1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

উৎসবের আসল গল্প

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

উৎসবের আসল গল্প

প্রণব কুমার চক্রবর্তী


         মহালয়ায় দেবীপক্ষের শুরু। ভোরবেলায় যখন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন কুমোরপাড়ার সনাতন পটুয়া গঙ্গা স্নান সেরে, ঠাকুর গড়ার মণ্ডপের এককোণে বসে দড়ি পাকাচ্ছিল। বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ আর কাশের বনে দোলা লাগা শরতের এই সকালটা নাকি সকলের কাছে পুজোর আনন্দের একটা আগমনী বার্তা। কিন্তু, কুমোরপাড়ার সনাতন পটুয়ার কাছে এটা একটা নিছকই "ডেডলাইনের খাঁড়া"। ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। হাতে আর মোটেই সময় নেই। চতুর্থী পঞ্চমীর মধ্যেই অর্ধেক প্রতিমা উদ্যোক্তরা মণ্ডপে নিয়ে যাবে।

          সনাতন পটুয়া কুমোরটুলির একজন প্রবীণ মৃৎশিল্পী। ওর হাতের আঙ্গুলের জাদুতে কত মাটির তাল জীবন্ত রূপ পেয়েছে। তার ইয়ত্যা নেই। কিন্তু, গত কয়েক বছর ধরে উৎসবের চেনা রূপ, চেনা আলো এবং ছন্দটা ওর চোখে কেমন যেন ঝাপসা ঠেকছে। ফ্যাকাসে ছন্দহীন হয়ে উঠেছে।

          - বাবা, বরিশা ক্লাবের সেক্রেটারি ফোন করে বলেছেন, থিম পুজোর ফাইনাল পেমেন্টটা নাকি প্রতিমা মন্ডপে তোলার পরেই ওরা দেবে। ওটাই ওদের নাকি প্র্যাকটিস। সনাতন পটুয়া ছেলে পঙ্কজ এসে দাঁড়ালো ওর পাশে। হাতে একটা বেশ দামী কোম্পানির স্মার্টফোন। চোখে মুখে শহুরে ব্যস্ততা এবং চতুরতার ছাপ।

          সনাতন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাটির দুর্গা প্রতিমার ডান হাতটাতে ফিনিশিং টাচ দিতে দিতে বলল, আগে মায়ের রূপ ফুটতো মনের ভক্তিতে রে পঙ্কজ। এখন ফোটে বাজেটে অঙ্কে। পুজোটা এখন আর উৎসব নেই রে, ওটা আদতে একটা কর্পোরেট কম্পিটিশন হয়ে গেছে।

          পঙ্কজ বাবার কথা একটু বিরক্ত হলো। বলল, তুমি চিরকাল সেই সেকেলে আবেগ নিয়েই পড়ে থাকলে বাবা। যুগের সাথে তাল মিলাতে না পারলে, কুমোরটুলির এই স্যাঁত স্যাতে চালাঘরেই ধুঁকে ধুঁকে তোমাকে মরতে হবে। এবার চলো। গাড়ি এসে গেছে, প্রতিমা রওনা করতে হবে।

         সনাতন চুপ করে রইল। একচালার সাবেকি দুর্গা থেকে আজ ফাইবারের থিম-ভিত্তিক মুক্তির রমরমা। মন্ডপে মন্ডপে শুধু চমকালো আলোর রোশনাই, বিজ্ঞাপন দাতার স্পন্সরের ব্যানার আর ভিআইপি পাশের লম্বা লাইন। কিন্তু, এই বিশাল কর্মকাণ্ড আর জাঁকজমকের কান্ড গড়ে তোলার পিছনে যে মানুষগুলোর ঘাম আর রক্ত জল করা খাটুনি মিশে থাকে, তারা সব পর্দার আড়ালে অনুক্তই থেকে যায়।

          কলকাতা অন্যতম বড় পুজো নলিন সরকার লেন সার্বজনীন দুর্গা পূজা। এবার তাদের বাজেট কোটি টাকার উপরে ছাড়িয়ে গেছে। পুজোর মণ্ডপ তৈরি হয়েছে রাজস্থানের একটা প্রাচীন প্রাসাদের আদলে। চব্বিশ ঘণ্টা সেখানে ধুপের সুবাস আর চন্দনের গন্ধ ভাসবে। বিরাট বিরাট ঝাড়লণ্ঠন আর নিয়ন লাইটার আলোয় চারিদিক ঝলমল করছে।

           ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় মন্ডপের বাইরে এক কোণে বসেছিল হরেন ঢাকি। মুর্শিদাবাদের এক প্রান্তিক শহর সালারের টিয়াতে ওর বাড়ি। পুজোর সময় ঢাকের বাজনা বাজাতে সঙ্গী কাঁসর এবং কুরকুড়ি বাজানদারদের নিয়ে এই পাঁচ ছটা দিনের জন্য বাড়ি ঘর ছেড়ে মুর্শিদাবাদের সালারের সেই টিয়া গ্রাম থেকে শিয়ালদা স্টেশন এসে ভিড় জমায়। কাঁধের ঢাকটা ওদের কাছে শুধুমাত্র একটা বাদ্যযন্ত্রই নয়, ওটা রোজগারের একটা বাহন, বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন।

          - কী রে হরেন? হাত চালা। মন্ত্রী, সেক্রেটারী এবং ভি আই পিরা সব এক্ষুনি মন্ডপে এসে ঢুকবে, হাটগুটিয়ে বসে থাকলে চলবে? উঠে এক্ষুনি ঢাক বাজানো শুরু কর। সেক্রেটারির ধমক খেয়ে হরেন ঢাকি টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়ে ঢাক বাজানো শুরু করলো বটে, কিন্তু ওর সঙ্গী কাঁসর বাজানোর ছেলে - মন্টু  ক্ষিণ স্বরে বললো - বাবু? কাকুর খুব জ্বর এয়েছে। তাই, একটু বসেছিল। সেক্রেটারি চলে যাচ্ছিল, কিন্তু মন্টুর কথা শুনে থেমে বলে উঠলেন -  জ্বর এসেছে বাজাতে না পারলে, চলে যা। কোনও অসুবিধা নেই। আমি এখনই আবার ঢাকি জোগাড় করে আনতে পারব।

          হরেন ক্লান্ত মুখে কাঁধে ঢাকের ফিতেটা  আরো শক্ত করে বেঁধে নিল। গত দুদিন ধরে ওর ডান হাতের কব্জিতে একটা তীব্র ব্যাথা, তার উপরে আজকে আবার জ্বর এসেছে। কিন্তু, ওর তো এইমুহূর্তে থামার উপায় নেই। ঢাক বাজিয়ে দুটো পয়সা কামাই করবে বলেই তো সে সেই টিয়া থেকে এখানে এসেছে। বাড়িতে এই পুজো শেষে কটা টাকা কামাই করে নিয়ে গেলে বাড়িতে চারটে বাড়তি ভাতের আশায় বসে আছে - ওর অসুস্থ বউ আর ছোট ছোট দুটো ছেলে মেয়ে। বউটাকে  একটা নতুন শাড়ি কিনে দিতে হবে।  ছেঁড়া শাড়ি পরে ও আর কতদিন কাটাবে?

          হরেন নিজের মনেই বলে, যখন ও মন্ডপে 'তা ধিন তা" বলে ঢাকের বোলে মেতে ওঠে, তখন হাজার হাজার মানুষ হাততলি দেয়, রিলস বানায়, ফ্রেমবন্দি করে সেই মুহূর্তগুলো। কিন্তু, ঢাকের সেই চড়া আওয়াজের আড়ালে যে একটা বুভুক্ষু পেটের আর্তনাদ ঢাকা পড়ে আছে, সেটা কেউই  খেয়াল করে না।  

          মণ্ডপের ঠিক উল্টোদিকে একটা ছোট্ট খাবারের স্টল দিয়েছে আরো একজন মহিলা আরতি। একাকী মা। তার স্বামী পাঁচ বছর আগে একটা পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তারপর থেকে ১০ বছরের একটা মেয়ে মিনুকে নিয়ে তার সংসার। পুজোর এই পাঁচ ছটা দিন অন্য পাঁচজনের মতো ওর কাছে মোটেই আনন্দের নয়। তীব্র লড়াই করে। বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হয় তাকে। সারা রাত জেগে লুচি, আলুর দম আর চপ ভেজে বিক্রি করতে হয় ওকে।

          মিনু আরতির মেয়ে। সে মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে মন্ডপের রঙিন ঝলমলে আলোর প্রতিফলন। ফিস ফিস করে বলল -  মা? সবাই কেমন নতুন জামা পড়ে ঘুরছে। আমায় একটা লাল জামা কিনে দেবে বলেছিলে, দেবে এবারে? 

          আরতি গ্যাসের উপরে বসানো কড়াইয়ের ফুটন্ত তেলের দিকে তাকিয়ে চোখের জলটা আড়াল করার চেষ্টা করলো। কান্না ভেজা গলায় বলল - মা রে, যদি এই কটাদিন বিক্রিবাট্টা ভালো হয়, তাহলে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার সময় তোকে একটা নতুন লাল জামা কিনে দেবো। এখন একটু লক্ষ্মী হয়ে চুপ করে থাক মা।

          উৎসবের আলো সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছায় না। কারো কাছে পুজো মানে আনন্দের আলো, আর কারো কাছে সেই আলো টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের অস্তিত্বকে জ্বালানি করার গ্লানি।

          অষ্টমী সকাল।

          অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার জন্য মন্ডপে উপচে পড়েছে ভিড় নতুন জামা কাপড়ের গন্ধ আর পারফিউমের সুবাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যতনা হুড়োহুড়ি পড়েছে অঞ্জলির ফুল আর বেলপাতা নেয়ার জন্যে, তার থেকে বেশি ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছে - সেলফি তোলা আর রিল্স বানানোর জন্য। সনাতন পটুয়া ওই ঠেলাঠেলিকে এড়াবার জন্য মন্ডপের এক কোণে দাঁড়িয়েছিল। সে এসেছে প্রতিমা তৈরির টাকাটা নিতে, আর প্যান্ডেলে মানুষের  ভিড়ের ধাক্কাধাক্কিতে প্রতিমার কোন ক্ষতি হয়েছে কিনা, সেটাও তদারকি করতে। হঠাৎ ক্লাবের সেক্রেটারি সুশোভন বাবু সনাতনকে ডেকে নিলেন বললেন সনাতন বাবু একটা সমস্যা হয়েছে মা দুর্গার ডান হাতের একটা কেমন যেন একটু ক্র্যাক করেছে মনে হচ্ছে। গেস্ট, মিডিয়ার সব লোকজন চলে আসবে একটু পরেই। জলদি ঠিক করে দেয়ার ব্যবস্থা করুন তো।

          সনাতন ভাবলো বলবে, মায়ের বোধন হয়ে গেছে। এখন কি মায়ের মণ্ডপে উঠে দুর্গা প্রতিমার  মেরামতি করাটা ঠিক হবে! পাপ হবে না তো! কিন্তু,  বলতে পারল না। বাধ্য হল, হাতে তুলি আর একটু মাটির পুটুলি নিয়ে মূর্তির বেদীতে উঠতে। উঠে সে যখন মায়ের মূর্তির দিকে তাকালো, দেখে মনে হলো - মা যেন এখন আর সেই মহিষাসুরমর্দিনী নন। উল্টো, তিনি যেন নিজেই এখন এক নিরুপায় কৃপাপ্রার্থী, কৃত্রিম জাঁক জমকের হাতে বন্দি হয়ে মুক্তির জন্য ছটপট করছেন।

          সনাতন পটুয়া যখন মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাতের আঙুলের ক্র্যাকটা ঠিক করতে ব্যস্ত, সেই সময়েই মন্ডপের বাইরে একটা শোরগোল শোনা গেল। হরেন ঢাকি ঢাক বাজাতে বাজাতে হঠাৎ  মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। একে জ্বর তার উপরে অতিরিক্ত পরিশ্রম, অপুষ্টি আর ক্লান্তিতে ও নিজের শরীরটাকে আর ধরে রাখতে পারেনি। মাথা ঘুরিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।

          - আরেহ! সেক্রেটারি সুশোভন বাবু, চিৎকার করে বলে উঠলেন - ওকে এখান থেকে এখনই সরিয়ে নিয়ে যাও। অষ্টমী পূজোর সময় কী এসব অলক্ষনে কান্ড! রিপোর্টাররা ব্যাপারটা জানতে পারলে এক্ষুনি ছুটে এসে বিরাট করে খবর করবে। সব দোষ এসে পড়বে আমাদের কাঁধে।

          কয়েকজন লোক মিলে হরেন ঢাকি ধরে টেনে হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে গেল। ওর চোখে মুখে একটু জল দেয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত করলো না। কারণ, সবাই তখন সবাই ঢাকের বোলের চেয়ে পুজোর নির্ঘণ্ট মেনে অঞ্জলি দেয়াটাই বেশি জরুরি মনে করছিল।

          সনাতন আর থাকতে পারলো না। মায়ের বেদি থেকে নেমে এসে হরেন ঢাকির পড়ে থাকা দেহটার পাশে দাঁড়াল। মিনুর মায়ের তেলে ভাজার দোকান থেকে একটা জারে জল নিয়ে ওর চোখে মুখে ছিটিয়ে দিয়ে, ওকে তুলে বসলো। তারপরে, পকেট থেকে টাকা বের করে শ অষ্টেক ওর হাতে দিয়ে বললো - আপনি কি আর এখানে এই পুজোয় ঢাক বাজাতে পারবেন? যদি পারেন, তাহলে যান ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খেয়ে আজ বিশ্রাম নিন। আগামী কাল বাজাবেন। আজ আমি আপনার হয়ে ঢাকটা বাজিয়ে দিচ্ছি। এই শহরের মানুষরা সব আমাদের খাটুনিটাকেই চেনে, আমাদের মানুষ বলে মনে করে না।

          সনাতন ওর কাছ থেকে ঢাক আর কাঠি দুটো নিয়ে মন্ডপে অষ্টমীর অঞ্জলি এবং আরতির বাজনা বাজাতে শুরু করলো। ছেলে পঙ্কজকে বললো বাড়ি চলে যেতে। প্রয়োজন হলে পুজোর বিসর্জন পর্যন্ত সে হরেন ঢাকির হয়ে এখানে ঢাক বাজিয়ে দেবে।

          দশমী এসে গেল।

          একটু বাদেই মন্ডপের ঠাকুর নিচে নামবে। শুরু হবে মায়ের বরণ আর মেয়েদের সিঁদুর খেলা। ওই নাচে ঢাক, কাঁসর আর কুরকুরি বাজাতে হবে। হরেন ঢাকি খানিকটা সুস্থ হয়ে সঙ্গীর হাত ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সনাতন পটুয়াকে বললো - দাদা, আজ আমি অনেকটাই সুস্থতা বোধ করছি। আজ আমি পারবো ঢাক বাজাতে। দিন ঢাকটা, বলে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যেতেই সনাতন বলে উঠলো, প্রতিবার তো বিসর্জনের ঢাক আপনিই বাজান। এবারে আমাকে বাজাতে দিন। আমি বাজাই, আপনি দেখুন আমার কথায় ভুলত্রুটি হচ্ছে।

          পঙ্কজ, সনাতন পটুয়ার ছেলে বাবার ওই কথা শুনে বলে উঠলো - এটা তুমি কি বলছো বাবা? এখন আমাদের ঢাক বাজাবার সময় নয়। আমাদের এখন বাবুঘাটে বিসর্জনে যেতে হবে। প্রতিমা তৈরির পেনেন্টগুলো নিতে হবে, আর ঠাকুরের কাঠামোগুলো কালেকশন করতে হবে।

          - যা। তুই যা। সনাতন ছেলের উদ্দেশ্যে বললো- তুই গিয়ে অন্য সব কালেকশনগুলো কর গিয়ে। আমি এখানেই থাকছি। বিসর্জনের সব কাজ শেষ করে, সেক্রেটারি সুশোভন বাবুর কাছ থেকে টাকা পয়সা সব বুঝে নিয়ে বাড়ি ফিরবো। তোকে আমার জন্য চিন্তা করতে হবে না।

          গঙ্গার ধারে বাবুঘাটে ঢাকের আওয়াজে তখন বিদায়ের সুর। বাতাসে বিজয়ার আনন্দ আর বিষাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। সনাতন সেক্রেটারি সুশোভন বাবুর দেয়া টাকার বান্ডিলটার দিকে তাকালো। ওই টাকায় হয়তো তাদের সংসার বেশ কয়েক মাস ভালভাবেই চলবে। কিন্তু, ওর মনের ভেতরের এই শূন্যতাটা তো আর পূর্ণ হবে না। ও ওই টাকার বান্ডিল থেকে কিছু টাকা বের করে হরেন ঢাকির হাতে দিয়ে বললো - আমি আপনার দাদা হিসেবে বলছি, বাড়ি ফিরে গিয়ে বৌ আর বাচ্চা দুটোকে জামা কাপড় কিনে দেবেন।

          গঙ্গার ঘাটে যখন প্রতিমা একের পর এক বিসর্জন দেওয়া হচ্ছিল, সনাতন দূর থেকে বসে শুধু দেখছিল আর ভাবছিল - মাটির তৈরি প্রতিমা আবার জলে ফেলে মাটিতেই মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে। সবটাই ক্ষণিকের মোহ এবং আভিজাত্য। কোটি কোটি টাকার রমরমা সব এক লহমাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

          ঘাটের একপাশে আরতি ওর মেয়ে মিনুকে নিয়ে বসে আছে। পুজো শেষে আরতির হাতে কিছু টাকা এসেছে। এবারে হয়তো কোজাগরী পুজোতে ও মিনুকে একটা নতুন লাল জামা কিনে দেবে। কিন্তু, মেয়ের চোখের সেই ক্লান্ত ঘুমন্ত চাহনি দেখে আরতির মনে হলো, পুজো উৎসবের আসল আনন্দটা ওরা বোধহয় কোনোদিনই ছুঁতে পারবে না।

          পুজো শেষ।

          একাদশীর সকালেই কলকাতা আবার তার পুরানো চেনা ছন্দে ফিরেছে। শহরের সব পুজোর প্যান্ডেলগুলো ভাঙার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। যে বাঁশ আর কাপড় দিয়ে তৈরি রাজকীয় প্রাসাদের মতো দেখতে প্যান্ডলগুলো দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় হয়েছিল, সেগুলো সব নোংরা জঞ্জালের মতো রাস্তার ধরে স্তূপীকৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

          সনাতন পটুয়া কুমোরটুলিতে তার ভাঙ্গা ঘরে ফিরে এসেছে। তার হাত দুটো আবার নতুন করে মাটির তাল মাখতে শুরু করেছে। এবার লক্ষ্মী প্রতিমার বায়না এসেছে।

          হঠাৎ ওর ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো হরেন ঢাকি। তার কাঁধে আজ ঢাক নেই। হাতে একটা ছোট্ট পুঁটুলি। ওই পুঁটুলির ভেতর থেকে একটা ছোট্ট টিনের কৌত বের করে সনাতনের হাতে দিয়ে বললো -  চললাম সনাতন দা। আমার গ্রামে ফিরে যাচ্ছি। এবারে পুজোর ঢাক বাজিয়ে যা পেলাম, তার থেকে অনেক বেশি মূল্যবান জিনিস পেয়েছি, সেটা হল অষ্টমীর দিন আপনার দয়া। আপনি সেদিন আমার পাশে না দাঁড়ালে আমি হয়তো মারাই যেতাম। হরেন ঢাকির চোখে জল।

          সনাতন হাসলো। হরেণের কাঁধে হাত রেখে বললো -  ওটা দয়া নয়রে। ওটা মায়ের আশীর্বাদ। মা দুর্গা মন্ডপে ওই সোনার গয়নার মধ্যে থাকেন না রে। মা থাকেন, তোর ওই ঢাকের বোলে। আরতির ওই তেলের কড়াইয়ের পরিশ্রমে আর আমার এই মাটির তালের গন্ধে  আমরাই তো মাকে তৈরি করি, কিন্তু আমরাই অবহেলিত থেকে যাই। এটাই হলো উৎসবের আসল গল্প। কিন্তু, আমাদের ওইসব দেখলে চলবে না। তোমাকে তোমার কাজ, আর আমাকে আমার কাজ করে যেতেই হবে। যাও, বারি গিয়ে ভাল থেকো।

হরেন ঢাকি সনাতনকে প্রণাম করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।



No comments:

Post a Comment