1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label প্রদীপ দে. Show all posts
Showing posts with label প্রদীপ দে. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

ভবিষ্যতের ছায়া

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

ভবিষ্যতের ছায়া

 প্রদীপ দে 

সাল ২০৪৫।

পৃথিবীর আকাশে তখন আর পাখির ঝাঁক উড়ত না, উড়ত ড্রোনের বহর। মানুষের হাতে ফুলের তোড়ার বদলে ছিল নিরাপত্তা চিপ, আর সীমান্তের কাঁটাতার ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল অবিশ্বাসের দীর্ঘ ছায়া।

কলকাতার এক সাধারণ স্কুলশিক্ষক অর্ণব সেন প্রতিদিনের মতো জানালার ধারে বসে খবর শুনছিলেন। টেলিভিশনের পর্দায় একটাই সংবাদ ঘুরে ফিরছিল—বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা চরমে। সাইবার আক্রমণ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে পৃথিবী যেন এক অদৃশ্য আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে।

অর্ণবের দশ বছরের মেয়ে মেঘলা প্রশ্ন করল,

—“বাবা, তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ কি সত্যিই হবে?”

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,

—“যুদ্ধ কখনো হঠাৎ হয় না মা। মানুষের ভয়, লোভ আর অহংকারই তাকে ডেকে আনে।”

কয়েক মাস পরেই সেই আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হলো।

একটি শক্তিশালী দেশের সামরিক উপগ্রহ রহস্যজনকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। দোষ চাপানো হয় প্রতিপক্ষের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হামলা। প্রথমে সাইবার যুদ্ধ—বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, হাসপাতাল সব অচল হয়ে পড়ে। তারপর শুরু হয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত।

কলকাতার রাতগুলো হঠাৎ অন্ধকারে ডুবে গেল। ইন্টারনেট নেই, যোগাযোগ নেই, বাজারে খাবারের সংকট। মানুষ বুঝতে পারল, আধুনিক সভ্যতা কতটা ভঙ্গুর।

একদিন স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে বসে অর্ণব দেখলেন শত শত মানুষ নিরাপত্তার আশায় জড়ো হয়েছে। সেখানে কোনো ধর্ম, জাতি বা দেশের বিভাজন ছিল না। সবাই শুধু মানুষ।

মেঘলা একটি খাতায় লিখছিল। অর্ণব জানতে চাইলেন,

—“কি লিখছ?”

মেয়েটি মৃদু হেসে বলল,

—“যুদ্ধ শেষ হলে পৃথিবীকে কেমন দেখতে চাই, সেটা লিখছি।”

খাতার পাতায় লেখা ছিল—

"আমি এমন একটি পৃথিবী চাই, যেখানে সীমান্ত থাকবে মানচিত্রে, মানুষের মনে নয়। যেখানে বিজ্ঞান জীবন বাঁচাবে, ধ্বংস করবে না। যেখানে শিশুরা বোমার শব্দ নয়, পাখির গান শুনে বড় হবে।"

অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।

যুদ্ধ চলল আরও কয়েক মাস। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ক্ষতবিক্ষত হলো। অবশেষে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত বিশ্বনেতারা আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হলেন। তারা উপলব্ধি করলেন—যে যুদ্ধে কেউ জেতে না, তাকে যুদ্ধ বলা যায় না;

 সেটি কেবল মানবতার পরাজয়।

দুই বছর পর পৃথিবী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। নতুন আন্তর্জাতিক চুক্তি হলো। অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবর্তে শুরু হলো পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য যৌথ উদ্যোগ।

একদিন অর্ণব একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের খবর দেখছিলেন। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুরা শান্তির বার্তা দিচ্ছিল। তাদের মধ্যেই ছিল মেঘলা।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে সে বলল—

“তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, মানবতা যদি পিছিয়ে যায় তবে সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। ভবিষ্যৎ গড়বে অস্ত্র নয়, পারস্পরিক বিশ্বাস।”

তার বক্তব্য শেষ হতেই উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দিল।

অর্ণব জানালার বাইরে তাকালেন। বহুদিন পর আকাশে এক ঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—শান্তি কোনো দুর্বলতার নাম নয়; শান্তিই মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় শক্তি।

আর সেই শক্তির ওপর ভর করেই ভবিষ্যতের পৃথিবী একদিন নতুন করে জেগে উঠবে।