1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

মহালয়া

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

মহালয়া

কৌশিক দরিপা

আদালতে আজ নিয়তির শেষ বিচার পর্ব।দীর্ঘ পাঁচ বছর বিচার চলার পর আজ আদালত শেষে নিয়তি কে নিঃশর্ত ভাবে মুক্তি দিয়েছে।এই পাঁচ বছর তাকে বিচার চলাকালীন জেল খাটতে হয়েছে।আদালত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নিয়তির মনে পড়ে যায় সেই অভিশপ্ত রাতের কথা।

নিয়তি সর্দার এক ছোট গ্রামের মেয়ে।স্বামী আর সন্তানকে নিয়ে তার সুখের সংসার।স্বামী বাঁশের তৈরী জিনিসের কারিগর।বাঁশের ঝুড়ি,কুলো,ধামা এই সব তৈরী করে শহরে সরবরাহ করে তাদের সংসার চলে।নিয়তি জঙ্গল থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে আসে।বাড়ির বাইরের উঠোনে তার স্বামী সেই বাঁশ কেটে,ছুলে,আঁশ ছাড়িয়ে তৈরী করে ওই সব জিনিস।বাজারের চাহিদা বেশি থাকলে নিয়তিও স্বামীর সাথে হাত লাগাতো। নিয়তির কাজ ছিলো বাজারে সেই সব মাল দোকানে সরবরাহ করে পয়সা নিয়ে আসা।

এবারের দুর্গা পূজায় শহরের এক প্যান্ডেল ডেকোরেটার্স এক বিশাল পরিমান ঝুড়ি ও কুলোর অর্ডার দিয়েছিলো।পুজোর আগে সেই মাল তৈরী করতে নিয়তি আর তার স্বামী হিমসিম খেয়ে যায়।একটু একটু মাল তৈরী করে,মণ্ডপে সেই মাল সাপ্লাই দিয়ে আসতো নিয়তি।তাদের হাতের তৈরী ঝুড়ি ও কুলোতে শহরের মণ্ডপ একটু একটু করে সেজে উঠছিলো।

আজ মহালয়ার আগের দিন।তাদের অর্ডারের শেষ কিস্তির মাল আজ ডেলিভারী দেওয়ার কথা।ডেকোরেটার্স সকালেই গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলো।সেই গাড়িতে মাল লোড করে নিয়তি শহরে সেই মাল নিয়ে যায়।গ্রাম থেকে সেই মাল শহরে নিয়ে যাওয়া,সেখানে মাল নামানো,গুনে সব মাল চেক করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়।সব কাজ মিটিয়ে টাকা নিয়ে নিয়তি তারপর রওনা দেয় গ্রামের উদ্দেশ্যে।

সন্ধ্যা প্রায় সাতটা বেজে যায়।বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে সে দেখে কোনো বাস নেই।শেষ বাস সন্ধ্যা ছটায় চলে গেছে।কি করবে না বুঝতে পেরে সে বাসস্ট্যান্ডেই অপেক্ষা করতে থাকে।রাত প্রায় নটা বেজে যায়।অনেক খোঁজ খবর নেওয়ার পর সে এক মালগাড়ির খোঁজ পায়।সেই গাড়িটা শহরে কোনো মাল সাপ্লাই দিয়ে,নিয়তির গ্রামের দিকে ফিরে যাচ্ছিল।অনেক অনুরোধের পর তারা নিয়তিকে গাড়িতে নিয়ে যেতে রাজি হয়।

রাত দশটায় সেই গাড়ি নিয়তিকে নিয়ে রওনা দেয় তাদের গ্রামের দিকে।প্রায় এক ঘন্টা গাড়ি চলার পর গাড়ির ড্রাইভার ও খালাসি এক লাইন হোটেলে গাড়ি দাঁড় করায় রাতের খাবার খাওয়ার জন্য।নিয়তি সারাদিন সেভাবে কিছু খায়নি।সেও টেবিলে বসে রুটি সবজি খায়।নিয়তি লক্ষ্য করে ড্রাইভার ও খালাসি ভিতরে রুমে গিয়ে খাবার খায়।নিয়তির এই জিনিসটা খুব অবাক লাগে,কিন্তু সে বেশি মাথা ঘামায় না ব্যাপার টা নিয়ে। 

রাত প্রায় বারোটা বেজে যায় গাড়ি আবার তার যাত্রা পথে রওনা দিতে।গাড়িতে চাপার পরই নিয়তি গাড়িতে কেমন এক গন্ধ পায়,তার বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে গন্ধটা মদের।তার বুক টা কেমন যেন ভয়ে শুকিয়ে যায়।সে তাদের অনুরোধ করে,তাকে এখুনি গাড়ি থেকে নামিয়ে দিতে।কিন্তু গাড়ি চলতে থাকে তার নিজস্ব গতিতে এঁকে বেঁকে,টলমল হাতে স্টিয়ারিং ধরে।

নিয়তি লক্ষ্য করে গাড়ি তাদের গ্রামের রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।সে চিৎকার করে,গাড়ি থামাও,কিন্তু গাড়ি আর থামে না।অন্ধকার নির্জন রাস্তায় তার চিৎকার শোনার কেও ছিলো না।জঙ্গলের মাটির রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে গাড়ি গিয়ে থামে গভীর জঙ্গলের মাঝখানে।দূর থেকে দূরে কেও নেই সেখানে তারা ওই তিনজন ছাড়া।গাড়ি থামতেই নিয়তি দরজা খুলে নেমে দৌড়াতে থাকে অচেনা পথে।

দুটি মাতাল ধাওয়া করে তার পিছন পিছন,দৌড়তে দৌড়তে নিয়তির ক্লান্ত পা থেমে যেতে চায়,হাঁপিয়ে ওঠে সে।কিন্তু তাকে তো থামা যাবে না,থামলেই থেমে যাবে তার জীবন।অবশেষে দুই মাতাল ধরে ফেলে তাকে।তার হাত পা ধরে কোলে তুলে নিয়ে আসতে থাকে গাড়ির দিকে।গাড়ির হেড লাইট জ্বালিয়ে দুটি পশু ছিঁড়ে ফেলতে থাকে তার গায়ের কাপড়।দুটি পশু ঝাঁপিয়ে তার শরীরের উপর আঁচড় কাটতে থাকে।করুন আর্তনাদে রাতের কালো আকাশ নির্বাক শ্রোতা হয়ে নিশ্চুপ হয়ে দেখতে থাকে নিয়তির করুন পরিণতি।

ধীরে ধীরে নিয়তির চোখের জল শুকিয়ে আসতে থাকে,মনের ভয় শেষ হয়ে ক্রোধে গর্জন করতে থাকে।নিয়তি দুটি পশুর হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গাড়ির ভিতর তার ব্যাগে কি যেনো খুঁজতে থাকে।মাতাল গুলো টলতে টলতে গাড়ির ভিতর নিয়তির কাছে এসে টানাটানি করতে গেলে,সে ব্যাগ থেকে বার করে কাঠ কাটার কাটারি টা,যেটাকে সে নিয়ে যেতো সবসময়।কোনো ঝুড়ি গাড়িতে আসতে আসতে ভেঙে গেলে,ওই কাটারি দিয়ে কেটে মেরামতির জন্য।কাটারি হাতে নিয়ে রণচন্ডি রূপে সে নেমে আসে গাড়ি থেকে।দুই মাতাল তাকে দেখে ভয় পেয়ে দৌড়াতে থাকে।দুই মাতালের পিছনে নিয়তি দৌড়াতে থাকে কাটারি নিয়ে।নেশার ঘোরে খালাসি মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই নিয়তি কাটারি দিয়ে তার শরীর থেকে মাথা আলাদা করে দেয়।কাঁপতে থাকা ড্রাইভার গতি বাড়িয়ে আরো জোরে ছুটতে থাকে।কিন্তু নিয়তি তাকেও ধরে ফেলে,কোপাতে থাকে কাটারি দিয়ে।ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় তার শরীর কে,সেও লুটিয়ে পড়ে মাটির উপর।নিয়তি তারও মাথা আলাদা করে দেয় শরীর থেকে।

কয়েক ঘন্টার পথ পেরিয়ে নিয়তি ছুটে ছুটে যখন গ্রামে ঢুকে,তার শরীরের এলোমেলা কাপড়ে রক্তের দাগ,এলোমেলো উড়ন্ত চুল,হাতে কাটারি- যাতে টাটকা রক্তের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।গ্রামের লোক অবাক হয়ে ছুটে এসে তাকে দেখতে থাকে।ভোরের আলো একটু একটু করে চোখ খুলে আকাশে লাল কালোর আবেশ ছড়িয়েছে।ক্লাবের ছেলেরা মাইক লাগিয়েছে,যাতে মুখরিত হয়ে চলেছে,বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের- 'যা দেবী সর্ব ভূতেশু,শক্তি রূপেণ সংস্কিতা,,,,,,,,'।চারিদিকে আতশ বাজির আওয়াজে হঠাৎ নিয়তির মনে পড়ে আজ তো মহালয়া।আজ তো দেবীর মর্তে আগমন,যে দেবী অসুরের বুকে ত্রিশূল ঢুকিয়ে মুক্তি দিয়েছিলো নিরীহ মানুষদের।সেও তো ওই পশুর বেশ ধারী অসুর বধ করে নিজেকে মুক্তি দিয়েছে,,,ভেঙে দিয়েছে অন্যায়ের কালো হাত কে।

নিয়তির স্বামী তাকে ধরে নিয়ে যায় বাড়িতে।একটু পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাকে থানায় নিয়ে যায়।থানায় বড় বাবু তার মুখ থেকে সব ঘটনা শুনে বলেন,তিনি কিছু ভুল করেন নি,কিন্তু তিনি আইন যেহেতু নিজের হাতে তুলেছেন, তারা চেষ্টা করবেন আত্মরক্ষার কারন দেখিয়ে যাতে তার শাস্তি কম করানো যায়।


No comments:

Post a Comment