1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

মায়ের আগমনে স্মৃতির দরজায়

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)


মায়ের আগমনে স্মৃতির দরজায়

দেবলীনা চন্দ

আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি, পূজার সময় এল কাছে...

শারদীয়ার আগমনী সুর যেন ছোটবেলার স্মৃতির দরজায় আজও নরম করে কড়া নাড়ে। পূজো মানেই তখন ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক অমলিন আনন্দ, যার সঙ্গে আজকের ঝলমলে আয়োজনের তুলনা হয় না।

আমাদের পূজো শুরু হতো পঞ্চমীর বিকেল থেকেই। সেদিন স্কুলে যেতাম ঠিকই, তবে মনটা পড়ে থাকত ছুটির ঘণ্টার অপেক্ষায়। যতদূর মনে পড়ে, পঞ্চমীর দিন হয়তো কোনো মৌখিক পরীক্ষা থাকত। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হতেই যেন মন উড়ে যেত কুমোরটুলির পথে। বাড়ি ফিরে কোনোমতে খেয়ে মা, বড়মা আর আমাদের চিরচেনা সারথি বাপীদার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম কুমোরটুলি, হাতিবাগান, নলিনী সরকার স্ট্রিটের প্রতিমা দেখতে। ভিড় আমি কোনোদিনই খুব একটা পছন্দ করতাম না, তাই পঞ্চমীর শান্ত বিকেলটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয়।

সময় বদলেছে। এখন মলের যুগ। এস্কেলেটরে চেপে একের পর এক দোকান ঘোরা, ব্র্যান্ডের ব্যাগ হাতে ছবি তোলা, আর একটু ক্লান্ত হলে কোনো ক্যাফেতে বসে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কোথায় কত বেশি ছাড় মিলছে, সেই আলোচনা—এটাই যেন আজকের পূজোর নতুন সংজ্ঞা।

এরই মাঝে পা দুটোকে একটু বিশ্রাম দিয়ে মুখের কাজ চালিয়ে যাওয়া। তবে আমাদের ছোটবেলায় কেএফসি, বিরিয়ানি বা চাউমিনের এত দাপট ছিল না। তখন ছিল বুড়ির মাথার চুল, ডালের পকোড়া, কড়াই থেকে নামানো গরম গরম জিলিপি, আর শেষে একখিলি ঠান্ডা মিষ্টি পান। এখন তো পানেরও কত রকমের বাহার—কফি পান, তন্দুরি পান, চকলেট পান! অথচ তখন বেনারসি পানই ছিল সেরা। হয়তো বুদ্ধি কম ছিল, তাই সেই একখিলি পানেই আনন্দের সব তালা খুলে যেত।

আমার পূজোর বাজার শুরু হতো মহালয়ার পর থেকেই। আমরা ছিলাম যৌথ পরিবারে। কখনো পিসিদের সঙ্গে ট্রেজার আইল্যান্ড, কখনো নিউ মার্কেটে শপিং করতে যাওয়া ছিল এক আলাদা আনন্দ। দোকান থেকে দোকানে হেঁটে বেড়ানো, দরাদরি করা, পছন্দের জামা খুঁজে পাওয়া—সবকিছুর মধ্যেই ছিল উৎসবের রং। হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ফোসকা পড়ে গেলে কোনো রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়তাম। কখনো কবিরাজি, কখনো মোগলাই—সেই স্বাদ আজও যেন জিভে লেগে আছে।

এখন অবশ্য সময় অন্যরকম। যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট ছোট পরিবার। মাসি-পিসিরা এখন ভালোবেসে হাতে টাকা তুলে দেন, কিন্তু কী কিনলাম, কতটা আনন্দ করলাম—সেটা জানার মতো সময় যেন কারও নেই। জিজ্ঞেস করলে হেসে বলেন, "তোরা এত ব্যস্ত, তাই আর সময় নষ্ট করতে চাই না।" সত্যিই হয়তো আমরা ব্যস্ত—কিন্তু সেই ব্যস্ততার বড় অংশটাই কেটে যায় মোবাইলের পর্দায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় বা অন্তহীন চ্যাটে।

আজকাল আবার পিতৃপক্ষ শেষ হওয়ার আগেই একের পর এক প্যান্ডেলের উদ্বোধন শুরু হয়ে যায়। মনে হয় পূজো যেন আর চার দিনের নয়, বারো দিনের উৎসব। অথচ সেই আগমনী গানের মাইক কোথায় হারিয়ে গেছে! যদি বা বাজে, সেখানে শোনা যায় অন্যরকম গানের দাপট। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার অভ্যাসও আজ প্রায় হারিয়েই গেছে।

প্যান্ডেলে ঢুকেই এখন সবাই ব্যস্ত থিম দেখতে, বিদেশের কোনো শহর বা ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি সাজসজ্জা ঘুরে দেখতে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা যেন দেবী দুর্গাকে নয়, থিমকেই বেশি খুঁজে বেড়াচ্ছি। দেবীমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে দু'মিনিট মন থেকে প্রণাম করার সময়টুকুও যেন আর থাকে না। মনে হয়, এই দর্শনার্থীরাই যেন এক-একজন কার্তিক—বিদেশ ভ্রমণের মোহে মায়ের কাছেই পৌঁছতে পারছে না। মা দুর্গা হয়তো নীরবে সবই দেখছেন, আর মৃদু হেসে অপেক্ষা করছেন—কবে তাঁর সন্তানরা আবার তাঁকেই খুঁজবে।

বিজয়ার শুভেচ্ছাও এখন অনেকটাই স্পিড পোস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ার বার্তায় বন্দি। কোলাকুলি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রণাম করা, মিষ্টি মুখ—সবই যেন ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে।

সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, উৎসবের রূপও বদলায়। তবু কোথাও যেন মনে হয়, পূজোর দিন হয়তো সত্যিই বেড়েছে, কিন্তু সেই শিউলি ফুলের গন্ধ, ভোরের মহালয়ার সুর, নতুন জামার গন্ধ, পরিবারের হাত ধরে প্যান্ডেলে ঘোরা আর নির্ভেজাল আনন্দ—সেগুলো যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

আজও আশ্বিনের হাওয়ায় যখন ঢাকের প্রথম আওয়াজ ভেসে আসে, তখন মনটা চুপিচুপি ফিরে যেতে চায় সেই ছোট্ট দিনগুলোয়। কারণ পূজো শুধু আলোর উৎসব নয়, শুধু থিম বা সাজসজ্জার উৎসব নয়—পূজো আসলে মানুষের, সম্পর্কের, ভালোবাসার আর একসঙ্গে থাকার উৎসব। সেই আবেগই হয়তো আজও আমাদের বারবার শৈশবের দরজায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

No comments:

Post a Comment