপ কিছু হয়েছে। তোমাকে লালবাজারে এখনই দেখতে চাই, আমি অপেক্ষা করছি।
এরপরই লাইনটা কেটে গেল। আমি বুঝে গেলাম, আজ ওনার কথায় কোনও ব্যাখ্যা নেই। আছে শুধু এক চাপা আতঙ্ক, যেটা শব্দ ছাড়াই সব বলে দিচ্ছে।
লালবাজারে ঢুকতেই এক অদ্ভুত নীরবতা অনুভব করলাম। সাধারণত এখানে সকাল মানে কাগজপত্রের শব্দ, অফিসারদের হাঁটাহাঁটি, রিপোর্টিং ডেস্কের ব্যস্ততা। কিন্তু আজ যেন সবাই কিছু লুকোচ্ছে কিংবা কিছু ঘটতে দেখেছে, যা তারা এখনো আত্মস্থ করতে পারেনি।
ডিসিপি সাহেবের কেবিনে ঢুকতেই দেখলাম তিনজন অফিসার দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মুখে উত্তেজনা নেই, আছে একধরনের অস্বস্তিকর ভয়।
ডিসিপি সাহেব টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখ দুটো লাল, দীর্ঘ, ঘুমহীন রাতের ক্লান্তি সেখানে স্পষ্ট।
- বসো, ধর।
উনি বললেন এবং আমি বসতেই উনি টেবিলের ওপর একটা ফাইল ঠেলে দিলেন। ফাইলের ওপরে রাখা ছিল দুটি ছবি।
আমি সেই ছবি উঠিয়ে দেখলাম, দুটি মৃতদেহ। একই ভাবে সাজানো, একই কাটা চিহ্ন, একই রকম অদ্ভুত হাসি। আর বুকের ওপর কালো কালিতে লেখা, 'মানুষ চিৎকার করে। আর সেই চিৎকারেই আমি ঈশ্বরের ভাষা শুনি। আমি সেই কণ্ঠস্বর'।
লেখাটা দেখে শরীরটা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- স্যার, এটা কি নতুন কোনও সিরিয়াল কিলার?
ডিসিপি সাহেব উত্তর দিলেন,
- নতুন? না। গত এক মাসে একই প্যাটার্নে তিনটে খুন হয়েছে। কিন্তু দুটো কেস শহরের বাইরে হওয়ায় কেউ সিরিয়াল অ্যাঙ্গেলটা ধরতে পারেনি। গত রাতের দুটো খুন সব সন্দেহ একেবারে দূর করে দিয়েছে।
আমি ছবিগুলো আবার দেখি। মৃতদের চোখ বন্ধ, মুখে পাতলা হাসি। কোনও লড়াইয়ের চিহ্ন নেই। এ যেন স্বেচ্ছায় মৃত্যুতে গেছে, অথবা
- স্যার, এটা কি কোনও ধরনের মানসিক নিয়ন্ত্রণ? রিচুয়ালিস্টিক কিলিং?
আমি বললাম। যা শুনে ডিসিপি সাহেব চোখের চশমাটা খুলে বললেন,
- যাই হোক না কেন, এটা পাকা হাতে করা কাজ। আর এই ব্যাপারটা তোমাকেই তদন্ত করতে হবে, ধর।
আমি চুপ করে থাকলাম। ডিসিপি আবার বললেন,
- আর একটা কথা, তোমার সঙ্গে এই কেসে রিটায়ার্ড আইপিএস সুমন চৌধুরীকেও দরকার পরলে নিতে পারো।
কথাটা শোনা মাত্র আমার বুকের ভিতর এক অদ্ভুত আলো জন্মালো। সুমন স্যার আমার কাছে মেন্টরের মতো। এই শহরের অদ্ভুত, অসম্ভব, গভীর কেসগুলোতে উনি সাহায্য না করলে বিগত কয়েক বছরে আমি একার হাতে কিছুতেই সমাধান করতে পারতাম না। এক রহস্যময় ছায়ার মতো উনি আমার পাশে থেকেছেন।
কিন্তু সুমন স্যার তো বহুদিন আগেই রিটায়ারমেন্ট নিয়েছেন। নিজের একটা সীমারেখার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে রেখেছেন। আজ আবার ওনার কাছে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? এই কেসে জড়াতে উনি কি আদৌ রাজি হবেন?
মনের মধ্যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খেতে লাগল আর সেইসঙ্গে বাড়তে থাকল একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি, যেন সময় নষ্ট করার কোনও সুযোগ নেই। আমি তাও সাবধানে ডিসিপি সাহেবকে প্রশ্নটা করলাম,
- স্যার, উনি রাজি হবেন?
উত্তর দিতে গিয়ে ডিসিপি সাহেব একটু হাসলেন,
- তুমি গেলে হবেন। তোমাকে উনি ভালোবাসেন। আর এই কেস, সুমনের অভিজ্ঞতা ছাড়া অসম্ভব।
উনি একটু থামলেন। তারপর বললেন,
- গো, টক টু হিম। উই নিড আনসার্স।
ডিসিপি সাহেবের কেবিন থেকে বেরিয়ে, আমি গাড়ি নিয়ে সোজা সুমন স্যারের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এখানে ওনার সম্পর্কে সামান্য কিছু পূর্বতথ্য দেওয়া প্রয়োজন।
আইপিএস সুমন চৌধুরী স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করার পর নিজের ইচ্ছেতেই নর্থবেঙ্গলে পাকাপাকি ভাবে থেকে গেছিলেন। কিন্তু একজন এত সফল অফিসার মাঝপথে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর লালবাজার হোক বা ভবানী ভবন, আজও যেন খুঁজে চলেছে। সরকারি বা বেসরকারি যেকোনও অনুষ্ঠানেই ওনার নাম একবার না একবার উঠে আসে।
তবে, সেই আসল উত্তর জানি একমাত্র আমি, ইন্সপেক্টর লক্ষ্মীনারায়ণ ধর। কিন্তু আমি সবসময় চেয়েছি, আইপিএস সুমন চৌধুরীর জীবনের ওই একটা অধ্যায় যেন আজীবন পরিচালক শাশ্বত রায়চৌধুরীর মার্ডার কেসের আড়ালেই চাপা পড়ে থাকুক।
পরবর্তী সময়ে লালবাজার স্পেশাল ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের একজন অফিসার হিসেবে যখনই কোনও জটিল কেস আমার হাতে এসেছে, সমাধানের জন্য আমি বরাবর ওনার শরণাপন্ন হয়েছি, 'বিশল্যকরণী' কেসটা থেকেই। বলা যায়, আমাদের সম্পর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে আমার কারণেই মূলত ওনাকে নর্থবেঙ্গল ছেড়ে আবার কলকাতায় ফিরে আসতে হয়েছে।
যাই হোক, ফেরা যাক বর্তমানের কথায়। সময় তখন সকাল সাড়ে দশটা। বালিগঞ্জ প্লেসের কাছে সুমন স্যারের নতুন ফ্ল্যাটের সামনে গাড়ি থামালাম। চারপাশে এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি। লিফটে উঠে ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুললেন সুমন স্যার নিজে।
গায়ে কালো রঙের জ্যাকেট, চুলে সামান্য পাক কিন্তু চোখে সেই আগের তীক্ষ্ণতা। আমাকে দেখেই বললেন,
- একি ধর, তুমি এখন? পথ ভুলে চলে এলে নাকি?
- না, স্যার। আসলে...।
আমাকে কথাটা আর সম্পূর্ণ করতে দিলেন না সুমন স্যার। তিনি নিজেই বলতে লাগলেন,
- ওহ! বুঝেছি। তোমার আসার মানেই কোনও বড় কেস হাতে এসেছে আর নভিসের মতো তুমি দৌড়ে এসেছ সিনিয়রের সাহায্য চাইতে। কি তাই তো?
আমি হাসলাম কিন্তু হাসিটা কোথাও আটকে গেল আর সেটা সুমন স্যার বুঝলেন।
- বলো, কি দেখলে?
আমি ফাইলটা ওনার হাতে দিলাম। উনি খুব ধীরে এবং খুব মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি ছবি দেখতে লাগলেন। যেন চোখ দিয়ে নয়, অন্য কোনও অনুভূতিতে পড়ছেন। কয়েক মিনিট নীরবতার পর উনি ফাইল বন্ধ করে বললেন,
- এই সিগনেচার লাইনটা।
উনি একটু চেয়ে রইলেন আমার দিকে। আমি বললাম,
- হ্যাঁ, স্যার কি?
উনি ধীরে বললেন,
- আমি এটা আগে দেখেছি। বারো বছর আগে একবার আর সেই কেস কখনো সমাধান হয়নি।
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
- মানে? স্যার, খুনি ফিরে এসেছে?
উনি মাথা নাড়লেন,
- ফিরেছে, বা কেউ তার কাজকে পুনরাবৃত্তি করছে। কিন্তু ধর…।
তিনি ছবিতে আঙুল রাখলেন।
- এই খুনি শুধু হত্যা করছে না। সে যোগাযোগ করছে, সে একটা বার্তা পাঠাচ্ছে। সে চায় শহর তার কথা শুনুক।
ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। আমি ধীরে বললাম,
- স্যার, আমরা শুরু করব এখনই?
আমার প্রশ্নটা শুনে সুমন স্যার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। চোখে মুখে মুহূর্তেই গুরুতর ভাব। তারপর ধীরে বললেন,
- অবশ্যই। কিন্তু মনে রেখো, এই খুনি তোমাকেও লক্ষ্য করতে পারে। সিরিয়াল কিলাররা কখনোই তদন্তকারীদের উপেক্ষা করে না।
আমি মাথা নাড়লাম আর সেইসঙ্গে বুঝতে পারলাম যে ওই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়ে গেছে কলকাতার রাস্তায় এক অদৃশ্য কণ্ঠস্বরের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ, যে যুদ্ধ শহরের বুক চিরে তুলে আনবে বারো বছর আগের এক শীতল, অমীমাংসিত অন্ধকার।
(২)
সূর্যের আলো সেদিন প্রকট ভাবে দুপুরের তেজ ধরেছে। শীতকালে এমনটা অবাকই করে। যাই হোক, লালবাজারের করিডোরে ঢুকতেই ভিড়টা চোখে পড়ল। সাংবাদিকরা নয়, আমার নিজের সহকর্মীরা। যারা অনেক অপরাধ দেখেছে, অনেক রক্তের গন্ধ জেনেছে কিন্তু আজ তাদের চোখে এক অদ্ভুত সন্ত্রস্ততা। মনে হচ্ছিল, গোটা ভবনের গায়ে কেউ একটা শীতল ছায়া বুলিয়ে দিয়েছে।
আমি আর সুমন স্যার সোজা চলে গেলাম ফরেন্সিক ল্যাবে। ভেতরে ঢুকতেই সেখানে ছড়িয়ে থাকা তীব্র নীরবতাটা চোখে পড়ল। দরজা পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই নাকে এসে লাগল সেই পরিচিত রাসায়নিক গন্ধ, মানে কোনও মৃতদেহের ওপর কাজ চলছে।
ডাঃ মীনাক্ষী সেন, শহরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফরেন্সিক এক্সপার্ট, টেবিলের ওপর ঝুঁকে কোনও স্যাম্পল পরীক্ষা করছিলেন।
তিনি আমাদের দেখে একটু অবাক হয়ে বলে ওঠেন,
- স্যার, আপনারা দুজনেই এসেছেন? আমি ফোন করতে যাচ্ছিলাম।
আমি বললাম,
- আসলে ডাঃ সেন, সুমন স্যার চান একেবারে গোড়া থেকে তদন্ত শুরু করতে। তাই...।
আমাকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে সুমন স্যার বললেন,
- ফরেন্সিক টেস্টে কী পাচ্ছেন, সেটাই আমরা আগে জানতে চাইছি।
ডাঃ সেন গ্লাভস খুলতে খুলতে বললেন,
- স্যার, মৃতদেহ দুটোই আশ্চর্যভাবে টর্চার ছাড়াই মারা গেছে। শনাক্তকৃত ইনজুরি নেই। কোনও স্ট্রাগল নেই। আর সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে মৃতদেহের ঠোঁটের কোণে যে হাসিটা আছে, এটা মৃত্যুর কয়েক সেকেন্ড আগেই তৈরি হয়েছে।
কথাটা শোনা মাত্র আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
- অর্থাৎ মৃত্যুর সময় তারা হাসছিল?
ডাঃ সেন বললেন,
- হাসছিল না, হাসতে বাধ্য করা হয়েছে।
সুমন স্যার তাকে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
- কোনও ড্রাগ?
উত্তর এলো,
- সেটাই অদ্ভুত, স্যার। কোনও শক্তিশালী প্যারালাইটিক ড্রাগ নেই। যা আছে তা অত্যন্ত অল্পমাত্রার, যেন কাউকে শান্ত করতে দেওয়া হয়েছে। আর জিনিসটা কনট্রোলড, প্রায় সার্জিক্যাল বলতে পারেন।
আমি বললাম,
- তাহলে ওদের ইচ্ছাশক্তি কেড়ে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে?
ডাঃ সেন মাথা নাড়লেন।
- ঠিক তাই। আমি আরও একটা জিনিস দেখেছি।
তিনি টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছোট কৌটো বের করলেন। ভেতরে ছিল কাপড়ের ক্ষুদ্র টুকরো। তারপর বললেন,
- এই কাপড়টা দুই মৃতদেহের হাতের তালুর ভেতর চেপে রাখা ছিল। টর্চারের চিহ্ন নয় বরং একটা চাপা ইঙ্গিত।
আমি কাপড়টা হাতে নিয়ে বললাম,
- এটা কি লেখা? তিনটি শব্দ- 'আমাকে বলতে দাও'।
আমাদের চারপাশের বাতাস সঙ্গে সঙ্গে ভারী হয়ে গেল। সুমন স্যার কাপড়টা খুব আস্তে হাতে নিলেন। চোখে এক মুহূর্তে পুরোনো স্মৃতি দৌড়ে গেল যেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- স্যার, আপনার কি এটা চেনা লাগছে?
উনি ধীরে উত্তর দিলেন,
- হুম! বারো বছর আগের একটা কেসে একই ধরনের কাপড় ছিল। কিন্তু তখন লেখা ছিল- 'আমার কথা শোনো'।
ডঃ সেন চমকে উঠে বললেন,
- স্যার, তারমানে আপনি বলছেন এটা নতুন কেউ নয়, পুরনো কেউ?
সুমন স্যার মাথা নেড়ে বললেন,
- হ্যাঁ, এই খুনি বা তার আদর্শ অনুসরণকারী মৃতদেহকে একটা বার্তা বাহক বানাচ্ছে। আমাদের যেতে হবে খুনের জায়গায়, যেখানে এই দুটো দেহ পাওয়া গেছে।
এরপর আমরা ল্যাব থেকে বেরিয়ে সোজা রওনা হলাম ইএম বাইপাসের নিকটবর্তী এক পরিত্যক্ত কারখানার উদ্দেশ্যে। পুলিশ ভ্যানের শব্দ, মিডিয়ার ক্যামেরা আর বাতাসের ঘোলাটে হাহাকার মিশে একটা অদ্ভুত চাপ তৈরি করছিল।
জায়গাটা দেখে মনে হলো এখানে মানুষ মরতে আসে না, এখানে মানুষকে আনা হয়। কারখানার ভাঙা দেওয়ালে লাল রঙে হাতের ছাপ, মাটিতে শুকনো রক্ত আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে দুই দেহের দাগ।
আমি নিচু হয়ে দাগগুলো দেখলাম। দুটো বৃত্ত আঁকা মাটির ওপর এবং মাথার দিক উত্তরমুখী। আমি বললাম,
- স্যার, এটা রিচুয়ালিস্টিক।
আমার কথাটা শোনার পর সুমন স্যারকে দেখলাম ওই বৃত্তের চারপাশে একটু হেঁটে নিয়ে উনি বললেন,
- হ্যাঁ, খুনি শিকারকে একটা মঞ্চে বসায়। এই জায়গাটা তার থিয়েটার।
আমি কৌতূহল পূর্বক জিজ্ঞেস করলাম,
- খুনি কি এখানে ভিক্টিম-দের সাথে কথাও বলে?
সুমন স্যার উত্তর দিলেন,
- হতে পারে, সিরিয়াল কিলাররা নিজেদের ঈশ্বর ভাবে। তারা মৃত্যু নয়, শ্রোতা চায়।
আমি চারদিকে তাকালাম এবং চোখে পড়ল একটা স্টিল পাইপ। তার ওপর একটা অদ্ভুত আঁকা দেখে আমি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম,
- স্যার, আঁকাটা দেখুন। মনে হচ্ছে এটা তার তৃতীয় শিকার।
সুমন স্যার আঙুল ছুঁইয়ে দেখে বললেন,
- না! এটা খুনির ভাষা, তার হিসাব। তার 'সিকোয়েন্স'। এই কেস তার কাছে একটা সংগীতের মতো। একেকটা খুন হলো একেকটা নোট।
কথাটা শুনে আমার শরীর শিউরে উঠল। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- কিন্তু কেন সে নিজেকে 'আমি সেই কণ্ঠস্বর' বলছে? সে কি বলতে চায়?
সুমন স্যার আমার দিকে চেয়ে বললেন,
- তুমি দেখছি এখনো একই রকম রয়ে গেছ, ধর। আমি সঙ্গে আছি মানে এই নয় যে তুমি নিজের বুদ্ধি খাটানো বন্ধ করে দেবে। আর কতদিন এইভাবে চলবে, ধর?
- না মানে, স্যার!
- থাক, ধর। সদ্য সম্পর্কে আসা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো ন্যাকামো করো না। আসল কথা হচ্ছে, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তার কণ্ঠস্বর দরকার। আর এই খুনি মনে করে, যারা সত্য বলছে না কিংবা যথেষ্ট জোর দিয়ে বলছে না, তাদের সে ভয় দিয়ে কথা বলাবে। মৃত্যু তার কাছে ট্রুথ এমপ্লিফায়ার।
কথাটা শুনে আমি ভাবলাম এই কেস শুধু খুন নয়, এটা একটা দর্শন। তখনই এক কনস্টেবল দৌড়ে এসে জানালো,
- স্যার, নতুন ফুটেজ এসেছে। মৃত্যুর এক ঘণ্টা আগে, একটা লোককে কারখানার কাছাকাছি দেখা গেছে।
আমি বললাম,
- চলো।
সিসিটিভি ফুটেজ চালানো হলো এবং রাত একটা বেজে পাঁচ মিনিট নাগাদ সেই অন্ধকার রাস্তা দিয়ে একটা ছায়াকে হাঁটতে দেখা গেল। চেহারা দেখা যাচ্ছে না কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গি, অলৌকিক রকম স্থির। সে হঠাৎ থেমে, মাথা তুলে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকাল।
ফুটেজের সেই দৃশ্য দেখে আমি থমকে যাই। ছায়াটা খুব আস্তে মাথা কাত করে, যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। সুমন স্যার গম্ভীর গলায় বললেন,
- সে জানত, একদিন আমরা এই ফুটেজ দেখব। এটা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, ধর। এটা তার বার্তা।
আমি সুমন স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম,
- বার্তা? ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সে কি বলতে চাইছে?
সুমন স্যার ধীরে বললেন,
- সে বলতে চাইছে, আমি আছি। তুমি দেখেছ আমাকে কিন্তু ধরতে পারবে না।
এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর তিনি যোগ করলেন,
- ধর, এই খুনি চাইছে তুমি তার খেলার অংশ হও। এই খেলা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে।
(৩)
সুমন স্যারের ফ্ল্যাটের বারান্দায় আমরা দুজনে বসে কেসটা নিয়ে আলোচনা করছি। রাত তখন সাড়ে দশটা। কেসের নথি খোলা কিন্তু আমাদের দুজনের মন সেই নথির ওপর নেই। চারপাশটা বেশ ঠাণ্ডা আর সেইসঙ্গে গরম চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে।
সুমন স্যার হঠাৎ চশমা নামিয়ে আমার দিকে তাকালেন।
- ধর, একটা প্রশ্ন করবো?
আমি বললাম,
- হ্যাঁ, স্যার। করুন, এতে আবার জিজ্ঞেস করার কি আছে।
তখনো জানতাম না যে স্যার এমন একটা প্রশ্ন আমার দিকে ছুঁড়ে দেবেন, যার উত্তর দিতে গিয়ে আমার ভিম্রি খাওয়ার মতো অবস্থা হবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
- তুমি এখনো বিয়ে করলে না কেন? কি ব্যাপার? কোনও মেয়ে পাচ্ছো না, নাকি তোমার এই নেকুপুশু স্বভাবটা সবাই পালিয়ে বাঁচে?
আমি চায়ের কাপটা প্রায় ফেলে দিচ্ছিলাম। কোনও মতে সেটা সামলে উত্তর দিলাম,
- আমি নেকুপুশু নই, স্যার। আসলে আপনার সামনে এলে, একটু ভয় ভয় থাকি। তবে, বাকিদের সামনে আমি একদম নরম-সরম মানুষ নই। কাজের সময় আমি...।
সুমন স্যার হেসে থামিয়ে দিলেন।
- এই কাজের সময়, কেসের সময়, লালবাজার এসব বাদ দাও। মানুষের জীবনে ডিউটি বলে একটা ব্যাপার আছে আর আছে মন। তোমার ডিউটি তো দিনে বারো ঘণ্টা চলে। কিন্তু তোমার মন? ওটা সারাক্ষণ কাকে খোঁজে, জানো?
আমি একটু চুপ করে রইলাম। এমন প্রশ্ন তিনি আগে কখনো করেননি। তাই বললাম,
- ঠিক মানুষ পাইনি হয়ত।
সুমন স্যার আমার কথা শুনে এইবার বলতে লাগলেন,
- হুঁহ! এই লাইনটা শোনার জন্যই আমি রিটায়ার করিনি, ধর। তাহলে শোনো, মেয়েরা কিন্তু বাইরে থেকে রাফ-অ্যান্ড-টাফ ছেলেদেরই বেশি পছন্দ করে। একটু অবস্থান দেখাতে হয়, একটু রাগ, একটু তেজ, একটু 'আমি আছি তো!' এই আত্মবিশ্বাস।
তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন,
- আর তুমি? তুমি তো 'স্যার স্যার' করে মানুষের কথা শুনতেই ব্যস্ত। নিজের কথা বলো কই?
আমি মৃদু হেসে বললাম,
- স্যার, আমি পুলিশ। আমার কথা বলার মতো সময়ই কোথায়?
- ব্যস! আবার পুলিশি ডায়লগ! শোনো, জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো নিজের অনুভূতিকে নিজের কাছেই আটকে রাখা। খুনিকে ধরতে তোমরা যতটা পরিশ্রম করো, ঠিক ততটাই পরিশ্রম করে নিজের সুখটাকেও খুঁজে নিতে হয়।
একটু থামলেন। তারপর আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
- তুমি খুব ভালো অফিসার। কিন্তু মানুষ হিসেবে তুমি আরও ভালো হতে পারবে, যদি নিজের জীবনটাকেও গুরুত্ব দিতে শেখো। পুলিশের ব্যাজ পরে থাকতে থাকতে তুমি ভুলো না ধর, যে এর নিচে তুমি আদতে একজন সাধারণ মানুষ।
আমি চুপ করে রইলাম। কথাগুলো মনের ভিতর ঢুকে গেল। তারপর একটু হেসে বললাম,
- ঠিক আছে, স্যার। মেয়েদের সামনে এবার একটু রাফ অ্যান্ড টাফ হবার চেষ্টা করবো।
সুমন স্যার আমার কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়লেন।
- হা-হা-হা! বেশ তখন না হয় দেখব। তবে মনে রাখবে, রাফ অ্যান্ড টাফ হওয়া মানে বদমেজাজি হওয়া নয়। এর আসল অর্থ হচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকা, যখন কেউ ভরসা খুঁজবে। এটাই আসল শক্তি।
আমরা দুজন আবার চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। তখন শুধু আমাদের মাঝে নীরবতা বিরাজ করছে। তবে, রাতের এই নীরবতা খুব বেশিক্ষণ থাকল না। কারণ মনের মধ্যে কে যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, দূরে কোথাও সিরিয়াল কিলার আবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আমাদের এই কেস যত এগোচ্ছিল, আমার মাথাটা তত ভারী হয়ে উঠছিল। মোবাইলে মৃতদেহের হাসি, মাটির বৃত্ত, সেই একই সিগনেচার লাইন সব এক অদ্ভুত ধাঁধার মতো লাগছিল। কিন্তু এই ধাঁধার একটা অংশ যেন বারো বছরের পুরনো অন্ধকারে লুকিয়ে আছে, যেখানে সুমন স্যার একসময় মুখোমুখি হয়েছিলেন কারোর যে মানুষ নয়, একধরনের মানসিক ঝড়। আজ সেই ঝড় আবার শহরে ফিরে এসেছে।
লালবাজারের আমাদের রুমটা সাধারণত গলার আওয়াজে মুখর থাকে। কিন্তু আজ সবাই ফিসফিস করছে। এরা সবাই নিজেদের মনে একটা কথাই বলছে,
- কলকাতায় নতুন সিরিয়াল কিলার নেমেছে।
টেবিলের ওপর ছড়ানো কাগজ, প্রিন্ট করা ছবি, ম্যাপ আর স্কেচ স্টিল। আমি আর সুমন স্যার সব তথ্য একসঙ্গে সাজাতে শুরু করলাম।
- স্যার!
আমি বললাম,
- তিনটে পুরনো কেসের ফাইল আপনি বলেছিলেন কোথাও আছে?
স্যার বললেন,
- হ্যাঁ, বারো বছর আগে তিনটে খুন। তখন আমি উত্তর চব্বিশ পরগনায় কয়েক মাসের জন্য পোস্টেড ছিলাম।
আমি বললাম,
- অর্থাৎ ওই ব্যক্তি তখন থেকেই সক্রিয় ছিল।
উনি মাথা নাড়লেন কিন্তু গম্ভীর ভাবে বললেন,
- না। তখন আমি যাকে খুঁজছিলাম, সে নিজেকে ওইভাবে দাবি করে কিছু বলতে চায়নি। সে শুধু শহরের মানুষের সত্য শুনতে চাইত।
আমি থমকে গেলাম। তারপর প্রশ্নটা ওনার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিলাম,
- তাহলে কি দুজন খুনি? একজন পুরনো, একজন নতুন?
সুমন স্যার আমার চোখে চোখ রেখে বললেন,
- না, ধর। একই দর্শন অথবা একই শিক্ষক।
তখন ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। মনে হলো আমরা আর একজন অপরাধীর নয়, একটা বিশ্বাসঘাতী দর্শনের পিছু নিয়েছি। ঠিক তখনই, ডিউটি অফিসার ঢুকে খবর দিল,
- স্যার, কারখানার আশেপাশে এক সন্দেহভাজনকে দেখা গেছে। লোকালদের বিবরণ পেয়েছি।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,
- চলুন, স্যার।
এরপর আমরা আবারও পৌঁছে গেলাম ওই কারখানার নিকটবর্তী কাঁকরডোমার পিছনের বস্তি এলাকায়। সেখানে আমরা পেলাম এক যুবক, রাহুল সরেনকে। রাতের ফুটেজে দেখা ছায়ার সাথে অনেক মিল আছে তার গড়নে। কিন্তু তার মুখে এক অদ্ভুত ভয়ের দাগ।
আমি তাকে বসালাম ইন্টারোগেশন রুমে এবং জিজ্ঞেস করলাম,
- রাহুল, গতকাল রাত একটা নাগাদ তুই কারখানার পেছনে ছিলি?
ও শিউরে উঠে বলল,
- স্যার, আমি খুনি নই! আমি শুধু...।
- শুধু কি?
আমি মাথা ঠাণ্ডা রেখে জিজ্ঞেস করলাম এবং উত্তরে ও বলল,
- ওই কারখানার ভেতর থেকে আওয়াজ শুনেছিলাম।
চোখ ছোট করে আবারও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম,
- কী ধরনের আওয়াজ?
রাহুলের হাত কাঁপছে, গলা শুঁকিয়ে আসছে। সে বলল,
- মানুষের কাঁদার আওয়াজ। কিন্তু কাঁদাটা অদ্ভুত, যেন কেউ দম চেপে কান্না আটকাচ্ছে।
কথাটা শেষ হতে না হতেই ঘরের ভেতরটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমি ফের ওকে প্রশ্ন করলাম,
- তুই ভেতরে দেখেছিলি?
- না, স্যার। আমি শুধু লুকিয়ে ছিলাম। কিন্তু একটা কথা আছে।
- বল।
রাহুল নিচু গলায় বলল,
- আমি একটা আওয়াজ শুনেছিলাম, একজন পুরুষ কণ্ঠ। অদ্ভুত রকম শান্ত কিন্তু গম্ভীর। সে বলছিল, আমাকে তোমার কথা শুনতে দাও। আগে তুমি চুপ থাকতে চেয়েছিলে, এবার আমাকে সব বলো।
রাহুলের গলায় কাঁপন ছিল, যেন শব্দটা এখনো তার কানে বাজছে। আমার হাত ঠাণ্ডা হয়ে গেল, থিয়েটারের মতো শব্দ, মৃতদেহের মতো শান্ত, সব যেন মিলে যাচ্ছে। সুমন স্যার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। উনি বললেন,
- রাহুল, তুই কি কণ্ঠস্বরটা চিনতে পেরেছিলি?
- না, বড় স্যার। কিন্তু আমি আরেকটা জিনিস দেখেছিলাম।
কথাটা শুনে আমরা দুজনেই ওর দিকে তাকালাম।
- কী?
রাহুল কাঁপা গলায় বলল,
- ওই মানুষটা কারখানা থেকে বেরিয়ে রাস্তার আলোয় দাঁড়িয়েছিল। তার ছায়া লম্বা হয়ে গেছিল ভূতের মতো আর সে থেমে ক্যামেরার দিকে তাকিয়েছিল।
ক্যামেরার বিষয়টা শোনার পর, আমার সেই ফুটেজের কথা মনে পড়ে গেল। একই আচরণ, একই ভঙ্গি।
রাহুল মাথা নিচু করে যোগ করল,
- আর সে শুধু হাসছিল, স্যার।
জেরা শেষে আমরা রাহুলকে ছেড়ে দিলাম। সে খুনি নয়, শুধু দু:স্বপ্নের সাক্ষী। বিকেলে স্যারের ফ্ল্যাটে ফিরে আসার পর, সুমন স্যার হঠাৎ একটা পুরনো ডায়েরি খুললেন। চামড়ায় মোড়া, নিস্তেজ গন্ধযুক্ত।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
- এটা কি সেই পুরনো কেসের?
উনি মাথা নেড়ে ডায়েরির পাতাগুলোতে হাত দিয়ে বললেন,
- মানুষ মরে যাওয়ার পরও কিছু শব্দ বেঁচে থাকে, যা আমি কখনো ভুলতে পারিনি।
আমি সেই পাতার দিকে তাকালাম, তাতে লেখা- 'সে নীরবতার মধ্য দিয়ে কথা বলে। মৃত্যুর আগে সে হাসল। খুনি হত্যা করে না, সে পরিচালনা করে'।
আমি হালকা শ্বাস ফেললাম।
- স্যার, তাহলে কি বলতে চাইছেন এ খুনি 'মৃত্যুর সুরকার'?
সুমন স্যার নরম গলায় বললেন,
- হ্যাঁ, ধর। এই খুনির কাছে মৃত্যু শুধু শেষ নয়, এটা একটা সংগীত। সঠিক সুরে, সঠিক নোটে মানুষকে সে মৃত্যুর মঞ্চে দাঁড় করায়।
আমি বললাম,
- কিন্তু এখন প্রশ্ন, তার পরের শিকার কে?
উনি পাতা উল্টে এক জায়গায় আঙুল রাখলেন। সেখানে লেখা- 'সে তাদের শিকার করে যারা সত্য গোপন করে'।
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, শব্দগুলো যেন নিজের ওজনেই গড়িয়ে পড়ছে,
- মানে সে এমন মানুষকেই মারছে, যাদের জীবনে সত্যি কোনও গোপন অন্ধকার আছে।
সুমন স্যার চোখের পাতা না ফেলে, তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর বললেন,
- ঠিক তাই। যে যার পাপ লুকিয়ে রেখেছে, তারাই ওর তালিকায়। এখন আমাদের কাজ, শহরের ভিড়ের মধ্যে সেই পরের ছায়াটাকে খুঁজে বের করা।
আমি কিছু বলার আগে উনি একটু থামলেন। চশমার কাচে আলোর ঝিলিক আর গলাটা কেমন যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। ধীরে কিন্তু এক অদ্ভুত শীতলতা নিয়ে বললেন,
- খেলা কিন্তু জমে উঠেছে, ধর।
তার কথায় অজান্তেই গলা শুকিয়ে গেল আমার। উনি আরও বললেন,
- ও অনেকটা এগিয়ে গেছে। আর আমরা এখনো তার অর্ধেক পথেও পৌঁছোতে পারিনি।
ঘরের ভেতর হঠাৎই এক ধরনের মন্থর নীরবতা নেমে এলো। আমার মনে তখন একটাই প্রশ্ন, পরের শিকার কে?
(৪)
সকালে লালবাজারের করিডোরে পা রাখতেই দেখলাম অস্বাভাবিক একটা উত্তেজনা। লোকজনের চলাফেরা তীব্র, কনস্টেবলরা বারবার ওয়্যারলেসে কিছু কথা বলছে।
আমাকে ঢোকার সাথেই বলা হলো,
- ধর স্যার, ডিসিপি সাহেব কেবিনে আপনাকে ডেকেছেন। সুমন স্যারও সেখানে আছেন।
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম। সুমন স্যার নিজে লালবাজারে! মানে অবশ্যই বড় কিছু ঘটেছে। আমি কেবিনে ঢুকতেই দেখি ডিসিপি সাহেব টেবিলে দু-হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ দুটো লাল, যেন সারা রাত ঘুমাননি। সুমন স্যার কোণে বসে নথিপত্র দেখছেন।
আমাকে দেখে সুমন স্যার চুপচাপ মাথা নাড়লেন। ডিসিপি সাহেব বলে উঠলেন,
- ধর, আরেকটা ডেড বডি।
আমার বুকের ভেতর খচ করে উঠল। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- কোথায়?
ডিসিপি সাহেব উত্তর দিলেন,
- গার্ডেনরিচ। এবারও একই প্যাটার্ন। দড়ি, মুখে রক্তে আঁকা চিহ্ন আর সেই ভয়ানক লাইন- 'মানুষ চিৎকার করে। আর সেই চিৎকারেই আমি ঈশ্বরের ভাষা শুনি। আমি সেই কণ্ঠস্বর'।
সুমন স্যার ধীরে আমার দিকে একটি ছবি এগিয়ে দিলেন। মৃতদেহের মুখটা দেখে একটা ঠাণ্ডা স্রোত পিঠ বেয়ে নেমে গেল। একটু থামার পর সুমন স্যার বললেন,
- এটা কোনও কাকতালীয়ও বা কপিক্যাট নয়, একজনই করছে। আর সে এবার আমাদের সঙ্গে খেলা শুরু করেছে।
ডিসিপি সাহেব সামনে রাখা ছোট প্যাকেটটা হাতে তুলে ধরলেন এবং সেইসঙ্গে বললেন,
- এটা মৃতদেহের পাশে রাখা ছিল। স্পষ্টভাবে তোমার নাম লেখা।
আমি চমকে উঠলাম,
- আমার?
ডিসিপি সাহেব প্যাকেটটা খুললেন এবং তার ভেতরে ছিল বলতে ছোট একটা ইউএসবি ড্রাইভ, সাথে চিঠি। হলুদ কাগজে কালো মার্কার দিয়ে লেখা- 'For Officer L.N. Dhar'।
ইউএসবি ড্রাইভটা লালবাজারের ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে চালানো হলো। সকলেই নিঃশব্দে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। তার মধ্যে ছিল একটি মাত্র ভিডিও ফাইল, নাম- 'LISTEN.mp4'।
আমি 'প্লে' চাপলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে অন্ধকার ঘর নেমে এলো। কেবল একটা টেবিল ল্যাম্পের ক্ষীণ আলো। তারপর ছায়ার মতো একজন মানুষ সামনে এসে দাঁড়ালো। মুখ ঢাকা, শুধু ঠোঁটের কোণে সেই ভয়াবহ হাসি। আর তার সেই অদ্ভুত খসখসে, বিকৃত, মড্যুলেটেড কণ্ঠস্বর,
- হ্যালো, ইনস্পেক্টর ধর!
আমার শরীরের সব রক্ত যেন মাথার দিকে উঠে গেল।
- তুমি আমাকে চেনো না কিন্তু আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে দেখছি। তোমার কাজ, তোমার ব্যর্থতা, তোমার চেষ্টা, সব। আর এবার আমার গল্পের নায়ক তুমি।
সবাই তখন স্তব্ধ। ভিডিও চলতে থাকল।
- তুমি মানো বা না মানো, এই যাত্রার শুরুটা তোমারই নেওয়া এক সিদ্ধান্তের ফল। ভুলটা ছিল তোমার ঠিকই কিন্তু সেই ভুলের আসল মূল্য আজ দিচ্ছে অন্য একজন মানুষ।
আমি ঘাবড়ে গিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,
- সে কি বলতে চাইছে? আমার কোনও সিদ্ধান্ত? কোনটা?
সুমন স্যার পাশ থেকে বলে উঠলেন,
- শান্ত হও, ধর। আমাদের শেষটা শোনা দরকার।
ভিডিওতে বলা তার কথাগুলো আবারও ভেসে এলো,
- আমি থামব না। এই শহর আমার কণ্ঠস্বর শুনবে। তোমার হাতে তিনজন শেষ হয়েছে, ইনস্পেক্টর ধর। চতুর্থটার আগে আমাকে থামাতে পারবে?
তারপর স্ক্রিন কালো হয়ে গেল এবং সেখানে একটি লাইন ভেসে উঠল- 'উৎস খুঁজে বের না করা অবধি আমার ছুটি নেই'।
লালবাজারের ল্যাবরুমে যেন বাতাস ভারী হয়ে গেল। এরপর আমরা দুপুর নাগাদ গার্ডেনরিচের সেই ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছোলাম। নদীর ধারের ফাঁকা জায়গা, শীতল বাতাসে দড়িতে দুলছে মৃতদেহটা। মুখে রক্তে আঁকা চিহ্ন এবার অন্যরকম, একটা বাঁকানো সর্পিল।
সুমন স্যার পাশ থেকে বললেন,
- এটা ধর্মীয় প্রতীক নয়। এটি সাইকোলজিক্যাল প্রতীক। স্পাইরাল অব কনফেশন অর্থাৎ মানসিক ভেঙে পড়া মানুষ নিজের অপরাধ বা যন্ত্রণায় ঘুরপাক খাচ্ছে, এটাই বোঝায়।
আমি গভীরভাবে দেহটা দেখতে লাগলাম। তার পকেটে খুব সামান্য জিনিস ছিল। একটা ছোট চাবি, আধখানা রেল টিকিট আর ভাঁজ করা একটা কাগজ। সেই কাগজ খুলতেই দেখলাম তাতে লেখা- 'ইন্সপেক্টর ধর, তুমি কি শুনছো?'
আমার হাত কাঁপতে লাগল। আমি কিছু বলার আগেই আমার হাত থেকে সেই কাগজটা নিয়ে সুমন স্যার দেখলেন। সেই মুহূর্তে ওনার মুখও ছিল বেশ গম্ভীর।
সেই মৃতদেহটির পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলো সন্ধ্যায়। ডিসিপি সাহেব রিপোর্ট নিয়ে কেবিনে ঢুকে বললেন,
- ধর, এবার টুইস্টটা তোমাকেই হজম করতে হবে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- কি টুইস্ট স্যার?
ডিসিপি সাহেব চুপচাপ আমার দিকে রিপোর্টটা এগিয়ে দিলেন এবং তা পড়ে আমার চোখ বিস্ফারিত। মৃতদেহের নাম, সন্দীপ মান্না।
সুমন স্যার ফিসফিস করে বললেন,
- এনাকে তুমি চিনতে নাকি?
আমার মুখ থেকে একটি শব্দও বের হলো না। গলা তখন শুকিয়ে কাঠ। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর বললাম,
- সন্দীপ মান্না আসলে তিন বছর আগে আমার পুরনো একটা কেসে গ্রেপ্তার হওয়া এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি। কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণ না থাকায়, তাকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে অফিসে বহু আলোচনা, প্রশ্ন, সমালোচনা হয়েছিল। এবার মনে হচ্ছে, ঠিক সেই সিদ্ধান্তটাই সিরিয়াল কিলারের কথার অর্থ। আজ সেই সিদ্ধান্তের জন্য আমাকে মূল্য দিতে হবে নাকি?
ডিসিপি সাহেব ধীরে বললেন,
- সে তোমার পুরনো কেস ফাইলের প্রতিটি লাইন মুখস্থ করে রেখেছে। তোমার সন্দেহভাজনদের অতীত, তাদের আচরণ, এমনকি লুকিয়ে থাকা গতিবিধিও। এই ধারাবাহিক খুনগুলো তোমার অতীতের সেই এক কেসকে কেন্দ্র করেই ঘুরছে, ধর।
আমি চুপ। সুমন স্যার ধীরে উঠে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
- অপরাধী শুধু খুনি নয়। সে তোমার অতীতে ঢুকেছে, তোমার পথও জানে। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
- কিন্তু স্যার, এই খুনির কাজের পদ্ধতিটা যে আপনার বারো বছর আগের কেসটার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, এ নিয়ে আপনার মতামতে কি কোনও পরিবর্তন হয়েছে?
আমার প্রশ্নটা শেষ হতেই সুমন স্যার একটু থামলেন। তারপর ধীরে বললেন,
- দেখো, ধর। প্রথমদিকে আমিও ভেবেছিলাম ঘটনাটা ঠিক সেই পুরনো দিকেই ঘুরছে। মিলগুলো ছিল খুব স্পষ্ট। কিন্তু ওই ভিডিও বার্তা আর যে সব নতুন তথ্য আমাদের সামনে উঠে আসছে, সেগুলো অন্য কথা বলছে। তবে, এখনই কোনও সম্ভাবনাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। বরং প্রতিটাকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
আমি কথাটা চুপ করে শুনছিলাম ঠিকই কিন্তু আমার চোখের সামনে তখন ভাসছিল সেই ভিডিওর শেষ লাইনটা অর্থাৎ 'উৎস খুঁজে বের না করা অবধি আমার ছুটি নেই'।
সবাই নীরব, শুধু মনে মনে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আর দেরি নয়, এবার আমি তাকে খুঁজে বের করবই। আর এর সঙ্গেই বলা যায়, গল্প এখন সত্যিকারের আরও গভীরে ঢুকতে শুরু করেছে।
(৫)
লালবাজারের রাতগুলো সত্যিই আলাদা। করিডোরে হলুদ আলো জ্বলে কিন্তু সেই আলো কেসের চাপে যেন ঠিক মতো চকচক করতেও ভুলে যায়। আজকের রাতটাও তেমনই। ইউএসবি ড্রাইভে থাকা ভিডিও, নতুন মৃতদেহ আর সন্দীপ মান্নার পরিচয় সব মিলিয়ে আমার মাথার ভেতর যেন একটানা ঝড় বয়ে চলছিল।
আমি করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দূরের সিগন্যাল আলো লাল-সবুজ বদলাচ্ছে, অথচ আমার চোখে সবই অস্পষ্ট। সুমন স্যার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
আমি ওনার দিকে চেয়ে বললাম,
- আচ্ছা, স্যার। সে আমাকে কেন টার্গেট করছে? আমার পুরনো কেসগুলো কেন টেনে আনছে? আমি কি ভুল করেছিলাম?
সুমন স্যার চুপ করে আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে বললেন,
- ধর, সিরিয়াল কিলার জন্মায় না। তাদের তৈরি করা হয়।
আমি সেই শুনে বিস্মিত হয়ে তাকালাম।
- হ্যাঁ। সমাজ, পরিবার, অপমান, প্রত্যাখ্যান, ট্রমা, হিংসা বা কখনো নীরবতা। এরা খুব নিঃশব্দে তৈরি হয়। নিজেদের কষ্টকে শব্দ দিতে না পারলে তারা সেটা হিংসাতে প্রকাশ করে। মনে রাখবে, এক একজন সিরিয়াল কিলার মানে এক একটা ভাঙা মানুষ।
স্যারের কথা শুনে আমি বললাম,
- কিন্তু সকল ভাঙা মানুষ তো খুনি হয় না, স্যার।
সুমন স্যার মাথা নাড়লেন।
- সঠিক। কিন্তু যাদের মধ্যে একটা বিশেষ মানসিক ফাটল থাকে, তারা নিজেকে ঠিক করতে পারে না। ফলাফল? নিজের যন্ত্রণা অন্যের মনে পোঁতা। এই কেসের খুনিও সেরকমই। সে নিজের যন্ত্রণা দিয়ে বার্তা দিচ্ছে। আর তুমি তার কাছে গল্পের একটা চরিত্র মাত্র।
আমি নিচু গলায় বললাম,
- এদের শেষটা যে ভালো হয় না, স্যার। আমরা তো এর আগেও দেখেছি।
সুমন স্যার একটু থামলেন। তারপর বলে উঠলেন,
- একেবারেই তাই। বেশিরভাগই ধরা পড়ে কিন্তু তার আগে একটা ভুল করে বসে।
- কী রকম ভুল?
আমার প্রশ্নের উত্তরে উনি বললেন,
- নিজেকে অজেয় ভাবার ভুল।
এরপর সুমন স্যার আমার দিকে তাকিয়ে,
- এটাই সেই শুরু। সে এখন খেলছে আর খেলার মাঝপথে সব খেলোয়াড়ই ভুল করে।
আমি ধীরে মাথা নাড়লাম। বাতাসে লেগে থাকা ঠাণ্ডা অনুভূতি আমার শরীর ছুঁয়ে গেল। আমরা নিচে নামার প্রস্তুতি নিলাম কারণ সামনে এই কেসে অপেক্ষা করছিল এক নতুন চমক।
পরের দিন সকালে সন্দীপ মান্নার পুরনো কেস ফাইলগুলো টেবিলে সাজানো। আমি নথি উল্টাতে উল্টাতে বললাম,
- সন্দীপকে সন্দেহ করা হয়েছিল একটা পুরনো নিখোঁজ হওয়ার কেসে। মেয়েটি হঠাৎই নিখোঁজ হয়েছিল কিন্তু প্রমাণের অভাবে সন্দীপকে ছাড়তে হয়েছিল। তখনই বলেছিলাম, কিছু একটা গোলমাল আছে!
সুমন স্যার নথির ওপরে আঙুল রেখে বললেন,
- অপরাধী কি এই কেসটার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে?
আমি খানিক ভাবলাম, মেয়েটির নাম ছিল শ্যামলী। উনিশ বছর বয়স, মধ্যবিত্ত পরিবার হঠাৎই নিখোঁজ হয়। আর সন্দীপ ছিল শেষ পরিচিত দেখা মানুষ। তারপর মাথায় আসা সেই অদ্ভুত প্রশ্নটা স্যারের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিলাম,
- আর যদি সন্দীপ না হয়? কেউ তাকে ফাঁসাচ্ছে না তো?
সুমন স্যার চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
- অপরাধী যখন বলছে 'তোমার ভুল সিদ্ধান্ত' তখন পরিষ্কার বুঝতে হবে, ধর। তোমার হাত থেকে সেই সময় দোষীকে ফসকে যেতে দিয়েছিলে।
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই কেসটা তাহলে আমার ভুল দিয়ে শুরু?
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ল কনস্টেবল, বিনয় রায়।
- স্যার, নতুন ইনফরমেশন এসেছে। সন্দীপ মান্নার ফোন দিয়ে শেষ যে লোকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তার নাম অর্ণব পাল।
আমি চমকে বলে উঠলাম,
- অর্ণব পাল? কেস ফাইল অনুযায়ী সে তো সেই নিখোঁজ মেয়ে শ্যামলীর নিজের খুড়তুতো ভাই!
সুমন স্যারের চোখ চকচক করে উঠল। আমরা আর সময় নষ্ট না করে দুপুর নাগাদ খিদিরপুরে অর্ণব পালের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম।
মলিন তিনতলা বাড়ি, দরজায় ছাইরঙা কাপড় শুকোচ্ছে। দুজন কনস্টেবল দরজায় তালা দেখে, দরজা ভাঙল এবং তারপর আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। ঘরে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ল একটা দেওয়ালে নানা মুখের ছবি, খবরের কাটিং আর নিখোঁজ শ্যামলীর ছবি।
সুমন স্যার কাছে গিয়ে একটা ছবি হাতে তুলে নিয়ে বললেন,
- এগুলো তোমাকে কিছু মনে করাচ্ছে, ধর?
আমি ভেঙে পড়া গলায় বললাম,
- হ্যাঁ, স্যার। এরা সবাই আমার পুরনো কেসগুলোর সন্দেহভাজন। প্রমাণের অভাবে শেষ পর্যন্ত কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি। কিন্তু একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না, সবার মাঝে শ্যামলীর ছবি কেন?
সুমন স্যার গভীরভাবে তাকিয়ে বললেন,
- মানে খুনি শুধু তোমাকে জানে না, তোমাকে মাসের পর মাস অনুসরণ করছে। আর শ্যামলীর ছবি এখানে কেন, বিষয়টা তলিয়ে দেখতে হচ্ছে।
কথাটা শোনা মাত্র আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। দেওয়ালে একটা লাল মার্কারে লেখা- 'তুমি যাদের ধরতে ব্যর্থ'। তার নিচে রয়েছে পাঁচটা মুখের ছবি। যার মধ্যে চারজনই এখন মৃত। যাদের আমরা সিরিয়াল কিলারের শিকার হিসেবে পেয়েছি।
ঠিক তখনই কনস্টেবল বিনয় রায় চিৎকার করে বলল,
- স্যার! বাথরুমে কিছু আছে!
আমরা দৌড়ে গেলাম এবং দেখি বাথরুমের দরজা খোলা, ভেতরে ছোট একটা টুল এবং তার ওপর মোবাইল ফোন। যার স্ক্রিনে একটা টাইমার-
00:00:47
00:00:46
00:00:45
সুমন স্যার চিৎকার করে বললেন,
- এসব কিছু স্পর্শ করো না!
কিন্তু টাইমার থামল 00:00:05-এ এসে এবং সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলের স্পিকার থেকে এক ভয়ঙ্কর বিকৃত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
- তোমরা ভুল জায়গায় খুঁজছ। আসল অপরাধী আমি নই।
আমরা সবাই থমকে গেলাম। ওই মুহূর্তে আমার মনের মধ্যে থেকে কেউ যেন জিজ্ঞেস করে উঠল,
- তারমানে এই কণ্ঠস্বর অর্ণবের?
আবারও মোবাইলের স্পিকার থেকে ভেসে এলো সেই একই লাইন,
- উৎস খুঁজে বের না করা অবধি আমার ছুটি নেই।
এরপর মোবাইলটা হঠাৎ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। বাথরুমে তখন কেবল নীরবতা। আমি আর সুমন স্যার একে অপরের দিকে তাকালাম। সুমন স্যার দৃঢ় গলায় বললেন,
- অর্ণব কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে, সব সম্ভাব্য লোকেশন আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। আর শ্যামলীকে এখনই সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। কারণ যত এগোচ্ছি, ততই মনে হচ্ছে অর্ণবের আসল সূত্র, তার 'উৎস' শ্যামলীই। পাঁচটি ছবির মধ্যে একমাত্র জীবিত মুখ সে।
আমার চোখ বিস্ময়ে আরও বড় হয়ে গেল।
- মানে শ্যামলী আদৌ নিখোঁজ ছিল না? অর্ণব পাল কি তার নিজের জ্যাঠতুতো দিদিকেই টার্গেট করছে এবার?
সুমন স্যার ধীরে মাথা নাড়লেন। চোখে সেই পরিচিত, অস্বস্তিকর ঠাণ্ডা চিন্তার রেখা।
- ঠিক সেটাই, ধর। আর যদি সেটা সত্যি হয়, তাহলে খেলা আমাদের ভাবনার চেয়েও অনেক গভীর।
আমার হাত অনিচ্ছায় শক্ত হয়ে উঠল। অর্ণব শুধু একজন খুনি নয়, সে আমার অতীতকেই অস্ত্র বানাচ্ছে। একদিকে শ্যামলী যে এখনো বেঁচে আছে, সেটাই এক দুঃসাহসিক সত্য। আর অন্যদিকে, আমরা যদি তাকে দ্রুত খুঁজে না পাই, অর্ণব তাকে শেষ করে দেবে। অতএব সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে, এই কেসটা এবার যেন সত্যিই একটা দুঃস্বপ্নে রূপ নিচ্ছে।
(৬)
লালবাজারের কনফারেন্স রুমে টেবিল জুড়ে ছড়ানো অর্ণব পালের গত তিন মাসের লোকেশন-লোগ, স্কেচ আর অজস্র লাল দাগের চিহ্ন। সুমন স্যার দু-হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে আছেন জানালার কাছে।
আমি টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে চার্টগুলো দেখতে দেখতে বুঝতে পারছিলাম, শহরটাকে যেন কেউ গোপনে ছুরি দিয়ে কেটে কেটে পথ বানিয়েছে।
- ধর।
সুমন স্যার বলে উঠলেন,
- সব লোকেশনকে রিং ফরমেশনে ঢুকিয়ে ফেলো। অর্ণব পাল বাইরে ঘোরাঘুরি করার মানুষ নয়। সে পালাবে না, ও অপেক্ষা করবে।
আমি দ্রুত ম্যাপে পিন মারতে লাগলাম। এক, দমদমের সেই পুরোনো ওয়ারহাউস, যেখানে অর্ণবকে ছয় মাস আগে শেষবার দেখা গেছিল। দুই, রোহড়ার ক্যানাল ঘাট, তার মোবাইলের শেষ ট্রেসড পিং। তিন, বেহালার একটি জীর্ণ বাড়ি, একসময় যেখানে ছিল তার বাবার পুরোনো ব্যবসার অফিস। চার, খিদিরপুরে ওদের পারিবারিক বাড়ি। আর পাঁচ, শহরের বাইরে একটি অ্যাব্যান্ডনড মোটেল, যার রেজিস্টারে গতরাতে 'A.P.' নামে এন্ট্রি হয়েছে।
আমি রিপোর্ট তুলে বললাম,
- স্যার, লোকেশনগুলোতে আমরা পাঁচজনের এক একটা ইউনিট পাঠাচ্ছি। প্রত্যেক টিমে থাকবে তিনজন করে আর্মড ব্রাঞ্চের সদস্য, লোকাল থানার একজন অফিসার আর সাইবার সেলের একজন।
স্যার মাথা নাড়লেন।
- তাদের বলো অর্ণবকে দেখলে খুনি হিসেবে নয়, বেঁচে থাকা একজন টার্গেট হিসেবে ট্রিট করতে। সে নিজেকে হত্যা করার মতো অবস্থায়ও যেতে পারে। আমাদের দরকার জীবিত অর্ণব।
বাইরে সাইরেন বাজল এবং প্রথম টিম বেরিয়ে গেল। এবার শ্যামলীর অনুসন্ধান শুরু করতে হবে তাই স্যারের দিকে ঘুরে আমি বললাম,
- স্যার, শ্যামলীকে খুঁজব কীভাবে? তার কোনও সাম্প্রতিক ছবি নেই, ফোন অফ, কোথাও রেজিস্টার করা নেই।
সুমন স্যার চেয়ারে বসলেন। হাত দুটো জোড়া করে বললেন,
- তাকে খুঁজতে হলে আমাদের তার ছায়ার পথ ধরতে হবে। একজন মানুষ লুকিয়ে থাকতে চাইলে সে নিজের পরিচয় মুছে দিতে পারে কিন্তু অভ্যাসকে নয়।
আমি তাকালাম,
- তার মানে স্যার?
স্যার টেবিলের ওপর তিনটে ফাইল রাখলেন। এক, শ্যামলীর পুরনো লাইব্রেরি কার্ড। দুই, দুটো রিসার্চ আর্টিকেলের কপি। আর তিন, একটা হাসপাতালের বহু পুরনো রিপোর্ট।
- এই তিনটেই তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
স্যার বললেন।
- সে পালিয়ে থাকলেও, বই পড়া ছাড়তে পারবে না। নিজের রিসার্চ ট্র্যাক করবে। আর হাসপাতালের সঙ্গে তার একটা অদৃশ্য যোগ আছে। আমরা এই তিন দিক চেক করব।
পরদিন আমি অনুসন্ধান করে দেখলাম, শ্যামলী গত চার মাসে তিনবার আলিপুর স্টেট লাইব্রেরি থেকে লগ-ইন করেছে কিন্তু নাম ছিল ভুয়ো। আইপি ট্রেস করে দেখা গেল যে একই ডিভাইস থেকে দু-বার একই বুথে বসেছিল কেউ।
আমি বললাম,
- স্যার, এই বুথটা নির্দিষ্ট। সম্ভবত সে এখানেই আসে।
সুমন স্যার বললেন,
- আগামীকাল ঠিক বিকেল পাঁচটায় ওই বুথের সামনে নজরদারি বসবে। সে ফিরবেই কারণ লুকিয়ে থাকার পরেও মানুষ নিজের অভ্যেসের কাছে ফিরে আসে।
দ্বিতীয় ধাপে, আমরা শ্যামলীর অনলাইন রিসার্চ ট্র্যাক করলাম। সে যে বিষয়গুলো পড়ছিল, তা হলো মেডিকেল সাইকোলজি, পোস্ট-ট্রমাটিক আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার এবং ক্রিমিনাল ব্রেইন প্যাটার্ন।
সুমন স্যার বললেন,
- ধর, যে মেয়ে এসব পড়ছে সে নিজেকেই বুঝতে চাইছে। আর অর্ণবকে আরও বেশি।
কথাটা শুনে আমি বললাম,
- তাহলে স্যার, সে নিশ্চয়ই অর্ণবের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
সুমন স্যার মৃদু হেসে উঠলেন।
- সে শুধু ওয়াকিবহাল নয়, সে আরও অনেক কিছুই জানে। আর এই জানাটাই আসল বিপদ।
শ্যামলীর পুরনো ফাইল দেখে আমরা জানতে পারলাম যে সে একসময় মানসিক ট্রমার জন্য এনআরএস হাসপাতালে থেরাপি নিত।
- তাহলে সে আবার ফিরে আসতে পারে।
আমি কথা শুনে স্যার বললেন,
- মানুষ নিজের ভাঙা জায়গায় ফিরে আসে, অন্তত দূর থেকে দেখতে। ফলো-আপ নাও আর গত তিন সপ্তাহে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজগুলো স্ক্যান করো। মুখ না মিললেও, হাঁটার ভঙ্গিই তাকে ধরিয়ে দেবে।
ঠিক তখনই ওয়ারলেস বেজে উঠল,
- ইউনিট থ্রি রিপোর্টিং, রোহড়ার ক্যানাল এলাকা। স্যার, অর্ণব সম্ভবত এখানে এসেছে। একটা ব্যাগ পাওয়া গেছে।
আমি স্যারের দিকে তাকালাম। উনি ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
- ব্যাগ খুলে দেখো।
কয়েক সেকেন্ড পর ওয়ারলেস থেকে ভেসে এলো,
- স্যার, ব্যাগের ভেতর শ্যামলীর পুরনো স্কার্ফ আর একটা নোট পাওয়া গেছে।
কথাটা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম,
- নোটে কী লেখা?
উত্তর এলো,
- তোমরা ওকে খুঁজে পাওয়ার আগেই আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলব।
আমরা দুজন কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সুমন স্যার গম্ভীর হয়ে বললেন,
- ধর, সময় আমাদের পক্ষে নেই। অর্ণব শ্যামলীকে খুঁজছে, তার মানে শ্যামলীর অবস্থান আমরা ঠিক ধরতে পারলে, অর্ণবও সেখানে ছায়ার মতো পৌঁছে যাবে।
আমি মাথা নাড়লাম।
- তাহলে স্যার, এখন কোন দিক?
স্যারের চোখে দৃঢ়তা নেমে এলো। উনি বললেন,
- সবদিক থেকেই আমরা একসঙ্গে আঘাত করব। যে ট্র্যাক আগে নির্দেশ করবে, আমরা সেখানে দৌড়ে যাব।
(৭)
সকালের আলো ঠিকমতো ছড়ায়ওনি, তবুও কলকাতা পুলিশের তিনটে টিম ইতিমধ্যেই তিন ভিন্ন দিক ধরে ছুটেছে। লাইব্রেরি, হাসপাতাল এবং রিসার্চ ট্রেইল শহরের অদৃশ্য মানচিত্রে এই তিনটে বিন্দুই এখন আমাদের তদন্তের কেন্দ্র। আমি আর সুমন স্যার যেন এই ত্রিভুজের মাঝখানে দাঁড়ানো দুজন সৈনিকের মতো।
ঘড়িতে তখন বাজে বিকেল চারটে পাঁচ, আলিপুর স্টেট লাইব্রেরির ভেতর টানটান নীরবতা। পাঠকের সংখ্যা সকাল থেকেই অস্বাভাবিক রকম কম। আমি টিমকে বলে রেখেছিলাম,
- নিঃশব্দে থাকুন, শ্যামলী লুকিয়ে থাকতে অভ্যস্ত। কাউকে দেখলেই সে গুটিয়ে যাবে।
শেষ কয়েকবার বুথ নম্বর ৬ থেকেই সে লগ-ইন করেছিল। ওই মুহূর্তে চোখের সামনে ধরা দিল এক বয়স্ক মহিলা, সে ওই বুথ ৬-এর সামনে এসে থামল। তার গলায় একটি ছেঁড়া স্কার্ফ, চুল এলোমেলো আর হাঁটার ভঙ্গি ছিল অদ্ভুত রকম নিচের দিকে ঝুঁকে।
ইউনিট-লিডার প্রসূন আমার কানের পাশে এসে নিচু স্বরে বলল,
- স্যার, ভিজুয়াল ম্যাচ নেই কিন্তু পারিপার্শ্বিক সবকিছুর মিল আছে।
আমি বললাম,
- আপাতত ফলো করুন।
মহিলা বসতেই বুথ ৬-এর কম্পিউটার স্ক্রীন জ্বলে উঠল। আমি ফিসফিস করে বললাম,
- স্যার, এটা ও-ই।
ওয়ারলেসে সুমন স্যার ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
- ধর, ভুল করবে না। প্রথমে নিশ্চিত হও, কোনও হঠকারিতা করো না।
ঠিক তখনই সেই মহিলাটি মুখ ঘুরিয়ে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকালো। তার চোখ দুটো ঠিক শ্যামলীর পুরনো ছবির মতোই আমার লাগল। ওদিকে, লালবাজারে বসে সুমন স্যার ও সাইবার টিম স্ক্যান করছিল এনআরএস হাসপাতালের গত দুই সপ্তাহের সিসিটিভি ফুটেজ। একটা ফুটেজে দেখা গেল, হাসপাতালের পুরনো থেরাপি সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন মহিলা। মুখ ঢাকা কিন্তু শরীরী ভাষা একই। আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, তার সামনে দাঁড়িয়েছিল আরেকজন মানুষ যার মুখ দেখা যায়নি। কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি একেবারেই সেই ছায়ার মতো। তাই সেই মহিলা দ্রুত সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল।
সাইবার টিম আবার শ্যামলীর রিসার্চের প্যাটার্ন খুঁজতে গিয়ে একটা অদ্ভুত তথ্য পায়। সে গত সপ্তাহে বারবার একটা ফাইল ডাউনলোড করার চেষ্টা করেছে। ফাইলের নাম- 'Cognitive Rift– Case AP'।
সুমন স্যার তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। ওনার মুখে এক ধরণের শীতল উপলব্ধি। হয়ত শ্যামলী টের পাচ্ছিল অর্ণব শেষ পর্যন্ত তাকে খুঁজে বের করবেই এবং হত্যা করার চেষ্টা করবে।
যাই হোক, লাইব্রেরির ভেতরে হঠাৎই টানটান মুহূর্ত। আমি আরেকটা সিগন্যাল পাঠালাম,
- স্যার, সাবজেক্ট নিশ্চিত। শ্যামলী বুথ ৬-এ।
সুমন স্যারের সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিলেন,
- ধর, একা ঢুকবে না। তার মানসিক অবস্থা আমরা জানি না। আর অতীতের কী সম্পর্ক আছে অর্ণবের সঙ্গে সেটাই সবচেয়ে বড় রহস্য।
আমি দম নিয়ে টিমকে সিগন্যাল দিলাম,
- পজিশন ধরে রাখুন, কেউ এগোবে না।
ঠিক তখনই শ্যামলীর সামনে কম্পিউটার স্ক্রীনে একটি লাইন উঠে এলো, একটি পপ আপ। সাদা পটভূমিতে কালো লেখায়- 'তোমাকে খুঁজে বের করেছি, এবার সমাপ্তির পালা'।
শ্যামলী সেটা দেখার পর, লাফ দিয়ে পিছনে সরল। তার চোখ তখন আতঙ্কে বড় হয়ে গেল এবং সেই দৃশ্য দেখে আমি কাচঘেরা দরজার ভেতর ছুটে গেলাম।
- শ্যামলী! থামুন! আমরা পুলিশ।
কিন্তু সে আমার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলতে লাগল,
- স্যার, দেরি হয়ে গেছে। আপনি বুঝতে পারছেন না, অর্ণব আমাকে মেরে ফেলবে।
আমি তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম। ওদিকে, হাসপাতালে আবার এক নতুন মোড়। ওয়ারলেসে ভেসে এলো,
- স্যার! হাসপাতালের স্টোররুমে একটা কাপড় পাওয়া গেছে, তাতে রক্ত লেগে আছে। আর তার পাশে শ্যামলীর পুরনো ওষুধের বোতল।
সুমন স্যারের কণ্ঠস্বর যেন হঠাৎ করে জমে গেল। ভারী স্বরে উনি আমাকে বললেন,
- ধর, শ্যামলী লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার আগেই তাকে আটকে রাখো। এই কেসের মূল কেন্দ্রে সে-ই রয়েছে।
আমি তখন শ্যামলীর সামনে দাঁড়িয়ে, বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। এমন সময় হঠাৎই লাইব্রেরির বাইরে একটা কালো ছায়া নড়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই শ্যামলী আমার হাত শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল,
- ও এসে গেছে।
আমি পেছনে ঘুরে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম, দরজার কাচে ভেসে উঠেছে কারোর প্রতিফলন। চোখ দুটো ঠাণ্ডা আগুনের মতো জ্বলছে, সে অর্ণব পাল। আর যেভাবে সে দাঁড়িয়ে আছে, তা দেখে মনে হতে বাধ্য যে আজ কেউই এই শহরে নিরাপদ নয়।
(৮)
লাইব্রেরির হলঘরটা তখন থমথমে, বাইরের আলো ফিকে হয়ে আসছে আর ঠিক সেই মুহূর্তে অর্ণব পালের ছায়া দরজার কাচে প্রথমবার স্পষ্ট হলো। একটা তীব্র, নির্লিপ্ত দাঁড়ানো ভঙ্গি, চোখ দুটো যেন নিভে যাওয়া আগুন।
শ্যামলী আমার হাত শক্ত করে ধরে কাঁপতে কাঁপতে বলছে,
- ও আমাকে মারতে এসেছে, ধরবাবু। আমাকে বাঁচান।
সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম শ্যামলী আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। উল্টোদিকে, প্রবেশদ্বারের সামনে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে অর্ণব। আমাকে দেখে সে সামান্য তার মাথা হেলাল এবং সেই পরিচিত রোগা হাসিটা ফুটে উঠল মুখে।
আমি ধীরে রিভল্ভারটা বের করে বললাম,
- অর্ণব পাল, পুলিশের তরফ থেকে বলা হচ্ছে তোমার চারদিকে ইউনিট মোতায়েন আছে। তোমার সামান্য নড়াচড়াও নজরে পড়বে।
তবে, অর্ণব সেই কথা উপেক্ষা করে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। আর তখনই দেখলাম, তার হাতে একটা পাতলা ডায়েরি এবং তাতে ফাঁকা কভার, কোনও নাম নেই।
সে নিচু গলায় বলল,
- তুমি দেরি করে ফেলেছ, ইন্সপেক্টর ধর।
আমি গম্ভীর ভাবে বললাম,
- ওই ডায়েরিটা নামিয়ে রাখো।
অর্ণব হেসে বলল,
- এটা আমার না, এটা তো তোমাদের শ্যামলীর।
পেছনে দাঁড়ানো শ্যামলীর মুখ একেবারে সাদা হয়ে গেল। তাকে বলতে শুনলাম,
- ধরবাবু, ওই ডায়েরিটা ওর হাতে কী করে গেল?
আমি উত্তর দিতে পারলাম না। অর্ণব ডায়েরিটা উলটে দেখাল, তাতে রয়েছে শ্যামলীর হাতে করা অদ্ভুত আঁকিবুঁকি। অর্ণব আঙুল রাখল নামটার ওপর, তার চোখ স্থির। সে বলল,
- ইন্সপেক্টর ধর, তুমি জানো এটা কী?
আমি বললাম,
- না, কি ওটা?
- এটা আসল সত্য, যেটা শ্যামলী লুকাতে চেয়েছে।
আমি বললাম,
- অর্ণব, তুমি শান্ত হও। তুমি বিভ্রান্ত।
সে হেসে উঠল এবং সেইসঙ্গে শ্যামলীর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলতে লাগল,
- আমি বিভ্রান্ত নই, ইন্সপেক্টর। আমি শুধু আমার হারানো জীবনের প্রতিশোধ নিতে চাই, যেটা ও আর ওর পরিবার নষ্ট করে দিয়েছে।
শ্যামলী কেঁপে উঠে বলল,
- আমি কিছু নষ্ট করিনি! তোর ভাবনায় যা আছে, যা তুই মনে করিস সবই ভুল। এর কোনওটাই সত্য নয়।
অর্ণব কথাটা শুনেই গর্জে উঠল,
- চুপ! তুমি জানো তুমি কী করেছিলে!
এই বলে সে হঠাৎ ডায়েরির মাঝখান থেকে একটা ছবি ছিঁড়ে বের করল। ছবিটায় দেখা যাচ্ছে একটা পুরনো হাসপাতালের ঘর, একটা ছায়ামূর্তি আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর। সেই দেখে আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
শ্যামলী অস্বাভাবিকভাবে বিড়বিড় করতে লাগল,
- ওই ছবি, ওটা সব সত্যি বলে না।
অর্ণব রাগে গজ্রে উঠল,
- ওহ! তারমানে এখন আমাকে তোমার মতো মিথ্যেবাদীর কাছ থেকে সত্যিটা জানতে হবে? না! আর কোনও কিছুর শোনার অবকাশ নেই, আজ শুধু বিচার হবে।
ঠিক তখনই পেছনের দরজা খুলে সুমন স্যার টর্চ হাতে ভেতরে ঢুকলেন। ওনার চোখে সেই অবিশ্বাস্য ঠাণ্ডা স্থিরতা, ধীর ভাবে উনি বললেন,
- বিচার? তুমি যাদের খুন করেছ তারা তোমার কাছে বিচার কিন্তু আইনের চোখে তুমি অপরাধী। অর্ণব, নিজের অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করো।
সে মাথা কাত করে সুমন স্যারের দিকে তাকাল এবং ওনার উদ্দেশ্যে বলতে শুনলাম,
- আইন? আইন আমার বাবা-মাকে বাঁচাতে পারেনি। আইন আমার জেঠুকে শাস্তি দেয়নি। আর সেই সন্দ্বীপ? যার হাতের স্পর্শে শ্যামলীর মন নষ্ট হয়ে যায়, তাকেও আইন রক্ষা করেছে।
কথাটা শোনা মাত্র শ্যামলী চিৎকার করে উঠল,
- অর্ণব, থাম! এভাবে কথা বলবি না! সন্দ্বীপ আমার সাথে কিছু...।
অর্ণব তার কথা কেটে দিয়ে বলল,
- মিথ্যে! সব মিথ্যে!
তার চোখে এক অদ্ভুত রাগ। আমি বুঝলাম, এই রাগ কোনও সাধারণ মানুষের রাগ নয়। এটা বছরের পর বছর জমে থাকা মানসিক বিকারের আগুন।
সুমন স্যারকে দেখলাম, উনি ঠাণ্ডা মাথায় অর্ণবকে বললেন,
- তোমার ছোটবেলা নিয়ে জানি। তোমার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর, তুমি শ্যামলীর বাবা-মায়ের কাছেই বড় হয়েছ। তারা তোমার জন্য যা যা করেছে সেটা...।
অর্ণব স্যারের কথাটা ফের একবার কেটে দিয়ে বলতে লাগল,
- হ্যাঁ! ওরা চেষ্টা করত, বিশেষ করে শ্যামলী। সে চেষ্টা করেছে আমাকে স্বাভাবিক করতে। কিন্তু আমি স্বাভাবিক ছিলাম না, হতে পারিনি।
একটু থেমে, মুখে সেই বিকৃত হাসি নিয়ে অর্ণব ফের বলল,
- কারণ আমার মাথার ভেতর সব সময় একটা কণ্ঠস্বর কথা বলত, তোর বাবা-মাকে খুন করেছে তোর জেঠু। তারপর বড় হওয়ার পর, সত্যিটা জানলাম। বাবার সমস্ত ব্যবসা আর সম্পত্তি জেঠুর হাতে চলে গেছে কারণ তখন আমি সাবালক হইনি। অতএব সুযোগ পেলে তাকে মেরে ফেলাই আমার কাছে অনিবার্য ছিল।
শ্যামলী কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
- তুই সেই চেষ্টা করেছিলিস, আমরা সবাই জানি। কিন্তু ওটা তোর ভুল ছিল।
অর্ণব তীব্র গলায় বলে উঠল,
- ভুল? ওর বেঁচে যাওয়াই ভুল ছিল!
তারপর হঠাৎ শান্ত হয়ে বলতে শুরু করল,
- তাই তো আমাকে মানসিক হাসপাতালে আটকে রাখলে, শিকল পরানো পাগল বানিয়ে রাখলে। আমি তখনো জানতাম আমি ঠিক, সবাই ভুল।
সুমন স্যার তাকে লক্ষ্য করে বললেন,
- আর সেখান থেকে পালিয়ে এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে ভেবেছিলে? অর্ণব, তুমি তখনই বিপজ্জনক ছিলে।
সে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
- বিপজ্জনক তো তখন হলাম, যখন দেখলাম শ্যামলীর বিয়ে সন্দ্বীপের সাথে ঠিক হয়েছে।
আমি বুঝতে পারছিলাম গল্পটা এবার আসল মোড়ে পৌঁছাচ্ছে। অর্ণব তাকিয়ে বলল,
- সন্দ্বীপের সাথে শ্যামলীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু শ্যামলী তো আমার। ছোটবেলা থেকে সে আমাকে ভালোবেসেছে, আমাকে সামলেছে, তাই সে আমারই। তাকে নিয়ে শুধু আমি বাঁচব।
শ্যামলী রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
- অর্ণব, এটা কোনও স্বাভাবিক বিষয় নয়, এটা অসুস্থ আসক্তি। তোর মাথায় কি নেই যে আমি তোর দিদি? আমার ওপর তোর সেরকম কোনও অধিকার ছিল না।
কথাটা শোনা মাত্র অর্ণবের চোখে জল লক্ষ্য করলাম। সে বলতে লাগল,
- তাই তুমি আমাকে মারতে দিলে? সন্দ্বীপের হাতেই? সন্দ্বীপ খুব চালাক, ও আমাকে মেরে ফেলতে চাইছিল। তোমাকে কোথাও লুকিয়ে রেখে বলল, শ্যামলী নিখোঁজ। যেন আমি ওর নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে মরে যাব।
একটু থেমে সে আবারও দাঁত চেপে বলে উঠল,
- তবে, জেঠুকে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম। তাকে আমি শেষ করেছি আর সেটাই তার পাওনা ছিল।
ওই মুহূর্তে আমি তাকে প্রশ্ন করলাম,
- আর সন্দ্বীপ? তাকেও তুমি শেষ করলে।
অর্ণব মাথা নাড়ল।
- হ্যাঁ, কারণ আইন ওকে ধরেনি। তাই আমাকেই করতে হলো। আমিই বিচারক, আমিই শাস্তিদাতা।
আমি তার দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাম। আসলে এমন আত্মবিশ্বাস, এমন উন্মাদ স্থিরতা খুবই বিপজ্জনক। এরপর সে দেখি হঠাৎ করেই শ্যামলীর দিকে এক পা বাড়িয়ে বলল,
- এবার তুমি। তোমাকে ছাড়া এই যাত্রা অসম্পূর্ণ।
শ্যামলী কথাটা শুনে পিছিয়ে গেল এবং আমি তার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
- অর্ণব, থামো নয়ত আমি গুলি চালাতে বাধ্য হবো।
অর্ণব থেমে দাঁড়ালো এবং হাসতে হাসতে বলল,
- গুলি চালালে আমার মুক্তি, চালান ইনস্পেক্টর ধর।
তার চোখে মৃত্যু-ইচ্ছের অদ্ভুত ঝিলিক। আমি গম্ভীর গলায় বললাম,
- আজ তুমি সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছো, অর্ণব। তুমি যেটা করেছ তা ন্যায় নয়, এটা প্রতিশোধ। আর প্রতিশোধ কখনো ন্যায় হতে পারে না।
অর্ণব ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
- আমার সত্য, আমার কাছে সত্যই থাকবে।
(৯)
লাইব্রেরির ভেতর বাতাস যেন ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। অর্ণব তাকের আড়ালে হাত বাড়িয়ে কী তুলতে চাইছে, সেটা সুমন স্যার আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তার চোখের দৃষ্টি, শরীরের কম্পন, বাকি সবই বলে দিচ্ছিল সে আজ মরতেও রাজি কিন্তু হারতে রাজি নয়।
রিভল্ভার তুলে গম্ভীর গলায় সুমন স্যার বললেন,
- অর্ণব, আর এক ইঞ্চি নড়লে তোমার শরীরের ভেতর দিয়ে আলো বয়ে যাবে। এবার থামো।
কিন্তু সে একটুও স্থির হলো না। বরং ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি রেখে, সে হাতে তুলে নিল একটা ভোঁতা লোহার রড।
শ্যামলী ওই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে কেঁপে উঠল,
- অর্ণব! এটা নামা প্লিজ।
কিন্তু অর্ণব যেন আর তাকে শুনতেই পাচ্ছে না। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,
- ইনস্পেক্টর ধর, আপনি কি কখনো অপরাধীর মাথার ভেতরে ঢুকে দেখেছেন, ওরা কেন অপরাধী হয়ে ওঠে? কারণ ওদের কাছে দোষীরা সবসময় বেঁচে থাকে। আর ওরা নিজেরাই প্রতিদিন মরতে থাকে। আমি তার কোনও ব্যতিক্রম নই।
আমি রিভল্ভারের ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে বললাম,
- ওসব কথা আমি সুমন স্যারের কাছে হাজারবার শুনেছি। উনি সব সময় একটা কথাই বলেন, যে ব্যক্তি নিজের মাথার ভেতরেই ফাঁসির মঞ্চ বানিয়ে রাখে, তাকে শাস্তি দিতে গিয়ে পুলিশকেও একসময় বিচারক হতে হয়।
অর্ণব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
- আপনি আমার বিচারক হতে চাইলেও পারবেন না। আমি আমার বিচার শেষ করেছি অনেক আগেই।
এরপর সে হঠাৎ শ্যামলীর দিকে ঘুরে দাঁড়াল এবং লোহার রডটা হাতে তুলে বলল,
- তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। তুমি আমার দিদি হলেও আমি তোমাকে তার চেয়ে বেশি ভালোবাসতাম। আর যাকে আমি পাব না, তাকে বাঁচতে দেব কেন?
শ্যামলী পিছিয়ে গেল কিন্তু তার পিঠ ঠেকল তাকের গায়ে এবং তার শ্বাস ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। সুমন স্যার সেটা টের পেয়ে, আমাকে ইশারা করলেন কারণ আর এক সেকেন্ড দেরি মানেই মৃত্যু।
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম,
- অর্ণব! আমি বলে দিচ্ছি, নড়বে না!
সে আমাকে উপেক্ষা করে দু পা এগিয়ে এলো শ্যামলীর দিকে এবং আমিও ট্রিগারে চাপ বাড়ালাম। কিন্তু তার মাঝে হঠাৎ করে শ্যামলী কাঁদো গলায় বলে উঠল,
- অর্ণব, থাম! অন্তত এখন আমার কথা শোন। তোকে কেউ মারতে চায়নি! সন্দ্বীপও না। আমরা চেয়েছিলাম তুই আমাদের সঙ্গেই থাক কিন্তু তুই যেভাবে আমার বাবার ওপর প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়লি, আমরা ভয় পেয়ে গেছিলাম। আর তাছাড়া আমি ভালোবাসতাম তোকে ভাই হিসেবে আর সন্দীপকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে। আমাদের হিন্দু ধর্মে ভাইবোনের সম্পর্কতে যেটা ভাবা পাপ, সেটাই তুই ভাবতে চাইছিলিস।
অর্ণব চুপ করে কথাগুলো শুনছিল, তার চোখে অস্পষ্টতা। মুখের পেশি শক্ত করে সে চিৎকার করে উঠল,
- মিথ্যে! সব মিথ্যে।
এই বলে সে শ্যামলীকে আঘাত করার জন্য লোহার রড উপরের দিকে তুলল আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমি গর্জে উঠলাম,
- অর্ণব! আর এক পা এগোলে আমি কিন্তু সত্যি এবার গুলি চালাব।
সে আমার দিকে পাগলের মতো তাকিয়ে বলল,
- মারুন! মেরে ফেলুন! কিন্তু আগে একবার...।
সে শ্যামলীর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং আমিও ট্রিগার চাপতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় শ্যামলী পাশের তাক থেকে একটা মোটা বই তুলে অর্ণবের মাথায় মারল। ঠাস!
অর্ণবের মাথায় আঘাত লাগায় সে নিজেকে সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল আর তার হাত থেকে লোহার রডটা কিছুটা দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ল। তার ভিতরে থাকা দানবটা যেন হঠাৎ চমকে উঠল। সে হাঁটুতে হাত রেখে শ্বাস ফেলতে লাগল।
আমি দৌড়ে গিয়ে থাবা মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে তার হাত মোচড়াতে মোচড়াতে চেঁচিয়ে বললাম,
- শেষ! খেলা শেষ, অর্ণব!
তবে, অর্ণব মাটিতে হাত রেখে বিড়বিড় করতে লাগল,
- আমি শাস্তি দিতাম, আমি ন্যায় করতাম কিন্তু আপনি আমাকে থামালেন। তাই আপনিই এখন অপরাধী হয়ে গেলেন, স্যার।
আমি দাঁতে দাঁত চিপে তাকে বললাম,
- অপরাধীর সংজ্ঞা যে নিজের মতো করে বানিয়ে নেয়, তাকে পৃথিবীর কোনও আদালত আর বাঁচাতে পারে না। আর তুমি এখন সেই মাত্রা পার করে ফেলেছ।
অর্ণব কথাটা শুনেই হেসে উঠল এবং তার সেই হাসি যেন লাইব্রেরির নীরবতার ভেতর ছুরির মতো বেজে উঠল।
- আমি হারিনি, স্যার। আমি শুধু শেষ হয়েছি। হার মানে তো যখন কোনও বিকল্প থাকে, আমার সেটা কখনোই ছিল না।
কথাটা শেষ হতেই তার চোখে এক অদ্ভুত শান্তি লক্ষ্য করলাম। আমি হ্যান্ডকাফ পরাতে পরাতে বললাম,
- বাছাধন, মানুষ যখন নিজের দোষ বোঝে না, তখনই সে সবচেয়ে বিপজ্জনক। আর তুমি সেই লিস্টের উপরে।
সে শেষবারের মতো শ্যামলীর দিকে তাকাল। তার চোখে জল ছিল কিন্তু তাতে কোনও কোমলতা নেই। শ্যামলীও তার খুড়তুতো ভাইয়ের দিকে তাকাল। নিজের ভিজে যাওয়া চোখ মুছতে মুছতে সে বলল,
- অর্ণব, তুই আমাদের সারাজীবন ভুল বুঝে গেলি, দিদির ভালোবাসা কোনোদিন বুঝতেই চাইলি না।
অর্ণবকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো। লাইব্রেরির স্যাঁতসেঁতে, গন্ধভরা ঘরের মাঝে তখন আমরা তিনজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। সুমন স্যার রেডিওতে জানালেন,
- কন্ট্রোল রুম, সাসপেক্ট ইন কাস্টডি। আমরা বের হচ্ছি, ওভার।
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আসার সময় সুমন স্যারের একটা কথা আমার সারাটা পথ কানে বাজছিল। সুমন স্যার তখন বলেছিলেন,
- বুঝলে ধর, পাগলকে ঠিক করা যায় কিন্তু পাগলামিকে নয়।
আর অর্ণব? সে মানুষ ছিল কিন্তু তার ভিতরের পাগলামি তাকে মানুষ থাকতে দেয়নি। এখন তার শেষ বিচারটা হবে আইনের সঠিক পথে।
(১০)
লালবাজারে ফিরে আসতেই যেন এক অন্য উত্তেজনা। খবর ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে, অর্ণব পাল লালবাজারের 'সাইলেন্ট জাস্টিস' সিরিয়াল কিলার এখন গ্রেফতার।
মিডিয়ার গাড়িগুলো একের পর এক এসে থামছে, যেন লালবাজারের সামনে কোনও যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে চোখ ধাধিয়ে দিচ্ছে। সুমন স্যার যুদ্ধংদেহী গলায় বললেন,
- এসবের কী দরকার? রাত দুপুরে সার্কাস লাগিয়ে দিলেন নাকি?
আমি হেসে বললাম,
- আসলে স্যার, আজকাল মিডিয়ার রাত নেই দিন নেই। খুনির ধর-পাকড় হলে তো ওনাদের ঈদ।
আমরা অর্ণবকে ভেতরের সেলে নিয়ে গেলাম। তার চোখে অদ্ভুত এক শান্তির ছাপ, যেন গ্রেফতার হওয়াটাই তার চূড়ান্ত পরিণতি।
সেলে ঢোকানোর সময় সে একবার শুধু বলল,
- আপনি দেরি করেননি, ইনস্পেক্টর ধর। আমি সময় মতো শেষ হয়েছি।
কথাটা শুনে আমি তাকে বললাম,
- অর্ণব, তুমি যে শেষ বলছ সেটা ভুল। তুমি এখনো শুরুতেই আছো। আগামীকাল কোর্টে যখন তোমার বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা পড়বে, তখন বুঝবে আসল শেষ কী।
অর্ণব হাসল না, শুধু চোখ দুটো স্থির রেখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। এদিকে, আমরা রিপোর্ট জমা দিতে ডিসিপি সাহেবের কেবিনে ঢুকলাম। উনি চোখ তুলে আমাদের দিকে তাকালেন, ওনার মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট।
- তোমরা ঠিক কাজটাই করেছ। শহরটাকে এক পাগলের হাত থেকে বাঁচানো গেছে। কিন্তু মিডিয়া, দেখছই তো।
আমি চেয়ারে বসে বললাম,
- স্যার, আজকাল মিডিয়া অপরাধীর মানসিকতা নিয়ে কম, টিআরপি নিয়ে মাথা ঘামায় বেশি।
পাশ থেকে সুমন স্যার হালকা হেসে বললেন,
- আসলে খুনের গল্পে খুন নিয়ে যারা বেশি উত্তেজিত হয়, তারা সত্যটা কখনো বোঝে না।
- যাই হোক, তোমার বেস্ট কাজ করেছ। কিন্তু একটাই কথা, কেসটা স্পর্শকাতর। অর্ণব মেন্টালি আনস্টেবল, সেটা বোঝাতে গেলে কোর্টে অনেক জেরা হবে।
ডিসিপি সাহেবের কথায় সুমন স্যার মাথা নেড়ে বললেন,
- হ্যাঁ, জানি। মানসিক অসুস্থতা আর অপরাধ, দুটোকে আলাদা করতে হলে প্রমাণ দরকার। আমার মনে হয় সেটা আদালতে দাঁড়িয়ে ইনস্পেক্টর ধর বলতে পারবে।
ডিসিপি সাহেবের কেবিন থেকে বেরিয়ে মনে হলো বুকের ভেতর কোথাও একটা ভার, অর্ণবকে ধরে আনার পরেও কেন যেন স্বস্তি আসছে না।
হ্যাঁ, সে খুনি। কিন্তু একজন মানুষকে আমাদের এই সমাজ কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে কোথাও ঠেলে দেয়, তা সত্যিই কল্পনার বাইরে। সুমন স্যারের একটা কথা মনে পড়ল,
- ধর, খুনি কখনো হঠাৎ করে তৈরি হয় না। সমাজ, পরিবার, সম্পর্ক সব মিলে একটা অদৃশ্য কারখানা আছে, যেখানে মানুষটাকে ধীরে ধীরে ভেঙে নতুন দানবে গড়ে তোলা হয়।
সেই রাতে সুমন স্যার আমাকে বাড়ি পৌঁছে ফোন করলেন। আমি ফোন ধরতেই উনি শান্ত গলায় বললেন,
- ধর, আগামীকাল কেসটা কোর্টে উঠছে। মাথায় রেখো, খুনির গ্রেফতার মানেই কেস শেষ নয়। কেস শেষ তখনই, যখন তার অপরাধী হয়ে ওঠার কারণগুলোকে খুঁজে বের করতে পারবে। না হলে পরের অর্ণবের জন্ম আটকাতে পারবে না।
আমি চুপ করে কথাগুলো শুনে গেলাম। রিটায়ার্ড আইপিএস সুমন চৌধুরী এই কেসে স্রেফ আমার সহযোদ্ধাই নন, উনি আমার মেন্টরও।
সুমন স্যার আরও একটা কথা বললেন,
- অপরাধ শুধু হাত দিয়ে হয় না, ধর। মাথা দিয়েও হয়।
সেই শুনে আমি তাকে বললাম,
- হ্যাঁ, স্যার। আমি বুঝেছি। কেসটাকে শুধু হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখব না, মানসিক অপরাধ হিসেবেও দেখব।
এরপর স্যার ফোনটা রেখে দিলেন। আমিও বিছানায় গা এলিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। তারপর নিজেকে বললাম,
- এই শহর শুধু অপরাধে ভরা নয়, ভরা ভাঙা মানুষে। যাদের ক্ষত চোখে দেখা যায় না, যাদের সময়মতো পতন কেউ থামাতে পারে না। অর্ণবকে আমরা ধরেছি ঠিকই কিন্তু ওর ভেতরের ভাঙা মানুষটাকে? না, সে তো চিরকালই অদৃশ্য থেকে যাবে। হয়ত কোনওদিনই তাকে ধরা যাবে না।


