![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
বিসর্জন
সৌরভ ঘোষ
১
ঢাকেরও প্রাণ আছে—এ কথা নিতাই ঢাকি বিশ্বাস করত। বছরে একবার, আশ্বিনের ভোরে, কলকাতার উদ্দেশে বেরোনোর আগে সে ঢাকটার গায়ে সরষের তেল মাখিয়ে দু'হাত জোড় করে বলত, চল রে সাথি, আর একবার হামাগো মুখ রক্ষা কর। তুই বাজলি, হামার ছেলেপিলের মুখে দু'মুঠো ভাত জুটবেক।
এ কথা শুনে পারুল হেসে বলত, মানুষরে যত না ভালোবাসো, ঢাকডারে তার চাইতেও বেশি ভালোবাসো!
নিতাই তখন হেসে উত্তর দিত, মানুষের মন ফেরে। ঢাকের মন ফেরে না।
এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। আশ্বিনের ভোর, পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের হরিপুর গ্রাম তখনও পুরোপুরি জাগেনি। কুয়াশা ভেজা বাতাসে শিউলির গন্ধ। দূরের বাঁশবাগান থেকে ভেসে আসছে শালিকের ডাক। গ্রামের পুকুরে দু-একজন বয়স্ক মানুষ স্নান করতে নেমেছে। উঠোনে জড়ো করে রাখা ধানের ওপর শিশির জমেছে। নিতাই ঢাকি নিজের উঠোনে বসে ঢাকটার চামড়া টানটান করছে। এই ঢাক তার ঠাকুরদার। তিন পুরুষের ঘাম, অভাব আর শিল্প মিশে আছে এর শরীরে। হঠাৎ পিছন থেকে ছোট্ট দুটো হাত এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। বাবা...
এই শ্রাবণে পিয়ার দশ বছর হল। মেয়েটার চোখে ঘুম তখনও ছাড়েনি। এলোমেলো চুল। পরনে ফিকে হয়ে যাওয়া নীল ফ্রক। বগলের কাছে সেলাই খুলে যাওয়ায় আবার পারুল সুচ-সুতো দিয়ে জুড়ে দিয়েছে। নিতাই মেয়েকে কোলে তুলে, মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ঘুম ভাঙল?
পিয়া মাথা নেড়ে, খুব আস্তে বলল, আজ যাইবা?
— হ্যাঁ রে মা।
— দশমীর আগে ফিরবা না?
— না। মা দুর্গারে বিদায় কইরা তবেই ফিরব।
পিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, বাবা... এ বছর একটা লাল জামা আনবা? ইস্কুলে পূজার পরে সবাই নতুন জামা পইরা আসে। মু প্রতিবার এইডাই পরি।
নিতাইয়ের বুকের ভেতরটা কেমন হু-হু করে উঠল। গত বছর ফিরে এসে বলেছিল, টাকা কম পড়ে গেল রে মা। এবার চৌধুরী বাড়ির পুজোর বায়না বড়। বকশিশও হয়তো ভালো হবে। সে মেয়ের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, শুধু লাল জামা না, চুলের ফিতে, কাচের চুড়ি—সব আনব। হামার পিয়াডা পূজার পর গেরামের সবথেইক্যা সুন্দর মাইয়া হইয়া ঘুরব।
পিয়ার মুখটা আনন্দে ঝলমল করে উঠল। ঠিক তখনই ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল পল্টু। সাত বছরের ছেলেটার গায়ে বাবার পুরোনো গেঞ্জি কেটে বানানো জামা। সে চিৎকার করে বলল, আর হামার?
নিতাই হেসে বলল, তোর কেডা?
— বল!
— বলও হবেক।
— সত্যি?
— মা দুর্গার কিরা।
পল্টু খুশিতে লাফিয়ে উঠল। রান্নাঘরের দরজায় হেলান দিয়ে সব দেখছিল পারুল। তার মুখে হাসি থাকলেও চোখের কোণে একটা অজানা আশঙ্কা। সে বলল, এসো, আগে খাইয়া লও। সকালের ট্রেন মিস হইলে আর উপায় নাই।
সকালের খাবার—গরম ভাত, আলু সেদ্ধ, নুন, কাঁচালঙ্কা আর পেঁয়াজ। নিতাই খেতে বসে হঠাৎ বলল, পারুল, ফিরতি বেলায় যদি কিছু টাকা বাঁচে, পিয়াডারে ডাক্তারের কাছে নিয়া যাইও। ক'দিন ধইরা কাশতেছে।
পারুল মাথা নাড়ল। কিন্তু দু'জনেই জানত, সেই "যদি" শব্দটার ওপরই তাদের সংসার দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই উঠোনের বাইরে থেকে গদাধরের গলা ভেসে এল—ওই নিতাই! হামরা আইয়া গেছি রে। ট্রেন কিন্তু কারও লাইগ্যা দাঁড়াইব না! নিতাইয়েরও খাওয়া তখন শেষ। হাত- মুখ ধুয়ে সে তার ঢাকটা কাঁধে তুলে নিল। বেরোনোর আগে একবার ঘরের দিকে তাকাল। দরজার চৌকাঠে একরাশ স্বপ্ন চোখে নিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে পিয়া আর পল্টু।
২
হরিপুর স্টেশন বলতে একচিলতে প্ল্যাটফর্ম, একটা টিনের ছাউনি আর সকালের চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসা ধোঁয়া। আশ্বিনের এই সময়টায় অবশ্য দৃশ্যটা একটু অন্যরকম। চারপাশে শুধু ঢাকি। কারও কাঁধে নতুন ঢাক, কারও কাঁধে বহু বছরের পুরোনো সঙ্গী। কেউ চামড়া রোদে সেঁক নিচ্ছে, কেউ আবার কাঠির মাথায় কাপড় জড়িয়ে নিচ্ছে। নিতাইদের দেখে চায়ের দোকানি মহাদেব হেসে বলল, কী রে, আবার কলকাতা কাঁপাইতে চললি?
মধু হেসে উত্তর দিল, কলকাতা কাঁপাব কেডা? হামরা তো পেট কাঁপাইতে যাই।
হাসির রোল উঠল। গদাধর গম্ভীর গলায় বলল, এই হাসিটুকুই সঙ্গে কইরা নে রে।
ঠিক তখনই হুইসেল দিয়ে লোকাল ট্রেনটা ঢুকল। ট্রেনে উঠেই চারজন জানলার ধারের একটা লম্বা সিট দখল করল। ঢাকগুলো সাবধানে মাথার ওপর তুলে রাখল। ঢাকের চামড়ায় যেন কোথাও আঁচড় না লাগে—ওগুলো শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, সংসারের অন্নদাতা। ট্রেন ছাড়তেই মধু জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, দ্যাখ, কাশফুলডা কেমন দুলতেছে! মনে হচ্ছে মা নিজেই আইতেছেন।
গদাধর হেসে বলল, মা আসেন ঠিকই, কিন্তু গরিবের ঘরে আসতে আসতে বোধহয় পথ ভুলে যান।
নিতাই প্রতিবাদ করল। ওরকম কইস না দাদা। মা সবার। শুধু কপাল সবার একরকম না।
রতন এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। হঠাৎ বলল, মু ভাবছি, এ বছর টাকা পাইলে বউডারে একদিন কলকাতা ঘুরাইতে আনব।
সকলেই হেসে উঠল, হাসির মাঝেই নিতাইয়ের চোখ চলে গেল জানলার বাইরে। ধানক্ষেত, পুকুর, কাশবন সব পিছিয়ে যাচ্ছে। মনে হল, পিয়া নিশ্চযই এখনও চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো এখনও রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে অজান্তেই ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেখল—পারুল মুড়ি আর নারকেল নাড়ু বেঁধে দিয়েছে। মনে মনে হাসল নিতাই।
হাওড়া স্টেশনে নেমে প্রতি বছরের মতোই চারজনের বুকটা ধক করে উঠল। এই শহরকে কোনোদিন আপন মনে হয় না। তবু এই শহরই বছরে পাঁচদিন তাদের দু'মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করে। প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই তারা দেখল, মানুষের ঢল। কোথাও একদল বিদেশি ক্যামেরা হাতে, কোথাও নতুন শাড়ি পরে ছবি তুলছে এক পরিবার, কোথাও আবার কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি।
রতন বিস্ময়ে বলল, এত মানুষ! গেরামের মানুষ সব মিলাইলেও এত হবেক?
মধু হেসে বলল, এই শহর ঘুমায় না রে।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে তারা হাতিবাগানের বাস ধরল, তারা যাবে চৌধুরী বাড়িতে। বাস থেকে নেমে কিছুক্ষণ হেঁটে তার চৌধুরী বাড়ির সামনে এসে পৌঁছল। গেটের সামনে গিয়েই চারজন থমকে দাঁড়াল। এ যেন বাড়ি নয়, ইতিহাস। বিরাট লোহার ফটক। দু'পাশে সিংহের মূর্তি। ভিতরে ঢুকতেই লাল রঙের দীর্ঘ উঠোন। চারদিকে ঘোরানো বারান্দা। সামনে বিশাল ঠাকুরদালান। কারিগররা শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা করছেন। কোথাও ফুল গাঁথা হচ্ছে, কোথাও আলোর মালা টাঙানো হচ্ছে।
রতন ফিসফিস করে বলল, এইডা কি মানুষর বাড়ি?
গদাধর মুচকি হেসে উত্তর দিল, আগে জমিদার ছিল। এখন টাকাওয়ালা। বাড়ির চেহারা বদলায় নাই।
ঠিক তখনই একজন ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, চুলে পাক ধরেছে, চোখেমুখে অদ্ভুত মমতা। বললেন, তোমরাই কি বর্ধমান থেকে আসছ?
গদাধর হাত জোড় করে বলল, আজ্ঞে, বাবু।
ভদ্রলোক হেসে বললেন, আমি অরিন্দম চৌধুরী। প্রতি বছর তোমাদের গ্রামের ঢাকিরাই আসে। আমার বাবা বলতেন, বর্ধমানের ঢাকের তালে অন্য রকম প্রাণ আছে। তিনি একে একে সবার নাম জেনে নিলেন। নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার বয়স কত?
— চল্লিশের কাছাকাছি হবেক বাবু।
— বাজাচ্ছ কত বছর?
— হাতে কাঠি ধরছি আট বছর বয়সে।
অরিন্দমবাবু কিছুক্ষণ নিতাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ঢাক বাজানো শুধু পেশা নয়, শিল্প। তোমরা প্রত্যেকে এক একজন শিল্পী। এই বাড়িতে তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না।
কথাটা শুনে চারজনই একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। "শিল্পী"—এই শব্দটা তারা খুব কম শুনেছে। সাধারণত সবাই বলে—ওই যে ঢাকি এসেছে। আজ প্রথম কেউ তাদের নামের আগে সম্মানের পরিচয় দিল। পিছন থেকে বাড়ির বয়স্ক গিন্নি এসে বললেন, ওদের আগে জলখাবার দাও। এত দূর থেকে এসেছে। তারপর ঘর দেখিয়ে দিও।
মধু নিচু গলায় নিতাইকে বলল, দ্যাখলি? সব বড়লোক একরকম হয় না।
নিতাই শুধু মাথা নাড়ল। তার মনে পড়ল পারুলের কথা— মানুষ চিনতে ভুল করো না।
ঘর দেখিয়ে দেওয়া হল। পরিষ্কার বিছানা, মাথার ওপর পাখা, বাইরেই জলের কল। জানলা খুললেই ঠাকুরদালান দেখা যায়। রতন খাটে বসে বলল, হামাগো ভাগ্যি খুইল্যা গেল রে!
গদাধর হেসে বলল, ভাগ্য খুলছে কিনা জানি না। তবে এবার বাজনা এমন হইব, যেন এই বাড়ির মানুষ বছর বছর হামাগো ডাকে।
ঠিক তখনই ঠাকুরদালান থেকে শঙ্খ বাজল। ষষ্ঠীর বোধন শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। নিতাই ধীরে ধীরে ঢাকটা কোলে তুলে নিল। আঙুল দিয়ে চামড়ায় আলতো চাপ দিল। মৃদু এক শব্দ উঠল। সে যেন নিজের মনেই বলল, চল সাথি... এবার এমন বাজাবি, যেন মা নিজেই শুনেন।
৩
ষষ্ঠীর সন্ধে এল। ঠাকুরদালানের সামনে তখন পা ফেলার জায়গা নেই। চৌধুরী বাড়ির প্রায় দেড়শো বছরের দুর্গাপুজো। চারদিকে আলোর মালা, শঙ্খধ্বনি, ধূপের ধোঁয়া, ফুলের গন্ধ। পুরোহিত মন্ত্র পড়ছেন। সেই মন্ত্রের ফাঁক দিয়ে যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে ঢাকের প্রাণ।
গদাধর ঢাকের ফিতে কোমরে শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে বলল, মনে রাখিস, প্রথম তালেই বিচার হয়। প্রথম আঘাতেই মানুষ বুঝে যায় ঢাকি কতখানি।
নিতাই মাথা নাড়ল। মধু দু'হাতের তালুতে একটু সরষের তেল মাখল। তারপর কাঠি দুটো হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করল। রতন কপালে হাত ঠেকিয়ে দেবীর দিকে তাকিয়ে প্রণাম করল। পুরোহিত দূর থেকে হাত তুলে ইশারা করলেন।
গদাধর ফিসফিস করে বলল, জয় মা।
চারজন একসঙ্গে কাঠি তুলল। বেজে উঠল ঢাক, প্রথম আঘাতেই যেন বিশাল ঠাকুরদালানের বাতাস কেঁপে উঠল। ঢাকের সাথে কাঁসর মিলিল, শঙ্খ মিলল, ঘণ্টা মিলল। ঠাকুরদালানে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল, এ বছর ঢাকিগুলো অসাধারণ।
অরিন্দম চৌধুরী বারান্দায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছিলেন। পাশে দাঁড়ানো তাঁর মা আস্তে আস্তে বললেন, তোর বাবা থাকলে আজ খুব খুশি হতেন। অরিন্দম মাথা নেড়ে বললেন, এরা শুধু বাজাচ্ছে না মা... এরা যেন মাকে ডাকছে।
পরদিন সকালেই কলাবউ স্নান। ভোরের আলো ফোটার আগেই চারজন ঢাকি উঠে পড়ল।
মধু হাই তুলতে তুলতে বলল, বড়লোকদের ঘুমও বুঝি আলাদা হয়?
গদাধর হেসে বলল, ঘুম সবার এক। চিন্তা আলাদা।
নিতাই কিছু বলল না। সে ঢাকের দড়িটা আবার শক্ত করে বেঁধে নিল।
সপ্তমী, অষ্টমী—দু'দিন যেন চোখের পলকে কেটে গেল। প্রতিদিনই কিছু না কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাতে অতিথিদের ভিড়। চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি কোণে যেন উৎসবের ঢেউ। কলকাতার নামকরা মানুষজন আসছেন। বিদেশ থেকে আসা আত্মীয়রা ছবি তুলছেন। বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন জামা পরে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। কেউ লাল পাঞ্জাবি, কেউ নীল ফ্রক, কেউ সোনালি লেহেঙ্গা। নিতাই বাজাতে বাজাতে বারবার পিয়ার মুখটা মনে করতে লাগল। লাল জামা পরলে ওকেও নিশ্চয়ই এমনই সুন্দর লাগবে।
নবমীর দুপুরে ভোজের আয়োজন দেখে রতনের চোখ কপালে উঠল। দীর্ঘ সারি টেবিল, রুপোর ডেকচি, সুগন্ধে ভরে গেছে চারদিক। বিরিয়ানি, মাটন চাপ, ছানার কোপ্তা, রাবড়ি, রাজভোগ, আইসক্রিম। এত খাবার চারজন কোনোদিন একসঙ্গে দেখেনি। আগেও অনেক মণ্ডপে ঢাক বাজিয়েছে কোথাও পায়নি এমন যত্ন। তাদের জন্যও আলাদা করে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অরিন্দমবাবু নিজে এসে বললেন, তোমরা আগে খেয়ে নাও। বিকেলে আবার বাজাতে হবে।
মধু হাত জোড় করে বলল, বাবু, হামাগো এত যত্ন কেউ করে না।
অরিন্দমবাবু মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, তোমরা না থাকলে আমাদের পুজোই অসম্পূর্ণ।
খাওয়া শেষ করে তারা উঠোনের এক কোণে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। নিতাই লক্ষ্য করল সামনের লনে কয়েকজন বাচ্চা খেতে বসেছে। একটি মেয়ে—বয়স পিয়ার সমান—দু'চামচ বিরিয়ানি খেয়ে মুখ কুঁচকে বলল, না, এটা ভালো লাগছে না। সে প্লেটটা ডাস্টবিনে ফেলে দিল। আরেকজন আধখাওয়া আইসক্রিম মাটিতে ফেলে দিয়ে নতুন একটা নিয়ে নিল। একটি ছেলে ঠান্ডা পানীয়ের বোতল অর্ধেক খেয়ে ডাস্টবিনে ছুড়ে দিল। নিতাই স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তার চোখে ফুটে উঠল নিজের উঠোন। পিয়া একদিন পারুলকে বলছিল— মা, বিরিয়ানি কেমন খেতে? পারুল উত্তর দিতে পারেনি। কারণ সেও কোনোদিন বিরিয়ানি খায়নি। নিতাইয়ের বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
গদাধরও সব দেখছিল। সে ধীরে ধীরে বলল, খাবারের দাম যারা জানে না, তাদের কাছে খাবারও খেলনা।
মধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ভগবান সবারে সমান কইরা পাঠায় না দাদা।
নিতাই চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। তার আর বসে থাকতে ভালো লাগছিল না। সে ঠাকুরদালানের দিকে এগিয়ে গেল। দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে শুধু একটাই কথা বলল— মা, হামার পিয়াডারে শুধু একটা ভালো জীবন দিও। বেশি কিচ্ছু চাই না।
নবমীর রাত। চৌধুরী বাড়ির ঠাকুরদালানে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। ধুনুচির ধোঁয়া আর আলোর মায়ায় পুরো বাড়িটাই যেন অন্য এক জগৎ। বাইরে ঢাকের তালে তালে পা ফেলছে মানুষ, ভেতরে দেবীর মুখে হ্যালোজেনের আলো যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। গদাধর একবার চারদিকে তাকিয়ে বলল, ভাইসব, আজ বুক খুলে বাজা। পরের এক বছর এই তালের জন্যই এরা অপেক্ষা করবে।
চারজন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। তারপর আবার শুরু হল বাজনা। নিতাইয়ের কাঠির আঘাতে কখনও আগমনী, কখনও যুদ্ধ, কখনও বিদায়ের সুর। ঠাকুরদালানে উপস্থিত বহু মানুষের শরীর কেঁপে উঠল সেই তালে। ঢাক শেষ হতেই হাততালির ঢেউ উঠল। কেউ কেউ এগিয়ে এসে নিতাইদের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইল। রতন লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মধু ফিসফিস করে বলল, দ্যাখ, হামাগো লগেও ছবি তোলে!
গদাধর হেসে উত্তর দিল, ছবি তুলবেক, নাম জিগাইব না। শিল্পীর নাম মানুষ কমই মনে রাখে রে।
নিতাই কিছু বলল না। তার চোখ পড়েছিল দেবীর মুখে। কেন জানি না, মনে হচ্ছিল দেবীর চোখ দুটো আজ খুব বিষণ্ন।
দেখতে দেখতে দশমীর সকাল এসেই গেল। বাড়ির মেয়েরা সিঁদুর খেলায় মেতেছে। লালপাড় সাদা শাড়িতে যেন একেকজন জীবন্ত আলপনা। উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে আকাশ ভরে যাচ্ছে। নিতাইদের ঢাকও থামল না। বিদায়ের তাল সবসময় একটু অন্যরকম। যত বাজে, তত বুক ভারী হয়ে আসে। দালান থেকে প্রতিমা নামানো হল। বিসর্জনের শোভাযাত্রা বেরোল। সামনে চারজন ঢাকি, তারপর দেবী, তারপর শ-খানেক মানুষ। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে অজস্র মানুষ মোবাইলে ভিডিও করছে। একটি ছোট ছেলে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, বাবা, এই ঢাকিগুলো কোথা থেকে এসেছে? লোকটি বলল, বর্ধমানের ঢাকি। এদের হাতেই পুজোর প্রাণ।
একথা শুনে নিতাইয়ের বুকটা গর্বে ভরে উঠল। গরিব মানুষকে সম্মান খুব কম মানুষই দেয়। সেই সম্মানের স্বাদ অদ্ভুত মিষ্টি। প্রতিমা বিসর্জন শেষ হতে হতে সন্ধে হল। চারজন ক্লান্ত শরীরে ফিরে এল চৌধুরী বাড়িতে। তারা স্নান সেরে উঠতেই অরিন্দম চৌধুরী তাদের ডাকলেন ঠাকুরদালানের পাশের বড় ঘরে। অরিন্দমবাবু একে একে চারজনের হাতে মোটা খাম তুলে দিলেন। বললেন, এটা তোমাদের পারিশ্রমিক। বাড়ির গিন্নি চারটি ধুতি, চারটি গামছা আর চারটি শাড়ির প্যাকেট এগিয়ে দিলেন। তারপর হাসিমুখে বললেন, তোমাদের বউদের জন্য। রতনের চোখ ভিজে এল। মধু মাথা নত করে প্রণাম করল।
গদাধর বলল, মা দুগগা আপনাগো সুখে রাখুন।
নিতাই বলল, বাবু... হামাগো মতো মানুষরে এত সম্মান কেউ দেয় না।
অরিন্দমবাবু তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, সম্মান তোমাদের প্রাপ্য। তোমরা শিল্পী, ভিক্ষুক নও। এটা কোনো দয়া নয়।
৪
পরদিন সকালেই বাড়ি ফেরার তাগিদে তারা চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। বাস ধরার আগে চারজন হাতিবাগান বাজার ঘুরবে মনস্থির করল। মধু প্রথমেই ছেলের জন্য একটি স্কুলব্যাগ কিনল। রতন বউয়ের জন্য একটা লালপাড় শাড়ি কিনল, সেটা বারবার খুলে দেখতে লাগল। গদাধর অনেক হিসেব করে মহাজনের ধার শোধ করার মতো টাকা আলাদা করে রাখল। নিতাই একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। দোকানের কাঁচের ভেতরে ঝুলছে ছোট ছোট ফ্রক। হলুদ, সবুজ, নীল। তার চোখ আটকে গেল একটা লাল ফ্রকে। সাদা ছোট ছোট ফুল ছাপা। দোকানদার নামিয়ে দিতেই নিতাই দু'হাতে জামাটা মেলে ধরল। মনে হল, যেন পিয়াই সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, দাদা, দশ বছরের মাইয়ার গায়ে হবেক? দোকানদার বলল, একদম হবে। নিতাই জামাটা বুকের কাছে টেনে ধরল। তারপর যথাযথ দাম দিয়ে কিনে নিল। পল্টুর জন্য একটা ফুটবলও নিল। পারুলের জন্য নিল নীলপাড় সুতির শাড়ি। আর নিল এক বাক্স নলেন গুড়ের সন্দেশ, পিয়ার জন্য লাল কাচের চুড়ি।
মধু হেসে বলল, এইবার তোর পিয়াডা খুশিতে পাগল হইয়া যাইব।
সকলের সাথে নিতাইও হেসে উঠল। বলল, হ, ঘরে ঢুকতেই দৌড়াইয়া আইসা গলা জড়াইব। তারপর কইব—বাবা, জামাডা পরাইয়া দাও।
চারজনের মুখেই তখন বাড়ি ফেরার আনন্দ। স্টেশনের পথে হাঁটতে হাঁটতে তারা হিসেব করছিল— কার বাড়িতে কী রান্না হবে। কে প্রথমে বউকে উপহার দেবে। কার ছেলে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে। শুধু ভাগ্য নীরবে নিজের হিসেব কষছিল। মানুষের সব আনন্দের পাশে সে কখন, কোথায়, কী লিখে রাখে—তা কেউ জানে না। ফেরার ট্রেনটা ছাড়ল দুপুর গড়িয়ে। জানলার বাইরে কলকাতা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। উঁচু দালান, ফ্লাইওভার, মানুষের ভিড়—সব ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ল। সামনে এগিয়ে এল কাশফুলে ঢাকা মাঠ, সবুজ ধানখেত, ছোট ছোট নদী। মধু গামছার গিট খুলে টাকা গুনতে গুনতে বলল, এইবার বউডারে কইব, আর কাঁদিস না। দু'মাসের চাল হইয়া যাবেক।
রতন শাড়িটার প্যাকেট বারবার বের করে বলতে লাগল, দেখ গদাধরদা, রঙডা কেমন? ওর খুব পছন্দ হইবেক, না?
গদাধর হেসে বলল, যে মানুষ ভালোবাসে, তার দেওয়া পুরোনো কাপড়ও নতুন লাগে।
নিতাই নিজের ব্যাগ খুলে লাল জামাটা বের করে দেখতে লাগল। জানলার আলো এসে পড়েছে জামাটার ওপর। সে আলতো করে জামাটার ভাঁজ ঠিক করে আবার ব্যাগে রেখে দিল। মনে মনে বলল, পিয়া, আর ক'ঘণ্টা। তারপর তোর গায়ে নিজের হাতে পরাইয়া দিমু।
বিকেলের দিকে তারা হরিপুর স্টেশনে নামল। নেমেই নিতাইয়ের মনে হল, আজ যেন সবকিছু আলাদা। পুজোর পরদিন স্টেশনটা সাধারণত খুব সরগরম থাকে। ঢাকিরা ফিরলে গ্রামের লোকজন হাসিমুখে গল্প করে। আজ সবাই চুপ। চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ানো লোকগুলো নিতাইকে দেখে চোখ সরিয়ে নিল।
গদাধর ধীরে বলল, কী হইছে রে?
কেউ উত্তর দিল না। ঠিক তখনই গ্রামের স্কুলশিক্ষক অজিতবাবু দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে নিতাইয়ের দিকে এগিয়ে এলেন। মুখটা ফ্যাকাশে। নিতাই হেসে বলল, মাস্টারমশাই, এত গম্ভীর ক্যান? পুজো ভালো কাটল তো?
অজিতবাবু ঠোঁট নাড়লেন, কিন্তু কথা বেরোল না। শেষ পর্যন্ত শুধু বললেন, নিতাই... তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি যা।
নিতাই জিজ্ঞেস করল, ক্যান? পারুল অসুস্থ?
তিনি মাথা নিচু করে রইলেন। চারজন ঢাকি দ্রুত হাঁটতে লাগল। যত বাড়ির কাছে এগোচ্ছে, ততই নিতাইয়ের বুক জোরে জোরে ধড়ফড় করছে। দূর থেকেই দেখা গেল, তাদের উঠোনের সামনে অনেক লোক। দু'জন পুলিশ দাঁড়িয়ে। কয়েকজন মহিলা পারুলকে ধরে রেখেছে। পারুলের বুকফাটা কান্না বাতাস ছিড়ে আসছে। নিতাই দৌড়ে উঠোনে ঢুকল। উঠোনের মাঝখানে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা ছোট্ট দেহ। তার পা কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে কাপড়টা সরাতেই পৃথিবীটা যেন থেমে গেল। পিয়া! মুখটা শান্ত। যেন ঘুমিয়ে আছে। নিতাই পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল।
পেছন থেকে অজিতবাবুর ভাঙা গলায় বললেন, কাল সন্ধ্যায় বিসর্জন থেকে ফিরছিল। গ্রামের বাইরে বাঁশবাগানের কাছে... কিছু দুষ্কৃতী... বাকিটা বলতে গিয়ে তার জিভ জড়িয়ে গেল।
নিতাই ধীরে ধীরে নিজের ব্যাগ খুলল। সাবধানে লাল জামাটা বের করল। মেয়ের বুকের ওপর আলতো করে রেখে দিল। তার পাশে রাখল লাল কাচের চুড়ি। এরপর নিতাই পিয়ার শরীরে লাল জামাটা বিছিয়ে মাপ নিল, হেসে বলল, একেবারে ঠিক মাপের, পারুল দেখ।
পারুল আর্তনাদ করে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, এই জামাডার লাইগ্যা কতদিন ধইরা অপেক্ষা করত রে!
গদাধর মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মধু কাঁদতে কাঁদতে বলল, ভগবানও এমন বিচার করেন?
সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরে গভীর রাতে নিতাই একা উঠোনে বসে ছিল। তার সামনে ঢাকটা রাখা। আকাশে তখন মেঘ সরে গিয়ে একফালি চাঁদ উঠেছে। সে ধীরে ধীরে ঢাকের গায়ে হাত রাখল। এই ঢাকের তালে চারদিন ধরে মানুষ নেচেছে, ধুনুচি জ্বলেছে, উলুধ্বনি উঠেছে। আনন্দে ভরে উঠেছিল কত শত মানুষের মন। আর সেই সময়েই তার নিজের মেয়েটা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল। নিতাই অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে কাঠি দুটো তুলে নিল। তারপর আবার নামিয়ে রাখল। খুব আস্তে বলল, মা দুগগা, হামার ঢাকের তাল যদি মানুষের আনন্দ বাড়ায়, তাইলে একটা কথা রাখো... আর কুনো বাপ যেন ফিরা আইসা তার মাইয়ার লাইগ্যা কেনা নতুন জামা লাশের গায়ে পরাইতে না হয়।
দূরে কোথাও অন্য কোনো গ্রাম থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে এল। সেখানে হয়ত এখনও বিসর্জন হয়নি।



No comments:
Post a Comment