![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
পঞ্চবাণ
সবিতা রায় বিশ্বাস
“বাবা মদন, বলি এসব হচ্ছেটা কী? তুমি আর রতি সারাক্ষণ প্রেমে মত্ত হয়ে আছো, ওদিকে যে পৃথিবী প্রেমশূণ্য হয়ে গেল সে খেয়াল আছে?”
“প্রণাম গ্রহণ করুন প্রজাপতি ব্রহ্মা| আপনার কথাটা আমি সম্পূর্ণ মানতে পারলাম না পিতা, আমি তো অহরহ শুনছি সকলে গাইছে, “এল ওই বনান্তে পাগল বসন্ত”, “বসন্ত মুখর আজি”, বসন্ত এল এল এল রে”, “বসন্ত এসে গেছে”, “আহা আজি এ বসন্তে”-
“থামো মদন থামো| গড়গড় করে স্কুলের ছাত্রের মতো গানের প্রথম লাইন বলে যেও না| কথায় আছে, ‘ফলেন পরিচীয়তে বৃক্ষঃ’| তা তুমি যে পুষ্পশর নিক্ষেপ করছ তার প্রমাণ তো মিলছে না, জন্মের পরিসংখ্যান তো সে কথা বলছে না|”
“প্রভু এখন মর্ত্যের মানুষ খুব হিসাবী, গণিতে পারদর্শী তাই ‘ফার্টিলাইজেশন’ হচ্ছে না| তাহলে কি করে পরিসংখ্যান বাড়বে?”
“বেশ! এবার তোমার ধনুর্বাণ নিয়ে এসো, দেখি কেমন অবস্থায় আছে| যদি কিছুর প্রয়োজন হয় আনিয়ে নেবে| খরচের টাকা মিসসেলিনিয়াস ডেবিট করে দিয়ে দেব|”
“না, মানে আবার এসবের কি দরকার প্রভু? যদি কিছুর প্রয়োজন হয় আমি আপনাকে বলব| আপনি একটু বিশ্রাম নিন|”
“কথা ঘুরিয়ো না কামদেব| আমি ব্যালেন্স শীট গোঁজামিল দিয়ে মিলিয়ে দিই না| রতি তোমাকে ইশারা করছে, তাই তো! রতির ইশারায় সাড়া দিয়ে তোমার কাজ ঠিকমত না করলে তোমাকে আমি সাসপেন্ড করে দেব| তখন বুঝবে মজা! রতি তোমাকে পতি বলে মানবে না|”
মদনদেব খুব মুশকিলে পড়ে গেল, ধনুকটি ইক্ষুনির্মিত| গুণটি মৌমাছি দিয়ে তৈরী| বহুদিন ধনুক ব্যবহার না করার ফলে মৌমাছিরা ইক্ষুর মিষ্টি রস খেয়ে ছিবড়ে করে ফেলেছে| বাণ ছিল পাঁচটি সুগন্ধি ফুল, অশোক, শ্বেত ও নীল পদ্ম, মল্লিকা ও আম্রমঞ্জরী দিয়ে তৈরী| যা হয়! দীর্ঘদিন ব্যবহার না করে সব ফুল শুকিয়ে ঝরে গিয়েছে| এখন পিতা ব্রহ্মাকে কি দেখাবে মদন? এসবের মূলে রতি, সারাক্ষণ কামদেবকে নিয়ে নাচে-গানে মত্ত| কামদেব ভুলেই গিয়েছিল ধনুর্বাণ নিক্ষেপ করার কথা|
রতিদেবীরও খুব খারাপ লাগছে, এদিকে বসন্ত যায়, যায়| এই বসন্তে পঞ্চশর নিক্ষেপ করতে না পারলে কামদেবের চাকরি থাকবে না| আর দেরী করা ঠিক হবেনা, আজ রাতেই ইক্ষুদন্ড সংগ্রহ করতেই হবে| মদনদেব আর রতিদেবী হাত ধরাধরি করে ‘জ্যোত্স্নারাতে সবাই গেছে বনে’ গাইতে গাইতে আখের মাঠে না গিয়ে মল্লিকাবনে নেমে পড়লেন| গন্ধে মাতাল হয়ে আসল কাজ ভুলে গাইতে লাগলেন, ‘আমার মল্লিকাবনে যখন প্রথম ধরেছে কলি’|
গানে বাধা পড়ল, দুইটি নারী পুরুষের ঝগড়া কানে এল, “তোমার মুরোদ আমার বোঝা হয়ে গেছে| আমারই ভুল হয়েছিল, তোমার রূপ দেখে মজেছিলাম| মা বারবার করে বলেছিল, পুরুষমানুষের রূপ কোনো কাজে লাগেনা| টাকা না থাকলে প্রেম ভালোবাসা দু’দিনেই ঘুলঘুলি দিয়ে পালিয়ে যাবে|”
“তা তোমার মায়ের কথা শুনলেই পারতে! এখন আমার জীবনটা আমসত্ব করে দিলে, কোথায় বৌকে একটু আদর সোহাগ করবো! টাচ করলেই শক লাগছে|”
কামদেব আর রতির হুঁশ ফিরল, তাই তো মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে| এরকম অবস্থা হলে পপুলেশন জিরোতে পৌঁছে যাবে| ঝট করে প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করে স্বর্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল| চারিদিকে বহুতলের ছড়াছড়ি, ইক্ষুদন্ড কাঁচের দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে| রতি বলল, “প্রভু এইসব বহুতলের নারী পুরুষ এত রাত্রে কেউ কাউকে আলিঙ্গন না করে হাতের যন্ত্রে কি দেখছে?”
“এটাই তো আসল সমস্যা প্রিয়ে, এরা বিচরণ করে ভার্চুয়াল জগতে, প্রেম করে সেখানে| শুধু কি প্রেম? তুমুল ঝগড়াও করে| কিন্তু ঝগড়ার পরে মিলন হয় না, কারণ সবই তো সোশ্যাল মিডিয়ার খেলা|”
“প্রজাপতি ব্রহ্মা কি এসব জানেন না? শুধু শুধু আমাদের দোষ দিচ্ছেন?”
“না, না দেবী| আমাদেরও কিছু ভুল আছে বৈকি! আমরা নিজেদের নিয়ে মত্ত ছিলাম এদেরই মত| তাই তো পৃথিবী আজ প্রেমহীন| ঠিক প্রেমহীন বলাও যায় না, আসলে কোনো কিছুরই গভীরতা নেই|”
ওদিকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু দু’জনেই চিন্তিত ও বিরক্ত| মদনদেব কি নিজের নাম ডোবাবে? বারবার বলা সত্ত্বেও তাদের পঞ্চবাণ নিক্ষেপ করার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না| অনেক কষ্টে বসন্তের ট্রান্সফার কয়েকদিন ডিলে করে দিয়েছি| ব্রহ্মা বাইনোকুলার দিয়ে দেখলেন, মদনদেব ধনুর্বাণ কাঁধে নিয়ে রতিদেবীকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের কাঁচের জানলা দিয়ে উঁকি মারছে| নিজের মনেই বলতে লাগলেন, “আরে বাবা! উঁকি, ঝুঁকি, টুকি যাই দিস না কেন, কোনো লাভ হবে না| আহাম্মক নাম ওখান থেকে| বিগবাজার, স্মার্টবাজার, আইনক্স, সিটি সেন্টার, বড়বাজার, গড়িয়াহাট, ময়দান এসব জায়গায় গিয়ে পঞ্চশর নিক্ষেপ কর| দেখি লোকে প্রেমে না পড়ে যায় কোথায়?
মদন আর রতি প্রজাপতি ব্রহ্মার কথা শুনেছিল কিনা জানা যায়নি| তবে পঞ্চশর নিক্ষেপ করেছিল নিশ্চয়| লোকজন ঝপাঝপ প্রেমে পড়তে লাগল, চোখে ধুতরো ফুল দেখতে লাগল| আসলে হয়েছে কি! দেখতে ভালো লাগবে বলে রতিদেবী ধুতরো ফুল দিয়ে ধনুক সাজিয়েছিলেন| পুলিশদের কাজের চাপ বেড়ে গেছে, যত্র তত্র মিলন ঠেকাতে লাঠি হাতে টহল দিতে হচ্ছে|
ব্রহ্মা, বিষ্ণু দুই দেবতাই খুব খুশি| ঢেঁকি নারদেরও আহ্লাদের অন্ত নেই| যত বেশি প্রেম তত বেশি বিরহ| বিরহ মানেই ঝগড়া, নারদ তো ঝগড়া ডিপার্টমেন্টের হেডমাস্টার| যা কান্ড ঘটতে লাগল সে আর বলার নয়, ছেলেমেয়েরা কখন যে কে কার প্রেমে পড়ছে বলা মুশকিল| প্রেম করতে করতে ঝগড়া করছে, ঝগড়া করতে করতে প্রেম| তাদের মা, বাবারাও বাদ যাচ্ছে না| তাই বলে সোশ্যাল মিডিয়াকে আটকানো যাচ্ছে না কিছুতেই| এই ব্যাপারটার দায়িত্ব নিলেন মহেশ্বর| দেখা যাক কি হয়! যদিও জগৎজননী উমা বলেছেন, “পাগলা ভোলা এ তোমার কম্ম নয়| তুমি নন্দী ভৃঙ্গীকে নিয়ে গাঁজায় দম দাও|”
এত বেশি প্রজার আগমনবার্তা রেজিস্টারে লিখতে লিখতে প্রজাপতি ব্রহ্মার আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল| বিষ্ণু বললেন মদনদেব আর রতিদেবীকে পুরস্কার স্বরূপ আসামের দেওয়ানগিরি পাহাড়ের ‘মদন কামদেব দেবালয়’ দিলেন| ওদের জন্যেই এ যাত্রায় স্বর্গের সিংহাসন অটুট রইল| মর্ত্যে প্রজা না থাকলে স্বর্গে দেবতারা মূল্যহীন|

.png)
.png)

.png)
.png)

.png)
.png)
.png)

