1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label গীতশ্রী চক্রবর্ত্তী মল্লিক. Show all posts
Showing posts with label গীতশ্রী চক্রবর্ত্তী মল্লিক. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

অবহেলায় ঝরে যাওয়া পাপড়ি

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)


অবহেলায় ঝরে যাওয়া পাপড়ি

গীতশ্রী চক্রবর্ত্তী মল্লিক

প্রচন্ড গরম পড়েছে। এই গরমে সকলেরই হাঁসফাঁস অবস্থা। রাতে ঘুম আসতে চায় না শ্রী-র। এসি চলে ২৭/২৮ শে। কারণ সাইনাসের প্রবলেম বেড়ে যায়। এসিতেও কমফোর্টেবল নয় শ্রী। এপাশওপাশ করতে করতে গভীর রাত হয়ে যায় ঘুমোতে। সকালে উঠতেও দেরী। আজ সকাল ৮টায় স্মার্টফোন বেজে ওঠে। শুয়ে শুয়েই শ্রী ফোনটা রিসিভ করে। স্ক্রীণে তখন বন্ধু শ্বেতার নাম ভেসে উঠেছে। শ্রী চমকে যায়, কারণ এইসময়ে শ্বেতা ফোন করে না। শ্রী ফোন ধরে বলে--- হ্যালো

শ্বেতা--- ঘুম থেকে উঠেছিস?

শ্রী--- না, শুয়ে আছি

শ্বেতা--- একটা খারাপ খবর আছে রে

শ্রী---মানে?

শ্বেতা---সুপর্ণা ভোর ৬.১৫ তে চলে গেছে।ওর মেয়ে ফোন করে জানালো।

শ্রী উঠে বসলো--- ভাবতে পারছে না। ওদের একটা বন্ধুগ্রুপ আছে।

ফোনে শ্বেতা বলে চললো--- হসপিটাল থেকে বডি আসবে সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ। আমি এগারোটা নাগাদ যাবো। তুই কি আসবি?

শ্রী----- হ্যাঁ যাবো, যেতে তো হবেই।

শ্বেতা--- ফোন ছাড়ছি, বাকি বন্ধুদের জানাতে হবে।

শ্বেতা ফোন ছেড়ে দিলো।

শ্রী উঠে বসলো। ভাবতে পারছে না সুপর্ণা অতীত হয়ে গেলো! এই তো দিন দশ-বারো আগে সুপর্ণা ফোন করেছিলো। কি এমন হোলো!! সুপর্ণার ছিলো শাড়ীর বুটিক। সিল্ক-তসরের শাড়ী ছিলো ওর বুটিকের প্রধান কালেকশান। হায়দ্রাবাদ, অসম বিভিন্ন জায়গায় যেত শাড়ীর মেলাতে,কলকাতা তো আছেই। ওর বাড়ীর নীচেই শাড়ীর বুটিক। সেখানে তো চেনা-অচেনা অনেকেই যেত শাড়ী কিনতে। শ্রী নিজেও ওর থেকে শাড়ী কিনেছে। সেদিন তো ফোনেই শ্রীকে বলছিলো সুপর্ণা আর শাড়ীর বিজনেস করবে না--- যা আছে সেগুলো কম প্রফিটে ছেড়ে দেবে, যদি শ্রী দেখতে চায় তো আসতে পারে।

শ্রী জানতো সুপর্ণার হাই ব্লাডসুগারের সমস্যা দীর্ঘদিনের। কিন্তু এই শারীরিক সমস্যা তো এখন ঘরে ঘরে। বছর খানেক হোলো শ্রী নিজেও ব্লাডসুগারের পেশেন্ট।

বিছানা থেকে উঠে পড়ে শ্রী। অনিলকে ফোন করে বললো সাড়ে দশটা নাগাদ গাড়ী নিয়ে আসতে, সল্টলেক যেতে হবে।

ব্রেকফাস্ট করে বেরোতে হবে, কারণ কিছু ওষুধ খেতে হয় শ্রীকে। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে যায় শ্রী। অনিলের গাড়ী এসে যায় ঠিক সময়ে। শ্রী রওনা হয়ে যায়। যেতে যেতে ভাবে----

" কি অবলীলায় মানুষ হারিয়ে যায়,হয় অতীত

বড়ো নড়বড়ে এই মৃত্যু-উপত্যকায় পায়ে চলার ভিৎ

কতো ঠুনকো সব সম্পর্ক, 

এই জীবন,

কায়ার সাথে ছায়াও যায় হারিয়ে,

শুধু রয়ে যায় স্মৃতি রোমন্থন

সময়ের দৌড়ে একদিন 

স্মৃতিও ম্লান

জীবন হতে মৃত্যু পর্যন্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের কঠিন উড়ান"।

অনিলের ডাকে সম্বিত ফেরে শ্রীর। সল্টলেক পৌঁছে অনিল জিজ্ঞেস করে কোন ব্লকে বাড়ী। শ্রী বুঝিয়ে দেয়। একসময় সুপর্ণার বাড়ীর সামনে গাড়ী থামলো। থমথমে পরিবেশ। শ্রী মণীষাকে ফোন করলো--- কোথায় সবাই? মণীষা বলে, "দোতলায় চলে এসো,এখানে আমরা সবাই, বডি এখনও আসে নি" ।

শ্রী দোতলায় গিয়ে দেখে গ্রুপের শ্বেতা,অশেষ,মণীষা আছে, আছে আরো মানুষ যাদের শ্রী চেনে না। একটা চেয়ারে বসলো শ্রী। পরিবেশটা বুঝতে চেষ্টা করলো। গ্রুপের সবাই আসতে পারে নি। শ্রী লক্ষ্য করে, সবাইকে খুব একটা শোকগ্রস্ত মনে হচ্ছে না। একমাত্র বিবাহিত মেয়ে-জামাই গেছে হসপিটালে বডি আনতে। শ্রীরা মানে গ্রুপের বন্ধুরা কষ্ট পাচ্ছে মনে মনে। সেরকম তো কিছু বয়স নয় সুপর্ণার।

এই তো সেদিন উদয়াচলে আড্ডা দিয়ে এলো, সঙ্গে অবশ্য আয়া ছিলো। আসলে বছর খানেক আগে পড়ে গিয়ে ডান হাত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় সুপর্ণার।হসপিটালে ভর্তি হয়ে অপারেশন করতে হয়।যদিও সেই হাতে আর জোর ফিরে আসে নি। এই অবস্থা কাটতে না কাটতেই মাঝরাতে জল পিপাসায় জল খেতে গিয়ে দাঁড়ানো অবস্থাতেই পড়ে যায়। আর উঠতে পারছিলো না।

এখানে বলে রাখি সুপর্ণার হাজব্যান্ড অনেক আগেই গত হয়েছেন। বাড়ীতে ও একাই থাকতো। মেয়ে অবশ্য প্রায়শই আসতো। ভোলা নামে একজন থাকতো সবসময়।

কোনোরকমে বিছানার চাদর টেনে টেনে ফোনটাকে কাছে পেয়ে ভোলাকে ফোন করে সুপর্ণা।দরজা ভেঙে ভোলা মালকিন সুপর্ণাকে বিছানায় শুয়ে দেয় ও ফোন করে জানায় সুপর্ণার মেয়ে মুনমুনকে।

খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই মুনমুন চলে আসে হাজব্যান্ড অজয়কে নিয়ে। মায়ের অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালে ভর্তি করে দেয়। পরেরদিন সবরকম টেস্ট-রিপোর্টের পর জানা যায় সুপর্ণার ডানদিকের ফিমার-বোন ভেঙে গেছে।

আবার হসপিটালাইজড সুপর্ণা। অপারেশন সাকসেস হোলো, বাড়ীতেও ফিরে এলো, কিন্তু কোথাও একটা মানসিক জোর হারিয়ে ফেলেছিলো। ফিজিওথেরাপিষ্ট আসতো বাড়ীতে হাঁটানোর জন্য। বন্ধুদের ফোন করে জিজ্ঞেস করতো সুপর্ণা---- " আমি ভালো হয়ে যাবো তো"? 

আমরা মানে বন্ধুরা মনে জোর দিতাম, "নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যাবি" ।

মানুষ সাধারণত বেঁচে থাকতে চায়।পৃথিবীর মায়া বড়ো মায়া, এর রূপ-রস-গন্ধের আকর্ষণ-শক্তি অসীম। সকলেই কিছু না কিছু কথা বলছিলো। শ্রী চুপচাপ ভাবছিলো---

"এ পথে যেতে হবে সকলকেই একদিন

শূন্য হতে মহাশূন্যে বিলীন

দিনরাতের মনোমালিন্য-ভালোবাসার পৃথিবীর এই রাজপ্রাসাদ

জীবনের যত ওঠা-পড়া,তবুও মায়া-জড়ানো এই 

বেঁচে থাকার সাধ

কত যন্ত্রণার প্রিয়-বিচ্ছেদের ভীড়ে

ফিরে ফিরে চাওয়া অতীতের তীরে

আসলে সময় সেরা নাট্যকার

ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসা সেই ভীষণ যন্ত্রণার

মানুষ যে বাঁচতে চায় 

মৃত্যুর পরের যাত্রা কোথায়?

তাই মানুষ বাঁচতে চায়, 

বাঁচতে চায়" ।

এমন সময় গাড়ীর আওয়াজ। সম্বিত ফিরলো শ্রীর। দোতলার বারান্দা থেকে দু-তিনজন দেখে বললো, এসে গেছে। শ্রী দেখে গাড়ীর গায়ে লেখা "শান্তির পথে"। কয়েকজন নীচে নেমে গেলো।

শ্রীতো গতকালই ফোন করেছিলো সুপর্ণাকে। ফোন বেজে বেজে থেমে গেছে। তখনও শ্রী জানতে পারে নি গত পাঁচ-ছদিন ধরে সুপর্ণা হসপিটালে। সকালেই তো শ্বেতা ফোন করে জানায়।

হতভম্ব শ্রী ভাবে, কত পলকা এই জীবন!অনেকে মিলে ধরাধরি করে সুপর্ণার নিথর শরীরটা ওর শোবার ঘরে রাখলো। কোথাও কোনো কান্নার আওয়াজ নেই, একফোঁটা চোখের জল নেই! সকলেই কিছু না কিছু বলছে। সকলের কথায় এটাই স্পষ্ট, কোনো একটা ইনফেকশনে এত বাড়াবাড়ি হয়ে গেছিল যে ICU তে দিতে হয়। এমনসময়ে সুপর্ণার মেয়ে মুনমুন এলো। কি স্বাভাবিক কন্ঠে বললো---" আন্টি, তুমি গতকাল ফোন করেছিলে, কিন্তু মায়ের ফোন তো আমার কাছে ছিল।ব্যস্ততার কারণে তোমার ফোন ধরতে পারি নি"। শ্রী লক্ষ্য করে, মুনমুন সদ্য মাতৃহারা হয়েছে। কিন্তু শোকের চিহ্ন মাত্র নেই। পরিপাটি সেজে--- (চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক) মায়ের নিথর শরীর আনতে গেছে হসপিটালে!!

হতভম্ব শ্রী জিজ্ঞেস করে মুনমুনকে--- কি হয়েছিল সুপর্ণার?

মুনমুন---- লিভার অকেজো হয়ে লাংসে জল জমে যায়, তার থেকে ইনফেকশন হয়ে এই মৃত্যু"।

কি স্বাভাবিক মুনমুন!!!শ্বেতাও জিজ্ঞেস করলো মুনমুনকে সুপর্ণার ব্যাপারে। মুনমুনের হাজব্যান্ডের সঙ্গেও কথা হোলো শ্বেতার। আসলে শ্বেতার ছেলে ও সুপর্ণার মেয়ে ছোটোবেলা থেকে একই স্কুলে পড়তো। তখন থেকেই শ্বেতা-সুপর্ণার বন্ধুত্ব। শ্বেতার মাধ্যমেই সুপর্ণার সঙ্গে বন্ধুত্ব শ্রী-র। তাই শ্বেতার অনেকবেশী পরিচিতি সুপর্ণার ফ্যামিলির সঙ্গে।

অশেষ ম্লানমুখে এদিক-ওদিক করছে, মাঝে মাঝে কারোর সাথে কথা বলছে। মণীষাও চুপচাপ। তবে শ্রী উপলব্ধি করে স্বজন-হারানোর বেদনা পরিবারকে স্পর্শ করে নি। সবচেয়ে অবাক করেছে মুনমুনের ব্যবহার! হাসিমুখেই সব কাজে তদারকি করছে।

শোবার ঘরে মেঝেতে শায়িত সুপর্ণার নিথর শরীর। শেষ সাজে সজ্জিত করা হচ্ছে সুপর্ণার নশ্বর শরীর। শ্বেতা থমথমে মুখে সেখানে বসে। মণীষাও চুপচাপ দেখছে সুপর্ণার নশ্বর শরীরের শেষ সাজ। শ্রী যায় নি ওই ঘরে। কারণ এই অবস্থাটা নিতে পারে না শ্রী। অশেষ এসে বসে জিজ্ঞেস করলো শ্রীকে--- তুমি যাবে না দেখতে?

শ্রী---- আমি নিতে পারি না অশেষ।

অশেষ--- শ্রী, জানো তো বিশ্বাস করতেই পারছি না। এই খারাপ-লাগা ব্যক্ত করা যায় না।

সুপর্ণা অনেক কথাই বলেছে আমাকে। আমি বুঝতে পারতাম সুপর্ণার অসহায় অবস্থাটা। অথচ সুপর্ণার নিজস্ব টাকার তো অভাব ছিল না। অবস্থার বিপাকে সেই টাকা মেয়ের কন্ট্রোলে চলে যায়। সুপর্ণা স্বাধীন ছিল না। মেয়েকে কোথাও একটা ভয় পেত। কারণ শরীর সাথ দিতো না। মেয়ের আন্ডারেই থাকতে হোতো। কিন্তু এই ভয়ের কথা বন্ধুদের কাছে প্রকাশ করে নি। কারণ মেয়ের ইমেজ খারাপ হবে। অপত্য স্নেহে গোপন করেছিলো সুপর্ণা। অশেষ আরো বললো--- কিন্তু আমি সব বুঝতে পারতাম।

শ্রী---- হ্যাঁ, ওর সঙ্গে কথায় আমি ফিল করেছি এই ব্যাপারটা। সুপর্ণা দিনে দিনে যেন বোঝা হয়ে যাচ্ছিল মেয়ে-জামাইয়ের কাছে। আজ যেন ওরা ভারমুক্ত হোলো।

সুপর্ণার নশ্বর শরীরটাকে কত ভালো করে সাজানো যায়,তারই ব্যস্ততা চলছে। শ্রী ভাবে  কি আবেগশূন্য মুনমুন! আচ্ছা, এখনকার প্রজন্মের সব ছেলেমেয়েই কি আবেগশূন্য?? শ্রী নিজের মনেই বলে ওঠে, তা কেন হবে? হয়তো এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা নিজের বৃত্তে থাকতেই পছন্দ করে। কিন্তু তার জন্য তো ওরা দায়ী নয়। দায়ী নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া। শ্রী ভাবে, আমাদের প্রজন্ম ঠাম্মা-দাদু-পিসি-জেঠু-কাকা সবার আদরে-শাসনে বড়ো হয়েছি, পাড়ার জেঠু-কাকা প্রয়োজনে শাসন করেছে, বিকেলে খেলার মাঠে বন্ধুদের সাথে খেলা, গরমের ছুটিতে মামারবাড়ীতে যাওয়া---- এর মধ্যে একাত্মতার আনন্দ নিয়ে বড়ো হয়েছি। এখনকার প্রজন্ম তো এইসব থেকে বঞ্চিত। ওরা কি করে বুঝবে এই আনন্দের মর্ম! তবুও মুনমুনকে একদম অন্যরকম মনে হচ্ছে--- যেন দায়মুক্ত, ভারমুক্ত।

শ্বেতার এক ছেলে ও এক মেয়ে। দুজনেই বিবাহিত এবং আমেরিকাবাসী। কিন্তু দুই ছেলেমেয়েই মায়ের প্রতি খুব দায়িত্বশীল। ঘটা করে মায়ের জন্মদিন পালন করে। খুব ভালোবাসে "মা"কে। ওরাও তো এই প্রজন্মের। 

এখানে বলে রাখি, শ্বেতার হাজব্যান্ড বহুবছর আগে গত হয়েছেন। তখন ছেলেমেয়ে দুজনেই খুব ছোটো। জীবনের নানা উত্থানপতনের মধ্যে দিয়ে শ্বেতা ছেলেমেয়েকে বড়ো করেছে। আজ তারা সুপ্রতিষ্ঠিত, কিন্তু মায়ের প্রতি তীব্র টান। অশেষের স্ত্রীও বহুকাল আগে গত হয়েছেন। মেয়েদুটো তখন খুব ছোটো। অশেষ আর বিয়ে করে নি। নিজের উপার্জন আর মেয়েদুটোকে মানুষ করার দিকেই মনোযোগ দিয়েছে। আজ মেয়েরা বিবাহিতা--- বড়ো মেয়ে আমেরিকাবাসী ও চাকুরীরতা। ছোটোমেয়েও রোজগেরে, বাবার কাছেই থাকে হাজব্যান্ড ও দুই বাচ্চাকে নিয়ে। কারণ অশেষ তো একা। দুই মেয়েই বাবার প্রতি খুব কর্তব্যপরায়না।

এরাও এই প্রজন্মেরই। আসলে প্রত্যেক ব্যক্তি-মানুষই আলাদা।

সবাই এঘর ওঘর করছে, শেষযাত্রার তদারকিতে ব্যস্ত। এ ওকে বলছে, দেখো কি সুন্দর লাগছে ( মানে সুপর্ণাকে)।এইসব কথা শুনে শ্রী ভাবে, এখনও এইসব কথা! মানুষের আসল সৌন্দর্য কোথায়! সুপর্ণা যে অসময়ে চলে গেল স্রেফ অবহেলায়। সেই অবহেলা কিসের প্রকাশ?

এমন সময় অশেষ ডাকলো----- শ্রী, এসো। সুপর্ণাকে নিয়ে যাবে এবার।

শ্রী উঠে গেলো যে ঘরে সুপর্ণা শায়িত। শ্রী চাইতে পারে নি সুপর্ণার দিকে। একঝলক দেখেই সরে আসে। অশেষ বলে--- এসো মালাটা দেই।

শ্রী--- আমি পারবো না, তুমিই দাও।

অশেষ মালা দিলো , একে একে অনেকেই মালা দিলো। এরপর ওকে নীচে নিয়ে যাওয়া হোলো, শোয়ানো হোলো সাজানো খাটে। বাকি কাজ সম্পন্ন করে "শান্তির পথে" গাড়ীতে তুলে দেওয়া হোলো চিরবিদায়ের পথে নিমতলার উদ্দেশ্যে। মণীষা কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে। অশেষ-শ্বেতা-শ্রী কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো চিরবিদায়ের পথে।তিনজনেরই চোখ ছলোছলো। শ্রী শ্বেতাকে বললো--- তোকে আমি নামিয়ে দেবো যাবার পথে। অশেষের ফ্ল্যাট সুপর্ণার বাড়ীর কাছেই। অশেষ তাই ওর গাড়ীতেই চলে গেলো। অনিল এলো, শ্রী-শ্বেতা একসাথে রওনা হোলো ভারাক্রান্ত মনে। ওদের বন্ধু-পরিবারের একটা পাপড়ি ঝরে গেলো।

যেতে যেতে শ্রী ভাবে----যখন শ্রী-র বাবা অকস্মাৎ চলে যায়, শ্রী-র জীবনে পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যায়।সেই পৃথিবী আর কখনও ফেরে নি শ্রী-র জীবনে। যখন মা চলে গেলো সেদিন শ্রী নিঃস্ব হয়ে গেলো। আর পূর্ণতা আসে নি জীবনে। যখন হাজব্যান্ড চলে গেলো, তখন একা হয়ে গেলো, কিন্তু অসহায় নয়। বাবা-মায়ের মৃত্যু যে অসহায় করে দেয়, নিঃস্ব করে দেয়, ছাদ-হারানো তপ্ত রোদে পুড়তে হয় বাকি জীবন।

এসে গেল লেকটাউন, শ্বেতার ফ্ল্যাট।নেমে গেল শ্বেতা। শ্রীকে নিয়ে গাড়ী রওনা হোলো।

শ্রীর ফ্ল্যাট দমদমে। সুপর্ণার জন্য মনটা কাঁদছে------

"হারিয়ে যেতে মন চায় না, তবুও হারিয়ে যেতে হয়, একদম একাকী

কত ইচ্ছে, কত কথা রয়ে যায় বাকী

ইচ্ছেরা ডানা ঝাপটায়

পূর্ণতার আশায়

শ্রাবন ঘনায়, গুচ্ছ গুচ্ছ কদম

রূপে ঝলসায়,সুবাস ছড়ায়

তবুও একদিন ঝরে যেতে হয়

যৌবনের বসন্তোৎসব শেষে রাত্রি নামে শরীরে

কেউ জানে না কখন হারিয়ে যাবে আঁধারের ভীড়ে, মহাশূন্যতার নীড়ে,

রেখে যায় শুধু সুখদুঃখের স্মৃতি

স্মৃতিদের ভীড়ে সব স্মৃতিও একদিন বিস্মৃতি 

সময়ই আসল নাট্যকার,

কলা-কুশলীরা পর্দার আড়ালে

নাটকের ইতি।

শ্রী মনে মনে বলে ওঠে, "না-ফেরার দেশে সুপর্ণা তুই ভালো থাক, খুব ভালো থাক।তবে ক্লাবে তোর চেয়ারটা শূন্যতার দোলায় দুলতেই থাকবে"।


Sunday, September 21, 2025

যন্ত্রণার সমুদ্র-মন্থন

ছবি : ইন্টারনেট

যন্ত্রণার সমুদ্র-মন্থন 

গীতশ্রী চক্রবর্ত্তী মল্লিক

"এক আকাশ নক্ষত্রদের মিছিলে ধ্বনিত

যে হাহাকার

শূন্য হতে মহাশূন্যতার

জন্ম হতে মৃত্যু সেতু পারাপার।

ক্ষণিকের অতিথি জীবন   

জড়িয়ে সম্পর্কের মায়ার বন্ধন

সম্পর্কের ভীড়, অজস্র কথার ভীড়, মতান্তর-মনোমালিন্যের ভীড়

এই অজস্র ভীড়েও মানুষ পথ হাঁটে একা"।

সান্ধ্য আড্ডা সেরে ফিরলো প্রৌঢ় যশ। ঘড়িতে প্রায় ৯.৩০। আট-দশ জনের আড্ডাটা প্রায় রোজই চলে। সব বন্ধুরাই কর্মজগত থেকে অবসর নিয়েছে। সংসারের দায়িত্ব-কর্তব্য প্রায় শেষ। এই আড্ডাটা মনের খাদ্য, বেঁচে থাকার জন্য জরুরী অক্সিজেন। প্রায় প্রত্যেকেই আসে পাড়ার মোড়ে মিহিরের চায়ের দোকানে।

এই আড্ডায় প্রায় সবাই ফিরে যায় যৌবনের সেই দিনগুলোতে। কে কটা হাফসুল খেয়েছে, কার ভালোবাসা ভেঙে অন্যত্র পরিণয়ে অচেনা নারীকে চেনার প্রচেষ্টায় সারাজীবন কাটিয়ে দিল, কে প্রণয় থেকে পরিণয়ে পৌঁছতে পেরেছে, জীবনের আরো নানা গল্পে বিভোর হয়ে থাকে সেই আড্ডা।

যশ একাই থাকে। মাস-মাইনের একটি ছেলে আছে যে দুবেলা এসে যশের  রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা,জামাকাপড় ধোয়া-ইস্ত্রীর কাজগুলো সব করে দেয়।

ড্রেস চেঞ্জ করে সোফায় বসে। সাউন্ড সিস্টেমে সেতার-সম্রাট নিখিল ব্যানার্জির সেতার চালিয়ে দেয়। টি টেবিলে হুইস্কির বোতল, গ্লাস।

রাগ--যোগকোষে নিখিল ব্যানার্জির আঙুলের ছোঁয়ায় হৃদয়-নিঙরানো সুর। ঘরের দেওয়াল-সিলিং জুড়ে সুরের মেহফিল। সামনে তিস্তার সাদাকালোর বড়ো ছবি, ভীষণ বাঙ্ময়। চেয়ে আছে যশের দিকে। গত দশবছর যশ একাই থাকে। তিস্তা বয়ে গেছে কালের নদীতে, হঠাৎ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। নিমেষেই তিস্তা চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। যশ মেনে নিতে পারে নি। একমাত্র ছেলে তিতাস  বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। বাবাকে অনেক চেষ্টাতেও নিয়ে যেতে পারে নি। আজো তিস্তার অস্তিত্বে বিশ্বাসী। তাই কাজের লোক হিসেবে কোনো মেয়েকে রাখে নি। তিস্তা ছাড়া আর কোনো মেয়েকে দেখতে চায় না এই ফ্ল্যাটে।

গ্লাসে হুইস্কি ঢালে। এইসময়টা যশের একান্ত ব্যক্তিগত। সুরা-সুর-তিস্তা সব নিয়ে যশের নিজস্ব জগৎ।অন্য কারোর প্রবেশাধিকার নেই। তিস্তার সঙ্গে কত না-বলা কথা বলার সময় এটা।

এইসময়টা যশ কারোর সঙ্গেই শেয়ার করে না।

সেতারে নিখিল ব্যানার্জির সুরের আলাপ সঙ্গে পন্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের অনির্বচনীয় সঙ্গত----- সুরে সুরে সুরলোক। ডুবতে থাকে, বিবশ হতে থাকে যশ, সঙ্গে সুরাপানের মাদকতা।

যশ তিস্তাকে আদর করে নদী বলে।

যশ--- নদী, আমাকে বোকো না। কথা দিচ্ছি বেশী খাব না।

আমার পাশে এসে বোসো। তোমাকে ওই ফোটোফ্রেমে একদম মানায় না।

সুরের আলাপে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা জড়িয়ে আছে। যশ ক্রমশঃ বিভোর হতে থাকে, বাস্তবটা ভুলতে থাকে।

সুরা ও সুরে আচ্ছন্ন যশ----- এই তো আমার পাশে এসে বসলে।নদী, তোমার দুষ্টুমিটা আজও একইরকম আছে। যতক্ষণ আমি না বলবো কিছুতেই কাছে আসবে না। আবার মুখ টিপে হাসছো!!

নেশাচ্ছন্ন যশ শুনতে থাকে নদী বলছে------আমি তো সব সময়ই তোমার কাছে আছি। এই যে আমায় এমন করে জড়িয়ে ধরেছো যদি কাজের মেয়েটা দেখতে পায়!! লোকজন মানো না, আমার তো লজ্জা করে।

যশ জড়ানো গলায় বলতে থাকে-----বেশ করবো জড়িয়ে ধরবো। আমার একমাত্র ভীষণ আদরের বউটাকে আমি আদর করবো, চুমুর সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে যাবো তাতে কার কি, সারা দুনিয়া যদি দেখে তো দেখুক না, কি আসে যায়! বরং আমার থেকে শিখে নিক বউকে কেমন করে আদর করতে হয়।

নদী, শুনছো সেতার-সম্রাট কেমন বাজিয়েছে রাগ যোগকোষ! ওনার মনে কি কোনো অব্যক্ত যন্ত্রণা ছিল! সেই যন্ত্রণাকে সুরে সুরে মিলেমিশে একাকার করে দিয়েছেন!  

নেশাতুর যশ শোনে নদী বলছে------ হয়তো ছিল। শিল্পী মানুষ তো। ওনার বাজনা ভয়ঙ্কর সেন্সেটিভ, ভীষণরকমের সূক্ষ মোচড়।যা হৃদয়তন্ত্রীর মর্মমূলে সোজা ধাক্কা মারে।

যশ, ডিনার কখন করবে? অনেক রাত হোলো, চিরকালের বেপরোয়া তুমি।

আবেশে জড়ানো যশ বলে--- নদী, খেতে পারি যদি তুমি খাইয়ে দাও। নয়তো তোমার সাথে বসেই সারারাত কাটিয়ে দেবো।

হঠাৎ একটা দমকা বাতাস ড্রয়িংরুমের পর্দাগুলোকে দুলিয়ে দিলো।

দু পেগ শেষ হোলো। আবার আরেকটা পেগ নিয়ে বসে যশ---- নদী, তুমি কোথায় গেলে? তুমি কি জানো না তোমায় ছাড়া থাকতে পারি না আমি! চীৎকার করে ডাকতে থাকে যশ। আচ্ছন্ন অবস্থায় শুনতে পায় যশ-----এই তো আমি তোমার পাশে, তোমার নদী। 

যশ------ তোমার মনে পড়ে কি নদী আমাদের প্রথম দেখা  হওয়া, সেই শুশুনিয়া পাহাড়!  পাহাড়ে উঠতে গিয়ে তোমার এক পায়ের জুতো খুলে যাওয়া! তুমি ওপরে একপাটি জুতো নীচে, ঠিক সেখানেই আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম।জুতোটা তুলে তোমার পায়ে পড়িয়ে দিয়েছিলাম। মনে হয়েছিলো এই নারীর সাথে আমার বহু জনমের পরিচয়।

খুব লজ্জা পেয়েছিলে তুমি। তুমি একটা পিকনিক গ্রুপের সাথে গিয়েছিলে, আমিও অন্য একটা পিকনিক গ্রুপের সাথে গিয়েছিলাম।

যশ নেশায় ডুবে শুনতে থাকে  নদী বলছে----সব মনে আছে। ফেরার সময় আমার ফোন নং নিয়েছিলে। কথায় কথায় তুমি জেনে নিয়েছিলে গ্রে স্ট্রীটে এক বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীর কাছে আমি গান শিখতে যাই এবং কবে,কখন।

যশ, আমার সব মনে আছে। বেশ ক'দিন পর গান শিখে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে গ্রে স্ট্রীটের ক্রশিংয়ে পেট্রল পাম্পের সামনে গেছি বাস ধরবার জন্য, হঠাৎ গাড়ীর হর্ণ। চেয়ে দেখি একটা লাল গাড়ীর ড্রাইভিং সিটে তুমি। আমাকে এমন করে তাড়াতাড়ি গাড়ীতে উঠতে বললে যে সম্মোহিতের মত উঠে পড়লাম কিন্তু ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে। তুমি সেটা লক্ষ্য করে বলেছিলে " আমার গাড়ীতে যখন উঠবে মাথা উঁচু করে"।

সুরে সুরে বিবশ যশ বলতে থাকে------নদী শুনছো, ত্রিতাল মধ্যলয়ে চলছে বাজনা। কি অনির্বচনীয়! মনে হয় সুরের স্বর্গলোক। যে যন্ত্রণা, যে কষ্ট কোনোদিনই বলা যায় না অথচ কি যেন না-পাওয়ার বেদনার ঢেউ নিরন্তর বয়ে চলেছে হৃদয়ের অতলে, তারই কি অপরূপ প্রকাশ সুরের মূর্ছনায়।

নদী,তোমাকে একান্ত করে পাওয়ার জন্য, ভালোবাসার জন্য আমি অনন্তকাল ধরে পৃথিবীতে ফিরতে চাই। আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেবে?

নেশায় ঢুলুঢুলু যশ শোনে নদীর কথা-----তুমি চিরকালই আমায় ইমোশোনাল ব্ল্যাকমেল করে গেলে!খুব ভালো করেই জানো তোমার কোনো কথা আমি ফেলতে পারি না। দিচ্ছি মাথায় হাত বুলিয়ে।

যশ-----নদী, তুমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে আমার ব্লাডপ্রেসারটা নরমাল  হয়ে যায়। বয়স তো  হচ্ছে, আজকাল প্রেসারটা ওপরের দিকেই থাকে।

আচ্ছন্ন যশ শোনে নদী বলছে-----কেন তিতাসের কাছে যাচ্ছো না? ও যে বারবার ডাকছে তোমায়। তোমাকে নিয়ে তিতাসও তো চিন্তায় থাকে।

নেশাচ্ছন্ন যশ রেগে চীৎকার করে বলে--- এই কথা একদম বলবে না। তুমি জানো না, তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারি না! আমাদের দাম্পত্যের ঘর-গেরস্থালি, আমার ফেরার অপেক্ষায় তোমার অপেক্ষা, তোমার শরীরের গন্ধ, পথ-হারানো ঘন কালো একরাশ চুলের গন্ধ, তোমার বিশেষ পারফিউমের ঘ্রাণ-----এগুলো ছাড়া আমি থাকতে পারি না যে! তিতাস ভালো আছে ওর বউ মহুল আর নাতি প্রীতমকে নিয়ে। ওখানে ওদের তৈরী জগতে। আর এখানে তোমাকে নিয়ে এই ফ্ল্যাটে আমার জগৎ। তিতাসও এসেছে আমাদের মাঝে। তুমি-আমি মিলে ওর সেই ছোট্টো দুটো ডানায় শক্তি জুগিয়েছি স্বাধীনভাবে জীবনের আকাশে উড়তে। তাই আজ ও উড়ছে। খুব ভালো থাক ওরা, আর আমি তোমাকে নিয়ে।

নদী, এইসব ছেড়ে আমাকে যাওয়ার কথা আর কখনও বলবে না। কথা দাও।

সুর-সুরায় আচ্ছন্ন যশ শুনছে নদীর কথা----- কথা দিলাম আর কখনও বলবো না। এবার মাথা ঠান্ডা হয়েছে তো? ভালো করে শোনো ত্রিতাল মধ্যলয়ের গৎ। সেতারশিল্পী আর তবলাশিল্পীর কি অনবদ্য বোঝাপড়া! আলাপ-বিস্তারের পরতে পরতে রাগ যোগকোষের সুরের অনির্বচনীয় মায়াজ্বাল।যশ, তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই  কলামন্দিরে সদারঙ্গ সঙ্গীত সম্মেলনে কত কত বিখ্যাত শিল্পীদের প্রোগ্রাম শুনেছি। মনে পড়ে বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে বেগম আখতারের ঠুংরী---কি অপূর্ব! যশ, তুমি-আমি মিলে বিখ্যাত প্রচুর শিল্পীদের প্রোগ্রাম শুনেছি।

যশ----- প্রতি শীতেই আমরা এই সঙ্গীত-সম্মেলনে যেতাম। শীতে প্রকৃতিতে যে মৃত্যুর হাতছানি থাকে মরশুমী ফুলের রঙের বর্ষা তাকে বিস্মৃতি দেয়, জীবনের উষ্ণতায় ভরিয়ে তোলে। আর শীতকালেই যত বেশী সঙ্গীত সম্মেলন হয়। এই সঙ্গীত যা হৃদয়ের উষ্ণতা-উত্তাপকে জীবনের খেলাঘরকে অন্য মাত্রা দান করে।

নদী, আমরা দুজনে নাইট শো-তে অনেক সিনেমা দেখেছি। সিনেমা দেখে সেন্ট্রাল এভেনিউ ধরে গাড়ীতে করে ফেরা। বেশী জোরে চালালে তুমি রাগ করতে।

নেশায় বুঁদ যশ শোনে নদীর কথা----- বৃষ্টি যে আমার খুব প্রিয় সেটা খুব ভালো জানো তুমি যশ। রাতে বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই, আমার বৃষ্টিমুখর শহর। তোমাকে কত বলেছি এই মুষলধারায় বৃষ্টিতে গাড়ীতে নিয়ে বেরোতে। তুমি কখনও "না" করো নি। তুমি আমায় নিয়ে বেরোতে বৃষ্টিমুখর শহরের রূপ দেখাতে। তুমি আমায় অনেক অনেক দিয়েছো, জীবনকে ভরিয়ে দিয়েছো।

ক্রমশঃ রাতের বয়স বেড়ে চলে। সুরাপানে মত্ত হতে থাকে যশ। টেবিলে রাতের খাবার ঢাকা। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। পর্দা সরিয়ে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকায় যশ। সেতার আর তবলার যুগলবন্দী দ্রুত লয়ে চারিদিকের পরিবেশ মোহনীয় করে তুলেছে।

যশ নদীকে ডাকে----- আমার পাশে এসে দাঁড়াও নদী।আকাশ দ্যাখো। আকাশও যেন কিছু বলতে চায়।

সুরাচ্ছন্ন যশ শোনে নদী বলছে----- হ্যাঁ, আকাশেরও ব্যথা আছে। যখন বাদল মেঘ তাকে বিবর্ণ করে,কালোয় কলঙ্কিত করে, তখন আকাশেরও কষ্ট হয়। স্বপ্ননীল রঙ হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় শঙ্খচিলের ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্ন। আকাশের কষ্ট মেঘধোয়া জলে ভিজে হয় একাকার।

আচ্ছন্ন যশ বলতে থাকে------নদী, তোমার গায়ের গন্ধ পাচ্ছি। তোমার ওই একরাশ চুলে আমার মুখ ঢেকে যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছি না আমি। আমার হাতটা ধরো। জীবনের উষ্ণতায় আমায় ফিরিয়ে নিয়ে চলো।

ত্রিতালের দ্রুত লয়ে সেতারের ঝালা আর তবলার অনবদ্য সঙ্গতে রাত তখন পূর্ণযৌবনা নারীর মতো বিরহ-ব্যাকুল। সে যুগলবন্দীর অনিন্দ্য প্রকাশে চাঁদের জোছনাও ব্যথাতুর। রাত ভেসে যায় সে আকুলতায়, আচ্ছন্ন যশ ভেসে যায়, বলতে থাকে------ নদী, আজ তো পূর্ণিমা। তবু কেন এত আঁধার? তোমার একরাশ ঘন কালো চুলে মুখ ঢেকেছে আমার। দেখতে পাচ্ছি না নদী। আমার হাতটা ধরো।

দমকা হাওয়ায় তিস্তার হাতে লাগানো বারান্দার জুঁইগাছটা যেন এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় দুলতে থাকে।

সম্মোহিতের মত যশ শোনে নদীর কথা------

"আমি ভেসে গেছি মহাকালের পারাবারে

কালের যাত্রায়,

স্মৃতির সরণী ধরে তুমি হেঁটে চলেছো

প্রতিদিন প্রতিরাত

এই মৃত্যু-উপত্যকায়

আমার কায়া আজ ছায়া হয়ে

বর্ষা-বসন্তে বিদ্যমান,

শরতের কাশে, হেমন্তের শিশির-সিক্ত ঘাসে রোরুদ্যমান,

গ্রীষ্মের খরতাপে আর শীর্ণকায় শীতের অরণ্যে ঝরাপাতার ব্যথাতুর আলাপে আমি বিলীয়মান

কাকে ছুঁতে চাও তিস্তাকে?

খুঁজে দেখো, অন্তরের মোহনায়

তোমার নদী হয়ে সর্বদা প্রবহমান"।

যশ টলোমলো পায়ে যেতে থাকে ডিনার টেবিলে----- নদী, বড্ডো খিদে পেয়েছে আমার,খাইয়ে দাও। কতদিন তোমার হাতে খাই নি বলো তো?

টাল সামলাতে না-পেরে ডিনার টেবিলে ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়ে সম্বিত হারায় যশ। কাঁচের ডিশগুলো সেই ধাক্কায় ঝনঝন শব্দে ভেঙে গুড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা খাবারের মাঝে সম্বিত-হারা যশ পড়ে থাকে।

ওদিকে সুরে সুরে সেতারের ঝালা বেজে চলেছে যন্ত্রনার সমুদ্র মন্থন করে। তিস্তার খুব আদরের জুঁইগাছটা বারান্দায় অসহায়ভাবে দুলতে থাকে।

...(সমাপ্ত)...




Wednesday, October 2, 2024

একটি সফল প্রেমের কাহিনী

ছবি  : ইন্টারনেট

একটি সফল প্রেমের কাহিনী 

গীতশ্রী চক্রবর্ত্তী মল্লিক

রাত বড়ো প্রিয় শ্রী-র। সাউন্ড সিস্টেমে বাজছে ওস্তাদ রশিদ খাঁ-র ভীমপলশ্রী। বড়ো করুণ রাগ, বড়ো নরম। বারান্দায় একা ইজিচেয়ারে, ভাসিয়ে নিয়ে যায় সময়ের অতীত-ঢেউ।

      সবে নতুন বিয়ে করে এসেছে। হ্যাঁ, বাবা-মায়ের অমতে এই বিয়ে, অসবর্ণ বিবাহ। শ্রী ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে। বিক্রম অব্রাহ্মণ। তাই অমত। নতুন পরিবেশ, শ্বশুরবাড়ীতে বড়ো পরিবার। তখনও শ্রী ভাবতে পারে নি "এই এক বাড়ীতে থাকাকেই কি পরিবার বলে"?

প্রায়ই লক্ষ্য করে এক টেবিলে  খেয়ে বাবা ও ছেলে যে যার মতো বেরিয়ে যায়। কিছু জিজ্ঞেস করে না বিক্রমকে। একদিন গাড়ীতে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ একটা বাড়ীর সামনে গাড়ীটা থামায়। শ্রী-কে নেমে আসতে বলে। ওই বাড়ীতে ঢুকে যায় এবং একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোকের সামনে দাঁড়িয়ে বিক্রম বলে-----" এই আমার স্ত্রী"। শ্রীকে প্রণাম করতে বলে।

শ্রী বুঝতে পারে, ইনি একজন অ্যাডভোকেট। প্রণাম সেরে শ্রী চেয়ারে বসে।

ভদ্রলোক বলে ওঠেন----- "বিক্রম, এত সুন্দর একটা লক্ষীমন্ত মেয়েকে তোর বাবা কোর্টে বাজারের মেয়ে বলেছে"!!!

ব্যাপারটা বোধগম্য হয় না শ্রী-র।

বাড়ীতে ফিরে বিক্রমকে জিজ্ঞেস করে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে। বিক্রম বলে------ "তোমাকে আগে বলি নি, কারণ তোমাকে হারাতে চাই নি। যেহেতু তোমার বাড়ীর অমত, সেটা আমার পয়সাওয়ালা বাবার prestige-এ লেগেছে। আমাকে আটকাতে পারবে না, তাই রেজেস্ট্রি-র পর যাতে তোমাকে নিয়ে বাড়ী ঢুকতে না পারি সেইজন্য আমার বাবা আমার বিরুদ্ধে কোর্টে কেস করেছে  "বাজারের মেয়ে" এনে ছেলে ঘর দখল করছে।

শ্রী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। বিয়ের আগে মামলা-মোকদ্দমার নাম শোনে নি। একটা সুসংস্কৃতিসম্পন্ন পরিবারের মেয়ে শ্রী। নানা প্রশ্ন ভীড় করে মনে। মুখে কিছু বলে না। একই বাড়ীতে একই পরিবারের এতগুলো মানুষ! কিন্তু কারোর সঙ্গে কারোর আত্মিক যোগ নেই। প্রত্যেকটা সম্পর্ক টাকাপয়সার সুতোয় বাঁধা। এমনকি বাবা-মায়ের সঙ্গেও তাই এবং এইভাবে সম্পর্কের সমীকরণের কারিগর বিক্রমের বাবা-মা।

শ্রী-র পড়াশোনা সাহিত্য নিয়ে। বাংলা অনার্স নিয়ে গ্রাজুয়েশনের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার ডিগ্রী, তারপর এম. ফিল। এরই মাঝে বিক্রমের সাথে পরিচয়, প্রণয় ও পরিণয়। পি. এইচ. ডি করছিল। কিন্তু শেষ করতে পারলো না শ্বশুড়বাড়ীর অসহনীয় পরিবেশ ও পরিস্থিতি। শ্রী সঙ্গীতশিল্পীও বটে। ছোটোবেলা থেকেই গান শিখেছে। প্রথমে বাবা ও পরে প্রতিথযশা শিল্পীর কাছে সঙ্গীতের তালিম। যথেষ্ট ভালো গাইত। বিভিন্ন ফাংশন ও আকাশবানীতে প্রোগ্রাম করেছে। এমন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে শিল্পী-মানসিকতা কোথায় যেন হাবুডুবু খেতে লাগলো, ক্রমশঃ দমবন্ধ পরিবেশ।

স্বাধীন জীবনটা কোথায় যেন হারাতে শুরু করলো শ্রী-র। বিক্রমরা ছয় ভাই। ছয় ভাইয়ের পাঁচ বউ। এদের মধ্যে শ্রী নতুন। সকাল ৭টার মধ্যে দোতলায় নেমে যেতে হয় বৌ-দের। লাটে উঠেছে শ্রী-র সকালের গানের রেওয়াজ। দোতলায় শ্বশুর-শাশুড়ী ও ছোটোছেলের বাস। তিনতলায় বাকি ভাই ও বৌ-রা। শ্রী লক্ষ্য করে, বৌদের কোনো সম্মান বা অস্তিত্ব নেই। পড়ে থাকা পুরোনো খাবার, বাড়ীর পুরুষদের পাতে পড়ে থাকা খাবার বৌ-দের খাওয়া অপরিহার্য। শ্রী মুখে কিছু বলে না, কিন্তু ওইসব এঁটো খাবার খায় না। বাকি বউরা এইসবে অভ্যস্ত। ফলে শ্রী সকলের কুনজরে পড়তে শুরু করলো।

এইভাবে চলতে লাগলো। শ্রী মুখে কিছু বলে না, কিন্তু তেল দিয়ে চলার পাত্রী নয়। সংসারের ঝোলে-ঝালে-অম্বলে থাকতে পছন্দ করে না। ক্রমশঃ সকলে বুঝতে পারছিলো "শ্রী অন্য জগতের মানুষ"। বাকি বৌরা দুজন গ্রাজুয়েট, দুজন স্কুল ডিঙোয় নি। ফলে শ্রী হয়ে উঠলো সবার ঈর্ষার কারণ।

ছলে-বলে-কৌশলে শ্রী-র পেছনে লাগা শুরু হোলো, পদে পদে অপদস্থ করা। এত মিথ্যাচার, এত মিথ্যাচার------মানুষ যে এত মিথ্যে কথা বলতে পারে ----বিক্রমদের বাড়ীতে না এলে জানতেই পারতো না শ্রী। বিক্রম কিন্তু সবার মত নয়, সহজ মানুষ। ফলে বিক্রমকে ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবতে পারত না শ্রী। বিক্রম নিজের ব্যবসায় সুপ্রতিষ্ঠিত। ফলে অন্যান্য ভাইদের ঈর্ষার কারণ বিক্রম। শ্রী ক্রমশঃ বুঝতে পারে পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বিক্রমকে ঠকানোর চক্রান্ত। মিথ্যে মামলায় দুজন ভাই বিক্রমকে ফাঁসিয়ে দিল। শ্রী অবাক বিস্ময়ে হতবাক। এদের হাত থেকে বিক্রমকে বাঁচানোটাই শ্রী-র প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়ালো। গানবাজনা,পি.এইচ.ডি সব লাটে উঠলো। ক্রমশঃ মামলা-মোকদ্দমা, পুলিশ-উকিলে ছেয়ে গেল শ্রী-বিক্রমের নতুন দাম্পত্য।

বিক্রমের মন সর্বদা উচাটন। কেস হারলে "কি হবে, কি হবে"!! শ্রী-র মত একটা সুশিক্ষিতা মেয়ে-কে " বাজারের মেয়ে"-তে পরিণত করা!! বিক্রমের বাবার কি শয়তান মস্তিস্ক!

শ্রী ভাবে উকিলরাও বা কি! এইসব মিথ্যে মামলায় পয়সা উপার্জন করে পরিবার প্রতিপালন করে! শেষপর্যন্ত কি ভালো হয় এইশ্রেণীর উকিলদের?

এরমধ্যে আরেক ঘটনা ঘটলো। ন'বৌ বদমাইশি করে শাশুড়ীর কান ভরালো। সকালবেলায় দোতলায় নামতেই শাশুড়ী শ্রী-কে গালাগাল শুরু করলো। শ্রী চুপচাপ শুনছিলো, কিন্তু যেই শ্রী-র বাবা-মা তুলে গালাগাল করেছে শ্রী প্রতিবাদ করে বলেছে------"মা, আমি তোমার মেয়ের মত, অন্যায় করলে আমাকে তোমার মারার রাইট আছে। কিন্তু আমার বাবা-মা তুলে গালাগাল করবে না। কারণ আমার বাবা-মা এই বিয়ে দেয় নি। আমি স্বেচ্ছায় তোমার ছেলেকে বিয়ে করেছি, কিন্তু সত্তা বিক্রী করি নি"।

এই বলে শ্রী তিনতলায় চলে আসে। পরপর তিনদিন কিছু খায় না। বাড়ীর অন্যরা তখন তামাশা দেখছে------ কি হয়, কি হয়।

শ্রী-ও দমবার পাত্রী নয়। তিনদিন দোতলায় নামেও নি, খায়ও নি। অন্য বউরা ভাবতেই পারে না এই প্রতিবাদ। তারা তাদের বাবা-মা নিয়ে গাল শুনতে অভ্যস্ত। বিক্রম লুকিয়ে খাবার এনেছে। শ্রী রিফিউজ করে বলেছে-------"তোমার মা-কে নিজে হাতে খাবার দিতে হবে, তবে খাবো, নয়তো নয়। মরতে হলে মরবো"।

বাড়ীর অতো লোক শুধু দেখছে তামাশা, একে তো কোর্টে কেস চলছে "বাজারের মেয়ে এনে ঘর দখল"।

শ্রী কিন্তু শাশুড়ীকে মন থেকে ভালোবেসেছিল, তাই প্রথম সম্বোধনেই " মা *আপনি* নয়, মা *তুমি* বলেছিল। যা অন্য বউরা পারে নি। এটাও অন্য বউদের একধরণের জ্বলন। তবে এই ভালোবাসা নিতে পারারও ক্ষমতা থাকা চাই। বিক্রমের মা শ্রীর এই নির্ভেজাল ভালোবাসা নিতে পারে নি।

তিনদিনের দিন রাতের বেলায় শ্রী-র ক্রমশঃ শরীর খারাপ হতে শুরু করলো। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে, পেটে খিঁচুনি ধরছে। বিক্রম ভয় পেয়ে  মা-কে বলতে যায়। একে একে সব বৌ, শাশুড়ী ও এক আশ্রিতা পিসীমা হাজির হয় বিক্রমের ঘরে। 498 ধারার কেসটা তখন মানুষজন মোটামুটি জেনে গেছে। শ্রী তো কিছুতেই খাবে না, ভীষণ আত্মসম্মানী। তখন শাশুড়ী এক গ্লাস দুধ নিজে হাতে শ্রী-কে দিয়ে খেতে বলে। শ্রী-র শরীর বিধ্বস্ত,শুনতে পাচ্ছে ওই পিসীমা বলছেন ------" বিভাবরী ( শাশুড়ীর নাম) এই মেয়ে ষোলোআনা জিদ্দি মেয়ে, অন্য বৌদের মত এর সঙ্গে ব্যবহার করিস না"।

যাইহোক শাশুড়ী দেবার পর শ্রী খায়, কিন্তু টানা তিনদিন না-খাওয়া ও মানসিক ধকলে কাহিল হয়ে পড়েছিল। বুঝতে পারে বড়ো ভুল জায়গায় এসে পড়েছে।

আবার রোজকার নিয়মে দিন গড়াতে থাকলো। ক্লাসিক গান শোনে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করে--------

"হে মোর দুর্ভাগা দেশ,যাদের করেছো অপমান

অপমানে একদিন হতে হবে তাহাদের সবার সমান"।

শক্তি পায় মনে। ক্রমশঃ তিনতলার ঐ কোনের ঘরটা একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে উঠলো। সকলের কৌতুহল ঐ ঘর, ঐ মেজো বৌ-কে নিয়ে। শ্রী-ই মেজ বৌ। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর পত্র শ্রী পড়েছে। কিশোরীবেলায় খবরের কাগজে পড়েছে সুরূপা গুহ ও দেবযানী বনিকের নারকীয় হত্যাকান্ড। মনে মনে তৈরী হয়ে যায়, এখানে থেকেই আত্মসম্মানের লড়াইটা চালিয়ে যাবে।

ওদিকে "বাজারের মেয়ে এনে ঘর দখল" -এর কেসটা তো চলছে। সেদিন বিক্রম কিছু না খেয়েই কোর্টে বেরিয়ে যায়। সেদিন ফাইনাল হিয়ারিং। বিক্রমের বাবা তুষার পালের খুব বদনাম, মামলাবাজ লোক। শ্রী ভেতরে ভেতরে খুব চিন্তিত, বিক্রমকে বুঝতে দেয় না। কারণ বিক্রম খুব সহজ মানুষ, মামলা-র কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ক্রমশঃ তাকে অন্যায়ভাবে  জড়িয়ে ফেলেছে মামলায়।

সারাদিন শ্রী চুপচাপ, ভেতরে ভেতরে অস্থির,কিন্তু বুঝতে দেয় না। পুরো বাড়ীটায় সেদিন যেন উৎসব লেগেছে।যেন কেসের ফলাফল ওরা জেনেই গেছে। তুষার পাল কোনোদিনও কেস হারে নি। বড় বড় উকিল লাগিয়েছে।

কিন্তু বিক্রমের সহায় হোলো ঈশ্বর। ও খুব ভক্তিমান। বিক্রমও খুব বড়ো উকিল লাগিয়েছে, কারণ শ্রী-র সম্মান, শ্রীকে কোনোমতেই হারাতে পারবে না বিক্রম।

শেষ-বিকেলে ফোন এলো বিক্রমের------ " শ্রী, রেডি থেকো। বাড়ী ফিরেই তোমাকে নিয়ে বেরোবো। গ্লোবে সিনেমা দেখে কোয়ালিটিতে ডিনার করে ফিরবো।বাড়ী ফিরে সব বলছি"। ফোন কেটে দেয় বিক্রম।

শ্রী বুঝতে পারে বিক্রম কেস জিতে গেছে। ততক্ষণে বাড়ীর সবাই ফলাফল জেনে গেছে। সারা বাড়ী থমথমে, তুষার পাল হেরে গেছে, ছেলের কাছে বাবা হেরেছে, সত্যের কাছে মিথ্যা হেরেছে।

কিছুক্ষণ বাদে বিক্রম ফিরে আসে, শ্রীকে পরম আদরে জড়িয়ে ধরে, আদরে-চুমুতে ভরিয়ে দেয়। বলতে থাকে-----"শ্রী, আর আমাদের বের করে দেবার ক্ষমতা নেই আমার বাবার। তোমার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট, গানের সার্টিফিকেট-শংসাপত্র দেখে বাবার উকিলকে জজসাহেব প্রচন্ড ধমকেছেন এইভাবে মিথ্যা মামলায় একজন নারীর চরিত্রহননের জন্য। রায়ে ঘোষণা করলেন, বিক্রমের আইনত স্ত্রী হিসেবে ওই বাড়ীতে থাকার"।

বিক্রমের জয়ের আনন্দ বাঁধনহারা। শ্রী রেডি হয়েই ছিলো। দুজনে বেরিয়ে যায় গাড়ীতে নতুন দাম্পত্য সেলিব্রেশানের জন্য।

...(সমাপ্ত)...

Saturday, October 21, 2023

মুখের সন্ধানে

ছবি : ইন্টারনেট

 মুখের সন্ধানে

গীতশ্রী চক্রবর্ত্তী মল্লিক

মেঝে জুড়ে অদৃশ্য ফাটল

বাড়ছে গোপনে, সেতু টলমল।

চলে যায় দিন, আসে রাত

আজ তোমাতে আমাতে ভীষণ তফাৎ।

তুমি মুখোশের আড়ালে নাড়াও কলকাঠি

হারানো মুখের সন্ধানে আমি ক্রমাগত পথ হাঁটি।

...(সমাপ্ত)...