1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

অবহেলায় ঝরে যাওয়া পাপড়ি

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)


অবহেলায় ঝরে যাওয়া পাপড়ি

গীতশ্রী চক্রবর্ত্তী মল্লিক

প্রচন্ড গরম পড়েছে। এই গরমে সকলেরই হাঁসফাঁস অবস্থা। রাতে ঘুম আসতে চায় না শ্রী-র। এসি চলে ২৭/২৮ শে। কারণ সাইনাসের প্রবলেম বেড়ে যায়। এসিতেও কমফোর্টেবল নয় শ্রী। এপাশওপাশ করতে করতে গভীর রাত হয়ে যায় ঘুমোতে। সকালে উঠতেও দেরী। আজ সকাল ৮টায় স্মার্টফোন বেজে ওঠে। শুয়ে শুয়েই শ্রী ফোনটা রিসিভ করে। স্ক্রীণে তখন বন্ধু শ্বেতার নাম ভেসে উঠেছে। শ্রী চমকে যায়, কারণ এইসময়ে শ্বেতা ফোন করে না। শ্রী ফোন ধরে বলে--- হ্যালো

শ্বেতা--- ঘুম থেকে উঠেছিস?

শ্রী--- না, শুয়ে আছি

শ্বেতা--- একটা খারাপ খবর আছে রে

শ্রী---মানে?

শ্বেতা---সুপর্ণা ভোর ৬.১৫ তে চলে গেছে।ওর মেয়ে ফোন করে জানালো।

শ্রী উঠে বসলো--- ভাবতে পারছে না। ওদের একটা বন্ধুগ্রুপ আছে।

ফোনে শ্বেতা বলে চললো--- হসপিটাল থেকে বডি আসবে সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ। আমি এগারোটা নাগাদ যাবো। তুই কি আসবি?

শ্রী----- হ্যাঁ যাবো, যেতে তো হবেই।

শ্বেতা--- ফোন ছাড়ছি, বাকি বন্ধুদের জানাতে হবে।

শ্বেতা ফোন ছেড়ে দিলো।

শ্রী উঠে বসলো। ভাবতে পারছে না সুপর্ণা অতীত হয়ে গেলো! এই তো দিন দশ-বারো আগে সুপর্ণা ফোন করেছিলো। কি এমন হোলো!! সুপর্ণার ছিলো শাড়ীর বুটিক। সিল্ক-তসরের শাড়ী ছিলো ওর বুটিকের প্রধান কালেকশান। হায়দ্রাবাদ, অসম বিভিন্ন জায়গায় যেত শাড়ীর মেলাতে,কলকাতা তো আছেই। ওর বাড়ীর নীচেই শাড়ীর বুটিক। সেখানে তো চেনা-অচেনা অনেকেই যেত শাড়ী কিনতে। শ্রী নিজেও ওর থেকে শাড়ী কিনেছে। সেদিন তো ফোনেই শ্রীকে বলছিলো সুপর্ণা আর শাড়ীর বিজনেস করবে না--- যা আছে সেগুলো কম প্রফিটে ছেড়ে দেবে, যদি শ্রী দেখতে চায় তো আসতে পারে।

শ্রী জানতো সুপর্ণার হাই ব্লাডসুগারের সমস্যা দীর্ঘদিনের। কিন্তু এই শারীরিক সমস্যা তো এখন ঘরে ঘরে। বছর খানেক হোলো শ্রী নিজেও ব্লাডসুগারের পেশেন্ট।

বিছানা থেকে উঠে পড়ে শ্রী। অনিলকে ফোন করে বললো সাড়ে দশটা নাগাদ গাড়ী নিয়ে আসতে, সল্টলেক যেতে হবে।

ব্রেকফাস্ট করে বেরোতে হবে, কারণ কিছু ওষুধ খেতে হয় শ্রীকে। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে যায় শ্রী। অনিলের গাড়ী এসে যায় ঠিক সময়ে। শ্রী রওনা হয়ে যায়। যেতে যেতে ভাবে----

" কি অবলীলায় মানুষ হারিয়ে যায়,হয় অতীত

বড়ো নড়বড়ে এই মৃত্যু-উপত্যকায় পায়ে চলার ভিৎ

কতো ঠুনকো সব সম্পর্ক, 

এই জীবন,

কায়ার সাথে ছায়াও যায় হারিয়ে,

শুধু রয়ে যায় স্মৃতি রোমন্থন

সময়ের দৌড়ে একদিন 

স্মৃতিও ম্লান

জীবন হতে মৃত্যু পর্যন্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের কঠিন উড়ান"।

অনিলের ডাকে সম্বিত ফেরে শ্রীর। সল্টলেক পৌঁছে অনিল জিজ্ঞেস করে কোন ব্লকে বাড়ী। শ্রী বুঝিয়ে দেয়। একসময় সুপর্ণার বাড়ীর সামনে গাড়ী থামলো। থমথমে পরিবেশ। শ্রী মণীষাকে ফোন করলো--- কোথায় সবাই? মণীষা বলে, "দোতলায় চলে এসো,এখানে আমরা সবাই, বডি এখনও আসে নি" ।

শ্রী দোতলায় গিয়ে দেখে গ্রুপের শ্বেতা,অশেষ,মণীষা আছে, আছে আরো মানুষ যাদের শ্রী চেনে না। একটা চেয়ারে বসলো শ্রী। পরিবেশটা বুঝতে চেষ্টা করলো। গ্রুপের সবাই আসতে পারে নি। শ্রী লক্ষ্য করে, সবাইকে খুব একটা শোকগ্রস্ত মনে হচ্ছে না। একমাত্র বিবাহিত মেয়ে-জামাই গেছে হসপিটালে বডি আনতে। শ্রীরা মানে গ্রুপের বন্ধুরা কষ্ট পাচ্ছে মনে মনে। সেরকম তো কিছু বয়স নয় সুপর্ণার।

এই তো সেদিন উদয়াচলে আড্ডা দিয়ে এলো, সঙ্গে অবশ্য আয়া ছিলো। আসলে বছর খানেক আগে পড়ে গিয়ে ডান হাত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় সুপর্ণার।হসপিটালে ভর্তি হয়ে অপারেশন করতে হয়।যদিও সেই হাতে আর জোর ফিরে আসে নি। এই অবস্থা কাটতে না কাটতেই মাঝরাতে জল পিপাসায় জল খেতে গিয়ে দাঁড়ানো অবস্থাতেই পড়ে যায়। আর উঠতে পারছিলো না।

এখানে বলে রাখি সুপর্ণার হাজব্যান্ড অনেক আগেই গত হয়েছেন। বাড়ীতে ও একাই থাকতো। মেয়ে অবশ্য প্রায়শই আসতো। ভোলা নামে একজন থাকতো সবসময়।

কোনোরকমে বিছানার চাদর টেনে টেনে ফোনটাকে কাছে পেয়ে ভোলাকে ফোন করে সুপর্ণা।দরজা ভেঙে ভোলা মালকিন সুপর্ণাকে বিছানায় শুয়ে দেয় ও ফোন করে জানায় সুপর্ণার মেয়ে মুনমুনকে।

খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই মুনমুন চলে আসে হাজব্যান্ড অজয়কে নিয়ে। মায়ের অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালে ভর্তি করে দেয়। পরেরদিন সবরকম টেস্ট-রিপোর্টের পর জানা যায় সুপর্ণার ডানদিকের ফিমার-বোন ভেঙে গেছে।

আবার হসপিটালাইজড সুপর্ণা। অপারেশন সাকসেস হোলো, বাড়ীতেও ফিরে এলো, কিন্তু কোথাও একটা মানসিক জোর হারিয়ে ফেলেছিলো। ফিজিওথেরাপিষ্ট আসতো বাড়ীতে হাঁটানোর জন্য। বন্ধুদের ফোন করে জিজ্ঞেস করতো সুপর্ণা---- " আমি ভালো হয়ে যাবো তো"? 

আমরা মানে বন্ধুরা মনে জোর দিতাম, "নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যাবি" ।

মানুষ সাধারণত বেঁচে থাকতে চায়।পৃথিবীর মায়া বড়ো মায়া, এর রূপ-রস-গন্ধের আকর্ষণ-শক্তি অসীম। সকলেই কিছু না কিছু কথা বলছিলো। শ্রী চুপচাপ ভাবছিলো---

"এ পথে যেতে হবে সকলকেই একদিন

শূন্য হতে মহাশূন্যে বিলীন

দিনরাতের মনোমালিন্য-ভালোবাসার পৃথিবীর এই রাজপ্রাসাদ

জীবনের যত ওঠা-পড়া,তবুও মায়া-জড়ানো এই 

বেঁচে থাকার সাধ

কত যন্ত্রণার প্রিয়-বিচ্ছেদের ভীড়ে

ফিরে ফিরে চাওয়া অতীতের তীরে

আসলে সময় সেরা নাট্যকার

ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসা সেই ভীষণ যন্ত্রণার

মানুষ যে বাঁচতে চায় 

মৃত্যুর পরের যাত্রা কোথায়?

তাই মানুষ বাঁচতে চায়, 

বাঁচতে চায়" ।

এমন সময় গাড়ীর আওয়াজ। সম্বিত ফিরলো শ্রীর। দোতলার বারান্দা থেকে দু-তিনজন দেখে বললো, এসে গেছে। শ্রী দেখে গাড়ীর গায়ে লেখা "শান্তির পথে"। কয়েকজন নীচে নেমে গেলো।

শ্রীতো গতকালই ফোন করেছিলো সুপর্ণাকে। ফোন বেজে বেজে থেমে গেছে। তখনও শ্রী জানতে পারে নি গত পাঁচ-ছদিন ধরে সুপর্ণা হসপিটালে। সকালেই তো শ্বেতা ফোন করে জানায়।

হতভম্ব শ্রী ভাবে, কত পলকা এই জীবন!অনেকে মিলে ধরাধরি করে সুপর্ণার নিথর শরীরটা ওর শোবার ঘরে রাখলো। কোথাও কোনো কান্নার আওয়াজ নেই, একফোঁটা চোখের জল নেই! সকলেই কিছু না কিছু বলছে। সকলের কথায় এটাই স্পষ্ট, কোনো একটা ইনফেকশনে এত বাড়াবাড়ি হয়ে গেছিল যে ICU তে দিতে হয়। এমনসময়ে সুপর্ণার মেয়ে মুনমুন এলো। কি স্বাভাবিক কন্ঠে বললো---" আন্টি, তুমি গতকাল ফোন করেছিলে, কিন্তু মায়ের ফোন তো আমার কাছে ছিল।ব্যস্ততার কারণে তোমার ফোন ধরতে পারি নি"। শ্রী লক্ষ্য করে, মুনমুন সদ্য মাতৃহারা হয়েছে। কিন্তু শোকের চিহ্ন মাত্র নেই। পরিপাটি সেজে--- (চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক) মায়ের নিথর শরীর আনতে গেছে হসপিটালে!!

হতভম্ব শ্রী জিজ্ঞেস করে মুনমুনকে--- কি হয়েছিল সুপর্ণার?

মুনমুন---- লিভার অকেজো হয়ে লাংসে জল জমে যায়, তার থেকে ইনফেকশন হয়ে এই মৃত্যু"।

কি স্বাভাবিক মুনমুন!!!শ্বেতাও জিজ্ঞেস করলো মুনমুনকে সুপর্ণার ব্যাপারে। মুনমুনের হাজব্যান্ডের সঙ্গেও কথা হোলো শ্বেতার। আসলে শ্বেতার ছেলে ও সুপর্ণার মেয়ে ছোটোবেলা থেকে একই স্কুলে পড়তো। তখন থেকেই শ্বেতা-সুপর্ণার বন্ধুত্ব। শ্বেতার মাধ্যমেই সুপর্ণার সঙ্গে বন্ধুত্ব শ্রী-র। তাই শ্বেতার অনেকবেশী পরিচিতি সুপর্ণার ফ্যামিলির সঙ্গে।

অশেষ ম্লানমুখে এদিক-ওদিক করছে, মাঝে মাঝে কারোর সাথে কথা বলছে। মণীষাও চুপচাপ। তবে শ্রী উপলব্ধি করে স্বজন-হারানোর বেদনা পরিবারকে স্পর্শ করে নি। সবচেয়ে অবাক করেছে মুনমুনের ব্যবহার! হাসিমুখেই সব কাজে তদারকি করছে।

শোবার ঘরে মেঝেতে শায়িত সুপর্ণার নিথর শরীর। শেষ সাজে সজ্জিত করা হচ্ছে সুপর্ণার নশ্বর শরীর। শ্বেতা থমথমে মুখে সেখানে বসে। মণীষাও চুপচাপ দেখছে সুপর্ণার নশ্বর শরীরের শেষ সাজ। শ্রী যায় নি ওই ঘরে। কারণ এই অবস্থাটা নিতে পারে না শ্রী। অশেষ এসে বসে জিজ্ঞেস করলো শ্রীকে--- তুমি যাবে না দেখতে?

শ্রী---- আমি নিতে পারি না অশেষ।

অশেষ--- শ্রী, জানো তো বিশ্বাস করতেই পারছি না। এই খারাপ-লাগা ব্যক্ত করা যায় না।

সুপর্ণা অনেক কথাই বলেছে আমাকে। আমি বুঝতে পারতাম সুপর্ণার অসহায় অবস্থাটা। অথচ সুপর্ণার নিজস্ব টাকার তো অভাব ছিল না। অবস্থার বিপাকে সেই টাকা মেয়ের কন্ট্রোলে চলে যায়। সুপর্ণা স্বাধীন ছিল না। মেয়েকে কোথাও একটা ভয় পেত। কারণ শরীর সাথ দিতো না। মেয়ের আন্ডারেই থাকতে হোতো। কিন্তু এই ভয়ের কথা বন্ধুদের কাছে প্রকাশ করে নি। কারণ মেয়ের ইমেজ খারাপ হবে। অপত্য স্নেহে গোপন করেছিলো সুপর্ণা। অশেষ আরো বললো--- কিন্তু আমি সব বুঝতে পারতাম।

শ্রী---- হ্যাঁ, ওর সঙ্গে কথায় আমি ফিল করেছি এই ব্যাপারটা। সুপর্ণা দিনে দিনে যেন বোঝা হয়ে যাচ্ছিল মেয়ে-জামাইয়ের কাছে। আজ যেন ওরা ভারমুক্ত হোলো।

সুপর্ণার নশ্বর শরীরটাকে কত ভালো করে সাজানো যায়,তারই ব্যস্ততা চলছে। শ্রী ভাবে  কি আবেগশূন্য মুনমুন! আচ্ছা, এখনকার প্রজন্মের সব ছেলেমেয়েই কি আবেগশূন্য?? শ্রী নিজের মনেই বলে ওঠে, তা কেন হবে? হয়তো এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা নিজের বৃত্তে থাকতেই পছন্দ করে। কিন্তু তার জন্য তো ওরা দায়ী নয়। দায়ী নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া। শ্রী ভাবে, আমাদের প্রজন্ম ঠাম্মা-দাদু-পিসি-জেঠু-কাকা সবার আদরে-শাসনে বড়ো হয়েছি, পাড়ার জেঠু-কাকা প্রয়োজনে শাসন করেছে, বিকেলে খেলার মাঠে বন্ধুদের সাথে খেলা, গরমের ছুটিতে মামারবাড়ীতে যাওয়া---- এর মধ্যে একাত্মতার আনন্দ নিয়ে বড়ো হয়েছি। এখনকার প্রজন্ম তো এইসব থেকে বঞ্চিত। ওরা কি করে বুঝবে এই আনন্দের মর্ম! তবুও মুনমুনকে একদম অন্যরকম মনে হচ্ছে--- যেন দায়মুক্ত, ভারমুক্ত।

শ্বেতার এক ছেলে ও এক মেয়ে। দুজনেই বিবাহিত এবং আমেরিকাবাসী। কিন্তু দুই ছেলেমেয়েই মায়ের প্রতি খুব দায়িত্বশীল। ঘটা করে মায়ের জন্মদিন পালন করে। খুব ভালোবাসে "মা"কে। ওরাও তো এই প্রজন্মের। 

এখানে বলে রাখি, শ্বেতার হাজব্যান্ড বহুবছর আগে গত হয়েছেন। তখন ছেলেমেয়ে দুজনেই খুব ছোটো। জীবনের নানা উত্থানপতনের মধ্যে দিয়ে শ্বেতা ছেলেমেয়েকে বড়ো করেছে। আজ তারা সুপ্রতিষ্ঠিত, কিন্তু মায়ের প্রতি তীব্র টান। অশেষের স্ত্রীও বহুকাল আগে গত হয়েছেন। মেয়েদুটো তখন খুব ছোটো। অশেষ আর বিয়ে করে নি। নিজের উপার্জন আর মেয়েদুটোকে মানুষ করার দিকেই মনোযোগ দিয়েছে। আজ মেয়েরা বিবাহিতা--- বড়ো মেয়ে আমেরিকাবাসী ও চাকুরীরতা। ছোটোমেয়েও রোজগেরে, বাবার কাছেই থাকে হাজব্যান্ড ও দুই বাচ্চাকে নিয়ে। কারণ অশেষ তো একা। দুই মেয়েই বাবার প্রতি খুব কর্তব্যপরায়না।

এরাও এই প্রজন্মেরই। আসলে প্রত্যেক ব্যক্তি-মানুষই আলাদা।

সবাই এঘর ওঘর করছে, শেষযাত্রার তদারকিতে ব্যস্ত। এ ওকে বলছে, দেখো কি সুন্দর লাগছে ( মানে সুপর্ণাকে)।এইসব কথা শুনে শ্রী ভাবে, এখনও এইসব কথা! মানুষের আসল সৌন্দর্য কোথায়! সুপর্ণা যে অসময়ে চলে গেল স্রেফ অবহেলায়। সেই অবহেলা কিসের প্রকাশ?

এমন সময় অশেষ ডাকলো----- শ্রী, এসো। সুপর্ণাকে নিয়ে যাবে এবার।

শ্রী উঠে গেলো যে ঘরে সুপর্ণা শায়িত। শ্রী চাইতে পারে নি সুপর্ণার দিকে। একঝলক দেখেই সরে আসে। অশেষ বলে--- এসো মালাটা দেই।

শ্রী--- আমি পারবো না, তুমিই দাও।

অশেষ মালা দিলো , একে একে অনেকেই মালা দিলো। এরপর ওকে নীচে নিয়ে যাওয়া হোলো, শোয়ানো হোলো সাজানো খাটে। বাকি কাজ সম্পন্ন করে "শান্তির পথে" গাড়ীতে তুলে দেওয়া হোলো চিরবিদায়ের পথে নিমতলার উদ্দেশ্যে। মণীষা কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে। অশেষ-শ্বেতা-শ্রী কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো চিরবিদায়ের পথে।তিনজনেরই চোখ ছলোছলো। শ্রী শ্বেতাকে বললো--- তোকে আমি নামিয়ে দেবো যাবার পথে। অশেষের ফ্ল্যাট সুপর্ণার বাড়ীর কাছেই। অশেষ তাই ওর গাড়ীতেই চলে গেলো। অনিল এলো, শ্রী-শ্বেতা একসাথে রওনা হোলো ভারাক্রান্ত মনে। ওদের বন্ধু-পরিবারের একটা পাপড়ি ঝরে গেলো।

যেতে যেতে শ্রী ভাবে----যখন শ্রী-র বাবা অকস্মাৎ চলে যায়, শ্রী-র জীবনে পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যায়।সেই পৃথিবী আর কখনও ফেরে নি শ্রী-র জীবনে। যখন মা চলে গেলো সেদিন শ্রী নিঃস্ব হয়ে গেলো। আর পূর্ণতা আসে নি জীবনে। যখন হাজব্যান্ড চলে গেলো, তখন একা হয়ে গেলো, কিন্তু অসহায় নয়। বাবা-মায়ের মৃত্যু যে অসহায় করে দেয়, নিঃস্ব করে দেয়, ছাদ-হারানো তপ্ত রোদে পুড়তে হয় বাকি জীবন।

এসে গেল লেকটাউন, শ্বেতার ফ্ল্যাট।নেমে গেল শ্বেতা। শ্রীকে নিয়ে গাড়ী রওনা হোলো।

শ্রীর ফ্ল্যাট দমদমে। সুপর্ণার জন্য মনটা কাঁদছে------

"হারিয়ে যেতে মন চায় না, তবুও হারিয়ে যেতে হয়, একদম একাকী

কত ইচ্ছে, কত কথা রয়ে যায় বাকী

ইচ্ছেরা ডানা ঝাপটায়

পূর্ণতার আশায়

শ্রাবন ঘনায়, গুচ্ছ গুচ্ছ কদম

রূপে ঝলসায়,সুবাস ছড়ায়

তবুও একদিন ঝরে যেতে হয়

যৌবনের বসন্তোৎসব শেষে রাত্রি নামে শরীরে

কেউ জানে না কখন হারিয়ে যাবে আঁধারের ভীড়ে, মহাশূন্যতার নীড়ে,

রেখে যায় শুধু সুখদুঃখের স্মৃতি

স্মৃতিদের ভীড়ে সব স্মৃতিও একদিন বিস্মৃতি 

সময়ই আসল নাট্যকার,

কলা-কুশলীরা পর্দার আড়ালে

নাটকের ইতি।

শ্রী মনে মনে বলে ওঠে, "না-ফেরার দেশে সুপর্ণা তুই ভালো থাক, খুব ভালো থাক।তবে ক্লাবে তোর চেয়ারটা শূন্যতার দোলায় দুলতেই থাকবে"।


No comments:

Post a Comment