![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
বিস্মরণের ইতিহাস : প্রসঙ্গ শ্যামাপ্রসাদ
প্রবীর সরকার
বাঙালি যে কতটা ইতিহাস-বিস্মৃত জাতি সেটাই যেন নতুন করে প্রমান করলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এবং কতটা আত্মঘাতী। এই মুহূর্তের শ্যামাপ্রসাদ চর্চা তাই খানিকটা যেন আত্মশুদ্ধির আর প্রায়শ্চিত্ত্যের আয়োজন। কিন্তু সেই সঙ্গে একটা কূট প্রশ্নের মতো মতো জীবনানন্দের কবিতার একটি চরণ যেন সামনে এসে দাঁড়ায়- ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ সহজতর উত্তর হলো, সেই শুভক্ষণ এতদিন আসে নি। কিন্তু প্রকৃত উত্তর রয়েছে আরও গভীরে। রবীন্দ্রনাথ বলতেন, তথ্য আর সত্য সর্বদা এক রেখায় এসে মেলে না। যা সত্য, তাই ইতিহাস, কিন্তু দর্শন-অদর্শন ও খণ্ড দর্শনের আড়ালে কিংবা দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্যে সেই ইতিহাসই সময়ে সময়ে বদলে যায়। যেমন অনার্য আদিবাসীদের পাশে এসে বিভূতিভূষণের মনে হয়েছিল, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস আর্যের ইতিহাস। কেননা সে ইতিহাস আর্যের উপলব্ধিজাত, আর্যের হাতে লেখা। আমাদের ইতিহাসও অনেকটা তাই। স্বাধীনতার আগে-পরে কয়েক দশকের ভারতীয় ইতিহাস যাঁরা সংকলন এবং নির্মান করেছেন, তাঁদর পাঠ ছিল ইউরোপীয় পরম্পরা নির্ভর, আর কিছুটা ভারতীয় দলতান্ত্রিক। ‘সাব-অল্টার্ন’দের কথাও এসেছে কিছু পরে, তবু দূরে এবং আড়ালেই থেকে গেছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
এ কোনও মোহিনী আড়াল নয়, এ ছিল সচেতন রাজনৈতিক ‘এজেণ্ডা’। তথ্য কী ছিল না? বহুজনের সাক্ষ্য ছিল, নথিপত্রও ছিল, তবু মৃত্যু রহস্যের মতো জীবনের কথাগুলিও যথার্থ উদ্ঘাটিত হয় নি এবং যথাস্থানে ঠাঁই পায় নি। অথচ এই সময়ের বঙ্গীয় রাজনীতির জগতে প্রবেশ করতে গেলে শ্যামাপ্রসাদের কাছেই মাথা নত করতে হবে। কেননা সর্ব ভারতীয় রাজনীতিতে মাথা উঁচু করে, কেন্দ্রীয় নেতাদের চোখে চোখ রেখে বলিষ্ঠ পায়ে চলতে পারতেন যে তিনজন বাঙালি, শ্যামাপ্রসাদ তাঁদের অন্যতম। আর ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ এবং তাঁরই হাতে গড়া সুভাষচন্দ্র বসু। কাজী নজরুল একটি চিঠিতে সুভাষ আর শ্যামাপ্রসাদের মধ্যেই বঙ্গ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ দেখেছেন এবং আপন আনুগত্য ব্যক্ত করেছেন।
ভারতীয় রাজনীতির বহমান ধারা থেকে মাঝে মাঝেই বাঁক নিয়েছে বঙ্গের রাজনীতি। সাম্প্রতিক সময়ের চার-পাঁচ দশক তার প্রমান। আবার বিগত শতাব্দীর গোড়া থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রমগুলিও তার সাক্ষ্য দেয়। কার্জনের বঙ্গবিচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বঙ্গদেশে হবে, এটা স্বাভাবিক কিন্তু সহিংস স্বাধীনতা আন্দোলন, চিত্তরঞ্জনের স্বরাজ্য পার্টি, সুভাষচন্দ্রের ফরওয়ার্ড ব্লক, আজাদ হিন্দ বাহিনী – এমনি অনেক বিষয় আছে যা সর্বভারতীয় রাজনীতির তালে তাল মিলিয়ে চলে নি। লর্ড কার্জনও সম্ভবত এটা জানতেন, তাই কেবল বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদের কথাই ভেবেছিলেন, পাঞ্জাব-ব্যবচ্ছেদের কথা ভাবেন নি। বৃহৎবঙ্গের পূর্বাংশ বা পূর্ব পাকিস্তানের (আজকের বাংলাদেশ) সংখ্যাগিষ্ঠ নাগরিক মুসলমান, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা তুলনায় বেশি। স্বাধীনতা অর্জনের এই সময়-পর্বে যখন ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ নিয়ে বিতর্ক চলছে, তখন অত্যন্ত সুকৌশলে যুক্তবঙ্গের প্রস্তাব দেন হুসেন শাহীদ সুরাবর্দি। আপাতদৃষ্টিতে তার মধ্যে বাঙালি অস্মিতার মোহনমন্ত্র ছিল, বাঙালি ঐক্যের স্নিগ্ধ প্রলেপও ছিল। উভয় বঙ্গ মিলেমিশে এক হয়ে যাবে, বাঙালি জাতির মহামিলনে যুক্তবঙ্গ হয়ে যাবে বঙ্গরাষ্ট্র!
অতএব কিছু সমর্থনও পান সুরাবর্দি। তাঁদের অন্যতম হলেন শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়, আব্দুল হাসিম প্রমুখ। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই যুক্তবঙ্গকে পরে অনুকূল সময়ে পাকিস্তানে মিশিয়ে দেবার গোপন এজেণ্ডা ছিল হিন্দু-বিদ্বেষী সুরাবর্দির। এই পর্বে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা ও দূরদর্শিতার কথা ভুলে গিয়ে তাঁকে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা দিয়েছে মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট ও কংগ্রেসের একটা অংশ। শ্যামাপ্রসাদ বুঝেছিলেন পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে স্বতন্ত্র বঙ্গরাষ্ট্র বা যুক্তবঙ্গ যদি গড়ে ওঠে, জনসংখ্যার বিচারে সেখানেও মুসলমানই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী। অতঃপর সে দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুর অধিকার বিপন্ন হবেই। ইতিমধ্যে গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, নোয়াখালির দাঙ্গা, আসাম ও সুর্মাভ্যালির রক্তপাত ঘটে গেছে। জীবনানন্দের মতো নির্জনতার কবিও লিখতে বাধ্য হয়েছেন, “মানুষ মেরেছি আমি/তার রক্তে আমার শরীর ভরে গেছে...।” অতএব হিন্দু জনমত তৈরি করতে থাকেন শ্যামাপ্রসাদ। তাঁকে ডাকে ১৯৪৭-এর ১৪ এবং ১৫ই মার্চ কলকাতায় একটি আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন লর্ড এস.পি. সিনহা, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র্র মজুমদার, মেঘনাদ সাহার মতো বিশিষ্টজনেরা। ৪ থেকে ৬-ই এপ্রিল (১৯৪৭) হিন্দু মহাসভার তারকেশ্বর সম্মেলেনে দীর্ঘ আলোচনা হয় হিন্দুদের নিরাপদ ভবিষ্যের জন্য পশ্চিমবঙ্গ গঠনের প্রস্তাব নিয়ে। শেষে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এমনকি কমিউনিষ্টরা দীর্ঘদিন বঙ্গ বিভাজনের বিরুদ্ধতা করে এলেও শেষ পর্যন্ত জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রহ্ম প্রমুখ কয়েকজন পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে মত দেন।
হিন্দু মহাসভা, ভারতীয় জনসংঘ – এই দলগুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বলে শ্যামাপ্রসাদকে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা দেওয়া বড় সহজ! কিন্তু এই “তথাকথিত” সাম্প্রদায়িকতা যদি অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি দেখাতো তবে হিন্দু বাঙালির দণ্ডকারণ্য, মানা ক্যাম্প, মরিচঝাঁপির কান্না শুনতে হতো না। ১৯৪৬-৪৭, ১৯৫২, ১৯৭০-৭১ এমনকি এই কয়েক বছর আগেও কাঁটাতারের দাগ পিঠে নিয়ে দলে দলে যে হিন্দু-বাঙালি সাত পুরুষের ভিটে ছাড়তে বাধ্য হলো, তাঁদের জন্যেও একটা মনুষ্যজনোচিত আশ্রয় নিশ্চিত করা যেত।
ইতিহাস এগুলি দেখে নি বা দেখলেও আড়াল করে রেখেছে, আর আড়াল করেছে শিক্ষাবিদ শ্যামাপ্রসাদকে। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র বলে কিছুটা ছায়ায় ঢাকা ছিল শ্যামাপ্রসাদের উপাচার্য এবং শিক্ষাবিদ পরিচয়। সে পরিচয় তুলে ধরার আগে দেখে নিই চমকে দেবার মতো তাঁর ছাত্রজীবন। জীবনে কোনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হন নি শ্যামাপ্রসাদ। সে কালের ম্যাট্রিক, আই.এ. বি.এ. এম.এ – সর্বত্র প্রথম। প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজির সাম্মানিক স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার স্নাতকোত্তর। দু’টি ভাষাতেই অসাধারণ দখল ছিল শ্যামাপ্রসাদের। তাঁর মধুপুরের ডায়েরি, রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যাওয়া কাশ্মীরের ডায়েরি, নানা সময়ে লেখা চিঠিপত্র, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, স্যার আশুতোষের অসমাপ্ত জীবনী – এগুলি বাংলায় লেখা। আবার ছাত্রকালেই লিখেছেন গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ‘Social Plays of Girishchandra’. পরে লিখেছেন ‘Leaves from a Diary’, ‘A Phase of the Indian Struggle’, ‘Bengal Famine: An Unpunished Genocide’, ‘Awake Hindusthan’ ইত্যাদি মূল্যবান গ্রন্থগুলি। মুখোপাধ্যায় পরিবার থেকেই প্রকাশিত হতো সে কালের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যপত্র ‘বঙ্গবাণী’, যার মুখ্য দায়িত্বে ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।
এম.এ. পাশ করে আইনের পাঠ নেন সে কালের রীতি মেনে (বি.এল.) তারপর ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে আসেন ইংলণ্ড থেকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডিলিট’, বারাণসী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ‘এল.এল.ডি’ – এগুলিও তাঁর উজ্জ্বলতার অভিজ্ঞান। আর একটি তথ্য উল্লেখ করব যা পুত্রের সর্বাঙ্গীন মনোগঠনে পিতার প্রয়াস। স্যার আশুতোষের নির্দেশে ‘The Capital’ পত্রিকার সম্পাদক Pat Lovett- এর কাছে প্রবন্ধ শৈলীর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ নিতেন শ্যামাপ্রসাদ। বাণিজ্য, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ক আন্তর্জাতিক মানের এই সাপ্তাহিক তখন প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের নাড়ীর টান সেই ছাত্রকাল থেকে। তরুণ বয়সেই সিনেটের সদস্য হয়েছেন, তারপর ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত উপাচার্যের আসনে। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে যোগ দেওয়া সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্যের কৃতিত্বের চেয়েও বড় হলো শিক্ষাবিদ হিসাবে তাঁর এমন কিছু প্রয়াস, যাকে বৈপ্লবিক বললেও কম বলা হয়। যেমন সেই ব্রিটিশ শাসনকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ইংরেজিতে ভাষণ দেওয়াই ছিল বিধি। স্রোতের উজানে হেঁটে শ্যামাপ্রসাদই প্রথম বাংলায় ভাষণ দেবার ব্যবস্থা করেন। আরও উল্লেখযোগ্য যে দীক্ষান্ত ভাষণটি দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৩৭)। কেবল তাই নয়, সেদিন একটি গান লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন কবি (‘শুভ কর্মপথে ধরো নির্ভয় গান...’)। ২০০৭-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ধশতবর্ষে এই গানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত রূপে গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদকে ভুলে গিয়ে। আজও বহু স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে এ গান উদ্বোধনী সংগীত রূপে গাওয়া হয়, কিন্তু তার ইতিহাস থেকে যায় নেপথ্যে।
সে কালে পূর্ব ভারতে স্কুলশিক্ষা পরিচালনা করতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের মতো শ্যামাপ্রসাদও বুঝেছিলেন, আগে যোগ্য শিক্ষক চাই। ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে বিলেতেও এটা উপলব্ধি করেছিলেন। অতএব শিক্ষকের যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য শুরু করে দিলেন Teachers’ Training Course. প্রশিক্ষিত হলো হাজার হাজার নবীন শিক্ষক। আজ সরকারি ও বেসরকারি পরিচালনায় এমন শিক্ষক-শিক্ষণ কলেজের সংখ্যাই কয়েক হাজার। রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের কথা মনে রেখেছেন কত জন? মনে রাখেন না যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সোশ্যাল সায়েন্স বিভাগ তাঁরই মানস সন্তান। ম্যাট্রিক স্তর থেকে শুরু করে ভূগোল শিক্ষা চালু করেছিলেন সাম্মানিক স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরেও। ১৯৩৩ –এ তাঁর উদ্যমে গড়ে উঠেছিল The Calcutta Geographical Society. বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা দপ্তরকে সক্রিয় করে একের পর এক বই প্রকাশ শুরু করলেন (যার একটি অমরেন্দ্র নাথ রায় সম্পাদিত ‘শাক্ত পদাবলী’। ১৯৪৪-এ প্রকাশিত এ বই উৎসর্গপত্রে কৃতজ্ঞতা সহ মুদ্রিত হয়েছে শ্যামাপ্রসাদের নাম)। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস থেকে বিনা ব্যয়ে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন The Calcutta Geographical Society-র Journal. তাঁর উদ্যোগে স্বনামধন্য ভূগোলবিদ এস.পি. চ্যাটার্জীর সহযোগিতায় প্রকাশিত Bengal Atlas দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন নেহেরু ও প্যাটেল। ভারতের জাতীয় এ্যাটলাসের পরিকল্পনা এখান থেকেই নেওয়া হয়েছিল। কৃষিবিদ্যা শিক্ষার ব্যবস্থা, মিউজিয়াম স্থাপন, বাংলায় বৈজ্ঞানিক পরিভাষা প্রণয়নের প্রয়াস – সবই শুরু করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। আর একটি যুগান্তকারী কাজ হলো রবীন্দ্রনাথ, সুনীতিকুমার রাজশেখর বসুদের নিয়ে বাংলা বানান সংস্কার কমিটি স্থাপন। অনেক পরে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এ কাজে আরও অনেকটা এগিয়েছে কিন্তু শ্যামাপ্রসাদকে মনে রাখে নি। অথচ জহুরী জহর চেনে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজের অধ্যাপক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের লেখা সেই সময়ের একটি চিঠির অংশ তুলে দিচ্ছি। ল্যাবরেটরির জন্য কিছু মূল্যবান যন্ত্র আবশ্যক ছিল কিন্তু নানাভাবে তদ্বির করেও আচার্য রায় তা যোগাড় করতে পারেন নি। তখন একটি মজার চিঠি লিখেছিলেন শ্যামাপ্রসাদকে, “...University-এর সাধারণ কাজে তুমি দেখিতেছি বাপকা বেটা হইয়াছ। কেননা এত পরিশ্রম ও স্বার্থত্যাগ কেহই করিতে রাজী নয়।... কি প্রকারে কোন্ ফাণ্ড হইতে টাকা আসিবে আমি বুঝিটুঝি না...Science College-র জন্য... ‘Goniometer’ চাই।”
এরপর আসি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসনের প্রসঙ্গে। এ নিয়ে পিতা আশুতোষের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রশাাসনের দ্বন্দ্বের খবর অনেকেই রাখেন। একাধিক ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯২৩-এর ঘটনা। এ বছর উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হলে লর্ড লিটন স্যার আশুতোষকে পুনর্নিয়োগের প্রস্তাব দেন এবং সেই সঙ্গে শর্ত আরোপ করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাত্র রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসনের উপরে এমন সরকারী হস্তক্ষেপ মেনে নেন নি আশুতোষ এবং পুনর্নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
এই বাঘেরই পুত্র শ্যামাপ্রসাদ। কিন্তু ইতিহাস সে কথা মনে রাখে নি বরং কখনও কখনও উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদের কার্যকলাপকে স্বেচ্ছাচার বলে দাগিয়ে দেবারও চেষ্টা করেছে। এই সব অপচেষ্টা দূর করার জন্যেই দরকার প্রকৃত ইতিহাস, ‘সত্য’ ইতিহাস। যে সত্যের উপরে ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকে তার উদ্ঘাটন নির্ভর করে সাম্রাজ্যবাদের চাপমুক্ত নির্লোভ মানুষের নিরপেক্ষ সত্যবোধের উপরে। আর দরকার বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি। স্বাধীনতার আগে বা পরে কখনও তা ছিল না। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ বা মুসলমান ইতিহাসবিদ সকলেই ইতিহাস লিখেছেন তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে। সমাজতন্ত্রবাদী লেখকরাই তাই; সেখানে ভারতের সত্য ইতিহাস নেই, বাংলারও প্রকৃত ইতিহাসও নেই। এ উপলব্ধি বঙ্কিমচন্দ্রের। নানা সময়ে তাঁর হাহাকার উচ্চারিত হয়েছে নানা লেখায় - “বাঙ্গালার ইতিহাস নাই... যে দেশে গৌড় তাম্রলিপ্তি সপ্তগ্রামাদি নগর ছিল, যেখানে নৈষধচরিত গীতগোবিন্দ লিখিত হইয়াছে, যে দেশ উদয়ানাচার্য রঘুনাথ শিরোমণি ও চৈতন্যদেবের জন্মভূমি, সে দেশের ইতিহাস নাই।... ইতিহাসবিহীন জাতির দুঃখ অসীম।” (বাঙ্গালার ইতিহাস) অন্যত্র লিখেছেন, “বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নহিলে বাঙ্গালী কখন মানুষ হইবে না।... আইস, আমরা সকলে মিলিয়া বাঙ্গালার ইতিহাসের অনুসন্ধান করি।”
শ্যামাপ্রসাদের অনালোকিত জীবন বঙ্কিমচন্দ্রের সেই দাবিকেই যেন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে আজকের বঙ্গদেশে। এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাঁর কাছেই মাথা নত করে প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু ‘সত্য যে কঠিন...’ উত্তর-স্বাধীনতা কালে যাঁরা রাজনীতির নিয়ামক, যাঁদের মহাজনী নৌকা এতকাল আসমুদ্রহিমাচলে ভেসে চলেছে, তাদের কাছে নবতর সত্য গ্রহণ করা সহজ নয়। তবু শিশুক্ষার জগৎ থেকে আম জনতার জগৎ – ইতিহাসের তথ্য ও সত্যকে মিলিয়ে নিয়ে প্রকৃত ইতিহাস রচনার দায় নেবার সময় সমাগত। বঙ্কিমের ভাষাতেই বলি, ‘সুপবন বহিতেছে, পতাকা উড়াইয়া দাও....’। বঙ্কিমচন্দ্র সে কালের পতাকায় মধুসূদনের নাম লিখতে বলেছিলেন, আমরা বলি লেখা হোক শ্যামাপ্রসাদের নাম।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment