1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

শেষ প্রদীপের আলো

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

শেষ প্রদীপের আলো

রণতোষ কুমার দেব

গ্রামের নাম ছিল চন্দ্রপুর। একসময় সন্ধ্যা নামলেই প্রতিটি বাড়ির উঠোনে প্রদীপ জ্বলে উঠত। বিদ্যুতের ঝলমলে আলোয় সেই দৃশ্য আজ হারিয়ে গেছে। শুধু গ্রামের শেষ প্রান্তের ছোট্ট কুঁড়েঘরটিতে প্রতিদিন একটি প্রদীপ জ্বালাতেন বৃদ্ধ শিক্ষক আবদুল করিম।

গ্রামের ছেলেমেয়েরা তাঁকে ভীষণ ভালোবাসত। কিন্তু খুব কম মানুষই জানত, কেন তিনি প্রতিদিন সেই প্রদীপ জ্বালান। কেউ বলত, এটি তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। কেউ মনে করত, মৃত স্ত্রীর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব প্রয়াস। অথচ সত্যিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রায় ত্রিশ বছর আগে এক বর্ষার ঝড়ো রাতে চারদিকে ঘন অন্ধকার। বিদ্যুৎ ছিল না। পথ হারিয়ে এক কিশোর তাঁর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। জানালায় জ্বলতে থাকা প্রদীপের আলো দেখে সে আশ্রয়ের সন্ধান পায়। সেই রাতের আতিথ্য আর স্নেহ তার জীবন বদলে দেয়। পরবর্তীকালে সেই ছেলেটিই পড়াশোনা করে একজন চিকিৎসক হয়। বিদায়ের সময় সে বলেছিল,

— “স্যার, আপনার প্রদীপ শুধু আমার পথ নয়, আমার জীবনও আলোকিত করেছে।”

সেই দিন থেকেই আবদুল করিম বিশ্বাস করেছিলেন—অন্ধকারে কে, কখন, কোন আলোর অপেক্ষায় থাকে, তা কেউ জানে না। তাই তিনি আর কোনো দিন প্রদীপ জ্বালানো বন্ধ করেননি।

সময়ের সঙ্গে তাঁর বয়স বেড়েছে। হাঁটার শক্তি কমেছে, হাত কাঁপতে শুরু করেছে। তবু সন্ধ্যা নামলেই তিনি যত্ন করে সলতে ঠিক করতেন, তারপর প্রদীপে আগুন ধরাতেন। গ্রামের অনেকে অবাক হয়ে বলত,

— “এখন তো বিদ্যুৎ আছে, মোবাইলের টর্চ আছে। এই প্রদীপের আর কী প্রয়োজন?”

তিনি শুধু মৃদু হেসে উত্তর দিতেন,

— “যে আলো মানুষকে পথ দেখায়, তার কখনো পুরোনো হয় না।”

এক শীতের সকালে খবর ছড়িয়ে পড়ল—আবদুল করিম আর নেই। গ্রামের মানুষ ছুটে এল তাঁর বাড়িতে। ঘরের এক কোণে প্রদীপটি নিভে ছিল। তার পাশেই ভাঁজ করা একটি চিঠি।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“আমার মৃত্যুর পরও যদি এই প্রদীপ জ্বলে, তবে বুঝব আলোকে আমি নয়, তোমরাই বাঁচিয়ে রেখেছ।”

পরদিন সন্ধ্যায় চন্দ্রপুর এক অভাবনীয় দৃশ্যের সাক্ষী হলো। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠোনে একটি করে প্রদীপ জ্বলে উঠল। কেউ কাউকে বলেনি, কেউ কাউকে বাধ্যও করেনি। প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছায় একটি করে আলো জ্বালিয়েছিল।

সেই দিন থেকেই চন্দ্রপুরে জন্ম নিল এক নতুন প্রথা। প্রতি বছর ওই একই দিনে গ্রামের মানুষ একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্তত একজন মানুষের উপকার করার অঙ্গীকার করে। কেউ দরিদ্র শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেয়, কেউ অসুস্থের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, কেউ বৃক্ষরোপণ করে, আবার কেউ নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের পাশে গিয়ে বসে।

ধীরে ধীরে মানুষ উপলব্ধি করল—আলো শুধু আগুনের শিখায় নয়; আলো বাস করে মানুষের কর্মে, ভালোবাসায় এবং দায়িত্ববোধে। একটি ছোট প্রদীপ যেমন গভীর অন্ধকার ভেদ করতে পারে, তেমনি একটি সৎ কাজও অসংখ্য হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে দিতে পারে।

আজ আবদুল করিমের প্রদীপ আর শুধু একটি প্রদীপ নয়; সেটি একটি বিশ্বাসের প্রতীক। এমন এক বিশ্বাস, যা শেখায়—পৃথিবী বদলাতে সব সময় বড় শক্তির প্রয়োজন হয় না। একটি ছোট আলোও যথেষ্ট, যদি তা নিঃস্বার্থ হৃদয় থেকে জ্বলে ওঠে।



No comments:

Post a Comment