![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
অগ্নিকন্যা
সলিল পঞ্চানন
বন্দেমাতরম …….। সবে অভিভাষণ পাঠ শুরু হয়েছে। এমন সময় ভেসে এল এই ধ্বনি। সভাগৃহে চরম বিস্ময়। শব্দের উৎস জানতে সবাই উদগ্রীব। প্রথমে ফিসফিস, পরে গুঞ্জন। এমন সময় নিজ আসন থেকে উঠে দাঁড়াল বছর একুশের এক তরুণী। গাউন পরিহিতা বসেছিল তৃতীয় সারির এক আসনে। শান্ত সৌম্য প্রতিচ্ছবি। অথচ তাঁর চোখেমুখে এক কঠিন দৃঢ়তার ছাপ সুস্পষ্ট। এ কী কান্ড ! তরুণী যে ধীর পায়ে মঞ্চের দিকেই এগিয়ে চলেছে। দর্শক শ্রোতা তো বটেই, পাঠকও যেন কিছুটা বিব্রত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়!
সেদিন ছিল ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলে-র সমাবর্তন অনুষ্ঠান। মঞ্চে উপবিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য লে. জেনারেল হাসান সোয়ারাবর্দি। তাঁর দু’পাশে বিদগ্ধ অতিথিবর্গ। মঞ্চের সামনে বসে রয়েছে বেশকিছু ছাত্রছাত্রী। ছাত্রী কম, ছাত্রের সংখ্যা বেশি। সবাই অপেক্ষারত, নিজেদের কষ্টার্জিত ডিগ্রির সার্টিফিকেট গ্রহণ করবে বলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য তথা বাংলার গভর্নর জেনারেল স্ট্যানলি জ্যাকসন তাঁর অভিভাষণ পাঠ শুরু করার মুহূর্তের ঘটনায় নিজেও হতবাক। গাউন পরিহিতা যে তরুণী ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছিল মঞ্চের দিকে, সে ১৯৩১ সালে বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজিতে সেকেন্ড ক্লাস অনার্স পাশ করেছে। মেধাবী এই ছাত্রীও ডিগ্রি লাভের প্রত্যাশায় সেদিনের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত। সত্যিই কি তাই?. পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কিন্ত অন্যরকম ইংগিত করে …..!
আচার্য পুনরায় পাঠ শুরু করলেন, এদিকে তরুণীও ততক্ষণে পৌঁছে গেছে একেবারে মঞ্চের কাছাকাছি । কেউ কিছু বোঝার আগেই গাউনের ভিতর থেকে একটি হাত বেরিয়ে আসে। রিভলবার ধরা হাত। গর্জে ওঠে রিভলবার। অভিভাষণরত আচার্য তথা বাংলার গভর্নর মঞ্চের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। সকলের ধারণা, অনর্থ ঘটে গেছে! কিন্ত তরুণী বুঝতে পারে তার গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। গভর্নর প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছলনার আশ্রয় নিয়েছেন। পুনরায় গুলি করার উদ্যোগ নিতেই উপাচার্য লে.জে. হাসান সোয়ারাবর্দি মঞ্চ থেকে লাফিয়ে তাকে জাপ্টে ধরে ফেলে। তারই ফাঁকে আরো দু’রাউন্ড গুলি চালিয়ে দেয় সে। কিন্ত ধ্বস্তাধ্বস্তির কারণে তাও ব্যর্থ হয়। তরুণীর টার্গেট ছিল বাংলার গভর্নর। তাই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও অন্য কাউকেই সে আঘাত করতে চায়নি। এমনকি উপাচার্য হাসান সোয়ারাবর্দিকে মেরে নিজে পালিয়ে বাঁচতে পারত, অন্তত চেষ্টা করতে পারত। কিন্ত তাও করেনি। এদিকে গুলির শব্দে চতুর্দিক থেকে পুলিশ ছুটে এসে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চলে অবর্ণনীয়, নির্মম অত্যাচার। অবশেষে গ্রেফতার। বিধ্বস্ত ক্ষতবিক্ষত তরুণীর মুখ থেকে তখনও একটিই মাত্র ধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে, ‘বন্দেমাতরম’।
শহীদ বিনয় বসুর আদর্শে অনুপ্রাণিতা তথা ‘ছাত্রী সংঘ’-র সদস্যা এই তরুণী কে রিভলবার সাপ্লাই করেছিলেন বাংলার এক বীরাঙ্গনা কমলা দাশগুপ্ত। তার নাম জানার জন্য পুলিশ তরুণীর উপর চালায় অকথ্য শারীরিক নির্যাতন। তবুও মুখ থেকে নাম প্রকাশ করতে না পেরে তাকে ছেড়ে দেবার টোপ দেওয়া হয়। শর্ত একটাই, রিভলবার সাপ্লাইকারীর নাম প্রকাশ। হাজার প্রলোভন, অমানবিক অত্যাচার কোনও কিছুই আদর্শ থেকে তাকে বিচ্যুত করতে পারেনি। পুলিশ তার মুখ থেকে সাপ্লাইকারীর নাম জানতে ব্যর্থ হয়। নির্ভীক এই বীরাঙ্গনা বিচারের সময় কোর্টের উদ্দেশ্যে জ্যাকসন প্রসঙ্গে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, “অ্যাজ অ্যা ম্যান হি ইজ জাস্ট অ্যাজ গুড টু মি অ্যাজ মাই ফাদার, এন্ড লেডি জ্যাকসন জাস্ট অ্যাজ গুড অ্যাজ মাই মাদার। বাট দি গভর্নর অফ বেঙ্গল রিপ্রেজেন্টস এ সিস্টেম হুইচ হ্যাজ কেপ্ট এনস্লেভড থ্রি হান্ড্রেড মিলিয়ন অফ মাই কান্ট্রিমেন এন্ড ওমেন”। এখানেই অনন্য বাংলার বীরাঙ্গনা এবং তার মানবিক স্বত্বা। এরপর বিচারের নামে চলে প্রহসন। মাত্র একদিনে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন। বিচারে তার নয় বছর সশ্রম কারাদণ্ড ঘোষিত হয়।
শ্রদ্ধেয় পিতামাতার আদর্শনিষ্ঠ সন্তান হলেন এই বীরাঙ্গনা। পিতা বেণীমাধব দাস ছিলেন ভারতমাতার শ্রেষ্ঠ সন্তান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রিয় শিক্ষক এবং মার্গদর্শক। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন কটকের রাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক। বাবা মা দুজনেই ব্রাহ্মসমাজের ভাবধারার সাথে সম্পৃক্ত থাকায় সন্তানেরা হয়ে উঠেছিল মুক্তমনা ও প্রগতিশীল। মা সরলা দেবী কলকাতায় মহিলাদের থাকার জন্য ‘পূণ্য আশ্রম ‘স্থাপন করেন। যা ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দীক্ষিত মেয়েদের নিশ্চিত আবাসস্থল। সময়ের নিরিখে ঐতিহাসিক এবং দুঃসাহসিকও বটে। দিদি কল্যাণী দাসও ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, ছাত্রীসংঘের সম্পাদিকা এবং পরবর্তীতে ‘যুগান্তর ‘ দলের এক প্রথম সারির নেত্রী। আদর্শবাদী পিতামাতা এবং বড়মামা বিনয়েন্দ্র নাথ সেনের মহৎ চরিতকথা---দিদির সাথে ছোট বোনেরও মানসিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করে তুলেছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কন্টকাকীর্ণ পথকে বেছে নিতে, বলাই বাহুল্য।
দীর্ঘ নয় বছর পর কারাবাস মুক্ত হন বীরাঙ্গনা। যে সময় প্রতিটি যুবক যুবতী নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য ব্যস্ত থাকে, সেসময় তাকে ভারতমাতার শৃঙ্খল মুক্ত করতে চাওয়ার অপরাধে কারাগারে বন্দী হয়ে কাটাতে হয়। কেবল তাই নয়, সেনেট হলে সেই ঘটনার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার সার্টিফিকেট বাতিল করে দেন। আরও বড় চমক ছিল তার অপেক্ষায়। কারামুক্তির পর অগ্নিকন্যা বাড়ি ফিরে দেখেন ইংরেজ পুলিশ তার ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র তছনছ করে দিয়ে গেছে। অনেক সামগ্রীর সাথে তার ইংলিশ অনার্স পাশ মার্কশিটও খোয়া যায়। এই দুটি ঘটনার কালোছায়া পরবর্তীতে তার জীবন দুর্বিষহ করে তোলে এবং এক মর্মান্তিক পরিণতির দিকে তাকে ঠেলে দেয়।
বীরাঙ্গনা তো আসলে এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। দেশের জন্য নিবেদিত যার প্রাণ, ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত স্বার্থের বেড়াজাল তাকে কী করে আটকে রাখবে? কিছুদিনের মধ্যেই গান্ধীজির ডাকে সাড়া দিয়ে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ আবার গ্রেফতার এবং চার বছরের কারাদণ্ড। আন্দোলন, পুলিশি জুলুম আর কারাদণ্ডের পর অবশেষে এল সেই কাঙ্খিত দিন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট। অনেক রক্তের বিনিময়ের ভারতের স্বাধীনতা লাভ। স্বাধীনতার বছর তার জীবনে আরও এক কারণে উল্লেখযোগ্য হয়ে রইল, স্বাধীনতা সংগ্রামী যতীশ ভৌমিকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন তিনি। এরপর স্বাধীনোত্তোর ভারত গড়ার কাজে পূর্ণোদ্যমে নেমে পড়েন নব দম্পতি। কম্প্যাশেনেট গ্রাউন্ডে দক্ষিণ কলকাতার এক শিক্ষায়তনে ইংরেজী শিক্ষিকার পদে ব্রতী হন তিনি। ১৯৬০ সালে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে সম্মানিত হন। তবে নৈতিকতার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার প্রদত্ত ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশন’ নিতে অস্বীকার করেন।
কালের নিয়মে একে একে বাবা মা স্বামী সহ পরিবারের সবাই তাকে ছেড়ে অন্যলোকে যাত্রা করেন। বীরাঙ্গনাও শিক্ষকতার পেশা থেকে অবসর নেন। কিন্ত শত চেষ্টার পরেও পেনশন প্রাপ্তি আর হয়ে ওঠে না তার। একটা পূর্বে স্বেচ্ছায় ছেড়েছেন আর একটা নিয়মের বেড়াজালে সরকারী অনুমোদন না পাওয়ায়। এরপর থেকেই নিঃসন্তান বিধবার একাকী জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অবহেলা আর অপমান তখন তার নিত্যসঙ্গী। চেনাজানা এবং আশেপাশের লোকজনের আচরণে বিপর্যস্ত শরীর ও মন। অভিমানে একদিন নিঃশব্দে তার প্রিয় শহর কলকাতা ছেড়ে হরিদ্বার চলে যান তিনি। ২৬ ডিসেম্বর ১৯৮৬ সাল হৃষিকেশ পুলিশ গঙ্গার ধারে এক বেওয়ারিশ মহিলার লাশ উদ্ধার করে। প্রায় এক মাস পর তাঁর এক ছাত্রের কাছে খবর পেয়ে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ডঃ ত্রিগুণা সেন পুলিশ মর্গে গিয়ে লাশটি সনাক্ত করেন। তিনি আর কেউ নন, অত্যন্ত বেদনায় অপমানে বাংলা ছেড়ে চলে যাওয়া অগ্নিযুগের অগ্নিকন্যা --- বীণা দাস। তার শেষের ক’মাসের ইতিহাস অজানা তথ্যের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলে-র উক্ত ঘটনার পর ইংরেজ সরকার লে.জে. সুয়ারাবর্দিকে ‘নাইটহুড’ উপাধি দান করে তার বিশ্বস্ততার প্রতিদান হিসেবে। স্বাধীন ভারতে তার নামে রাস্তার নামকরণও করা হয়। আর বীণা দাস?
স্বাধীনতার অতন্দ্র সেনানী, ইংরেজ আমলে সয়েছেন পুলিশের অকথ্য অত্যাচার, যৌবনের প্রায় সম্পূর্ণ সময় কাটিয়েছেন লোকচক্ষুর আড়ালে ইংরেজের কালো কুঠুরিতে। সেটা নাহয় ছিল ইংরেজ আমল। ভারতমাতার শৃঙ্খল মুক্ত করার সংগ্রামের বিশ্বস্ত সৈনিক ছিলেন তিনি। অসম এই যুদ্ধে তার উপর বর্বরোচিত আক্রমণ নেমে আসবে এটা স্বাভাবিক, আর তা তার জানা। আর জেনেশুনেই তিনি এপথে পা বাড়িয়েছিলেন। কিন্ত স্বাধীনতা লাভের পর? স্বাধীন দেশ ও দেশবাসীর কাছে বুঝি উপহাসের পাত্রী হয়ে রয়ে গেলেন তিনি! তবুও তো কমবেশী যা পেয়েছেন তা কেন্দ্রীয় স্তরে। আর তার প্রিয় বাংলা বা কলকাতা? কী দিয়েছে তাকে? লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, গঞ্জনা আর অপমান! হায়রে বাংলা, হায়রে বাঙালি অস্মিতা! শুধুই বোলবোলা আর চাটুকারিতা! নাকি বিস্মৃতির গহ্বরে ঠেলে দেওয়া? ইতিহাস সাক্ষী, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ যাত্রাপথে তবু বীণা দাস আজও অগ্নিকন্যা।

.png)
.png)
No comments:
Post a Comment