1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label মিঠুন মুখার্জী. Show all posts
Showing posts with label মিঠুন মুখার্জী. Show all posts

Wednesday, October 2, 2024

আমার দেশ আমার ভারত

ছবি : ইন্টারনেট

আমার দেশ আমার ভারত 

মিঠুন মুখার্জী

 "ও আমার দেশের মাটি তোমার পড়ে ঠেকাই মাথা।"

--- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই জনপ্রিয় স্বদেশপ্রেমমূলক গানের মধ্য দিয়ে বলতে পারি আমাদের দেশ ভারতবর্ষের প্রতি প্রতিটি ভারতবাসীর আছে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো দেশে জন্মগ্ৰহণ করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে ওঠে। নিজের মাতৃভূমির প্রতি দেশের প্রতি তাদের থাকে অসীম ভালোবাসা ও নিবিড় শ্রদ্ধা। দেশের জন্য সে নিজের প্রানকেও উৎসর্গ করতে পারে। তেমনি আমার রক্তের মধ্যে আমি আমার দেশের তথা ভারতবর্ষের প্রতি গভীর টান অনুভব করি। নিজের জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি যেমন আমার সব থেকে অধিক ভালোবাসা আছে, ঠিক তেমনি দেশমাতার প্রতি ভালোবাসা আমার হৃদয়ে বর্তমান।

      ভারতবর্ষের জন্ম ইতিহাস আজও অনেকেরই অজানা। কীভাবে এদেশের নাম ভারতবর্ষ হল তাও মুষ্টিমেয় ভারতবাসী বলতে পারবে। দেশমাকে নিয়ে মানুষের ভালোবাসা আছে অথচ তার সম্পর্কে কিছু জানে না-- এমন মানুষদের দেখলে সত্যিই লজ্জা লাগে। যদিও বর্তমানে অন্যদেশে জন্মে বিভিন্ন কারনে ভারতবর্ষে এসে বিদেশিরা এদেশকে নিজের মাতৃভূমি বলে দাবি করেন। ফলে এমনটি হবার।

         ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট আমার ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করেছে। তার আগে কয়েকশো বছর ধরে বিদেশীদের শাসনাধীন ছিল। তাঁর উপর চলেছে নিষ্ঠুর অমানবিক নির্যাতন। মোঘল - পাঠান - শক - হূন ও ইংরেজদের দ্বারা এই দেশ মাতা ও দেশের সন্তানেরা বারংবার হয়েছে অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত, নিপীড়িত। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অগুনিত মানুষের প্রানের বিনিময়ে আমার মাতৃভূমি ও তার সন্তানেরা স্বাধীনতা লাভ করেছে। বর্তমানে আমরা স্বাধীন হলেও সামাজিক নানান প্রতিবন্ধকতা প্রতিটি পদে পদে আমাদের পরাধীন করে রেখেছে। স্বাধীনতা পেলেও যেন আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীন নই। রাজনীতি ধর্মীয় বেড়াজাল দুর্নীতি প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের অক্টোপাসের ন্যায় জড়িয়ে রেখেছে। ক্ষমতাবানের মিথ্যার কাছে আজ আমাদের সততা ঢাকা পড়ে গেছে। তবুও আমি ভারতবাসী, ভারতবর্ষ আমার মা। সবকিছুকে সহ্য করে তাকে আমরা ভালোবাসি।

          উত্তরে হিমালয় থেকে শুরু করে দক্ষিনে কন্যাকুমারী পর্যন্ত এর পরিধি। পাহাড় - সমুদ্র - জঙ্গল- মরুভূমি সবকিছুকেই শত কষ্ট সয়ে বহন করে চলেছে ভারতমাতা। কোল, ভিল, সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডাদের আদি বাসস্থান ভারতবর্ষকে মধ্য এশিয়া থেকে এসে বাহু শক্তির বলে বলিয়ান আর্যরা দখল করেছে। তাদের আশ্রয় হয়েছে সভ্যসমাজের বাইরে পাহাড়ে ও জঙ্গলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এরাই ভারতভূমিকে নিজের মাতৃভূমি বলে দাবি করেন।

      ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য বিরাজমান। কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতি নয়, সমস্ত জাতির মানুষ এখানে বসবাস করে। হিন্দু-মুসলমান-শিখ-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলেই এখানে ভাই ভাই। তবে কিছু মানুষের জন্য মাঝে মাঝে জাতিগত সমস্যা তৈরি হয় এদেশে। বিজ্ঞান ও ধর্ম নিজ নিজ পথে সর্বদা চলেছে এদেশে। একে অপরের রাস্তায় চলার চেষ্টা করলে নানান সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

এদেশের মাটিতে যুগে যুগে এমনসব অবতারের জন্ম হয়েছে যারা তাদের কর্মের জন্য সমগ্ৰ জগতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এরা সকলেই ভারতমায়ের সন্তান। ত্রেতা যুগে শ্রীরাম, দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ, কলিতে চৈতন্য মহাপ্রভু সকলেই ভারতমায়ের বুকে জন্মগ্ৰহন করেছেন। সকলেই বিষ্ণুর অবতার। দুষ্টের দমন আর সৃষ্টের পালন করতে যুগে যুগে ভারতমায়ের কোলে তার আবির্ভাব ঘটেছে। এছাড়া মহাপুরুষের সংখ্যা অগনিত। এরা মানুষ হয়ে জন্মে কর্মের দ্বারা দেবতুল্য হয়ে উঠেছেন। কথায় বলে যেই জীব সেই শিব। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইত্যাদি সকলেই সমাজের ও মানুষের মঙ্গলে কাজ করে গেছেন। ভারতমায়ের মুখ সর্বদা উজ্জ্বল করেছেন।

আমার ভারতমাতার উপর অতীতে চলেছে অকথ্য অত্যাচার। বিদেশি শক্তি কয়েকশ বছর ধরে ভারতমাতার ও তার সন্তানদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে। মুঘল,পাঠান, শক, হুন, ইংরেজ আরো অনেক বিদেশী শক্তি এদেশে শাসন চালিয়েছ। অনেক রক্তপাত ঘটেছে ভারতমাতার বুকে। দীর্ঘ দিনের অপেক্ষা ও জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। বীর বিপ্লবীরা ভারতমায়ের সম্মান রক্ষার্থে নিজেদের জীবন বলিদান দিয়েছেন। বিনয়-বাদল-দীনেশ, মাস্টার দা সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম বসু, ভগৎ সিং, রাজগুরুর মতো ভারতমায়ের সন্তানদের আত্মবলিদানের কথা কখনো ভোলার নয়। দেশমাকে স্বাধীন করার পিছনে যার অবদান সবার আগে স্বীকার করতে হয় তিনি হলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। তবে দুঃখের বিষয় রাজনৈতিক নেতাদের চক্রান্তের শিকার হন তিনি। স্বাধীন ভারতে সকলের সম্মুখে স্বাধীনভাবে থাকতে পারেন নি তিনি। অন্তরালে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে তাকে। অথচ ঠগ প্রবঞ্চকরা নিজেদের স্বার্থে দেশটাকে দুটুকরো করে ভারতমায়ের হৃদয়ে চিরক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তারাই হয়েছেন দেশনায়ক, এক একজন বড় নেতা। তবে ভারতমাতাকে স্বাধীন করতে কেবল পুরুষেরা নন নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মাতঙ্গিনী হাজরা থেকে শুরু করে গান্ধী বুড়ি, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো নারীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে অনেক লড়াই করেছিলেন। অসংখ্য নারীদের প্রান দিতে হয়েছে এই দেশমাকে স্বাধীন করার জন্য। ১৮৫৭ সালে ঝাঁসির রানী লক্ষীবাঈও ইংরেজদের বিরুদ্ধে কম লড়াই দেন নি। নারী - পুরুষের দীর্ঘ ত্যাগের জন্য এই অসম্ভব কাজকে সম্ভব করা গিয়েছিল।

      ভারতবর্ষ এমন একটি দেশ যেখানে রচিত হয়েছে রামায়ণ - মহাভারতের মতো বৃহৎ মহাকাব্য। এছাড়া শ্রীমদ্ভগবদগীতার মতো গ্ৰন্থ। যে গ্ৰন্থে সমগ্ৰ ভারতবাসীর আত্মদর্শন ধরা পড়েছে। মানবজীবনে কি প্রয়োজন আর কি প্রয়োজন নেই , এককথায় মানবজীবন সার্থক করে তোলার মহামন্ত্র আছে এই মহামূল্যবান গ্ৰন্থে। শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনকে আত্ম দর্শন করানোর জন্য ও নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য যে বানী বর্ষণ করেছিলেন তাই-ই শ্রীমদ্ভগবদগীতা। ভারতবর্ষের অমূল্য সম্পদ। এই রকম জীবন পরিবর্তনের গ্ৰন্থ সমগ্ৰ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।

   ভারতবর্ষে জন্মেছে একদল বীরাঙ্গনা নারী, যারা ভারতমায়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে দেশে - দেশান্তরে। শকুন্তলা থেকে শুরু করে দ্রৌপদী, কৈকেয়ী, জনা, ঝাঁসির রানী লক্ষীবাঈয়ের মতো নারীরা অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করেন নি, সে অন্যায় অন্যে করুক আর প্রিয়জন। পুরুষশাসিত সমাজে আজ পিছিয়ে পড়া নারীরা পুরুষকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। আজ নারী মহাকাশে যাচ্ছে, প্লেন চালাচ্ছে, বিভিন্ন গবেষণায় প্রধানের ভূমিকা পালন করছে। আজ নারী করছে না এমন কিছুই নেই। ভারতমায়ের গর্ব আজ নারীরা। এখন সমাজ একটি নারী সন্তানের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে।

       'গুরু কৃপা হি কেবলম' । গুরুর কৃপা না থাকলে আমরা সঠিক মার্গ দর্শন করতে পারিনা। গুরু হলেন মানুষের পথপ্রদর্শক। যিনি অন্ধকার থেকে আলোর পথে শিষ্যকে নিয়ে যান তিনিই প্রকৃত গুরু। যুগে যুগে ভারতমায়ের কোলে এমন সব গুরুর ও ঋষি - মুনির জন্ম হয়েছে যারা ভারতমায়ের সন্তানদের সঠিক পথে নিয়ে গিয়েছেন। ঋষি দুর্বাসা, ঋষি কর্ণ, ঋষি বিশ্বামিত্র, ঋষি ভিগু, প্রনবানন্দ মহারাজ, অনুকূল ঠাকুরের মতো অসংখ্য গুরু ও ঋষি - মুনির আবির্ভাব ঘটেছে ভারতবর্ষে যারা তাদের সাধনার দ্বারা ঈশ্বরের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করেছেন। তাদের দেখানো পথে চলে আপামর ভারতবাসীর কল্যানসাধন হয়েছে।

            ভারতবর্ষ সেই পুন্যভূমি যেখানে বিষ্ণু অবতার গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটেছিল। এই অবতারের দেখানো পথ অনুসরণ করে বৌদ্ধ ধর্ম ভারত ও ভারতের বাইরের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষকে সঠিক পথে চলার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। একদা ভারতবর্ষের বুকে নালন্দা, বিক্রমশীলা ও তক্ষশীলার মতো বৌদ্ধ মহাবিহার নির্মান করা হয়েছে। যেখানে দেশে-বিদেশের বহু মানুষ শিক্ষা গ্ৰহনের জন্য আসতেন। এখানে শিক্ষা গ্ৰহনের জন্য কোনো অর্থ প্রদান করতে হত না। তৎকালীন ভারতবর্ষের বিখ্যাত ব্যক্তিরা এই সমস্ত মহাবিহার থেকে শিক্ষা গ্ৰহন করে ভারতবর্ষের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আজও ইতিহাস এর সাক্ষ্য বহন করছে।

     ভারতবর্ষের উপর দিয়ে বয়ে গেছে পবিত্র নদী গঙ্গা । যার পবিত্র জলে মানুষের সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়। হিমালয়ের গঙ্গোত্রী নামক হিমবাহের গোমুখ গহ্বর থেকে এই নদীর উৎপত্তি। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এই গঙ্গার বাস দেবাদিদেব মহাদেবের জটায়। সাগর রাজার ষাট হাজার পুত্রের প্রান ফিরিয়ে আনার জন্য প্রপুত্র ভগীরথ মহাদেবের জটা থেকে গঙ্গাকে মর্ত্যে এনেছিলেন। গঙ্গাকে দেবী হিসাবে হিন্দুরা মানেন। সেই সৃষ্টির থেকে এখনো এই পবিত্র নদী বয়ে চলেছে এবং তার স্পর্শে সকলের পাপ মোচন করে পুন্যের ভান্ডার পূর্ণ করছেন তিনি।

      ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিস্ময়কর। ভারতের ভূস্বর্গ কাশ্মীরে একবার গেলে মনে হয় যেন পুরো জীবনটাই সেখানে থেকে যাই। কাশ্মীরের ডাল লেক, শ্রীনগর, জম্মু, বৈষ্ণদেবীর মন্দির, অমরনাথ দেখার মতো জায়গা। ভারতবাসী ও ভারতের বাইরের মানুষদের কাছে সত্যিই এটি স্বর্গ। ভারতমায়ের এই অসাধারণ সৌন্দর্যের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এছাড়া হিমাচলপ্রদেশের সিমলা,কুলু, মানালি, ধর্মশালা; সিকিমের গ্যাংটক ,সাংগু লেক; বঙ্গোপসাগর ,আরব সাগর, হরিদ্বার, ঋষিকেশ, মুসৌরি, কেদারনাথ - বদ্রিনাথ, হরিয়ানার গুরগাঁও আরও শতসহস্র অপূর্ব সুন্দর জায়গা এই ভারতভূমির অন্তর্ভুক্ত, যা প্রতিটি ভারতবাসীর ও বিদেশীর মনকে আকৃষ্ট করে। প্রকৃত স্বর্গভূমি এখানেই অবস্থিত।

        ভারতবর্ষ এমন এক পবিত্রভূমি যেখানে সতী দেবীর দেহের একান্ন খন্ডের বেশিরভাগ পড়েছিল। সেই জায়গা গুলোতে সতীপীঠ গড়ে উঠেছে। দেবীর আশীর্বাদধন্য এই পবিত্র ভূমি এ থেকে তা জানা যায়। সীতা, শ্রীরাধারানী, সাবিত্রী, বেহুলা, মীরার মতো নারীদের যে দেশে জন্ম সেই ভারতমাতা তার এই সন্তানদের জন্য গর্বিত। বতর্মানে  নারীরা হয়তো অনেক উন্নত হয়েছে,  কিন্তু এই সকল নারীদের ধারে কাছে পৌঁছতে পারবে না। ভারতমাতার আরও কিছু নারীদের কথা বলতে হয়, যারা বছরের পর বছর নিজেদের প্রতিভায় দেশে - বিদেশে দেশমায়ের নাম উজ্জ্বল করেছেন। লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আশা ভোঁসলে, পি টি ঊষা, কল্পনা চাউলা, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা দত্ত প্রভৃতি।

     পরিশেষে বলা যায় ভারতবর্ষে জন্মে প্রতিটি ভারতবাসী গর্ব অনুভব করেন। এই দেশ পৃথিবীর  জনবহুল দেশ হলেও জনগনই এর শক্তি। দিনে দিনে যেভাবে ভারতবর্ষ সবদিক থেকে উন্নতি করছে তাতে একদিন জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেবে। প্রচীন কাল থেকে বতর্মান কাল পর্যন্ত অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ আজকে উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। কি অর্থনীতি, কি সামরিক বাহিনী , কি সংস্কৃতি,  কি ঐতিহ্যে প্রথম বিশ্বের যে - কোনো দেশকে বর্তমানে ভারতবর্ষ মোকাবিলা করতে পারে। পৃথিবীতে এমন অনেক বড় বড় দেশ আছে যারা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও যুদ্ধ-মহামারির সমস্যায় ভারতের সহযোগিতা প্রার্থনা করে। ভারতবর্ষও উদারচিত্তে তাদের সহযোগিতা করে আসছে।  ভারত ভূমি সম্পর্কে বলা যায় ----

"ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো

তোমাতে আমরা লভিয়া জন্ম, ধন্য হয়েছি ধন্য গো।"

...(সমাপ্ত)...


Saturday, October 21, 2023

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো

ছবি : ইন্টারনেট

 বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো 

মিঠুন মুখার্জী 

গৌরচন্দ্রিকা : বাঙালির বারোমাসে তেরো পার্বণ। যে কোন একটা অনুষ্ঠান হলেই বাঙালিরা আনন্দ না করে পারে না। এক কথায় আনন্দ প্রিয় বাঙালি। সামাজিক-পারিবারিক-আন্তর্জাতিক-ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে তারা আপন করে পালন করে। সারা বছর তারা আনন্দে- হৈ হুল্লোড়ে-নাচানাচি করে কাটাতে চায়। বিভিন্ন পুজো থেকে শুরু করে স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, নেতাজি জন্ম জয়ন্তী, বিবাহ, জন্মদিন, অন্নপ্রাশন, দোল, ক্রিসমাস, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, আরো অনেক উৎসব আছে যা বাঙালিরা হৃদয় দিয়ে পালন করে থাকে। তবে সকল উৎসবের মধ্যে শ্রেষ্ঠ উৎসব হলো দুর্গাপুজো। আপামর সমস্ত বাঙালিরা এই উৎসবটি মহাজাকজমকের সঙ্গে আয়োজন করে থাকে। শুধু বাংলায় নয়, বাংলার বাইরে দেশে-বিদেশের প্রবাসী বাঙালিরাও সমস্ত ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও এই উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির আর কোনো মহোৎসব এতদিন ধরে অনুষ্ঠিত হয় না। পঞ্চমী থেকেই পুজোর সূত্রপাত হয়ে যায়। ষষ্ঠী-সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী ও দশমীর এই ছয় দিন বাঙালিদের কাছে সবথেকে বেশি আনন্দের দিন। আবালবৃদ্ধবনিতারা এই উৎসবে শামিল হয়। মূলত মহালয়া থেকেই দেবীপক্ষের সূচনা হয়ে যায়।

দুর্গাপুজোর কেনাকাটা : এই মহোৎসবে শ্রেণীগত কোন ভেদাভেদ থাকে না। ধনী-দরিদ্র-মধ্যবিত্ত যার যেরকম ক্ষমতা প্রত্যেকেই বাড়ির সকলের জন্য এই সময় জামাকাপড় কিনে থাকেন। ছেলেদের জন্য জিন্সের প্যান্ট, গেঞ্জি, জামা, দামি সু, বেল্ট ; আর মেয়েদের জন্য সালোয়ার, শাড়ি, জুতো, সাজার মেকাপ, আরো অনেক দামি দামি দ্রব্য। এছাড়াও আত্মীয়দের মধ্যেও জামা-কাপড় দেওয়ার চল আছে। এই সময় বাজারের সবকিছুর দাম অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। একশ্রেণীর ব্যবসায়ীদের সারা বছরের রোজগার পুজোর আগের তিন মাসে উঠে আসে। সব জেনে শুনে কেনাকাটা করা ছাড়া মানুষের উপায় থাকে না।

দুর্গাপুজোর আনন্দ : আনন্দ প্রিয় বাঙালিরা সবসময় আনন্দ করতে ভালবাসে। পুজোর দিনগুলি তাদের কাছে এত তাড়াতাড়ি চলে যায় যে, অনেকেই মনে মনে ভাবেন-- 'সাধ মিটিলো না। আরো কিছুদিন যদি দুর্গা পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে পারতাম, তবে খুবই ভালো হতো।' মহালয়া থেকেই সকলের মনের মধ্যে একটা পুজো পুজো ব্যাপার চলে আসে। মনটা আনন্দে ভরে ওঠে সকলের। সারা বছর আপামর বাঙালিরা এই দিন গুলির জন্য অপেক্ষা করে থাকে। ছোট থেকে বয়স্ক পর্যন্ত সকলেই এই উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে। মাঠে মাঠে কাঁশফুল শরৎকালে মা দুর্গার আগমন বার্তা নিয়ে আসে। এই কাঁশফুলও বাঙালির মনে আনন্দ এনে দেয়।

       কলকাতা সহ বড় বড় মফস্বল এলাকায় যেখানে বড় বড় পূজো হয়, সেখানে চতুর্থি - পঞ্চমীর দিন থেকেই মানুষের ঢল নামে। শুধু রাত্রিবেলা নয়, দিনের বেলাতেও পুজোর প্যান্ডেল ও প্রতিমা দর্শন করে আনন্দ উপভোগ করে তারা। তবে আনন্দ উপভোগের বিষয়টা এক একজনের কাছে এক এক রকম। কেউ ঠাকুর ও প্যান্ডেল দেখে আনন্দ পায়, কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে লোক দেখে আনন্দ পায়, কেউবা কোন একটা মন্ডপে গিয়ে ওই কদিন বসে থেকে আনন্দ উপভোগ করে, আবার কেউ বাড়িতে থেকেই আনন্দ পায়।

দুর্গাপুজোর খাওয়া- দাওয়া : বাঙালিরা ভোজন প্রিয় । অনুষ্ঠান হবে আর খাওয়া-দাওয়া হবে না, এটা হতেই পারে না। বাঙালির কাছে সমস্ত উৎসবের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার বিষয়টাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুজোর কদিন বেশিরভাগ বাঙালি রাতের খাওয়াটা বাইরে থেকেই সেরে আসে। খাওয়ার তালিকায় থাকে--- ফুচকা, চাউমিন, মোগলাই, বিরিয়ানি, চিকেন, মাটন, মিক্স রাইস, রুমালি রুটি, তরকা আরো অনেক ধরনের ফাস্টফুড। সঙ্গে থাকে আইসক্রিম ও নরম পানীও ইত্যাদি। প্রতিদিনই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ অনুভব করে তারা। তাছাড়া অষ্টমীর দিন বাঙালিদের বাড়িতে লুচি - ছোলার ডাল - আলুর দম - ফুলকপির তরকারি - চাটনির ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। নবমীর দিন ঘরে ঘরে মটন ও চিকেন রান্না হয়। কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া দাওয়া হয় সেইদিন।

দুর্গাপুজোর ঘোরাঘুরি : বাঙালিদের পুজোর কটা দিন কোন বাঁধনই আটকে রাখতে পারে না। কেউ দুপুরের পর পরিবার নিয়ে ফাঁকায় ফাঁকায় ঠাকুর দেখে, আবার কেউ সন্ধ্যা ও রাত্রির ভিড়ের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখে। কেউ নিজের এলাকায় ঠাকুর দেখে কলকাতায় বড় বড় প্যান্ডেল ও প্রতিমা দেখতে যায়। সারারাত ধরে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখে ভোরবেলা ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে। কষ্ট হলেও এই কদিন ঠাকুর দেখার আনন্দ কেউই মিস করতে চায় না।

দুর্গা পুজোর দিনগুলি : পঞ্চমীর দিন বেলতলার পুজো হয়। বিকেল বেলা প্রতিমা মন্ডপে প্রবেশ করানো হয়। তারপর ষষ্ঠীর দিন থেকে দেবী দুর্গা ও তার সঙ্গে আসা লক্ষী - সরস্বতী - গনেশ - কার্তিক প্রভৃতি দেব-দেবীদের পুজো করা হয়। তাছাড়াও কলাবউ ও মহাদেবের পুজোও হয়। অষ্টমীর দিন সকালবেলা পুজো হওয়ার পর আবালবৃদ্ধবনিতারা মায়ের কাছে অঞ্জলী দেন। পুজোর দিনগুলির মধ্যে এই দিনটিই বাঙালিদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের দিন। নবমীর দিন আসলেই বাঙালির মনটি ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কারণ নবমী নিশি পেরিয়ে গেলেই পিতৃগৃহ থেকে মা দুর্গার স্বামীগৃহে চলে যাওয়ার সময় চলে আসে। আবার একটা বছর বাঙালিদের অপেক্ষা করতে হয় মার ঘরে ফেরার। সকলের মনটা দুঃখে ভরে ওঠে। বাঙালির মনটা বলে ওঠে-- "ওহে নবমী নিশি না হইওরে অবসান।'' মন্ডপে মন্ডপে এই পাঁচ- ছয় দিন ঢাক - কাঁসর - ঘন্টা ও শঙ্খের ধ্বনিতে অপূর্ব একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মণ্ডপের ও লাইটিং-এর রেষারেষি হয় পুজো কমিটিগুলির মধ্যে।

দুর্গা পুজোর দিনগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান : বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবে সবকিছুই হবে আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে না--- এটা অসম্ভব। বড় বড় পুজোগুলিতে চতুর্থি থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত উদ্বোধন করতে নামিদামি শিল্পীদের আগমন ঘটে। তাদের দিয়ে ফিতে কেটে যেমন সেই বছরের পুজোর উদ্বোধন করা হয়, তেমনি নাচ-গান ও বিভিন্ন যন্ত্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজো আরো মহিমাময় হয়ে ওঠে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর দিনগুলিতে অনেক পুজো কমিটি বিভিন্ন সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। কলকাতার বড় বড় পুজোয় যেমন বোম্বে থেকে নামিদামি তারকারা আসেন, তেমনি দিল্লি-ব্যাঙ্গালোর- মুম্বাইয়ের প্রবাসী বাঙালিদের পুজোতেও  বাংলা থেকে বড় বড় শিল্পীরা গান-বাজনা করার জন্য যান। এক কথায় গান ও নাচ পাগল বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একটা গুরুত্ব আছে। তাছাড়া মাইক ও বক্সে বিভিন্ন শিল্পীর বিভিন্ন ধরনের গান বাজে পুজোর মন্ডপে মন্ডপে। যা শুনলে মনের মধ্যে একটা পুজো পুজো ভাব আসে।

দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জন : নবমী নিশি পার হয়ে দশমী পড়তেই বাঙালিদের  চোখে জল দেখা যায়।  এই দিনটি মা দুর্গার বিদায়ের দিন। মন চায় না মাকে বাপের বাড়ি থেকে স্বামী গৃহে যেতে দিতে ,কিন্তু যেতে যে দিতেই হবে। যতই আমরা বলি যেতে নাহি দিব। দশমীর দিনেই বেশিরভাগ প্রতিমা নিরঞ্জন দেওয়া হয়। বারোয়ারী পুজো গুলোর প্রতিমাকে বরণ করে দশমীর দিন নদীতে নিয়ে যাওয়া হয়। বড় বড় ক্লাবের দুর্গা প্রতিমাগুলি দশমীর পরও আরো দুই-তিন দিন রেখে দেওয়া হয়। তারপর নদীতে কিংবা পুকুরে বিসর্জন দেয়। পচেশন করে বাঙালিরা নাচতে নাচতে খুব আনন্দের সহিত প্রতিমা নিরঞ্জন করে। এই দৃশ্য দেখার জন্য রাস্তার দুই পাশ দিয়ে অসংখ্য বাঙালিরা দাঁড়িয়ে যায়। তারা মা দুর্গার বিগ্ৰহকে প্রণাম করেন এবং মায়ের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।

শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় বাঙালির দুর্গা পুজো শুধু বাঙালিদের কাছেই নয়, বাঙলার বুকে থাকা সমস্ত জাতির মানুষের কাছে শ্রেষ্ঠ উৎসব। তারা নিজেদের মধ্যে উচ্চ-নীচ,ধনী-দরিদ্র ও জাতিগত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এই মহোৎসবে জনস্রোতে মিশে যায়। সকলের মন থেকে একটা কথাই ধ্বনিত হয়---" আসছে বছর আবার হবে। মা তুমি আবার এসো।"

...(সমাপ্ত)...

Monday, July 24, 2023

একটু শান্তির খোঁজে

একটু শান্তির খোঁজে 

মিঠুন মুখার্জী 


                 সমগ্র আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। পেঁজা তুলোর মতো কালো মেঘ আকাশের এক দিক থেকে অন্যদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে। সুযোগ পেলেই মেঘের ঘর্ষণে বিদ্যুতের আলো সমস্ত পৃথিবীকে উজ্জ্বল করে তুলছে। ঘন ঘন বজ্রপাত হচ্ছে। এমন প্রলয়ময় পরিবেশে মা দেবকীর গর্ভে বিশ্বময় অধর্ম নাশে এবং ধর্মের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন বসুদেব নন্দন বাসুদেব। তাঁর আবির্ভাবে জগৎময় প্রেম ও ভক্তি রসের জাগরণ ঘটেছিল। বন্ধ কারাগার থেকে মায়া শক্তির বলে বাসুদেবের আশ্রয় হয়েছিল মা যশোদার ঘরে। কংস বধের পূর্ব ইঙ্গিত মতো দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের আবির্ভাবের খবর মা মহামায়া কংসকে জানিয়ে দেন। তারপর কি হয়েছিল দাদু। বলো না, বলো না আমাদের। আমার কাছে ছোট্ট বলাই জিজ্ঞাসা করেছিলো। আমি ওদের শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের কাহিনীটা শোনাচ্ছিলাম। আমার বয়স এখন তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। আমি আবার ওদের শ্রী কৃষ্ণের বৃন্দাবনে বেড়ে ওঠার কাহিনী শোনালাম। তারপর দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে এলো। গল্প বলা সেদিনকার মতো শেষ করে বলাইদের বললাম -- "তোর আবার কালকে বিকেলে আসিস। এরপর কি হয়েছিল তোদের শোনাবো।" আমার কথা মত যে যার বাড়ির পথে যাত্রা করে।

                বলাই আমার পাশের বাড়ির এক অনাথ শিশু। দাদু নিরঞ্জনের কাছে ছোট থেকেই মানুষ। আমার বাল্যবন্ধু। দুজনে একসঙ্গে বড় হয়েছি, পড়াশোনা করেছি, এমনকি এক গাঁয়ের মেয়েও  বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের বিরম্বনায় দুজনেই আজ পত্নীহীন। আমার এক মেয়ে, বিয়ে দিয়েছি দূর দেশে। বছরে দুই একবার আসে। পেনশনের টাকায় কোনমতে সংসার চলে। নিজে দুটো রান্না করে নি কষ্ট করে। যেদিন পারিনা, সেদিন পাশের বাড়ির নিমাইয়ের বউ ভাত দিয়ে যায়। নিরঞ্জনের ছোট মেয়ের বিয়ে হয়নি, যে কারণে আমার মতো সমস্যায় পড়তে হয় না ওকে। সংসারের সব কিছুই ওই পুটিই সামলায়।

              প্রচণ্ড গরমে রাতে ভালো করে ঘুম হলো না। সারারাত হাতপাখা নাড়তে নাড়তে হাতের ডানা দুটি একেবারে ব্যথা হয়ে গেছে। ভোর রাতে হঠাৎই আকাশ প্রচন্ড মেঘলা করে বিদ্যুৎ চমকানো সহ মুষলধারায় বৃষ্টি নামল। তখন ভোর পাঁচটা। আমার ঘুম আর হলো না। আমি বৃষ্টি দেখতে খুব ভালোবাসি। বর্ষা ঋতু আমার  ও রাধার খুব ভালো লাগতো। রাধার বিয়ে হওয়ার পর আমি একেবারে একাকীত্ব অনুভব করি। তাই বিকেল বেলা পাড়ার ছোট ছোট নাতি-নাতনিগুলো এলে আমার একাকীত্ব দূর হয়ে যায়। এখন ওরাই আমার আনন্দেরদূত। জানালার কাছে বসে বসে বৃষ্টি দেখছিলাম আর প্রকৃতির অপরূপ শোভাকে উপভোগ করছিলাম‌। এরকম বৃষ্টি হলে আমার মানসপটে ভেসে ওঠে ময়ূরের পেখম মেলে বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য, শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে অভিসারিকা রাধার দেখা করতে যাওয়ার সেই বর্ষা অভিসারের দৃশ্য‌। আর মনে পড়তো রাধার মার কথা। সেও বৃষ্টি ভারি পছন্দ করত। বৃষ্টিতে ভিজত আর চিৎকার করে বলতো-- " আমার ভারী ভালোলাগে বৃষ্টিতে ভিজতে। তুমি এসো, দেখবে তোমারও খুব ভালো লাগবে। অসহ্য গরমের ক্লান্তি একেবারে ভুলে যাবে।" কিন্তু সেই বৃষ্টিতে ভিজেই ওকে চলে যেতে হবে আমি এখনও ভাবতে পারিনা। নিউমোনিয়ায় মারা যায় রাধার মা সুন্দরী বউ‌।

           টানা  দুঘন্টা মুষলধারায় বৃষ্টি হওয়ার পর বৃষ্টি একেবারে থেমে যায়। আকাশে তখনও মেঘ ছিল। পরে আবার বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে যাবো বলে বেরিয়ে দেখি রাস্তাঘাট কাদায় কাদা। কিছু কিছু জায়গায় জল দাঁড়িয়ে গেছে। বাজারে যাওয়ার সময় দেখি, পাড়ার ছেলেরা মাঠে ফুটবল খেলছে। ছোট্ট বলাই মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে। আমাকে দেখে দৌড়ে চলে আসে। জিজ্ঞাসা করে-- 'দাদু বাজারে যাচ্ছ?' আমি বলি-- "হ্যাঁ রে। বিকেলে আসিস কিন্তু।" বলাই মাথা নেড়ে আবার মাঠে গিয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে লাগলো ‌।

         বাজার থেকে ফিরে এসে নিজের মত হাঁড়িতে চাল ও আলু চড়িয়ে দিয়ে 'শ্রীমদ্ভাগবতগীতা' খুলে একাদশ অধ্যায় "বিশ্বরূপ দর্শন যোগ" পাঠ করছি -- অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণের দিব্যদৃষ্টিদান ও বিশ্বরূপ দর্শন এবং ভক্তি রসের সঞ্চার সম্পূর্ণ কয়েকটি শ্লোক পাঠ করে নিয়ে ভাত নামিয়ে রাখি। তারপর এগারো নম্বর অধ্যায়টি শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে দুপুরের খাবার খেতে বসি। খাওয়া শেষ করে একটু বিশ্রামের জন্য খাটে গিয়ে বসি। বাজার থেকে ফেরার পরপরই পুনরায় টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছিল। যখন দুপুরবেলা একটু বিশ্রাম নিতে যাচ্ছি তখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ায় কখন যে খাটে শরীর ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেই তা জানি না।

ঘুমের জগতে রাধার মাকে দেখলাম, যে একটা আম বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে হাসছে আর আমাকে দেখে  বলছে -- " ও রাধার বাবা, তোমার জন্য বহুদিন ধরে অপেক্ষা করে আছি। কই, তুমি তো এখনো এলেনা। জন্ম-জন্মান্তরে একসঙ্গে থাকার কথা দিয়েছিলে। তোমার মনে নেই !!" তারপর দেখলাম যমরাজ এসে জোর করে সুন্দরীর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে যেতে চাইছে না। যমরাজকে শুধু বলছে-- " জন্ম-জন্মান্তরে ও একসাথে থাকার কথা দিয়েছিল আমাকে।" সুন্দরীর কথার প্রত্যুত্তরে যমরাজ জানান--- "এখনো সময় হয়নি ওর। সময় হলে ওকেও নিয়ে আসব।" তারপর দেখলাম, একটা চাবুক মারতে মারতে সুন্দরীকে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল‌। আমি চমকে উঠে দেখি সমস্ত গা বেয়ে ভয়েতে দরদর করে ঘাম ঝরছে। বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে। সুন্দরীকে স্বপ্নে দেখে আমার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। ভাবলাম, আজকে আর বাচ্চাদের কিছু বলবো না। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের দয়ায় তা পারলাম না।

বিকেল পাঁচটার সময় বলাই, রতন, রিমি, আরাধ্যা, পাখি আরো অনেক শিশুরা গল্প শুনতে এলো বৃষ্টি মাথায় করে। ওদের ফিরিয়ে দিতে মন চাইল না। সেদিন বালক কৃষ্ণের কালিয়া দমন কাহিনী শোনালাম শিশুদের। বালক কানাই তাঁর বন্ধুদের নিয়ে মাঠে খেলা করছিলেন। খেলতে খেলতে বল নদীতে পড়ে যায়। সকলে যখন আফসোস করছিল যে, আজকে আর তারা খেলতে পারবেনা, তখন  কানাই জলের মধ্যে ডুব দিলেন। বলের খোঁজে একেবারে নদীর নিচে গিয়ে দেখেন, সেখানে কালিয়া নামের পাঁচ মাথা বিশিষ্ট একটি সাপের রাজ্য। সে কৃষ্ণকে বল দিতে চাইল না। বালক কানাইয়ের সাথে এরপর প্রচন্ড লড়াই হল কালিয়ার। অবশেষে কালিয়া পরাজয় স্বীকার করলেন এবং তার পঞ্চ ফনার উপর নৃত্য করতে করতে বালক কানাই জল থেকে উঠে এলেন। পাঁচ মাথা বিশিষ্ট কালিয়া নাগ-এর কথা শুনে সকলে ভয়ে শিউরে উঠলো। আরাধ্যা ও পাখি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল -- "দাদু কানাইয়ের সাথে কালিয়া পারল না কেন? ওর কী প্রচণ্ড শক্তি?" বলাই বলল -- " দাদু, কালিয়ার বিষ ছিল না ?" ওদের প্রত্যেকের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে দিতে সন্ধ্যা গড়িয়ে এলো। তুলশী তলায় ও ঘরে লক্ষীর বেদীতে প্রদীপ দেখাতে হবে তাই ওদের সেই দিনের মত ছুটি দিয়ে দিলাম। শিশুদের কৌতুহলী মনের প্রশ্ন আমার খুব ভালো লাগতো। তাই আমি রাগ না করে সহজ-সরল ভাবে উত্তর দিতাম।

অকালে রাধার মা চলে যাবার পর থেকে আমি একেবারে একা। রাধা ছেলে-মেয়েদের সামলে অতদুর থেকে আসতে পারে না। একটু শান্তি পাওয়ার জন্য মনের মধ্যে জমে থাকা মেঘ কারো সামনে প্রকাশ করি না। একা একা সেই মেঘ বৃষ্টি হয়ে দুচোখ থেকে ঝরে পড়ে একান্ত নিভৃতে। আজ সন্ধ্যা প্রদীপ ধরিয়ে কোনমতে কৃষ্ণ নাম করে ঘরে আসি। শরীরটা খুব একটা ভালো লাগে না। প্রিয়জনদের কথা চিন্তা করে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। জগতে আমরা সকলেই দুঃখকে চেপে রেখে সুখের অনুসন্ধান করে চলেছি। শিশুদের সংস্পর্শ আমি তাই করে চলেছি। আনন্দ পাই তাদের নিষ্পাপ সংস্পর্শে‌। তবে মনের মধ্যে জমে থাকা দুঃখ-কষ্টের কথা প্রকাশ করার লোকের খুবই অভাব।

দীর্ঘদিন নিরঞ্জন আমার বাড়ির ছায়া মাড়ায় নি। কিন্তু সেদিন রাতে হঠাৎ নিরঞ্জনের আগমন আমাকে অবাক করেছিল। নিরঞ্জনের চোখে জল দেখে আমিও কেঁদে ফেলেছিলাম। নিরাঞ্জন আমার কাছে চোখের জল নিয়ে এসে বলেছিল -- " গোবিন্দ তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস বন্ধু। সত্যি সত্যি আমি এতদিন ধরে তোকে ভুল বুঝেছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছি বিরাজ বৌ-এর মৃত্যুর জন্য তুই দায়ী নস, দায়ী আমার কপাল। তার নিয়তি তার মৃত্যুর কারণ।" নিরঞ্জনের এই কথা শোনার পর আমি জড়িয়ে ধরেছিলাম তাকে। কান্নায় দুজনে ভেসে গিয়েছিলাম।

সেদিনটি ছিল পয়লা বৈশাখ‌। আমি গ্রামের হাটে বাজার করতে গিয়েছিলাম। বিরাজ বৌও সেদিন বাজারে গিয়েছিল। বাজার সেরে গ্রামে ফেরার সময় দুজন একসাথে ফিরছিলাম। হঠাৎ প্রবল বেগে ঝড়-বৃষ্টি নামে। দুজনেই ভিজে ভিজে বাড়ি ফিরেছিলাম। বাড়ি ফিরে কলের জলে স্নান করে নিলে জ্বর আসবে না -- এই কথা আমি বিরাজ বৌকে বলেছিলাম। কিন্তু পরদিন থেকে জ্বরে পড়েছিল বিরাজ বৌ। নিউমোনিয়ায় সেও অকালে সুন্দরী বৌয়ের মতো চলে যায়। নিরঞ্জন সেই থেকে আমাকে ভুল বুঝেছিল যে, আমার বলাতেই বিরাজবৌ সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ী ফিরে ছিল। যার পরিনতি তার মৃত্যু। আজ সময়ের সাথে সাথে সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। তাই নিজের বাল্যবন্ধু, প্রাণপ্রিয় বন্ধুর কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছে। নিজেদের ভুল বোঝাবুঝি দূর হওয়ার পর সেদিন রাত্রে আমরা দুই বন্ধু প্রায় দু-ঘন্টা ধরে নিজেদের অতীতে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা স্মৃতি রোমন্থন করি।

রাত্রি দশটা নাগাদ নিরঞ্জন বাড়ি চলে গেলে আমার ভিতরটা অনেকটা হালকা হালকা বোধ হয়। এতদিনের একটা ভুল-বোঝাবুঝি ঘুচে যাওয়ায় কিছুটা শান্তি আমি পেয়েছিলাম। বাসুদেব শ্রী কৃষ্ণের কাছে বলেছিলাম -- " হে প্রভু জীবনের শেষ কয়েকটা বছর যেন এভাবেই আমি কাটিয়ে দিতে পারি-- আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন। মানবজীবন বড় দুঃখের। এ জীবনে শান্তির বড়ই অভাব। আমরা সকলেই অর্থের জন্য দৌড়ে চলেছি। প্রকৃত শান্তি কারো ঘরে নেই। ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে উঠেছে। নিজের মানুষরাই নিজেদেরকে দেখে না। এ বড় দুঃখের বিষয়। একটু শান্তির খোঁজে আমরা সকলেই।  কিন্তু শান্তি কোথায়?"

...(সমাপ্ত)...

Saturday, April 15, 2023

ফেলে আসা দিন

ছবি : ইন্টারনেট

ফেলে আসা দিন 

মিঠুন মুখার্জী 

নবমীর দিন রাত দশটা। মোটরসাইকেল নিয়ে সন্দীপ ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে। সঙ্গে জায়া সন্দীপ্তা ও একমাত্র মেয়ে আরাধ্যা। প্রচন্ড ভিড়ের কারণে রাত করে বেরোনো। ভিড় অনেকটাই কম। সুন্দর সুন্দর মণ্ডপ ও বিগ্রহ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় সকলের। আরাধ্যা ফুচকা খাওয়ার বায়না জুড়ে দেয়। ফুচকা খাওয়াতে গিয়ে সন্দীপের দেখা হয় নবনীতার সঙ্গে। সঙ্গে তার স্বামী ও ননদ। নবনীতা তাকে দেখে অচেনার ভাব করে। মুহূর্তে সন্দীপের মানসপটে ভেসে উঠেছিল অতীতের দিনগুলির স্মৃতি।

                     নিজের জীবনের থেকেও সন্দীপ বেশি ভালোবেসেছিল নবনীতাকে। বিএসসি প্রথমবর্ষ থেকে তারা একসঙ্গে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তো। নবনীতাই তাকে প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিল। রাজি না হওয়ায় একপ্রকার ব্ল্যাকমেইল করেই রাজি করিয়েছিল তাকে। পাঁচ বছরের সম্পর্ক একটা ভুল বোঝাবুঝিতে নষ্ট হয়ে যায়। সন্দীপ এমএসসি পাশ করার পর তিন বছর সময় চেয়েছিল নবনীতার বাবার কাছে। তিনি তা দেননি। তিনি বলেছিলেন--- "তোমার মতো এমএসসি পাস ছেলে কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোমার কিছু হবে না।" বাবার কথার কোন প্রতিবাদ সেদিন নবনীতা করেনি। বাবা বিয়ে ঠিক করলে চুপচাপ মেনে নিয়েছিল সে। বিয়ের কার্ড সন্দীপের হাতে দিয়ে বলেছিল--- "আমার কিছু করার নেই। আমি নিরুপায়। তোমার ব্যর্থ জীবনের সঙ্গে আমি আমার জীবনকে জড়াতে পারলাম না। আমায় পারলে ক্ষমা করো।" এই কথা শুনে সন্দীপ রেগে গিয়ে নবনীতার গালে কষে একটা চড় দিয়েছিল।  সন্দীপ তাকে বলেছিল--- "সব মেয়েরাই এক। প্রেম করে নিজের ইচ্ছায়, বিয়ে করে বাবার কথায়। বিয়ে যদি করতে পারবি না তাহলে আমাদের মতো ছেলের সঙ্গে প্রেমে পড়িস কেন?" দু-চোখে জল দেখা গিয়েছিল সন্দীপের। এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায় নবনীতার। একাগ্র চিত্তে পড়াশোনা করে কিছুদিনের মধ্যেই কলেজের প্রফেসর হয় সন্দীপ। তারপর প্রায় পাঁচ বছর নবনীতার সঙ্গে তার দেখা হয়নি। তবে তার এক বন্ধুর কাছ থেকে সে জেনেছিল--- 'বিয়ের কার্ড হাতে দিয়ে নবনীতা তাকে যে কথাগুলো বলেছিল, সেগুলো ওর মনের কথা নয়। বাবা-মার ব্ল্যাকমেইলে পড়ে ওই কথাগুলো নবনীতা বলতে বাধ্য হয়েছিল।' সেই বন্ধুর কাছ থেকে এটাও জেনেছিল যে,--- 'নবনীতার স্বামী প্রতিদিন মদ পান করে নবনীতাকে প্রহার করেন। আর্থিক সুখ থাকলেও মানসিক সুখ নেই তার। তাছাড়া এখনো পর্যন্ত একটাও সন্তানের মুখ দেখেনি।'

        অতীত স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দুচোখ চিকচিক করে উঠে সন্দীপের। আরাধ্যা ও সন্দীপ্তার ফুচকা খাওয়া হলে তারা সেখান থেকে অন্য মন্ডপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। যাওয়ার সময় সন্দীপ মনে মনে ভাবে--- 'আমরা কর্ম করলেও ভাগ্য আমাদের হাতে থাকে না। সব জানেন আমার গৌরহরি। তিনি সব ভালোর জন্যই করেন।'

...(সমাপ্ত)...

Friday, January 13, 2023

সত্যজিতের স্বপ্ন

সত্যজিতের স্বপ্ন

মিঠুন মুখার্জী 

সত্যজিৎ বড় হয়ে একজন ডাক্তার হতে চেয়েছিল। কিন্তু উপযুক্ত গাইডেন্স-এর অভাবে তার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। অনেক কষ্ট করে উচ্চশিক্ষা লাভ করলেও একটা সরকারি চাকরি জোগাড় করতে পারে নি। এমএসসিতে বায়োলজিতে প্রথম শ্রেণী পাওয়া ছেলেটি শেষমেষ শপিংমলের হিসাবরক্ষকের কাজ বেছে নিয়েছিল। ডাক্তার হতে না পারলেও কোন কাজকেই সে ছোট মনে করত না। সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। আমাদের দেশে এমন কত মানুষ আছেন যাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। তার অনেক কারণ। 

          বাবা শশীভূষণ সত্যজিতের প্রতি তেমন নজর দিতেন না। তার জীবনের যেটুকু উত্তরণ ঘটেছে তাতে তার মা রাধা দেবীর অবদান। নিজে অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু সাধারণ কাস্টের ছেলে হওয়ায় সব জায়গায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাছাড়া অদৃষ্ট তার সঙ্গ দেয়নি। সত্যজিতের সততাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অসৎ ব্যক্তিরা অনেক এগিয়ে গেছে। সে শুধু কষ্ট পেয়েছে। 

         শপিংমলে কাজ করতে করতে সে ভাবতো--- "ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হতে পারিনি। তাই কি হয়েছে। আমার মতো কত মানুষ আছে যাদেরও স্বপ্ন পূরণ হয় নি। তাই বলে হতাশা নিয়ে পিছিয়ে যেতে হবে। মোটেও না। এমন একটা কাজ করতে হবে যার মাধ্যমে সকল মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়া যায়।" এই চিন্তা সত্যজিৎকে ঠিক মতো ঘুমতে দিত না। পাড়ার কিছু বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে এই সিদ্ধান্তে আসে তারা--- 'প্রতি রোববার তারা বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় রক্তদান শিবিরের আয়োজন করবে। এর ফলে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া সহজ হবে। সারা সপ্তাহ সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট চলবে।' এই উদ্যোগকে সকলে স্বাগত জানায়। 

       নিজের পাড়া দিয়েই সত্যজিৎ ও তার বন্ধুরা এই কাজটি শুরু করেছিল। প্রথম রবিবারে একশোজন রক্তদান করেছিলেন। দ্বিতীয় রোববার পাশের গ্রামে একশো দশ জন, তৃতীয় রোববার আরেকটি গ্রামে নব্বই জন। এভাবে এক বছরে চার হাজার প্যাকেট রক্ত তারা ব্লাড ব্যাংকে তুলে দিয়েছিল। তাছাড়া সরাসরি অসুস্থ ব্যক্তিকে রক্ত দেওয়ার জন্য বহু ডোনারও জোগাড় করে। দেখতে দেখতে সত্যজিৎ ও তার বন্ধুদের নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তারা একটা ওয়েলফেয়ার তৈরি করে। যার প্রধান দায়িত্বে ছিল সে। তারা ক্যাপশন তৈরি করেছিল--- "রক্ত দিন জীবন নিন"। পাড়ায় পাড়ায় ছুটির দিনগুলিতে সকলে মিলে এক ঘন্টা রক্তদানের সচেতনতামূলক ক্যাম্প শুরু করে। তাতে রক্ত দিলে শরীরে কি উপকার হয় তা মানুষ জেনে খুব উৎসাহী হত। পাঁচ বছরে সারাদেশে দৃষ্টান্ত গড়ে তারা। তাদের এই সমাজ সেবামূলক কাজে অনেক বড় বড় ব্যক্তি, নেতা, প্রশাসনিক কর্তা যোগ দিয়েছিল। সত্যজিতের সত্যের পথে এগিয়ে চলা এভাবেই স্বপ্নকে পূরণ করেছিল।

...(সমাপ্ত)...


Sunday, September 25, 2022

অবৈধপ্রণয়

ছবি : ইন্টারনেট 

 অবৈধপ্রণয়

মিঠুন মুখার্জী

জলজের সামনে রনিতা ও বীরেন্দ্রর সম্পর্ক একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেছে। দুচোখে বারিধারা থৈথৈ করে তাঁর। তাঁর মানসপটে ভেসে ওঠে অতীতের তাঁর ও রনিতার দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি। জলজের পিতার খুব পছন্দ হয়েছিল রনিতাকে। মারা যাওয়ার আগে রনিতা ও জলজের চার হাত এক করে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। হয়েছিলও তাই। বিয়ের এক মাসের মধ্যে দুরারোগ্য রোগে জলজের পিতা মারা যান। রনিতাকে নিয়ে জলজের মা ও জলজ সুখেই ছিলেন। কিন্তু জলজ বুঝতে পারেননি রনিতা ছাইচাপা আগুন।

  ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ-এর মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় ছিল বীরেন্দ্র ও রনিতার মধ্যে। বিয়ের আগে থেকেই বীরেন্দ্রর সঙ্গে প্রেম ছিল রনিতার। অথচ বিয়ের আগে রনিতা জলজকে বলেছিলেন-- "আমার কারো সাথে কোন সম্পর্ক নেই, আমি এখনকার মেয়েদের মত নই।" রনিতার প্রতি অন্ধবিশ্বাস জলজের জীবনে কাল হয়েছিল।

  জলজ বহু চেষ্টা করেও একটা চাকরি জোটাতে পারেন নি। তাই একটি গার্মেন্টস-এর দোকান দিয়েছিলেন। জলজের আয় ও বাবার পর মায়ের পাওয়া পেনশনে ছোট্ট সংসার চলে যেত। জলজের দোকানে থাকার সময় বীরেন্দ্রর সাথে কথা বলতেন রনিতা। এমনকি ভিডিও চ্যাটিংও করতেন। এক রবিবার রনিতাকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে গিয়েছিলেন জলজ। সেখানে বীরেন্দ্রর সাথে দেখা হয়েছিল তাদের। রনিতা দূর সম্পর্কের দাদা বলে জলজের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন বীরেন্দ্রর । বিষয়টা সেদিন বুঝতে পারেন নি জলজ। কিন্তু আজ তার কাছে সবকিছু একেবারে জলের মত পরিষ্কার।

 পার্কের পরিচয়ের পর বীরেন্দ্র বেশ কয়েকদিন জলজদের বাড়ি এসেছিলেন। জলজের মা জলজকে অনেকবার সাবধান করে দিয়েছিলেন। তিনি জলজকে বলেছিলেন-- "বীরেন্দ্র ও রনিতার সম্পর্কটা আমার কাছে মোটেই ভালো লাগছে না। সন্দেহ হচ্ছে ছেলেটা সত্যি সত্যি রনিতার দাদা তো!" জলজকে খোঁজ নিতে বলেছিলেন তার মা। কিন্তু রনিতার প্রতি অন্ধবিশ্বাসে তিনি বিষয়টি হালকা চালে নিয়েছিলেন। মাকে বলেছিলেন-- "মা, আমার ওসব মনে হয় না। তাছাড়া ও আমাকে মিথ্যে কথা বলবে কেন? আমাদের জন্য ও তো কম করে না।"

জলজের রনিতার প্রতি অন্ধবিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে বেশিদিন লাগে নি। এক শনিবার দুপুর বেলা অত্যন্ত প্রয়োজনে বাড়িতে আসেন জলজ। অন্যদিন বাড়ি আসেন রাত নটায়। সেদিন ঘটল ঘটনাটা।জলজ বাড়িতে ঢুকতেই দেখলেন বাড়ির বাইরে একটি মোটরসাইকেল দাঁড় করানো। সন্দেহ দানা বাঁধে তাঁর মনে। চুপিচুপি গেট খুলে ঘরে ঢুকে জলজ দেখেন, এক ঘরে তাঁর মা ঘুমোচ্ছেন। রনিতার ঘরের দরজা ভেজান। জলজ ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে যা দেখলেন, তাতে সেই মুহূর্তে যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো। একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন তিনি।এরপর দরজাটা পুনরায় বন্ধ করে দোকানে চলে গেলেন সে। বীরেন্দ্র ও রনিতা বুঝতেও পারলেন না জলজ তাদের সম্পর্ক জেনে ফেলেছেন।

দোকানে ফিরে গিয়ে কান্নায় ফেটে পড়েন জলজ। এমন দৃশ্য তিনি দেখেছেন, যা কাউকে বলা যাবে না। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে তিনি মাকে নিয়ে হরিদ্বার যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন । মায়ের প্রশ্নের জবাবে জলজের দু-চোখে শুধু জল গড়ায়, তিনি চুপ করে থাকেন। মা জলজের চুপ থাকার কারন বুঝে যান। হরিদ্বার যাওয়ার আগে জলজ রনিতার উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখে যান। তিনি লেখেন--- "প্রিয় রনিতা, তুমি আমাকে এভাবে ঠকাবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। তোমাকে বিয়ে করবার আগে আমি অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমার কারো সাথে সম্পর্ক আছে কিনা। কিন্তু তুমি আমাকে বলেছিলে তুমি সেরকম মেয়ে নও। তোমাকে মনে প্রানে খুব চেয়েছিলাম, অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু আজ তোমার ও বীরেন্দ্রর যে সম্পর্ক আমি দেখলাম, তা কেবল আমি কেন, কোন স্বামীই সহ্য করতে পারবে না। তাই আমি মাকে নিয়ে হরিদ্বারে চললাম। আর কোনদিন ফেরা হবে কিনা জানি না। তবে তুমি বীরেন্দ্রকে নিয়ে সুখী হও।  আর আমাকে যদি তুমি এক দিনের জন্য ভালোবেসে থাকো, তবে আমার একটা কথা রেখো, আমার বাড়ি ও দোকান বিক্রি করে যা টাকা পাবে তার পঞ্চাশ শতাংশ টাকা কোনো অনাথ আশ্রমে দিয়ে দেবে।আমার মার শেষ ইচ্ছা তবে পুরণ হবে। ইতি- তোমার হতভাগ্য স্বামি।"

...(সমাপ্ত)...

 

Monday, August 15, 2022

ভানুপ্রিয়ার আশ্চর্য ঘোড়া

ছবি : ইন্টারনেট
ভানুপ্রিয়ার আশ্চর্য ঘোড়া
মিঠুন মুখার্জী

বহু বছর আগের এক কথা। জীবনপুর নামে এক রাজ্যের প্রজাদের দুরবস্থার সীমা ছিল না। রাজ্যের রাজা অনন্ত বর্মা মারা যাওয়ার পর রানী বিশ্বরূপা সিংহাসনে বসেন। যেহেতু রাজদম্পতীর কোন সন্তান ছিল না, সেহেতু রানীই দায়িত্বভার তুলে নিয়েছিলেন। রাজা যতটা প্রজাহিতৈষী ছিলেন, রানী একেবারে তার উল্টো‌। তিনি প্রজাদের উপর জোর জুলুম করতেন। খাজনা দেড়গুন-দ্বিগুণ নিতেন। প্রজারা দিতে না পারলে জমি বাড়ি সব কেড়ে  নিতেন। রাজা অনন্ত বর্মা মারা যাওয়ার পর রানীর তিন ভাই ও মামা জীবনপুরে আসেন এবং রানীর থেকেও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। জীবনপুর থেকে প্রজারা ভয় পেয়ে চলে যেতে থাকে। অশ্ব গুপ্ত, শ্রুত গুপ্ত ও চন্দ্রগুপ্ত রানীর তিন ভাই ও মামা প্রতাপ সিংহ। প্রজাদের উপর এদের অত্যাচারও ক্রমে বেড়ে যেতে থাকে।
           রানী বিশ্বরূপার বউ হয়ে আসার অনেক আগে রাজা অনন্ত বর্মা রূপনগর নামক এক রাজ্যের একটি জঙ্গলে শিকারে গিয়েছিলেন। রূপনগরের রাজা অর্জুন বর্মা অনন্ত বর্মার খুব প্রিয় বন্ধু ছিলেন। দুজনে মিলে শিকার করতে যেতেন। সঙ্গে থাকতেন সেনাপতি ও কিছু সৈন্য। একবার শিকার করার সময় হঠাৎ অনন্ত-বর্মার সামনে একটি বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ে। বন্দুক থেকে গুলি বের হলেও তিনি লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। ঠিক তখন একটি ঘোড়া জঙ্গলের দিক থেকে হঠাৎ এসে বাঘটির সামনে দাঁড়ায়। ঘোড়ার দুই চোখ থেকে জ্যোতি বের হয়। বাঘটি মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
          এই দৃশ্য দেখে সকলে অবাক হয়ে যান। তারা বুঝে উঠতে পারেন না মুহুর্তের মধ্যে কি হলো। এমন সময় এক অপরূপা সুন্দরী নারী সেই ঘোড়ার পিঠে চেপে তাঁদের সামনে আসেন। রাজা অনন্ত বর্মা তার পরিচয় জানতে চান। তখন সেই নারী বলেন--- "আমি আপনাকে রক্ষা করেছি। আমার আশ্চর্য ঘোড়ার অসীম ক্ষমতা। যার কাছে এই ঘোড়া বশ হবে তাঁর কথামতো সব অসম্ভব কাজ সম্ভব করে দেবে। আমি  এই জঙ্গলের এক জোংলি রাজার মেয়ে।নাম ভানুপ্রিয়া। এই জঙ্গলে যে সমস্ত মানুষ বিপদে পড়েন তাদের আমি রক্ষা করি। আমার পবন নামের এই ঘোড়াটি সময়ে পাখা মেলে উড়তেও জানে। যাকে বলে পঙ্খিরাজ ঘোড়া। এটি আমার আগে আমার বাবা রাজা দোবরুপান্নার বশ ছিল। তিনি গত হয়েছেন পাঁচ বছর হয়েছে। তখন থেকেই ও আমার বশ। আমার কথামতো ও সব করে।" ভানুপ্রিয়া নিজে যে জাদুবিদ্যা জানেন, সেটা কারকে জানান না। সে নিজেও অসীম শক্তির অধিকারিণী।
        ভানুপ্রিয়াকে দেখে অনন্ত বর্মার খুব ভাল লেগেছিল। তাছাড়া ঐ আশ্চর্য ঘোড়াটির প্রতি লোভও হয় তাঁর। তিনি তখন ভানুপ্রিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। ভানুপ্রিয়া বলেন--- "আপনারা আমার দাদা বিনয় পান্নাকে গিয়ে বলুন। যদি সে রাজি হয়, তাহলে আমিও রাজি। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। বিয়ে আমি করবো কিন্তু আমার এই জঙ্গল ছেড়ে আমি যেতে পারব না। আপনাকে হয় আমার সঙ্গে এই জঙ্গলে থাকতে হবে, নতুবা আপনি বিয়ে করে আমাকে এখানে রেখে যাবেন। আপনার সময় বিশেষে এখানে আসবেন।"
       অনেক ভেবেচিন্তে রাজা অনন্ত বর্মা রাজি হলেন। তারপর বন্ধু অর্জুন বর্মাকে নিয়ে বিনয় পান্নার সঙ্গে কথা বলেন এবং নিয়ম মেনে রাজকুমারী ভানুপ্রিয়াকে বিবাহ করেন।অর্জুন বর্মা বুঝতে পেরেছিলেন অনন্ত-বর্মা মূলত ঘোড়াটার জন্যই ভানুপ্রিয়াকে বিয়ে করেছিলেন। একরাত্রি সেই জঙ্গলে ভানুপ্রিয়ার সঙ্গে কাটিয়ে পরদিন নিজ রাজ্যে ফিরে এসেছিলেন রাজা। ভানুপ্রিয়াকে কথা দিয়েছিলেন, প্রতি মাসে সে দুইদিন করে জঙ্গলে এসে থাকবেন। কিন্তু সে তাঁর কথা রাখেননি। জীবনপুরে ফিরে আসার পর তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেন--- "এভাবে সম্পর্ক থাকে না। এক জায়গায় চাষ আর এক জায়গায় বাস সম্ভব নয়।" তিনি যেহেতু ভানুপ্রিয়ার শর্ত মেনেই বিয়ে করেছিলেন, সেহেতু তাঁর ওপর জীবনপুরে আসার জন্য জোর খাটাতে পারেননি। ফলে পিতা-মাতার দেখা বিশ্বরূপাকে বিবাহ করেন। বিবাহের সময় অনন্ত বর্মার পরিবার বুঝতে পারেননি, বিশ্বরূপা খুব লোভী এবং তাঁদের পরিবারে এসেছেন তাঁদের সম্পত্তির জন্য। ভাইগুলো এক একটা শয়তান। তাছাড়া এরা সকলেই ডাইনি
              ভানুপ্রিয়া ও রাজা অনন্ত বর্মার সম্পর্কের কথা রাজা বিশ্বরূপাকে কখনো জানাননি। রানীও কারোর কাছ থেকে জানেন নি। রাজা অনন্ত বর্মাকে রানী ছলনা করে হত্যা করেছেন বলে শোনা যায়। কিন্তু রানীর ও রানীর ভাইদের ভয়ে কেউ এই সত্য উন্মোচন করার সাহস দেখান না।
          এদিকে ভানুপ্রিয়া মাসের-পর-মাস রাজা অনন্ত-বর্মার অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু রাজা আর সেখানে যাননি। তাই মনে মনে কষ্ট পান তিনি। মন ভারাক্রান্ত হলেও মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষা করার কাজ সে প্রতিনিয়ত করে যান। একদিন দুজন কাঠুরিয়াকে একটা হাতি তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ পবন ঘোড়াটি হাতিটার সামনে এসে দাঁড়ায় এবং হাতির থেকেও অনেক বড় হয়ে যায়। তারপর সামনের পা দুটি দিয়ে হাতিকে লাথি মারে। ফলে হাতিটি মহাশূন্যে উড়ে যায় এবং নিচে পড়ে মারা যায়। আরেকদিন একটি ডাকাতের দল নতুন বিয়ে করে যাওয়া এক দম্পতির সোনাদানা বন্দুক দেখিয়ে লুট করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাদের কান্না শুনে ভানুপ্রিয়া ঘোড়াটি নিয়ে সেখানে যান এবং ঘোড়াটি ডাকাতদের সামনে পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়‌‌। তারপর দড়ির মতো তার লেজ অনেক বড় হয়ে যায়। লেজে ডাকাতদের বেঁধে নিয়ে মহাশূন্যে উড়ে যায় এবং উপরে গিয়ে লেজের বাঁধন শিথিল করে দেয়‌। নিচে পড়ে ডাকাত গুলো সব মারা যায়। দম্পতির সমস্ত কিছু ভানুপ্রিয়া ফিরিয়ে দেন।
             কিছুদিন পর আর একটা ঘটনা ঘটেছিল। বনের মধ্যে একটি বাচ্চা কান্না করছিল। ভানুপ্রিয়া কান্না উদ্দেশ্য করে গিয়ে দেখেন--- একটি সাত-আট বছরের বাচ্চা।বাবা-মার সঙ্গে জঙ্গলে ঘুরতে এসে হারিয়ে গিয়েছিল সে। বাবা-মাকে না দেখতে পেয়ে ভয়ে কাঁদছিল। তার কান্না শুনে একটা বাঘ তার দিকে এগিয়ে এসেছিল। ঠিক তখনই ভানুপ্রিয়ার কথামতো ঘোড়াটি মুখ দিয়ে আগুন বের করে।ভয় পেয়ে বাঘটি তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তারপর বাচ্চাটিকে নিয়ে ভানুপ্রিয়া ঘোড়ায় করে তার বাবা-মাকে খুঁজে বার করেন এবং বাচ্চাটিকে তাদের হাতে তুলে দেন।
              একদিন পবনকে নিয়ে ভানুপ্রিয়া রাজার খবর নিতে জীবনপুরে যান।ঘোড়াটি জীবনপুরে ঢুকেই জোরে জোরে ডাকতে থাকে। ভানুপ্রিয়া বিপদের ইঙ্গিত পেয়ে আর এগোয় না। সেখানকার এক চাষীর কাছ থেকে তিনি সবকিছু জানতে পারেন। রাজার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী, রানীর অত্যাচার, তাঁর ভাইদের নিষ্ঠুর আচরণ---- সব জেনে যায় সে। জীবনপুরের কারো কাছে নিজের পরিচয় সে দেয় না। সেদিনকার মতো রূপনগরের জঙ্গলে ফিরে আসেন তিনি। রাজার মৃত্যু সংবাদে মনটা ভারাক্রান্ত হয় তাঁর। বিধবা নারীর সমস্ত নিয়ম পালন করেন সে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, তাঁর স্বামীকে যারা ছলনা করে হত্যা করেছেন তাদের তিনি উচিত শিক্ষা দেবেন। তাঁর অধিকার সে পুরোমাত্রায় বুঝে নেবেন।
            এরপর একদিন সকালবেলা ভানুপ্রিয়া তাঁর পবনকে নিয়ে জীবনপুরে পাড়ি দেন। বিনয় পান্না তাঁর দলবল নিয়ে জীবনপুর ও রূপনগরের সীমানায় আশ্রয় নেন। প্রথমেই তাঁরা সরাসরি যুদ্ধ করতে চান নি। এদিকে ভানুপ্রিয়া প্রাসাদের বাইরে গা ঢাকা দিয়ে থাকেন সন্ধ্যা হওয়ার অপেক্ষায়। রাতে যখন রানী ও তাঁর ভাইরা যে যার ঘরে ঘুমিয়েছিলেন তখন সে পবনের পিঠে চড়ে উড়ে-উড়ে রানির ঘরে প্রবেশ করেন। ডাইনি বিশ্বরূপাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়ে যখন প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন রানীর ঘুম ভেঙে যায়। হঠাৎ সে নিজের রুপে ফিরে আসেন। রানী বিশ্বরূপা আসলে একজন ডাইনি। সে তাঁর জাদুবিদ্যা ভানুপ্রিয়ার উপর প্রয়োগ করার আগেই ভানুপ্রিয়া তাঁর জাদুবিদ্যায় তাকে বন্দি করে ফেলেন। তাঁর হাত-পা বেঁধে ফেলেন। ডাইনি বিশ্বরূপা তাঁর কাছে জানতে চান--- 'কে সে? কি চান? তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? কেন নিয়ে যাচ্ছেন?' ডাইনির প্রশ্নের উত্তর স্বরূপ ভানুপ্রিয়া তাঁর ও অনন্ত-বর্মার সম্পর্কের কথা তাঁকে জানান। ডাইনি এরপর হাসতে থাকে আর বলেন--- "রাজা অনন্ত বর্মাকে আমি হত্যা করেছি দু'বছর আগে। ভালোই হয়েছে, তখন না মারলে  আজ তো মরতই। তুইও আমার হাতে মরবি।" এরপর ভানুপ্রিয়া বিশ্বরূপাকে বলেন--- "রাজাকে তুই কেন মারলি বল? ও তো তোকে বিশ্বাস করত।" এই প্রশ্নের উত্তরে ডাইনি বলেন--- "ওকে আমি প্রজাদের জন্য ভাবতে অনেকবার বারণ করেছি, কিন্তু আমার কথা শোনে নি। আমার ভাইদের জীবনপুরের সিংহাসনে পদ দেওয়ার কথা বলেছিলাম, কিন্তু ও রাজি ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে নিজের আসল রূপে ফিরে এসে ওকে হত্যা করতে হয়েছে। আমি সিংহাসনে বসে খুব খুশি।" এই কথাগুলো বলে বিকট হাসি হাসেন বিশ্বরূপা। ভানুপ্রিয়া বিশ্বরূপার এই ডাইনি রূপ দেখে কিছুটা অবাক হন। ডাইনি আরো বলেন--- "শুধু রাজাকেই নয়, আমি এই রাজ্যের অনেক প্রজার রক্ত পান করেছি এযাবত। তাছাড়া রাজা অনন্ত-বর্মার পিতা-মাতা আমার বিপক্ষে যাওয়ায়, ওদেরও হত্যা করে আমি রক্ত পান করেছি।" এই কথা শুনে ভানুপ্রিয়া প্রচন্ড রেগে যান। জাদুবিদ্যা দ্বারা ডাইনিকে ছোট করে দেন। তারপর পবন পা দিয়ে ডাইনির বুকের উপর বারবার আঘাত করে। কিন্তু ডাইনি মরে না।
             এরপর ভানুপ্রিয়া তাঁর জাদু আয়না বের করেন। ডাইনি ও তার ভাইদের মৃত্যু রহস্য আয়নার মধ্যে দেখতে পান। জীবনপুরের রাজপ্রাসাদে  দুটি খাঁচার মধ্যে মোট পাঁচটি পাখি আছে, সেই পাখিগুলোর মধ্যে এদের প্রাণ লুকিয়ে আছে। এরপর বিশ্বরূপাকে একটা বোতলের মধ্যে পুরে ফেলেন তিনি। তখন সবাই ঘুমাচ্ছিলেন, পাখিগুলো ঝিমোচ্ছিল। ভানুপ্রিয়া খাঁচা থেকে পাখি গুলো বের করে একটা একটা করে মুন্ডুচ্ছেদ করতে থাকেন, আর রানীর ভাইরা ও মামা তাদের ঘরে দাপাদাপি ও রক্তাক্ত হয়ে চিৎকার করতে লাগে। ধীরে ধীরে তারা মারা যান এবং অদৃশ্য হয়ে যান। কিন্তু যে পাখিটির মধ্যে ডাইনির প্রাণ ছিল, সেটিকে ধরতে গেলে ঠোকর দিয়ে উড়ে যায়। পাখি উড়ে গেলে ভানুপ্রিয়ার নির্দেশ মতো পবন পাখা মেলে ভানুপ্রিয়াকে নিয়ে তার পিছু নেয়। অনেকক্ষণ উড়ার পর অবশেষে ভানুপ্রিয়া পাখিটিকে ধরে ফেলেন। এরপর পাখিটিকেও হত্যা করেন। সঙ্গে সঙ্গে বোতল পেটে ডাইনি মাটিতে পড়ে যান ও ছটপট করতে করতে মারা যান। মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যান।
            জীবনপুরকে ডাইনিদের হাত থেকে মুক্ত করে ভানুপ্রিয়া নিজে রাজ সিংহাসনে বসেন। রূপনগর থেকে  দাদা বিনয় পান্নাকে জীবনপুরে নিয়ে আসেন। তাঁর ওপর দায়িত্বভার অর্পণ করেন। কিভাবে চলে যাওয়া প্রজারা পুনরায় জীবনপুরে ফিরে আসবে তার ব্যবস্থা করেন। প্রজাদের জমি,অর্থ,ধান দান করেন। চলে যাওয়া প্রজারা রানীর উদারতা দেখে পুনরায় জীবন পুরে ফিরে আসেন। রানী ভানুপ্রিয়া অনন্ত-বর্মার একটা স্ট্যাচু নির্মাণ করেন। তাঁর মহৎ নীতির কথা দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে দেন। তাঁকে সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে আশ্চর্য ঘোড়া পবন। পবনের চেষ্টায় অসম্ভবকে সম্ভব করেন তিনি। অনন্ত-বর্মার মতো রানী ভানুপ্রিয়ার সুশাসনে প্রজারা আবার সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।
...(সমাপ্ত)...

Sunday, April 17, 2022

হৃদ মাঝারে রাখবো

 

ছবি  : ইন্টারনেট 

 হৃদ মাঝারে রাখবো 

মিঠুন মুখার্জী 

দেবাদৃত সকালবেলা কলেজে যাওয়ার সময় অদিতিকে ফোনে জানায় আজ কলেজ থেকে তারা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে যাবে। তারা দুজনেই রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ দ্বিতীয়বর্ষতে পড়ে। দুজনেরই বিষয় বাংলা। দমদম নাগেরবাজার-এর কাছেই অদিতির বাড়ি। দেবাদৃত বারাসাতের চাঁপাডালির কাছেই থাকে। বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। অদিতির বাবা ভৈরবচন্দ্র কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক।বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে সে। কলেজেই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়, সেখান থেকেই বন্ধুত্ব ও প্রেম। প্রেমে পড়লে সবাই খারাপ হয় না।প্রেম এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা ও শক্তি হয়ে ওঠে কখনো কখনো। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন 'বাল্য প্রণয়ে অভিসম্পাত আছে।'

               দুটি ক্লাস করার পর তারা ব্যাগ পিঠে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে মেট্রোয় জোড়াসাঁকোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। গিরিশ পার্ক মেট্রো স্টেশনে নামতে হয় ঠাকুর বাড়ি যেতে। ঠাকুর বাড়ি যখন পৌঁছায়, তখন বেলা একটা বাজে। সূর্য মাথার উপর বিরাজমান। আজ বিশেষ কোন দিন না হওয়ায় ঠাকুরবাড়িতে তেমন ভিড় ছিল না। দেবাদৃত দুটি টিকিট কেটে অদিতিকে নিয়ে মিউজিয়ামে প্রবেশ করে। এই নিয়ে দেবাদৃত দশবার ঠাকুরবাড়ি এসেছে। এখানে এলে তার মন ভালো হয়ে যায়। হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি ঠাকুরের চেয়ে প্রাণের ঠাকুর রবি ঠাকুরকে দেবাদৃতের বেশি ভালো লাগে। রবীন্দ্রনাথের সকল সৃষ্টি একজীবনে পড়ার খুব ইচ্ছা জাগে তার। এককথায় বইপাগল সে।

               বিকেল চারটের সময় তারা মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে বুকস্টল থেকে দুটি বই কেনে। 'কাদম্বরীর সুইসাইড নোট' (রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়) ও 'ঠাকুরবাড়ির অন্দরকথা'প্রথম বইটি অদিতি কেনে ও পরেরটা দেবাদৃত। যখন তারা কাদম্বরীর আত্মহত্যা করার কক্ষের সামনে, তখন অদিতির মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। দেবাদৃত বুঝতে পারে অদিতির এমন মনের অবস্থার কারণ। সে জানে অদিতি কাদম্বরীর আত্মহত্যা মেনে নিতে পারেনি।সে ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের এর জন্য দায়ী করে, বিশেষ করে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। অদিতি রবি ঠাকুরকে পছন্দ করে, কিন্তু দেবাদৃতের মতো অন্ধবিশ্বাস নেই। অদিতি মাঝেমাঝে দেবাদৃতকে বলতো-- 'রবি ঠাকুরকে কোনো দিন অভাবের সাথে লড়াই করতে হয়নি, বাবার জমিদারি ছিল তাই কোনো বাঁধা পাননি; কিন্তু নজরুল সারা জীবন লড়াই করেছেন অভাবের সঙ্গে, তিনিও কম বড় কবি নন।'

              সন্ধ্যা ছটায় সেদিন ঠাকুরবাড়ি থেকে বাড়ি ফিরেছিল আদিতি। দেবাদৃত ফিরেছিল সাতটা। এরা একে অপরকে খুব বোঝে। তারা দুজনেই দশের মধ্যে থাকত স্কুল জীবনে। শুধু পড়াশোনা নয়, সব বিষয়েই তারা অত্যন্ত সচেতন। স্পেশাল পেপার রবীন্দ্রসাহিত্য থাকায় অন্য লেখকদের তুলনায় রবি ঠাকুরের সাহিত্য বেশি পড়তে হয় তাদের। তবুও নজরুল যেন অদিতির মনের কোন এক জায়গায় অবস্থান করে। দেবাদৃত অদিতিকে মাঝে মাঝে  তাদের সম্পর্কের পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন করলে অদিতি হেসে বলত--" ভালোবাসার কখনো পরাজয় হয় না, যদি মনের মিল থাকে। সব ভালোবাসার পরিণতি এক হয় না। বিয়েতেই ভালবাসার সার্থকতা আমি মানি না।" এ প্রসঙ্গে আরো বলতো-- "রবি ঠাকুর সারা জীবনে কত নারীকে ভালোবেসেছেন, এমনকি কাদম্বরী দেবীকে, তাই বলে কি বিবাহ করেছেন? তাই বলে তাঁর ভালোবাসা কি মিথ্যা হয়ে গেছে?" অবশ্য দেবাদৃতের কাছে ভালোবাসা যেভাবে অভিব্যক্ত, অদিতির কাছে ঠীক অন্য। তবু তাদের দুজনের বিশ্বাস ছিল তারা সারা জীবন একসঙ্গে কাটিয়ে দেবে।

            পরদিন অদিতি কলেজ যেতে না পারায় দেবাদৃত খুব একাকীত্ব বোধ করে। কলেজের বাংলার অধ্যাপক সুবিনয় মজুমদারের মেয়ে নবনীতা মজুমদারও তাদের সঙ্গে পরে। সেও দেবাদৃতকে  খুব পছন্দ করে। ওর অদিতির সঙ্গে ঠান্ডা লড়াই চলে সবসময়। পিতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটু দিদি দিদি ভাব। যাকে বলে প্রফেসর পিতার একমাত্র মেয়ে ভালোবাসায় ও প্রশ্রয়ে একেবারে মাথায় চড়ে বসেছে। তাছাড়া কলেজে রাজনীতিও করে মাঝে মাঝে। অদিতি না আসায় সুযোগ বুঝে তার মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসাকে দেবাদৃতের কাছে নিবেদন করে। অদিতি সম্পর্কে এমন কিছু কথা বানিয়ে দেবাদৃতকে বলে যেগুলি সে প্রথমে বিশ্বাস করে না। তবে দীর্ঘক্ষন কারো সম্পর্কে বললে মানুষের মন একসময় একটু হলেও মানতে বাধ্য হয়। দেবাদৃতেরও এমন হয়েছিল।

           নবনীতা দেবদৃতকে জানায়, -- " অদিতি তাদের কলেজের উপাচার্যের ছেলে দেবাংশুর সঙ্গে বেশ কিছুদিন প্রেম করছে। তুমি সামান্য একজন প্রাইমারি শিক্ষকের ছেলে, তোমাকে হয়তো ওর আর ভালো লাগছে না।" দেবাদৃত নবনীতার সব কথা শুনেও বিশ্বাস করে না। কিন্তু কয়েকদিন পর কলেজের লাইব্রেরীতে দুজনকে একসাথে দেখে দেবাদৃতের মনেও সন্দেহ হয়। সে লক্ষ করে অদিতি যেন কয়েকদিন ধরে তাকে এড়িয়ে চলছে।

       এই ঘটনার পর তিনদিন বিশ্ববিদ্যালয় আসে নি দেবাদৃত। অদিতি ফোন করেও পায় না তাকে। দেবাদৃতের  বাড়িতে গিয়ে দেখে প্রচন্ড জ্বরে কাতরাচ্ছে দেবাদৃত। অভিমানে অদিতির সঙ্গে তেমন কথা  বলে না। দেবাদৃতর মা অদিতিকে বসতে বললে অদিতি জানায়-- 'দেবা ইউনিভার্সিটি তিন দিন যাচ্ছে না, তাই বাড়ি চলে এলাম খবর নিতে। সামনে পরীক্ষা তো তাই'দেবাদৃত কথা বলছে না দেখে মনের কষ্টে আর বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে চলে আসে অদিতি। বাড়ি ফিরে একপ্রকার কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। দেবাদৃতের সামনে ভালোবাসার অভিব্যক্তি প্রকাশ না করলেও তার কান্না প্রমাণ দেয় সে তাকে যথেষ্ট ভালোবাসে।

     অদিতি তেমন জটিল মনের মানুষ নয়। তাই দেবদৃতের এহেন আচরণ বুঝে উঠতে পারেনি। পরের দিন হঠাৎ অদিতির কাছে একটা ফোন আসে। একজন মেয়ে জানায়-- "দেবাদৃতের থেকে দূরে চলে যা, নতুবা তোর কপালে অসীম দুঃখ আছে।" অদিতির বুঝতে দেরি হয়না এই অবস্থার জন্য কে দায়ী।পরদিন কলেজের উপাচার্যের কাছে গিয়ে নবনীতার নামে রিপোর্ট জানায় সে। উপাচার্য নবনীতাকে ও তার পিতা সুবিনয় মজুমদারকে ডেকে পাঠায়। নবনীতা ভয় পেয়ে সকল সত্যকথা তাদের জানিয়ে দেয়। নবনীতার এরুপ আচরনের জন্য উপাচার্য এক সপ্তাহ তাকে ক্লাস না করার শাস্তি দেন। সমস্ত সত্য বিষয়টি বন্ধুদের মারফত  দেবাদৃত জেনে যায়। দেবাংশু অদিতির যে শুধু ভালো বন্ধু আর কিছুই নয়, এটা অদিতির কাছ থেকে জানতে পারে সে। বন্ধুদের সামনে অদিতির কাছে ক্ষমা চায় দেবাদৃত। চোখে জল দেখা যায় অদিতির। সে বলে--" তুমি আমায় অবিশ্বাস করবে আমি কোনোদিন তা ভাবি নি। এই ঠুনকো বিশ্বাসে সারা জীবন আমাকে আগলে রাখবে তুমি?" এরপর অদিতি চলে যেতে চাইলে দেবাদৃত রবি ঠাকুরের একটি বিখ্যাত গানের উক্তি কবিতা আবৃত্তির মতো ব্যক্ত করে অদিতিকে বলে--" আমারো পরানো যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো। / তোমা ছাড়া আর এ জগতে মোর কেহ নাই, কিছু নাই গো।" হঠাৎ অদিতির পা এই কথাগুলো শুনে আটকে যায়। সমস্ত অভিমান মুহূর্তে ভেঙে যায় তার। দুটি মানুষের অভিমানের অশ্রু আনন্দ অশ্রুতে রূপান্তরিত হয়। তবে জীবনে এরকম ভুল বোঝাবুঝি বারবার তাদের মধ্যে হবে না তা কে বলতে পারে।

...(সমাপ্ত)...