![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
অন্ধত্ব থেকে জেগে ওঠা
চৈতন্য দাশ
পৃথিবীর মানচিত্রের একটি ছোট্ট দেশ। দেশটির নাম স্বর্ণভূমি। নামের মতোই সে দেশ ছিল সোনালি ধানের গন্ধে ভরা, নদীর কলকল ধ্বনিতে মুখর, আর মানুষের মুখে ছিল পরিশ্রমের দীপ্তি। সেখানে কৃষক বীজ বুনত ভবিষ্যতের আশায়, জেলে নদীতে জাল ফেলত সন্তানের মুখে পুষ্টিকর আহার তুলে দেওয়ার জন্য, আর শিক্ষক বিদ্যালয়ের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখাতেন।
স্বর্ণভূমির সীমান্তের ওপারে ছিল আরেকটি দেশ। তার নাম সূর্যভূমি। দুই দেশের ভাষা আলাদা, পতাকা আলাদা, কিন্তু মানুষের চোখের জল, হাসি, ক্ষুধা আর ভালোবাসা ছিল একই রকম।
স্বর্ণভূমির এক গ্রামে বাস করতেন বৃদ্ধ শিক্ষক অনিরুদ্ধ। গ্রামের মানুষ তাঁকে ‘গুরুদা’ বলেই চিনত। তাঁর একটি সুঅভ্যাস ছিল— প্রতিদিন সন্ধ্যায় বটগাছের নিচে বসে গ্রামের ছেলেমেয়েদের গল্প শোনানো।
একদিন এক কিশোর জিজ্ঞেস করল,
—গুরুদা, যুদ্ধ কেন হয়?
অনিরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন,
—যুদ্ধ কখনও মাটির ইচ্ছায় হয় না, নদীর ইচ্ছায় হয় না, সাধারণ মানুষেরও ইচ্ছায় হয় না। যুদ্ধ জন্ম নেয় রাষ্ট্রনায়কদের অহংকারের গর্ভে।
ছেলেমেয়েরা কিছুটা বুঝল, কিছুটা বুঝল না।
গুরুদার মুখে যুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে একদিন সত্যি সত্যি পৃথিবীর আকাশে অশান্তির কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। স্বর্ণভূমির শাসক রাজদেব ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতালোভী। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইতিহাসে নিজের নাম বড় অক্ষরে লিখতে হলে শক্তি প্রদর্শন করতে হবে। অন্যদিকে সূর্যভূমির শাসক বীরেশও কম যান না। তাঁরও ধারণা ছিল, পৃথিবীকে দেখিয়ে দিতে হবে তাঁর দেশের সামরিক ক্ষমতা।
দুই নেতা প্রতিদিন ভাষণ দিতেন।
একজন বলতেন, "আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। আমরা একদিন সারা পৃথিবীতে ছড়ি ফুরাবো…"
অন্যজন বলতেন, "আমাদের শক্তির কাছে কেউ টিকতে পারবে না। পৃথিবীর সব শক্তিকে একদিন ধুলোয় মিশিয়ে দেবো…"
দুই দেশের সংবাদমাধ্যম উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালতে লাগল। সাধারণ মানুষ প্রথমে ভেবেছিল, এসব রাজনৈতিক কথা, কিন্তু ধীরে ধীরে সীমান্তে সৈন্য বাড়ল, যুদ্ধবিমান উড়ল, ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন হলো…
গ্রামের কৃষক নিবারণ একদিন বাজারে এসে বলল,
—ধানের দাম পড়ে গেছে। সার পাওয়া যাচ্ছে না।
পাশ থেকে দোকানদার বলল,
—সব টাকা নাকি যুদ্ধের প্রস্তুতিতে যাচ্ছে। কেউ গুরুত্ব দিল না। কিন্তু যুদ্ধের ছায়া যখন নামে, তা প্রথমে মানুষের চোখে নয়, সংসারের হাঁড়িতে ধরা পড়ে।
স্বর্ণভূমির বিদ্যালয়গুলোতে নতুন বই আসা বন্ধ হয়ে গেল। হাসপাতালের ওষুধ কমে গেল। সেতু নির্মাণের কাজ থেমে গেল। রাষ্ট্রনায়কদের মুখে তখনও যুদ্ধের গৌরবের গল্প।
অবশেষে এক অন্ধকার রাতে সীমান্তে গোলাগুলি শুরু হলো। সকালের সূর্য উঠল ঠিকই, কিন্তু তার আলোয় দেখা গেল ধোঁয়া, আগুন আর আতঙ্ক।
স্বর্ণভূমি ও সূর্যভূমি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল।
যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে স্বর্ণভূমির রাজধানীতে বিজয়ের স্লোগান উঠল। মানুষকে বলা হলো— "এটি দেশের সম্মান রক্ষার যুদ্ধ।"
কিন্তু গ্রামের মানুষ দেখল অন্য দৃশ্য। নিবারণের একমাত্র ছেলে সৈনিক ছিল। সে আর যুদ্ধভূমি থেকে ফিরল না। জেলের নৌকা নদীতে নামল না, কারণ নদীপথে মাইন পাতা হয়েছে। বিদ্যালয়ের মাঠে শিশুদের খেলা বন্ধ হয়ে গেল। হাসপাতালের বারান্দা আহত মানুষের আর্তনাদে ভরে উঠল। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা থেকে বহু দূরে নিরাপদ স্থানে বহু আশ্রয়কেন্দ নির্দিষ্ট করা হলো।
একদিন সকলের গুরুদা, অনিরুদ্ধ গ্রামের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বসেছিলেন। একটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—গুরুদা, আমার বাবা কোথায়? অনিরুদ্ধ উত্তর দিতে পারলেন না, কারণ তিনি জানতেন, যুদ্ধের অভিধানে অনেক প্রশ্নের উত্তর থাকে না।
দুই
দিন যেতে লাগল। যুদ্ধ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল।
বোমা পড়ল কারখানায়। আগুন লাগল শস্যগুদামে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হলো। নদীর জল দূষিত হয়ে গেল।
যে দেশ একসময় সোনালি ধানের হাসিতে মুখর ছিল, সেখানে এখন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে।
একদিন রাতে গুরুদা তাঁর পুরোনো ডায়েরি খুললেন। সেখানে তিনি লিখলেন—
"যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো, এটি নাকি জনগণের জন্য লড়া হয়। বাস্তবে জনগণ শুধু মূল্য দেয়, সিদ্ধান্ত নেয় অন্যেরা। যুদ্ধের মঞ্চে ভাষণ দেন ক্ষমতাবানরা, কিন্তু কবরস্থানে শুয়ে থাকে সাধারণ মানুষ…"
এদিকে যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। দুই দেশের শাসকই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছেন, কিন্তু অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন। লক্ষ লক্ষ শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।
যুদ্ধের দ্বিতীয় বছরে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
স্বর্ণভূমি ও সূর্যভূমি সীমান্তে একদিন দুই দেশের সাধারণ মানুষ মুখোমুখি হলো। কেউ ছিল কৃষক, কেউ শ্রমিক, কেউ শিক্ষক, কেউ ডাক্তার…
তারা বুঝতে পারল—যাদের বিরুদ্ধে তারা লড়ছে, তারাও ঠিক তাদের মতোই মানুষ।
এক বৃদ্ধ কৃষক কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি।
অপর পাশের বৃদ্ধ উত্তর দিল,
—আমিও।
একজন বলল,
—আমার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
অন্যজন বলল,
—আমারটাও।
সেদিন সীমান্তে কোনো গুলি চলল না। চলল শুধু মানুষের কান্না। সেই কান্না যেন আকাশ ভেদ করে উঠল। অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপে যুদ্ধ থামল, কিন্তু যুদ্ধ থামলেই কি ক্ষতি থামে? যে শিশুটি বাবা হারিয়েছে, তার শূন্যতা কি পূরণ হয়? যে কৃষকের জমি ধ্বংস হয়েছে, তার ফসল কি সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে? যে সেতু, কারখানা, বিদ্যালয়, হাসপাতাল ধ্বংস হয়েছে, তা কি একদিনে পুনর্নির্মাণ সম্ভব?
—না!
যুদ্ধের ক্ষত মাটির গভীরে যেমন থাকে, তেমনি মানুষের মনেও থেকে যায় বহু প্রজন্ম।
তিন
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এক সন্ধ্যায় আবার বটগাছের নিচে গ্রামের মানুষ জড়ো হলো। অনিরুদ্ধ তখন বৃদ্ধ হয়েছে। এক কিশোর তাঁকে জিজ্ঞেস করল, —গুরুদা, তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি হতে পারে?
গুরুদা আকাশের দিকে তাকালেন। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আকাশে লাল আভা।
তিনি বললেন,— হতে পারে, যদি মানুষ ইতিহাস ভুলে যায়। হতে পারে, যদি ক্ষমতার লোভ বিবেককে অন্ধ করে দেয়। হতে পারে, যদি নেতাদের অহংকার মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
—আর যদি বিবেক অন্ধত্ব থেকে জেগে ওঠে?
—তবে যুদ্ধ হবে না। কারণ যুদ্ধের অস্ত্র কারখানায় তৈরি হয়, কিন্তু শান্তির ভিত্তি তৈরি হয় মানুষের হৃদয়ে।
তিনি আরও বললেন,
—মনে রেখো, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার ক্ষেপণাস্ত্রে নয়, তার কৃষকের মাঠে, তার শিক্ষকের কলমে, তার শ্রমিকের ঘামে, তার শিশুর হাসিতে। যুদ্ধ এগুলোকে ধ্বংস করে। শান্তি এগুলোকে লালন করে। যুদ্ধের মূল্য পরিশোধ করে সাধারণ জনগণ, অথচ এর সুফল প্রায়শই কেউই পায় না। পরস্পরের শান্তির সংলাপ ও সহযোগিতার আশ্বাস দেশ ও দশের প্রকৃত মঙ্গল ডেকে আনে।
সেদিন বটগাছের পাতাগুলো হাওয়ায় দুলছিল।
মনে হচ্ছিল, প্রকৃতিও যেন গুরুদার কথায় সম্মতি জানাচ্ছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এলো। আকাশে তারা জ্বলল, আর সেই তারার আলোয় যেন একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল— যুদ্ধ কখনও জনগণের উৎসব নয়, এটি তাদের দুর্ভাগ্য। কিছু অহংকারী, দাম্ভিক ও ক্ষমতালোভী মানুষের ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয় অসংখ্য নিরীহ মানুষকে। যুদ্ধের আগুনে শুধু সৈনিক নয়, পুড়ে যায় স্বপ্ন, শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ, তাই সভ্যতার প্রকৃত বিজয় যুদ্ধ জিতে নয়, যুদ্ধ এড়িয়ে। কারণ শান্তির একফোঁটা শিশির অনেক সময় যুদ্ধের হাজার বিজয়ের চেয়েও মূল্যবান। এই সত্য যতদিন মানুষ মনে রাখবে, ততদিন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ আলোর দিকেই এগিয়ে যাবে।


