1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label মুসকান ডালিয়া. Show all posts
Showing posts with label মুসকান ডালিয়া. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

পোট্রেট

ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

পোট্রেট

মুসকান ডালিয়া


রাত তখন প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই।

মুম্বাইয়ের জুহু সমুদ্রতট দিনের কোলাহল ঝেড়ে ফেলে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। দূরে দূরে সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো, ঢেউয়ের মৃদু গর্জন আর নোনা হাওয়ার স্পর্শ- সব মিলিয়ে যেন বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝামাঝি এক রহস্যময় পরিবেশ।

সপ্তর্ষি টলতে টলতে হাঁটছিল। শহরের পরিচিত নারীলোলুপ, আত্মকেন্দ্রিক এই মানুষটা রাতভর বারে মদ্যপান করে ফিরছিল নিজের ফ্ল্যাটে। হঠাৎই তার চোখ পড়ল সমুদ্রের ধারে পড়ে থাকা একটি বড় ক্যানভাসের ওপর। কৌতূহলবশত এগিয়ে গিয়ে তুলে নিল সেটি।

একটি পোট্রেট। ছবিতে এক তরুণী। সাদা ওড়নায় ঢাকা তার সমগ্র মুখ, শুধু দুটি চোখ দৃশ্যমান। সেই চোখ- অস্বাভাবিক সুন্দর। গভীর, বিষণ্ণ, অথচ অদ্ভুত জীবন্ত। কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর যেন সপ্তর্ষির চারপাশের পৃথিবী মিলিয়ে যেতে লাগল। মনে হচ্ছিল, চোখ দুটো তাকে ডাকছে।

"কেউ হয়তো ফেলে গেছে," নিজের মনেই বলল সে।

পোট্রেটটা বগলে নিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরে এল।

দেয়ালে টাঙিয়ে রাখবে ভেবেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিছানায় বসে ছবিটাকে সামনে রেখে তাকিয়ে রইল। মিনিট পেরিয়ে ঘণ্টা হতে না হতেই অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল তার। ছবির চোখ দুটো যেন পলক ফেলল। সপ্তর্ষির বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

না... এটা অসম্ভব!

পরক্ষণেই মুখ ঢাকা ওড়নাটা যেন নিজে থেকেই একটু একটু করে সরে যেতে লাগল। ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক অপার্থিব সুন্দর মুখ।

তারপর...

ছবির মেয়েটি ক্যানভাসের ভেতর থেকে আস্তে আস্তে বাইরে পা রাখল। চারপাশের বাতাস হিম হয়ে গেল। সপ্তর্ষির শরীর কাঁপতে শুরু করল।

বলল— কে... কে তুমি?

মেয়েটি শুধু হাসল। সেই হাসিতে ছিল অভিমান, ভালোবাসা আর মৃত্যুর শীতলতা।

নরম স্বরে সে বলল-- আমাকে চিনতে পারছ না, সপ্তর্ষি? আমি নয়নিকা। তিন বছর আগে যে তোমার আঁকা চোখে নিজের পৃথিবী খুঁজে পেয়েছিল।

হঠাৎই সপ্তর্ষির মনে পড়ে গেল সব।

নয়নিকা...

একসময় তাকে নিয়েই কত ছবি এঁকেছিল সে। বলেছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চোখ তারই। অথচ কিছুদিন পর নতুন সম্পর্কের নেশায় নয়নিকাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল নিজের জীবন থেকে।

নয়নিকা মৃদু হেসে বলল--এই চোখ দুটো তো তোমারই আঁকা। শুধু মৃত্যুর পর আমি এসে এদের মধ্যে বাসা বেঁধেছি।

সপ্তর্ষি পিছিয়ে যেতে চাইল কিন্তু পারল না।

মনে হল অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে আটকে রেখেছে।

নয়নিকার চোখে জল চিকচিক করছিল।

বলল -- তুমি চলে যাওয়ার পর বাঁচতে পারিনি জানো? ঠাকুমার ঘুমের ওষুধ... তারপর এক অন্তহীন ঘুম। কিন্তু সেই ঘুমেও শান্তি পাইনি। কারণ আমার অসমাপ্ত ভালোবাসা আমাকে বেঁধে রেখেছিল এই ছবির মধ্যে। সে আরও কাছে এগিয়ে এল।

বলল— তিন বছর ধরে অপেক্ষা করেছি, সপ্তর্ষি। আজ আর একা ঘুমাব না।

চারদিকের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

ঘরের আলো একে একে নিভে গেল। নয়নিকা দু'হাত বাড়িয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরল সপ্তর্ষিকে।ওপরমুহূর্তেই তার শরীর ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যেতে লাগল।

সপ্তর্ষি চিৎকার করতে চাইল। কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। ধীরে ধীরে সে-ও অদৃশ্য হয়ে গেল।

পরদিন সকালে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে পুলিশ ঢুকল। ঘরে কোথাও সপ্তর্ষির অস্তিত্ব নেই।

শুধু দেয়ালে ঝুলছে সেই রহস্যময় পোট্রেট।

তবে ছবিটা আর আগের মতো নেই।

এখন সেখানে দুটি মানুষ।

নয়নিকার চোখ দুটি শান্ত হয়ে বন্ধ।

তার মাথা হেলান দিয়ে আছে সপ্তর্ষির বুকে।

আর সপ্তর্ষির দুটি চোখ...

সেগুলো খোলা।

যেন অনন্তকাল ধরে ছবির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পরবর্তী দর্শকের অপেক্ষায়।