![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
গ্যাঁজারু ভোম্বলদার বিশ্বকাপ দর্শন
চন্দন ঘোষ
মনিদার চায়ের দোকানে আমরা সবাই মাটির ভাঁড়ে তারিয়ে তারিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি, এমন সময় আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে ভোম্বলদা বললেন - বুঝলি, আমি বিশ্বকাপের খেলা দেখতে কানাডা, মেক্সিকো আর আমেরিকা যাচ্ছি। দেড় মাস পরে ফিরব। তোদের বলিনি মনখারাপ হবে বলে। ভিসা, হোটেল আর ফ্লাইটের টিকিট সব রেডি হয়ে গেছে।
সে কি দাদা, এই এতো বড় খবরটা চেপে গেছেন? পেট ফুলে যায়নি আপনার?
সে আবার যায় নি? তোদের বলব, আর তোরা মুখ আমসি করে শুনবি, সেটা ভেবেই এত দিন বলিনি। ভেবেছিলাম বলব না। কিন্তু বলেই ফেললাম তোদের। কোন কথা আমি চেপে রাখতে পারি না। এটাকে তোরা আমার বদভ্যেস বল কিংবা সুভ্যেস বল।
একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। আমাদের না বললে আপনার পেট ফুলে ঢোল হয়ে যেত, পেটে গ্যাস জমে যেত, আর আপনার যাওয়াও ক্যানসেল হয়ে যেত।
আর বলিস না। ভেবেছিলাম এখানে বসে তোদের সাথেই খেলা দেখাটা এনজয় করব। আমার যাওয়ার একটুও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ওই ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনো এমন করে আমায় যাওয়ার জন্যে অনুরোধ করলেন যে ওনাকে না বলতে পারলাম না। আমার খেলাও দেখেছেন – না, না, সামনা সামনি মাঠে নয়, ভিডিও তে। আমার খেলার ভিডিও ক্যাসেটগুলো অনলাইনে কিনে ইউরোপের আর ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবল ক্লাবগুলোকে বিলি করেছেন। আমাকে বললেন, এখনকার প্লেয়ারগুলো তো আমার খেলা দেখেই বড় হয়েছে। আমি গেলে মেসি, রোনালদো, এমবাপে, নেইমার, হ্যারি কেইন – এরা কতো উৎসাহিত হবে বলুন তো? আপনাকে সামনে দেখলে ওরা আরও ভালো খেলার জন্যে অনুপ্রানিত হবে। আপনাকে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে আসতেই হবে স্যার।
উনি নিজে থেকেই আমার ভিসা, থাকার জন্যে হোটেল বুকিং, ফ্লাইটে আসা যাওয়ার টিকিট সব করে দিয়েছেন। আবার বলেছেন ওখানে খাওয়া দাওয়া ঘোরাঘুরির জন্যে ডেইলি পকেটমানিও দেবে। মানে বুঝিয়ে দিয়েছেন আমার এক পয়সাও খরচ হবে না। এই সব ভেবে দেখলাম এমন সুযোগ বার বার আসে না। খেলা দেখার জন্যে ওপেন টিকিট দিয়েছেন। যে কোন দিন, যে কোন স্টেডিয়ামে, যে কোন টিমের ম্যাচ দেখার সুযোগ। ভিআইপি গেস্টরুমে বসে খেলা দেখার ব্যবস্থা।
তবে চিন্তা করিস না। ভিডিও কনফারেন্সিং কলে আমি তোদের সাথে যোগাযোগ রাখব। খেলার আপডেটস দেব। এমনিতে তো তোরা রোজই টিভিতে খেলা দেখবি। মাঝে মধ্যে ক্যামেরা ভি আই পি গেস্টের দিকে ঘোরালে আমাকেও দেখতে পাবি।
জিজ্ঞেস করলাম, ভোম্বলদা, তাহলে যাচ্ছেন কবে? ব্যাগ গোছাতে কিংবা কিছু দরকার হলে জানাবেন, কিনে এনে দেব। প্রয়োজনে আপনাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়ে আসতেও পারি।
না, না, কোন কিছু কিনে এনে দিতে হবে না। একি আমি গোবরডাঙ্গাতে যাচ্ছি যে অনেক কিছু কিনে নিয়ে যেতে হবে? যেখানে যাচ্ছি, সেখানে সব কিছুই পাওয়া যায়। জিয়ান্নি কে শুধু একবার বললেই হবে।
মেক্সিকোর সিটি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ দেখাচ্ছে টিভিতে। আমরা হুমড়ি খেয়ে টিভির সামনে বসে দেখছি যদি একবারের জন্যে ভোম্বলদাকে দেখতে পাই। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে। ভোম্বলদা তো আর নিজে থেকে ফোন করবেন না। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালাম – দাদা, গিয়ে থেকে তো আর ফোন করলেন না। আজ রাতের ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আপনাকে ভিডিও কল করব। প্লিজ ধরবেন।
রাত একটার সময় ভোম্বলদাকে ফোনে ধরলাম। চারিদিকে অন্ধকার। দেশলাইয়ের কাঠির আগুনে যেটুকু ওনার মুখ দেখা যায়, সেটুকুই দেখা যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, আপনার রুমের লাইট টা জ্বালুন, আপনার হোটেলের রুমটা দেখি। আপনার মুখটা ভালো করে দেখি। কতদিন পরে আপনাকে দেখছি বলুন তো? ভালো আছেন তো?
ভোম্বলদা আমার সাথে ফিসফিস করে কথা বলছেন – যেন অন্য কেউ ওনার কথা শুনতে না পায়।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি খুব ভালো আছি। রুমের লাইট জ্বালতে পারব না। সবাই জেনে যাবে যে আমি রুমে আছি। আর বলিস না, আমি যে এতো পপুলার আগে জানতাম না। রুমের বাইরে রিপোর্টাররা সব ক্যামেরা হাতে বসে আছে। যার খেলা দেখে আজকের মেসি, নেইমার, এমবাপে, রোনালদোরা ফুটবল খেলা শিখেছে, তাকে দেখবে বলে, তার একটা ইন্টারভিউ নেবে বলে হাঁ পিত্যেশ করে বসে আছে। খুব জ্বালা রে এখানে। সব সময় লুকিয়ে চুরিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। একটা বোরখা কিনেছি। মুখ মাথা ঢেকে ওটা পরেই বেরোচ্ছি।
দাদা, আপনার শরীর ভালো আছে তো? কেমন খেলা দেখছেন?
খুবই ভালো আছি। খেলার কথা আর বলিস না। আজ এ শহরে তো কাল ও শহরে। এবেলা এই স্টেডিয়ামে তো ওবেলা আরেকটা স্টেডিয়ামে। আহা, স্টেডিয়ামগুলো দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। কি বিশাল যে বলে বোঝানো যাবে না। অনেক ছবি তুলেছি। পরে দেখাব।
দাদা, প্লেয়ারদের সাথে আলাপ পরিচয় হয়েছে?
বাব্বা, সেটা আবার হয়নি? প্রত্যেকটা দেশের কোচ ওদের ম্যাচের আগে আমাকে নিয়ে গেছেন ওদের ম্যাচের ড্রেসিংরুমে। সব প্লেয়ারদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। যা বুঝলাম, এবার মাঠ কাঁপাবে এমবাপে। মাত্র সাতাশ বছর বয়েস। কালো হরিণ। ওকে দেখে আমাদের বিদেশ বসুর কথা মনে পড়ে গেল। কি খেলত ছেলেটা। ওকেও বাংলার দর্শকরা কালো হরিণ বলে ডাকত।
আমি দশটা প্লেয়ারের নাম বলছি, লিখে রাখ। খেলা তো দেখছিস, এদের মার্ক করে রাখবি। আমার চোখ আসল মুক্তো চিনে নিতে দেরি করে না। এদের খেলার স্টাইল পুরোটাই আমার মতন। মানে ভালো করে আমার ভিডিও ফলো করেছে। হ্যাঁ, লেখ, ওরা হল – লিওনেল মেসি, রোনালদো, কাইলিয়ান এমবাপ্পে, ল্যামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম, এরলিং হ্যালান্ড, পেড্রি, ভিনিসিয়াস জুনিয়ার, রড্রি, জামাল নুসিয়ালা আর হ্যারিকেন।
দাদা, বললেন দশটা প্লেয়ারের নাম বলবেন। কিন্তু এগারোটা বললেন কেন?
ওঃ তাই বুঝি? তাহলে লাস্টের নামটা বাদ দিয়ে দে। দেখবি ও ইংল্যান্ডের হাতে হেরিকেন ঝুলিয়েই ছাড়বে।
শোন, বেশিক্ষন কথা বলতে পারব না। আমার মোবাইলে চার্জ কমে আসছে। এখন ছাড়ছি। বাকি খবর আমি তোকে টেক্সট করে দেব। বাই। সাবধানে থাকিস। আর একটা কথা, এবার থেকে ভিডিও কল করবি না। শুধু ভয়েস কল করবি। এখানে চারদিকে হ্যাকাররা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার পেগাস্যাসে ফোন ট্যাপ করে আমার ভিডিও বাজারে ভাইরাল করে ছেড়ে দেবে। আবার পরে কথা হবে কেমন?
কোয়ার্টার ফাইনালের খেলা চলছে তখন। একদিন রাতে আবার ফোন করলাম ভোম্বলদাকে। দাদা, খবর কি? কথা বলা যাবে এখন না কি ব্যস্ত আছেন?
না, না, বল। কি জানতে চাইছিস বল।
আপনার কথাগুলো এমন জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে কেন ভোম্বলদা? শরীর ঠিক আছে তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার শরীর খুবই ভালো আছে। এখন একটু নিজেকে একা পেয়েছি। হোটেলের রুমে বসে আমি শশা দিয়ে মুড়ি খাচ্ছি। মুড়ি চিবোতে চিবোতে কথা বলছি বলে এরকম লাগছে।
সময় কাটছে কেমন? খেলা দেখা ছাড়া বাকি সময় কি ঘুরে বেড়াচ্ছেন?
আর ঘুরে বেড়ানো। মোবাইল ফোন অফ করে রাখতে হচ্ছে। ফাইনালের টিকিটের জন্যে সবাই যা বিরক্ত করছে যে বলার নয়।
গতকাল আমার আশীর্বাদ নিতে এসেছিল সবচেয়ে বয়সে ছোট প্লেয়ার মেক্সিকোর গিলবার্তো মোরা। মাত্র আঠারো বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলছে ছেলেটা। ওকে আমি আর কি আশীর্বাদ করব। পাশেই দাঁড়িয়ে স্কটল্যান্ডের তেতাল্লিশ বছরের ক্রেইগ গর্ডন। এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সের প্লেয়ার। গিলবার্তো মোরা কে বললাম, আশীর্বাদ এনার কাছে নে। এতোগুলো বছর একটানা খেলে যাচ্ছেন। ক্ষমতা আছে।
ওদের পেছনেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে মেসি আর রোনালদো। আমার অটোগ্রাফ নিতে এসেছে। ওদের অটোগ্রাফ বুকে সাইন দিয়ে বললাম, ভাই মেসি, বয়স তো কম হল না। দেখতে দেখতে থারটি নাইনে পা দিয়েছ। আর তুমি রোনালদো, তুমি তো এক কাঠি ওপরে। ফরটি ওয়ান। এটাই বোধহয় তোমাদের লাস্ট ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা। জান লড়িয়ে দিয়ে খেল। সারা পৃথিবী যেন তোমাদের খেলা মনে রাখে। আর একটা সাজেশন, দেশের জন্যে তো অনেক খেলেছ, এবার একটু নিজের জন্যে খেল। মানে যে ক্লাব বেশি দক্ষিনা দেবে, সেখানে খেল। আর তো কয়েকটা বছর পরে রয়েছে তোমাদের সামনে। যা পারো কামিয়ে নাও এই সময়।
পিএসজির ম্যানেজার কাম কোচ লুইস এনরিকে মার্তিনেজ গার্সিয়া ওনার টিম বানানোর জন্যে আমার সাজেশন নিতে এসেছিলেন। ওনাকে বললাম, ফাইনাল পর্যন্ত ওয়েট করবেন না। এখনই নেইমার, মেসি আর এমবাপে কে সাইন করিয়ে রেখে দাও। ফাইনালের পরে ওদের আর খুঁজে পাবে না। অন্য কোন আরব কান্ট্রি ওদের নিয়ে নেবে অঢেল টাকায়।
এই কদিন আর আমায় ফোন করিস না। সেমিফাইনাল আর ফাইনালের ম্যাচ কভার করতে হবে। প্রি এন্ড পোস্ট ম্যাচের রিপোর্ট লেখা একটুখানি ব্যাপার নয়। আমি মোটামুটি জুলাইয়ের বাইশ তেইশ তারিখ নাগাদ ফিরব। বাকি কথা সামনা সামনিই হবে।
তেইশে জুলাইয়ের ভোররাতে ফিরলেন ভোম্বলদা। না, না, আমরা কেউ যাইনি এয়ারপোর্টে ওনাকে রিসিভ করতে। গতকাল সন্ধ্যায় দেখা হল মনিদার চায়ের দোকানে। চোখ মুখ ফুলে গেছে ঘুমিয়ে। আহারে, কত ধকল গেছে ওনার শরীরের ওপর দিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, দাদা, আমাদের জন্যে কিছু আনেন নি? মানে বিশ্বকাপের কোন স্যুভেনির জাতীয়।
স্যুভেনির এনেছিলাম রে। এয়ারপোর্টে লাগেজ বেল্টে একই রকম স্যুটকেস ছিল, পালটা পালটি হয়ে গেছে। বাড়িতে এসে খুলে দেখি হোটেলের বিছানার চাদর, তোয়ালে, প্লেট, চামচে ভর্তি। স্টিকারটাও ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি রাস্তায় আসার সময়। গিয়ে যে ফেরত দেব তাও হল না। যাক, তোদের লাগলে বলিস, দিয়ে দেব।
না, না, কারোর ব্যবহার করা বিছানার চাদর, গামছা, তোয়ালে, এঁটো কাঁটা চামচের দরকার নেই আমাদের। আপনি সুস্থ শরীরে ফিরে এসেছেন এই আমাদের বড় পাওনা। পরে সময় করে যে ছবিগুলো তুলেছেন, সেগুলো দেখাবেন।
সরি। ক্যামেরাটাও তো আমার ওই স্যুটকেসের মধ্যে ছিল। সেটাও গেছে। এই দ্যাখ, তোর বৌদির চারটে মিসড কল। বাড়ি যাই বুঝলি?

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment