![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
সনাতনের দুর্গাপূজা
তিতলী সাঁবুই
মহালয়ার সেই চেনা ভোরবেলা যখন চারিদিকের অন্ধকার একটু একটু করে কেটে যেত আর রেডিওর ভেতর থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই উদাত্ত গলার চণ্ডীপাঠ চারপাশের বাতাসে গমগম করে উঠত তখন আট বছরের ছোট্ট সনাতনের ঘুমটা ভাঙত এক অদ্ভুত আনন্দের শিহরণ নিয়ে। সে বিছানায় শুয়ে শুয়েই অনুভব করতে পারত যে আর মাত্র কটা দিন পরেই মা চলে আসবেন আর তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করত।
সনাতনের বাবা হরেন পাল ছিলেন কৃষ্ণনগরের এক অত্যন্ত নামকরা মৃৎশিল্পী যাঁর হাতের ছোঁয়ায় শুকনো মাটিও যেন কথা বলে উঠত। প্রতি বছর পূজার আগে কৃষ্ণনগর থেকে তাঁরা সপরিবারে চলে আসতেন কলকাতার কুমোরটুলির এক চিলতে ভাঙা ঘরের আস্তানায় যেখানে দিনরাত এক করে প্রতিমা তৈরির কাজ চলত। সনাতন সারাদিন সেই ঘরের এক কোণায় বসে অপলক চোখে চেয়ে থাকত আর খড় কাদার সেই চেনা গন্ধটা বুক ভরে টেনে নিত। সে দেখত কীভাবে সাধারণ বাঁশ আর খড়ের একটা কাঠামোকে বাবা তাঁর জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় আস্তে আস্তে একটা জীবন্ত রূপ দিয়ে তুলছেন।
কিন্তু এই সব কিছুর মাঝে সনাতনের মনে একটা মস্ত বড় প্রশ্ন দানা বেঁধেছিল যা সে সহজে কাউকে বলতে পারত না কারণ সে একটু লাজুক স্বভাবের ছিল। সে খেয়াল করেছিল যে তার বাবা যখনই প্রতিমার মূল অঙ্গ তৈরি করা শেষ করে একদম শেষ প্রলেপটা দিতে যেতেন, তখন ঘরের এক কোণায় লুকিয়ে রাখা একটা লাল কাপড়ে মোড়া কিছু বের করতেন। সেই লাল কাপড়ের ভেতর থাকত এক অদ্ভুত লালচে রঙের কিছুটা মাটি যা বাবা খুব যত্ন করে এনে আসল মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতেন। সনাতন অনেক দিন ধরে এটা লক্ষ্য করছিল কিন্তু বাবাকে কাজের সময় বিরক্ত করতে ভয় পেতে । অবশেষে একদিন যখন চারদিকের কোলাহল একটু কম ছিল তখন সে সাহস করে বাবার পিঠের কাছে গিয়ে দাঁড়াল এবং মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করেই ফেলল - বাবা, এই মাটিটা তুমি প্রতি বছর কোথা থেকে আনো? আর এটা কেন প্রতিমার গায়ে মেশাতে হয়? এটা না মেশালে কি মা দুর্গা রেগে যাবেন?
হরেন পাল তখন দেবীর ত্রিনয়ন অর্থাৎ চোখের মণি আঁকার জন্য তুলিটা রঙে ডোবাচ্ছিলেন। ছেলের এই কৌতূহল ভরা প্রশ্ন শুনে তিনি হাতের তুলিটা আলতো করে নামিয়ে রাখলেন এবং তাঁর ক্লান্ত দুটো চোখে এক অদ্ভুত মায়াবী আলো জ্বলে উঠল। তিনি সনাতনের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে নিজের খুব কাছে টেনে বসালেন এবং অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন বাবা, এটা কোনো সাধারণ নদীর বা মাঠের মাটি নয়। এটা হলো আমাদের সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত আর লাঞ্ছিত নিষিদ্ধ পল্লীর দরজার মাটি।
সনাতন এই কথা শুনে ভারী অবাক হয়ে গেল কারণ সে বড়দের মুখে শুনেছে যে সেই সব জায়গায় ভালো মানুষেরা যায় না। হরেন পাল তখন ছেলের মনের সংশয় দূর করার জন্য বললেন সমাজ যাঁদের অপবিত্র বা খারাপ বলে দূরে ঠেলে দেয় মা দুর্গার মূর্তি গড়ার জন্য তাঁদের ঘরের মাটিই সবচেয়ে আগে প্রয়োজন হয়, কারণ এর পেছনে এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। যখন কোনো মানুষ সেই সমস্ত দরজায় পা রাখে তখন সে তার জীবনের সমস্ত পুণ্য ও মনের পবিত্রতা ওই দরজার বাইরে ফেলে রেখে তবেই ভেতরে ঢোকে। তাই বছরের পর বছর ধরে ওই দরজার মাটি পৃথিবীর সমস্ত মানুষের পবিত্র পুণ্যকে নিজের বুকে ধারণ করে রেখেছে। মা আসলে আমাদের এই মাটির মাধ্যমেই শেখাতে আসেন যে তাঁর কাছে কোনো মানুষই ছোট নয় বা কোনো মানুষই অপবিত্র নয় এবং আমরা সবাই তাঁর সমান সন্তান।
বাবার মুখের এই কথাগুলো সনাতনের কচি মনে এক গভীর দাগ কেটে গেল এবং দেখতে দেখতে দিনগুলো পার হয়ে পূজার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলে এল। সনাতনদের নিজেদের হাতে তৈরি করা সেই অপরূপ প্রতিমাটি এবার শহরের সবচেয়ে বড় আর নামী মণ্ডপে আলো করে বসল যা দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছিল। ষষ্ঠীর দিন সকালবেলা যখন ঢাকের ওপর প্রথম কাঠি পড়ল আর সেই চেনা আওয়াজে চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠল তখন সনাতন মণ্ডপের এক অন্ধকার কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেবীর সেই অপরূপ শান্ত মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল দেবী যেন শুধু মাটি আর রঙের তৈরি কোনো মূর্তি নন তিনি যেন সত্যি সত্যি কৈলাশ পর্বত থেকে তাঁর চার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এই কদিনের জন্য নিজের বাপের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন।
সনাতন মণ্ডপে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল কত রকমের কত বৈচিত্র্যের মানুষ সেখানে আসছে। কেউ নতুন নতুন দামি জামা কাপড় পরে হাসিমুখে দল বেঁধে ঘুরছে, ছবি তুলছে, আবার কেউ মণ্ডপের একেবারে বাইরে ধুলোর মধ্যে বসে একটুখানি প্রসাদ পাওয়ার আশায় চাতকের মতো হাত পেতে অপেক্ষা করছে। ঠিক তখনই মণ্ডপের ঠিক মাঝখানে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যা সনাতনের মনের ভেতরের চিন্তাভাবনা আর দুর্গাপূজার পুরো গল্পটাকেই চিরদিনের মতো বদলে দিল।
মণ্ডপের সেই চোখ ধাঁধানো আলো আর জাঁকজমকের মাঝখানে হুট করে কোথা থেকে একটা পাগল মতন মহিলা এসে ঢুকে পড়ল। তার গায়ে ছিল নোংরা ছেঁড়া একটা শাড়ি আর মাথার চুলগুলো জট পাকিয়ে জংলি রূপ ধারণ করেছিল। তাকে দেখা মাত্রই মণ্ডপের পাহারাদারেরা লাঠি উঁচিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তেড়ে গেল এবং আশেপাশের ভদ্র মানুষেরাও তাকে দূর দূর করে তাচ্ছিল্য করতে লাগল যাতে তাদের গায়ে নোংরা না লেগে যায়। তীব্র ভয়ে আর আতঙ্কে সেই অসহায় মহিলাটি সোজা দৌড়ে গিয়ে প্রতিমার ঠিক পায়ের কাছে মা দুর্গার সিংহের পাশে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ল আর দেবীর মুখের দিকে চেয়ে খিলখিল করে আপন মনে হেসে উঠল।
সনাতন খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে এখন বুঝি সবাই মিলে তাকে মারধর করবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ঠিক সেই মুহূর্তে মণ্ডপের প্রধান পুরোহিত মশাই কিন্তু তাকে একটুও বকলেন না বা তাড়িয়ে দিলেন না। বরং তিনি শান্ত পায়ে এগিয়ে গেলেন এবং দেবীর চরণ থেকে একটা লাল পদ্মফুল তুলে নিয়ে পরম আদরে ওই পাগলির হাতে দিলেন এবং মায়ের থালা থেকে একটু প্রসাদ নিয়ে তাকে খেতে দিলেন।
পুরোহিত মশাই তখন চারপাশের সমস্ত রাগান্বিত মানুষের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে বললেন- আপনারা ওকে মারবেন না। কারণ মায়ের কাছে কোনো বাছবিচার নেই। যিনি দেশের বড় রাজরানী তিনিও মায়ের পরম আদরের মেয়ে আর এই যে অসহায় পাগলিনী ইনিও কিন্তু মায়েরই এক রূপ।
পুরোহিত মশাইয়ের এই কথা শুনে মণ্ডপের সমস্ত মানুষ শান্ত হয়ে গেল আর সনাতনের তখন এক ঝটকায় মনে পড়ে গেল তার বাবার বলা সেই নিষিদ্ধ পল্লীর মাটির আসল অন্তর্নিহিত কথাটি। সে তখন পরিষ্কার বুঝতে পারল যে দুর্গাপূজা মানে শুধু নতুন জামা কাপড়ের দেখনদারি বা আলোর রোশনাই নয় এর আসল অন্তরালের গল্পটা হলো ভালোবাসার সবাইকে বুকে টেনে নেওয়ার আর চারপাশের সমস্ত মানুষকে আপন করে নেওয়ার। মা দুর্গা প্রতি বছর এই মর্ত্যলোকে আসেন আমাদের ভেতরের লুকিয়ে থাকা অহংকার রাগ আর ভেদাভেদের অসুরকে নাশ করতে যাতে আমরা সবাই একে অপরকে ভালোবাসতে পারি।
দেখতে দেখতে চারটে দিন যেন চোখের পলকে কেটে গেল আর বিজয়া দশমীর সেই বিষণ্ণ দিনটি এসে উপস্থিত হলো যখন প্রতিমা বিসর্জনের জন্য মণ্ডপ থেকে বের করে গঙ্গার ঘাটের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। চারদিকের সিঁদুর খেলা আর ঢাকের আওয়াজের মাঝখানে সনাতনের চোখ ফেটে জল চলে আসছিল কারণ তার মনে হচ্ছিল তার নিজের ঘরের কেউ যেন তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
কিন্তু গঙ্গার ঘাটে
যখন প্রতিমা জলে নিরঞ্জন হয়ে গেল তখন তার মনের ভেতর আর কোনো গভীর দুঃখ বা কষ্ট অবশিষ্ট
ছিল না কারণ সে ততক্ষণে নিজের মনের ভেতর এক পরম সত্য জেনে গেছে। সে বুঝতে পেরেছে যে
মা আসলে কোথাও চলে যান না তিনি প্রতি বছর উমা সেজে আমাদের এই বাপের বাড়িতে আসেন আমাদের
সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়ে যেতে। মা দুর্গা প্রতিটি মানুষের মনের মণিকোঠায় একতার
ভালোবাসার আর সহানুভূতির যে সুন্দর গল্পটা রেখে যান সেটাই আসলে সারা বছর ধরে সমস্ত
সাধারণ মানুষকে পৃথিবীর বুকে সমস্ত লড়াইয়ের মাঝে বেঁচে থাকার এক পরম শক্তি জোগায়।



No comments:
Post a Comment