1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label রম্যরচনা. Show all posts
Showing posts with label রম্যরচনা. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

পঞ্চবাণ

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

পঞ্চবাণ

সবিতা রায় বিশ্বাস

“বাবা মদন, বলি এসব হচ্ছেটা কী? তুমি আর রতি সারাক্ষণ প্রেমে মত্ত হয়ে আছো, ওদিকে যে পৃথিবী প্রেমশূণ্য  হয়ে গেল সে খেয়াল আছে?”

“প্রণাম গ্রহণ করুন প্রজাপতি ব্রহ্মা| আপনার কথাটা আমি সম্পূর্ণ মানতে পারলাম না পিতা, আমি তো অহরহ শুনছি সকলে গাইছে, “এল ওই বনান্তে পাগল বসন্ত”, “বসন্ত মুখর আজি”, বসন্ত এল এল এল রে”, “বসন্ত এসে গেছে”, “আহা আজি এ বসন্তে”-

“থামো মদন থামো| গড়গড় করে স্কুলের ছাত্রের মতো গানের প্রথম লাইন বলে যেও না| কথায় আছে, ‘ফলেন পরিচীয়তে বৃক্ষঃ’| তা তুমি যে পুষ্পশর নিক্ষেপ করছ তার প্রমাণ তো মিলছে না, জন্মের পরিসংখ্যান তো সে কথা বলছে না|”

“প্রভু এখন মর্ত্যের মানুষ খুব হিসাবী, গণিতে পারদর্শী তাই ‘ফার্টিলাইজেশন’ হচ্ছে না| তাহলে কি করে পরিসংখ্যান বাড়বে?”

“বেশ! এবার তোমার ধনুর্বাণ নিয়ে এসো, দেখি কেমন অবস্থায় আছে| যদি কিছুর প্রয়োজন হয় আনিয়ে নেবে| খরচের টাকা মিসসেলিনিয়াস ডেবিট করে দিয়ে দেব|”

“না, মানে আবার এসবের কি দরকার প্রভু? যদি কিছুর প্রয়োজন হয় আমি আপনাকে বলব| আপনি একটু বিশ্রাম নিন|”

“কথা ঘুরিয়ো না কামদেব| আমি ব্যালেন্স শীট গোঁজামিল দিয়ে মিলিয়ে দিই না| রতি তোমাকে ইশারা করছে, তাই তো! রতির ইশারায় সাড়া দিয়ে তোমার কাজ ঠিকমত না করলে তোমাকে আমি সাসপেন্ড করে দেব| তখন বুঝবে মজা! রতি তোমাকে পতি বলে মানবে না|”

মদনদেব খুব মুশকিলে পড়ে গেল, ধনুকটি ইক্ষুনির্মিত| গুণটি মৌমাছি দিয়ে তৈরী| বহুদিন ধনুক ব্যবহার না করার ফলে মৌমাছিরা ইক্ষুর মিষ্টি রস খেয়ে ছিবড়ে করে ফেলেছে| বাণ ছিল পাঁচটি সুগন্ধি ফুল, অশোক, শ্বেত ও নীল পদ্ম, মল্লিকা ও আম্রমঞ্জরী দিয়ে তৈরী| যা হয়! দীর্ঘদিন ব্যবহার না করে সব ফুল শুকিয়ে ঝরে গিয়েছে| এখন পিতা ব্রহ্মাকে কি দেখাবে মদন? এসবের মূলে রতি, সারাক্ষণ কামদেবকে নিয়ে নাচে-গানে মত্ত| কামদেব ভুলেই গিয়েছিল ধনুর্বাণ নিক্ষেপ করার কথা|

রতিদেবীরও খুব খারাপ লাগছে, এদিকে বসন্ত যায়, যায়| এই বসন্তে পঞ্চশর নিক্ষেপ করতে না পারলে কামদেবের চাকরি থাকবে না| আর দেরী করা ঠিক হবেনা, আজ রাতেই ইক্ষুদন্ড সংগ্রহ করতেই হবে| মদনদেব আর রতিদেবী হাত ধরাধরি করে ‘জ্যোত্স্নারাতে সবাই গেছে বনে’ গাইতে গাইতে আখের মাঠে না গিয়ে মল্লিকাবনে নেমে পড়লেন| গন্ধে মাতাল হয়ে আসল কাজ ভুলে গাইতে লাগলেন, ‘আমার মল্লিকাবনে যখন প্রথম ধরেছে কলি’|

গানে বাধা পড়ল, দুইটি নারী পুরুষের ঝগড়া কানে এল, “তোমার মুরোদ আমার বোঝা হয়ে গেছে| আমারই ভুল হয়েছিল, তোমার রূপ দেখে মজেছিলাম| মা বারবার করে বলেছিল, পুরুষমানুষের রূপ কোনো কাজে লাগেনা| টাকা না থাকলে প্রেম ভালোবাসা দু’দিনেই ঘুলঘুলি দিয়ে পালিয়ে যাবে|”

“তা তোমার মায়ের কথা শুনলেই পারতে! এখন আমার জীবনটা আমসত্ব করে দিলে, কোথায় বৌকে একটু আদর সোহাগ করবো! টাচ করলেই শক লাগছে|”

কামদেব আর রতির হুঁশ ফিরল, তাই তো মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে| এরকম অবস্থা হলে পপুলেশন জিরোতে পৌঁছে যাবে| ঝট করে প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করে স্বর্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল| চারিদিকে বহুতলের ছড়াছড়ি, ইক্ষুদন্ড কাঁচের দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে| রতি বলল, “প্রভু এইসব বহুতলের নারী পুরুষ এত রাত্রে কেউ কাউকে আলিঙ্গন না করে হাতের যন্ত্রে কি দেখছে?”

“এটাই তো আসল সমস্যা প্রিয়ে, এরা বিচরণ করে ভার্চুয়াল জগতে, প্রেম করে সেখানে| শুধু কি প্রেম? তুমুল ঝগড়াও করে| কিন্তু ঝগড়ার পরে মিলন হয় না, কারণ সবই তো সোশ্যাল মিডিয়ার খেলা|”

“প্রজাপতি ব্রহ্মা কি এসব জানেন না? শুধু শুধু আমাদের দোষ দিচ্ছেন?”

“না, না দেবী| আমাদেরও কিছু ভুল আছে বৈকি! আমরা নিজেদের নিয়ে মত্ত ছিলাম এদেরই মত| তাই তো পৃথিবী আজ প্রেমহীন| ঠিক প্রেমহীন বলাও যায় না, আসলে কোনো কিছুরই গভীরতা নেই|”

ওদিকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু দু’জনেই চিন্তিত ও বিরক্ত| মদনদেব কি নিজের নাম ডোবাবে? বারবার বলা সত্ত্বেও তাদের পঞ্চবাণ নিক্ষেপ করার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না| অনেক কষ্টে বসন্তের ট্রান্সফার কয়েকদিন ডিলে করে দিয়েছি| ব্রহ্মা বাইনোকুলার দিয়ে দেখলেন, মদনদেব ধনুর্বাণ কাঁধে নিয়ে রতিদেবীকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের কাঁচের জানলা দিয়ে উঁকি মারছে| নিজের মনেই বলতে লাগলেন, “আরে বাবা! উঁকি, ঝুঁকি, টুকি যাই দিস না কেন, কোনো লাভ হবে না| আহাম্মক নাম ওখান থেকে| বিগবাজার, স্মার্টবাজার, আইনক্স, সিটি সেন্টার, বড়বাজার, গড়িয়াহাট, ময়দান এসব জায়গায় গিয়ে পঞ্চশর নিক্ষেপ কর| দেখি লোকে প্রেমে না পড়ে যায় কোথায়?

মদন আর রতি প্রজাপতি ব্রহ্মার কথা শুনেছিল কিনা জানা যায়নি| তবে পঞ্চশর নিক্ষেপ করেছিল নিশ্চয়| লোকজন ঝপাঝপ প্রেমে পড়তে লাগল, চোখে ধুতরো ফুল দেখতে লাগল| আসলে হয়েছে কি! দেখতে ভালো লাগবে বলে রতিদেবী ধুতরো ফুল দিয়ে ধনুক সাজিয়েছিলেন| পুলিশদের কাজের চাপ বেড়ে গেছে, যত্র তত্র মিলন ঠেকাতে লাঠি হাতে টহল দিতে হচ্ছে|

ব্রহ্মা, বিষ্ণু দুই দেবতাই খুব খুশি| ঢেঁকি নারদেরও আহ্লাদের অন্ত নেই| যত বেশি প্রেম তত বেশি বিরহ| বিরহ মানেই ঝগড়া, নারদ তো ঝগড়া ডিপার্টমেন্টের হেডমাস্টার| যা কান্ড ঘটতে লাগল সে আর বলার নয়, ছেলেমেয়েরা কখন যে কে কার প্রেমে পড়ছে বলা মুশকিল| প্রেম করতে করতে ঝগড়া করছে, ঝগড়া করতে করতে প্রেম| তাদের মা, বাবারাও বাদ যাচ্ছে না| তাই বলে সোশ্যাল মিডিয়াকে আটকানো যাচ্ছে না কিছুতেই| এই ব্যাপারটার দায়িত্ব নিলেন মহেশ্বর| দেখা যাক কি হয়! যদিও জগৎজননী উমা বলেছেন, “পাগলা ভোলা এ তোমার কম্ম নয়| তুমি নন্দী ভৃঙ্গীকে নিয়ে গাঁজায় দম দাও|”

এত বেশি প্রজার আগমনবার্তা রেজিস্টারে লিখতে লিখতে প্রজাপতি ব্রহ্মার আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল| বিষ্ণু বললেন মদনদেব আর রতিদেবীকে পুরস্কার স্বরূপ আসামের দেওয়ানগিরি পাহাড়ের ‘মদন কামদেব দেবালয়’ দিলেন| ওদের জন্যেই এ যাত্রায় স্বর্গের সিংহাসন অটুট রইল| মর্ত্যে প্রজা না থাকলে স্বর্গে দেবতারা মূল্যহীন|


সুপরামর্শ

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

সুপরামর্শ

সুজিত মণ্ডল

বসন্তের সকালগুলোর একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। না শীত, না গরম। জানালা খুললেই মনে হয়, প্রকৃতি যেন আলতো করে কাঁধে হাত রেখে বলছে—“কেমন আছ?” এমন ভোরে বেশিরভাগ মানুষ তখনও ঘুমের সঙ্গে আপস-রফা করছে। কিন্তু সুমন রায় সেই দলের নন। তিনি পেশায় আইনজীবী। ভোরবেলা উঠে এক কাপ লিকার চা হাতে আইনের মোটা মোটা বই খুলে বসাই তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। আদালতে প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডাতে হলে দিনের শুরুটা যুক্তির সঙ্গেই হওয়া চাই– এটাই তাঁর বিশ্বাস।

সেই দিনও তার ব্যতিক্রম হলো না। ইংরেজি আইনের মোটা বই খুলে "Evidence Act" পড়ছেন, এমন সময় বাইরে থেকে ভেসে এল এক নারীকণ্ঠ,

— “ও ঠাকুরপো... বাড়িতে আছো?”

সুমনবাবু চশমার ফাঁক দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন। ভোরবেলা! ক্লায়েন্ট আসার সময় তো এখনও হয়নি! তিনি দরজার ভেতর থেকেই বললেন,

— “আছি... কিন্তু কে বলছেন?”

— “আমি নির্ঝরদার বউ, স্বপ্না। পাশের গ্রাম থেকে এসেছি।”

— “আচ্ছা, একটু দাঁড়ান, দরজা খুলছি।”

দরজা খুলতেই মাঝবয়সি এক ভদ্রমহিলা, কপালে বড় লাল টিপ, হাতে জপমালা, মুখে অদ্ভুত গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে।

দেখে মনে হচ্ছে, দেশের বড় কোনও সাংবিধানিক সংকটের সমাধান চাইতে এসেছেন।

সুমনবাবু ভদ্রভাবে বললেন,

— “ভেতরে আসুন।”

মহিলা ঘরে ঢুকে চারদিকে একবার তাকিয়ে ধীরে ধীরে বসলেন।


সুমনবাবু বুঝলেন, বিষয়টা নিশ্চয়ই গুরুতর। হয়তো জমিজমা, হয়তো পারিবারিক বিবাদ, না হয় উত্তরাধিকার মামলা। তিনি নোটবই খুলে কলম হাতে নিলেন।

— “হ্যাঁ, বলুন।”

মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— “ঠাকুরপো... আমি সারারাত একফোঁটা ঘুমোতে পারিনি।”

সুমনবাবু একটু চিন্তিত।

— “শরীর খারাপ নাকি?”

— “না গো।”

— “তাহলে?”

— “ডাক্তারেও লাভ হবে না।”

এবার সুমনবাবু পুরো বিভ্রান্ত। আইনের বই বন্ধ করে বললেন,

— “তা হলে সমস্যাটা কী?”

মহিলা চারদিকে তাকিয়ে যেন নিশ্চিত হলেন, আর কেউ শুনছে না। তারপর নিচু গলায় বললেন,

— “আমাদের এক গুরু ভাই...”

— “হুঁ।”

— “...এক গুরুবোনকে নিয়ে পালিয়েছে।”

সুমনবাবু কলম থামিয়ে দিলেন। মনে মনে বললেন, এ আবার কেমন মামলা! তবু গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন,

— “কোথায় পালিয়েছে?”

— “শুনেছি কাটোয়া দিকেই।”

— “তাতে আপনার সমস্যা?”

মহিলা যেন অবাক।

— “সে কী ঠাকুরপো! এত বড় ঘটনা! আমি সারারাত ঘুমোতে পারিনি।”

— “কিন্তু আপনার তো কোনও ক্ষতি হয়নি!”

— “ক্ষতি হয়নি মানে? সমাজের কত বড় কলঙ্ক!”

সুমনবাবু একটু হেসে ফেললেন।

হাসিটা চেপে রেখে বললেন,

— “আচ্ছা, আপনি চান আমি কী করি?”

মহিলা যেন আশার আলো দেখলেন।

— “তুমিই একটা উপায় বলো।”

— “আইনগত ব্যবস্থা?”

— “না না... মানে... কী করলে পাপ কাটবে?”

সুমনবাবু এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।

চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে একটু ভেবে বললেন,

— “আমার একটা পরামর্শ আছে।”

মহিলা উৎসুক হয়ে সামনে ঝুঁকলেন।

— “বল ঠাকুরপো।”

সুমনবাবু সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত মুখে বললেন,

— “আপনিও একজন গুরু ভাইকে নিয়ে পালিয়ে যান।”

দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড। চার সেকেন্ড... মহিলা যেন বজ্রাহত! তারপর দু’হাত মাথায় দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,

— “হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ! এ কী পরামর্শ দিলে ঠাকুরপো!”

সুমনবাবু শান্ত গলায় বললেন,

— “কেন? ওঁরা যা করেছেন, আপনিও করলে তো সমান সমান হয়ে যাবে!”

— “ছি! ছি! আমি তো আইনি পরামর্শ চাইতে এসেছিলাম!”

— “আমিও তো আইনের ভাষাতেই বললাম। সমতা বজায় রাখতে হবে।”

মহিলা উঠে দাঁড়ালেন।

মুখে শুধু,

— “হরে কৃষ্ণ... হরে কৃষ্ণ... ভগবান, সবাইকে সুমতি দাও!”

দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে আবার ফিরে বললেন,

— “আজ থেকে কাউকে বলব না যে উকিলদের কাছে বুদ্ধি চাইতে হয়!”

সুমনবাবু মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,

— “আর আমি আজ থেকে বুঝলাম, সব সমস্যার সমাধান আদালতে হয় না; কিছু সমস্যার বিচার মানুষের মাথার ভেতরেই আটকে থাকে।”

মহিলা জপমালা ঘোরাতে ঘোরাতে চলে গেলেন। সুমনবাবু আবার আইনের বই খুললেন। কিন্তু "Evidence Act"-এর অক্ষরগুলোও যেন সেদিন মুচকি মুচকি হাসছিল। কারণ, আদালতে যত বিচিত্র মামলা আসে, জীবনের আদালতে তার চেয়েও বিচিত্র মানুষ আসে– আর সেই মানুষগুলোই আইনজীবীদের জীবনের সবচেয়ে বড় “কেস স্টাডি” হয়ে থেকে যায়।



গ্যাঁজারু ভোম্বলদার বিশ্বকাপ দর্শন

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

গ্যাঁজারু ভোম্বলদার বিশ্বকাপ দর্শন  

চন্দন ঘোষ

মনিদার চায়ের দোকানে আমরা সবাই মাটির ভাঁড়ে তারিয়ে তারিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি, এমন সময় আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে ভোম্বলদা বললেন - বুঝলি, আমি বিশ্বকাপের খেলা দেখতে কানাডা, মেক্সিকো আর আমেরিকা যাচ্ছি। দেড় মাস পরে ফিরব। তোদের বলিনি মনখারাপ হবে বলে। ভিসা, হোটেল আর ফ্লাইটের টিকিট সব রেডি হয়ে গেছে। 

সে কি দাদা, এই এতো বড় খবরটা চেপে গেছেন? পেট ফুলে যায়নি আপনার? 

সে আবার যায় নি? তোদের বলব, আর তোরা মুখ আমসি করে শুনবি, সেটা ভেবেই এত দিন বলিনি। ভেবেছিলাম বলব না। কিন্তু বলেই ফেললাম তোদের। কোন কথা আমি চেপে রাখতে পারি না। এটাকে তোরা আমার বদভ্যেস বল কিংবা সুভ্যেস বল।    

একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। আমাদের না বললে আপনার পেট ফুলে ঢোল হয়ে যেত, পেটে গ্যাস জমে যেত, আর আপনার যাওয়াও ক্যানসেল হয়ে যেত। 

আর বলিস না। ভেবেছিলাম এখানে বসে তোদের সাথেই খেলা দেখাটা এনজয় করব। আমার যাওয়ার একটুও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ওই ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনো এমন করে আমায় যাওয়ার জন্যে অনুরোধ করলেন যে ওনাকে না বলতে পারলাম না। আমার খেলাও দেখেছেন – না, না, সামনা সামনি মাঠে নয়, ভিডিও তে। আমার খেলার ভিডিও ক্যাসেটগুলো অনলাইনে কিনে ইউরোপের আর ল্যাটিন আমেরিকার  ফুটবল ক্লাবগুলোকে বিলি করেছেন। আমাকে বললেন, এখনকার প্লেয়ারগুলো তো আমার খেলা দেখেই বড় হয়েছে। আমি গেলে মেসি, রোনালদো, এমবাপে, নেইমার, হ্যারি কেইন – এরা কতো উৎসাহিত হবে বলুন তো? আপনাকে সামনে দেখলে ওরা আরও ভালো খেলার জন্যে অনুপ্রানিত হবে। আপনাকে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে আসতেই হবে স্যার।        

উনি নিজে থেকেই আমার ভিসা, থাকার জন্যে হোটেল বুকিং, ফ্লাইটে আসা যাওয়ার টিকিট সব করে দিয়েছেন। আবার বলেছেন ওখানে খাওয়া দাওয়া ঘোরাঘুরির জন্যে ডেইলি পকেটমানিও দেবে। মানে বুঝিয়ে দিয়েছেন আমার এক পয়সাও খরচ হবে না। এই সব ভেবে দেখলাম এমন সুযোগ বার বার আসে না। খেলা দেখার জন্যে ওপেন টিকিট দিয়েছেন। যে কোন দিন, যে কোন স্টেডিয়ামে, যে কোন টিমের ম্যাচ দেখার সুযোগ। ভিআইপি গেস্টরুমে বসে খেলা দেখার ব্যবস্থা।    

তবে চিন্তা করিস না। ভিডিও কনফারেন্সিং কলে আমি তোদের সাথে যোগাযোগ রাখব। খেলার আপডেটস দেব। এমনিতে তো তোরা রোজই টিভিতে খেলা দেখবি। মাঝে মধ্যে ক্যামেরা ভি আই পি গেস্টের দিকে ঘোরালে আমাকেও দেখতে পাবি। 

জিজ্ঞেস করলাম, ভোম্বলদা, তাহলে যাচ্ছেন কবে? ব্যাগ গোছাতে কিংবা কিছু দরকার হলে জানাবেন, কিনে এনে দেব। প্রয়োজনে আপনাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়ে আসতেও পারি। 

না, না, কোন কিছু কিনে এনে দিতে হবে না। একি আমি গোবরডাঙ্গাতে যাচ্ছি যে অনেক কিছু কিনে নিয়ে যেতে হবে? যেখানে যাচ্ছি, সেখানে সব কিছুই পাওয়া যায়। জিয়ান্নি কে শুধু একবার বললেই হবে। 

মেক্সিকোর সিটি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ দেখাচ্ছে টিভিতে। আমরা হুমড়ি খেয়ে টিভির সামনে বসে দেখছি যদি একবারের জন্যে ভোম্বলদাকে দেখতে পাই। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে। ভোম্বলদা তো আর নিজে থেকে ফোন করবেন না। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালাম – দাদা, গিয়ে থেকে তো আর ফোন করলেন না। আজ রাতের ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আপনাকে ভিডিও কল করব। প্লিজ ধরবেন। 

রাত একটার সময় ভোম্বলদাকে ফোনে ধরলাম। চারিদিকে অন্ধকার। দেশলাইয়ের কাঠির আগুনে যেটুকু ওনার মুখ দেখা যায়, সেটুকুই দেখা যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, আপনার রুমের লাইট টা জ্বালুন, আপনার হোটেলের রুমটা দেখি। আপনার মুখটা ভালো করে দেখি। কতদিন পরে আপনাকে দেখছি বলুন তো? ভালো আছেন তো? 

ভোম্বলদা আমার সাথে ফিসফিস করে কথা বলছেন – যেন অন্য কেউ ওনার কথা শুনতে না পায়। 

হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি খুব ভালো আছি। রুমের লাইট জ্বালতে পারব না। সবাই জেনে যাবে যে আমি রুমে আছি। আর বলিস না, আমি যে এতো পপুলার আগে জানতাম না। রুমের বাইরে রিপোর্টাররা সব ক্যামেরা হাতে বসে আছে। যার খেলা দেখে আজকের মেসি, নেইমার, এমবাপে, রোনালদোরা ফুটবল খেলা শিখেছে, তাকে দেখবে বলে, তার একটা ইন্টারভিউ নেবে বলে হাঁ পিত্যেশ করে বসে আছে। খুব জ্বালা রে এখানে। সব সময় লুকিয়ে চুরিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। একটা বোরখা কিনেছি। মুখ মাথা ঢেকে ওটা পরেই বেরোচ্ছি। 

দাদা, আপনার শরীর ভালো আছে তো? কেমন খেলা দেখছেন? 

খুবই ভালো আছি। খেলার কথা আর বলিস না। আজ এ শহরে তো কাল ও শহরে। এবেলা এই স্টেডিয়ামে তো ওবেলা আরেকটা স্টেডিয়ামে। আহা, স্টেডিয়ামগুলো দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। কি বিশাল যে বলে বোঝানো যাবে না। অনেক ছবি তুলেছি। পরে দেখাব।

দাদা, প্লেয়ারদের সাথে আলাপ পরিচয় হয়েছে? 

বাব্বা, সেটা আবার হয়নি? প্রত্যেকটা দেশের কোচ ওদের ম্যাচের আগে আমাকে নিয়ে গেছেন ওদের ম্যাচের ড্রেসিংরুমে। সব প্লেয়ারদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। যা বুঝলাম, এবার মাঠ কাঁপাবে এমবাপে। মাত্র সাতাশ বছর বয়েস। কালো হরিণ। ওকে দেখে আমাদের বিদেশ বসুর কথা মনে পড়ে গেল। কি খেলত ছেলেটা। ওকেও বাংলার দর্শকরা কালো হরিণ বলে ডাকত। 

আমি দশটা প্লেয়ারের নাম বলছি, লিখে রাখ। খেলা তো দেখছিস, এদের মার্ক করে রাখবি। আমার চোখ আসল মুক্তো চিনে নিতে দেরি করে না। এদের খেলার স্টাইল পুরোটাই আমার মতন। মানে ভালো করে আমার ভিডিও ফলো করেছে। হ্যাঁ, লেখ, ওরা হল – লিওনেল মেসি, রোনালদো,  কাইলিয়ান এমবাপ্পে, ল্যামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম, এরলিং হ্যালান্ড, পেড্রি, ভিনিসিয়াস জুনিয়ার, রড্রি, জামাল নুসিয়ালা আর হ্যারিকেন। 

দাদা, বললেন দশটা প্লেয়ারের নাম বলবেন। কিন্তু এগারোটা বললেন কেন?

ওঃ তাই বুঝি? তাহলে লাস্টের নামটা বাদ দিয়ে দে। দেখবি ও ইংল্যান্ডের হাতে হেরিকেন ঝুলিয়েই ছাড়বে।

শোন, বেশিক্ষন কথা বলতে পারব না। আমার মোবাইলে চার্জ কমে আসছে। এখন ছাড়ছি। বাকি খবর আমি তোকে টেক্সট করে দেব। বাই। সাবধানে থাকিস। আর একটা কথা, এবার থেকে ভিডিও কল করবি না। শুধু ভয়েস কল করবি। এখানে চারদিকে হ্যাকাররা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার পেগাস্যাসে ফোন ট্যাপ করে আমার ভিডিও বাজারে ভাইরাল করে ছেড়ে দেবে। আবার পরে কথা হবে কেমন?   

কোয়ার্টার ফাইনালের খেলা চলছে তখন। একদিন রাতে আবার ফোন করলাম ভোম্বলদাকে। দাদা, খবর কি? কথা বলা যাবে এখন না কি ব্যস্ত আছেন? 

না, না, বল। কি জানতে চাইছিস বল। 

আপনার কথাগুলো এমন জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে কেন ভোম্বলদা? শরীর ঠিক আছে তো? 

হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার শরীর খুবই ভালো আছে। এখন একটু নিজেকে একা পেয়েছি। হোটেলের রুমে বসে আমি শশা দিয়ে মুড়ি খাচ্ছি। মুড়ি চিবোতে চিবোতে কথা বলছি বলে এরকম লাগছে।  

সময় কাটছে কেমন? খেলা দেখা ছাড়া বাকি সময় কি ঘুরে বেড়াচ্ছেন? 

আর ঘুরে বেড়ানো। মোবাইল ফোন অফ করে রাখতে হচ্ছে। ফাইনালের টিকিটের জন্যে সবাই যা বিরক্ত করছে যে বলার নয়। 

গতকাল আমার আশীর্বাদ নিতে এসেছিল সবচেয়ে বয়সে ছোট প্লেয়ার মেক্সিকোর গিলবার্তো মোরা। মাত্র আঠারো বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলছে ছেলেটা। ওকে আমি আর কি আশীর্বাদ করব। পাশেই দাঁড়িয়ে স্কটল্যান্ডের তেতাল্লিশ বছরের ক্রেইগ গর্ডন। এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সের প্লেয়ার। গিলবার্তো মোরা কে বললাম, আশীর্বাদ এনার কাছে নে। এতোগুলো বছর একটানা খেলে যাচ্ছেন। ক্ষমতা আছে। 

ওদের পেছনেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে মেসি আর রোনালদো। আমার অটোগ্রাফ নিতে এসেছে। ওদের অটোগ্রাফ বুকে সাইন দিয়ে বললাম, ভাই মেসি, বয়স তো কম হল না। দেখতে দেখতে থারটি নাইনে পা দিয়েছ। আর তুমি রোনালদো, তুমি তো এক কাঠি ওপরে। ফরটি ওয়ান। এটাই বোধহয় তোমাদের লাস্ট ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা। জান লড়িয়ে দিয়ে খেল। সারা পৃথিবী যেন তোমাদের খেলা মনে রাখে। আর একটা সাজেশন, দেশের জন্যে তো অনেক খেলেছ, এবার একটু নিজের জন্যে খেল। মানে যে ক্লাব বেশি দক্ষিনা দেবে, সেখানে খেল। আর তো কয়েকটা বছর পরে রয়েছে তোমাদের সামনে। যা পারো কামিয়ে নাও এই সময়।               

পিএসজির ম্যানেজার কাম কোচ লুইস এনরিকে মার্তিনেজ গার্সিয়া ওনার টিম বানানোর জন্যে আমার সাজেশন নিতে এসেছিলেন। ওনাকে বললাম, ফাইনাল পর্যন্ত ওয়েট করবেন না। এখনই নেইমার, মেসি আর এমবাপে কে সাইন করিয়ে রেখে দাও। ফাইনালের পরে ওদের আর খুঁজে পাবে না। অন্য কোন আরব কান্ট্রি ওদের নিয়ে নেবে অঢেল টাকায়।

এই কদিন আর আমায় ফোন করিস না। সেমিফাইনাল আর ফাইনালের ম্যাচ কভার করতে হবে। প্রি এন্ড পোস্ট ম্যাচের রিপোর্ট লেখা একটুখানি ব্যাপার নয়। আমি মোটামুটি জুলাইয়ের বাইশ তেইশ তারিখ নাগাদ ফিরব। বাকি কথা সামনা সামনিই হবে। 

তেইশে জুলাইয়ের ভোররাতে ফিরলেন ভোম্বলদা। না, না, আমরা কেউ যাইনি এয়ারপোর্টে ওনাকে রিসিভ করতে। গতকাল সন্ধ্যায় দেখা হল মনিদার চায়ের দোকানে। চোখ মুখ ফুলে গেছে ঘুমিয়ে। আহারে, কত ধকল গেছে ওনার শরীরের ওপর দিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, দাদা, আমাদের জন্যে কিছু আনেন নি? মানে বিশ্বকাপের কোন স্যুভেনির জাতীয়। 

স্যুভেনির এনেছিলাম রে। এয়ারপোর্টে লাগেজ বেল্টে একই রকম স্যুটকেস ছিল, পালটা পালটি হয়ে গেছে। বাড়িতে এসে খুলে দেখি হোটেলের বিছানার চাদর, তোয়ালে, প্লেট, চামচে ভর্তি। স্টিকারটাও ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি রাস্তায় আসার সময়। গিয়ে যে ফেরত দেব তাও হল না। যাক, তোদের লাগলে বলিস, দিয়ে দেব। 

না, না, কারোর ব্যবহার করা বিছানার চাদর, গামছা, তোয়ালে, এঁটো কাঁটা চামচের দরকার নেই আমাদের। আপনি সুস্থ শরীরে ফিরে এসেছেন এই আমাদের বড় পাওনা। পরে সময় করে যে ছবিগুলো তুলেছেন, সেগুলো দেখাবেন। 

সরি। ক্যামেরাটাও তো আমার ওই স্যুটকেসের মধ্যে ছিল। সেটাও গেছে। এই দ্যাখ, তোর বৌদির চারটে মিসড কল। বাড়ি যাই বুঝলি? 




Friday, January 13, 2023

দুমুখো সাপ

ছবি : ইন্টারনেট

দুমুখো সাপ
ডাঃ সৌভিক ব্যানার্জী

 'দুমুখো সাপ' বাস্তবে এরকম কোনো সাপ সত্যি আছে কিনা ভূ ভারতে তা হয়তো অনেকের জানা নেই, কিন্তু আমাদের আশেপাশে এইরকম  উদাহরণ ভূড়িভূড়ি। যেমন ধরুন, দোকানে মিষ্টি কিনতে গেলেন আর দোকানদার মিষ্টি হেসে মিষ্টি কথা বলে বাসি মিষ্টিটা আপনাকে খাইয়ে দিল - ব্যাস, দুমুখো সাপ। আবার ধরুন কোনো প্রাণের বন্ধুকে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে আপনি কিছু ব্যক্তিগত কথা বললেন। কিছুদিন পরে দেখলেন আপনার ব্যক্তিগত কথা সার্বজনীন হয়ে গেছে, দুমুখো সাপ। এবার একটু ভালোবাসা বিষয়ে কথা বলা যাক। আপনি আপনার প্রিয়তমা কে ভালোবেসে একটি গোলাপ ফুল দিলেন কোনো একটি বিশেষ দিনে আর সেই গোলাপ হয়তো আপনার প্রিয়তমার বিশ্বাসী হাত দিয়ে বিষবাসিনী হয়ে চলে গেল তার কোনো একজন ভালোলাগার মানুষের কাছে - দুমুখো সাপ থুড়ি সাপিনী।

আচ্ছা বলুন তো এই যে দুমুখচারিতা, এটা কার দোষ? সাপের না সাপুড়ের নাকি যে অমরসৃষ্টিকর্তা উপরে বসে আছেন তার? তাহলে একটা বিজ্ঞানের গল্প বলি শুনুন।

জীবনবিজ্ঞান বলে, দুমুখো সাপ নামভেদে ব্রাহ্মণী, দুমুখো সাপ দেখতে অনেকটা কেঁচোর মতন। কিন্তু কেঁচোর মতো এদের গায়ে কোনো খন্ডায়ন থাকে না। এদের মাথা আর ঘাড় স্পষ্টভাবে পৃথক নয়। এদের মাথা থেকে পা অবধি একই রকম দেখতে। মাথার দিক ও দেহের শেষের দিক একইরকম দেখতে বলে এদের দুমুখো সাপ বলা হয়। তবে এরা মাটির নিচে থাকতে বেশি পচ্ছন্দ করে এবং তাই এদের মাটি সাপও বলা হয়ে থাকে। আমাদের মতো দেশের মাটিতে এদের প্রচুর পাওয়া যায়। এরা কিন্তু জাতে সচরাচর নিশাচর কারণ এরা খুবই আলোকসংবেদী।

এতক্ষণ তো শুনলেন বিজ্ঞানের কথা কিন্তু শুধু বিজ্ঞানের কথা শোনাব বলে তো এই লেখা নয়। আমাদের সমাজে দুমুখো সাপের বিজ্ঞান হলো এই যে এরা মাটির নিচেই থাকে মানে লোকের পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়ে। প্রকাশ্যে আসার মতো সংবেদনশীলতা এদের নেই। আমাদের দেশে এর সংখ্যা অগুন্তি। তবে এদের মাথার পেছনে আরও একটা মুখ থাকে। আপনি কিন্তু এদের প্রকৃত মুখ কোনটা ধরতে পারবেন না। যেমন ধরুন এরা আপনাকে ভুল বুঝিয়ে দিয়ে খাটিয়ে এদের নিজেদের কাজ করিয়ে নেবে আর কাজ ফুরিয়ে গেলেই আপনার পেছনে আপনার কাজের সমালোচনা করবে। আপনার পেছনে আপনার কাজের কৃতজ্ঞতা, নৈব নৈব চ।

যাই হোক দিনের শেষে এদেরকে নিয়েই থাকতে হবে তাই এরপর থেকে মিষ্টি মুখে মিষ্টি হাসি দেখলেই কিন্তু সাবধান।

...(সমাপ্ত)...

Wednesday, January 12, 2022

ছাগ

 

ছবি  : ইন্টারনেট 

ছাগ

প্রদীপ বিশ্বাস

 

      নীলকান্ত সেন ক'দিন থেকে লক্ষ্য করছেন কোনো কিছু একটা বিষয়ে গভীরভাবে  ভাবতে গেলেই তার পেটের ডান দিকটা কেমন যেন তিরতির কাঁপে। যেন বাঁশবনে বসন্তের হাওয়া বইছে,  ভেরি ডিস্টার্বিং ।  

নীলুবাবু চিরকালই একটু ভাবুক প্রকৃতির সংবেদনশীল মানুষ । প্রকৃতি, সমাজ ,এসব নিয়ে একটু 'ডিপলি' ভাবতে পছন্দ করেন । ওটাই তার নেশা । প্রতি রাতে খাবার পর নিয়মমত অন্ধকার ঘরে চোখ বন্ধ করে উনি গভীর ভাবনায় লীন হয়ে যান। ভাবসাধন একধরনের। ঠিকমত না ভাবলে পরদিন সকালে তার কোষ্ট পরিষ্কার হয়না , সে এক আরো কষ্টের ব্যাপার । কিন্তু কদিন থেকে ভাবতে গেলেই তার  বুকের ডানদিকে একটা  আজব কাঁপুনি শুরু হয়ে যাচ্ছে। এ এক বিষম বিরক্তিকর  অনুভূতি।

 

বরবটির সবজি নীলুবাবুর খুব প্রিয় কুইজিন।  সেদিন রাতে, রুটি আর বরবটি ভাজা দিয়ে ডিনার সেরে নীলুবাবু ভাবতে গেলেন।এ সময় তাকে ডিস্টার্ব করা সম্পূর্ণ নিষেধ। সুন্দর ভাবে শুরু করেছিলেন গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে ভাবনা। গ্লেসিয়ার গলছে ..সি লেভেল বাড়ছে...।

 ঠিক সেই সময়ই  আবার তার বুকের ডান দিকে তিরতির কাঁপতে শুরু হলো। ঠিক যেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের ঝালা। ভাবার দফারফা। বিরক্ত নীলুবাবু ঘিলু ঠান্ডা করতে মাঝরাতে ব্যালকনিতে এসে দাড়ালেন। হালকা শীতল আবহাওয়া ,নিশ্চুপ পরিবেশ ।একফালি কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন , দেখলেন একটা ইউএফও  অনেক উঁচুতে মাঝআকাশ চিরে , জ্বলতে নিভতে থাকা বাতি জ্বালিয়ে মন্থর গতিতে মহাশূন্য মাপতে মাপতে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। একটু পরে খেয়াল করলেন, ওটা আসলে একটা জেট প্লেন।

নীলুবাবু কম কথার মানুষ। দারা-পুত্র পরিবারকে সব কথা বলেননা। কিন্তু এবার শেষ পর্যন্ত সমস্যাটা অর্ধাঙ্গিনীকে বলতেই হলো । শুনেই অনিতা দেবী বেশ ঘাবড়ে গেলেন । ভাবলেন হার্টের অসুখ । নীলুবাবুর যে বয়স তাতে একটু আধটু হার্টের ব্যামো স্বাভাবিক। চিন্তিত অনিতা দেবী ফোন করে  তড়িঘড়ি শহরের নামকরা কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ হৃদয়নাথ কাটকে 'র এপয়েন্টমেন্ট  নিয়ে নিলেন। আত্মীয়স্বজনদের খবর দিলেন। অনিতা দেবীর ছোটভাই ব্যাঙ্গালোর থাকে , নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হলেও তার সবরকমের ডাক্তারিবিদ্যায় বেশ দখল আছে। তাকে 'ডাক্তার গুগল' বলে তার পরিচিত মানুষজন বেশ  ইজ্জত  দেয় । সে চটজলদি হোয়াটসএপ করে বিশেষজ্ঞের মত দিল  - ইটস আ নিউরো-সাইকো ইস্যু.. হাবাপেন্টিন চালাও এক মাস। সঙ্গে সাইটোপ্লাসম  ব্লকার ও খেতে হবে । কেউ বললো - এটা সুগার, সাংঘাতিক রোগ , মামা আরামদেবের গুড়নাশিনী বটিকা পূর্ণিমা রাতে  চাঁদনিসহ সেবন  করুন , আরাম পাবেন।

 

নীলুবাবু শোনেন সবার কথা , করেন নিজের মত।  তিনি কোনো ওষুধ খেলেননা, ডাক্তার ও দেখালেননা। রোজ নিয়মমাফিক অফিস যান , বাড়ি ফিরে বরবটি ভাজা দিয়ে রুটি খান তারপর ঘুমিয়ে যান। ভাবনসুখ বঞ্চিত হয়ে জীবনের প্রতি সব আগ্রহই হারিয়ে ফেললেন। যে মানুষ ভাবেনা, সে আবার কেমন মানুষ।

সেদিন রাতে নীলুবাবু একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন । স্পষ্ট দেখলেন , গভীর সবুজ   জঙ্গলের মাঝে পিচঢালা একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে আরো গভীর জঙ্গলে । তিনি সেই রাস্তায় হাঁটছেন । হটাৎ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো পাঁচটা ছাগল। তাকে ঘিরে দাড়ালো সেগুলো। ভাবখানা-যেতে নাহি দিব। তার দিকে তাকিয়ে ছাগ নাগরিক , সিং নাড়িয়ে , মাথা দুলিয়ে হাসছে । তারপর  সামনের দু পা তুলে তারা  তাকে গোলকরে ঘিরে নাচতে লাগলো ।  জিপসি ডান্স । সে সময়ই হটাৎ তার ঘুমটা ভেঙে গেল।

পরদিন বাসিমুখে মোবাইল খুলে দেখেন অচেনা নাম্বার থেকে একটা মেসেজ এসেছে ।  বিষয় 'ছাগলের দুধের আশ্চর্য গুণ" । এরকম তো কতশত মেসেজই আসে প্রতিদিন । হোয়াটসএপ সব ধরণের জ্ঞানের প্রশান্ত মহাসাগর । একধরনের  উন্মুক্ত  বিশ্ববিদ্যালয় । অন্যদিন এসব মেসেজ না দেখেই ডিলিট করে দেন। নীলুবাবু  আজ কিন্তু এই মেসেজটিকে আর  অগ্রাহ্য করতে পারলেননা।  পড়ে বুঝলেন, বিশ্বের যাবতীয় কঠিন থেকে কঠিনতম রোগের অব্যর্থ ওষুধ হল ছাগী দুগ্ধ। বিভিন্ন বস্তুর সংমিশ্রনে এ এক আশ্চর্য রসায়ন। প্রাতঃকালে ডুমুরের ফুল ও একপোয়া ছাগলের দুধ সেবনে ক্যানসার পর্যন্ত সেরে যায় এমনটাই দাবি করেছেন বার্তা প্রেরক। গান্ধীজি ও প্রেসিডেন্ট কিম জঙ্গের ছাগল প্রীতির কথাও উল্লেখ আছে মেসেজে। এমন কি , কি আশ্চর্য নীলুবাবুর কাপুনি ব্যামোর উপসর্গ ও উপশমের কথাও লেখা আছে! দুবেলা দুপোয়া ছাগলের দুধ  দু'ভাগ ডাবের জলের সঙ্গে মধু মিশিয়ে দুমাস খেলেই রোগ নির্মূল হবে। মেসেজের শেষে  লেখা আছে -সংগৃহীত।

শেষরাতে  স্বপ্নে দেখা ছাগনৃত্যের কথাটা মনে পড়ল ,  নিজেকেই বললেন - ভেরি ইন্টারেস্টিং !   এই 'কুল' সমাধান  পড়ার পরই নীলুবাবু উত্তেজনায় কুলকুল  করে ঘেমে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। কিন্তু,  এই ইটপাথরের জঙ্গলে পশ ফ্ল্যাট কলোনিতে বেশ কিছু মানুষের ব্যবহারে ছাগলত্ব  পাওয়া গেলেও ছাগলের দুধ পাওয়া বেশ কঠিন।এটাই চিন্তার বিষয়। তবে নীলুবাবু জিদ্দি মানুষ। যা ভাবেন তা করেন।  ঠিক করলেন  তার রোগের ট্রিটমেন্টের প্রয়োজনে একটা ছাগল কিনে ফেলবেন। ছাগল তো আর মহিষ নয় , কতই বা আর দাম হবে। হিসেব করে দেখলেন , মাটনের দাম 700 টাকা কেজি হলেও ছ -সাত কেজির ছোটখাটো ছাগল বাচ্চা সমেত পাঁচ-ছ হাজারের বেশি হবেনা। অবশ্য যদি পান তবে একমাসের জন্য সসন্তান ছাগল ভাড়ায় নিতে পারেন , এটাই বেশি সুবিধাজনক ।

 

যেদিন থেকে কোলস্টেরল আধিক্য ধরা পড়েছে , নীলুবাবু আর মাটন খাননা। তবে রবিবার সাতসকালে  ডাক্তার হর'র দোকানে মাংস কিনতে পৌঁছলেন। বাজারে তার  মদ ও মাংসের দোকান পাশাপাশি। এক খাম্বা মদ কিনলে মাংসে পাঁচ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট। হর দত্ত আদপে কোনো ডাক্তার নয় , তবে সে যাবতীয় অসাধ্য রোগে এক খাম্বা মানে পুরো বোতল দারু ও সঙ্গে  অর্ধেক কিলো খুব ঝাল দিয়ে কষানো খাসির মাংস খেতে বলে। তাই ,বাজারে রসিকজন তাকে ডাক্তার বলে। নীলুবাবু আধাকিলো মাংস কিনে পয়সা গুনতে গুনতে দেখলেন খুঁটিতে বাধা তিনটে পাঠা মনের সুখে পাতা চিবোচ্ছে । একটু আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন - দাদা ,  ছাগল পাওয়া যাবে ? হর ডান হাত দিয়ে নাকের ওপর থেকে মাছি তাড়িয়ে গম্ভীর ভাবে বলল - ' ছাগল-বকরি বেচিনা , স্রেফ পাঠা আর খাসি, একনম্বর মাল। নীলুবাবু বোঝাবার চেষ্টা করলেন -  আরে না ,আমি  একটা গোটা ছাগল চাইছি ।

হর একটু অবাক হলো ।

- জিন্দা মাল চাইছেন ? বলি দেবেন ? মানত আছে , রাজরাপ্পা যাচ্ছেন ? তা যেখানে খুশি যাননা, ভালো কিলো তিনেকের কচি কালো পাঠা আছে , চার পড়বে।

হর দত্তর কোটেশন  শুনে নীলু বাবু হাত নাড়িয়ে বলেন -নারে বাবা , কোনো বলি টলি নয় , পাঠা নয় ,বাচ্চা সমেত ছাগল চাই । পোষা হবে , দুধ খাবো। গান্ধীজি খেতেন। কিম জোঙ্গও খান।

হর নিলুবাবুকেই মাছি ভাবে হয়ত।কসাই মার্কা চোখ দেখিয়ে  হাত নাড়িয়ে বলে- ছাগলের দুধ  !  পাগল ! ও'সব জিন্দা মাল পুরুলিয়া,চান্ডিল ,চাইবাসা বা পটমদায় দেখুন। ওরে  নিধু , রাং আর সীনাটা নামা। নিধু  খুঁটিতে ঝোলানো খাসির বাকি ধর টুকু ঘ্যাঁচ করে কেটে এনে হর'র সামনে কাঠের গুঁড়ি তে এনে ফেলে।

নিরাশ নীলুবাবু  দুপুরে মাংস ভাত খেয়ে একটা স্বর্গীয় নিদ্রাসুখ উপভোগ করে বিকেলের চায়ে চুমুক দিতে দিতে ছাগ পোষণের ইচ্ছে টুকু সংসার সংসদে পেশ করলেন । প্রস্তাব পাস হবার আগেই প্রবল প্রতিরোধে ঝড়ের মুখে কুটোর মত উড়ে গেল। চিন্তিত গিন্নি ব্যাঙ্গালোরে ভাইকে বার্তা দিলেন - তোর জামাইবাবুর মাথাটা পুরোপুরি গেছে রে , ছাগল পুষবে জেদ করছে , এখন আমার কি হবে রে।

গুগল ডাক্তার   তুরন্ত  জবাব দিলে - পিওর সাইকো ডিসঅর্ডার , হাবাপেন্টিনের ডোজ ডবল করে দাও ।

ছাগল নিয়ে ভেবে ভেবে নীলুবাবু অর্ধেক পাগল হয়ে গেলেন । এসময় তার ক্ষমতা থাকলে তিনি হয়তো ছাগলকেই রাষ্ট্রীয় পশু ঘোষনা করতেন !

 

মিথিলেশ যাদব প্রতি সকালে নীলকান্ত বাবুর বাড়িতে 'খাঁটি গরুর' দুধ দিয়ে যায়। তার কাছে একটু এনকোয়ারি করতেই সে একপায়ে রাজি। মহা উৎসাহে সে জানায় , বকরির দুধ কি বলছেন , পয়সা ফেকলে সে  মানুষকা দুধ  ভি এনে দেবে।   মিথিলিশের আত্মবিশ্বাস দেখে চমৎকৃত নীলুবাবু জানালেন - নেহি ,নেহি আদমি কা নেহি চাহিয়ে ,কাল সে আধা কিলো বকরির দুধ ই দাও। সওদা পাকা হবার পর একটা শর্ত রাখলেন , উনি যেকোনো দিন গিয়ে সামনে চেক করবেন যে দুধ সত্যিই ছাগলের কিনা। মিথিলেশ জানায় - স্যার , কভি ভি আইয়ে গোয়ালা বস্তি মেরে খাটাল মে , সামনে দুইয়ে দেব আপনাকে।

চারদিন ছাগামৃত ডাবের জল ও মধুর সাথে মিশিয়ে খাবার পরই নীলু বাবু  এই হোয়াটসএপিও ওষুধের উপকারটা হাতেনাতে বুঝতে পারছিলেন। তার মগজ আবার অল্প অল্প করে ভাবনা সুখের লোড নিতে পারছিল । পেটের ডান দিকের সেই কাঁপুনিটা আর বিলকুল  টের পাচ্ছিলেননা।

সন্তুষ্ট নীলুবাবু এত খুশি হলেন যে কাউকে না বলেই এক বিকেল বেলা মিথিলিশের খাটাল যাবেন স্থির করলেন। যেমন ভাবা তেমনই কাজ , একটু খোঁজাখুঁজি করে গোয়ালা বস্তিতে মিথিলিশের খাটালে পৌঁছে গেলেন।  তখন ঘুঁটের ধোয়া , খর-বিচালি, কাঁচা গোবরের গন্ধ আর গরু মহিষের হাম্বা মিলেমিশে ভারী সন্ধ্যা ঘন হয়ে নেমে আসছে। মিথিলেশ খাটালে ছিলনা , দুধ দিতে বেরিয়েছে। এক বুড়ো ,মহিষগুলোকে জল দিচ্ছিল। তাকেই নীলুবাবু জিজ্ঞেস করলেন - বকরি কাহা ? লোকটি অদূরে একটি গাছ দেখিয়ে দিলো। আধো অন্ধকারে দুটি ছাগল পাতা চিবোচ্ছে। দেখে তার মনটা খুশিতে ভরে উঠলো , আহা, তাহলে তিনি ছাগলের দুধই খাচ্ছেন। গান্ধীজিও খেতেন। যাক ,তাহলে লোকটি ঠকাচ্ছে না।

তিনি ধীরপায়ে গোবর কাদা বাঁচিয়ে ছাগদ্বয়ের কাছে পৌঁছলেন । তারপর , যা দেখলেন তাতে নিলুবাবুর  ঘিলু জ্বলে উঠলো। একি দেখছেন তিনি ! ভালোভাবে নেড়েচেড়ে দেখে ,চুপচাপ বাড়ি ফিরে গেলেন। সে রাতে বাঘের স্বপ্ন দেখলেন নীলুবাবু ! বাঘ লুচি মাংস খাচ্ছে।

পরদিন সকাল সাতটা বাজতেই মিথিলেশ দুধ নিয়ে হাজির। দুউ...ধ , লিজিয়ে শুধ বকরির দুধ। নীলুবাবু ভোরবেলাতেই দাঁত মেজে 'রেডি' হয়ে অপেক্ষা করেছিলেন । মিথিলিশের আওয়াজ শুনেই বেরিয়ে এলেন। বাংলা হিন্দি মিলিয়ে যা বললেন , তা অনেকটা এইরকম -

- মিথিলেশ ,ওই দিন তুম বলা থা , পয়সা দিলে মানুষের দুধ পাওয়া যাবে ?

মিথিলেশ কিছু বুঝতে না পেরে আমতা আমতা করে  বলে - হা সাব , বোলে তো ছিলাম।

- আমার চাই । পয়সা দেগা হাম।আজই মানুষের দুধ চাই।

-জোগাড় হয়ে যাবে। কিন্তু অনেক পয়সা লাগবে সাব।

- হম .. ঠিক হ্যায়,আজই চাই । অভি চাই।

- জরুর মিলবে , কিন্তু দু একদিন সময় লাগবে ।

-  দেরী কিসের ? তুমি তোমার  দুধ দাও ।অভি দেও।

- আরে বাঃ ,আমি আবার দুধ কি করে দেব। আমি পুরুষ মানুষ। মরদ কি দুধ দেয় ? আমাকে তেমন জেনানা খুঁজতে হবে , যে নিজের দুধ বেচবে।

- না, না । তোমার পাঠা যদি দুধ দিতে পারে , তুমি দুধ দিতে  দিলে দোষ কোথায় ?  তুমিও বিলকুল দুধ দিতে পারো..।

মিথিলেশ চালাক মানুষ। তার বুঝতে দেরি হয়না নীলুবাবু কি বলতে চাইছেন।

'সার পাগলা গয়ে... ' বলে মিথিলেশ  তার পাঠার দুধের ক্যান না নিয়েই ছুট লাগায়।

 

কি আশ্চর্য ! এক সপ্তাহ 'পাঠার দুধ' খেয়েই বোধহয় রোগের উপশম হলো , নীলুবাবু আবার চমৎকার ভাবনা প্র্যাকটিস করতে পারছেন । সূর্যের তাপ নাকি ক্রমশঃ কমে আসছে। মাত্র কয়েক লক্ষ বছরই আয়ু বাকি ! খুবই  ভাবনার বিষয় বইকি ।।

pkbtpc@gmail.com
জামশেদপুর 

Wednesday, January 1, 2020

নগেন দাদুর পেট


.                                 ...দিব্যজ্যোতি দত্ত

                  নগেন দাদুর পেটে কি যেনো ঢুকেছেরে পটলা। দাদু বোধ হয় আর বাঁচবে না।
-তুই কিভাবে জানলি?
-বারে, দ্যাখ না পেটটা কেমন উপরে উঠছে আর নামছে। পেটের মধ্যে কিছু না ঢুকলে পেট কখনো এভাবে নড়ে?
-তা অবশ্য তুই ঠিকই বলেছিস গুবলু। এখন কি করা যায় বলতো?

পরের কাহিনীতে যাওয়ার আগে এই দুজনের ব্যাপারে কিছু বলে নেওয়া যাক। পটলা আর গুবলু নগেন দাদুর দুই নাতি-নাতনি। ওরা কেউই অবশ্য নগেন দাদুর কাছে থাকেনা। এবারে গরমের ছুটিতে বাবা-মায়ের সাথে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। এর আগেরবার যখন এসেছিল তখন ওরা দুজনেই খুব ছোট ছিল। তখনকার কথা ওদের মনেও নেই। এবার নগেন দাদুকে খুব কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছে ওরা। গত দুদিনে ওদের জ্বালায় নগেন দাদুর অবস্থা খুব খারাপ। কখনো দাদুর চশমার গ্লাস ভেঙে পরীক্ষা করছে কখনো বা দাদুর ডায়েরীর পৃষ্ঠা ছিঁড়ে নৌকা বানাচ্ছে। মোট কথা, যার উপরে চোখ পরছে তার আর রক্ষা নেই। এসবের বাইরে সারাদিন দুজনের চিৎকার চেঁচামেচি তো আছেই। একটু আগে নগেন দাদু মাত্র দুপুরের খাবার সেরে ঘুমাতে গেছেন। ঘরে বসে থাকতে থাকতে দাদুর ভুঁড়িটার সাইজও একটু বেড়েছে। এবার সেই ভুঁড়ির উপরেই চোখ পড়লো পটলা আর গুবলুর। যাই হোক, আবার গল্পে ফিরে আসি।
-শোন পটলা, ডাক্তাররা কেমন অপারেশন করে ফোঁড়া বের করে দেখেছিস?
-ধুর পাগল, এটা তোর ফোঁড়া মনে হচ্ছে কোন আক্কেলে? আমার মনে হচ্ছে দাদু আমাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ফুটবলটা খেয়ে নিয়েছে।

পটলার কথা শেষ হতেই বারান্দায় ফুটবলটা আছে কিনা দেখতে ছুটলো গুবলু। পটলাও পিছন পিছন হাজির। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা কিছুটা হতাশই হলো। ফুটবলটা জায়গা মতই আছে।
-কি বুঝলি?
-ফুটবল পাম্পারের হাওয়াটুকু সব খেয়ে নিলো না তো?
-যা তো, দৌড় দিয়ে পাম্পারটা নিয়ে আয়।

পটলা দৌড়ে পাম্পারটা নিয়ে এলো। কিন্তু পাম্প করতেই গুবলু আরো চিন্তায় পড়ে গেলো। পাম্পার তো এখনো কাজ করছে ঠিক ঠাক।
-পটলা, শোন দাদুর পেটে কি আছে আমাদের দেখতে হবে।
-তো কিভাবে দেখবি?
-মা একবার রাগ করে তোর বেলুনে সুঁই ফুটিয়ে দিয়েছিল। তারপর কি হয়েছিল মনে আছে?

বেলুনের কথা মনে হতেই খুব কান্না পেল পটলার। অনেক সাধ করে কিনেছিল সে।
-হ্যা, মনে আছে। বেলুনটা কেমন করে উড়ে যাচ্ছিল। তারপর একদম চুপসে গেলো।
-ঠিক। দাদুর পেটেও আমাদের সুঁই দিয়ে একটা ফুটো করতে হবে। দেখতে হবে দাদুও ওভাবে উড়ে যায় কিনা।
-যদি উড়ে যায়?
-তাহলে তো ক্লিয়ার হয়ে গেলো দাদু আমাদের কিছুই খায়নি।
-আর না উড়লে?

পটলার প্রশ্নে গুবলুকেও বেশ চিন্তিত মনে হলো।
-না উড়লে বড় অপারেশনেই যেতে হবে আমাদেরকে। নে নে, রেডি হয়ে নে।

যেই বলা সেই কাজ। ব্যাগের থেকে বাবার দুটো শার্ট গায়ে চাপিয়ে দুজনে দাদুর কাছে হাজির। মুখে মাস্ক। ভাবখানা এমন যেন ডাক্তার এসেছেন অপারেশন করতে। মায়ের সেলাইয়ের বক্স থেকে সুঁইও নিয়ে আসা হয়েছে। পটলা সুঁই নিয়ে রেডি। দুজনের হাতেই আবার গ্লাভস। গুবলু হাত বাড়াতেই পটলা সুঁইটা ওর হাতে দিয়ে দেয়। কিন্তু যেই না গুবলু নগেন দাদুর পেটে সুঁই ফুঁটাতে যাচ্ছে অমনি কে যেন তার হাত ধরে বসলো।
-গুবলু-পটলা? কি হচ্ছে এসব?
-দাদু আমাদের কি যেন খেয়ে নিয়েছে মা।
পটলা কাঁদো কাঁদো হয়ে উত্তর দিলো।
-কিভাবে বুঝলি?
-বারে, নইলে কারো পেট এতো বড় হয়? আর কেমন নড়ছে দেখো?

গুবলুর এমন কথা শুনে এবার হো হো করে হেসে উঠলেন নগেন কাকু।
-বাবা, আপনি ঘুমাননি?
-ঘুমানো কি আর উপায় আছে বৌমা। তোমার এই দস্যু ছেলে-মেয়ে দুটোর উপরে নজর রাখতে রাখতে ঘুম কখন যে পালিয়ে গেছে টেরই পাইনি। একটু ঘুম ঘুম আসছিল বটে। কিন্তু ওদের মুখে কি সব অপারেশনের কথা শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তাই আর ঘুমাইনি। হা হা হা।
-তা আপনি যা-ই বলুন বাবা, বড্ড বাড়াবাড়ি করছে ওরা। এখানে আর বেশীদিন থাকা যাবেনা দেখছি।
-না বৌমা। ওদের আর কি দোষ। এমন পেট ওরা তো আগে কখনো দেখেনি। তাই কখনো ভাবছে ওদের ফুটবল খেয়ে নিয়েছি আবার কখনো ভাবছে ওদের পাম্পারের সবটুকু হাওয়া খেয়ে নিয়েছি। হা হা হা।

হাসির সময় নগেন দাদুর ভুঁড়িটাও জোরে দুলতে থাকে। তা দেখে হেসে ফেলে গুবলু আর পটলা। মা ও আর চেপে রাখতে পারলেন না হাসি।

dibya_1991@yahoo.com
ঢাকা, বাংলাদেশ