1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label অরিন্দম ব্যানার্জ্জী. Show all posts
Showing posts with label অরিন্দম ব্যানার্জ্জী. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

যে কণ্ঠ বাজেনি

ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

যে কণ্ঠ বাজেনি 

অরিন্দম ব্যানার্জ্জী

মহালয়ার ভোরে প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটল না—বাজল।

মাত্র সাত সেকেন্ডের একটি শব্দ। অথচ মণ্ডপের বাঁশের কাঠামোর নীচে ঘুমিয়ে থাকা তিনটি কুকুর একসঙ্গে উঠে চিৎকার করতে করতে রাস্তার দিকে ছুটে গেল। পাশের বহুতলের কয়েকটি জানলায় আলো জ্বলে উঠল। একজন নিরাপত্তারক্ষী দূর থেকে গালাগাল দিলেন।

ঈশানী সেন হেডফোন খুলে ফেলল।

সামনের অন্ধকারে ভাঙা একটি বাড়ির অবয়ব। পোড়া জানলা, বেঁকে যাওয়া লোহার শিক, অর্ধেক মাটিতে ঢুকে থাকা শিশুর লাল জুতো—সবই থার্মোকল, প্লাস্টার আর রঙের তৈরি। তবু ভোরের আবছা আলোয় ধ্বংসস্তূপটিকে সত্যি মনে হচ্ছিল।

ঠিক তখনই পাশের বাড়ির রেডিয়ো থেকে ভেসে এল চণ্ডীপাঠ।

একদিকে অসুরবিনাশিনীকে আহ্বান, অন্যদিকে মানুষের তৈরি পৃথিবী ধ্বংসের শব্দ। দুটি শব্দই ঘুম ভাঙায়; একটি মানুষকে দরজা খুলতে শেখায়, অন্যটি দরজা বন্ধ করতে।

কন্ট্রোল ডেস্কের পাশে দাঁড়ানো দিব্যেন্দু দত্ত সন্তুষ্ট গলায় বললেন,

—এই তো! বুকের ভিতরটা কেঁপে গেল। আর একটু গভীর বেস দেওয়া যায়?

ঈশানী উত্তর দিল না। ল্যাপটপের পর্দায় শব্দটির তরঙ্গরেখা ছোট করে আনল।

দিব্যেন্দু এই পূজা কমিটির সম্পাদক। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, গলায় সর্বক্ষণ ক্লান্ত অথচ উৎসাহী স্বর। গত তিন মাস ধরে তাঁর ঘুম নেই বললেই চলে। থিমের নাম—“তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ: শেষ উৎসবের আগে”।

মণ্ডপে ঢুকলে দর্শক প্রথমে দেখবে যুদ্ধের আগের শহর—রেস্তোরাঁ, স্কুলবাস, শিশুর খেলনা। তারপর সাইরেন বাজবে, আলো নিভবে, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্য বদলে যাবে। শেষ প্রান্তে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবেন দশভুজা। তাঁর হাতে অস্ত্র থাকলেও মুখে থাকবে বিষণ্ণতা।

দিব্যেন্দু বলেছিলেন, “যুদ্ধবিরোধী বার্তা।” স্পনসরের প্রতিনিধি বলেছিলেন, “এই বছরের সবচেয়ে ভাইরাল থিম।” শিল্পী বলেছিলেন, “মানুষ ধাক্কা খাবে।” প্রত্যেকেই একই মণ্ডপ নিয়ে কথা বলেছিলেন, কিন্তু যেন আলাদা আলাদা জিনিস দেখেছিলেন।

ঈশানীর দায়িত্ব ছিল সেই ধাক্কার শব্দ তৈরি করা।

সে পেশায় সাউন্ড ডিজাইনার। বিজ্ঞাপন, তথ্যচিত্র, ছোট ছবি—যেখানে শব্দের প্রয়োজন হয়, সেখানেই তার ডাক পড়ে। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত কাজটাকে সে শিল্প ভাবত। এখন শিল্পের সঙ্গে হাসপাতালের বিল, বাড়িভাড়া এবং ব্যাঙ্কের বার্তারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

তার মায়ের হৃদ্‌যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের জন্য অগ্রিম টাকা জমা দিতে হবে লক্ষ্মীপুজোর আগেই। এই মণ্ডপের কাজ শেষ হলে যে পারিশ্রমিক পাবে, তার বড় অংশ সেই খাতে যাবে।

কাজটি তাই শুধু ভালো লাগা কিংবা খারাপ লাগার বিষয় নয়।

দিব্যেন্দু আবার বললেন,

—বিস্ফোরণটা ভালো হয়েছে। তবে মানুষের কণ্ঠগুলো আরও স্পষ্ট চাই। যুদ্ধ মানে শুধু বোমা নয়, মানুষও তো।

ঈশানী তাঁর দিকে তাকাল। কথাটির মধ্যে ভুল কিছু ছিল না। তবু কোথায় যেন একটা অস্পষ্ট অস্বস্তি থেকে গেল।


কমিটি একটি বিদেশি অনলাইন সংস্থা থেকে ‘ওয়ার রিয়ালিটি প্যাক’ কিনেছিল। কয়েক হাজার শব্দের সংগ্রহ—সাইরেন, গুলির আওয়াজ, ট্যাঙ্ক, ভাঙা কাচ, আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যাওয়া মানুষের পায়ের শব্দ, হাসপাতালের করিডর, দূর থেকে ভেসে আসা কান্না।

ফোল্ডারের শেষে ছিল মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা বারোটি ব্যক্তিগত বার্তা।

কোনোটিতে এক শিশু বাবাকে ডাকছে। কোনোটিতে একজন বৃদ্ধা বলছেন, তাঁর ওষুধ ফুরিয়ে এসেছে। একটি রেকর্ডে কেবল হাঁপানোর শব্দ। আর একটি বার্তায় বাংলা ভাষায় এক যুবকের কণ্ঠ—

“মা… আবার সাইরেন বাজছে। তুমি ফোনটা রাখিস না।”

শব্দটির দৈর্ঘ্য এগারো সেকেন্ড। মাঝখানে সংযোগ কেটে যাওয়ার মতো খসখসে আওয়াজ। পেছনে ধাতব কিছু একটা কাঁপছে।

থিমের পরিকল্পক বার্তাটি শুনে বলেছিলেন,

—এটা রাখতেই হবে। বাংলা কণ্ঠ শুনলে এখানকার মানুষ সঙ্গে সঙ্গে কানেক্ট করবে।

ঈশানী জিজ্ঞেস করেছিল,

—যাঁর কণ্ঠ, তাঁর অনুমতি নেওয়া হয়েছে?

স্পনসরের প্রতিনিধি হেসে বলেছিলেন,

—লাইসেন্সড প্যাক। টাকা দিয়ে কেনা। সব অনুমতিই আছে।

আইনের ভাষায় উত্তরটি হয়তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মানুষের কণ্ঠ কি শুধু একটি অডিয়ো ফাইল? মৃত্যুভয়ে বলা একটি বাক্যের মালিকানা কি সত্যিই কয়েক ক্লিকের মধ্যে বদলে যেতে পারে?

প্রশ্নগুলো ঈশানী কাউকে করেনি। নিজের মনেও বেশিক্ষণ রাখেনি। কারণ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে হাসপাতালের অগ্রিম জমা দেওয়া যায় না।

মণ্ডপে কাজ করা মানুষদের অধিকাংশের নাম পূজা কমিটির কেউ জানত না। তাদের পরিচয় ছিল কাজ দিয়ে—বাঁশওয়ালা, কাপড়ওয়ালা, রঙের লোক, ইলেকট্রিকের ছেলে, ঝাড়ুদার মাসি।

নাসিমা বিবিকে সবাই ‘মাসি’ বলেই ডাকত।

তিনি ভোরে এসে আগের রাতের কাঠের গুঁড়ো, তারের টুকরো, প্লাস্টারের ধুলো পরিষ্কার করতেন। শিল্পীদের চা বানিয়ে দিতেন। দুপুরে কেউ খেতে না পারলে নিজের ভাত থেকে ভাগ দিতেন। মণ্ডপের কোন সরু পথে দর্শক আটকে যেতে পারে, কোথায় জল জমলে কেউ পিছলে পড়বে—এসব বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ কমিটির সদস্যদের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল ছিল।

একদিন তিনি দিব্যেন্দুকে বলেছিলেন,

—ওই ভাঙা দেওয়ালের কোণটা একটু কেটে দিন। অন্ধকারে বাচ্চার মাথায় লাগবে।

প্রথমে কেউ পাত্তা দেয়নি। পরে এক স্বেচ্ছাসেবক সত্যিই সেখানে মাথা ঠুকে বসলে কোণটি কেটে দেওয়া হয়েছিল।

ষষ্ঠীর আগের রাতে সম্পূর্ণ শব্দপরিকল্পনার পরীক্ষা চলছিল। মণ্ডপ প্রায় প্রস্তুত। আলো নিভতেই কৃত্রিম শহরের উপর নেমে এল যুদ্ধ।

সাইরেন।

দৌড়ে পালানোর পায়ের শব্দ।

বিস্ফোরণ।

ভেঙে পড়া কাচ।

তারপর সেই বাংলা কণ্ঠ—

“মা… আবার সাইরেন বাজছে। তুমি…… ফোনটা রাখিস না…..।”

ঝনঝন করে একটি বালতি মেঝেতে পড়ে গেল।

ঈশানী ঘুরে দেখল, নাসিমা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পায়ের কাছে জল ছড়িয়ে পড়ছে। মুখে কান্না নেই, চিৎকার নেই। শুধু চোখ দুটি যেন হঠাৎ বয়সে আরও দশ বছর এগিয়ে গেছে।

তিনি ধীরে ধীরে কন্ট্রোল ডেস্কের কাছে এলেন।

—দিদি, ওই কথাটা আর একবার বাজাবেন?

ঈশানী প্রথমে ভাবল, মহিলা শব্দটি বুঝতে পারেননি। সে ক্লিপটি আবার চালাল।

“মা… আবার সাইরেন বাজছে। তুমি…….. ফোনটা রাখিস না।”

নাসিমা চোখ বন্ধ করলেন। বার্তা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—পেছনে লোহার দরজাটা শুনতে পাচ্ছেন?

ঈশানী শব্দটি আলাদা করে বাড়িয়ে দিল। খসখসে আওয়াজের নীচে সত্যিই ধাতব দরজা কাঁপার শব্দ ছিল।

—ও যে কারখানায় কাজ করত, আশ্রয়ের ঘরটার দরজা ওরকমই ছিল। ফোনে কতবার শুনেছি। আর ভয় পেলে “মা” বলার আগে একটু শ্বাস টানত। ঠিক ওইভাবে।

ঈশানী খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল,

—কার কথা বলছেন?

—আমার ছেলে। জামিল।

নাসিমার ছেলে জামিল শেখ তিন বছর আগে একটি বিদেশি শিল্পাঞ্চলে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির কাজে গিয়েছিল। প্রথমে নিয়মিত টাকা পাঠাত। পরে সংঘর্ষ শুরু হলে কারখানার কর্মীদের একটি ভূগর্ভস্থ ঘরে আশ্রয় দেওয়া হয়।

এক রাতে জামিল ফোন করেছিল। নাসিমার ছোট বোনের ফোনে বার্তাটি রেকর্ড হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পরে কারখানার পাশে বিস্ফোরণ ঘটে। কিছু শ্রমিক উদ্ধার হয়, কয়েকজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। জামিলের নাম কোনও তালিকাতেই ছিল না।

জীবিতদের তালিকায় নয়। মৃতদের তালিকাতেও নয়।

সরকারি কাগজে সে এখনও নিখোঁজ। অর্থাৎ মৃত্যু প্রমাণিত নয়, জীবনও নয়।

—ফোনটা পরে নষ্ট হয়ে গেল—নাসিমা বললেন।—মেরামত করতে দিয়েছিলাম। কিছুই ফেরত পেলাম না। আমার বোন নাকি খবরের লোককে বার্তাটা পাঠিয়েছিল। ভেবেছিল, ছেলেটাকে খুঁজে পেতে সুবিধা হবে। তারপর কোথা থেকে কোথায় গেল, জানি না।

ঈশানী পর্দার দিকে তাকাল। ফাইলটির নীচে লেখা—

South Asian Male Voice, Air Raid Shelter, Raw Emotion.

নাম নেই। দেশ নেই। একটি মানুষের শেষ পরিচয় হয়ে আছে—‘কাঁচা আবেগ’।

ঈশানী বলল,

—আমি আপনাকে অডিয়োটা দিয়ে দেব।

নাসিমা মাথা নেড়ে বললেন,

—দেবেন। কিন্তু এখানে বাজাবেন না।

—কমিটির সঙ্গে কথা বলতে হবে।

—বলুন।

কণ্ঠে অনুনয় ছিল না। ছিল সিদ্ধান্ত।

ঈশানী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—আপনি চাইলে ওর নাম বলে একটা উৎসর্গ করা যেতে পারে। মানুষ জানবে—

—না দিদি।

নাসিমা এবার তার চোখের দিকে তাকালেন।

—মানুষ জানবে কী? আমার ছেলে খুব ভয় পেয়েছিল? ও শুধু ভয় পেত না। ও গান গাইত। ছোটবেলায় পুকুরে ডুব দিয়ে আমার পা ধরে টানত। রান্নায় নুন বেশি হলে বলত, “মা, আমাকে কি মেরে ফেলবে?” ঈদের আগে নিজের জামা না কিনে আমার চশমা করিয়ে দিয়েছিল। সেসবের দাম কেউ দেয়নি। শুধু ওর ভয়টার দাম হয়েছে।

শেষ কথাটি বলার সময়ও তাঁর গলা কাঁপল না।

—আমার ছেলের গলাটা আমি শুনব। কিন্তু হাজার লোক দাঁড়িয়ে শুনে বলবে, “কী দারুণ থিম”—এটা চাই না।

ঈশানী ল্যাপটপের ঢাকনা নামিয়ে দিল।

দিব্যেন্দু সব শুনে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—ব্যাপারটা খুব খারাপ হয়েছে, মানছি। কিন্তু আমরা তো জেনে করিনি।

—এখন জানি—ঈশানী বলল।

—অডিয়োটা বৈধভাবে কেনা।

—বৈধ আর ঠিক—দুটো সবসময় এক নয়।

দিব্যেন্দু বিরক্ত হলেন না। দুই হাতে কপাল চেপে বসে রইলেন। তাঁর বাবার দোকান একসময় দাঙ্গায় পুড়ে গিয়েছিল। সেই স্মৃতি থেকেই নাকি তিনি যুদ্ধবিরোধী মণ্ডপের কথা ভেবেছিলেন। পরিকল্পনার প্রথম বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, “মানুষ যেন বুঝতে পারে, ধ্বংস কখনও শুধু খবরের কাগজে থাকে না।”

অথচ সেই ধ্বংসকে সত্যি করে তুলতে গিয়ে তাঁরা আর একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিপর্যয় কিনে এনেছেন।

দিব্যেন্দু বললেন,

—ক্লিপটা বাদ দিলে শেষ অংশটা বসবে না। বিচারকদের জন্য পুরো সিকোয়েন্স নতুন করে সাজাতে হবে। স্পনসরও মেনে নেবে না।

—তাহলে নাসিমাকে ডেকে বলুন। তাঁর সামনে বসে বলুন, তাঁর ছেলের শেষ কথাটা আমাদের পুরস্কারের জন্য দরকার।

দিব্যেন্দু মুখ তুললেন।

—এভাবে বলছ কেন?

—অন্যভাবে বললে কথাটার মানে বদলে যাবে?

কয়েক মুহূর্তে তাঁর মুখের ক্লান্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

—আমাকে একটু সময় দাও।

কিন্তু সময় ছিল না। নবমীর রাতেই বিচারকেরা আসবেন।

সেদিন গভীর রাতে বাড়ি ফিরে ঈশানী মায়ের ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়াল। আলো নেভানো। মা ঘুমোচ্ছেন। বিছানার পাশে ওষুধের পাতা, হাসপাতালের কাগজ, চশমা।

মোবাইলে একটি নতুন ভয়েস মেসেজ এসেছিল সোহমের কাছ থেকে।

ঈশানীর ছোট ভাই একটি পণ্যবাহী জাহাজে রেডিয়ো অফিসার। জাহাজটি কয়েক দিন ধরে সংঘর্ষপ্রবণ একটি বন্দরের বাইরে অপেক্ষা করছে। যোগাযোগ কখনও হচ্ছে, কখনও বন্ধ।

সোহমের কণ্ঠ ভেসে এল—

“দিদি, আমরা ঠিক আছি। নেটওয়ার্ক নেই বললেই চলে। মাকে বলিস চিন্তা না করতে। আর হ্যাঁ, হাসপাতালের টাকা নিয়ে ভাবিস না, ফিরলে—”

বার্তাটি মাঝপথে কেটে গেল।

ঈশানী দ্বিতীয়বার শুনল। তারপর তৃতীয়বার।

তার মনে হল, এই কণ্ঠও এখন একটি ফাইল। কয়েক কিলোবাইট তথ্য। চাইলে কপি করা যায়, কাটা যায়, পেছনে সাইরেন বসানো যায়। একদিন অচেনা কোনও শহরের উৎসবে কেউ হয়তো শুনবে—“দিদি, আমরা ঠিক আছি”—এবং তার পরেই হাততালি দেবে।

সে ফোনটি বুকের কাছে চেপে ধরল।

কিছু ব্যক্তিগত শব্দ পৃথিবীকে শোনানোর জন্য নয়। পৃথিবী যতই অস্থির হোক, মানুষকে অন্তত নিজের প্রিয়জনের কণ্ঠের দরজায় তালা দেওয়ার অধিকারটুকু রাখতে হয়।

নবমীর রাতে মণ্ডপের সামনে মানুষের ঢল নেমেছিল।

বিচারকের গাড়ি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কমিটির সদস্যরা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। টেলিভিশনের ক্যামেরা বসল। স্পনসরের প্রতিনিধি শেষ মুহূর্তেও লোগোর আলো ঠিক আছে কি না দেখলেন।

নাসিমার কাজ সন্ধ্যার মধ্যেই শেষ হয়েছিল। তবু তিনি বাড়ি যাননি। মণ্ডপের একটি অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

দিব্যেন্দু কন্ট্রোল ডেস্কে এসে ঈশানীকে বললেন,

—তুমি কী ঠিক করেছ?

—আপনি?

দিব্যেন্দু জবাব দিলেন না। শুধু বললেন,

—সিকোয়েন্স শুরু করো।

আলো নিভে গেল।

প্রথমে স্বাভাবিক শহরের শব্দ—ট্রাম, স্কুলের ঘণ্টা, বাজার, শিশুর হাসি। তারপর দূর থেকে সাইরেন উঠল।

মণ্ডপের দেয়াল রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।

বিস্ফোরণের শব্দে কয়েকজন দর্শক চমকে গেলেন। একটি শিশু মায়ের হাত শক্ত করে ধরল। ধোঁয়ার মধ্যে পোড়া খেলনাটি দেখা গেল। কোথাও একজন নারীর কান্না। কোথাও দৌড়ে পালানোর শব্দ।

এরপর জামিলের কণ্ঠ বাজার কথা।

ঈশানীর আঙুল কিবোর্ডের উপর স্থির।

দূরে দাঁড়ানো নাসিমার সঙ্গে তার চোখাচোখি হল। আলো-অন্ধকারে মহিলার মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। ঈশানী সামান্য মাথা কাত করল—শেষবারের মতো অনুমতি চাওয়ার ভঙ্গিতে।

নাসিমা ধীরে মাথা নাড়লেন।

না।

ঈশানী বোতাম চাপল।

কোনও কণ্ঠ বাজল না।

কোনও কান্না নয়, কোনও সাইরেন নয়, কোনও সুর নয়।

তিরিশ সেকেন্ডের সম্পূর্ণ নীরবতা।

প্রথম কয়েক সেকেন্ড দর্শকেরা ভাবল যান্ত্রিক গোলযোগ হয়েছে। কেউ গলা খাঁকারি দিল। একটি মোবাইলের ক্যামেরা চালু হওয়ার শব্দ শোনা গেল। বাঁশের কাঠামোর কোথাও থেকে শুকনো কড়মড় আওয়াজ এল।

তারপর মানুষ নিজের শ্বাস শুনতে পেল।

অন্ধকারে একটি শিশু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

—মা, সবাই চুপ কেন?

মা উত্তর দিলেন না।

বাইরের রাস্তা থেকে খুব ক্ষীণভাবে ঢাকের বোল ভেসে আসছিল। এতক্ষণ বিস্ফোরণের নীচে চাপা পড়ে থাকা সেই ঢাকের শব্দ হঠাৎ যেন দূরের কোনও জীবিত পৃথিবীর হৃদ্‌স্পন্দন হয়ে উঠল।

দিব্যেন্দু দ্রুত কন্ট্রোল ডেস্কের দিকে এগিয়ে এসেছিলেন। মাঝপথে থেমে গেলেন। তাঁর চোখ চলে গেল নাসিমার দিকে।

তিরিশ সেকেন্ড পরে আলোর মধ্যে প্রতিমার মুখ ফুটে উঠল।

কোনও ঘোষণা ছিল না। তবু দর্শকদের মধ্যে কেউ হাততালি দিল না। বেশ কিছুক্ষণ কেউ নড়লও না।

বাইরে বেরিয়ে একজন বিচারক শুধু বললেন,

—ওই নীরবতাটা পরিকল্পিত?

দিব্যেন্দু একবার ঈশানীর দিকে তাকালেন।

তারপর বললেন,

—হ্যাঁ। তবে পরিকল্পনাটা আমাদের একার নয়।


পরদিন সামাজিক মাধ্যমে মণ্ডপের নীরবতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল। কেউ লিখল, “যুদ্ধের নিহতদের প্রতি তিরিশ সেকেন্ডের শ্রদ্ধা।” কেউ লিখল, “অসাধারণ সাউন্ড কনসেপ্ট।” কেউ বলল, “পুরোটাই প্রচারের কৌশল।”

যে কণ্ঠটি বাজেনি, তার কথা কেউ জানল না।

দিব্যেন্দু দুপুরে ঈশানীর হাতে পারিশ্রমিকের খাম দিয়ে বললেন,

—পুরো টাকাই আছে।

ঈশানী খাম খুলল না।

—স্পনসর কিছু বলল না?

—বলেছে। আমিও কিছু বলেছি।

—কী?

দিব্যেন্দু মৃদু হেসে বললেন,

—সব কথা মাইকে বলার জন্য নয়।

কয়েক মুহূর্ত পরে তিনি যোগ করলেন,

—আগামী বছর থিমটা একটু ছোট করব। এত বড় বড় কথা বললে ছোট ছোট ভুল চোখে পড়ে না।

ঈশানী কিছু বলল না। শুধু বুঝল, মানুষ বদলায় কোনও বক্তৃতার শেষে নয়; কখনও কখনও একটি বাক্য না শোনার পর।

দশমীর সকালে মণ্ডপ প্রায় ফাঁকা। রাতের ফুল শুকিয়ে এসেছে। ধুনোর গন্ধের সঙ্গে ভিজে মাটির গন্ধ মিশে আছে।

ঈশানী নাসিমার হাতে একটি ছোট মেমোরি কার্ড দিল।

—শব্দটা পরিষ্কার করেছি। বেশি পরিষ্কার করিনি। তাতে ওর গলাটাও বদলে যেত।

নাসিমা কার্ডটি দুই আঙুলে ধরে রইলেন, যেন এত ছোট জিনিসে একটি মানুষ কী করে জায়গা পায়, বুঝতে পারছেন না।

ঈশানী বলল,

—যে সংস্থা অডিয়োটা বিক্রি করেছে, তাদের কাছে অভিযোগ পাঠিয়েছি। তারা তদন্ত করবে বলেছে। সব জায়গা থেকে হয়তো মুছবে না। কিন্তু চেষ্টা করা যাবে।

নাসিমা জিজ্ঞেস করলেন,

—ইন্টারনেটে ঢুকে গেলে সত্যিই কি কিছু মুছে যায়?

ঈশানী মিথ্যে আশ্বাস দিল না।

—সবটা নয়। কোথাও থেকে আবার বেরিয়ে আসতে পারে।

নাসিমা কার্ডটি মুঠোর মধ্যে নিলেন।

—তবু কাল এখানে বাজেনি।

—না।

—সেটুকুই আগে থাক।

প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বেরোনোর সময় ঢাক বাজতে শুরু করল। আবির উড়ল। হাসি, কান্না, উলুধ্বনি, শঙ্খ—সব শব্দ একসঙ্গে মিশে গেল।

নদীর ধারে ভিড় থেকে একটু দূরে নাসিমা বসেছিলেন। ঈশানী দেওয়া ছোট ইয়ারফোনটি তাঁর কানে।

“মা… আবার সাইরেন বাজছে। তুমি ফোনটা রাখিস না।”

তিনি বার্তাটি আবার চালালেন।

এবার কোনও দর্শক নেই। কোনও বিচারক নেই। কোনও আলো বা শিল্প নির্দেশনা নেই। শুধু একজন মা এবং তাঁর সন্তানের আতঙ্কিত, অসমাপ্ত কণ্ঠ।

ঈশানীর ফোন কেঁপে উঠল। সোহমের বার্তা—

“বন্দর খুলছে। সম্ভবত কাল রওনা দেব। মাকে এখনই বলিস না, আগে নিশ্চিত হই।”

ঈশানী চোখ বন্ধ করল। দূরে প্রতিমা জলে নামানো হচ্ছে। মানুষের কণ্ঠে বিদায়ের ধ্বনি উঠছে।

হঠাৎ আকাশে আতশবাজি ফেটে গেল।

নাসিমার হাত কেঁপে উঠল। ঈশানীও চমকে তাকাল। দুজনের চোখ একবার মিলল। কেউ কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল না। ঈশানী শুধু তাঁর পাশে গিয়ে বসল।

নদীর জলে প্রতিমার মুখ ধীরে ধীরে নেমে গেল।

ঢাক থেমে যাওয়ার পরও নাসিমা ইয়ারফোনটি কান থেকে খুললেন না।