1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

প্রেম আগমনী

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

প্রেম আগমনী

তাপসকিরণ রায়

শরতের আকাশ নীলচে সাদা মেঘের ভেলায় ভাসছে। পাড়ার মোড়ে ঢাকের কাঠি পড়তে শুরু করেছে দু-দিন হলো। ঢাকের সেই পরিচিত গুরুগুরু শব্দ আর বাতাসে ভেসে আসা শিউলি ফুলের আকুল সুবাস মনটাকে নিমেষেই কয়েক বছর পেছনে টেনে নিয়ে যায়।

তিন বছর পর এবার দুর্গাপূজোয় বাড়ি ফিরেছে অনির্বাণের। কর্মসূত্রে তাকে ব্যাঙ্গালোরে থাকতে হয়। কর্পোরেট জীবনের ব্যস্ততায় ইচ্ছে থাকলেও উৎসবের শহর কলকাতায় ফেরা হয়ে ওঠেনি এতদিন। কিন্তু এবার আর মনটা মানেনি। ইট-কাঠের শহর ছেড়ে অচেনা এক টানে সে ছুটে এসেছে নিজের পাড়ায়।

মহাষষ্ঠীর দিন সন্ধেয় পাড়ার মণ্ডপে লাল-সাদা আলোর রোশনাই। অনির্বাণ মণ্ডপের এক কোণে দাঁড়িয়ে ঢাকের বাদ্যি শুনছিল আর শৈশবের স্মৃতিগুলো রোমন্থন করছিল। ঠিক তখনই মণ্ডপের সিঁড়ি বেয়ে নামছিল মেঘনা।

পরনে বাসন্তী রঙের তাঁতের শাড়ি, খোলা চুলে হালকা শিউলির মালা, আর হাতে পূজোর বেলপাতা ভর্তি পিতলের থালা। তিন বছরে মেঘনা যেন অনেকটাই বদলে গেছে, অথচ আগের মতোই মায়াবী। সেই ছোটবেলার মেঘনা, যার সঙ্গে একসময় পূজোর চারটে দিন কেটে যেত ঠাকুর দেখা আর ফুচকা খাওয়ার প্রতিযোগিতায়।

উচ্চশিক্ষার জন্য মেঘনা যখন পুনে চলে যায় আর অনির্বাণ দক্ষিণ ভারতে, তখন থেকেই যোগাযোগের সুতোটা আস্তে আস্তে আলগা হতে শুরু করেছিল। কোনো ঝগড়া বা ভুল বোঝাবুঝি হয়নি, কিন্তু কাজের ব্যস্ততা আর দূরত্বের দেয়াল দুজনকে দুটো আলাদা দ্বীপে পরিণত করেছিল। অথচ প্রতিটা অষ্টমীর অঞ্জলিতে অনির্বাণের মনে মনে মেঘনার মুখটাই ভেসে উঠত।

মহাঅষ্টমীর সকাল। চারদিকে ধুনুচি আর ধূপের সুবাস। মণ্ডপে অঞ্জলি দেওয়ার প্রচণ্ড ভিড়। অনির্বাণ আর মেঘনা ভিড়ের মাঝে পাশাপাশি গিয়ে দাঁড়াল। হাতে পদ্ম আর দূর্বা ঘাস।

পুরোহিত মশাই যখন উচ্চস্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন—

"এষ সচন্দন পুষ্প বিল্বপত্র অঞ্জলি..."

অনির্বাণ মনে মনে মায়ের কাছে প্রার্থনা জানাল, ‘মা, এই বছরের অঞ্জলিটা যেন শুধুই নিয়মের না হয়, একটা হারানো সুর ফিরে পাওয়ারও হয়।’

অঞ্জলি শেষে ফুল মায়ের পায়ে সমর্পণ করে যখন দুজনে ঘুরে দাঁড়াল, তখন মেঘনার মিষ্টি হাসিটা অনির্বাণের বুকের বাঁ দিকটায় এক অদ্ভুত দোলা দিল।

‘এত ‘বছর পর বাড়ি ফিরলি, একবারও জানানো প্রয়োজন মনে করিসনি?’—মেঘনার গলায় রাগ আর অভিমানের সুর স্পষ্ট।

অনির্বাণ একটু হেসে বলল, ‘ভেবেছিলাম অবাক করে দেব। কিন্তু তোকে এখানে দেখে বুঝতে পারছি, এই অভিমানটা আমারই পাওনা ছিল। তুই আজও ঠিক ততটাই সুন্দর আছিস মেঘনা, যতটা পাঁচ বছর আগের অষ্টমীর সকালে ছিলিস।’

মেঘনার গাল দুটো লজ্জায় সামান্য লাল হয়ে উঠল। সে চোখ নামিয়ে আলতো হেসে বলল, ‘বাজে কথা না বলে চল, প্রসাদ খাবি।’

অষ্টমীর সন্ধিপূজোর সময় মণ্ডপে ১০৮টি প্রদীপের আলো জ্বলছিল। কাঁসর-ঘণ্টা আর ঢাকের শব্দে চারপাশ মুখরিত। অনির্বাণ আর মেঘনা মণ্ডপের এক পাশে দাঁড়িয়ে সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখছিল। ১০৮টি পদ্মের মাঝে দেবী দুর্গার মুখটা যেন অদ্ভুত এক ঐশ্বরিক আলোয় ঝলমল করছে।

ঢাকের শব্দে কান পাতা দায়, কিন্তু তার মাঝেই অনির্বাণ বুকে জমিয়ে রাখা সাহসটুকু এক করে মেঘনার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।

মেঘনা চমকে উঠে তাকাল, কিন্তু হাতটা সরিয়ে নিল না। বরং তার আঙুলগুলো অনির্বাণের হাতের সাথে আরও শক্ত করে মিশে গেল।

‘তুই তো আবার পূজো শেষ হলেই ফিরে যাবি, তাই না?’—মেঘনার গলায় জমতে থাকা এক রাশ বিষাদ।

অনির্বাণ ওর চোখে চোখ রেখে শান্ত ও দৃঢ় স্বরে বলল,

‘শহর বদলাতে পারে মেঘনা, কিন্তু মনের ঠিকানা বদলায় না। তিন বছর আগে যা বলতে পারিনি, আজ সেই ভুলটা আর করব না। এই শরতের রোদ আর ঢাকের বাদ্যি সাক্ষী রইল—এবার থেকে আমার পূজো মানেই তোকে সাথে নিয়ে বাঁচা।’

মেঘনা মুখে আর কিছুই বলল না। ওর চোখে জল আর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে পরম নিশ্চিন্তির হাসি।

নবমীর রাতে যখন আরতির ধুনুচির ধোঁয়ায় চারপাশ আচ্ছন্ন, তখন মণ্ডপের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো মানুষের হাত ধরা উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছিল—এই পূজোয় শুধু প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়নি, দুটো থমকে থাকা হৃদয়েও নতুন প্রেমের স্পন্দন জেগে উঠেছে। বিজয়ার মিষ্টিমুখ এবার আর শুধু নিয়মের থাকবে না, তা হবে দুটি মনের এক হওয়ার শুভসূচনা।



No comments:

Post a Comment