1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

দেবী দুর্গার সেকাল ও একাল

ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

দেবী দুর্গার সেকাল ও একাল 

চিত্তরঞ্জন দাস

           পূজা অতি প্রাচীন একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান । কেবল ভারতবর্ষে নয় --- গ্রিক পুরাণে , প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায়, এমনকি পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অতি প্রাচীনকাল থেকে যে বিভিন্ন পূজার প্রচলন ছিল তার বহু প্রমাণ পাওয়া গেছে । 

      আসলে মানুষ সৃষ্টির আদিকাল থেকে তার চেয়ে যে মহৎ ও শক্তিমান, তাকেই পুজো করে এসেছে। শরণাপন্ন হয়েছে সেইসব শক্তিমানের কাছে।

       একেবারে গোড়ার দিকে মানুষ যখন অরণ্যচারী ছিলেন, তখন তারা ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাত, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তিকে ভয় পেত । তখন এইসব প্রাকৃতিক শক্তিকে শান্ত করার জন্য মানুষ তাদের পূজা শুরু করে । অবশ্য তারা যে কেবল প্রাকৃতিক শক্তির পূজা করতো তা নয়, বিভিন্ন প্রাগৈতিহাসিক উপাদান বিশ্লেষণ করে ঐতিহাসিকগণ জেনেছেন যে মানুষ বিভিন্ন পশু পাখি এবং গাছ-গাছালিরও পূজা করতেন । বিভিন্ন দেবদেবীর বাহন আজও সেই স্মৃতি বহন করে চলেছে।

      আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার যুগে এবং তারও আগে প্রাচীন আমেরিকায় যখন মায়া সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল সে সময়ও যে মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল, বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ থেকে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। খ্রিস্টপূর্ব পনেরশো বছর আগে রচিত হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ থেকেও আমরা প্রাকৃতিক বিভিন্ন শক্তিকে পূজা করার কথা জানতে পারি । বৈদিক যুগে সূর্যের উপাসনাই ছিল মানুষের হৃদয়ের অর্ঘ্য নিবেদনের শ্রেষ্ঠ উপায়। ক্রমে ক্রমে সূর্য পূজা পর্যবেশিত হয় মুক্ত যজ্ঞবেদীর উপর প্রজ্জ্বলিত অগ্নিতে । প্রাকবৈদিক যুগে সম্ভবত মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল না। তখন চলতো নিরাকার শক্তির আরাধনা। তারপরে লেখচিত্র সমন্বিত "যন্ত্র" সৃজন করে তার আরাধনা হতো। অবশেষে এলো মূর্তি পূজা!  

            সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত একটি সিলমোহরে দেখা গেছে এক নারীর জরায়ু থেকে একটি শস্যের গুচ্ছ বেরিয়ে এসেছে। এই নিদর্শন থেকে বোঝা যায় সেই যুগে মাতৃদেবীকে মূলত শস্যদেবী রূপেই পূজা করা হতো । ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে সম্ভবত দেবী দুর্গাকেও শস্যদেবী রূপে পূজা করা হতো । যে সময়ে দেবী দুর্গার পূজা অনুষ্ঠিত হয় অর্থাৎ আশ্বিন মাস --- সেই সময়ে অতিবর্ষণ, ঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্ঘটনায় ধান ও অন্যান্য শস্যের প্রচন্ড ক্ষতি হয়ে থাকে । সম্ভবত এই ক্ষতির হাত থেকে বাঁচার জন্য কৃষিভিত্তিক বৈদিক সভ্যতার যুগে মা দুর্গাকে শস্যদেবী হিসেবে পূজা করার সূত্রপাত ঘটে। 

      মার্কেণ্ডেয় পুরানে মা দুর্গার যে বিবরণ পাওয়া যায় , সেখানে দেখা যায় দুর্গার দশ হাতে আছে দশটি শাক। যথা -- পত্র ,মূল,কবীর, অগ্র, ফল, কান্ড, ত্বক, ফুল,রূঢ়ক এবং কবক। আধুনিককালের দুর্গাপূজায় নবপত্রিকা পূজা বা কলাবউ পূজা সেই শস্যদেবীর বন্দনারই স্মৃতি বহন করে । গবেষকগণ মনে করেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সমাজের শস্যদেবী দুর্গার ব্যাপক রূপান্তরের মাধ্যমে অসুরদলনী দুর্গার আবির্ভাব ঘটেছে।

            এখন আমরা যে আদ্যাশক্তি মহামায়া বা অসুরদলনী দুর্গার আরাধনা করে থাকি, সেই দুর্গার প্রথম সাক্ষাৎ মেলে তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দুর্গা গায়ত্রীতে।

         "কাত্যায়নায় বিদ্মহে কন্যাকুমারীং ধীমহি।

                                 তন্নো দুর্গি প্রচোদয়াৎ ।।"

         এখানে দুর্গাকে ঋষি ক্যাত্যায়নের কন্যা কাত্যায়নী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার কৃষ্ণ যজুর্বেদের মৈত্রায়নী সংহিতায় এই দুর্গাকে আমরা পাই গিরিসুতা গৌরী রূপে । আসলে ঋগ্বেদ,ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ , স্কন্দপুরাণ,  মার্কণ্ডেয় পুরাণ, অগ্নিপুরাণ ,বৃহদ্ধর্ম পুরাণ,দেবীভাগবত  প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্ম পুস্তকের প্রত্যেকটিতে নানা নামে এবং নানা রূপে দেবী দুর্গাকে বর্ণনা করা হয়েছে। কোথাও তিনি আদ্যাশক্তি , মহামায়া, চন্ডিকা। আবার কোথাও তিনি পার্বতী, গৌরী,উমা।

       তবে কেবল ভারতবর্ষে নয় ভারতবর্ষের বাইরে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও আমরা সিংহবাহিনী মা দুর্গার সন্ধান পেয়েছি। যেমন গ্রিক পুরাণে দেবী "এথেনা "কে সিংহবাহিনী রূপে অসুর নিধনে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায় ! প্রাচীন মিশরে "আইসিস" নামের যে দেবতাকে পূজা করা হয়, ভাবা হয় তিনিও মা দুর্গা। প্রাচীনকালে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও মা দুর্গা ভিন্ন ভিন্ন নামে পূজিতা হতেন । ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধপ্রিয় দেবতা "ভিরগো" দেবীই নাকি মা দুর্গা এবং আরো মনে করা হয় বৈদিক সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে দেবী "ভিরগো"ই ভারতীয় মা দুর্গায় রূপান্তরিত হয়েছেন।

         তন্ত্রোক্ত দেবতা হিসেবে আমরা যে দুর্গার কথা জানতে পেরেছি, বিভিন্ন শাস্ত্রে সেই দুর্গা নামের বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় । মার্কেন্ডেয় পুরান মতে ---

             "দুর্গাসি দুর্গভব সাগরনৌরসঙ্গ ।" 

অর্থাৎ দুর্গাই সংসার রূপ দুঃখ সাগর পারাপারের একমাত্র তরণী। অন্যভাবে বললে বলা যায় --- যিনি দুঃখ বা দুর্গতি হরণ করেন, তিনিই দুর্গা।

    দুর্গা শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হল -- দুর- √গম +অ (কর্মবাচ্যে)+ আ স্ত্রীলিঙ্গে । যার অর্থ যাঁকে স্মরণ করলে দুঃখ দূরীভূত হয়।

       আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে ---

" নারায়নী মহাভাগে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী ।

          দুর্গে স্মৃতিমাত্রেন দুর্গং নৃনামিহ।।" 

     এখানে "দুর্গ" শব্দে -- দুর্গ নামক দৈত্য এবং "আ" শব্দের অর্থ হন্তা। অর্থাৎ যিনি দুর্গ নামক দৈত্যকে বিনাশ বা হত্যা করেন তিনিই দুর্গা । কথিত আছে এই দুর্গ নামক দৈত্য দেবতাদের কাজকর্মে অহেতুক বিঘ্ন সৃষ্টি করতেন এবং দেবতাদের বেদ হরণ করে তাদের বিরক্ত করতেন।

        স্কন্দপুরাণেও দুর্গাসুর হত্যার কারণে যে দেবীর নাম দুর্গা হয়েছে , সেই বিবরণ পাওয়া যায় --- 

     "অদ্য প্রভৃতি যে নাম দুর্গোতি খ্যাতিমেষ্যতি।

           দুর্গ দৈত্যস্য সময়ে পাতনাদতি দুর্গমাৎ।।"

         পূর্বেই বলা হয়েছে বিভিন্ন শাস্ত্রে দুর্গাকে বিভিন্ন রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। আর্য ঋষিরা যে নব দুর্গার আরাধনা করতেন সেই নবদুর্গার নয়টি রূপ হল --- শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা,কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা , কাত্যায়নী, কালরাত্রী, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী ।

     অন্যদিকে দশমহাবিদ্যায় দুর্গার যে দশটি রূপ দেখা যায়, সেগুলি হল -- কালী, তারা , ছিন্নমস্তা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী,  ভৈরবী , ধুমাবতী,বাগলা, মাতঙ্গী ও কমলা । 

    চন্ডীপুরাণে আবার মা দুর্গার আটটি রূপ -- 

             "উগ্রচন্ডা, প্রচন্ডা চ চন্ডোগ্রা চন্ডনায়িকা।

             চন্ডা চন্ডাবতী চৈব চন্ডরূপাতি চন্ডিকা।।" 

এইভাবে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন রূপে যুগ যুগ ধরে মা দুর্গা পূজিতা হয়ে এসেছেন। 

      শাস্ত্রমতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পর থেকে এ পর্যন্ত সময়কালকে চারটি যুগে ভাগ করা হয়। যথা -- সত্য, দ্বাপর, ত্রেতা এবং কলি। সব যুগেই দুর্গাপূজা হয়ে এসেছে।

      সত্যযুগে রাজ্যহারা রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি মেধসমুনির নির্দেশে দুর্গাপূজা করেছিলেন। দ্বাপরে গোপকুমারীগণ শ্রীকৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য দুর্গাপূজা করেছিলেন। ক্রেতাযুগে  লক্ষ্মীস্বরূপা সীতাদেবীকে নিজ রাজ্যে বন্দী করে রাখার মানসে রাক্ষসরাজ রাবণ চৈত্র মাসে দুর্গাপূজা করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত হয় । এই যুগেই দশরথপুত্র রামচন্দ্র সীতাকে উদ্ধার করার জন্য যুদ্ধে রাবণকে বধ করার আশীর্বাদ কামনা দুর্গা মায়ের অকালবোধন করেন।

        বাল্মিকী রামায়ণে অকালধবোধের কোন উল্লেখ না থাকলেও কৃত্তিবাসী রামায়ণে অকালবোধনের যে পরিচয় পাওয়া যায় তার থেকে জানা --- মাঘ মাস থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত সূর্যের গতি উত্তর দিকে থাকে, এই সময়টাকে বলা হয় উত্তরায়ণ । উত্তরায়ণ হলো দেবতাদের দিন । অন্যদিকে শ্রাবণ মাস থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত সূর্যের গতি থাকে দক্ষিণ দিকে। তাই এই সময়টাকে বলা হয় দক্ষিণায়ণ। দক্ষিণায়ণ হলো দেবতাদের কাছে রাত্রি। এই সময় দেবতাগণ নিদ্রিত থাকেন। অযোধ্যার রাজা দশরথপুত্র রামচন্দ্র দক্ষিণায়ণ কালে আশ্বিন মাসে অকালে অর্থাৎ নিদ্রামগ্ন থাকার সময়ে দেবী দুর্গার বোধন করেন এবং ১০৮টি পদ্ম সহযোগে দেবী দুর্গার আরাধনা করে তাঁর আশীর্বাদ লাভ করেন।  অকালে দেবীর এই বোধনই দুর্গার অকালবোধন নামে পরিচিত । শাস্ত্র মতে অকালবোধনের পর প্রসন্ন দেবী দুর্গা রামচন্দ্রের ধনুঃশরে প্রবেশ করে রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করেছিলেন।

      শাস্ত্র মতে বর্তমানে যে যুগ চলছে তা হল কলিযুগ । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর রাজা পরীক্ষিতের রাজত্বকাল থেকে এই যুগের শুরু । কলিযুগের মোট আয়ূ ৪ লক্ষ ৩২ হাজার বছর! এর মধ্যে মাত্র ৫০০০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ কলিযুগ শেষ হতে এখনও সময় লাগবে ৪ লক্ষ ২৭ হাজার বছর। শাস্ত্রানুসারে কলিযুগের পরে পুনরায় ফিরে আসবে সত্যযুগ ! অন্যান্য যুগের ন্যায় কলিযুগেও মা দুর্গা পুজিতা হয়েছেন।

         বাঙ্গালীদের মধ্যে এই পূজা প্রথম প্রবর্তন করেন বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় সুলতান হোসেন শাহের সমসাময়িক রাজা কংসনারায়ণই সর্বপ্রথম বাংলায় দুর্গাপূজা শুরু করেন। রাজা কংসনারায়ণ যখন দুর্গাপূজা শুরু করেন, তখন এক মণ অর্থাৎ ৪০ কেজি চালের দাম ছিল ৯৪ পয়সা, ১ মণ ডালের দাম ছিল ৮৪ পয়সা,১ মণ ঘি-র দাম ছিল ৪ টাকা ৯৪ পয়সা, ১মণ চিনির দাম ছিল ৫ টাকা ৬৯ পয়সা। সেই সময়ে দুর্গাপূজায়  কংসনারায়ণ খরচ করেছিলেন প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ টাকা । রাজা কংসনারায়নের পর বাঙালিরা দুর্গাপূজায় মেতে ওঠেন । এখন শুধু বাংলা নয় -- দিল্লি , বোম্বাই ছাড়িয়ে দুর্গাপূজা হচ্ছে লন্ডনে, আমেরিকায়, কানাডায়, বাংলাদেশে এমনকি পাকিস্তানেও।

তাই কেবল বাঙালি নয়, এই নীলগ্রহে যতদিন মানুষের অস্তিত্ব থাকবে ততদিনই বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন রূপে পূজিতা হবেন অসুরদলনী মা দুর্গা।

তথ্যসূত্রঃ

১)  ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ (বঙ্গানুবাদ)

২) বেদ (বঙ্গানুবাদ)

৩)  কৃত্তিবাসী রামায়ণ

৪) বিভিন্ন সাময়িক পত্রপত্রিকা ও সংবাদপত্র


No comments:

Post a Comment