![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
সুপরামর্শ
সুজিত মণ্ডল
বসন্তের সকালগুলোর একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। না শীত, না গরম। জানালা খুললেই মনে হয়, প্রকৃতি যেন আলতো করে কাঁধে হাত রেখে বলছে—“কেমন আছ?” এমন ভোরে বেশিরভাগ মানুষ তখনও ঘুমের সঙ্গে আপস-রফা করছে। কিন্তু সুমন রায় সেই দলের নন। তিনি পেশায় আইনজীবী। ভোরবেলা উঠে এক কাপ লিকার চা হাতে আইনের মোটা মোটা বই খুলে বসাই তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। আদালতে প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডাতে হলে দিনের শুরুটা যুক্তির সঙ্গেই হওয়া চাই– এটাই তাঁর বিশ্বাস।
সেই দিনও তার ব্যতিক্রম হলো না। ইংরেজি আইনের মোটা বই খুলে "Evidence Act" পড়ছেন, এমন সময় বাইরে থেকে ভেসে এল এক নারীকণ্ঠ,
— “ও ঠাকুরপো... বাড়িতে আছো?”
সুমনবাবু চশমার ফাঁক দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন। ভোরবেলা! ক্লায়েন্ট আসার সময় তো এখনও হয়নি! তিনি দরজার ভেতর থেকেই বললেন,
— “আছি... কিন্তু কে বলছেন?”
— “আমি নির্ঝরদার বউ, স্বপ্না। পাশের গ্রাম থেকে এসেছি।”
— “আচ্ছা, একটু দাঁড়ান, দরজা খুলছি।”
দরজা খুলতেই মাঝবয়সি এক ভদ্রমহিলা, কপালে বড় লাল টিপ, হাতে জপমালা, মুখে অদ্ভুত গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে।
দেখে মনে হচ্ছে, দেশের বড় কোনও সাংবিধানিক সংকটের সমাধান চাইতে এসেছেন।
সুমনবাবু ভদ্রভাবে বললেন,
— “ভেতরে আসুন।”
মহিলা ঘরে ঢুকে চারদিকে একবার তাকিয়ে ধীরে ধীরে বসলেন।
সুমনবাবু বুঝলেন, বিষয়টা নিশ্চয়ই গুরুতর। হয়তো জমিজমা, হয়তো পারিবারিক বিবাদ, না হয় উত্তরাধিকার মামলা। তিনি নোটবই খুলে কলম হাতে নিলেন।
— “হ্যাঁ, বলুন।”
মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “ঠাকুরপো... আমি সারারাত একফোঁটা ঘুমোতে পারিনি।”
সুমনবাবু একটু চিন্তিত।
— “শরীর খারাপ নাকি?”
— “না গো।”
— “তাহলে?”
— “ডাক্তারেও লাভ হবে না।”
এবার সুমনবাবু পুরো বিভ্রান্ত। আইনের বই বন্ধ করে বললেন,
— “তা হলে সমস্যাটা কী?”
মহিলা চারদিকে তাকিয়ে যেন নিশ্চিত হলেন, আর কেউ শুনছে না। তারপর নিচু গলায় বললেন,
— “আমাদের এক গুরু ভাই...”
— “হুঁ।”
— “...এক গুরুবোনকে নিয়ে পালিয়েছে।”
সুমনবাবু কলম থামিয়ে দিলেন। মনে মনে বললেন, এ আবার কেমন মামলা! তবু গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন,
— “কোথায় পালিয়েছে?”
— “শুনেছি কাটোয়া দিকেই।”
— “তাতে আপনার সমস্যা?”
মহিলা যেন অবাক।
— “সে কী ঠাকুরপো! এত বড় ঘটনা! আমি সারারাত ঘুমোতে পারিনি।”
— “কিন্তু আপনার তো কোনও ক্ষতি হয়নি!”
— “ক্ষতি হয়নি মানে? সমাজের কত বড় কলঙ্ক!”
সুমনবাবু একটু হেসে ফেললেন।
হাসিটা চেপে রেখে বললেন,
— “আচ্ছা, আপনি চান আমি কী করি?”
মহিলা যেন আশার আলো দেখলেন।
— “তুমিই একটা উপায় বলো।”
— “আইনগত ব্যবস্থা?”
— “না না... মানে... কী করলে পাপ কাটবে?”
সুমনবাবু এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে একটু ভেবে বললেন,
— “আমার একটা পরামর্শ আছে।”
মহিলা উৎসুক হয়ে সামনে ঝুঁকলেন।
— “বল ঠাকুরপো।”
সুমনবাবু সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত মুখে বললেন,
— “আপনিও একজন গুরু ভাইকে নিয়ে পালিয়ে যান।”
দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড। চার সেকেন্ড... মহিলা যেন বজ্রাহত! তারপর দু’হাত মাথায় দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
— “হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ! এ কী পরামর্শ দিলে ঠাকুরপো!”
সুমনবাবু শান্ত গলায় বললেন,
— “কেন? ওঁরা যা করেছেন, আপনিও করলে তো সমান সমান হয়ে যাবে!”
— “ছি! ছি! আমি তো আইনি পরামর্শ চাইতে এসেছিলাম!”
— “আমিও তো আইনের ভাষাতেই বললাম। সমতা বজায় রাখতে হবে।”
মহিলা উঠে দাঁড়ালেন।
মুখে শুধু,
— “হরে কৃষ্ণ... হরে কৃষ্ণ... ভগবান, সবাইকে সুমতি দাও!”
দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে আবার ফিরে বললেন,
— “আজ থেকে কাউকে বলব না যে উকিলদের কাছে বুদ্ধি চাইতে হয়!”
সুমনবাবু মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,
— “আর আমি আজ থেকে বুঝলাম, সব সমস্যার সমাধান আদালতে হয় না; কিছু সমস্যার বিচার মানুষের মাথার ভেতরেই আটকে থাকে।”
মহিলা জপমালা ঘোরাতে ঘোরাতে চলে গেলেন। সুমনবাবু আবার আইনের বই খুললেন। কিন্তু "Evidence Act"-এর অক্ষরগুলোও যেন সেদিন মুচকি মুচকি হাসছিল। কারণ, আদালতে যত বিচিত্র মামলা আসে, জীবনের আদালতে তার চেয়েও বিচিত্র মানুষ আসে– আর সেই মানুষগুলোই আইনজীবীদের জীবনের সবচেয়ে বড় “কেস স্টাডি” হয়ে থেকে যায়।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment