![]() |
| ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
নানারূপে নানা নামে দুর্গা
জগদীশ মণ্ডল
আকাশে শরৎ আলোর মোহময় আবেশে সূচনা হয় দুর্গা
পূজার কল্পারম্ভ। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীর পুণ্যলগ্নে বেজে ওঠে আগমনীর বার্তা,"
বাজলো তোমার আলোর বেণু মাতলোরে
ভুবন.."। হিমালয় গিরি কন্যা সিংহবাহিনী দশভুজা রূপ ধারণ করে আবির্ভূত হন। মর্তলোকে
নেমে আসেন অশুভশক্তি বিনাশে মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। বাঙালিরা যে দশভুজা দুর্গার আরাধনা
করেন তিনি বিভিন্ন দেশে নানারূপে নানানামে, নানাসময়ে পূজিত হন।
আমাদের বাংলায় দুর্গার চিরন্তনীরূপ দশভুজা।
কিন্তু দ্বাদশ শতকে তিনি ছিলেন অষ্টভুজা। পরে অষ্টাদশভুজা হন। আরও পরে হন দশভুজা। যা
বাঙালির ঘরে ঘরে পূজিত এবং শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় উৎসব। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে আছে শিব এবং দুর্গার
কথা। কালের প্রভাবে দুর্গা কখনো হয়েছেন
"শিবকালী" আবার "মহাকালী"। সেজন্য দুর্গার অপর নাম "মহাকাল"।
কোথাও বা শিব- দুর্গা নামেই পরিচিত। নেপালে বৌদ্ধ সম্প্রদায় এবং হিন্দুরা নীলতারা
এবং উগ্রতারা (দুর্গার ভিন্ন রূপ) উপাসনা করেন। ভুটান এবং মেঘালয়ে দুর্গা "মহামায়া"
রূপে পূজিত হন। ভারত এবং তিব্বত সীমান্তের দুর্গম হিমবাহ পঞ্চপল্লী পর্বতমালায় ভাদ্র
মাসের শুক্লা ত্রয়োদশীতে একদিনের দুর্গাপূজা হয়। পর্বত মন্দিরে অষ্টভুজা দেবী দুর্গা
পাহাড়িয়া লোকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। বিদেশীদের কাছে প্রস্তর নির্মিত অষ্টভুজা দেবী
"পাহাড়ি দুর্গা" নামে খ্যাত। অবশ্য পূজার দিনটি ছাড়া মন্দির সারা বছর তুষারাবৃত
থাকে। জনশ্রুতি আছে পাহাড়ি দুর্গা মহামায়া'র প্রকৃত উৎপত্তিস্থল মহাহিমবাহ। এই হিমবাহ মহাশূন্যের
অধিনায়িকা "ঈশ্বরী আর্যা"। মহাশূন্যের আবার পাঁচটি ভাগ। হিন্দুরা যাকে বলে
"পঞ্চভূত"। তিব্বতি বৌদ্ধরা বলেন "স্কন্ধ"।স্কন্ধ পাঁচ প্রকার।
রূপ, সংজ্ঞা,বেদনা, সংস্কার এবং বিজ্ঞান। কর্মের পরিণতিতে "পঞ্চস্কন্ধ " জীবে পরিণত হয়।
মহাশূন্যের দেবী এখানে একদিনের জন্য ভক্তের পূজা নিতে আসেন। কারও মতে তখন তাঁকে
"স্কন্ধদূর্গা" বলা হয়।
ঋকবেদের বিভিন্ন সূত্র থেকে দুর্গার নানা রূপের
বর্ণনা পাওয়া যায়। বিশ্ব দূর্গা, অগ্নি দুর্গা,
সিন্ধু দুর্গা, রাত্রি দুর্গা প্রভৃতি। চন্ডিতে দুর্গাকে
"শাকম্ভরী" বলা হয়েছে। আবার মার্কেণ্ডেয় পুরাণে তাঁকে বাসন্তী দেবীর আসন
দিয়েছেন। যদিও শাস্ত্রসম্মত উপায়ে শিল্পীরা মূর্তি তৈরিতে প্রচুর বিকৃতভাবের উদয়
করেছেন। তবে বাংলার ভক্তরা দুর্গোৎসব পালনে প্রাচীন তিন পুরাণ দেবী, বৃহনন্দীকেশ্বর ও কালিকা গ্রন্থের বর্ণনা পদ্ধতি
ও আচরণবিধি মেনে পূজাপর্ব গ্রহণ করে। অন্নদা কল্পতন্ত্রে দুর্গাকে অন্নপূর্ণা এবং মহেশ্বরীরূপে
পাওয়া যায়। অন্নপূর্ণার পূজা হয় চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমীতে। কথিত আছে ভিখারি শিবকে
রক্ষার জন্য তাঁর আবির্ভাব। এই দেবী কোথাও চতুর্ভূজা ভৈরবী, কোথাও দ্বিভুজা ভুবনেশ্বরী। রাজপুতনায় দেবী দুর্গাকে
নিয়ে "গঙ্গা" উৎসবের চল আছে।
গ্রিক পুরাণ মতে দেবী দুর্গা সিংহ বাহিনী। মিশরে
যাকে বলা হয় "আইসিস"। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে দেবী "কাইবেলে"
এর আবির্ভাব হয়। তাঁর বাহন সিংহ। তিনি দেবী দুর্গার সমগোত্রীয়। গ্রীসে দেবী দুর্গা
পূজিত হন অসুরদলনী "অ্যাথিনা" বা "রিয়া" রূপে।" পারস্যে
পূজিত হন "অনাহিত" নামে। তাঁর দুই বাহু। মিশরে ইনি "ইন্থার"। এখানে
দেবী দুবাহু থেকে হলেন চতুর্ভূজা। দেবী দুর্গা "শতভুজা" নামেও পুজিত হন।
ক্রিট দ্বীপে দেবী দুর্গা "ষড়ভুজা" এবং "শক্তিরূপিনী" নামে পূজা
পান। জাপানে দুর্গার নাম "চনষ্ঠি"। মহাচীনে তিনি পূজিত হন "মহামায়া"
"বজ্রতারা" রূপে। তাঁর গায়ের রং, বর্ণ এবং প্রকৃতিতে ইনি "ভীষণদর্শনা"।
দাক্ষিণাত্যের লোকেরা ব্যাঘ্রবাহিনী মহাদেবীকে
"শ্রী" শক্তির আধার রূপে পূজা করেন। এশিয়া মাইনর সহ সমগ্র সিংহলে দেবী দুর্গা
"সিবিলি" নামে পূজা পান।
অসুর নিধন করতে গিয়ে দুর্গাকে বিভিন্ন সময়
ভিন্ন রূপ ধরতে হয়েছিল। সেই রূপেই তিনি বহু স্থানে পূজিত হন। কৃত্তিবাস রামায়ণে পাওয়া
যায় রামচন্দ্র দুর্গা দেবীকে অকালবোধন রূপে পূজা করেছিলেন। তবে ভাগবত, কালিকাপুরাণ মতে দেবীর অকালবোধন করেন ব্রহ্মা। দেবী
রাত্রে (দক্ষিণায়ণ) ঘুমন্ত অবস্থায় "কৌমারী" ব্রতরত অবস্থায় ছিলেন। এ
সময় গভীর-নিদ্রা থেকে বেলতলায় জাগানো হয়েছিল বলে তাঁকে "অকালবোধিতা" বলা
হয়।শুম্ভ, নিশুম্ভ নামক অসুরকে বধ করার সময় দুর্গা
"অযোনিজা" রূপ ধারণ করেন। নারী পুরুষের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছিলেন বলে তিনি
"অযোনিজা"। তাঁর পূজা করেছিলেন অর্জুন।
অবশ্য হিন্দু ও বৌদ্ধ পুরাণ মতে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে নিধন করার জন্য তিনটি রূপ পরিগ্রহ করেন। প্রথমে উগ্রচণ্ডা, দ্বিতীয় বারে ভদ্রকালী, তৃতীয়বারে দুর্গা রূপে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় দেবী দুর্গা ভিন্ন নামে পূজিত হন। কাশ্মীরে দেবী দুর্গার নাম "অম্বিকা"। দক্ষিণ ভারতে "কন্যাকুমারিকা" বা "আম্বা" রূপে। গুজরাটবাসী পূজা করেন "হিংগলা" দেবী রূপে। মিথিলায় উদিত হন "উমা" রূপে। কান্বকুব্জে পূজা পান "কল্যাণী" মাতা রূপে। বিন্ধ্যাচলের মত দুর্গা ভারতসহ বাংলাদেশের সর্বত্র বন্দিত হন "দশভূজা", "মহিষাসুরমর্দিনী" রূপে।যে রূপেই আসুন না কেন মা আমাদের রক্ষা করে চলেছেন অসুর শক্তির বিনাশ করে।তাই তো যুগে যুগে প্রণম্য তিনি।



No comments:
Post a Comment