![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
সাহেববাগান “দুর্গাবাড়ির” মাতৃবন্দনা
অনির্বাণ সাহা
অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত চন্দননগর শহর । ফরাসি উপনিবেশ হওয়ায় বিপ্লবীগণ এখানে অতি সহজে ও সুরক্ষিত অবস্থায় তাদের কার্যকলাপ পরিচালনা করতে পারত । সুতরাং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে চন্দননগরের গুরুত্ব অপরিসীম । আবার দেশভাগের পরেও এই শহরের কৌলিন্য বিশেষ হ্রাস পাইনি । এই শহরের ইতিহাস-বর্তমান-সংস্কৃতিই তার ধারক ও বাহক । আবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা অধুনা বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর যে অত্যাচার সংঘটিত হয়েছিল, সেখান থেকে বাঁচতে অনেক হিন্দু পরিবার তাদের পূর্বপুরুষের ভিটে-মাটি ছেড়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে মূলত পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন শহরে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে । চন্দননগর শহর তাদের মধ্যে এক অন্যতম নাম । চন্দননগর হয়ে ওঠে তাদের আশ্রয়দাতা, হয়ে ওঠে নতুন জীবনের চাবিকাঠি । এক কথায় বলা যেতেই পারে চন্দননগর শহর হয়ে ওঠে তাদের কাছে মাতৃক্রোড় সম সুরক্ষিত আশ্রয় । ঐতিহাসিক এই শহরেই বিবাদ ভুলে মেলবন্ধন ঘটে দুই বাংলার সংস্কৃতির । এই শহরে এর কয়েক শতক আগে থেকেই বিভিন্ন পরিবারে নিজ-নিজ রীতি অনুযায়ী দেবী দূর্গার আরাধনার হত । ওপার বাংলা তথা অধুনা বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু পরিবাররাও এখানে বসতি স্থাপন করে পারিবারিক মাতৃ বন্দনা শুরু করে । সংস্কৃতির সাথে সাথে মেলবন্ধন হয় ধর্মীয় সংস্কৃতির, মেলবন্ধন হয় ধর্মীয় রীতিনীতির । চন্দননগরের সাহেববাগান এলাকায় বসবাসকারী বণিক মজুমদার পরিবার হল তার এক অন্যতম উদাহরণ । আর তাদের পারিবারিক মাতৃবন্দনা তথা “দুর্গাবাড়ির” মাতৃবন্দনা আজও সগৌরবে অমলিন ।
এই পরিবারের মাতৃবন্দনা যথেষ্ট ঐতিহ্যবাহী এবং প্রাচীন । তবে পরিবারের দুর্গাপূজার ইতিহাস বা কথা জানার আগে এই পরিবারের পারিবারিক ইতিহাসটা জানা খুবই প্রাসঙ্গিক । এই পরিবার মূলত “বণিক” সম্প্রদায়ভুক্ত । এদের সম্পূর্ণ পদবী ছিল “বণিক মজুমদার“ । কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন কারণবসত এই পরিবার শুধুমাত্র “মজুমদার” পদবী ব্যবহার করে । এদের আদি নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের ঢাকার মুন্সিগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামের তালতলা পাড়া অঞ্চলে । পারিবারিক মতে তারা সেই অঞ্চলের জমিদার ছিল । তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলে জমি ও বাগান ছাড়াও বড় থাম ও খিলানযুক্ত একটি বনেদী বাড়ীও ছিল । সাথে মন্দির ও দালানও ছিল । আর ছিল দুটি বড় কারখানা । একটি মোমবাতির এবং একটি সাবানের । কারণ এই পরিবারের পারিবারিক ব্যবসা ছিল মোমবাতি ও সাবান প্রস্তুত এবং তার রপ্তানি । কিন্তু ভারত স্বাধীন হওয়ার বেশকিছু বছর আগে থেকেই অবিভক্ত পাকিস্তানের পূর্ব অংশে তথা বর্তমানের বাংলাদেশে স্থানীয় হিন্দুদের উপর মুসলিমদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ও অত্যাচার শুরু হয় । নিজেদের জীবন রক্ষার তাগিদে বেশিরভাগ হিন্দু পরিবারই নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটে-মাটি ত্যাগ করে, যৎসাবান্য বস্ত্র ও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আবার কখনও এক বস্ত্রে দেশত্যাগী হয় । আশ্রয় নেয় বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় । সেই রকমই একটি পরিবার হল বণিক মজুমদার পরিবার । সালটা তখন আনুমানিক ১৯৪৩-৪৪ । এই পরিবারের শ্যামলাল বণিক মজুমদার, তার সহোদর ভাই গুরুপদ বণিক মজুমদার এবং জেঠতুতো ভাই বল্লভ বণিক মজুমদার সপরিবারে ও সবান্ধবে নিজেদের জমিদারি ত্যাগ করে অধুনা পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন । বল্লভ বণিক মজুমদার হাওড়া জেলার লিলুয়ায় বসবাস শুরু করেন (প্রাথমিকভাবে একটি ভাড়া বাড়িতে ওঠেন, পরবর্তীতে ভট্টনগরে জমি ক্রয় করে নিজ ভবন প্রস্তুত করেন) । শ্যামলাল বণিক মজুমদার নিকটবর্তী হুগলি জেলার উত্তরপাড়া অঞ্চলে একটি ভাড়া বাড়িতে ওঠেন । কিন্তু সেখানে তাদের মন টেকে না । খুব অল্পদিনেই (মাত্র পাঁচ মাস) সেখান থেকে চন্দননগরের রথের সড়কের কাছে একটি ভাড়া বাড়িতে ওঠেন । প্রায় দুই দশক সেখানে বসবাস করলেও পরবর্তীতে আনুমানিক ১৯৬৩ সালে সাহেববাগানে নিজ ভবন প্রস্তুত করেন শ্যামলাল বণিক মজুমদার । এই ভবনের নির্মাণকার্য্য সম্পন্ন হলেই স্ত্রী হেমলতা দেবী ও চার পুত্রকে (অমূল্য মজুমদার, শান্তিরঞ্জন মজুমদার, প্রাণগোপাল মজুমদার এবং সুভাষচন্দ্র মজুমদার) নিয়ে রথেরসড়কের ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজ ভবনে বসবাস শুরু করেন তিনি । এবং গুরুপদ বণিক মজুমদার প্রথম থেকেই কলকাতায় (খুব সম্ভবত লেকটাউন অঞ্চলে) তার বসতি গড়ে তোলেন । পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, এই পরিবারে দুর্গাপুজোর সূচনা হয় আনুমানিক নবম পূর্বপুরুষের (বর্তমান প্রজন্ম থেকে) হাত ধরে । অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৩৫০ বছর পূর্বে । এই পরিবারে দেবী দশভূজা তৎকালীন সময় থেকে পূজিত হয়ে আসছেন “আনন্দময়ী মা” নামে । পারিবারিক রীতিনীতি ও অত্যন্ত নিষ্ঠা মেনে প্রতিবছর নিরবিচ্ছিন্নভাবে আয়োজিত হত এই পরিবারের মাতৃবন্দনা । তৎকালীন সময়ে তালতলা অঞ্চলের জমিদার বাড়িতে পুজো উপলক্ষে বসত মিলনমেলা । হ্যাজাকের আলো, মানুষের কোলাহল আর সদর্প মন্ত্রচ্চারণে জমিদার বাড়ি তথা সমগ্র অঞ্চল মুখরিত হয়ে থাকতো ওই চারটি দিন । ১৯৪৩-৪৪ সালে নিজেদের জীবন ও বংশরক্ষার দায়ে এই পরিবারের মূল অংশটি ভারতে চলে এলে, অধুনা বাংলাদেশের বাড়ির পূজাটি আর আয়োজিত হয়েছিল কিনা সেব্যপারে কিছু জানা সম্ভব হয় না । ভারতে আসার পর মূলত বল্লভ মজুমদারের ভট্টনগরের নিজ বাড়িতে আনুমানিক ১৯৪৫-৪৬ সাল থেকে পুনরায় তাদের পারিবারিক এই পূজাটি পুনরায় আয়োজিত হতে শুরু করে । পূজা আয়োজনের জৌলুষ অনেকটা কমলেও দীর্ঘ বছর এই পরিবারের মাতৃবন্দনা বল্লভ মজুমদারের ভট্টনগরের বাড়িতেই আয়োজিত হয়েছিল । কিন্তু তারপরেই এই পরিবারের আকাশে নেমে আসে কালো অন্ধকারাচ্ছন্ন মেঘের ভ্রুকুটি । আনুমানিক ১৯৬৩ সালে বয়সজনিত কারণেই বল্লভ মজুমদার মহাশয় ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন । আর সেই বছর থেকে পারিবারিক ও হিন্দু সংস্কারগত কারণে এই পরিবারের মাতৃবন্দনা বন্ধ হয়ে যায় ।
একটা প্রবচন আছে “শেষ হইয়াও হইলো না শেষ” । এই পরিবারের মাতৃবন্দনার ইতিহাস ঠিক তেমনই । ভট্টনগরের বাড়ির পূজা বন্ধ হয়ে গেলে প্রায় তিন বছর পরে ১৯৬৬ সাল নাগাদ চন্দননগরের সাহেববাগানের বাড়িতে পুনরায় শুরু হয় মাতৃবন্দনা । অর্থাৎ এই হিসাব ধরলে বর্তমানে এই পূজাটি ২০২৫ সালে ৬০তম বছরে পদার্পণ করেছিল । এখানে দেবী মায়ের আরাধনা মূলত শুরু হয় শ্যামলাল মজুমদার ও তার সহধর্মিনী হেমলতা মজুমদারের উদ্যোগে । শুধু পারিবারিক দেবী আরাধনার পুনঃপ্রতিষ্ঠাই নয়, সেই উদ্দেশ্যে দুর্গাপূজার ঠিক আগেই বাড়ি লাগোয়া অবশিষ্ট জমিতে নির্মাণ করেন একটি মন্দির বা ঠাকুরদালান । আর তখন থেকেই সম্ভবত এই বাড়ির নামকরণ করা হয় “দুর্গাবাড়ি” । বর্তমানে এই দুর্গাবাড়ির আনন্দময়ী মায়ের বন্দনার বা আরাধনার সকল দায়িত্বভার পালন করেন মূলত শ্যামলাল বণিক মজুমদারের আট পৌত্ররা । তারা হলেন যথাক্রমে গৌতম মজুমদার, রঞ্জিত মজুমদার ও আরও তিন ভাই (অমূল্য মজুমদার ও তার স্ত্রী রুক্মিণী মজুমদার মহাশয়ার পুত্র), দেবাশীষ মজুমদার (শান্তিরঞ্জন মজুমদা ও তার স্ত্রী কল্যাণী মজুমদার মহাশয়ার পুত্র) এবং বিশ্বজিৎ মজুমদার ও প্রসেনজিৎ মজুমদার (প্রাণগোপাল মজুমদার ও তার স্ত্রী আরতী মজুমদার মহাশয়ার পুত্র) । এখানে বলে রাখা ভালো শ্যামলাল বণিক মজুমদার মহাশয় কনিষ্ঠ পুত্র সুভাষচন্দ্র মজুমদার অবিবাহিত অবস্থাতেই অকালে ইহজগতের মায়া ত্যাগ করেন । এই মন্দিরে প্রতি বছরই একচালা দেবী প্রতিমা নির্মিত হয় । তবে এই প্রতিমার বিশেষত্ব হলো গণেশ এবং কার্তিকের স্থান পরিবর্তন । অর্থাৎ এখানে গণেশ থাকেন দেবীর বামদিকে আর কার্তিকের অবস্থান দেবীর ডানদিকে । পূর্বে দেবী ডাকের সাজে সুসজ্জিতা হলেও, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে বর্তমানে দেবী আবির্ভূতা হন সোনালী জড়ির সাজে । দেবীর পিছনের চালচিত্রটি সাধারণ সাজশয্যায় সুসজ্জিত হলেও দেবীর একদম মাথার উপরে একটি মহাদেবের পটচিত্র থাকে । এই পরিবারের মৃন্ময়ী দেবী প্রতিমা নির্মাণে যেসকল মৃৎশিল্পীরা ১৯৬৬ সাল থেকে যুক্ত ছিলেন তারা হলেন যথাক্রমে নৈহাটির ননী পাল (আনুমানিক ২৪-২৫ বছর), রিষড়ার প্রানবন্ধু পাল (আনুমানিক ১৫-১৬ বছর), এবং বর্তমানে স্থানীয় গোরাচাঁদ পাল । প্রথম বছর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে পূজারী হিসেবে ছিলেন বিশিষ্ট পুরোহিত শ্রীযুক্ত ক্ষীতিশ ভট্টাচার্য্য মহাশয় । বর্তমানে আনুমানিক প্রায় ১৫ বছর ধরে এই পরিবারের কুলপুরোহিত হিসেবে যুক্ত রয়েছেন শ্রীযুক্ত অর্ধেন্দু চক্রবর্তী মহাশয় । পারিবারিক রীতি অনুযায়ী প্রতিমা পরিবারের দুর্গা মন্দিরেই পারিবারিক স্থায়ী কাঠামোতে নির্মিত হয় । পুণ্য রথযাত্রার দিন এই পরিবারের প্রতিমার মুখ বসানো হয় । মহাষষ্ঠীর দিন হয় দেবীর বোধন । স্থাপন করা হয় নিদ্রাঘট । দেবীর ঘট ও ঘটস্নানের ক্ষেত্রে এই পরিবারের বিশেষ রীতি ও বৈশিষ্ট্য প্রচলিত রয়েছে । সপ্তমীর পুণ্য তিথিতে বাড়িতেই পিতলের প্রধান ঘটস্নান করানো হয় এবং স্থাপন করা হয় । এছাড়াও আটটি মাটির ঘট স্থাপিত হয় যথাক্রমে মহাদেব, নারায়ণ, চণ্ডী, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও নবপত্রিকার উদ্দেশ্যে । মহাঅষ্টমীর দিন সকালে আরও একটি পিতলের ঘট বাদ্যযন্ত্র সহকারে স্থানীয় নিকটবর্তী জগন্নাথ ঘাটে একডুবে স্নান করানো হয় এবং তা সপ্তমীতে স্থাপিত দেবীর ঘটের সম্মুখে স্থাপন করা হয় । এই পরিবারের দেবীর ঘটের মাহাত্ম্য বা বৈশিষ্ট্য এখানেই শেষ নয় । অষ্টমীতে স্থাপিত পিতলের ঘটের চারদিকে গোল করে মাটির ছোট ছোট আরও নয়টি ঘট স্থাপিত হয় এবং প্রতিটির মাথায় নয়টি আলাদা আলাদা রঙের ধ্বজা বসানো হয় । এই নয়টি ঘট নবসখীর প্রতীক স্বরূপ ।
সপ্তমী থেকে নবমী প্রতিদিন ১০৮টি করে নৈবেদ্য দেবী দশভূজা ও বাড়িতে স্থাপিত অন্যান্য দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয় । সন্ধি পুজোর সময় দেবীর উদ্দেশ্যে আলাদা একটি নৈবেদ্য দেওয়া হয় পরিবারের পক্ষ থেকে । মহানবমীর সন্ধ্যায় মহাদেবকে তুষ্ট করার জন্য সিদ্ধি দিয়ে তার আরাধনা করা হয় । অতি প্রাচীনকাল থেকেই পারিবারিক রীতি অনুযায়ী দেবীর উদ্দেশ্যে দিনে কোন প্রকার অন্নভোগ বা সন্ধ্যায় শীতল দেওয়ার রীতি প্রচলিত নেই । প্রতিদিন দেবীকে দুবেলা ফুল, ফল, মিষ্টান্ন ও বাড়িতে তৈরি নারকেল নাড়ু সন্দেশ ইত্যাদি দিয়ে পূজা করা হয় । তবে পরিবারের সদস্যরা তিনদিন একবেলা অর্থাৎ দুপুরে পেঁয়াজ ছাড়া মাছ দিয়ে ও নিরামিশ তরকারি দিয়ে অন্ন অর্থাৎ ভাত খান । বণিক মজুমদার পরিবারের “দুর্গাবাড়ি”-র এই পুজো প্রারম্ভিকলগ্ন থেকেই শাক্ত মত অনুযায়ী বর্তমানেও হয়ে আসছে । ফলত এই পরিবারে বলিপ্রথার রীতি এখনও বর্তমান । এই পরিবারের বলিপ্রথাতেও রয়েছে বিশেষত্ব । সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত এই পরিবারের দেবী আরাধনার সময় মোট ২১টি বলি দেওয়া হয় । তিনদিনে মোট ১৯টি ফল বলি, নবমীর দিন একটি পাঠা বলি এবং পাঠাবলির পরে উক্ত দিনেই শত্রুবলির প্রথা এখানে চালু রয়েছে । এই রীতিটি প্রারম্ভিক লগ্ন থেকেই এই পরিবারের প্রচলিত বলে জানা যায় । নবমীর দিন সকালে চাল বেটে তাকে একটি কল্পনার শত্রু আকার দিয়ে কচুপাতার উপর রেখে তার ওপরে আরেকটি কচুপাতা চাপা দেওয়া হয় । পরিবারের ও প্রতিবেশী সকল পুরুষ সদস্যরা বাম হাতে খাড়া ধরে এই কাল্পনিক বলি সম্পন্ন করেন । পারিবারিক ও সকলের মঙ্গল কামনায় শত্রু নিধনের প্রার্থনা নিবেদনের উদ্দেশ্যে এই বলি সম্পন্ন করা হয় । মহা দশমীর দিন সকালে সকল প্রকার সবজি দিয়ে ভূজ্জি দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে শেষ পূজা নিবেদন করা হয় । পূজার শেষে ঘরের কোনে একটি যাত্রার ঘট বসানো হয়। দেবীর বরণ পর্ব শুরুর আগে দশমীর দিন দুপুরে ভাত, চিংড়ি দিয়ে লাল শাক, ইলিশ মাছ, কুমড়ো ভাজা খাবার এই পরিবারে প্রচলিত রয়েছে । দ্বিপ্রাহরিক আহার শেষ হলে প্রথমে বাড়ির বয়জ্যেষ্ঠা সধবা সদস্যা ও তারপরে অন্যান্যরা দশভূজা আনন্দময়ী মাকে বরণ করেন । বরণ পর্ব শেষ হলে শুরু হয় বিদায়ী সিঁদুর খেলা । পরিবারের ও স্থানীয় নারী পুরুষ সকলেই সিঁদুরের রাঙা হয়ে ওঠেন । তারপরেই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, সেই বিদায়বেলা । কনকাঞ্জলি প্রদানের পর সকালে স্থাপিত যাত্রার ঘটে পূজা দিয়ে মায়ের নিরঞ্জন যাত্রা শুরু হয় । স্ট্র্যান্ডের কাছে রানীঘাটে এই পরিবারের প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয় । পূর্বে বাদ্যযন্ত্র সহকারে ছোট করে শোভাযাত্রা করা হলেও বর্তমানে তা বন্ধ । প্রতিমা নিরঞ্জনের পর বাড়ি ফিরে উক্ত দিন সন্ধ্যা বেলাতেই দুর্গাদালানে আয়োজিত হয় নারায়ণ পূজা ।
শুধু দশভুজার আরাধনাই নয়, বেশ কয়েক দশক পূর্ব থেকেই এই পরিবারে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা, বিশ্বকর্মা, গন্ধেশ্বরী, মা মনসা, দোলযাত্রা, কার্তিক পূজা ও কালী পূজার প্রচলন রয়েছে । তবে কালের অমোঘ নিয়মেই বিশ্বকর্মা, গন্ধেশ্বরী ও কার্তিক পূজা বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে । দূর্গাপূজার পর কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার বিশেষ তিথিতে যথেষ্ট নিষ্ঠা ও আয়োজন সহকারে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয় । আবার দোলযাত্রার আগের দিন ন্যাড়াপোড়ানোর মাধ্যমে দোলযাত্রা উৎসবের শুভ সূচনা করা হয় । দোল পূর্ণিমার দিন দোলযাত্রার বিশেষ পূজা আয়োজিত হয় এই পরিবারে । দেবী মনসা এই পরিবারে নিত্য পূজিতা হলেও শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তির দিন মা মনসার আরাধনাও বহু বছর ধরেই হয়ে আসছে এখানে । আবার বৈশাখ মাসের বিশেষ তিথিতে প্রায় ২০ বছর ধরে মা কালীর বন্দনাও এই পরিবারে চলে আসছে । দূর্গাপূজার মতো কালীপূজায় বলি প্রথার প্রচলন নেই ।
তথ্যসূত্র :
চন্দননগরের সাহেব বাগানের “দুর্গাবাড়ির” বণিক মজুমদার পরিবারের বর্তমান সদস্য বিশ্বজিৎ মজুমদার, দেবাশীষ মজুমদার, প্রসেনজিৎ মজুমদার, রনজিত মজুমদার, পুত্রবধূ পারমিতা মজুমদার ও সোমা মজুমদারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment