![]() |
| ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
পরমা প্রকৃতি রূপে শক্তিময়ী মা দুর্গা
শ্রী রূপম চক্রবর্ত্তী
দুর্গা পূজা নিয়ে আসে বাংলার জীবনে এক নতুন মাত্রা, বাংলার মানুষ মেতে উঠে খুশিতে আনন্দে। এই মাতৃপূজা যদিও মূলত: ধর্মীয় অনুষ্ঠান তবুও বিভিন্ন শ্রেণীর জনসাধারণের আন্তরিক মিলনের ফলে দুর্গাপূজা সামাজিক ব্যপ্তি লাভ করেছে। পূজা নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই পৌরনিক যে কাহিনীগুলো আছে তারও আলোচনা করতে হয়। নারীরূপী মহাশক্তি দুর্গার মোহে মোহিত হয়ে মহিষাসুর দেবীকে ভোগ করার প্রস্তাব করেন। উক্ত পাশবিক ভোগেচ্ছা মহিষাসুরকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। শরৎ আনন্দের সিন্ধু জলে সন্তানদের অবগাহন করানোর মানসে জগৎজননী মা আসেন আমাদের আঙ্গিনায়। মায়ের অমৃত সন্তান সন্ততি মধু মঙ্গলময় ধুপদীপ শংখরবে ও উলুধ্বনিতে মাকে সুস্বাগত জানায়। দুর্গতিনাশিনী দুর্গার আগমনে প্রতিটি প্রাণকেন্দ্রে বিপ্লবের সঞ্চার হয়। রাশি রাশি ঝরা শিউলির কোমল বুকে মায়ের অরুণ রাঙা চরণ চিহ্ন এই পৃথিবীকে আরও সুন্দর এবং সজীব করে তুলে।
মায়ের আগমনী গানে ভক্তরা আনন্দচিত্তে সামিল হয়। যেখানে প্রেমহীন নির্দয় শূন্য মরুভূমিতে অশুভ অহংকারী শক্তির প্রেত নৃত্য চলছে, সম্পদ মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত হচ্ছে, মানুষের প্রচেষ্টা প্রেমার্দ্র দুঃখ মোচনীয় প্রক্রিয়ায় বিনিযুক্ত হচ্ছেনা সেখানে ছড়িয়ে দিতে হবে মায়ের গুণকীর্তন। মায়ের আগমনী বার্তা আমাদের শুভ শক্তি জাগরণের প্রেরণা যোগায়। সুর অসুরের সংগ্রাম চিরকাল দেখা যায়। দেবতা ঐশ্বরিক শক্তিতে শক্তিতে শক্তিমান। কিন্তু দেবতাগণ বিস্মৃত ছিলেন। তাই তাদের উপর পরীক্ষার নিমিত্তে দুর্গতি নেমে আসে। দেবতাগণ অসুরের নিকট পরাজিত হয়ে রাজ্যহারা হন। স্বর্গভ্রষ্ট হয়ে দেবতারা যখন এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা সুর শক্তির আগমনের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। দেবতাদের কাছ থেকে আমরা মহামিলনের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। সামাজিক ঐক্য স্থাপনের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। ঐক্য স্থাপনের জন্য প্রয়োজন সকল শুভ শক্তির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নতুবা অশুভ শক্তির পাদুর্ভাব ঘটবে।
মাতৃপূজায় দেখানো হয়েছে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানুষ কিভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজ নির্মাণ করতে পারেন। মনুষ্য সমাজ অসুর শক্তিকে বিনাশ করে নিজ শক্তি বীর্যবল, কর্মস্পৃহা ইত্যাদির সংমিশ্রণে শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, শাসন, ধনে জনে,উন্নতির চরম ও পরম শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হয়। এই শিখরে আরোহন করতে গেলে আমাদের জীবনে অনেক দুর্গতি আসবে। দুর্গতিপ্রাপ্ত লোকদের দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গা রক্ষা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বিজয় কামনায় শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে অর্জুন শ্রীশ্রী দুর্গার স্তব করেছেন। কৃত্তিবাসী রামায়ণে রাম রাবণের যুদ্ধ কাহিনীতে রামচন্দ্র কর্তৃক শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা করার কথা বলা আছে। তিনি অকালবোধনের মাধ্যমে মাতৃপূজা করেছিলেন। রাবণকে বধ করার জন্য ১০৮ টি নীল পদ্ম দিয়ে রাম অকালে মায়ের পূজা করেছিলেন। যাই হোক শুভ শক্তিকে জাগ্রত করার জন্য এবং আমরা যেন সব রকমের বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি তার জন্য মায়ের পূজা করি। এই কারণে আমরা কোথাও যাওয়ার সময় বলি দুর্গা, দুর্গা। মা শুধু মূর্তি বা মন্দিরে নন। তিনি যেমন আছেন দেবালয়ে তেমন আছেন মানব আলয়ে। তার কাছে সবাই সন্তান।
আমাদের দেশ উৎসবের দেশ, পার্বণের দেশ। বারো মাসে এখানে তের পার্বণ। এক সময় উৎসব-পার্বণে এদেশের মানুষ আনন্দ-সুখে দিন কাটাত। প্রাত্যহিকের বেদনা ভুলে থাকতে পারত। প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী- কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ!’ আমার মা ভক্তদের কাছে বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন মহিষাসুরমর্দিণী, কাত্যায়নী, শিবানী, ভবানী, আদ্যাশক্তি, চণ্ডী, শতাক্ষী, দুর্গা, ঊমা, গৌরী, সতী, রুদ্রাণী, কল্যাণী, অম্বিকা, অদ্রিজা। দেবী দুর্গা পরমা প্রকৃতিরূপে পূজিত হয়েছেন ভারতীয় এবং মূলত বাঙালি সমাজে। তবে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে অবাঙালিরা ভিন্ন ভিন্ন নামে দুর্গাপূজা করেন। যেমন, কাশ্মীর ও দাক্ষিণাত্যে অম্বা ও অম্বিকা, গুজরাটে হিঙ্গুলা ও রুদ্রাণী, কান্যকুব্জে কল্যাণী, মিথিলায় উমা, কুমারিকায় কন্যাকুমারীর পূজা প্রচলিত। পুরান অনুসারে রাজ্যহারা রাজা সুরথ রাজ্য ফিরে পাবার জন্য বসন্তকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। তাই এ পূজার নাম হয় ‘বাসন্তী পুজা’। রামচন্দ্র রাবণবধের জন্য শরৎকালে দেবীর পূজা করেন। অকালে পূজা করেন বলে এর নাম হয় ‘অকালবোধন’। শারদীয়া দুর্গাপূজাই তখন থেকে বেশি প্রচলিত হয়। রাজাহারা যুধিষ্ঠির বিপদনাশ ও রাজ্য ফিরে পাবার জন্য দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন বলে মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে। সবগুলো ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, যুদ্ধজয় ও বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য দেবীর পূজা হয়েছে। দেবী দুর্গা তাই জয়-প্রদায়নকারী ও দুর্গতিনাশিনী।
তবে পরিতাপের বিষয় দুর্গাপূজা থেকে মিলন ও ঐক্য স্থাপনের যে শিক্ষা আমরা পাই সে শিক্ষা থেকে আমরা দিনদিন দূরে সরে যাচ্ছি। চারদিকে চলছে ধর্মের নামে অধর্ম। পূজার নামে চলছে ব্যবসায়। ত্যাগের বহিরাবরণে চলছে বিলাস সামগ্রীর প্রাচুর্যতা। এমত অবস্থায় দেবীর কাছে প্রার্থনা জানাই শক্তিময়ী তুমি আমাদের সাহস দাও, শক্তি দাও, ভক্তি দাও, প্রেম দাও যাতে সুন্দর সুশৃঙ্খল সমাজ নির্মাণ করতে পারি। মাকে ভক্তি করে আরাধনা করলেই তিনি শান্তি প্রদান করেন। মেধস মুনি জানালেন,"আরাধিতা সৈব নৃণাং ভোগস্বর্গাপবর্গদা"। আরাধনা করলেই তিনি উপাসকের ইহকালে সুখ ও পরকালে অশেষ শান্তি প্রদান করেন। আমরা সবাই শান্তি চাই। এই শান্তি নিয়েই যেন সবাই থাকতে পারেন সেটাই প্রত্যাশা করছি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মায়ের চরণে নিবেদন করি-" তোমারে নমিহে সকল ভুবন মাঝে/ তোমারে নমিহে সকল জীবন কাজে/ তনু মন ধন করি নিবেদন আজি / ভক্তি পাবন তোমার পূজার ধুপে।" গ্রাম-বাঙলার শারদ আকাশে বাজতে থাকে মায়ের আগমনীর সুর। এই সুর প্রতিটি মানুষের মনে মানবতার ঝংকার তুলুক। যেখানে থাকবে প্রেম, যেখানে থাকবে নির্ভেজাল ভালোবাসা। মানুষে মানুষে স্নেহ থাকুক, মমতা থাকুক।


