1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label দীপঙ্কর সাহা. Show all posts
Showing posts with label দীপঙ্কর সাহা. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

বিলম্বিত লয়

ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

 বিলম্বিত লয়

দীপঙ্কর সাহা


-এক-

সরসী বাগচী

দেখতে শুনতে আমি খারাপ নই, পাড়ার মাসিমনিরা আড়ালে বলেন, রাজকন্যার মতো রুপ! রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও আমার দিকে দু'দন্ড তাকিয়ে দেখে। কিন্তু এসব আমি অবহেলার সাথে উপেক্ষা করি। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ছোঁকছোঁক করা লোকদের আমি দু'চোখ পেতে দেখতে পারি না। উনিশ বছর বয়স হলো, এখন পর্যন্ত কোনও ছেলেকে কাছে ঘেঁষতে দেই নি। 

পড়াশুনাতেও আমি একদম মন্দ নই, হায়ার সেকেন্ডারীতে সব বিষয়ে নয়ের ঘরের উপরের দিকে নম্বর ছিল। বর্তমানে পদার্থ বিদ্যায় অনার্স নিয়ে স্কটীশ চার্চ কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি। 

শুনলাম, বাবার কাছে একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে খুব বড়ো ঘর থেকে। পূর্ববঙ্গে বিক্রমপুরে নাকি ওদের জমিদারি ছিল, এদেশে এসেও ব্যবসা করে নাকি দারুণ ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। সল্টলেকে বিশাল বাড়ি, এছাড়াও নিউ টাউন, গড়িয়াহাটে এবং কালিঘাটে ফ্ল্যাট আছে। 

তবে একটাই আপত্তিকর কথা, পাত্রের এটা হতে চলেছে দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম স্ত্রী বিয়ের এক বছর পরে বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে পরলোকগমন করেছে। বাচ্চাটি জীবিত, বছর দেড়েকের এক কন্যা সন্তান। 

পাত্রের মা মেয়ে দেখতে এসে খুব পছন্দ করেছেন আমাকে। আমার মায়ের হাত ধরে নাকি তিনি বলেছেন, কোনো দাবি দাওয়া নেই, ঘরের মেয়ের মতোই থাকবে আমার বাড়িতে, চাইলে পড়াশুনাও চালিয়ে যেতে পারে, কোনও আপত্তি নেই। 

এরপর স্বভাবতই আমার সব আপত্তি ধূলিসাৎ হয়ে গেল। পড়াশুনা শেষ না করে বিয়ে করবো না, আমার জেদ ছিল। বি-এস-সি পাশ করে, আরো পড়াশুনার ইচ্ছে আমার! 

পাত্র শুনলাম আমায় দেখতে আসবে না, তার মায়ের মতই নাকি তার কাছে শেষ কথা। শুনে একটু স্বস্তি হলো, আমায় দেখে মন ভোলানো জাতীয় কথা বলতে শুরু করলে আমি সহ্য করতে পারতাম না। 

আমরাও পূর্ববঙ্গের লোক, বাবা এক কাপড়ে দেশ ছেড়ে এদেশে চলে আসেন, তারপর অনেক কষ্টে এক প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকের চাকরি জোগাড় করে, নিজের পায়ে দাড়িয়েছেন। ফলে আমাদের সাংসারিক অবস্থা কোনদিনই খুব ভালো ছিল না। আমি নিজে স্টাইপেন্ড না পেলে কতদূর পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারতাম, ভগবান জানেন। 

-দুই-

অতনু গাঙ্গুলী

মা খুব করে ধরেছে, আবার যাতে আমি বিয়ে করে সংসার ধর্ম পালন করি। কিন্তু মনীশাকে আমি ভুলি কেমন করে? আমাদের মাত্র এক বছরের সাহচর্য হলেও, বিয়ের আগের বছর পাঁচের সেই মিষ্টি মধুর দিনগুলি, এত তারাতারি ভুলে যাবো? 

না, তা সম্ভব হবে না। মাত্র বছর দেড়েক হলো ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, এরমধ্যে ওর জায়গায় আমি অন্য কাউকে বসাতে পারবো না। 

মার যুক্তি আমি বুঝি, আমার শিশু কন্যা অণু বা অণুমিত্রা গাঙ্গুলী, মায়ের অভাব আজকাল খুব অনুভব করে। ইদানীং তো নাকি বলতেই শুরু করেছে, - সবার তো মা আছে, আমার কেন নেই? এমন কি একজন মা এনে দেবার বায়নাও না কি করতে শুরু করেছে। এই সবই আবদার করে ওর দিদি অর্থাৎ আমার মায়ের কাছে। অণু এখনও পুরো বাক্য বলতে না পারলেও, ভাঙা ভাঙা শব্দে ঠিক বুঝিয়ে দেয় কি বলতে চায়! 

অণুর দেড় বছর বয়স, খুব মিষ্টি চেহারা, কথা বার্তায়ও বয়সের তুলনায় খুব সপ্রতিভ। ডাকলেই সবার কাছে চলে যায় এবং মিষ্টি কথায় ও গল্পে নিমেষে তাঁর মন জয় করে নিতে সক্ষম হয়! কিন্তু বিয়ে করে যাকে ঘরে আনবো, সে যে ওকে মেনে নেবে তার কি গ্যারান্টি আছে? সামনে মিষ্টি ব্যবহার করলেও আড়ালে হয়তো পছন্দ করবে না। 

চিরকাল মায়ের সব কথা মেনে নিয়েছি, কিন্তু এবার যে একদমই মানতে মন চাইছে না। 


-তিন-

সরসী বাগচী

শেষ পর্যন্ত বিয়েটা ঠিক হয়েই গেল। আমার সব আপত্তি বৃথা গেল, ভেবেছিলাম পড়াশুনার শেষে নিজের পায়ে দাড়াব এবং বাবাকে সাপোর্ট জোগাবো। কিন্তু মা বাবা দুজনেই যেভাবে বোঝাতে শুরু করলো, আমি না করতে পারলাম না। ছেলের বাবা ও মা এসে পাকা কথা দিয়ে গেলেন, কয়েক দিন পর আশীর্বাদও করে গেলেন।

মাত্র তিন মাস বাদে বিয়ে, এদিকে বুঝতে পারছি বাবার অবস্থা সঙ্গীন। করোণার জন্যে বাবার স্কুল বন্ধ অনেক দিন। কিন্তু স্কুলের হেড মাষ্টার হওয়ায় বাবাকে স্কুলে যেতে হত মাঝেমধ্যেই। কিন্তু একে তো একেবারেই ছোটো মাপের একটা স্কুল, তার উপর নামহীন বেসরকারি প্রাইমারী স্কুল! 

কিছুদিন অর্ধেক বেতন দিয়েছিল, তারপর এখন পুরোপুরি ভাবেই বন্ধ হয়ে গেছে বেতন। কয়েকটি মাত্র প্রাইভেট ট্যিউশনীতে ভর করে জোড়াতালি দিয়ে চলছিল সংসারটা! এরপর বিয়ের খরচের বোঝা ঘাড়ে চাপলে বাবার যে নাজেহাল অবস্থা হবে, সেকথা বুঝতে বুদ্ধি খরচ করতে হয় না। 

আমিও অবশ্য চুপচাপ বসে নেই, পড়াশুনার ফাঁকে গোটা তিনেক ছাত্রী পড়াবার কাজ জুটিয়ে নিয়েছি। একজনের বাড়িতে জড়ো হয়ে তিনজন কোচিং নেয় আমার কাছে। উচু ক্লাশের ছাত্রী, এবং তিন জনই এক স্কুলের ও একই ক্লাশের ছাত্রী হওয়ায় আমার পরিশ্রমও কম হয়, আবার মায়ের হাতেও বেশ কিছু নগদ দিতে পারছি। 

-চার-

অতনু গাঙ্গুলী

শেষ পর্যন্ত এবারও মায়ের কথায় মত দিতেই হলো। মা আর বাবা একদম পাকা কথা দিয়ে এসেছেন, কদিন পর আশীর্বাদও করে এলেন। ফলে মত না দিয়ে আর উপায় কি! 

তবে মত দিলেও আমার মনটা তো আমারই থাকবে, জোড় করে তো আর দিতে পারবো না নতুন করে কাউকে। 

মা বারবার নানান অজুহাতে শোনাতে ছাড়ছে না, মেয়েটি নাকি অপূর্ব সুন্দরী, তারচেয়েও মিষ্টি ব্যবহার, বুদ্ধিমতী, পড়াশুনাতেও চৌকস এবং পরিবারটি গরীব হলেও নাকি খুবই সম্ভ্রান্ত। 

পূর্ব বাঙলা থেকে নাকি সর্বস্ব খুইয়ে এক কাপড়ে এদেশে এসে উঠেছন, তারপরে অনেক পরিশ্রম করে এখন চলনসই অবস্থায় পৌছেছেন। 

আমি জানি মা মানুষ চিনতে ভুল করে না সচরাচর, তাতে আমার কি কিছু এসে যায়! একেবারেই না। 

মাঝে আর মাত্র তিন মাস। তারপরেই একটা শুভ দিন দেখে বিয়ে ঠিক হয়েছে। কিন্তু বিয়ের দিনটা যতো এগিয়ে আসছে, আমার মনটা ততোই চঞ্চল হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে ঠিক করছি না। মস্তবড় একটা ভুল হতে চলেছে। শুধু আমারই নয়, যে ঘরে আসবে তার প্রতিও রীতিমতো অন্যায় হতে চলেছে।

-পাঁচ-

সরসী বাগচী

শেষমেশ বিয়েটা হয়েই গেল। বাবার অনেক ধার দেনা হয়ে গেছে, সেটা আমি বুঝি। ওরা অবশ্য বলেছিল, কিচ্ছু দেবেন না, শাখা সিন্দুরে বিয়ে হয়ে যাবে। মা বলেই দিয়েছিল একটা সোনার চেন দেবে, আর কিছু ইমিটেশন গয়না দিয়ে সাজিয়ে দেবে, যাতে দেখতে খারাপ না লাগে। 

বড় ঘরে বিয়ের অনেক হ্যাপা, সেটা না বোঝার মতো আমি বোকা নই, তত্ত্ব রুচি সম্মত হওয়া চাই, প্রণামীর শাড়ি ইত্যাদি পছন্দসই হওয়া চাই, বরযাত্রীদের আপ্যায়ন, খাওয়া দাওয়া উচিত মানের হওয়া দরকার, সবগুলোই খরচ সাপেক্ষ। 

বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত না হলেও, আত্মসম্মান বোধ প্রচন্ড। কাজেই সবদিক বজায় রাখতে গিয়ে, ধার দেনা প্রচুর হয়ে গেছে। 

বিয়ের লগ্ন ছিল শেষ রাতে, সব অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে প্রায় ভোর হয়ে গেল। পরদিন চলে গেলাম আমার এতদিনের স্মৃতিময় বাড়িঘর ছেড়ে। অতনুদের বাড়িতে পৌছতেই একটা মিষ্টি চেহারার ছোট্টো শিশু কন্যা আমার দিকে ছুটে এলো, আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলাম, বললাম, - খুব সুন্দর সেজেছো তুমি! মেয়েটির ত্বরিৎ উত্তর, - তুমিও! 

অতনু দেখলাম, একটু অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলো আমাদের। পরদিন ফুলশয্যার জন্য সাজানো হচ্ছে, যে ঘরটি, আমাকে অতনুর মা (এখনও শ্বাশুড়ী মা বলতে অভ্যস্থ হই নি) বলে দিয়েছিলেন, এটাই নাকি আমাদের ঘর। ঘরে দেখলাম একটা ডবল বেড খাট, একটা চার দরজার আলমারি, পড়ার চেয়ার টেবিল, বইএর তাক, একটা ইজি চেয়ার এবং একটা কৌচ দিয়ে সাজানো। 

দুজনে একা হতেই অতনু কাছে এসে বলে, - একটা কথা তোমাকে বলা দরকার, আমি কিন্তু এখনও ভালোবাসি মনীশাকে, ওই যে যার ছবি দেওয়ালে টাঙানো দেখছো। বিয়েটা আমাকে করতে হয়েছে মায়ের জবরদস্তিতে। তোমাকে আমি স্ত্রী হিসাবে মেনে নিতে না পারলেও, তোমার যদি অমত না থাকে, তাহলে বন্ধু হতেই পারি। 

শোয়ার সময় দেখলাম, নিজেই কৌচের উপর একটা চাদর পেতে বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়লো। 

এই প্রথম দেখলাম একটি ছেলে আমাকে তোষামোদ করলো না, কোনও আকাঙ্ক্ষার দৃষ্টিতে আমায় দেখলো না। আমার কিন্তু একটু অন্যরকম লাগলো, সত্যি বলতে কি ভালোই লাগলো। 

আমার বিছানা পাতাই ছিল, বেড কভারটা টান মেরে খুলে নিয়ে শুয়ে পরলাম। 

-ছয়-

অতনু গাঙ্গুলী

আমার যা বলার ছিল, অল্প কথায়, প্রথম রাতেই ওকে বলতে পেরে একটু হাল্কা লাগছে। আমার আলাদা শোওয়াতেও দেখলাম কোনও অনুযোগ বা আপত্তি করলো না। 

সকাল হতেই নিজের বিছানা তুলে, খাটে রেখে দিলাম, অন্যকে জানাবার কি প্রয়োজন এইসব কথা! অন্যেরা জানলে জটিলতা বাড়বে বই কমবে না। 

মা জানতে চাইছিলো হানিমুনে কবে এবং কোথায় যাবো! বললাম এই মূহুর্তে অফিসে জয়েন করতেই হবে, ভীষণ জরুরি কাজ আছে। এই বলে এখনকার মতো তো এড়িয়ে গেলাম। 

কিন্তু আমি জানি মা ছাড়বে না, আবার প্রশ্ন করবে। দেখা যাক কতোদিন আটকে রাখা যায়! পরের বার নতুন কোনও বিশ্বাসযোগ্য অজুহাত খুঁজতে হবে। 

তবে অফিসে কাজের ব্যাপারটা একেবারে মিথ্যেও নয়। কাজটা সত্যিই জরুরি, কিন্তু ইচ্ছে থাকলে কি না হয়। আরো দুই বা তিন দিনের বাড়তি ছুটি কি আর ম্যানেজ করে নিতে পারতাম না! পারতাম ঠিকই, কিন্তু সরসীর সাথে আমার যে রকম সম্পর্ক, তাতে আর যাই হোক দুজনে মিলে হানিমুনে যাওয়া চলে না। তাই মুখ বুজে অফিসের কাজে মন দিলাম। 

-সাত-

সরসী বাগচী গাঙ্গুলী

সবাই এতো ভালো ব্যবহার করছে, যেন আমি ওদের কতো দিনের চেনা পরিচিত। সবচেয়ে মিষ্টি অণু মেয়েটি, আমার সাথে খুব ভাব হয়ে গেছে। আমাকে মা বলে ডাকতেও শুরু করেছে, শুনতে কানে লাগছে, কিন্তু মানিয়ে নিতে হলো। 

শ্বাশুড়ী মাকে একা পেতেই বললাম, আমার কলেজ খুলে গেছে, যেতে হবে। উনি মত দিয়ে দিলেন, বললেন গাড়ি করে নামিয়ে দেওয়া হবে। আমি বললাম গাড়ি লাগবে না, আমি নিজেই যেতে পারবো। উনি ছাড়লেন না। এরপরে যে কথাটি বলতে যাবো, সেটার কথা ভেবে মেনে নিলাম। 

বললাম, আমি তিনটি ছাত্রীকে পড়াই এবং যা পাই সেটা আমার মায়ের হাতে তুলে দি, সেটা কিন্তু ছাড়তে চাই না। উনি খানিকটা ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত মেনে নিলেন। আরো বললেন, 

- তোমার হাত খরচের টাকা থেকেও কিছু বাঁচিয়ে যদি তুমি তোমার মায়ের হাতে তুলে দাও, আমি কিছু মনে করবো না। আর এইকথা শুধু তোমার আর আমার মধ্যেই থাক, আর কারো জানার দরকার নেই। 

আমার আর অতনুর মধ্যে যে কোনও সম্পর্ক নেই, সে কথা কাউকে বলতে পারিনি, না বাপের বাড়িতে, না শ্বশুর বাড়িতে। শুধু শুধু মা বাবা কষ্ট পাবে। আর শ্বশুর বাড়ি বললে তো নানান রকম প্রসঙ্গ উঠবে, মাঝখান থেকে আমি অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়বো। 

অষ্টমঙ্গলায় নিজেদের বাড়িতে যখন গেলাম, অতনুর সপ্রতিভ ব্যবহারে সবাই একদম বিমুগ্ধ, মায়ের শ্যেন দৃষ্টিতে পর্যন্ত কোনও কিছু ধরা পড়ে নি। 

-আট-

অতনু গাঙ্গুলী

সরসী মেয়েটি সত্যিই প্রশংসার যোগ্য, কোনও অভিযোগ বা অনুযোগ ছারাই সব কিছু মেনে নিয়েছে। আরও ভালো লাগে এইজন্য যে, আমার সাথে কোনও সম্পর্ক না থাকা স্বত্ত্বেও অণুকে খুবই ভালোবাসে। 

অণুও দেখি মায়ের খুব ভক্ত হয়ে উঠেছে, অবসর সময় মায়ের সাথে গল্প বা খেলা চাই, আজকাল আমার কাছেও একটু কম আসে। বাড়ির সবাইও দেখি সরসীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সরসীকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে একটা চোরাবালির উপর দাড়িয়ে আছে ওর বৈবাহিক জীবন। 

বাড়ির সবার সাথে সরসী এমন ভাবে মিশে গেছে যেন আজন্ম এই বাড়িরই মানুষ। মা একদম ঠিক বলেছিল, গরীব হলেও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। গরীব ঘরের থেকে এতো প্রাচুর্যের মধ্যে এসেও ওর চোখে কোনও দিন লোভের ছায়া দেখতে পাই নি। 

সবচেয়ে ভালো লাগে ওর বই পড়ার সময়, পড়ায় একদম একশো পারসেন্ট নিমগ্ন, অন্য কোনও দিকে মন নেই। এতোটা কনসেন্ট্রেশন দিয়ে যদি আমি পড়তে পারতাম! 

-নয়-

সরসী গাঙ্গুলী

এ বাড়ির সবাই আমাকে স্নেহ ভালবাসা দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে, শুধুমাত্র অতনু ছাড়া। তাতে অবশ্য আমার খুব একটু যায় আসে না। তবে যেমন ভদ্র ব্যবহার পাচ্ছি ওর থেকে, আমিও সেই রকমই ভদ্র ব্যবহার করে যাচ্ছি। কাজেই দূরত্ব ঘুচছে না। 

কলেজে যেতে শুরু করতেই, জীবন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এলো। অবশ্য মা বাবাকে ভীষণ মিস করছি, সেকথা বলাই বাহুল্য। কলেজ শেষে, কলেজের কাছেই একটা বাড়িতে, একই পাড়ার তিনটি মেয়ে এসে জড়ো হয়, অঙ্ক আর বিজ্ঞানের বিষয়গুলির ট্যিউশন নেয়। শুনলাম ওদের ক্লাশেরই আরো একটি মেয়ে নাকি জয়েন করতে চায়। সপ্তাহে তিন দিনের ট্যিউশন, আর একজন এ্যাড হলে তো ভালোই। 

একটা জিনিসে একটু অস্বস্তি হয়, কলেজ শেষ হওয়ার আগেই গাড়ি এসে দাড়িয়ে থাকে আমার জন্য, সেই গাড়ি নিয়েই যেতে হয় ট্যিউশনীর জন্য। কিছুদিন পর অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। 

কাজের দিনে অণু আমাকে বেশি পায় না। কিন্তু যতটুকু পায়, বেশ বুঝতে পারি আমার প্রতিক্ষায় থাকে। শিশুটি আমাকে যেভাবে জড়িয়ে ধরেছে, ওর জন্যে আমিও একটা আন্তরিক স্নেহের টান অনুভব করি। ওকে একটু দেখতে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্য মনটা ছটফট করতে থাকে। 

আর ছুটির দিন গুলোতে, আমার পড়াশুনা ছাড়া বাকি সমযটা ওকে নিয়েই কাটে। সেদিন কি কারণে যেন কলেজ তারাতারি ছুটি হয়ে গেছে, ট্যিউশন ছিল না সেদিন, বাড়ি ফিরে এলাম। অণু খুব খুশি, ওকে নিয়ে ছাদে যেতে হলো। বায়না হলো লুকোচুরি খেলতে হবে ওর সাথে। 

রুমাল দিয়ে আমার চোখ বাঁধা, আমি তো জানি ও কোথায় কোথায় লুকোয়। ওকে একটু সময় দিয়ে অন্ধকার হাতড়ে বেড়াচ্ছি, নাহলে খেলাটা জমবে কেমন করে! এমন সময় হঠাৎ একটা শক্ত কিছুতে হোচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম, কে যেন আমায় জড়িয়ে ধরলো। চোখ খুলে দেখি অতনু। ছিটকে সরে গিয়ে বললাম, - স্যরি, দেখতে পাইনি। 

ও বললো, - স্যরি কেন, চোখ তো বাঁধা ছিল দেখতে পাবে কেমন করে! 

এই প্রথম অতনুর কন্ঠে একটু উষ্ণতার স্পর্শ অনুভব করলাম! 

-দশ-

অতনু গাঙ্গুলী

অফিসে খুব কাজের চাপ বেড়ে গেছে। অল্প কদিন আগে আই-টির গোটা দুয়েক মস্ত বড়ো অর্ডার এসেছে। তারমধ্যে সবচেয়ে বড়ো অর্ডারটা আমার গ্রুপে এক্সিকিউট করতে দেওয়া হলো। এখনও তো প্ল্যানিং স্টেজে আছে, এরপর কাজের চাপ আরো বাড়বে। 

কদিন আগে মায়ের শরীর খারাপ ছিল, তাই একটু তারাতারি ফিরলাম। বিশেষ কিছু না, সামান্য প্রেশার বেড়েছে। আসল কথা সেদিন কাজে মন বলছিলো না। মনটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। 

চা খেয়ে ভাবলাম ছাদে গিয়ে একটু খোলা হাওয়ায় ঘুরে আসি। ছাদে পা রাখতেই সরসী আমার জুতোয় হোচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল, ভাগ্যিস ধরে ফেলেছিলাম, নইলে একটা এক্সিডেন্ট ঘটে যেতে পারতো। 

সরসী মেয়েটি খুব ইনটেলিজেন্ট, সামান্য যেটুকু পড়ার সময় পায়, তাইতেই বি এস সি পার্ট ওয়ানে দারুণ রেজাল্ট করেছে। 

হাই ফার্স্ট ক্লাস তো বটেই। কলেজ টপার, ইউনিভার্সিটির্্যাঙ্কিং জানিনা। তাছাড়া কথাবার্তা, আচার ব্যবহারে একটা নম্র কিন্তু সফিস্টিকেশন আছে। অণুকেও সত্যিই খুব ভালোবাসে। অণুতো আজকাল মাকে পেলে আমার কাছে আসেই না। 

কি জানি, আজকাল মনটা কেন মাঝে মাঝেই ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আগে যেমন সর্বক্ষণ মনীশা মনটা জুড়ে থাকতো, আজকাল সেই ফিলিংটা আর ঠিক আসে না, কেন কে জানে! 

-এগারো-

সরসী গাঙ্গুলী

পার্ট ওয়ান পরীক্ষা হয়ে রেজাল্ট বেড়িয়ে গেছে। কলেজ এখন ছুটি। মাঝে মাঝেই মা বাবার সাথে দেখা করতে যেতে পারছি। আমার স্টাইপেন্ডের টাকায় নিজের খরচটা চলে যায়। হাত খরচের টাকা যেটা শ্বাশুড়ী জমা দেন, সেটা নিতে প্রথমে আপত্তি করেছিলাম, উনি শোনেন নি। ভীষণ অস্বস্তি হয় ওটা নিতে। 

এছাড়া ছাত্রীও এখন তিনজনের জায়গায় চারজন হয়ে গেছে, ফলে মায়ের হাতে এখন অনেকটা বেশি দিতে পারছি। বাবা মা কিছুতেই নিতে চাইছিল না, অনেক জোড়াজুড়ি করে শেষ পর্যন্ত দিতে পেরেছি। 

বাবার স্কুল এখনও খোলে নি। বাবা একটা প্রাইভেট কোচিং ক্লাশের সেন্টার খুলেছে, মা তো বললো ভালোই চলছে। তবে বুঝতে পারি বাবা খুবই ব্যাস্ত থাকে আজকাল। দেখে বেশ ভালো লাগলো। আমার জন্যে মা বাবার অবস্থা খারাপ জেনে মনের মধ্যে একটা কাঁটা সব সময় খোঁচা মারতো। সেটা দুর হয়ে গেছে দেখে নিশ্চিত হয়ে ফিরলাম। 

কলেজ ছুটি থাকায় অণুকে আজকাল অনেকেটা সময় দিতে পারছি, ফলে ওও খুশি, আমিও খুশি। কেন জানি না, অণুর সাথে হাসি খেলায় সময়টা আমার বেশ ভালোই কাটে। মেয়েটির মধ্যে একটা মিষ্টি আকর্ষণীয় জাদু আছে। 

-বারো-

অতনু গাঙ্গুলী

আমার বস অমিতাভ নটরাজন আই টি ফিল্ডে সারা ভারতে একজন নামজাদা লোক। বছরের বেশির ভাগ বিদেশে কাটাতে হয়, ফলে কোলকাতা সেন্টারের ইনচার্জ এর দায়িত্বও অনেকটা সময় আমাকেই সামলাতে হয়। 

আমার বিয়ে ও বৌভাতের সময় থেকে উনি লম্বা ট্যুরে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশগুলোতে ছিলেন। ফিরে এসে আমায় কংগ্রাচুলেট করলেন। বিয়ের গিফট হিসাবে হাতে ধরিয়ে দিলেন দুজনের ল্যান্সডাউন ভ্রমণের জন্য চার রাত পাঁচ দিনের একটা প্যাকেজের টিকেট। কোলকাতা দিল্লি কোলকাতা এয়ার ফেয়ার, দিল্লি ল্যান্সডাউন দিল্লির ক্যাব, হোটেল, খাওয়া দাওয়া এবং আনুসাঙ্গিক বেড়াবার ক্যাব ইত্যাদি সবই ধরা আছে প্যাকেজে। 

উনি ধরেই নিলেন যে, উনি ছিলেন না বলেই অফিস সামলে আমি হানিমুনে যেতে পারিনি। ল্যান্সডাউন আমার দেখা নেই এবং অনেক দিন ধরেই যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল, মনটা তাই খুশিতে ভরে উঠলো।

কিন্তু একটা খটকা মনের মধ্যে কাঁটা হয়ে বিঁধছে শুধু। সরসী কে নিয়ে একা দুজনে কোন মুখে বেড়াতে যাই! একথা বলতেও পারছি না কাউকে। শেষ পর্যন্ত অনেক ভেবে চিন্তে, যে ট্র্যাভেল এজেন্সির টিকিট, তাদের অফিসে গিয়ে কথা বললাম। বছর দুয়েকের এক শিশুকে প্যাকেজে এ্যাড করতে চাই, কয়েক মিনিটে সব ব্যাবস্থা হয়ে গেল। পেমেন্ট করে খুশি মনে আমি বাড়ির পথ ধরলাম। 

-তেরো-

সরসী গাঙ্গুলী

হানিমুনে যাওয়া হবে জেনে একটু অস্বস্তি হচ্ছিলো। দুজনের মধ্যে মাপা সম্পর্ক, মাপা কথাবার্তা, ফলে ভ্রমণ কাহিনী বোরিং হয়ে যেতে বাধ্য। মাঝখানে তবু অণু থাকবে বলে একটু ভালো লাগছে।

বাবার কাছে ল্যান্সডাউনের অনেক গল্প শুনেছি। সেসব অবশ্য বহু দিন আগের কথা। বাবার তখন যুবক বয়স, দেশভাগের অনেক আগে। তবে সেসব গল্পের সাথে আজকের ল্যান্সডাউন যে মিলবে না, সেকথা জানি। 

  সময় মতো এয়ার পোর্ট পৌছে গেলাম। অন লাইনে চেক ইন করাই ছিল, সিকিউরিটি চেক করিয়ে ভেতরে গিয়ে বসলাম। অতনু কেবিন লাগেজগুলো আমার কাছে জমা রেখে একটু দুরে গিয়ে কার সাথে কথা বলতে শুরু করলো। মনে হলো অফিসের কোনও সহকর্মী।

ফ্লাইটে চড়ে অণুর আবদারে ওকে উইন্ডো সিটটা ছেড়ে দিতেই হলো, ফলে মাঝখানে আমি এবং কোনের সিটে অতনু আমার পাশে, এই ভাবে বসতে হলো। অতনু মনে হয় আন্তরিক ভাবেই স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। গল্প করে গেল প্রায় পুরো সময়টাই। বেশ কথা বলতে পারে ছেলেটি, এতদিনতো ভদ্রতার মুখোশ পড়া কথাই শুধু বলতো দুই একটা, তাই বুঝতে পারি নি। বেশ কায়দা করে আমার পছন্দ অপছন্দের সমস্ত খোঁজ খবর নিয়ে নিল। 

লান্সডাউন একটা খুব সুন্দর হিলী স্টেশন। দিল্লি থেকে বাই রোড দুশো আশি কিলোমিটার রাস্তা, তারমধ্যে আবার শেষ চল্লিশ কিলোমিটার নাকি খাড়া চড়াই। সাইট সিইং এর অনেক গুলো পয়েন্ট আছে, ডায়েরিতে সব নোট করে রেখেছি। ওখানে যাবো বলে গুগলে একটু খোঁজ খবর নিয়ে নিলাম। 

দিল্লি পৌছে লাগেজ পেতে বেশ খানিকটা দেরি হলো। যাই হোক লাগেজ নিয়ে বাইরে বেরুতেই দেখি এক ক্যাবওয়ালা অতনুর নাম লেখা প্ল্যাকার্ড ধরে দাড়িয়ে আছে। 

-চৌদ্দ-

অতনু গাঙ্গুলী

দিল্লি থেকে ক্যাবে ছয় থেকে সাত ঘন্টার পথ ল্যান্সডাউন। হোটেল বুকিং আছে ব্লু পাইন রিসর্টে। ড্রাইভার সঞ্জয় সিং এর সাথে ভাব জমিয়ে নিলাম। ও জানালো সকাল আটটায় বেসমেন্ট ওয়ানে রেস্টুরেন্ট কজি ট্রিটে কমপ্লিমেন্টারি বুফে ব্রেকফাস্ট শুরু হয়, ব্রেকফাস্ট নিয়ে একঘন্টার মধ্যে সারাদিনের মতো বেড়াবার জন্য রেডি হয়ে থাকতে হবে। 

প্রতিদিন সকাল নটার সময় ও আসবে। মোটামুটি এগারোটা পয়েন্ট আছে দেখার। প্রথম দুদিন ও শেষ দুদিন সাইট সিইং, মাঝখানে একদিন ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি, কেনাকাটা করা ইত্যাদি। 

বেশ ওয়েল প্ল্যানড প্যাকেজ। পৌছতে পৌছতে দুপুর হয়ে গেল, রুমটা খুব সুন্দর, হিমালয়ের অপূর্ব দৃশ্য দেখা যাচ্ছে তিন দিক থেকেই। চটপঢ্যট রেডি হয়ে লাঞ্চ সেরে বেড়িয়ে পরলাম। 

সরসী দেখলাম আমার মতোই বেশ গোছানো এবং চটপটে। নিজের সাথে সাথে অণুকেও গুছিয়ে রেডি করে নিলো খুব তাড়াতাড়ি। শুরু হয়ে গেল আমাদের ল্যান্সডাউনের সাইট সিইং। 

সবচেয়ে ভালো লাগলো, কোনও তাড়াহুড়োর ব্যাপার নেই, অপর্যাপ্ত সময় নিয়ে এক একটা পয়েন্ট দেখার ব্যাবস্থা। 

সরসী দেখলাম আমার মতো এত বেশি কথা বলে না, কিন্তু খুব গুছিয়ে কথা বলতে জানে। কিছুক্ষণ কথা বললেই বোঝা যায় ওর ইন্টেলিজেন্স লেভেল সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। 

-পনেরো-

সরসী গাঙ্গুলী

দুদিন খুব সুন্দর সাইট সিইং করা হলো। এখানে এসে অবধি অন্য এক অতনুকে দেখছি। খুব সুন্দর কথা বলে আর সেন্স অব হিউমার, যেটা বেশির ভাগ লোকের থাকে না, সেটা ওর মধ্যে আছে দেখে বেশ লাগলো। তাছাড়া খুব কেয়ারিং, শুধু অণুর ব্যপারেই নয়, আমার ব্যাপারেও। এছাড়াও গোছানোর কাজ অর্ধেকটা নিজেই করে নেয়। ফলে আমার খুব সুবিধা, আমার কাজ অর্ধেকটা ও নিজেই করে নিচ্ছে। 

অণুতো বেড়াতে এসে খুবই এক্সাইটেড। সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য বিভোর হয়ে দেখে, খুব ভালো লাগলে একটু হাততালি দেয়। আরও একটা ব্যাপার খুব মিষ্টি লাগে, এটা চাই ওটা চাই বলে একদমই বিরক্ত করে না। যেটাই ওকে আমি বা ওর বাবা আমরা নিজের থেকে কিনে দেই, তাতেই খুশি। 

তৃতীয় দিনের ভোর, বাইরে চমৎকার আবহাওয়া। অতনু আমায় ডেকে বললো, 

- চলো একটু মর্নিং ওয়াকে যাওয়া যাক। 

আমিও এটাই চাইছিলাম, কিন্তু অণু? ওর তো ঘুম ভাঙতে এখনও এক ঘণ্টা। 

অতনু বলে, - আমরা আধ ঘন্টায় ফিরে আসবো, রুমটা লক করছি না, টেনে বন্ধ করে দিচ্ছি। ও তো ডোর হ্যান্ডেলে হাত পাবে না। রিসেপশনে বলে যাবো, ওরা মাঝখানে একবার খোঁজ নিয়ে নেবে। 

সকালের শীত শীত আবহাওয়ায় দারুণ লাগলো বেড়াতে। কিন্তু ফিরে দেখি অণু নেই ঘরে। দরজার কাছে বেতের স্টুলটা টেনে আনা রয়েছে। রিসেপশনে জিজ্ঞাসা করতে জানালো, আমরা যাওয়ার দশ মিনিট পর ওরা লোক পাঠিয়ে দেখে এসেছে বেবি তখনও ঘুমাচ্ছে। 

অতনু সঙ্গে সঙ্গে থানায় ফোন করে, ছুটে বেড়িয়ে গেল আশেপাশে খুঁজতে, সাথে সাথে আমিও। টেনশনে দুজনের মুখে কথা নেই। আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। একটা ক্যাব ধরে থানায় গিয়ে শুনলাম, একটা দুই বছরের বেবি, পাহাড়ি পথে হোচট খেয়ে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট খেয়েছে, লাল ফ্রক পরণে, কাছেই এক নার্সিং হোমে ভর্তি। 

শুনে দুজনেরই বুক শুকিয়ে এতটুকু, কাল রাতের নাইট ড্রেসটাতো ওর লালই ছিল, পুলিশের গাড়িতে নার্সিং হোমটার পথে ছুটে যাওয়া হলো। আমার বুকটা হাপরের মতো ওঠা নামা করছে। কেন আমি অতনুর কথায় মর্নিংওয়াকে যেতে রাজি হলাম! 

নার্সিং হোমে পুলিশের সাথে ঢুকে, শিশু পেসেন্টটিকে দেখে, ঘাম দিয়ে জ্বর নামলো। না অণু নয়, অন্য কেউ। কিন্তু তাহলে অণু কোথায়? 

হোটেলে ফিরে অতনু রিসেপশনের ছেলেটিকে উত্তম মধ্যম ঝেড়ে কৈফিয়ত চাইলো। ছেলেটি বলে, 

- স্যার বেবিটি যদি বাই চান্স নীচে নেমে আসতে পারে, তাহলে পিছন দিকে একটা দরজা আছে। কাস্টোমার এরিয়া নয় বলে, ওটা সব সময় গার্ডেড থাকে না। 

আমরা ছুটলাম সেই দিকে, বাইরে বেরুতেই একটা ঘোরানো পাহাড়ী রাস্তা। সরু রাস্তাটায় দুটো কুকুর মুখোমুখি দাড়িয়ে ঝগড়া বা ঘেউ ঘেউ করছে, দুটোরই শ্বদন্ত বার করা, চোখে মুখে এক হিংস্র ভাব। আর তার ঠিক পাশে রাস্তার উপর ফুট দুয়েক উঁচুতে দাড়িয়ে মজা দেখছে অণু। অবাক বিস্ময় ওর চোখে মুখে! যে কোনো মূহুর্তে কুকুরগুলো অণুকে কামড়ে দিতে পারে, কিন্তু সেদিকে ওর বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। 

কুকুরকে আমি ছোটোবেলা থেকেই ভীষণ ভয় পাই। কিন্তু, আমার শিশু কন্যাটির বিপদ দেখে, সেই মূহুর্তে সব কিছু উপেক্ষা করে, কুকুরদুটোর মাঝখান দিয়েই ছুটে গিয়ে অণুকে জড়িয়ে ধরলাম। অতনুও ঠিক সেই মূহুর্তে অণুকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে আমাকে শুদ্ধু অণুকে জড়িয়ে ধরে। 

অতনুর উষ্ণ স্পর্শে এক অনাস্বাদিত আবেগে আমার সর্বশরীর রোমাঞ্চিত হতে লাগল। হোটেলে ফিরে অতনু বলে, 

- ফুলশয্যার রাতে যা বলেছিলাম, যদি পারো তো ভুলে যেও, সেটা ছিল সেই মূহুর্তের কথা মাত্র।