![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
চিন্ময়ী মায়ের মৃন্ময়ী রূপ ও পতিতালয়ের মাটি
শৌনক দত্ত
সনাতন ধর্ম এমন একটি বহমান ধারা। সময়ের সাথে সাথে নতুন শাস্ত্র তথা স্মৃতি, অন্যান্য বিষয় যেমন এগিয়েছে তেমনি মানুষের দেবদেবীর কল্পনায়ও এসেছে ভিন্নতা । কাজই এই বহমান ধারার বৃহৎ রশ্মির কোনো একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে মাথা গলিয়ে দিলেই হিন্দুধর্মের ক্রমবিবর্তনের ধারাটিকে উদ্ধার করা যাবে না। উমা আসছেন মর্ত্যে। প্রতিটি দূর্গামন্ডপে সাজ সাজ রব। দেবী দুর্গার কাঠামো পূজো রথযাত্রায় হয়ে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। দেবীকে মৃন্ময়ী রূপ দিতে ব্যস্ত মৃৎ শিল্পীরা। মৃৎশিল্পীর নিপুণ হাতের জাদুতে মহিষাসুরমর্দিনী আস্তে আস্তে দেবী রূপ পাবেন। সেই ছোট্টবেলা থেকে প্রতিমা বানানো দেখতে আমার দারুণ লাগে। কেন দারুন লাগে যদি বলতে বলেন অবশ্যই সেটা বলতে পারবো না, তবুও বুঝতে শেখার দিন থেকে শ্মশানে একপা চলে যাবার পরও আমি কাঠাম পূজো থেকে দেবী হয়ে ওঠার সময় কালটা দারুন ভাবে উপভোগ করি। আজ এই সব লিখতে গিয়ে মনে হলো সম্ভবত জয় বাবা ফেলুনাথ পড়া ও দেখার পরে আমার প্রতিমা বানানো দেখার নেশা প্রকট হয়েছিল। আমিও ক্যাপ্টেন স্পার্ক হতে চেয়েছিলাম। তখন নবম শ্রেণীতে পড়ি, ঠাকুর দালানে সেদিন শুনতে পেলাম বেশ্যা বাড়ি থেকে মাটি আনা হয়নি বলে ঠাকুরদার চিৎকার চেঁচামিচি। আপনারা নিশ্চয় জানেন হিন্দুশাস্ত্র লিঙ্গপুরাণে দুর্গাপুজোকে ‘চতুষ্কর্মময়ী’বলা হয়েছে। চতুষ্কর্ম বলতে–(১) মহাস্নান, (২) ষোড়শোপচার পুজো, (৩) বলিদান এবং (৪) হোম। দুর্গাদেবীর স্নান একটি অত্যাবশ্যকীয় পূজাঙ্গ। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিথিতে দেবীকে বহুবিধ উপাচার সহযোগে স্নান করানো হয়। উপাচারগুলি কী আমরা এবার জেনে নিতে পারি। এই উপাচারগুলির মধ্যে ১২ টি মাটির উল্লেখ পাওয়া যায়–(১) রাজবাড়ির দুয়ারের মাটি, (২) চার মাথার মোড়ের মাটি, (৩) গঙ্গার মাটি, (৪) ষাঁড়ের শৃঙ্গ মাটি, (৫) নদীর দুই কূলের মাটি, (৬) সর্বতীর্থের মাটি, (৭) উইঢিবির মাটি, (৮) সাগরের মাটি, (৯) বুনো শুয়োরের দন্তলগ্ন মাটি, (১০) গোষ্ঠের মাটি, (১১) দেবদুয়ারের মাটি এবং (১২) বেশ্যাদ্বারের মাটি। আমি সেইদিনই প্রথম জানলাম এত রকম মাটি ও উপকরণের প্রয়োজন হয়।
বেশ্যাবাড়ির মাটি কেন ব্যবহার করা হয় এই প্রশ্নটা করার মতন কোন মানুষ এবং অতি অবশ্যই সাহস আমার ছিলো না। আমি নানা বইয়ে খুঁজে বেড়াতে লাগলাম। আর এই সন্ধান করতে গিয়ে দেখলাম ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, দূর্গা পূজার প্রথম প্রবর্তক কৃষ্ণ, দ্বিতীয় বার দুর্গা পূজা করেন স্বয়ং ব্রহ্মা আর তৃতীয়বার দুর্গা পূজার আয়োজন করেন মহাদেব। আবার দেবী ভাগবত পুরান অনুসারে জানতে পারি, ব্রহ্মার মানস পুত্র মনু ক্ষীরোধ সাগরের তীরে দূর্গার আরাধনা করে বর লাভে সফল হন। মূল বাল্মীকির রামায়ণে, দুর্গা পূজার কোন অস্থিত্ব নাই। কিন্তু বাঙালি যে রামায়ণ পড়ে রাম কাহিনী জানলো সেই কৃত্তিবাসী রামায়ণে দুর্গাপূজার অস্থিত্ব আছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এটি মূল রামায়ণের আক্ষরিক অনুবাদ নয়। মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কবি কৃত্তিবাস ওঝা সংস্কৃত রামায়ণ বাংলা করার সময় মূল রামায়ণের বাইরের তৎলালীন সমাজে প্রচলিত বাংলার সামাজিক রীতিনীতি ও লৌকিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ, অনেক মিথ, গল্প বাংলা রামায়ণে ইচ্ছাকৃতভাবে (নাকি গৌড়েশ্বর বা অন্য কারো অনুরোধে?) ঢুকিয়ে বাংলা রামায়ণ আরো অধিক সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, তিনি সংস্কৃত রামায়ণ উপাখ্যানের এমনভাবে বঙ্গীকরণ বা বাঙ্গালীকরন করেন--যা পড়লে মনে হবে, রামায়নের ঘটনা তার সমাজের আদি কাহিনী।
কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাংলাভাষী হিন্দু সমাজে বেশ জনপ্রিয়তা পায়, সেখানে তিনি কালিকা পুরাণের ঘটনা অনুসরণে ব্রহ্মার পরামর্শে রামের দুর্গা পূজা করার কথা উল্লেখ করেছেন। শক্তিশালী রাবনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিজয় নিশ্চিত করতে শরৎকালে শ্রী রাম চন্দ্র কালিদহ সাগর থেকে ১০১ টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে প্রাক্ প্রস্তুতি হিসাবে দুর্গা পূজা করে দুর্গার কৃপা লাভ করেন বলে কৃত্তিবাস ওঝা বর্ণনা করেছেন। তবে দুর্গা পূজার সব চাইতে বিশদ বর্ননা পাওয়া যায় মার্কন্ডুয়ে পুরানে। যেখানে মহির্ষী জৈমিনি ও মহির্ষী মার্কন্ডুয়ের কথোপকথনের ভিত্তিতে পুরাণটি রচিত হয়। এই পুরাণের মধ্যে তেরটি অধ্যায় দেবীমহাত্ম্যম নামে পরিচিত। বাংলায় শ্রীশ্রী চন্ডী নামে সাতশত শ্লোক বিশিষ্ট দেবী মহাত্ম্যম পাঠ আছে--যা দুর্গা পূজার প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পূজার আসরে স্থায়ী হয়ে গেছে। মোটা দাগে এই কথাটি প্রচলিত থাকলেও দূর্গা পূজার বিধি নিয়েও ইতিহাস ঘাঁটলে দেখতে পাই বাঙালিকরণের গল্প সেখানেও ঢুকে পড়েছে সহজসরল বাঙালির মতোই! খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রাজশাহীর তাহের পুরের উদয় নারায়ণের পুত্র রাজা কংশনারায়ণ খাঁ যখন তাঁর প্রধান পুরোহিত ও সভা পন্ডিত নাটোরস্থ বাসুদেবপুর গ্রামের শাক্ত মতালম্বী রমেশ চন্দ্র শাস্ত্রীর কাছে জানলেন চার প্রকার যজ্ঞ আছে, কিন্তু রাজসূয়,বাজপেয়ি ও বিশ্বজিৎ এই তিনপ্রাকার যজ্ঞ স্বাধীন সার্বভৌম রাজচক্রবর্ত্তী দ্বিগজয়ী বীরের এবং অশ্বমেধ কলিতে অচল তাই তিনি মনস্থির করলেন মহা আড়ম্বরে যজ্ঞের অনুরূপ মহাপূজা করবেন কি সেই মহাপূজা অনেক ভেবে কিংবা কৃত্তিবাস রামায়ণ পড়ে অনূপ্রানিত হয়েছিলেন তাই রামের মতো তিনিও ঠিক করলেন দুর্গা পূজা করবেন সেই শুরু আজো বাঙালীরা মহা ঘটা করে দূর্গাপূজা করছে। ঐ সময় প্রায় আট লক্ষ টাকা খরচ করে তিনি পূজা করেন এবং এই পূজার নিয়ম কানুন শ্লোক(যাকে মন্ত্র বলা ঠিক নয়) সব কিছু ওই শাক্ত মতাবলম্বী রমেশচন্দ্র শাস্ত্রীর তৈরী এবং অতিঅবশ্যই বাঙালি ধরনে ও বাঙালির একান্ত নিজস্ব ধারায়। কেন এমন বলছি কারণ মার্কন্ডেয় মুনির নামে লেখা চন্ডীপুরাণ, মার্কেন্ডয় পুরাণের ৮১ থেকে ৯৩ টি অর্থাৎ ১৩ টি অধ্যায় মোট ৭০০ টি শ্লোক নিয়ে চন্ডীপুরাণ রচিত তাকে 'সপ্তশতী'ও বলা হয়। শোনায় ও পাঠে আবেগ ও ভক্তি উৎপত্তি হয় ঠিকই,কিন্তু তাতে ঈশ্বরীয় ব্যাপার কিছু নেই।
এর পুরো ব্যাখ্যা গোয়ালিয়র রাজ্যের ভিন্ড নামক স্থানে গবেষক দ্বারা প্রাপ্ত রাজা ভোজ দ্বারা রচিত ইতিহাস সঞ্জিবনী গ্রন্থে প্রামাণ পাওয়া যায়।
বাঙালির আগে কি তাহলে দুর্গা পূজা হয়নি? এই নিয়ে ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম সনাতন ধর্মের আর্য ঋষিরা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতীক হিসাবে দেবী দুর্গার আশীর্বাদ লাভের জন্য আরাধনা করতেন। মার্কন্ডুয়ে পুরান মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথা খ্রীষ্ট্রের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে ওড়িষ্যা) দশেরা নামে দূর্গা পুজা প্রচলন করেছিল। নেপালে দশেরা বা দশাইন নামেই পুজা হয়। যদিও প্রাচীন ওরিষ্যার সাথে নেপালের পূজার যোগসূত্র আছে কিনা সে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পরিব্রাজক, বৌদ্ধ পন্ডিত হিউয়েন সাংকে নিয়ে দূর্গাপূজার একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। চীনা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাখায় বিভ্রান্ত হয়ে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের মূল পান্ডুলিপি সংগ্রহে ৬৩০ সালে ভারত সফরে আসেন। ভারত বর্ষের নানা বিহারে বিদ্যা অর্জন করেন। ৬৩৫-৬৪৩ পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছর তিনি হর্ষবর্ধনের রাজ সভায় ছিলেন। তবে তার কাহিনী দূর্গা, কালী, কালীর আরেক রূপ চন্ডি নাকি বন দেবীকে নিয়ে-তা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে তার রচনায় উল্লেখ করেছেন, হর্ষবর্ধন এর সময়ে দস্যু তস্কর এর উপদ্রব খুব বেশি ছিল এবং তিনি নিজেও একাধিক বার দস্যুর হাতে নিগৃহিত হয়েছিলেন। তার প্রবাস জীবনের কোন এক সময়ে গঙ্গাপথে (প্রাচীন গঙ্গারিডি) এই পরিব্রাজক কোন বৌদ্ধ বিহারে যাচ্ছিলেন। পথে দস্যুর কবলে পড়লেন। দস্যুরা তাকে দেবী দূর্গার সামনে বলি দেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। কেউ মনে করেন, বন দেবী, কেউ মনে করেন কালী, কারণ প্রাচীনকালে নরমুন্ড ভোগ দেবার বিষয়টি বনদেবী বা কালী দেবীর জন্য প্রযোজ্য ছিল--যা এখন পাঠা দিয়ে পূরণ করা হয়। দূর্গা মাকে খুশী করার জন্য নরমুণ্ড ভোগ দেবার বিষয়টি ইতিহাস থেকে জানা যায় না। যাই হোক, বলির পূর্ব প্রস্ততি প্রায় শেষ, এমন সময় প্রচন্ড বেগে ঝড় ছুটে এল। সব আয়োজন ঝড়ের কবলে লন্ডভন্ড হয়ে গেল। ডাকাতরা জান বাঁচাতে পালাতে লাগল। সেই সুযোগে হিউয়েন সাংও পালিয়ে যান।
বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাস সন্ধান করতে গেলে দেখবো মধ্য যুগে বাংলা সাহিত্যে দূর্গা পূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে আছে দুই ধরনের স্থাপত্যরীতি মন্দির। প্রাচীনতমটি পঞ্চরত্ন দেবী দূর্গার--যা সংস্কারের ফলে মূল চেহেরা হারিয়েছে। ১১শ বা ১২শ শতক থেকে এখানে কালী পূজার সাথে দূর্গা পূজাও হত। ইতিহাসবিদ দানীর মতে, প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে রমনায় কালী মন্দির নির্মিত হয়েছিল এবং এখানেও কালী পূজার সাথে দূর্গা পূজা হত। ১১শ শতকে অভিনির্ণয়-এ, মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দূর্গাভক্তিতরঙ্গিনীতে দূর্গা বন্দনা পাওয়া যায়। বঙ্গে ১৪শ শতকে দুর্গা পূজার প্রচলন ছিল কিনা ভালভাবে জানা যায় না। ঘটা করে দূর্গা পূজা চালুর আগে কিছু কিছু উচ্চ বর্ণ হিন্দুদের গৃহকোণে অত্যন্ত সাদামাঠা ভাবে ঘরোয়া পরিবেশে এই পূজা চালু ছিল। আর ঘটা করে দূর্গা পূজার ইতিহাস, খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। তবে কখন থেকে ঘটা করে এই পূজা চালু হল--তা নিয়ে পরিষ্কার বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক কোন প্রমান পাওয়া যায় না। যতটুকু জানা যায় তা হল, কারো মতে, ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দের শেষের দিকে দিনাজপুরের জমিদার প্রথম দূর্গা পূজা করেন। আবার কারো মতে, ষোড়শ শতকে রাজশাহী তাহেরপুর এলাকার রাজা কংশ নারায়ন প্রথম দূর্গা পুজা করেন। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারে দূর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন। অনেকে মনে করেন, ১৬০৬ সালে নদীয়ার ভবনানন্দ মজুমদার দূর্গা পূজার প্রবর্তক। ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দূর্গা পূজার আয়োজন করেছিল বলে ধারণা করা হয়। এই সাবর্ণ রায় চৌধুরীর দুর্গা প্রতিমা থেকেই আদতে বাংলায় দেবী দুর্গার যে মূর্তিটি সচরাচর দেখা যায় সেটি পরিবারসমন্বিতা বা সপরিবার দুর্গার মূর্তি। এই মূর্তির মধ্যস্থলে দেবী দুর্গা সিংহবাহিনী ও মহিষাসুরমর্দিনী; তার মুকুটের উপরে শিবের ছোট মুখ, দেবীর ডানপাশে উপরে দেবী লক্ষ্মী ও নিচে গণেশ; বামপাশে উপরে দেবী সরস্বতী ও নিচে কার্তিকেয়। তারা কার্তিকেয়র রূপ দেন জমিদারপুত্রের, যা তৎপূর্ব ছিল সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের আদলে যুদ্ধের দেবতা রূপে। এছাড়াও বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর-সংলগ্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গা এক বিশেষ মূর্তি দেখা যায়। সেখানে দেবীর ডানপাশে উপরে গণেশ ও নিচে লক্ষ্মী, বামে উপরে কার্তিকেয় ও নিচে সরস্বতী এবং কাঠামোর উপরে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বৃষভবাহন শিব ও দুইপাশে দেবীর দুই সখী জয়া ও বিজয়া অবস্থান করেন।
এত কিছুর সন্ধান পেলেও দুর্গাপুজোয় বেশ্যাদ্বারের মাটির ব্যবহারের কোন বিধি আমি খুঁজে পাইনি। যেহেতু বিধির সন্ধান নেই সেহেতু পতিতালয়ের মাটি ব্যবহারের কোন বিধানও আমি পাইনি। তবে একটি মন্ত্রের সন্ধান পেয়েছি-
‘‘এবংবিধা ভবেদ্দেশ্যা ন বেশ্যা কুলটা প্রিয়ে। কুলটাসঙ্গমাদ্দেবী রৌরবং নরকং ব্রজেৎ॥"
এখানে বেশ্যা শব্দটি কুলটা নয়,কুলটা বেশ্যা রৌবব নরকে গমন করে। দশমহাবিদ্যায় পূর্ণাভিষিক্ত ব্রহ্মবাদিনী নারীকেই এখানে বেশ্যা বলা হচ্ছে।”
‘‘বেশ্যা ন তু পতিতায়াং বশ্যং ত্রিলোকং ততৌ বেশ্যা।।’’
এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে বেশ্যা মানে পতিতা নয়। ত্রিলোক যাঁহার বশে তিনিই বেশ্যা। তন্ত্র অভিষিক্ত ব্রহ্মবাদিনী নারীর দেহে দশমহাবিদ্যা অবস্থান করেন। সেই নারীর সাধনস্থলের মৃত্তিকার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সেই নারীর গৃহের মৃত্তিকা যিনি যথাযথ সংসার ধর্ম পালন করেন ও তন্ত্র সাধনায় দশমহাবিদ্যার উপাসনার মাধ্যমে ব্রহ্মবাদীনি হয়ে ওঠে। মহানির্ব্বাণ তন্ত্রে দেখা যায় পূর্ণাভিষিক্ত পুরুষ ও পূর্ণাভিষিক্তা স্ত্রী স্থানে চক্রানুষ্ঠান পূর্ব্বক সাধনমার্গের চূড়ান্ত স্তরে উপনীত হন সেই স্থানের মৃত্তিকাকে বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা বলে। ফলে গুরুগৃহের মাটি বা কোনও সিদ্ধপীঠস্থান বা সতীপীঠের মাটি ব্যবহারের অনুমতি আছে। দশবিধ অনুযায়ী মাটির অভাবে শুধুমাত্র গঙ্গামাটি দিয়েও মায়ের মহাস্নান সম্পন্ন করার বিধান আছে শাস্ত্রে কারণ গঙ্গা সর্ব তীর্থময়ী। এইটা জানার পরে আমার মনে অন্য একটা প্রশ্ন জাগলো। মায়ের প্রতিমা তৈরিতে তবে পতিতালয়ের মাটির ব্যবহার প্রচলন কেন করা হলো? জেনে বুঝে নাকি অজ্ঞানে? অজ্ঞানে এটা মানতে মন চায় না বরং শুধু মনে হয় বাংলায় দুর্গা পূজার প্রচলন করেছেন রাজা জমিদাররা হয়ত তারাই ত্রিলোক যাহার বশে বলতে নাচঘরের সেই নর্তকী বা পতিতাকেই বৈধতা দিতে চেয়েছেন! সাল-তারিখ-উদ্দেশ্য কিছুই জানা যায় না। তবে মনে হয় গণিকালয় যে একটি পবিত্র জায়গা, এটা সাব্যস্ত করতেই তৎকালীন সমাজপতিদের এহেন অপব্যাখ্যা। এর ফলে গণিকাগমন কোনো অপরাধ হয় না। পাপ কাজ বা কোনো ঘৃণ্য কাজ রূপে পরিগণিত হয় না। সেকালে এখনকার মত গণিকাবৃত্তি ও গণিকাগমন মোটেই ঘৃণ্য ছিল না। আর একটা কারণও হতে পারে। এমনটাও মনে হয়—একটা পুরুষ যখন গণিকার বাড়ি গিয়ে অবৈধ যৌনাচার করে তখন ওই পুরুষের জীবনের সমস্ত পুণ্য গণিকার বাড়ির মাটিতে পতিত হয় বা পুণ্য তাঁকে ত্যাগ করে, বিনিময়ে ওই পুরুষ গণিকার ঘর থেকে নিয়ে আসে সমস্ত পাপ। এরূপ বহু পুরুষের অর্জিত সমস্ত পুণ্য ত্যাগে গণিকাদের ঘরের মাটি পূণ্যময় হয় বলে মনে করা যায়, তাই গণিকার ঘরের মাটি ব্যবহারের বিধান দেয়া হয়েছে।
জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে আমার স্পষ্ট ধারণা জন্মেছে যে ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দূর্গা পূজার আয়োজন করেছিল বলে এই সাবর্ণ রায় চৌধুরীর দুর্গা প্রতিমা থেকেই আদতে বাংলায় দেবী দুর্গার যে মূর্তিটি আমরা এখন দেখি সেটি প্রচলিত। আবার তারও আগে খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রাজশাহীর তাহের পুরের উদয় নারায়ণের পুত্র রাজা কংশনারায়ণ খাঁ কৃত্তিবাস রামায়ণ পড়ে অনূপ্রানিত হয়েছিলেন তাই রামের মতো তিনিও ঠিক করলেন দুর্গা পূজা করবেন সেই শুরু আজো বাঙালীরা মহা ঘটা করে দূর্গাপূজা করছে। ঐ সময় প্রায় আট লক্ষ টাকা খরচ করে তিনি পূজা করেন এবং এই পূজার নিয়ম কানুন শ্লোক(যাকে মন্ত্র বলা ঠিক নয়) সব কিছু ওই শাক্ত মতাবলম্বী রমেশচন্দ্র শাস্ত্রীর তৈরী এবং অতিঅবশ্যই বাঙালি ধরনে ও বাঙালির একান্ত নিজস্ব ধারায়। এই দুটি জিনিসকে যদি আপনি প্রামাণ্য ধরেন তবে একটা জিনিস খুব স্পষ্ট হয় যে বাঙালির দুর্গা প্রতিমারূপ ও পূজা বিধান সম্পূর্ণ মনগড়া এবং বাঙালির একান্ত নিজস্ব সৃজন। দুর্গাপূজার প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেবীর বোধন তথা জাগরণের প্রথা প্রচলিত রয়েছে। বোধনের যে-পৌরাণিক গল্পই পরবর্তীকালে সংযুক্ত হোক না-কেন, দুর্গার পূজা প্রসঙ্গে, মূলে যে ঐ শিকার ও সংগ্রহনির্ভর ধর্মধারার উপজীব্য আচার-বিধির মধ্যেই লুকিয়ে আছে তা খুঁজে বের করা এমন কিছু কঠিন নয়। বোধন বা জাগরণকেন্দ্রিক কিছু-কিছু সংস্কারের দিকে চোখ ঘোরালেই তার সন্ধান মেলে। যেমন, লৌকিক বনদুর্গার পূজা উপলক্ষে গাছ জাগানোর একটি প্রথা আছে। দেবী সেখানে বৃক্ষবিশেষের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছেন বলে কল্পনা করা হয় এবং সেই গাছকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে বনদুর্গার ‘বর্ত’ (অর্থাৎ, ব্রত) বা পূজার মুখপাত করা হয়। এই সব লৌকিক স্ত্রী-দেবতাই বিবর্তিত হতে-হতে একটা বিশেষ পর্যায়ে এসে ক্ল্যাসিক্যাল দুর্গায় পরিণতি লাভ করেছেন। লৌকিক রীতিগুলি বিবর্তিত বা রূপান্তরিত হয়েও টিঁকে আছে তার মধ্যে, কিন্তু প্রত্যেকটি রীতির অন্তর্নিহিত প্রাচীনতর ভাবনা-তাৎপর্যের বাইরের ব্যাখ্যাটা পাল্টে গিয়ে কোনো-একটা-কিছু পুরাণ-কাহিনির উদ্ভব ঘটেছে সেখানে। সংস্কৃতির ক্রমচলিষ্ণু চরিত্রের জন্য প্রথা,আচার,বিশ্বাস,সংস্কার-ইত্যাদির ক্ষেত্রে এমনটি যে হামেশাই ঘটে, সেকথা নৃবিজ্ঞানী এবং লোকসংস্কৃতির তাত্ত্বিকরা বলে থাকেন। সুতরাং দুর্গার বোধনের মধ্যে আদিম বৃক্ষ-জাগরণ, শস্য-জাগরণ ইত্যাদি বিশ্বাসই সঞ্চিত হয়ে আছে যে, সেটা স্বচ্ছন্দেই বুঝতে পারি। ক্ল্যাসিক্যাল রামায়ণের অনুষঙ্গ হিসেবে যে-সব অর্বাচীন পৌরাণিক কাহিনি গড়ে উঠেছে,সেগুলির মধ্যে বৃক্ষের বোধনের বদলে দেবীর মানবীমূর্ত্তিতে জাগরণের কল্পনাটা এইসব সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত-থাকা আচরণরূপে প্রতিভাষিত হয়েছে। কিন্তু বৃক্ষজাগরণের কল্পনাটা প্রাথমিকভাবেই বা কেন সঞ্জাত হয়েছিল? বর্ষার শেষে শরৎকালে নতুন করে যখন মানুষ সাচ্ছন্দজীবনের আস্বাদ পেত, তখন প্রকৃতি-উপাসক আদিম মানুষেরা বৃক্ষের অবলীন যে-অলৌকিক শক্তির কল্পনা করত, তাকেই জাগিয়ে তুলত । মূলত, নূতন করে খাদ্যসংগ্রহের আয়োজন শুরু হতো যখন, তখনকার সেই-আরণ্যক-উৎপাদন ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসটা ধর্মধারার মধ্যেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিফলিত হতো। ফল, মূল, শস্য ইত্যাদি যখন খাদ্যরূপে প্রয়োজনীয়, তখন তাদের প্রত্যেকটিকে অবলম্বন করেই এক-একটি দেবকল্পনা দানা বাঁধল। এদের প্রত্যেকটিই সমাবৃত হয়েছে দুর্গার সঙ্গে আরাধিত নবপত্রিকার মধ্যে : কলা (ব্রহ্মাণী), কচু (কালী), হলুদ (দুর্গা), জয়ন্তী (কার্তিকী), বের (শিবা), ডালিম (রক্তদন্তিকা), অশোক (শোকরহিতা), মানকচু (চামুন্ডা), ধান (লক্ষ্মী)। দেবীদের এইসব নাম পরবর্তীকালেই নির্দিষ্ট হয়েছে; আদিকালের মানুষেরা নিশ্চয় এইসব তৎসম শব্দের সাথে পরিচিত ছিলেন না। এঁরা সবাই মিলেই কালক্রমে দুর্গার সঙ্গে মিলিত হয়ে গেছেন, যদিও এখনও এঁরা বোধনের পরে পূজিত হন আলাদাভাবেই। কলা বৌয়ের উপস্থিতি এবং তার গলায় শ্বেত অপরাজিতার লতা এবং হলুদ সুতোয় বেঁধে নবপত্রিকা দোলানোও ঐ আদিকালের বৃক্ষোপাসনা-কেন্দ্রিত ভাবনারই অনুসরণ। শরৎকালের অরণ্যে-প্রান্তরে খাদ্য সংগ্রহের নতুন উদ্যমের সূত্রপাত যেসব বৃক্ষ দেবতাদের বোধনের মাধ্যমে করা হতো, উত্তরকালে মহিষামর্দিনীর সঙ্গে তাঁরা মিশে গেছেন এবং সেই ক্ষেত্রেও বোধনের রেওয়াজটা থেকেই গেছে : বোধনের মিথ বা পুরাবৃত্ত তারই ওপর গড়ে তোলা এক বহিঃসৌধ। এইখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা খুব জরুরি আমাদের সংস্কৃতিতে নারী হলো উর্বরতার প্রতীক, তাই কৃষিকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর প্রজননশক্তি ও উদ্ভিদের বিকাশকে এক করেই এই দেবী/নারীমূর্ত্তি তৈরী করা হয়েছে। যাকে ইংরেজিতে বলে,“ ফ্যার্টিলিটি কাল্ট বা উৎপাদন ধর্মধারা ”।
দেবী মর্ত্যে আসেন (এবং কৈলাসে ফেরেন) চার ভাবে: নৌকা চড়ে, গজবাহিনী হয়ে, অশ্বপৃষ্ঠে এবং দোলায় চেপে! এই চার রকমের যানবাহন ব্যবহারের পরিণামে বা ঘটে তা হল (যথাক্রমে) : শস্যবর্ধন; বৃষ্টি ও শস্যের প্রাচুর্য ; সবকিছু ছত্রভঙ্গ হওয়া; এবং মড়ক; এর কোনো আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও কেউ দেয়নি। এমন বহু অসংগতি চোখে পড়ে ফলে আমার সবচেয়ে বড় যুক্তি দুর্গাপুজো যেহেতু মহোৎসব, তাই ওই সময় সমাজে জাতিভেদ, অন্তজ শ্রেণি ইত্যাদি মুছে ফেলার চেষ্টা হয়ত ছিল। তাই হয়ত যৌনপল্লি থেকে মাটি এই কারণেই নিয়ে এসো, যাতে আমরা যৌনকর্মীদের ঘৃণা না করি। তাঁরাও তো সমাজের একপ্রকার উপকার করছেন। কিন্তু এইটা লিখতে লিখতে একটা নতুন অনুভূতি হলো শরৎকালে দেবীর অকালবোধন। সেখানে মহামায়ার যে নয়টি রূপের দেখা আমরা পাই সেগুলো হলো —(১) নর্তকী, অভিনেত্রী, (২) কাপালিক, (৩) ধোপানি, (৪) নাপিতানি, (৫) ব্রাহ্মণী, (৬) শূদ্রাণী, (৭) গোয়ালিনী, (৮) মালিনী ও (৯) গণিকা। এই নবম রূপটিই আসলে গণিকালয়ের প্রতিনিধি। তাই মনে করতেই পারি যুক্তির খাতিরে, সে কারণেও এই রীতির জন্ম হতে পারে। দেবী দুর্গা যেহেতু সমগ্র নারীশক্তিরই প্রতীক, তাই গণিকাকেও এখানে সমগ্র নারীজাতিরই এক অঙ্গ হিসাবে দেখা হয়। তাই দুর্গাপুজোয় অষ্টকন্যার ঘরের মাটি নেওয়ার পর নবম কন্যা হিসাবে গণিকালয়ের মাটি মূর্তি তৈরির সময় ব্যবহার করা হয়। আর দুর্গাপুজোয় মূল উদ্দেশ্য যেহেতু সমস্ত নারীজাতিকেই সম্মান দেখানো, তাই গণিকাকেও এখানে সম্মান দেখানোর রীতি চলে আসছে। কিংবা চন্ডীর সেই মন্ত্রই সত্য-
স্ত্রেয়ঃ সমৎসা সকলা জগৎসু। অর্থাৎ সব স্ত্রী-ই আমি, অন্য কেউ নেই।



No comments:
Post a Comment