1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label জ্যোতিদীপ বর্মন. Show all posts
Showing posts with label জ্যোতিদীপ বর্মন. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

সন্ধিক্ষণ

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

সন্ধিক্ষণ

জ্যোতিদীপ বর্মন

ঘুমটা ভাঙল রাত আড়াইটেয়। অ্যালার্ম দিইনি, তবু ভাঙল। শরীর বোধহয় নিজের হিসেবে চলে। কোন দিন অষ্টমী, কখন সন্ধি।

কলকাতায় তখন ভোর গড়াচ্ছে। মাকে ফোন করতেই দুবার রিং হয়ে ধরল, যেন ফোনটা হাতেই ধরা ছিল।

"উঠে পড়েছিস? এই তো, এক্ষুনি সন্ধিপুজো বসবে।"

ভিডিও কলটা মা প্যান্ডেলের দিকে ঘুরিয়ে ধরল। স্ক্রিন জুড়ে মানুষের পিঠ, ভিড়ের ফাঁক দিয়ে একফালি প্রতিমা। একশো আটটা প্রদীপ জ্বলছে একে একে। আওয়াজ আসছে দেরিতে, ভেঙে ভেঙে। ঢাকের বোল, শঙ্খ ধ্বনি, পুরোহিতের মন্ত্র, সব মিলিয়ে গমগম পরিবেশ। আর এদিকে, আমার রান্নাঘরে, শুধু ফ্রিজের একটানা গুনগুন।

"শীত পড়ে গেছে ওখানে?"

"পড়ছে।" জানলার বাইরে অন্ধকার, বরফ নয়, শুধু ভিজে হিম। হেলসিঙ্কির শরৎ গন্ধহীন। এখানে শিউলি ফোটে না। পুজো যে এসে পড়েছে, নাক দিয়ে টের পাওয়ার কোনও উপায় নেই।

ছোটবেলায় এই সন্ধির সময়টাই ছিল সবচেয়ে উত্তেজনাময়। বাবা কাঁধে তুলে নিত, যাতে ভিড়ের মাথার ওপর দিয়ে দেখতে পাই। ঠিক ওই মুহূর্তে ঢাক পাগলের মতো বেজে উঠত, কাঁসর, ধুনুচি, আর দূরে একটা কামানের মতো শব্দ। শুনেছিলাম, ওইটেই নাকি অসুর বধের ক্ষণ। অষ্টমীর শেষ, নবমীর শুরু, মাঝখানের ওই আটচল্লিশ মিনিট। দেবী তখন চামুণ্ডা। বাবার কাঁধে চেপে ভাবতাম, এত আলো, এত শব্দ, তবু বড়দের চোখে জল কেন।

তখন বুঝিনি। এখন বুঝি।

কেউ মুখ ফুটে বলে না, কিন্তু গোটা পুজোটাই আসলে একটা বিদায়ের মহড়া। উমা চার দিনের জন্য বাপের বাড়ি আসে। বোধনের দিনেই সবাই জানে, দশমীতে চলে যাবে। তবু বরণ হয়, সিঁদুর খেলা হয়, মিষ্টিমুখ হয়। আনন্দটা গড়ে ওঠে চলে-যাওয়ার ভিতের ওপর।

মেনকা জানত। প্রতি বছর মেয়ে আসে চার দিনের জন্য, তারপর কৈলাসে ফেরে, দূরের সংসারে, বরের কাছে। মায়ের ঘরে সে চিরকালের অতিথি। এতদিন ভাবতাম, এ নিছক গল্প, পুরাণকথা।

এখন বুঝি, আমিও যেন সেই উমা। বছরে একবার, বড়জোর দুবার, চার-পাঁচ সপ্তাহের জন্য ফিরি।। বাকি সময়টা এই রকমই। স্ক্রিনের ওপারে একফালি মুখ, দেরিতে পৌঁছনো শব্দ। আর মা তো মেনকাই। বিসর্জনের বেলায় ওঁর চোখের জল কোনওদিন লোকদেখানো ছিল না, আমি জানি।

স্ক্রিনটা হঠাৎ থেমে গেল। ঠিক যখন একশো আটটা প্রদীপ জ্বলছে, ছবিটা থমকে গেল। ধুনুচির ধোঁয়ায় মায়ের মোহময়ী মুখ, আরতির ভঙ্গিতে ঠাকুর মশায়ের হাত তোলা, আটকে রইল ওইখানে। "হ্যালো? শুনতে পাচ্ছিস?" আমার গলা রান্নাঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।

কয়েক সেকেন্ড। তারপর ছবি ফিরল, শব্দ ফিরল, মাঝের মুহূর্তটুকু হারিয়ে গেল একেবারে। যা দেখলাম না, আর কোনওদিন দেখা হবে না।

"রেখে দিই রে, অঞ্জলির লাইন পড়ে গেছে। তুইও একটু ঘুমিয়ে নে।"

কল কেটে গেল। ফোনের স্ক্রিন অন্ধকার, তাতে নিজের মুখের আবছা ছায়া, দাড়ি বেড়েছে, চোখের নীচে কালি। বাইরে তখনও রাত। হেলসিঙ্কিতে ভোর হতে ঢের বাকি।

আলো জ্বালালাম না। অন্ধকারেই বসে রইলাম কিছুক্ষণ। ফ্রিজটা গুনগুন করেই চলল।