![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
শারদীয় দুর্গোৎসব: ধর্ম ও অধর্মের কথা
পি.শাশ্বতী
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব শরৎকালের দুর্গাপুজো আজ আর শুধু বাংলার চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বঙ্গজীবনের শহর ও গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের সীমানা ছাড়িয়ে অসুর নাশিনী মা দুর্গা ও তাঁর চার ছেলেমেয়ের কথা প্রায় গোটা বিশ্ববাসীর কাছে আজ আর অজানা নেই। সাম্প্রতিক কালে দুর্গাপুজো কার্নিভালকে কেন্দ্র করে এই উৎসব আন্তর্জাতিক মানের শিরোপা জয় করে নিয়েছে। বাঙালির কাছে এ যে কী চরম প্রাপ্তি সেটা আর বিস্তারিত করে বলার কিছু নেই। যেমন এই দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বাঙালির উন্মাদনা ও উচ্ছ্বাস নিয়েও আর নতুন করে কিছু বলার নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু করে বদলে গেছে এই উৎসবের চরিত্র। একসময় সারা বছরের প্রতীক্ষার পর আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে যা ছিল মাত্র চারটি দিনের মন মাতানো আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের উৎসব— আজ সেই উৎসবের দিন সংখ্যার পরিধি বেড়ে পাঁচদিন, সাতদিন এবং বাড়তে বাড়তে আজ এক পাক্ষিকালে এসে দাঁড়িয়েছে। পুজোর বৈভব ও শৈল্পিক চেতনাতেও লেগেছে আধুনিক থেকে আধুনিকতার ছোঁয়া। আজ গোটা বাংলায় কয়েক হাজার বিভিন্ন স্তরের শিল্পী টিঁকে আছে বছরের এই একটিমাত্র উৎসবে নিজেদের উৎকর্ষতার প্রমাণ দিয়ে। একের সঙ্গে অন্যের প্রতিযোগিতা যেমন বেড়েছে, তেমনই প্রতিটি পুজোমণ্ডপ প্রতি বছরই সেজে ওঠে নতুন নতুন বৈচিত্র্যময় শিল্পের সম্ভারে। কিন্তু এই যে দুর্গাপুজো— এ কি শুধুই বাঙালির দেবী? বাংলার পুজো? কোন পুরাকাহিনি বা লোককাহিনি লুকিয়ে আছে আজকের দুর্গাপুজোর অন্তরালে? আর সেসব কাহিনির সঙ্গে আজকের দুর্গাদর্শনের মিলই কতটা আজও প্রাসঙ্গিক— এই প্রশ্ন তো উঠতেই পারে! কারণ লোককথা, চারণ গান, মঙ্গলকাব্য এবং লোকসাহিত্যের বৈশিষ্ট্যই এই যে তা অঞ্চল ভেদে পরিবর্তিত হয়। এর আশ্রয় মূলত কল্পনা এবং পরিবেশন দক্ষতা। এতে ঐতিহাসিক সত্যতার পরিমাণ অত্যন্ত অল্প। তাই অঞ্চল ভেদে এই সব কাহিনির অন্তরালে থাকা উৎস, সমসাময়িক তথ্য এবং আবেগ— সবই কালের নিয়মে পরিবর্তিত হয়।
দেবী দুর্গা যে শুধু বাঙালির দেবী নন বা দুর্গাপুজো যে শুধু বাংলার পুজো নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রচলিত পুরাণ কাহিনি অনুসারে ভীল রাজা সুরথ বা অযোধ্যার রামচন্দ্রের দুর্গাপুজোর বিবরণে। পুরাণ অনুসারে এই দুই রাজাই ভারতভূমিতে প্রথম দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। যদিও পুরাণ কাহিনি যেহেতু লোককথার পরম্পরায় প্রবাহিত, তাই এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। তারপরেও এই কাহিনিগুলির সারাৎসার যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনই এর গুরুত্বকেও কোনো ভাবেই খাটো করা যায় না।
এবার আসা যাক ঐতিহাসিক ভিত্তি ধরে বাংলায় শরৎকালে এই পুজোর প্রচলনের ইতিহাসে। হরপ্পার সময়কাল থেকে শুরু করে পাল ও সেন যুগ পর্যন্ত বাংলার বুকে অবিচ্ছিন্নভাবে এই শারদোৎসব চলছে। বাংলায় প্রথম মহিষমর্দিনী মূর্তি পঞ্চম শতকে উত্তর বাংলাদেশে মহাস্থানের কাছে পাওয়া যায়। সেখানে ইনি দশভূজার বদলে চতুর্ভুজা দেবী। সিংহবাহিনীও নন। ঐতিহাসিক মতে পালযুগে সর্বপ্রথম বাংলায় চণ্ডীমূর্তি সিংহবাহিনী মূর্তি হিসেবে পাওয়া যায়। আবার আর-একটি তথ্য অনুযায়ী বাংলায় প্রথম দুর্গাপুজো করেন নদীয়ার তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ, আবার কেউ বলেন মল্লরাজারা।
তথ্য প্রামাণ্য অনুযায়ী ঐতিহাসিক ভাবে শারদোৎসব নিয়ে দ্বন্দ্ব যাই-ই থাকুক না কেন, আদিকালের সেই সব দুর্গাপুজোর সঙ্গে রাজারাজড়াদেরই ধর্মীয় ও ঐতিহ্যের সম্পর্কই ছিল মুখ্য। সেখানে সাধারণ মানুষের যোগসূত্র ছিলই না। বাংলায় শারদের অমলিন শুভ্র সকালে সাধারণের যোগসূত্রে প্রথম দুর্গা পুজোর আয়োজন শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ সাহেবদের বদান্যতায় কলকাতা তথা বাংলায় বাঙালিদের মধ্যে 'নব্য বাবু কালচার' চালু হবার পর। পুরোনো পতনোন্মুখ অভিজাত সামন্ত রাজাদের ধ্বংসস্তূপ থেকে, তাদেরই অন্নে লালিত, গুছিয়ে নেওয়া কর্মচারীরা ইংরেজদের সহযোগিতা করে রাতারাতি জমিদারি প্রাপ্ত হন। আবার কেউ বেনিয়াবৃত্তি থেকে ফুলে ফেঁপে, ইংরেজ রাজকর্মচারী টাকা ধার দিয়ে সেই টাকার সুদের অর্থে ক্রমেই বিত্ত থেকে বিত্তশালী হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে ইংরেজ সরকারকে কর দিতে না পারা ক্ষয়িষ্ণু এবং কিছু কিছু বিদ্রোহী জমিদারদের জমিদারি যখন সরকার নিলামে ছড়িয়েছে, এইসব বিত্তবান বেনিয়া বাবু সম্প্রদায় সেই জমিদারি কিনে নিয়ে রাতাতাতি সমাজে এক সম্মানীয় আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। অর্থের সঙ্গে সঙ্গে আসে জীবনযাপনে বৈভব প্রদর্শনের ব্যাকুলতা। তাই এক-এক বাবুর এক-এক রকম সু-অভ্যাস কিংবা বদ অভ্যাসের অনুষঙ্গ এসে জোটে। কারও বিনোদন পোষ্য বিড়ালের মহা সমারোহে বিয়ে দেওয়া, কারও বা দেশি-বিদেশি ঘুড়ি ওড়ানো। কারও বাইজিবাড়ি রাত কাটানো তো কারও সন্ধ্যা হলেই বেশ্যালয়ে গমন— এই রকমই, বাবুজীবনের একটি বিনোদনের হাত ধরে কলকাতায় প্রথম বাঙালি জীবনে ঢুকে পড়ে শারদকালীন দুর্গোৎসব। আরও ভালো করে বলতে গেলে— এইসব কোনো বাবুদের ষড়যন্ত্রই বাংলার নবাবি শাসনের পতনের মূল কারণ। পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের অভাবনীয় জয়ের আশীর্বাদ স্বরূপ এঁদের এক-একজনের কপালে জুটতে থাকে ইংরেজ আশীর্বাদ ধন্য রাজাবাহাদুর, রায়বাহাদুর উপাধি। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর উপর মহলের কত্তা-ব্যক্তিদের আরও বেশি করে তোষণের উদ্দেশেই তখন এঁদের মধ্যে দুর্গোৎসবের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। ফলত, বিশাল ব্যয় বহুল দুর্গোৎসব সাধারণের কাছে বারোয়ারী সংস্কৃতিতে নেমে আসে। যদিও বাহাদুরদের অন্দর মহলে সাধারণ সময়ে সাধারণের প্রবেশের উপর ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা। মনে রাখা প্রয়োজন, আজ থেকে তিনশো বছর আগে বাঙালি নব্য বাবুসমাজে দেবী দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, ও কার্তিক-গনেশের পুজো প্রচলিত ছিল না। সেই সময় থেকে মহিষমর্দিনীর বন্দনা সর্বজনীন হিসেবে প্রচলিত হয়ে আসছে।
যদিও বেঙ্গল গেজেটের তথ্য অনুযায়ী ১১৬৬ সনে বারোয়ারি পুজো প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। ১৩৪৬ সনে শ্রীসতীশচন্দ্র সেন বারোয়ারি প্রথম পুঁজির জায়গাটিতে মন্দির নির্মাণ করেন। গেজেট অনুযায়ী এখানে লক্ষ করবার বিষয় এই যে, তখনও কিন্তু ‘দুর্গাপূজা’ নামটি ব্যাপক ভাবে প্রচলিত হয়নি। ‘শ্রীশ্রীঁবিন্ধ্যবাসিনী’ নামে আঞ্চলিক ভাবে এই পুজো পরিচিত ছিল।
পলাশির যুদ্ধের আগে নবাব সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, ইংরেজদের পক্ষ থেকে শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেব ছিলেন তার মূল প্রতিনিধি। মুর্শিদাবাদে গিয়ে তিনি কেবলমাত্র নবাবের ওমরাহগণের সঙ্গেই পরামর্শ করেননি, বহু জমিদারকেও রবার্ট ক্লাইভের সহায় করে তুলেছিলেন। এমনকি ক্লাইভের দূতরূপে মিরজাফরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন তিনিই। পলাশির প্রান্তরে সিরাজের পরাজয়ের পর মিরজাফর, রামচাঁদ রায়, আমির বেগ আর শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেব একত্রিত হয়ে সিরাজের কোষাগার লুঠ করে প্রায় আট কোটি টাকার মূল্যবান সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। উত্তর কলকাতার শোভাবাজার অঞ্চলে তৎকালীন বড় ব্যবসায়ী শোভারাম বসাকের কাছ থেকে একটি প্রাসাদোপম বাড়ি নবকৃষ্ণ কিনেছিলেন তার অনেক আগেই। পলাশির যুদ্ধের পর সেই প্রাসাদের সঙ্গে নবকৃষ্ণ তৈরি করালেন দেওয়ানখানা, নাচঘর, লাইব্রেরি, নহবতখানা ইত্যাদি। সেই সঙ্গে তৈরি করলেন সাত খিলানের একটি সুবিশাল ঠাকুরদালান।
'কলকাতা বিচিত্রা' গ্রন্থে রাধারমণ রায় লিখেছেন, পলাশিতে সিরাজের পতনে যারা সবচেয়ে উল্লসিত হন তাঁদের মধ্যে ছিলেন নদীয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় আর কলকাতার নবকৃষ্ণ দেব। তিনি লেখেন— “কোম্পানীর জয়কে তাঁরা হিন্দুর জয় মনে করলেন। ধূর্ত ক্লাইভও তাঁদের সেরকমই বোঝালেন।” ক্লাইভ চাইলেন এই জয়কে মহা সমারোহে উদযাপন করতে। কিন্তু কিভাবে আয়োজন করা যায় এই মহাউৎসব? অনেক ভেবেচিন্তে রাজা নবকৃষ্ণ প্রথম আয়োজন করলেন দুর্গাপুজোর। গড়ে উঠল একচালা প্রতিমা। প্রতিমার গা ভর্তি সোনার গয়না ঝলমল করে উঠল। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে লেখক জানিয়েছেন, “দুর্গার কেশদামে গুঁজে দেওয়া হল ২৬টি স্বর্ণনির্মিত স্বর্ণচাঁপা। নাকে ৩০টি নথ। মাথায় সোনার মুকুট।” তারপর তোপধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে সন্ধিপুজোর শুরু। দৈনিক নৈবেদ্য দেওয়া হচ্ছে ৩০ মন চালের। সে বছর নবকৃষ্ণদেব আর নদীয়ার কৃষ্ণচন্দ্র লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে শরৎকালীন দুর্গাপুজোর মাধ্যমে ইংরেজদের বিজয় উৎসবটি পালন করলেন। সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ক্লাইভ নিজে মূর্তিপুজো বিরোধী খ্রিস্টান হয়েও স্রেফ নিজেদের স্বার্থে হিন্দুপ্রেমিক সেজে নবকৃষ্ণের দুর্গাপুজোয় ১০১ টাকা দক্ষিণা আর ঝুড়িঝুড়ি ফলমূল পাঠিয়েছিলেন। এমনকি নবকৃষ্ণের বাড়িতে সপারিষদ উপস্থিত হয়ে পুজোর বহিরঙ্গের সবটুকু আনন্দ শরীর ও মন দিয়ে চেটেপুটে উপভোগ করেছিলেন ক্লাইভ। নবকৃষ্ণের কাছেও দুর্গাঠাকুর ছিলেন উপলক্ষ্য মাত্র। ক্লাইভকে তুষ্ট করাই ছিল তাঁর আসল উদ্দেশ্য। নবকৃষ্ণ ভালো করেই জানতেন মূর্তিপুজো বিরোধী ক্লাইভকে শুধু দুর্গাঠাকুর দেখিয়ে মন ভরানো যাবে না। তিনি তাই ক্লাইভের জন্যে মদ-মাংস-বাইনাচেরও বন্দোবস্ত করেছিলেন। এই কারণেই উঠোনের একপ্রান্তে ঠাকুরদালান তৈরির সাথে সাথে অন্যপ্রান্তে তৈরি করা হয়েছিল নাচঘর। ক্লাইভকে তুষ্ট করবার জন্য বিদেশ থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে নিয়ে আসা হয়েছিল ‘নিকি বাঈ’ নামের অসাধারণ লাস্যময়ী এক নর্তকীকে। এসব থেকে বোঝা যায় যে নবকৃষ্ণের কাছে দুর্গাঠাকুর ছিলেন উপলক্ষ্যমাত্র, আসলে তিনি ক্লাইভ-পুজোই করতে চেয়েছিলেন।
১৭৫৭ সালে নবকৃষ্ণ দেব জাঁকজমকসহকারে দুর্গাপুজো শুরু করে যে ধারা তৈরি করেন, কলকাতার উঠতি বণিকশ্রেণির মধ্যে সেটাই একটা রেওয়াজ এবং আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠেছিল। শোভাবাজারের দেব পরিবারের পারিবারিক দুর্গাপুজোয় যোগদানকারী ইংরেজদের সংখ্যা প্রতিপত্তির একটি সূচক হয়ে ওঠেছিল। ধার্মিক সংকোচ দূরে সরিয়ে রেখে মুসলিম ঘরানার নর্তকীদের আমন্ত্রণ করা হত একথা আগেই বলা হয়েছে। ইংরেজরাও নর্তকীদের সাথে নাচে অংশগ্রহণ করতেন। প্রচলিত প্রবাদে শোনা যায়, তাঁরা নাকি উইলসন হোটেল থেকে আনা গরু এবং শুয়োরের মাংসর সাথে আকণ্ঠ পানভোজন করতেন। এক হিসেবে বলা যায়, কলকাতায় বাইজি নাচের প্রবর্তক নবকৃষ্ণই। নবকৃষ্ণর মৃত্যুর পরেও এই প্রথার কোনো বদল ঘটেনি। শুধুমাত্র ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের কারণে এই উৎসবের ছেদ পড়েছিল; তবে পরের বছর এই উৎসব মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়।
নবকৃষ্ণের জীবনীকার বিপিনবিহারী মিত্র লিখেছেন, "ঠিক একশত বছর পূর্ব্বে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর নবকৃষ্ণ যে ভবনে রবার্ট ক্লাইভ এবং কলিকাতাস্থ অন্যান্য ইংরাজদিগকে অভ্যর্থনা করেন, সেই ভবনে তাঁহার পৌত্রেরা ক্লাইভের সমকালীন ইংরাজদিগের পৌত্রদিগকে সিপাহী বিদ্রোহ শান্তির পর অভ্যর্থনা করায় উভয়পক্ষই পূর্ব্বকথা স্মরণ করিয়া আপনাদিগকে অত্যন্ত গৌরবান্বিত মনে করিয়াছেন।" অতএব এই নিবন্ধে আগে যা বলা হয়েছে, সেই সূত্র মেনেই বিপিবিহারীর লেখনীতেও সেই কথাটি প্রতিধ্বনি শুনতে পাই— এই উৎসব বনেদিবাড়ির ব্রিটিশ পুজো ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রাসঙ্গিক ভাবেই এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সামন্ত রাজাদের বিনোদনের অঙ্গ হিসেবে এক সময়ে যা ছিল দেবদাসী বা রাজনর্তকীদের নৃত্যায়োজন, সেটাই পরবর্তীতে ইসলাম সংস্কৃতির বিনোদন আঙ্গিক বাইজি ঘরানায় দেশীয় সামন্তরাজারা আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন। প্রাচীন ইতিহাস থেকেই জানা যায়, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত রাজদরবারে উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল কবি, বিদূষক, সঙ্গীতজ্ঞ, বড় বড় জ্যোতিষাচার্যের মতো রাজ-তারকাদের। আমরা পরিচয় পাই কালিদাস, বাণভট্ট, বরাহমিহির, খনা দেবী, চণ্ডীদাস , জয়দেবের মতো মহান ব্যক্তিত্বের। দ্বাদশ শতাব্দীর কবি জয়দেব রাজা লক্ষণ সেনের সভাকবি উজ্জ্বল করে রেখিছিলেন। রাজনর্তকী হিসেবে বুদ্ধের কালে আম্রপালি থেকে শুরু ক'রে দ্বাদশ শতাব্দীর পদ্মাবতীর উল্লেখ পাই। দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সামন্তরাজাগণ শিল্প, সঙ্গীত ও সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বহু সামন্ত রাজা নিজেরাই সাহিত্য সৃষ্টি করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। এঁদের মধ্যে একজন রাজা বল্লাল সেন।
কিন্তু এদেশে দীর্ঘকালীন মুসলিম রাজত্বের পর ইংরেজ রাজত্বে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে দেশীয় বাবু সম্প্রদায়ের স্বঘোষিত রাজারা সেই বিনোদনের আসর মুড়ে দিতে শুরু করেন খানিকটা ধর্মীয় চাদরের আচ্ছাদনে। সেখানে যত না ছিল ভক্তি, তার থেকে বেশি ছিল চটুল বিনোদনের মহোৎসব! আর এ সবকিছুই ছিল ইংরেজ মনিবদের সন্তুষ্টির লক্ষ্যে।
এবার দুর্গাপুজোর পুরাণে বর্ণিত ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়া যাক। পুরাণ অনুযায়ী সমাধি নামক বৈশ্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে রাজা সুরথ বসন্তকালে ঋষি মেধসের আশ্রমে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। যা পরে ‘বাসন্তী পূজা’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। দেবী দুর্গার প্রথম পূজারী হিসাবে চণ্ডীতে রাজা সুরথের উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, শারদীয়া দুর্গাপূজাকে 'অকালবোধন' বলা হয়। কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের আগে শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে মা দুর্গাকে অকালে পূজা দিয়েছিলেন বলে এই পূজার নাম হয় ‘অকালবোধন’।
বাসন্তীপুজোই ছিল আদি দুর্গাপুজো। পুরা কাহিনিতেও চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে এই বাসন্তীপুজোরই উল্লেখ আছে। প্রথা মতো সেই আদিকাল থেকে বাঙালি চৈত্র মাসেই দুর্গাপুজো উদযাপন করে এসেছে। সাধারণ বাঙালির কাছে দুর্গাপুজোর এই তথ্যটি জানা থাকলেও অনেকেরই জানা নেই এর পৌরাণিক ইতিহাস।
পুরাণ মতে, দৈবের অঘটনে বঙ্গের এক রাজা সুরথ নিজের রাজ্য হারিয়ে আশ্রয় নেন ঋষি মেধসের আশ্রমে। ওই একই সময়ে সাংসারিক জীবনে ব্যর্থতার কারণে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা এবং সংসার থেকে বিতাড়িত হয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হন সমাধি নামক আরও একজন বৈশ্য। ঋষি মেধস ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও একজন পরোপকারী মুনি। তিনি এই দুই অসহায় মানুষকে শুধু আশ্রয়ই দেন না, দেবী মহামায়ার কাহিনি বর্ণনা করে দৈব-দুর্বিপাক থেকে মুক্তি পেতে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধিকে দেবী দুর্গার আরাধনা করতে পরামর্শ দেন। তাঁরা ঋষি মেধসের কথামতো দেবীর আরাধনা ও তপস্যা করে মেধস আশ্রমেই এক বসন্তকালে প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। যা পরে বাসন্তীপুজো নামে প্রসিদ্ধ হয়। দেবী দুর্গার প্রথম পূজারী হিসেবে চণ্ডীতে রাজা সুরথের নাম উল্লেখ আছে। এ তো গেল পৌরাণিক কথা।
পশ্চিমবঙ্গ তথা বাংলাদেশ, আসাম, বিহার, ওড়িশার প্রচলিত ‘দুর্গোৎসব’ মূলত কালিকাপুরাণে বর্ণিত পদ্ধতি নির্ভর। তবে বলা হয়ে থাকে যে, বাংলায় দুর্গোৎসব মূলত বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণ , কালিকা ও দেবী পুরাণে বিধৃত রীতি অনুযায়ী তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ধারায় সম্পন্ন হয়। অনেক সময় আবার মহাকাল সংহিতায় বর্ণিত পদ্ধতি, যা তান্ত্রিক দুর্গোৎসব নামে পরিচিত। পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতির জন্য অবশ্য স্মার্ত রঘুনন্দনের দুর্গোৎসবতত্ত্ব ও তিথিতত্ত্বকে অনুসরণ করা হয়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্যাপতির ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী’ বা শূলপাণি রচিত ‘দুর্গোৎসববিবেক’ প্রভৃতি স্মৃতিভাষ্য বা মহাকালসংহিতা, কালীবিলাসতন্ত্র বর্ণিত পদ্ধতিও অনুসরণ করা হয়। আবার বিহারে দুর্গোৎসব মূলত ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী’ অনুসারে হয়ে থাকে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাল্মীকির রামায়ণে দুর্গাপুজোর কোনো উল্লেখ নেই, আছে কৃত্তিবাসী রামায়ণে। তাছাড়া রামায়ণ বা মার্কণ্ডেয় পুরাণের সঙ্গে ইতিহাসের কোনো যোগ প্রায় নেই বললেই চলে। অন্য সূত্রানুসারে, উত্তরবঙ্গের তাহেরপুরের ভুঁইয়া রাজা কংসনারায়ণ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগে আট লক্ষ টাকা দিয়ে শরৎকালে দুর্গাপুজো করেন। এমনকি নদীয়ার ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় প্রথম শারদীয়া বা শরৎ দুর্গাপুজো করেন বলেও শোনা যায়। সেনরাজারাও বসন্তকালেই দুর্গাপুজো করতেন বলে জানা যায়।
কোনো কোনো গবেষকের মতে, অবিভক্ত পূর্ববঙ্গে দুর্গাপুজো হতো বসন্তকালে। আর শরৎকালে চালু ছিল ‘নবপত্রিকা পূজা’।
কলকাতা শহরের পুরনো ধনী পরিবারগুলোর দুর্গাপূজা 'বনেদি বাড়ির পূজা' নামে পরিচিত। অন্যদিকে আঞ্চলিক স্তরে এক-একটি অঞ্চলের বাসিন্দারা যৌথভাবে যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন তা বারোয়ারি পূজা বা সর্বজনীন পূজা নামে পরিচিত। দেবী দুর্গার ভাবনা থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'বন্দে মাতরম' গানটি তাঁর 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে সংযোজন করেন। সুভাষচন্দ্র বসু এবং অন্যান্য আরও বেশ কিছু বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী নেতারা এই রকম সর্বজনীন পূজার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বেলুড় মঠ-সহ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বিভিন্ন শাখাকেন্দ্র এবং ভারত সেবাশ্রম সংঘের বিভিন্ন কেন্দ্রের সন্ন্যাসীরা দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন।
সব শেষে এবিষয়ে একটি প্রায় অজানা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। সেটি হল বঙ্গবাসী আমরা যখন শারদীয় দুর্গোৎসবের এক ঝলমলে পরিবেশে দুই পক্ষকাল ধরে নানা আনন্দে মেতে থাকি, তখন এই বঙ্গেরই অন্য কয়েকটি প্রান্ত পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ির চা-বাগানে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারী 'অসুর' জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা এই সময়টা ‘শোক সময়’ হিসেবে পালন করে থাকেন। কিন্তু কেন? সে অন্য নিবন্ধের প্রসঙ্গ
তথ্যসূত্র :
১.কলকাতা বিচিত্রা, রাধারমন রায়, দেব সাহিত্য কুঠির
২.কলিকাতার কথা, প্রমথনাথ মল্লিক, পুস্তক বিপণী
৩.কলিকাতার ইতিহাস, বিনয়কৃষ্ণ দেব, সপ্তর্ষি
৪.ক্লাইভের দুর্গাপূজা, নির্মল কর, আনন্দবাজার পত্রিকা,
৫.কলকাতার দুর্গাপূজা, উইকিপিডিয়া,
৬.বাংলায় দুর্গা পুজো ও তার ইতিহাস, দেবলীনা দত্ত দে, এশিয়ানেট নিউজ



No comments:
Post a Comment