![]() |
| ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence) |
ইউরোপের টোপ, মস্কোর মশকরা আর কিয়েভে কী ভেবে!
সোমা দে
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
প্রায় ১৬ বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে সফর চলছে। মূলত কর্মযোগে। সফরের সবই মসৃন তো নয়। পথে নানা ঝুঁকি। তারই কিছু বিশেষ রইলো এইখানে।
সেসময় আমি শুধু দৌড়োচ্ছি। এক সপ্তাহ গ্রীনল্যান্ডে, আর পরের সপ্তাহে মালদ্বীপ, তারপরে অন্য কোথাও, এবং তারপরে অন্য কোনখানে। যাত্রাপথের নানা মাধ্যম, বাস, ট্রাম, ট্যাক্সি, উড়োজাহাজ, জলজাহাজ, এদের মাধ্যমে আবহাওয়া, তাপমাত্রার তোয়াক্কা না করে ছুঁটছি। এই ছুটন্ত ঘোড়া সবে যখন ছুটতে শিখছে, উপনীত হয়েছে ফ্রান্সের Toulouse শহরে, সাল ২০১০। কথা ছিল, ৪ দিন পরে যেতে হবে বেলজিয়ামে, ফ্লাইটে। দিন চলছে। হঠাৎ খবর এলো, আইস্ল্যাণ্ড থেকে ভলকানো এমন ফুলেফেঁপে উঠেছে যে তার ধোঁয়ায় ইউরোপের ফ্লাইটের রাস্তা প্রায় বন্ধ। প্রথমে তেমন আমল দিই নি। ধীরে ধীরে লন্ডনের Heathrow এর মতো ব্যস্ত এয়ারপোর্টও যখন জানালো, ইউরোপের মধ্যে সব ফ্লাইট আপাতত স্থগিত, ভিতরে শুরু হলো দুশ্চিন্তা। কিভাবে বেলজিয়াম যাবো! চুপচাপ বসে থেকে কবে ভলকানোর ঝলকানো শেষ হবে, অপেক্ষা করাই যেত! কিন্তু আমি দেখলাম, স্থানীয় মানুষ ট্রেন ব্যবহার করছেন। আকাশপথ বন্ধ হলেও স্থলপথ বলবৎ। তাই ঠিক করলাম ট্রেনে যাওয়া যাক, বেলজিয়াম। টিকিট ইত্যাদি নিজেকেই কাটতে হবে। ওই সময়ে ট্রেনস্টেশন জনাকীর্ণ, কারণ সকলের কাছেই ওইটিই একমাত্র পথ। অন্য বেশ কিছু শহরের মতো সেইসময় ফ্রান্স শহরে ইংরিজি বলার চল সাধারণের মধ্যে কম। কষ্ট করে বুঝে একটি অতিশয় লম্বা লাইনে দাঁড়ালাম। কাউন্টারে পৌঁছে হাঁকুপাঁকু করে যখন বেলজিয়ামের টিকিট চাইলাম, জানলাম এই লাইনটি লোকাল যাত্রার। দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য যে টিকিট কাউন্টার, সেটি ঐদিকে, বলে যেদিকে দেখলাম, সেখানে আরও একটি অতীব লম্বা লাইন। বুঝলাম পরিস্থিতি ভয়ানক। চারিদিকে মানুষের মুখে আশংকা, কবে পৌঁছবে, কখন পৌঁছবে এই নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা। এইখানে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়া ভালো যে, হোয়াটস্যাপ, জিপিএস, 4G ইত্যাদি তখন দুর্লভ অথবা অনুপলব্ধ। যোগাযোগ বলতে টেলিফোন কল এবং তা বিদেশে যথেষ্ট ব্যয়বহুল। যাইহোক, ইন্টারন্যাশনাল কাউন্টার থেকে টিকিট নিতে গিয়ে দেখলাম উনি তিনটে টিকিট দিলেন। Toulouse থেকে Bordeaux, Bordeaux থেকে Paris এবং Paris থেকে Brussels, এইভাবে পৌঁছতে হবে বেলজিয়াম। অর্থাৎ তিনটি ট্রানসিট ট্রেন। এবং মাঝে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের সময় ব্যবধান। দেখেই মাথায় হাত। শুধু তাই নয়, প্যারিসে কেবল প্লাটফর্ম চেঞ্জ করতে হবে না, স্টেশনও চেঞ্জ করতে হবে। মাথা ঘুরছে। চোখে সর্ষে ফুলও যে দেখছি, সে শক্তিও নেই। শুধু অন্ধকার। কলকাতা শহরের শিয়ালদহ আর হাওড়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মন প্রমাদ গুনছে, এই যাত্রা খুব সুখকর হবে বলে মনে হয়না। আমার মুখ-চোখের ভয়ানক অবস্থা দেখে কাউন্টারের ভদ্রমহিলা আশ্বস্ত করলেন বটে, তবু দুশ্চিন্তা কাটে না। টিকিট নিয়ে হোটেলে ফিরে ব্যাগ গোছালাম। ট্রেন পরের দিন সকালে। সারারাত কাটলো নির্ঘুম। পরের দিন হুড়োহুড়ি করে বিশাল ব্যাগ নিয়ে পৌঁছে গেলাম স্টেশনে। ট্রেনে যাওয়ার কথা ভাবা ছিল না, তাই ব্যাগের আয়তন ফ্লাইট-উপযুক্ত। এখন হ্যাচরপ্যাচর করে কোনোরকমে সামলাই। সামনে সিঁড়ি এবং escalator. হায়! escalator কাজ করছে না। দিশাহারা হবো হবো, ওকি একজন ইউরপিয়ান ভদ্রলোক আমার পাশ দিয়ে গিয়ে আমার ব্যাগটি নিয়ে তরতর করে উঠে পড়ছেন escalator এ। ভাবলাম একি একি! নিয়ে পালাচ্ছে নাকি! ওবাবা না, উপরে উঠে আমার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছেন আমার ওঠার। সাহায্য করলেন, কিছু না বলতেই। বিদেশে অচেনা মানুষের এমন সহায়তা, অচেনা জায়গা হঠাৎ কেমন ভালোবাসার হয়ে গেলো। একটি জায়গা শুধুই তো তার দর্শনীয় বস্তুগুলোর জন্য নয়। মানুষ, পরিবেশ এবং আরও বিষয় থাকে। যেমন দেখি, ট্রেন আগেই এসে হাজির। ট্রেনে জায়গা অনেক। কেউ দাঁড়িয়ে নেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কেউ ঘাড়ের ওপর উঠে পড়ছে না। ট্রেন ছুটতে শুরু করলো, সাথে মনের পরিবর্তন। ভিতরে আরামে বসে, বাইরে মনোরম সবুজ দৃশ্য, একের পর এক রং, রস, গন্ধ! হঠাৎ মনে হলো, এই ট্রেন জার্নি না করলে, ইউরোপ দেখাই অপূর্ণাঙ্গ থেকে যেত। Bordeaux তে পৌঁছলাম নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগেই। এবং যেই প্লাটফর্মে পরবর্তী ট্রেন, তা একেবারে চোখের সামনেই, এবং ট্রেন দাঁড়িয়ে আছেই। মসৃণ এবং স্নিগ্ধ। এভাবেই পৌঁছলাম প্যারিস। স্টেশনের বাইরে ট্যাক্সি। ট্যাক্সির ভদ্রলোককে মনে হলো, জিজ্ঞেস করি, কোনোভাবে আইফেল টাওয়ার দেখা যায় কিনা স্টেশনে যাওয়ার পথে। হাসিমুখে রাজি হলেন। মাত্র ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে আইফেল টাওয়ারের আইকনিক এই অবয়ব দেখে টুক করে মোবাইলে একটি ছবি তুলে ঝটপট উঠে পড়লাম ট্যাক্সিতে। ধীরে ধীরে পৌঁছলাম Brussels. আর পরের দিন অফিসে আমাকে দেখে সবাই অবাক। কেউ ভাবতেই পারেনি আমি এসে পৌঁছবো এই সংকটের মধ্যে। যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেই নিজেকে ২৪ ঘন্টা আগে দুষছিলাম, শেষে দেখলাম তা হলো বলেই, জীবনের পাতায় একটি জাঁকাল পাতা যুক্ত হলো।
কাজের সূত্রে এবার চললাম মস্কো। এর আগেও বার কয়েক গিয়েছি, ঘটনাচক্রে তা জুন-জুলাই ছিল। এবার জানুয়ারীর শুরুতে যেতে হচ্ছে ভেবে গুগল খুলে টেম্পারেচার দেখতে গেলাম। দেখে হার্টে একটা চিনচিন অনুভব করলাম, মাইনাস টোয়েন্টি এইট ডিগ্রী সেলসিয়াস। রিয়েলি? আর ইউ সিরিয়াস!! চোখে ভুল দেখছি কি? কচলে, মচলে আবার দেখি, মাইনাস টোয়েন্টি এইট। এবার চোখে সর্ষের ফুল, সব যেন ধোঁয়া ধোঁয়া। সবকিছুরই সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেওয়া বাঙালির রক্তে। গুগলকে অবিশ্বাস করার ধৃষ্টতা দেখালাম, আরও বার দশেক অন্য সাইট চেক করলাম, ড্যাম, একই রেজাল্ট। প্লাস ফিফটিনের কলকাতায় বসে মাইনাস টোয়েন্টি এইট কল্পনা করা অসম্ভব জেনেও চেষ্টা করতে গিয়ে ভীষণ বিষম খেলাম। হার্টে চিনচিনের সাথে এবার মাথা ভোঁ ভোঁ, পেট গুড় গুড় শুরু হলো। টেম্পারেচার এনালিসিস করতে গিয়ে জানলাম রাশিয়া পৃথিবীর শীততম দেশগুলির মধ্যে একটি। যাই হোক যেতে যখন হবেই, ভাণ্ডার খুঁজে বার করা গেলো যেসব শীতের পোশাক যারা এতদিন ন্যাপথলিনের আবেশে মাখা, যারা আলোর মুখ দেখেনি বহুশতক হয়ে গেলো। কলকাতাতে নেহাতই তাদের গুণের কদর ছিল না। এবার পূর্ণ মর্যাদা পাবে বুঝে তারাও বেশ ফুলে-ফেঁপে। দু'টি নিতেই বাক্স-পেটরা ফুল। তার পরে বেশ টেনশনের রাতগুলো কাটিয়ে পোঁছলাম "মস্কোভা"। এয়ারপোর্টে পৌঁছে বোঝার উপায় নেই বাইরে কি অপেক্ষা করছে। ব্যাগপত্তর গুছিয়ে বাইরে আসতে আসতেই রাত, মানে টেকনিক্যালি সকাল ২:৩০. টম ক্রুসের লুকওয়ালা ড্রাইভার আমার নামওয়ালা সাইন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে এঞ্জেলিনা মনে হলো। গটগট করে এগিয়ে গেলাম, বলতে পারেন ভেসে গেলাম। হঠাৎ মনে পড়লো ক্যাশ চাই। ঠান্ডার ডান্ডাতে বাকি সব ভুলেছি। কার্ডটা ভুলিনি ভাগ্যিস। সামনেই ৪ টি এটিএম মেশিন। বীরবিক্রমে এগিয়ে গেলাম টম করুইস আমার ব্যাগটি নিয়ে আমাকে খানিক বোঝা মুক্ত করে বাধ্য ছেলের মতো পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। এটিএম এ কার্ড ঢুকিয়ে এদিক ওদিক টেপাটেপি করতেই দুমদাম রাশিয়ান ফরফে কি সব এসে সব শান্ত। এক সেকেন্ড - দু সেকেন্ড - তিন - চার - পাঁচ -ছয় শান্ত। ইতনা সন্নাটা কিউ হ্যায় ভাই! মানে? টাকা? কার্ড? টাকা বেরোলো না। কার্ডও না। অসহায় চোখে তাকাই এদিক ওদিক। ক্যানসেল টেপাটেপি করি, নাথিং। মানেটা যা দাঁড়ালো তা হলো এটিএম এর খিদে পেয়েছিলো মাঝরাতে, বাঙালির যেমন পায়, ফ্রীজে রাখা মিষ্টির খিদে। এরও পেয়েছিলো, খেয়ে নিলো আমার কার্ড। আমার ততক্ষনে মাথায় হাত, চোখ কপালে এবং আর যা যা কিছু ওপরে ওঠা বা নিচে নামা সম্ভব। চোখ ফেটে কান্না বেরিয়ে আসে প্রায়, টমবাবু আন্দাজ করে ছুটে আসে।কিন্তু রাশিয়ার অধিকাংশের মতো উনিও ইংরিজি বলেন না। নানা অঙ্গ-ভঙ্গি হলো, আসেপাশের অনেকে এসে আরো টেপাটেপি করলেন। এটিমের বোধহয় ততক্ষনে খাবার স্টমাক পেরিয়ে ইন্টেস্টাইনে। নো মোর আশা। প্রায় কেঁদে ফেলবো এই সময়ে, হঠাৎ দেখি টম নেই। হাওয়া। জাস্ট ভ্যানিশ। ব্যাগটা? আমার ব্যাগটা? তাও নেই। ধপ করে বসে পড়লাম। হায় মনুষ্যত্ব হারানোর কম্পেটিশনে এরাও তাহলে প্রতিযোগিতায়। নিজেকে অসহায় মনে হলো। কি করবো, কি করা উচিত, এসব ভাবার মানসিক স্থিতি তখন হারিয়েছি। একটা শুন্যতা। ব্ল্যান্ক। এমটিনেস। গলা ছেড়ে কাঁদতে পারলে ভালো লাগবে মনে হলো। কিন্তু না, আমরা শহুরে সভ্য আর্বানীটির তত্ত্বাবধানে অভ্যস্ত। বেসামাল হলে চলবে না। হাসি পেলে মুখ টিপে। কান্না পেলে লুকিয়ে। কলকাতা হলে এতক্ষনে একটা মিনি ঝাঁক তৈরী হতো আমাকে ঘিরে। এখানে কারোর সময় নেই। মাঝরাতে এমনিতেই সবাই হয় ক্লান্ত নাহয় ব্যস্ত। বোধহয় মিনিট দু-তিনেক ওভাবেই বসে। শক্তি কিছু জড়ো করে এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির কাছে গেলাম। ভাঙা ইংলিশ বলে তারা। বোঝার চেষ্টা করছে যথা সম্ভব। আমি তত ধৈর্য্য হারাচ্ছি। মনে মনে কি কি গালাগালি দেব সেটা সাজাচ্ছি। ঠিক করলাম চারিদিকে জানাবো এই ঘটনা, এই অরাজকতার ব্যাপারে। তোলপাড় করে দেব পৃথিবী। উড়িয়ে দেব, ভাসিয়ে দেব, আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি। ফাটিয়ে ..... আরে ওই তো ওই তো টম ক্রুজ, ওই তো। পালাচ্ছে নাকি আমার দিকেই আসছে? হ্যা আমার দিকেই। হাতে ব্যাগটাও আছে। হাঁফাতে হাঁফাতে ইশারায় বোঝাল, ওই এটিএম যে ব্যাংকের, তার অফিস দোতালায়। টম ক্রুজ ওখানেই ছুটেছিল। কিন্তু এতো রাতে তাদের ব্যাংকের কোনো লোক নেই। আরও অনেক কিছু বোঝাতে চাইলেও পারছিল না, তাই সাথে নিয়ে এসেছে আধো ইংরিজি বলা পথ চলতি প্যাসেঞ্জারকে। প্যাসেঞ্জার ভদ্রলোকটি সমস্তটা মন দিয়ে শুনলেন এবং বেশ কটা পটাপট ফোন করলেন, সাদা কাগজে খসখস লিখে দিলেন একটা ঠিকানা আর আমাকে জানালেন, উপযুক্ত প্রমানসহ আগামীকাল এই ঠিকানায় গেলেই পাওয়া যাবে রিপ্লেসড কার্ড। ঠিকানাটি ওই ব্যাংকের মেইন অফিস। আর টম বাবাজির গাড়ি ভাড়া টাকা নাকি পরে দিলেও চলবে। এবার চোখের জল আর আর্বানিটি ধরে রাখতে পারলো না। কান্না হয়ে বেরিয়ে এল।
মনে আছে, 2014 সালের মাঝামাঝি, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের বিবাদের জেরে, ইউক্রেনের কাছে মালয়েশিয়ার ফ্লাইট দুর্ঘটনার পরে, সেই রুটের সমস্ত ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করা হয়েছিল! আমি সেসময় ইউক্রেন, কিয়েভে, এবং ঠিক একই দিনে ইউক্রেন ছেড়ে দেশে ফেরার কথা! যতদিন কিয়েভ শহরে ছিলাম, খবরে শুনেছি ক্রমাগত দুই দেশের অস্থির অবস্থার কথা। পথে মানুষ কম, আতঙ্কে আছেন। যে কোনও বড় শব্দে মানুষ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠছেন। যেদিন ফেরার কথা, ব্যাগ গুছিয়ে বেড়োবো, ঠিক তখনই নিউসে দেখি মালয়েশিয়ার ফ্লাইট দুর্ঘটনার খবর। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আমার ট্রাভেল এজেন্টের ফোন। তিনি জানালেন আমার্ ফ্লাইটও ওই রুটেই ছিল। কিন্তু যেহেতু একটু পরে ছিল, তাই দুর্দশা এড়াতে পেরেছি, এযাত্রা বেঁচে গেছি। শুনে একটু সামলে নিতে মনে হলো, স্বস্তি, প্রাণ আছে, এখনো প্রাণ আছে। এরপর ট্রাভেল এজেন্ট বলে যাচ্ছেন যে, ভিসাটি আমার আজকের দিন অবধিই বৈধ। তাই যদি আজ কোনও ভাবে এই দেশ থেকে না বেরোতে পারি, তাহলে এখানে এই পরিস্থিতিতেই ভিসা এক্সটেনশন পদ্ধতির মধ্যে যেতে হবে! এবং তা এই প্রবল ভয়ানক অস্থির পরিবেশে খুব সুখকর যে হবে না, তা বলাই বাহুল্য! ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। ঠিক করলাম, এয়ারপোর্টে যাই। সারা রাস্তায় মনে হলো, সবাই এয়ারপোর্টেই ছুটছে। পালতে চাইছে যেভাবেই হোক। এদিক ওদিক ট্রাফিক জ্যাম। এয়ারপোর্টে চারিদিকে বিশৃঙ্খলা, ফ্লাইট শুরুর কোনো ইঙ্গিত নেই, বিমানবন্দরে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা! ভয়ানক। আমার ফ্লাইট কাউন্টারেও ভিড়। সবাই অস্থির। এরমধ্যে কিছু মানুষ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাইছেন। বলছেন, হোটেলের ব্যবস্থা করবেন, চারগুণ টাকার এই মুহূর্তে কি করা যাবে, সেই উৎকণ্ঠা। এবং বোধহয় একসময় মাথা ঘুরে পড়েও গেলাম। চোখ খুলতে দেখি আমার এয়ারলাইন্স -এর স্টাফেরা আমাকে একটি জায়গায় নিয়ে রেখে জল ইত্যাদি দিচ্ছে। আমি বেঁচে আছি এই ভরসায়, শক্তিতে কয়েক ঘন্টা আরও কাটালাম। ট্রাভেল এজেন্টকে ফোন করছি, অন্য এয়ারলাইন্স-এ উপায় দেখছি, এভাবেই কাটলো সারা রাত। স্নায়ু দুর্বল, কিন্তু আমি নিজেকে উজ্জীবিত করার জন্য কঠোর চেষ্টা করছি। কোনোরকমে একটি ফ্লাইট পাওয়া গেলো, যা অর্ধ্যেক পৃথিবী ঘুরিয়ে আমাকে পৌঁছে দেবে দেশে। তাই হোক, তবু মুক্তি। ফ্লাইট উঠে যখন চলছি, আমি প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরছি। কিন্তু এখনো কত মানুষ আটকে। স্থানীয় মানুষ, তাদের এই থেকে থেকেই অস্থিতিশীল জীবন, এর শেষ কোথায়! কোনও গুপী-বাঘা আসুক কখনও। অমোঘ সত্য বলুক সরল ভাবে, “তোরা যুদ্ধ করে করবি কী, তা বল, মিথ্যে অস্ত্র-শস্ত্র ধরে প্রাণটা কেন যায় বেঘোরে"! গান গেয়ে থামিয়ে দিক লড়াই। মানুষ সুস্থ থাক। লড়াই থামুক। যদি হতেই হয়, হোক গানের লড়াই।


