1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Friday, October 9, 2026

তিব্বতে এক বাঙালি গুপ্তচর: শরৎচন্দ্র দাসের জীবন, অভিযান ও উত্তরাধিকার

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

তিব্বতে এক বাঙালি গুপ্তচর: শরৎচন্দ্র দাসের জীবন, অভিযান ও উত্তরাধিকার

মৃণাল পাল 

          উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কয়েকটি অঞ্চল ছিল, যেগুলি ইউরোপীয় শক্তির কাছে ছিল রহস্যে মোড়া। তিব্বত ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। চারদিকে হিমালয়ের দুর্গম পর্বতমালা, বছরের অধিকাংশ সময় বরফে ঢাকা গিরিপথ, কঠোর ধর্মীয় শাসন এবং বিদেশিদের প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা তিব্বতকে বিশ্বের অন্যতম বিচ্ছিন্ন দেশে পরিণত করেছিল। ইউরোপীয়রা তাকে বলত "Forbidden Land" বা নিষিদ্ধ দেশ। অথচ এই দেশটিকেই জানার জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল অত্যন্ত আগ্রহী। কারণ ভারতের উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা, মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং হিমালয়ের কৌশলগত অবস্থান তিব্বতকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যকার মধ্য এশিয়ার আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা ইতিহাসে "The Great Game" নামে পরিচিত। এই প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল তিব্বত। ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পেরেছিল, কোনো দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমেই তার ভূগোল, গিরিপথ, নদীপথ, জনসংখ্যা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য জানতে হবে। কিন্তু ইউরোপীয়দের পক্ষে তিব্বতে প্রবেশ কার্যত অসম্ভব ছিল। ফলে তারা আশ্রয় নিল ভারতীয় শিক্ষিত ও পাহাড়ি ভাষায় দক্ষ ব্যক্তিদের।

এই প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের মঞ্চে আবির্ভূত হন এক বাঙালি যুবক, শরৎচন্দ্র দাস। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন শিক্ষক, ভাষাবিদ, অভিযাত্রী, মানচিত্রকার, বৌদ্ধধর্ম গবেষক এবং ব্রিটিশ সরকারের গোপন তথ্যসংগ্রাহক। তাঁর জীবনকে একক কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, তেমনি ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক তিব্বত গবেষণায়ও অসামান্য অবদান রেখেছেন।

        ১৮৪৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার (বর্তমান বাংলাদেশ) আলমপুর গ্রামে শরৎচন্দ্র দাসের জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত কৌতূহলী ও মেধাবী। প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের বাইরে ইতিহাস, ভূগোল, উদ্ভিদবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

       বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রকৌশল শিক্ষারও ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ভাগ্য তাঁর প্রতি সহায় হয়নি। শেষ বর্ষের পরীক্ষার আগে তিনি মারাত্মক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন জ্বরে ভুগে তাঁর পড়াশোনা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।এই অসুস্থতাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

        প্রেসিডেন্সি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক চার্লস ব্যারন ক্লার্ক (C. B. Clarke) শরৎচন্দ্রের মেধায় মুগ্ধ ছিলেন। তাঁর সুপারিশে শরৎচন্দ্র দার্জিলিংয়ের Bhutia Boarding School-এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।এই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনকে এক নতুন পথে নিয়ে যায়।

         তৎকালীন দার্জিলিং ছিল ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে সিকিম, ভুটান ও তিব্বতের মানুষের অবাধ যাতায়াত ছিল। স্কুলে পড়ত মূলত তিব্বতি, ভুটিয়া ও লেপচা ছাত্ররা।প্রথমদিকে ভাষার সমস্যায় পড়লেও শরৎচন্দ্র অসাধারণ অধ্যবসায়ের সঙ্গে তিব্বতি ভাষা আয়ত্ত করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি শুধু কথ্য ভাষাই নয়, ধর্মীয় সাহিত্যেও দক্ষ হয়ে ওঠেন। পরে এই ভাষাজ্ঞানই তাঁকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তিব্বত বিশেষজ্ঞে পরিণত করে।শুধু ছাত্রদের সঙ্গেই নয়, সিকিমের রাজপরিবার, উচ্চপদস্থ লামা এবং অভিজাত সমাজের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠে।

       দার্জিলিংয়ে থাকাকালীন শরৎচন্দ্রের পরিচয় হয় পেমিয়াংচি মঠের বিশিষ্ট লামা উগ্যেন গিয়াতসো-র সঙ্গে।উগ্যেন ছিলেন জ্ঞানী, বিচক্ষণ এবং তিব্বতের অভ্যন্তরে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। শরৎচন্দ্রের ভাষাজ্ঞান ও বৌদ্ধধর্মের প্রতি আন্তরিক আগ্রহ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।পরবর্তীকালে এই উগ্যেন গিয়াতসোই শরৎচন্দ্রের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হয়ে ওঠেন।তাঁর মাধ্যমেই শরৎচন্দ্র পাঞ্চেন লামার দরবারে প্রবেশের অনুমতি লাভ করেন।

         ১৮৭৯ সালে শরৎচন্দ্র ও উগ্যেন গিয়াতসো প্রথমবার তিব্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।তাঁদের পথ ছিল অত্যন্ত দুর্গম।দার্জিলিং থেকে পেমিয়াংচি, সেখান থেকে জোংরি, তারপর প্রায় উনিশ হাজার ফুট উচ্চতার চাংথাং গিরিপথ।পথে হাঁটুসমান বরফ।

কোথাও বরফ কেটে সিঁড়ি বানাতে হয়েছে।

কোথাও কুকরি দিয়ে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে হয়েছে।আবার কোথাও পাহাড়ি গুহায় রাত কাটাতে হয়েছে।অক্সিজেনের স্বল্পতায় প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই।অবশেষে তাঁরা পৌঁছান তাশি লুনপো মঠে, যা ছিল পাঞ্চেন লামার আসন।

সেখানে শরৎচন্দ্র প্রায় ছয় মাস অবস্থান করেন।

এই সময় তিনি তিব্বতি ভাষায় রচিত বহু প্রাচীন সংস্কৃত বৌদ্ধগ্রন্থের অনুলিপি সংগ্রহ করেন।

কিন্তু একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তিব্বতের নদী, পাহাড়, গিরিপথ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জনবসতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর তথ্যও লিপিবদ্ধ করতে থাকেন।

        এসব তথ্য গোপনে পৌঁছে যায় ব্রিটিশ ভারতের Survey of Indiaএর হাতে।ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল মন্তব্য করেছিলেন,"Mr. Das's reports are of exceptional value for mapping Tibet."এই প্রথম ব্রিটিশ সরকার তিব্বতের একটি নির্ভরযোগ্য মানচিত্র নির্মাণের উপাদান পেতে শুরু করে।

        প্রথম তিব্বত অভিযান থেকে ফিরে আসার পর শরৎচন্দ্র দাস উপলব্ধি করেছিলেন যে তিব্বত শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি এক অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জগত। তাশি লুনপো মঠে কয়েক মাসের অবস্থানে তিনি তিব্বতি সমাজ, প্রশাসন, বৌদ্ধ দর্শন এবং ভাষা সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাঁর কাছে আরও বড় দায়িত্ব অর্পণ করল। এবার লক্ষ্য ছিল তিব্বতের রাজধানী লাসা, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোনো ইউরোপীয় বা ব্রিটিশ প্রতিনিধি প্রবেশ করতে পারেননি।

        ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পেরেছিল, তিব্বতের রাজধানী, সেখানকার প্রশাসনিক কাঠামো, সামরিক শক্তি, দুর্গ, রাস্তা, নদীপথ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা গেলে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনা অনেক সহজ হবে। শরৎচন্দ্র ছিলেন এই কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। তিনি তিব্বতি ভাষায় সাবলীল, বৌদ্ধ আচার-অনুষ্ঠানে পারদর্শী এবং তিব্বতি সমাজে গ্রহণযোগ্য একজন মানুষ।

      ১৮৮১ সালের শেষদিকে শরৎচন্দ্র দাস আবার যাত্রা শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিশ্বস্ত সঙ্গী লামা উগ্যেন গিয়াতসো। এবার তাঁদের যাত্রা আরও দীর্ঘ, আরও বিপজ্জনক।দার্জিলিং থেকে সিকিম, তারপর বরফঢাকা গিরিপথ অতিক্রম করে তাঁরা পৌঁছান তাশি লুনপো মঠে। আগের সফরের সুবাদে পাঞ্চেন লামার দরবারে তাঁরা আন্তরিক অভ্যর্থনা পান। তিব্বতি অভিজাতদের অনেকেই তাঁকে চিনতে শুরু করেছিলেন। কেউ তাঁকে ভারতীয় পণ্ডিত হিসেবে জানতেন, কেউ আবার ভাবতেন তিনি কাশ্মীরের এক বৌদ্ধ ভিক্ষু। এই পরিচয়ই তাঁর নিরাপত্তার প্রধান ঢাল হয়ে ওঠে।

      তাশি লুনপো থেকে কয়েক মাস পরে তাঁরা রওনা দেন লাসার উদ্দেশ্যে। পথে শরৎচন্দ্র প্রতিদিন নিয়ম করে জরিপ চালাতেন। কম্পাস দিয়ে দিক নির্ণয় করতেন, পদক্ষেপ গুনে দূরত্ব হিসাব করতেন, সূর্যের অবস্থান দেখে উচ্চতা নির্ধারণ করতেন। নদীর প্রবাহ, গিরিপথের ঢাল, গ্রামের অবস্থান, সেতুর দৈর্ঘ্য, পাহাড়ের গঠন, এমনকি পথে কত সময় লাগে, তাও তিনি লিখে রাখতেন।এই সমস্ত কাজ তাঁকে করতে হতো গোপনে। সামান্য সন্দেহ হলেই তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত ছিল।

     ১৮৮২ সালের মে মাসে বহু কষ্টের পথ অতিক্রম করে শরৎচন্দ্র অবশেষে পৌঁছান তিব্বতের রাজধানী লাসা।তখনকার লাসা ছিল ধর্মীয় রাজধানী, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং তিব্বতি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। শহরের কেন্দ্রস্থলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল বিখ্যাত পোতালা প্রাসাদ। বিশাল সাদা-লাল প্রাসাদটি শুধু রাজপ্রাসাদ নয়, তিব্বতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার প্রতীকও ছিল।লাসার সাধারণ মানুষ শরৎচন্দ্রকে দেখে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। লাল পাগড়ি, তিব্বতি পোশাক, মুখে ক্লান্তির ছাপ দেখে অনেকে ভেবেছিল তিনি দূরদেশ থেকে আসা কোনো অসুস্থ লামা।কিন্তু এই সাধারণ চেহারার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল অসাধারণ এক মিশন।

      ১৮৮২ সালের ১০ জুন শরৎচন্দ্র দাসের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন।একজন পরিচিত লামার সাহায্যে তিনি প্রবেশ করেন পোতালা প্রাসাদের অভ্যন্তরে। সেখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় তৎকালীন ত্রয়োদশ দলাই লামা থুবতেন গ্যাতসো-র সঙ্গে, যাঁর বয়স তখন মাত্র আট বছর।শরৎচন্দ্র তাঁর স্মৃতিকথায় এই সাক্ষাতের অত্যন্ত জীবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন।

      বিশাল দরবারকক্ষে সোনার অলঙ্করণে সজ্জিত সিংহাসনের উপর বসে ছিলেন শিশুদলাই লামা। উপস্থিত লামারা মন্ত্রোচ্চারণ করছিলেন। অতিথিদের সামনে জাফরান মিশ্রিত পবিত্র জল পরিবেশন করা হয়। পরে মাখন চা দেওয়া হয়। শরৎচন্দ্র প্রণামী হিসেবে এক তোলা সোনা নিবেদন করেন।বিদায়ের সময় তাঁকে সম্মানসূচক লাল খাদা পরিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এখানেই শেষ হয়নি।

তিনি লিখেছিলেন, "শিশুটির চোখে যেন ক্লান্তির ছাপ ছিল। প্রতিদিন একই ধর্মীয় আচার ও রাজকীয় অনুষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি নিশ্চয়ই তাকে অবসন্ন করে তুলেছিল।" এই মানবিক পর্যবেক্ষণ শরৎচন্দ্রের লেখাকে কেবল ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, মূল্যবান সমাজ-ইতিহাসের দলিলে পরিণত করেছে।

      শরৎচন্দ্র দাস কি সত্যিই গুপ্তচর ছিলেনঐতিহাসিকদের অধিকাংশই মনে করেন, হ্যাঁ, তবে তাঁর পরিচয় কেবল গুপ্তচরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।তিনি নিয়মিতভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঠাতেন,গিরিপথের অবস্থান,সামরিক রাস্তাঘাটের বিবরণ,নদীর গতিপথ,দুর্গ ও প্রহরী ব্যবস্থার তথ্য,প্রশাসনিক কাঠামো,ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা

,জনসংখ্যা ও অর্থনীতির বিবরণ।বিশেষভাবে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তিব্বতের সরকারি বার্তাবাহক ব্যবস্থা। তিনি লিখেছেন, নীল পোশাক পরিহিত বিশেষ অশ্বারোহীরা হলুদ ব্যাগে সরকারি নথি বহন করতেন এবং লাসা থেকে পিকিং পর্যন্ত দ্রুত যোগাযোগ রক্ষা করতেন। এই কুরিয়ার ব্যবস্থার বর্ণনা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

       শরৎচন্দ্রের সংগৃহীত তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর মানচিত্র।সেই সময় তিব্বতের নির্ভুল মানচিত্র বিশ্বের কোথাও ছিল না।তিনি নিজে কম্পাস, সেক্সট্যান্ট, থার্মোমিটার ও অন্যান্য জরিপযন্ত্র ব্যবহার করে দূরত্ব ও উচ্চতা নির্ণয় করতেন। কখনও পদক্ষেপ গুনে, কখনও সূর্যের অবস্থান দেখে, আবার কখনও নদীর গতিপথ অনুসরণ করে তিনি তথ্য সংগ্রহ করতেন।এই মানচিত্রই পরে ব্রিটিশ ভারতের Survey of India-র নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।ঐতিহাসিক আলাস্টেয়ার ল্যামের মতে, শরৎচন্দ্র দাসের সংগৃহীত ভৌগোলিক তথ্য ছাড়া ব্রিটিশদের পক্ষে তিব্বত সম্পর্কে এত দ্রুত নির্ভরযোগ্য ধারণা তৈরি করা সম্ভব হতো না।

      কিন্তু এই অভিযানের মূল্য ছিল ভয়ঙ্কর।তিব্বত সরকার পরে জানতে পারে যে কয়েকজন লামা ও স্থানীয় ব্যক্তি শরৎচন্দ্রকে সাহায্য করেছিলেন।তাঁদের অনেককে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

ইতিহাসে উল্লেখ আছে, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়।সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী উগ্যেন গিয়াতসো। যদিও তিনি পরবর্তীকালে সিকিমে ফিরে আসতে সক্ষম হন, তবু দীর্ঘদিন তাঁকে রাজনৈতিক সন্দেহের মধ্যে জীবন কাটাতে হয়।এই ঘটনার পর শরৎচন্দ্রের জন্য তিব্বতের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।কিন্তু তাঁর সংগ্রহ করা তথ্য ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ সরকারের হাতে পৌঁছে গিয়েছিল।

       এর মাত্র দুই দশক পরে, ১৯০৪ সালে কর্নেল ফ্রান্সিস ইয়ংহাজব্যান্ড-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী তিব্বত অভিযানে বের হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, শরৎচন্দ্র দাসের সংগৃহীত মানচিত্র ও তথ্য সেই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

         লাসা থেকে ফিরে আসার পর শরৎচন্দ্র দাসের জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তিনি জানতেন, আর কোনোদিন হয়তো তিব্বতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন না। কিন্তু তাঁর হাতে ছিল অমূল্য সম্পদ। ছিল শত শত পাণ্ডুলিপি, অসংখ্য নোট, মানচিত্র, ভাষাতাত্ত্বিক তথ্য এবং এমন এক অভিজ্ঞতা, যা সে সময় পৃথিবীর খুব কম মানুষেরই ছিল।তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর প্রকৃত কাজ এখন শুরু। এতদিন তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন, এবার সেই তথ্যকে জ্ঞানে রূপান্তরিত করার সময়।

         শরৎচন্দ্র দাসের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত তাঁর সংগৃহীত তিব্বতি পাণ্ডুলিপি।মধ্যযুগে ভারতে বহু বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে নালন্দা, বিক্রমশীলা এবং ওদন্তপুরী, মুসলিম আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায়। সেই সঙ্গে হারিয়ে যায় অসংখ্য সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থ।

কিন্তু এই গ্রন্থগুলির অনেকগুলিই শতাব্দী আগে তিব্বতি ভাষায় অনূদিত হয়ে তিব্বতের মঠগুলিতে সংরক্ষিত ছিল।

       শরৎচন্দ্র এই ঐতিহাসিক সত্য উপলব্ধি করেছিলেন।তাই তিনি শুধু ভ্রমণ করেননি; তিনি ধৈর্য ধরে বিভিন্ন মঠ থেকে পাণ্ডুলিপির অনুলিপি সংগ্রহ করেন। অনেক ক্ষেত্রে নিজেই কপি তৈরি করেন, আবার কোথাও লামাদের সহযোগিতায় নকল করিয়ে আনেন।এই সংগ্রহ পরবর্তীকালে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।

বিশ শতকে বহু ইউরোপীয় ও জাপানি গবেষক শরৎচন্দ্রের সংগ্রহের উপর নির্ভর করেই তাঁদের গবেষণা এগিয়ে নিয়ে যান।

        শুধু পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ নয়, ভাষাতত্ত্বেও শরৎচন্দ্রের অবদান অসামান্য।তিনি বহু বছরের শ্রমে প্রস্তুত করেন Tibetan-English Dictionary।

এটি ছিল সে সময়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তিব্বতি-ইংরেজি অভিধানগুলির অন্যতম।

অভিধানটিতে তিনি শুধু শব্দের অর্থ দেননি; প্রতিটি শব্দের ব্যুৎপত্তি, ধর্মীয় ব্যবহার, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং উচ্চারণও ব্যাখ্যা করেছেন।

আজও তিব্বতবিদ্যার গবেষণায় এই অভিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হয়।১৯০২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ

A Journey to Lhasa and Central Tibet

এটি শুধু একটি ভ্রমণকাহিনি নয়।

এটি একই সঙ্গে—

ভৌগোলিক জরিপ,

সমাজবিজ্ঞান,

নৃতত্ত্ব,

ধর্মতত্ত্ব,

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ,

এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা।

এই গ্রন্থে তিনি লাসার বাজার, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, ডাকব্যবস্থা, কর ব্যবস্থা, কৃষিকাজ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এমনকি তিব্বতিদের হাস্যরসেরও বর্ণনা দিয়েছেন।

তাঁর ভাষা ছিল সহজ, পর্যবেক্ষণ ছিল সূক্ষ্ম এবং বর্ণনা ছিল নিরপেক্ষ।এই কারণেই বইটি আজও তিব্বত গবেষণার একটি ক্লাসিক গ্রন্থ।

      শরৎচন্দ্র দাসের গবেষণা দ্রুত ইউরোপে সমাদৃত হয়।ব্রিটিশ সরকার তাঁকে "রায়বাহাদুর" উপাধি প্রদান করে।পরে তাঁকে Companion of the Order of the Indian Empire (CIE) সম্মানেও ভূষিত করা হয়।

লন্ডনের Royal Geographical Society তাঁকে হিমালয়ের অজানা ভূগোল সম্পর্কে অসামান্য অবদানের জন্য সম্মানিত করে।

তাঁর গবেষণাপত্র নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে Journal of the Asiatic Society of Bengal-এ।

এশিয়া, ইউরোপ ও জাপানের গবেষকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন তিব্বত বিষয়ক অন্যতম নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ।

থাইল্যান্ড ও জাপান সফর

তিব্বত গবেষণার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি শরৎচন্দ্র।

তিনি থাইল্যান্ডে গিয়ে পালি ও বৌদ্ধ দর্শনের উপর গবেষণা করেন।

সেখানে তাঁর পাণ্ডিত্য দেখে থাই রাজপরিবার তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করে।

জীবনের শেষ পর্যায়েও তাঁর জ্ঞানপিপাসা কমেনি।

মৃত্যুর মাত্র দুই বছর আগে তিনি জাপান সফর করেন।

সেখানে বৌদ্ধ মঠ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাণ্ডুলিপি সংগ্রহশালা ঘুরে গবেষণা করেন।

তখন তাঁর বয়স প্রায় সত্তর।

লাসা ভিলা

তিব্বতে আর প্রবেশ করতে না পারলেও শরৎচন্দ্র সারাজীবন সেই দেশকে ভুলতে পারেননি।

দার্জিলিংয়ে তিনি একটি বাড়ি নির্মাণ করেন।

বাড়িটির নাম দেন "লাসা ভিলা"।

এই বাড়িটি ছিল এক অর্থে তাঁর ব্যক্তিগত তিব্বত জাদুঘর।

এখানে সংরক্ষিত ছিল—

তিব্বতি পাণ্ডুলিপি,

থাংকা চিত্র,

ধর্মীয় মূর্তি,

প্রার্থনাচক্র,

তিব্বতি বাদ্যযন্ত্র,

মানচিত্র,

এবং তাঁর অভিযানের ডায়েরি।

লাসা ভিলা একসময় ভারতীয় ও বিদেশি গবেষকদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

বিতর্ক: তিনি কি নায়ক, না ব্রিটিশ গুপ্তচর?

শরৎচন্দ্র দাসের জীবন নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও বিতর্ক রয়েছে।

একদল ইতিহাসবিদের মতে, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত গুপ্তচর।

তাঁর সংগৃহীত তথ্যই ১৯০৪ সালে ইয়ংহাজব্যান্ডের তিব্বত অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই অভিযানের ফলে বহু নিরীহ তিব্বতির প্রাণহানি ঘটে।

অন্যদিকে অনেক গবেষক মনে করেন, শরৎচন্দ্রকে শুধুমাত্র গুপ্তচর হিসেবে বিচার করা অন্যায়।

তাঁর প্রকৃত পরিচয় একজন জ্ঞানসন্ধানী গবেষক।

ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতা না পেলে হয়তো তিনি কখনোই তিব্বতে প্রবেশ করতে পারতেন না।

আর তাঁর সংগৃহীত পাণ্ডুলিপি, অভিধান এবং গবেষণা আজও বিশ্বজুড়ে অমূল্য সম্পদ।

ইতিহাসবিদ John Bray লিখেছেন,"Sarat Chandra Das stood at the intersection of scholarship and imperial politics."

অর্থাৎ, তিনি এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্র, যেখানে জ্ঞানচর্চা এবং সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।

      জীবনের শেষ কয়েক বছর শরৎচন্দ্র দার্জিলিং ও কলকাতার মধ্যে যাতায়াত করে কাটান।

তিনি লেখালেখি, গবেষণা এবং বক্তৃতা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।১৯১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর দার্জিলিংয়ের লাসা ভিলা-তেই তাঁর মৃত্যু হয়।তাঁর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের একটি অংশ বিভিন্ন গ্রন্থাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত হয়।আজও তাঁর অনেক সংগ্রহ ভারতের National Library, Asiatic Society এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মূল্যবান ঐতিহাসিক সম্পদ হিসেবে রক্ষিত আছে।

ইতিহাসের মূল্যায়ন

          এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ ইতিহাস শরৎচন্দ্র দাসকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে।

তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি হিমালয়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে শুধু একটি নিষিদ্ধ দেশে প্রবেশ করেননি; তিনি দুই ভিন্ন সভ্যতার মধ্যে জ্ঞানের সেতুবন্ধনও তৈরি করেছিলেন।তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাসে কোনো ব্যক্তিত্বকে শুধু নায়ক বা খলনায়ক হিসেবে বিচার করা যায় না।

শরৎচন্দ্র দাস একই সঙ্গে ছিলেন অভিযাত্রী, ভাষাবিদ, গবেষক, মানচিত্রকার এবং ব্রিটিশ ভারতের এক গোপন তথ্যসংগ্রাহক।

তাঁর জীবন তাই ইতিহাসের এক জটিল, কিন্তু অত্যন্ত আকর্ষণীয় অধ্যায়।

         শরৎচন্দ্র দাসের মৃত্যুর পর তাঁর নাম ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে থাকে। স্বাধীনতার পর ভারতের ইতিহাসচর্চায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতারা বেশি গুরুত্ব পেলেও, ব্রিটিশ আমলে কর্মরত বহু ভারতীয় পণ্ডিত ও অভিযাত্রীর অবদান তুলনামূলকভাবে আড়ালে থেকে যায়। শরৎচন্দ্র দাস তাঁদেরই একজন।কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁর মর্যাদা কখনও কমেনি। ইউরোপ, জাপান, আমেরিকা এবং তিব্বতবিদ্যার গবেষণায় আজও তাঁর লেখা, মানচিত্র, অভিধান ও সংগৃহীত পাণ্ডুলিপি অপরিহার্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক তিব্বতবিদ্যার (Tibetology) ইতিহাসে তাঁর নাম লরেন্স ওয়াডেল (L. A. Waddell), জিউসেপ্পে তুচ্চি (Giuseppe Tucci), আলেকজান্দ্রা ডেভিড-নীল (Alexandra David-Néel) প্রমুখ আন্তর্জাতিক গবেষকদের পাশে উচ্চারিত হয়।

        ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিতেও তাঁর অবদান নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে। এশিয়াটিক সোসাইটি, ন্যাশনাল লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সংগৃহীত পাণ্ডুলিপি নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। বৌদ্ধ দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, ভূগোল এবং হিমালয় গবেষণায় তাঁর কাজ আজও প্রাসঙ্গিক।

       দার্জিলিংয়ের রেলস্টেশনের কাছেই অবস্থিত শরৎচন্দ্র দাসের বাড়ি 'লাসা ভিলা'। এখানেই তিনি তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়েছিলেন।একসময় এই বাড়িতে সংরক্ষিত ছিল তিব্বত থেকে আনা বহু দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, ধর্মীয় প্রতিমা, থাংকা চিত্র, মানচিত্র এবং ব্যক্তিগত ডায়েরি। দুর্ভাগ্যবশত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রহের অনেকাংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চলে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। তবুও লাসা ভিলা আজও তাঁর স্মৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

       দার্জিলিংয়ের Himalayan Tibet Museum-এ শরৎচন্দ্র দাসকে আধুনিক তিব্বত গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। স্থানীয় তিব্বতি সমাজও তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে, কারণ তিনি তাঁদের সংস্কৃতি ও ধর্মকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেছিলেন।

       শরৎচন্দ্র দাসকে মূল্যায়ন করা সহজ নয়।

তিনি কি ব্রিটিশ গুপ্তচর?নাকি একজন অসাধারণ গবেষক?নাকি একজন অভিযাত্রী?এই তিনটি পরিচয়ই সত্য।ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি একই সঙ্গে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। একদিকে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও কৌশলগত স্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। অন্যদিকে সেই একই যাত্রায় তিনি উদ্ধার করেছেন বহু হারিয়ে যাওয়া ভারতীয় বৌদ্ধ ঐতিহ্য।

তাঁর সংগ্রহ করা ভৌগোলিক তথ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামরিক পরিকল্পনায় ব্যবহৃত হয়েছে, আবার তাঁর সংগ্রহ করা পাণ্ডুলিপি ভারতীয় ইতিহাস ও দর্শনের অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছে।এই দ্বৈত পরিচয়ই তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম জটিল ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

       তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার দিকে তাকালে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।প্রথমত, তিনি ছিলেন অসাধারণ ভাষাবিদ। বাংলা, ইংরেজি, তিব্বতি, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায় তাঁর দক্ষতা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।দ্বিতীয়ত, তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ অভিযাত্রী। আধুনিক প্রযুক্তি, রাস্তা কিংবা যোগাযোগব্যবস্থা ছাড়াই তিনি একাধিকবার হিমালয়ের দুর্গম গিরিপথ অতিক্রম করেছিলেন।

তৃতীয়ত, তিনি ছিলেন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত পড়লে বোঝা যায়, তিনি শুধু রাজনীতি বা ভূগোল নয়, মানুষের পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, বাজার, বিচারব্যবস্থা, এমনকি শিশুদের আচরণও গভীরভাবে লক্ষ্য করতেন।চতুর্থত, তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান গবেষক। তাঁর প্রতিটি লেখা তথ্যনিষ্ঠ, সংযত এবং প্রমাণভিত্তিক। সেই কারণেই তাঁর গ্রন্থগুলো আজও গবেষণার প্রাথমিক উৎস (Primary Source) হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

আজ ভারত ও চীনের সীমান্ত প্রশ্নে তিব্বতের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আবারও আলোচনায় এসেছে। হিমালয়ের গিরিপথ, সীমান্ত, প্রাচীন বাণিজ্যপথ এবং তিব্বতের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে গবেষণা হচ্ছে।

      এই প্রেক্ষাপটে শরৎচন্দ্র দাসের লেখা ও মানচিত্র শুধু ঐতিহাসিক দলিল নয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।একই সঙ্গে তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে জ্ঞানচর্চা কখনও কখনও রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তাই ইতিহাস পড়ার সময় কোনো ব্যক্তিকে কেবল নায়ক বা খলনায়কের চোখে দেখলে তার প্রকৃত মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না।

          শরৎচন্দ্র দাস ছিলেন এক অসাধারণ বাঙালি, যিনি জ্ঞানের সন্ধানে হিমালয়ের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। তিনি শুধু একজন অভিযাত্রী নন; তিনি ছিলেন ভাষাবিদ, শিক্ষক, মানচিত্রকার, গবেষক এবং বৌদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ অনুরাগী। একই সঙ্গে তিনি ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশও ছিলেন।

তাঁর জীবনের সাফল্য যেমন বিস্ময়কর, তেমনি বিতর্কও গভীর। তিনি যে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, তা একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে সামরিক সুবিধা দিয়েছিল, অন্যদিকে বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তিব্বতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে।

      আজ, তাঁর মৃত্যুর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে, শরৎচন্দ্র দাসকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে। তাঁকে শুধু "গুপ্তচর" বললে যেমন তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়, তেমনি শুধু "গবেষক" বললেও তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার পূর্ণ ব্যাখ্যা হয় না।তিনি ছিলেন এক "পণ্ডিত-অভিযাত্রী", যিনি জ্ঞান, সাহস ও কৌতূহলকে সঙ্গী করে হিমালয়ের ওপারে এক অজানা বিশ্বের দ্বার উন্মোচন করেছিলেন। সেই কারণেই শরৎচন্দ্র দাস শুধু বাঙালির গর্ব নন; তিনি বিশ্ব তিব্বতবিদ্যার ইতিহাসে এক অমর নাম।

তথ্যসূত্র 

1. Das SC. A Journey to Lhasa and Central Tibet. London: John Murray; 1902.

2. Das SC. Tibetan-English Dictionary. Calcutta: Bengal Secretariat Book Depot; 1902.

3. Das SC. Narratives of the Mission of George Bogle to Tibet and of the Journey of Thomas Manning to Lhasa. London: Trübner & Co.; 1889.

4. Lamb A. British India and


No comments:

Post a Comment