1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

ইউরোপের টোপ, মস্কোর মশকরা আর কিয়েভে কী ভেবে!

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

 ইউরোপের টোপ, মস্কোর মশকরা আর কিয়েভে কী ভেবে!

সোমা দে 

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

প্রায় ১৬ বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে সফর চলছে। মূলত কর্মযোগে। সফরের সবই মসৃন তো নয়। পথে নানা ঝুঁকি। তারই কিছু বিশেষ রইলো এইখানে।

সেসময় আমি শুধু দৌড়োচ্ছি। এক সপ্তাহ গ্রীনল্যান্ডে, আর পরের সপ্তাহে মালদ্বীপ, তারপরে অন্য কোথাও, এবং তারপরে অন্য কোনখানে। যাত্রাপথের নানা মাধ্যম, বাস, ট্রাম, ট্যাক্সি, উড়োজাহাজ, জলজাহাজ, এদের মাধ্যমে আবহাওয়া, তাপমাত্রার তোয়াক্কা না করে ছুঁটছি। এই ছুটন্ত ঘোড়া সবে যখন ছুটতে শিখছে, উপনীত হয়েছে ফ্রান্সের Toulouse শহরে, সাল ২০১০। কথা ছিল, ৪ দিন পরে যেতে হবে বেলজিয়ামে, ফ্লাইটে। দিন চলছে। হঠাৎ খবর এলো, আইস্ল্যাণ্ড থেকে ভলকানো এমন ফুলেফেঁপে উঠেছে যে তার ধোঁয়ায় ইউরোপের ফ্লাইটের রাস্তা প্রায় বন্ধ। প্রথমে তেমন আমল দিই নি। ধীরে ধীরে লন্ডনের Heathrow এর মতো ব্যস্ত এয়ারপোর্টও যখন জানালো, ইউরোপের মধ্যে সব ফ্লাইট আপাতত স্থগিত, ভিতরে শুরু হলো দুশ্চিন্তা। কিভাবে বেলজিয়াম যাবো! চুপচাপ বসে থেকে কবে ভলকানোর ঝলকানো শেষ হবে, অপেক্ষা করাই যেত! কিন্তু আমি দেখলাম, স্থানীয় মানুষ ট্রেন ব্যবহার করছেন। আকাশপথ বন্ধ হলেও স্থলপথ বলবৎ। তাই ঠিক করলাম ট্রেনে যাওয়া যাক, বেলজিয়াম। টিকিট ইত্যাদি নিজেকেই কাটতে হবে। ওই সময়ে ট্রেনস্টেশন জনাকীর্ণ, কারণ সকলের কাছেই ওইটিই একমাত্র পথ। অন্য বেশ কিছু শহরের মতো সেইসময় ফ্রান্স শহরে ইংরিজি বলার চল সাধারণের মধ্যে কম। কষ্ট করে বুঝে একটি অতিশয় লম্বা লাইনে দাঁড়ালাম। কাউন্টারে পৌঁছে হাঁকুপাঁকু করে যখন বেলজিয়ামের টিকিট চাইলাম, জানলাম এই লাইনটি লোকাল যাত্রার। দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য যে টিকিট কাউন্টার, সেটি ঐদিকে, বলে যেদিকে দেখলাম, সেখানে আরও একটি অতীব লম্বা লাইন। বুঝলাম পরিস্থিতি ভয়ানক। চারিদিকে মানুষের মুখে আশংকা, কবে পৌঁছবে, কখন পৌঁছবে এই নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা। এইখানে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়া ভালো যে, হোয়াটস্যাপ, জিপিএস, 4G ইত্যাদি তখন দুর্লভ অথবা অনুপলব্ধ। যোগাযোগ বলতে টেলিফোন কল এবং তা বিদেশে যথেষ্ট ব্যয়বহুল। যাইহোক, ইন্টারন্যাশনাল কাউন্টার থেকে টিকিট নিতে গিয়ে দেখলাম উনি তিনটে টিকিট দিলেন। Toulouse থেকে Bordeaux, Bordeaux থেকে Paris এবং Paris থেকে Brussels, এইভাবে পৌঁছতে হবে বেলজিয়াম। অর্থাৎ তিনটি ট্রানসিট ট্রেন। এবং মাঝে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের সময় ব্যবধান। দেখেই মাথায় হাত। শুধু তাই নয়, প্যারিসে কেবল প্লাটফর্ম চেঞ্জ করতে হবে না, স্টেশনও চেঞ্জ করতে হবে। মাথা ঘুরছে। চোখে সর্ষে ফুলও যে দেখছি, সে শক্তিও নেই। শুধু অন্ধকার। কলকাতা শহরের শিয়ালদহ আর হাওড়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মন প্রমাদ গুনছে, এই যাত্রা খুব সুখকর হবে বলে মনে হয়না। আমার মুখ-চোখের ভয়ানক অবস্থা দেখে কাউন্টারের ভদ্রমহিলা আশ্বস্ত করলেন বটে, তবু দুশ্চিন্তা কাটে না। টিকিট নিয়ে হোটেলে ফিরে ব্যাগ গোছালাম। ট্রেন পরের দিন সকালে। সারারাত কাটলো নির্ঘুম। পরের দিন হুড়োহুড়ি করে বিশাল ব্যাগ নিয়ে পৌঁছে গেলাম স্টেশনে। ট্রেনে যাওয়ার কথা ভাবা ছিল না, তাই ব্যাগের আয়তন ফ্লাইট-উপযুক্ত। এখন হ্যাচরপ্যাচর করে কোনোরকমে সামলাই। সামনে সিঁড়ি এবং escalator. হায়! escalator কাজ করছে না। দিশাহারা হবো হবো, ওকি একজন ইউরপিয়ান ভদ্রলোক আমার পাশ দিয়ে গিয়ে আমার ব্যাগটি নিয়ে তরতর করে উঠে পড়ছেন escalator এ। ভাবলাম একি একি! নিয়ে পালাচ্ছে নাকি! ওবাবা না, উপরে উঠে আমার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছেন আমার ওঠার। সাহায্য করলেন, কিছু না বলতেই। বিদেশে অচেনা মানুষের এমন সহায়তা, অচেনা জায়গা হঠাৎ কেমন ভালোবাসার হয়ে গেলো। একটি জায়গা শুধুই তো তার দর্শনীয় বস্তুগুলোর জন্য নয়। মানুষ, পরিবেশ এবং আরও বিষয় থাকে। যেমন দেখি, ট্রেন আগেই এসে হাজির। ট্রেনে জায়গা অনেক। কেউ দাঁড়িয়ে নেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কেউ ঘাড়ের ওপর উঠে পড়ছে না। ট্রেন ছুটতে শুরু করলো, সাথে মনের পরিবর্তন। ভিতরে আরামে বসে, বাইরে মনোরম সবুজ দৃশ্য, একের পর এক রং, রস, গন্ধ! হঠাৎ মনে হলো, এই ট্রেন জার্নি না করলে, ইউরোপ দেখাই অপূর্ণাঙ্গ থেকে যেত। Bordeaux তে পৌঁছলাম নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগেই। এবং যেই প্লাটফর্মে পরবর্তী ট্রেন, তা একেবারে চোখের সামনেই, এবং ট্রেন দাঁড়িয়ে আছেই। মসৃণ এবং স্নিগ্ধ। এভাবেই পৌঁছলাম প্যারিস। স্টেশনের বাইরে ট্যাক্সি। ট্যাক্সির ভদ্রলোককে মনে হলো, জিজ্ঞেস করি, কোনোভাবে আইফেল টাওয়ার দেখা যায় কিনা স্টেশনে যাওয়ার পথে। হাসিমুখে রাজি হলেন। মাত্র ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে আইফেল টাওয়ারের আইকনিক এই অবয়ব দেখে টুক করে মোবাইলে একটি ছবি তুলে ঝটপট উঠে পড়লাম ট্যাক্সিতে। ধীরে ধীরে পৌঁছলাম Brussels. আর পরের দিন অফিসে আমাকে দেখে সবাই অবাক। কেউ ভাবতেই পারেনি আমি এসে পৌঁছবো এই সংকটের মধ্যে। যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেই নিজেকে ২৪ ঘন্টা আগে দুষছিলাম, শেষে দেখলাম তা হলো বলেই, জীবনের পাতায় একটি জাঁকাল পাতা যুক্ত হলো।

কাজের সূত্রে এবার চললাম মস্কো। এর আগেও বার কয়েক গিয়েছি, ঘটনাচক্রে তা জুন-জুলাই ছিল। এবার জানুয়ারীর শুরুতে যেতে হচ্ছে ভেবে গুগল খুলে টেম্পারেচার দেখতে গেলাম। দেখে হার্টে একটা চিনচিন অনুভব করলাম, মাইনাস টোয়েন্টি এইট ডিগ্রী সেলসিয়াস। রিয়েলি? আর ইউ সিরিয়াস!! চোখে ভুল দেখছি কি? কচলে, মচলে আবার দেখি, মাইনাস টোয়েন্টি এইট। এবার চোখে সর্ষের ফুল, সব যেন ধোঁয়া ধোঁয়া। সবকিছুরই সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেওয়া বাঙালির রক্তে। গুগলকে অবিশ্বাস করার ধৃষ্টতা দেখালাম, আরও বার দশেক অন্য সাইট চেক করলাম, ড্যাম, একই রেজাল্ট। প্লাস ফিফটিনের কলকাতায় বসে মাইনাস টোয়েন্টি এইট কল্পনা করা অসম্ভব জেনেও চেষ্টা করতে গিয়ে ভীষণ বিষম খেলাম। হার্টে চিনচিনের সাথে এবার মাথা ভোঁ ভোঁ, পেট গুড় গুড় শুরু হলো। টেম্পারেচার এনালিসিস করতে গিয়ে জানলাম রাশিয়া পৃথিবীর শীততম দেশগুলির মধ্যে একটি। যাই হোক যেতে যখন হবেই, ভাণ্ডার খুঁজে বার করা গেলো যেসব শীতের পোশাক যারা এতদিন ন্যাপথলিনের আবেশে মাখা, যারা আলোর মুখ দেখেনি বহুশতক হয়ে গেলো। কলকাতাতে নেহাতই তাদের গুণের কদর ছিল না। এবার পূর্ণ মর্যাদা পাবে বুঝে তারাও বেশ ফুলে-ফেঁপে। দু'টি নিতেই বাক্স-পেটরা ফুল। তার পরে বেশ টেনশনের রাতগুলো কাটিয়ে পোঁছলাম "মস্কোভা"। এয়ারপোর্টে পৌঁছে বোঝার উপায় নেই বাইরে কি অপেক্ষা করছে। ব্যাগপত্তর গুছিয়ে বাইরে আসতে আসতেই রাত, মানে টেকনিক্যালি সকাল ২:৩০. টম ক্রুসের লুকওয়ালা ড্রাইভার আমার নামওয়ালা সাইন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে এঞ্জেলিনা মনে হলো। গটগট করে এগিয়ে গেলাম, বলতে পারেন ভেসে গেলাম। হঠাৎ মনে পড়লো ক্যাশ চাই। ঠান্ডার ডান্ডাতে বাকি সব ভুলেছি। কার্ডটা ভুলিনি ভাগ্যিস। সামনেই ৪ টি এটিএম মেশিন। বীরবিক্রমে এগিয়ে গেলাম টম করুইস আমার ব্যাগটি নিয়ে আমাকে খানিক বোঝা মুক্ত করে বাধ্য ছেলের মতো পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। এটিএম এ কার্ড ঢুকিয়ে এদিক ওদিক টেপাটেপি করতেই দুমদাম রাশিয়ান ফরফে কি সব এসে সব শান্ত। এক সেকেন্ড - দু সেকেন্ড - তিন - চার - পাঁচ -ছয় শান্ত। ইতনা সন্নাটা কিউ হ্যায় ভাই! মানে? টাকা? কার্ড? টাকা বেরোলো না। কার্ডও না। অসহায় চোখে তাকাই এদিক ওদিক। ক্যানসেল টেপাটেপি করি, নাথিং। মানেটা যা দাঁড়ালো তা হলো এটিএম এর খিদে পেয়েছিলো মাঝরাতে, বাঙালির যেমন পায়, ফ্রীজে রাখা মিষ্টির খিদে। এরও পেয়েছিলো, খেয়ে নিলো আমার কার্ড। আমার ততক্ষনে মাথায় হাত, চোখ কপালে এবং আর যা যা কিছু ওপরে ওঠা বা নিচে নামা সম্ভব। চোখ ফেটে কান্না বেরিয়ে আসে প্রায়, টমবাবু আন্দাজ করে ছুটে আসে।কিন্তু রাশিয়ার অধিকাংশের মতো উনিও ইংরিজি বলেন না। নানা অঙ্গ-ভঙ্গি হলো, আসেপাশের অনেকে এসে আরো টেপাটেপি করলেন। এটিমের বোধহয় ততক্ষনে খাবার স্টমাক পেরিয়ে ইন্টেস্টাইনে। নো মোর আশা। প্রায় কেঁদে ফেলবো এই সময়ে, হঠাৎ দেখি টম নেই। হাওয়া। জাস্ট ভ্যানিশ। ব্যাগটা? আমার ব্যাগটা? তাও নেই। ধপ করে বসে পড়লাম। হায় মনুষ্যত্ব হারানোর কম্পেটিশনে এরাও তাহলে প্রতিযোগিতায়। নিজেকে অসহায় মনে হলো। কি করবো, কি করা উচিত, এসব ভাবার মানসিক স্থিতি তখন হারিয়েছি। একটা শুন্যতা। ব্ল্যান্ক। এমটিনেস। গলা ছেড়ে কাঁদতে পারলে ভালো লাগবে মনে হলো। কিন্তু না, আমরা শহুরে সভ্য আর্বানীটির তত্ত্বাবধানে অভ্যস্ত। বেসামাল হলে চলবে না। হাসি পেলে মুখ টিপে। কান্না পেলে লুকিয়ে। কলকাতা হলে এতক্ষনে একটা মিনি ঝাঁক তৈরী হতো আমাকে ঘিরে। এখানে কারোর সময় নেই। মাঝরাতে এমনিতেই সবাই হয় ক্লান্ত নাহয় ব্যস্ত। বোধহয় মিনিট দু-তিনেক ওভাবেই বসে। শক্তি কিছু জড়ো করে এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির কাছে গেলাম। ভাঙা ইংলিশ বলে তারা। বোঝার চেষ্টা করছে যথা সম্ভব। আমি তত ধৈর্য্য হারাচ্ছি। মনে মনে কি কি গালাগালি দেব সেটা সাজাচ্ছি। ঠিক করলাম চারিদিকে জানাবো এই ঘটনা, এই অরাজকতার ব্যাপারে। তোলপাড় করে দেব পৃথিবী। উড়িয়ে দেব, ভাসিয়ে দেব, আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি। ফাটিয়ে ..... আরে ওই তো ওই তো টম ক্রুজ, ওই তো। পালাচ্ছে নাকি আমার দিকেই আসছে? হ্যা আমার দিকেই। হাতে ব্যাগটাও আছে। হাঁফাতে হাঁফাতে ইশারায় বোঝাল, ওই এটিএম যে ব্যাংকের, তার অফিস দোতালায়। টম ক্রুজ ওখানেই ছুটেছিল। কিন্তু এতো রাতে তাদের ব্যাংকের কোনো লোক নেই। আরও অনেক কিছু বোঝাতে চাইলেও পারছিল না, তাই সাথে নিয়ে এসেছে আধো ইংরিজি বলা পথ চলতি প্যাসেঞ্জারকে। প্যাসেঞ্জার ভদ্রলোকটি সমস্তটা মন দিয়ে শুনলেন এবং বেশ কটা পটাপট ফোন করলেন, সাদা কাগজে খসখস লিখে দিলেন একটা ঠিকানা আর আমাকে জানালেন, উপযুক্ত প্রমানসহ আগামীকাল এই ঠিকানায় গেলেই পাওয়া যাবে রিপ্লেসড কার্ড। ঠিকানাটি ওই ব্যাংকের মেইন অফিস। আর টম বাবাজির গাড়ি ভাড়া টাকা নাকি পরে দিলেও চলবে। এবার চোখের জল আর আর্বানিটি ধরে রাখতে পারলো না। কান্না হয়ে বেরিয়ে এল।

  মনে আছে, 2014 সালের মাঝামাঝি, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের বিবাদের জেরে, ইউক্রেনের কাছে মালয়েশিয়ার ফ্লাইট দুর্ঘটনার পরে, সেই রুটের সমস্ত ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করা হয়েছিল! আমি সেসময় ইউক্রেন, কিয়েভে, এবং ঠিক একই দিনে ইউক্রেন ছেড়ে দেশে ফেরার কথা! যতদিন কিয়েভ শহরে ছিলাম, খবরে শুনেছি ক্রমাগত দুই দেশের অস্থির অবস্থার কথা। পথে মানুষ কম, আতঙ্কে আছেন। যে কোনও বড় শব্দে মানুষ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠছেন। যেদিন ফেরার কথা, ব্যাগ গুছিয়ে বেড়োবো, ঠিক তখনই নিউসে দেখি মালয়েশিয়ার ফ্লাইট দুর্ঘটনার খবর। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আমার ট্রাভেল এজেন্টের ফোন। তিনি জানালেন আমার্ ফ্লাইটও ওই রুটেই ছিল। কিন্তু যেহেতু একটু পরে ছিল, তাই দুর্দশা এড়াতে পেরেছি, এযাত্রা বেঁচে গেছি। শুনে একটু সামলে নিতে মনে হলো, স্বস্তি, প্রাণ আছে, এখনো প্রাণ আছে। এরপর ট্রাভেল এজেন্ট বলে যাচ্ছেন যে, ভিসাটি আমার আজকের দিন অবধিই বৈধ। তাই যদি আজ কোনও ভাবে এই দেশ থেকে না বেরোতে পারি, তাহলে এখানে এই পরিস্থিতিতেই ভিসা এক্সটেনশন পদ্ধতির মধ্যে যেতে হবে! এবং তা এই প্রবল ভয়ানক অস্থির পরিবেশে খুব সুখকর যে হবে না, তা বলাই বাহুল্য! ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। ঠিক করলাম, এয়ারপোর্টে যাই। সারা রাস্তায় মনে হলো, সবাই এয়ারপোর্টেই ছুটছে। পালতে চাইছে যেভাবেই হোক। এদিক ওদিক ট্রাফিক জ্যাম। এয়ারপোর্টে চারিদিকে বিশৃঙ্খলা, ফ্লাইট শুরুর কোনো ইঙ্গিত নেই, বিমানবন্দরে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা! ভয়ানক। আমার ফ্লাইট কাউন্টারেও ভিড়। সবাই অস্থির। এরমধ্যে কিছু মানুষ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাইছেন। বলছেন, হোটেলের ব্যবস্থা করবেন, চারগুণ টাকার এই মুহূর্তে কি করা যাবে, সেই উৎকণ্ঠা। এবং বোধহয় একসময় মাথা ঘুরে পড়েও গেলাম। চোখ খুলতে দেখি আমার এয়ারলাইন্স -এর স্টাফেরা আমাকে একটি জায়গায় নিয়ে রেখে জল ইত্যাদি দিচ্ছে। আমি বেঁচে আছি এই ভরসায়, শক্তিতে কয়েক ঘন্টা আরও কাটালাম। ট্রাভেল এজেন্টকে ফোন করছি, অন্য এয়ারলাইন্স-এ উপায় দেখছি, এভাবেই কাটলো সারা রাত। স্নায়ু দুর্বল, কিন্তু আমি নিজেকে উজ্জীবিত করার জন্য কঠোর চেষ্টা করছি। কোনোরকমে একটি ফ্লাইট পাওয়া গেলো, যা অর্ধ্যেক পৃথিবী ঘুরিয়ে আমাকে পৌঁছে দেবে দেশে। তাই হোক, তবু মুক্তি। ফ্লাইট উঠে যখন চলছি, আমি প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরছি। কিন্তু এখনো কত মানুষ আটকে। স্থানীয় মানুষ, তাদের এই থেকে থেকেই অস্থিতিশীল জীবন, এর শেষ কোথায়! কোনও গুপী-বাঘা আসুক কখনও। অমোঘ সত্য বলুক সরল ভাবে, “তোরা যুদ্ধ করে করবি কী, তা বল, মিথ্যে অস্ত্র-শস্ত্র ধরে প্রাণটা কেন যায় বেঘোরে"! গান গেয়ে থামিয়ে দিক লড়াই। মানুষ সুস্থ থাক। লড়াই থামুক। যদি হতেই হয়, হোক গানের লড়াই।  


অচেনা দুধপাথরি

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

অচেনা দুধপাথরি

সুমেধা চট্টোপাধ্যায়


কাশ্মীরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মণিমুক্তগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি জায়গা এখন মানুষের পদধূলি-ধন্য হয়ে গেছে। গড়পরতা ভ্রামণিকরা গুলমার্গ, সোনমার্গ, পহেলগামের বাইরে খুব বেশি যায় না। কিন্তু একটু অন্যরকম জায়গা যারা দেখতে চান এবং একটু নিরিবিলিতে প্রকৃতি উপভোগ করতে পছন্দ করেন তারা একটু পায়ে পায়ে ঘুরে দেখতেই পারেন ইউসমার্গ, দুধপাথরি, কোকেরনাগ অথবা গুরেজ ভ্যালি।

 এবছর এক বসন্ত দিনে আমার সুযোগ হয়েছিল "দুধপাথরি" ছুঁয়ে দেখার, তার রূপে স্নাত হওয়ার। কাশ্মীর ভ্রমণে আমরা একটা পুরো দিন রেখেছিলাম দুধপাথরির জন্য। অপরূপ কাশ্মীর, এ যেন প্রাচ্যের স্বর্গ। সেই যে স্কুলের দিনগুলিতে ভূগোল বইতে পড়া 'ভূস্বর্গ', তাকেই যেন ছুঁয়ে দেখা। নীলাভ দেওয়ালের মতো চারিদিকের প্রকৃতিকে ঘিরে আছে বরফে ঢাকা সুউচ্চ পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে দেবদারু, পাইন,ফার এবং ওক গাছেরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, যেন সেই প্রাচীন কাল হতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরী সবাই। নিশ্চুপ,নিশ্চল। ঝিরঝির করে বয়ে চলা বুনো ঝোরা আর উপত্যকার বুক চিরে শুয়ে থাকা স্বচ্ছতোয়া নদী। এই নদী এখানে শালিগঙ্গা নামে পরিচিত। ভরা শীতে ইনি শ্বেত বসনা হয়ে পড়েন; অর্থাৎ জল প্রায় বেশির ভাগটাই জমে যায়। বড় পাথরে জলতরঙ্গের সুর তুলে উচ্ছল কিশোরীর মতো ছুটে চলেছে সে। পাহাড়ের ফাঁকে কোথাও একটু সমতলে জমিতে ছোট্ট ছোট্ট ঘরবাড়ি,বাগান,ফসলের মাঠ। এমন আঁকা প্রকৃতি যে আর্টিস্টরা হাতে রং-তুলি তুলে নিতে বাধ্য।

ছবি : সুমেধা চট্টোপাধ্যায়

 শ্রীনগর থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে প্রকৃতির এই আশ্চর্য সৃষ্টি দুধপাথরি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৯০০০ ফিট। এই এলাকাকে কাশ্মীরের 'দুগ্ধ উপত্যকা' বলা হয়।

 'দুধপাথরি' শব্দটির অর্থ দুধ ভর্তি পাথর বা দুধের উপত্যকা। আমরা যখন শ্রীনগর থেকে রওনা দিয়ে উপত্যকার কাছে পৌঁছলাম বেশ জোরে বৃষ্টি নামল। একটি দোকানে গরম গরম আলুর পরোটা এবং কফি সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা সেজে নিলাম যুদ্ধের সাজে, অর্থাৎ বর্ষাতি এবং বড় গামবুট আমাদের দোসর হল। যে রেস্তোরায় আমরা জলযোগ সারলাম সেখানকার পিছনদিকের জানলা থেকেও আমরা এক অপরূপ ভ্যালির দৃশ্য দেখেছিলাম। হাল্কা বৃষ্টি পড়ছে। সবুজ চাদরের মাঝে কারও দু'একটি ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। চারিদিক একদম স্বর্গসদৃশ প্রায়। তুলে নিলাম জানলার ফাঁক দিয়ে কয়েকটি ছবি। তারপর বর্ষাতি-গামবুট সহ আমরা চললাম দুধপাথরির দিকে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে দুধের সরের মতো বরফের আচ্ছাদন। মনে হচ্ছে গৃহিনীর ক্ষণিকের অসাবধানতায় দুধ উতলে সর পরে আছে চারিদিকে। এঁকেবেঁকে গাড়ি চলেছে। আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোক ঢোকার মুখে একজনের সঙ্গে কথা বলে নিলেন। বেশি গাড়ির ভিড় তখনও না থাকায় পারমিশন নিয়ে শেষ পর্যন্ত গাড়ি নিয়েই চললেন।

ছবি : সুমেধা চট্টোপাধ্যায়

 ''দুধপাথরি" নামের পিছনে লুকিয়ে আছে একটা মজার গল্প। স্থানীয় উপকথা মতে, অনেককাল আগে এই কাশ্মীর উপত্যকায় বাস করতেন এক ধর্মপ্রাণ মানুষ। একাধারে কবি, গীতিকার ও সুফি সাধক সেই মানুষটার নাম শেখ নূর-উদ্দিন নূরানী। একদা বিশেষ এক প্রয়োজনে এই পথ দিয়েই চলেছিলেন সুফি পীর শেখ নূর। নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় পথের মধ্যে ঘাসেঢাকা এক অজানা মাঠে থামতে বাধ্য হন তিনি। নামাজের আগে অজু করতে জল দরকার। এদিকে আশেপাশে নদী বা ঝরনা কিচ্ছুটি নেই। ভারি বিপদে পড়লেন ঋষি নূর। জল খুঁজতে গিয়ে মাঠের শক্ত মাটিতে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন তিনি। সেই আঘাতে আশ্চর্যভাবে মাটি ফেটে বেরিয়ে আসে দুধের ধারা।

 কথিত আছে যে, দুধ বেরোতে দেখে বিস্মিত হয়ে বলে ওঠেন শেখ নূর, বলেন, এ দুধ দিয়ে কী করব আমি! দুধ পান করা যেতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে অজু করা তো যাবে না। সাধকের মুখে এ কথা শোনামাত্র দুধের সেই ধারাই বদলে যায় স্বচ্ছতোয়া জলে। পাহাড়ের উপরে ঘাসজমির মধ্যে দিয়ে সেই দুধেল জল না কি আজও বয়ে যায়। আর এই ঘটনার পরই এই ঘাসেঢাকা উপত্যকার নাম হয়ে যায় "দুধপাথরি"।

 গরমের দিনে পরিস্কার আকাশে প্রকৃতি যেন তার রঙের বাক্স উপুড় করে দেয় এই দুধপাথরি উপত্যকায়। হাতছানি দিয়ে ডাকে পুরু সবুজ ঘাসের গালিচা আর ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা রঙের বুনো ফুল। মৃদুমন্দ বয়ে চলেছে পাথুরে নদী। তার বরফগলা ঠান্ডা জল ক্লান্ত শহুরে শরীরকে স্নিগ্ধ করে। দূরে দিঘল গাছের সারির মাথায় নানা রঙের খেলা শুরু হয় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তে।

 আমরা অবশ্য অন্য একটি রূপ দেখলাম দুধপাথরির। কনকনে ঠান্ডা। মাঝে মাঝে হাল্কা তুষারপাত। বেশ কয়েক ইঞ্চি পুরু বরফ। দূরে পীরপঞ্জালেও জমেছে মন খারাপের মেঘ। শালিগঙ্গা নদীর ধার পর্যন্ত নেমে যাওয়া যায় অনেক নীচে। বরফ গলা জলে বেগবতী শালিগঙ্গা যেন ভরা যৌবনবতী। তাকিয়ে থাকলে ঘোর লেগে যায়। অনেকে আবার নদী পার হয়ে অন্য পারে যাচ্ছে। আমরা ঐ সুঁচ-বেঁধা ঠান্ডার মাঝে আর ওপারে যাই নি। তবে মন-প্রাণ ভরে আকণ্ঠ পান করেছিলাম এই দুধের উপত্যকার সৌন্দর্য। যেন প্রতি বাঁকেই অপেক্ষারত বিস্ময় এবং প্রকৃতির উজাড় করে দেওয়া শোভা। শালিগঙ্গা থেকে ফিরতি পথে এক জায়গায় বরফের উপর দেখি লাল-শিফন পরিহিতা এক মহিলা নুডল স্ট্র‍্যাপ ব্লাউজ পরে রিল বানাচ্ছেন। লোকজন বেশি নেই। রীল বানানোর আদর্শ জায়গাই বটে। আমরা সেই বরফেই বেশ খানিক তফাতে রেইনকোট খুলে ছবি তুললাম। বৃষ্টি অনেকটা হাল্কা, কিন্তু গা ভিজে যাচ্ছে। তবে চারিদিকের অপার সৌন্দর্য মন কেড়ে নেয়। তাই অন্য কোনও প্রতিকূলতাই আর স্পর্শ করে না মনকে।

ছবি : সুমেধা চট্টোপাধ্যায়

 

একদিকে হিমাচল প্রদেশ আর অন্যদিকে জম্মু-কাশ্মীর, এর ঠিক মাঝখানে মগ্ন মৈনাকের মতো ঘুমিয়ে আছে পীরপঞ্জাল রেঞ্জ। ভৌগলিকভাবে হিমালয়ের এই পীরপাঞ্জাল রেঞ্জেরই অংশ দুধপাথরি, যার একদিকে ছড়িয়ে আছে চিরসবুজ পাইন আর দেবদারু গাছের জঙ্গল, আর অন্যদিকে ঘাসের গালিচা। পশুচারণের উপযুক্ত এই তৃণভূমিতে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় কাশ্মীরী ভেড়ার পাল। গ্রীষ্মে উপত্যকা ছেয়ে যায় ডেইজি এবং বাটারকাপের মতো হলুদ সাদা বুনো ফুলে। সে এক অদ্ভুত মনোরম দৃশ্য!

 আমার চোখে দুধপাথরি মনে হয়েছিল যেন পরীদের গ্রাম। মানুষেরা এখানে পরিযায়ী। আসে, চলে যায়। নীড় বাঁধে না।গরমের দিনগুলোতে ভেড়ার পাল নিয়ে রাখালের দল এ পথে যাওয়া আসা করে ঠিকই, কিন্তু শীতের কয়েকমাস প্রচন্ড তুষারপাতের ফলে এই অঞ্চল মনুষ্যবসবাসের একেবারে প্রতিকূল হয়ে ওঠে। গরমকালের এই ছমাসই দুধপাথরিতে বেড়াতে যাওয়ার সময়।

 বিদেশী পর্যটকদের অনেকেই দুধপাথরীকে 'মিনি কাশ্মীর' হিসেবে বর্ণনা করেন। কি অদ্ভুতভাবে আমরা যখন এই উপত্যকায় প্রবেশ করছি তখন আমাদের সকলেরই মনে হয়েছিল কাশ্মীরে আসার পয়সা উসুল হয়ে গেল শুধু দুধপাথরি এসেই। সমগ্র কাশ্মীরের সোউন্দর্যের প্রতিভূ হয়েই আমাদের মনে জায়গা করে নিল এই দুধের উপত্যকা। পশ্চিমে অবস্থিত বিখ্যাত তুসামিদান। অল্প দূরেই রয়েছে স্বচ্ছ জলের লেক নীল নাগ। লেকের জলে সত্যিই যেন নীল গুলে দিয়েছে কেউ। আশেপাশে গভীর জঙ্গল, ইতস্তত ঘাসজমি আর দূরের পাহাড় নিয়ে আদর্শ পিকনিক স্পট এই নীল নাগ। আমরা অবশ্য ঐদিকে আর যাই নি।

 শালিগঙ্গার দিকে যেতেই চোখে পড়েছিল দুধপাথরির JKTDC র আবাস। কেমন যেন ভয় করে উঠল! জন-মানব শূন্য। নি:সারে বৃষ্টি পড়ছে। বরফের আচ্ছাদনের মাঝে বাংলো যেন গা ছমছমে হানা বাড়ি। শুনলাম গরম কালে ভালোই লোকজন থাকে এখানে। এবার যেহেতু বরফ অনেকটাই দেরিতে পড়া শুরু হয়েছে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে, তাই এই মার্চ শেষ বা এপ্রিলেও চলছে বরফের মরসুম - শীতকাল।

ছবি : সুমেধা চট্টোপাধ্যায়

 ফেরার সময়ে বেশ খানিকটা যানজটে পড়তে হল। ততক্ষণে অনেক গাড়ি ভিতরে ঢুকে এসেছে। আমাদের সারথি জহুর ভাই বলেই রেখেছিল দুধপাথরি থেকে ফেরার পথে এখানকার লোকাল কুইজিন 'সর্ষো দা সাক' আর 'মক্কি দি রোটি' খাওয়াবে। ফিরতি পথে এই খাবারের অসংখ্য ঝুপড়ি চোখে পড়ল। মক্কি' শব্দটির অর্থ 'ভুট্টার গুঁড়োর রুটি'। ভুট্টার গুঁড়ো দিয়ে হলুদ রঙের রুটির মতো বেলে নিয়ে তা তাওয়ায় সেঁকে বেশ কুড়মুড়ে এক ধরণের রুটি বানানো হয়। সঙ্গে আমাদের দিয়েছিল স্থানীয় আচার এবং সর্ষে শাকের একটি অত্যন্ত সুস্বাদু পদ। ঝুপঝুপে বৃষ্টির মধ্যে এই গরম গরম রুটি ও শাকের তরকারি যেন অমৃতসমান মনে হল। স্বাদকোরকগুলি যেন শীতঘুম শেষে জেগে উঠল আড়মোড়া ভেঙে। তাদের প্রাণে খুশির জোয়ার এল যেন। দুধপাথরিকে পিছনে ফেলে এবার এগিয়ে যাওয়ার পালা। খাবারের জায়গাটির পিছনেও উঁকি মারছে পীরপঞ্জাল। চারিদিক দিয়ে ঘিরে এই উপত্যকার অতন্দ্র প্রহরায় যেন সে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে দুধের সর তখনও বিদ্যমান। জহুর ভাই বললেন, 'আঘলি বার গরমি মেইন আনা, পুরা ভ্যালি দুসরা দিখেগা।' পরিতৃপ্ত এবং সৌন্দর্য-সম্পৃক্ত মনে আমরা দুধের উপত্যকাকে বিদায় জানালাম।

 কেউ যদি কখনও দুধপাথরি যাওয়ার কথা ভাবেন, তাহলে আমাদের ড্রাইভার জহুর আহমেদকে যোগাযোগ করতে পারেন। চলভাষঃ 9622439599


নীরবতার সেই শহর, যেখানে ইতিহাস আজও শ্বাস নেয়

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

নীরবতার সেই শহর, যেখানে ইতিহাস আজও শ্বাস নেয়

ℙ𝕠𝕝𝕒𝕟𝕕 Auschwitz-Birkenau Memorial and Museum

ডাঃ রণধী দাশ

পোল্যান্ডের দক্ষিণে ছোট্ট শান্ত শহর Oświęcim। চারদিকে সবুজ গাছ, পরিচ্ছন্ন রাস্তা, পাখির ডাক, আর ইউরোপীয় শহরের স্বাভাবিক ছন্দ। প্রথম দেখায় কিছুই অস্বাভাবিক মনে হয় না। মনে হয়, এটি যেন আর পাঁচটা শান্ত শহরের মতোই একটি সাধারণ জনপদ।

কিন্তু শহরের এক প্রান্তে পৌঁছাতেই বদলে যায় সব অনুভূতি।

একটি লোহার গেট। তার ওপরে লেখা—"Arbeit Macht Frei"।

সামনের কাঁটাতারের বেড়া, লাল ইটের ব্যারাক, নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, আর বাতাসে এক অদ্ভুত ভারী নিস্তব্ধতা। মনে হয়, এই নীরবতা যেন শব্দেরও বেশি কিছু বলে।

এই মুহূর্তে আপনি আর একজন পর্যটক নন।

আপনি প্রবেশ করতে চলেছেন মানবসভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটির ভেতরে।

এটি Auschwitz-Birkenau Memorial and Museum।

এটি কোনো দর্শনীয় স্থান নয়। এটি পৃথিবীর বিবেক।

যেখানে মানুষ সংখ্যা হয়ে গিয়েছিল

১৯৪০ সালে নাৎসি জার্মানি এখানে প্রতিষ্ঠা করে Auschwitz I।

শুরুতে এটি ছিল রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য একটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি রূপ নেয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার যন্ত্রে।

১৯৪১ সালে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে গড়ে ওঠে Auschwitz II–Birkenau—একটি বিশাল নির্বাসন ও হত্যাকেন্দ্র।

১৯৪০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এখানে প্রায় ১১ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান।

তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ইহুদি।

কিন্তু মৃত্যুর সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন আরও অনেকে—পোলিশ নাগরিক, রোমা জনগোষ্ঠী, সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী, প্রতিবন্ধী মানুষ, শিশু, নারী, বৃদ্ধ...

তাঁদের অপরাধ ছিল কেবল একটি—

তাঁরা "অন্যরকম" ছিলেন।

সেই গেট, যেখান থেকে অধিকাংশ মানুষ আর ফিরে আসেননি

লোহার গেটের ওপরে লেখা—

Arbeit Macht Frei
"Work Sets You Free."

এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রতারণাগুলোর একটি।

যারা এই গেট পেরিয়ে ঢুকেছিলেন, তাঁদের অধিকাংশের জন্য মুক্তি বলতে ছিল কেবল মৃত্যু।

আজও পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা দর্শনার্থীরা এই গেটের নিচ দিয়ে হাঁটার সময় অজান্তেই নীরব হয়ে যান।

কারণ তাঁরা জানেন—

একই পথ ধরে একদিন হাজার হাজার মানুষ শেষবারের মতো পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন।

জুতার পাহাড়, চুলের স্তূপ, আর নীরব প্রশ্ন

ইটের তৈরি ব্যারাকগুলো আজ জাদুঘর।

ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়—

হাজার হাজার জুতা।

চশমা।

স্যুটকেস।

রান্নার বাসন।

শিশুদের খেলনা।

মায়েদের হাতব্যাগ।

আর কাঁচের বিশাল প্রদর্শনীতে মানুষের কাটা চুল।

প্রতিটি জুতা এক একটি জীবন।

প্রতিটি স্যুটকেস এক একটি অসমাপ্ত যাত্রা।

প্রতিটি শিশুর ছোট্ট জুতা যেন নিঃশব্দে প্রশ্ন করে—

"আমাদের অপরাধ কী ছিল?"

এখানে ইতিহাস পড়া যায় না।

এখানে ইতিহাস অনুভব করা যায়।

মৃত্যু যেখানে ছিল একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া

Block 11—যার আরেক নাম Death Block।

এখানে মানুষকে দিনের পর দিন অনাহারে রাখা হতো।

অন্ধকার সেলে বন্দি করা হতো।

দাঁড়িয়ে থাকার মতো ছোট্ট কক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হতো।

বাইরে রয়েছে Death Wall।

এই দেয়ালের সামনে হাজার হাজার মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

আজও সেখানে তাজা ফুল পড়ে থাকে।

মানুষ কথা বলে না।

শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।

গ্যাস চেম্বারের ভেতরে

এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে ভাষা ব্যর্থ হয়ে যায়।

Auschwitz-এর গ্যাস চেম্বার তার একটি।

আজ সেখানে কোনো আর্তনাদ নেই।

কোনো পদচিহ্ন নেই।

শুধু নীরবতা।

কিন্তু সেই নীরবতাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী শব্দ।

এখানেই Zyklon-B ব্যবহার করে কয়েক মিনিটের মধ্যে শত শত মানুষকে হত্যা করা হতো।

তারপর পাশের ক্রেমাটোরিয়ামে তাদের দেহ পুড়িয়ে ফেলা হতো।

বিজ্ঞান একসময় মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য সৃষ্টি হয়েছিল।

কিন্তু মানবতা হারালে বিজ্ঞানও হত্যার অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

Auschwitz তার নির্মম প্রমাণ।

Birkenau — শেষ যাত্রার স্টেশন

কয়েক মিনিটের বাসযাত্রার পর পৌঁছে যাওয়া যায় Birkenau।

দূর থেকেই চোখে পড়ে বিখ্যাত সেই রেললাইন।

এই রেললাইন ধরে গবাদিপশু বহনের মালবাহী ট্রেনে করে হাজার হাজার মানুষকে এখানে আনা হতো।

ট্রেন থামত।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

তারপর শুরু হতো নির্বাচন।

কে শ্রমশিবিরে যাবে।

আর কে সরাসরি মৃত্যুর দিকে।

একজন মা হয়তো শেষবারের মতো সন্তানের হাত শক্ত করে ধরেছিলেন।

একজন বাবা হয়তো শেষবারের মতো ফিরে তাকিয়েছিলেন।

কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পরিবার ভেঙে যেত চিরদিনের জন্য।

ইতিহাসকে ধ্বংস করা যায় না

যুদ্ধের শেষদিকে নাৎসিরা গ্যাস চেম্বার ও ক্রেমাটোরিয়ামের বড় অংশ ধ্বংস করে দেয়।

তাদের বিশ্বাস ছিল—

প্রমাণ মুছে ফেললে ইতিহাসও মুছে যাবে।

কিন্তু ইতিহাস কখনো ধ্বংস হয় না।

ধ্বংসস্তূপও সাক্ষ্য দেয়।

নীরবতাও কথা বলে।

শেষ প্রান্তে

Birkenau-এর শেষ প্রান্তে আন্তর্জাতিক স্মৃতিসৌধ।

সেখানে লেখা—

"May this place forever be a cry of despair and a warning to humanity."

বাংলায়—

"এই স্থান চিরকাল মানবতার জন্য হতাশার আর্তনাদ এবং এক চিরন্তন সতর্কবার্তা হয়ে থাকুক।"

অনেকেই এখানে এসে ছবি তোলেন না।

শুধু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন।

কারণ এই জায়গায় ক্যামেরা নয়—

মানুষের বিবেকই সবচেয়ে বেশি কাজ করে।

ফিরে আসার পথে

ফেরার সময় মনে হচ্ছিল—

আজ আমি কোনো জাদুঘর দেখে ফিরছি না।

আমি ফিরে যাচ্ছি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার একটি অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে।

আমার ক্যামেরায় কিছু ছবি রয়ে গেছে।

কিন্তু তার থেকেও গভীরভাবে থেকে গেছে এক অনুভূতি—

ঘৃণা যখন রাষ্ট্রের নীতি হয়ে ওঠে, তখন সভ্যতাও অসভ্য হয়ে যেতে পারে।

Auschwitz তাই শুধু অতীতের গল্প নয়।

এটি ভবিষ্যতের জন্যও এক সতর্কবার্তা।

স্টেশন ছেড়ে ট্রেন যখন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল সেই অসীম নীরবতার ভেতর থেকে লক্ষ লক্ষ অদৃশ্য কণ্ঠ একসঙ্গে ফিসফিস করে বলছে—

"আমাদের ভুলে যেও না। আমাদের ইতিহাস যেন আর কখনো পুনরাবৃত্তি না হয়।"

Image 3
Image 4
Image 3
Image 3
Image 3
Image 3
Image 3
Image 6
Image 2
Image 3
Image 1
Image 5
Image 3
Image 3
Image 3
Image 3
Image 3

Sunday, September 21, 2025

এক মিষ্টি সফর


ছবি : ইন্টারনেট

এক মিষ্টি সফর
ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল

কলকাতা খাদ্যরসিকের শহর। বাঙালি সিনেমায়, সাহিত্যে, দৈনন্দিন কথাবার্তায়, চুটকিতে খাবারের অনুসঙ্গের ছড়াছড়ি। যদিও সেই অর্থে মিশেলিন স্টার পাওয়া রেস্তোরাঁ বা ডেলি কলকাতায় নেই, কিন্তু এই শহরের অলিতে গলিতে “হিডেন জেম” এর ছড়াছড়ি। মোটামুটি কলকাতা যবে থেকে রেনেসাঁর শহর হয়ে উঠেছে এবং বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়েছে, তবে থেকেই কলকাতায় নানা দেশের খাবারের ছড়াছড়ি। সেটা ওড়িশা হতে পারে, চীন হতে পারে, মোগলাই, অর্থাৎ তুর্ক-আফগান হতে পারে। আবার, এইসব নানা দেশের খাবারের সংমিশ্রণে কলকাতায় সৃষ্টি হয়েছে নিজস্ব কিছু পদ। এবং আজও হয়ে চলেছে কলকাতার এই খাবারের এক্সপেরিমেন্ট। যেমন, এখন দক্ষিণ কোরিয়ার খাবার এখানে খুব জনপ্রিয়। সেই খাবারের মধ্যে আবার বাঙালি উপাদান মিশিয়ে নানা নতুন পদ সৃষ্টি হচ্ছে। মোমো একটি পাহাড়ি স্ন্যাক্স। সেটা নিয়ে কলকাতায় কী না এক্সপেরিমেন্ট হয়! চকলেট মোমো থেকে শুরু করে ভেটকি মোমো। সুতরাং কলকাতার “ফুড সিন” ভীষণভাবেই ডায়নামিক একটি জগৎ।

আমি কিছুদিন আগে এক রবিবার সকাল থেকে দুপুরে উত্তর কলকাতার একটি বিশেষ জায়গায় ফুড ট্রেইলে গিয়েছিলাম। কোনও গ্রুপের সাথে নয়। পুরোপুরি নিজে নিজে গুগল দেখে এবং কিছু ব্লগ পড়ে আমি আমার রুট ঠিক করেছিলাম। এপ্রিল মাসে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে যাওয়া। তাই বেশি ঘোরাঘুরির ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু কম পরিশ্রমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্পট কাভার করব এবং রসনার পরিতৃপ্তি করব, এটাই ছিল আমার লক্ষ্য। এর জন্য আগের দুদিন খাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলাম, যাতে সব কটা দোকানের অন্তত একটা খাবার টেস্ট করার জায়গা পেটে থাকে।

প্রথমেই আমি গিয়ে নামলাম কলেজ স্ট্রিট পেরিয়ে হাতিবাগানের অজন্তার দোকানের মোড়ে। এই সিগন্যালে শ্যামবাজারের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডানহাতে একটা গলি পড়বে, শিবদাস ভাদুড়ি স্ট্রিট। এই রাস্তাটা গিয়ে পড়ছে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র স্ট্রিটে। সেটা দিয়ে ঢুকলেই ডানহাতে প্রথম দোকান হল অমৃত। ছোট্ট মিষ্টির দোকান। কিন্তু এই দোকানের দই একবার খেয়ে দেখুন। তারপর বুঝবেন যে মিষ্টি দই বলে এতদিন যে সব খাবার খেয়েছেন, সব তুচ্ছ। আমি কোচবিহারে যখন গিয়েছিলাম, তখন সম্রাট বলে একটা দোকানে “ক্ষীরদই” খেয়েছিলাম। ওখানকার খুব বিখ্যাত খাবার। এই অমৃতের দই অনেকটা সেরকম। খুব মিষ্টি, বোধহয় ক্ষীর দেওয়া। তাই একবারে বেশি খেলাম না। ইচ্ছে তো করছিল অনেকটা খেয়ে নিতে। কিন্তু আমার তো প্ল্যান ছিল আরও কয়েকটা মিষ্টির দোকান কভার করব। তাই প্রথমেই পেট ভরে গেলে চলবে না। একশো দই খেয়ে আমার ফুড ট্রেইলের শুভ মহরৎ হল। আমি নানা ব্লগে এই দোকানের দইয়ের কথাই পড়েছিলাম। অন্য কোনও মিষ্টির নাম দেখিনি। কিন্তু দোকানের শোকেসে আরেকটা মিষ্টি দেখে বেশ আকর্ষণীয় লাগল। নাম জিজ্ঞাসা করলাম---বাদশাভোগ। সেটাও একটা টেস্ট করলাম। দারুণ খেতে। নীচে রইল তার ছবি।

 

এই রাস্তায় অমৃত ছাড়িয়ে জাস্ট দুটো বাড়ি পেরোলেই ওই একই ফুটপাথে রয়েছে আরেক ঐতিহ্যশালী বাঙালি মিষ্টির দোকান---সেন মহাশয়। একশো বছরের বেশি পুরনো। অমৃত ছাড়িয়ে এবার গেলাম সেখানে। এখানে আরেকটা ইন্টারেস্টিং জিনিস চোখে পড়ল। এই দুই দোকানের মধ্যে রয়েছে একটি বাঙালি লন্ড্রি। বোধহয় একশো বছরের পুরনো। নামটা বেশ অন্যরকম---ধৌতাগার! এই নামটা কেন যে বাংলা ভাষায় সেভাবে পরিচিত নয়, সেটাই অবাক করার মত। আমি ঠিক করলাম যে এবার থেকে লন্ড্রি নিয়ে কারও সাথে কথা বলতে গেলে এই শব্দটা ব্যবহার করব।

যাই হোক, সেন মহাশয়ে ঢুকলাম। অমৃত যেমন ছোট দোকান, রাস্তায় দাঁড়িয়েই খেতে হয়, সেন মহাশয় সেরকম নয়। বেশ বড়। দোকানের মধ্যে কিছু চেয়ার দেওয়া আছে। যদিও টেবিল দেখলাম না। সেন মহাশয়ের মিষ্টি দক্ষিণ কলকাতাতেও দেখেছি। কিন্তু এখানের বেশিরভাগ মিষ্টিই অচেনা মনে হল। এইসব মিষ্টির আবার নানারকম নাম আছে। যদিও সেইসব নাম আমার জানা নেই। আর সব মিষ্টির সামনে নাম লেখাও নেই। তবে আমি থাকতে থাকতেই একজন এসে কী একটা অদ্ভুত নামের মিষ্টি অর্ডার দিলেন। অপরূপা বা ওইরকম কিছু নাম। বুঝলাম যে, সেন মহাশয়ে খেতে এলে শুধু শোকেসের মিষ্টি দেখলে হবে না। একটু নাম জেনেও আসতে হবে।

একটাই নাম জানা ছিল—রটবি সন্দেশ। রবীন্দ্রনাথ নিজে নাকি এই নাম দিয়েছিলেন। সেটাই কিনলাম (ছবিতে বাঁদিকের প্লেটে, আম সন্দেশের নীচে)। এটা আবার সামনের কাঁচের তাকে ছিল না। পেছনের ঘর থেকে এনে দিল। সেই সাথে নিলাম মিহিদানা আর আম সন্দেশ। আম সন্দেশটা আমার সবথেকে ভালো লাগল। ভেতরে আমের জেলি দেওয়া। মিহিদানাও দারুণ। গড়িয়াহাটের সেন মহাশয়ে একটা সবুজ রঙের কাঁচা আমের স্বাদের কড়াপাকের সন্দেশ ছোটবেলায় অনেক খেয়েছি। সেটা এই দোকানে দেখলাম না। কিন্তু এই দোকানের আম সন্দেশ আবার অন্যরকম স্বাদ, এটা নরম পাকের। এদের সব মিষ্টি আসল ফলের রস দিয়েই তৈরি হয়। সীতাভোগ একটু খাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু অন্য আরও কিছু দোকানে যেতে হবে। এরপর সীতাভোগ খেলে সেইসব দোকানে ইনজাস্টিস হবে। তাই এবারের মত এটা বাদ দিলাম।

সেন মহাশয়ের পর মুখ ঘোরালাম বিধান সরণির অপর দিকে। কিন্তু গুগল ম্যাপ দেখলেও সেদিকে গেলাম না। আরেকটা বিশেষ রাস্তা ধরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। তাই গুগলে যেটা সোজা রাস্তা দেখাল, সেটা ছেড়ে হাতিবাগানের মেইন রাস্তা ধরে একটু হেঁটে, দর্পনা পেরিয়ে ডান দিকে ঢুকলাম শ্যামপুকুর স্ট্রিটে। আরেকটা মিষ্টির দোকানে তো যাবই। কিন্তু তার আগে একটা বিশেষ বাড়ি দেখব। সেটা হল এই শ্যামপুকুর স্ট্রিটে রামকৃষ্ণ মিশনের বাড়ি, যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। তাছাড়া একটু হাঁটতেও হবে। মিহিদানা খেয়ে পেট তো ভরে গেছে। পরের দোকানে যাওয়ার আগে একটু খালি করতে হবে তো!! তাই বলরাম ঘোষ স্ট্রিট না ধরে শ্যামপুকুর স্ট্রিট।

সেই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেই বিখ্যাত বাড়ি তো দেখাই হল। সেই সাথে পুরনো কলকাতার আরও কিছু ঝুলবারান্দা দেওয়া বাড়ি দেখা হল। মানে, যেরকম ডিজাইন আস্তে আস্তে উঠে গেছে। এখন শুধু ফ্ল্যাট হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে। সেই রাস্তা দিয়ে মিনিট পাঁচেক হেঁটে এসে পৌঁছলাম একটা তিন মাথার মোড়ে। সেখানেই রয়েছে “চিত্তরঞ্জন”।

চিত্তরঞ্জনে বিখ্যাত হল “মধুপর্ক”। ছোট ছোট বাটিতে দইয়ের মত একটি অপূর্ব খাদ্য। দই নয়, বোধহয় দই, মধু আর ঘি মিলে বানানো। একটা প্রথমে কিনে খেলাম। তারপর মনে হল যে এত কষ্ট করে এখানে এসে মাত্র একটা বাটি খেলে পরিশ্রম বৃথাই যাবে। তাই আরেকটা এলাচি ফ্লেভারের মধুপর্ক খেলাম। তিন চারটে ফ্লেভারে এটা পাওয়া যায়। তবে চকলেট বা ভ্যানিলার থেকে শুদ্ধ বাঙালি স্বাদই ভালো লাগলো আমার। এটাও ছোট দোকান। রাস্তায় দাঁড়িয়েই খেতে হয়।

চিত্তরঞ্জনের ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে “দ্বারকা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার” এবং তার পাশেই ছোট্ট একটা দোকান—ভবতারিণী সুইটস। প্রথম দোকানটি পাশেরগুলোর তুলনায় বয়সে একদম শিশু। যদিও মিষ্টি ভালো। আর পরেরটি ছোট হলেও তার বৈশিষ্ট্য হল ভ্যানিলা রসগোল্লা। এছাড়াও বেশ কিছু চকলেট সন্দেশ পাওয়া যায়। আমার দুর্ভাগ্য যে, সেইদিন ভবতারিণীতে ভ্যানিলা রসগোল্লা ছিল না। ফলে সেটা বাদ গেল। কিন্তু দোকানটা চেনা রইল।

এরপরের দোকানের দিকে এবার পা বাড়ালাম। চিত্তরঞ্জন সুইটস থেকে বাঁদিকে একটু গেলেই শ্যামবাজার এ ভি স্কুলের সামনে বাসরাস্তা---যতীন্দ্র মোহন এভিনিউ। এটা হল চিৎপুর রোডের সমান্তরাল রাস্তা। সেই রাস্তা পেরোলেই জগৎ মুখার্জি পার্কের গায়ে নবীন চন্দ্র দাস। রসগোল্লার আবিষ্কর্তা।

হলুদ সাইনবোর্ড দেওয়া দোকান। সামনে কাঁচের দেওয়াল। এপ্রিল মাসের সেই দুপুরে আমার তখন বেশ গরম লাগছে। ঢুকে একটু বসে নিলাম প্রথমে। ছোট দোকান হলেও বসার জায়গা আছে। এই দোকানে এসে রসগোল্লা না খেলে আর কি খাব? সুতরাং রসগোল্লা অর্ডার দিতেই হল। কিন্তু শুধু রসগোল্লা খেলে তো আর হবে না। সেই সাথে ছানার টোস্ট খেলাম। আর ঠিক সেই সময়েই গাড়িতে করে টাটকা খাবার ডেলিভারি এল। ফলে একটা শিঙাড়াও খেলাম। এদের শিঙ্গাড়া কিন্তু দারুণ। এছাড়াও রয়েছে আরও কিছু সন্দেশ----ডাব সন্দেশ, গোলাপভোগ, কেশর রসমালাই ইত্যাদি।

সুতরাং নবীন চন্দ্র দাস মানেই যদি শুধু রসগোল্লা খেয়ে চলে আসেন, তাহলে ভুল করবেন। আমি আবার মিষ্টি খেতে খেতে দোকানের ভদ্রলোকটির সাথে সেই রসগোল্লার জি আই ট্যাগ পাওয়া নিয়ে ওড়িশার সাথে দশ বছর আগের লড়াইএর গল্প করলাম।

মোটামুটি এই পাঁচটি দোকান দেখে এবং খেয়েই আমার সেদিনের মত মিষ্টি খাওয়ার শখ শেষ হল। বাড়ির জন্য কিছু মিষ্টি নিলাম। এরপর ইচ্ছে ছিল হাতিবাগান দিয়ে শ্যামবাজারে গিয়ে গোলবাড়িতে রুটি মাংস খাব। কিন্তু পেটের অবস্থা দেখে সেটা বাদ দিলাম সেদিনের মত। তাও শ্যামবাজার মোড় অবধি গেলাম। হরিদাস মোদকের দোকানটা চিনে রাখলাম। এখানকার খাবারের জন্য আরেকদিন আসতে হবে। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে গেছে। এবার শিয়ালদহ হয়ে বাড়ি।  

আরও একটু ঘুরলে আরও কিছু দোকান দেখাই যেত। কিন্তু শুধু ছবি তোলা তো আর আমার উদ্দেশ্য ছিল না। তাই আর সেদিনের মত ঘোরাঘুরি করলাম না। আমার উদ্দেশ্য তো সফল হয়েই গেছে----কম পরিশ্রমে বেশি ভালো খাওয়া। আমি যে চত্বরটায় ঘুরে এইক’টা দোকান দেখলাম, সেটা একজন সাধারণ গতিবেগে হাঁটা লোকের ঘুরতে আধঘণ্টার বেশি লাগবে না। আবার আরেকদিন হবে।

...(সমাপ্ত)...


নাপোলি ও পম্পেই ভ্রমণ: ইতিহাসের এক অদেখা ক্যানভাস

ছবি : ইন্টারনেট

নাপোলি ও পম্পেই ভ্রমণ: ইতিহাসের এক অদেখা ক্যানভাস

ডাঃ রণধী দাশ

নেপোলি: ইতিহাসের শহরে এক নতুন দিন

সকালের হালকা জলখাবার সেরে রোমা টারমিনি স্টেশন থেকে আমাদের নেপোলি যাত্রা শুরু হলো। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম নেপোলি সেন্ট্রালে। হোস্টের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছাতে পাঁচ মিনিটও লাগলো না। সুন্দর ও বড় এই অ্যাপার্টমেন্টে আমরা পরবর্তী তিন রাত কাটাবো।

নেপোলি, বা নাপোলি, ইতালির এক ঐতিহাসিক শহর যা তার অনন্য সংস্কৃতি, শিল্প এবং অবশ্যই বিশ্ববিখ্যাত নেপোলিটান পিজ্জার জন্য পরিচিত। ২৮০০ বছরের পুরোনো এই শহরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার ছাপ। নেপোলি শহরের প্রাণকেন্দ্রে Spaccanapoli-এর সরু গলিগুলো যেন এক জীবন্ত জাদুঘর, যা আমাদের মুগ্ধ করে রাখলো।

নেপোলিটান পিজ্জা এখানকার এক বিশেষ আকর্ষণ। এখানকার পিজ্জায় ব্যবহৃত টমেটো ভিসুভিয়াস পর্বতের ঢাল থেকে আসে, আর মোজারেলা ডি বুফালা নামক বিশেষ মোজারেলা তৈরি হয় ভূমধ্যসাগরীয় মহিষের দুধ থেকে, যা এই পিজ্জাকে এক অসাধারণ স্বাদ দেয়। আমরাও এখানকার বিখ্যাত নেপোলিটান পিজ্জা, পাস্তা, এবং সি-ফুড দিয়ে তৈরি Grigliata di calamari e gamberi ও Mozzarella di bufala Pizza খেলাম, যা ছিল এক কথায় অসাধারণ।

পম্পেই: ভিসুভিয়াসের কোলে এক নীরব শহর

নেপোলি থেকে পম্পেই যাওয়ার জন্য আমরা পাশের দোকান থেকে বাস টিকিট কেটে নিলাম। মোটামুটি ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা ভিসুভিয়াসের পাদদেশের এই ঐতিহাসিক স্থানে পৌঁছে গেলাম।

পম্পেই এক রোমান শহর, যা ৭৯ খ্রিস্টাব্দে ভিসুভিয়াসের ভয়াবহ অগ্নুৎপাতে মুহূর্তের মধ্যে লাভা আর ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, এই অগ্নুৎপাতই শহরটিকে ইতিহাসের বুকে অক্ষত রেখে দেয়। ১৮ শতকে খনন কাজ শুরু হওয়ার পর এই শহরটি যেন পুনরায় জেগে ওঠে। এখানে আজও দেখা যায় প্রাচীন বাড়ি, থিয়েটার, বাজার এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিদর্শন।

পম্পেই-এর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমরা যেন ২০০০ বছর আগের রোমান যুগে ফিরে গিয়েছি। এখানকার প্রতিটি স্থাপত্য, প্রতিটি শিল্পকর্ম যেন সেই ভয়াবহ মুহূর্তের নীরব সাক্ষী। আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে জমাট বাঁধা মানুষের শরীরের ছাঁচগুলো দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম, যা সেই সময়ের ভয়াবহতা অনুভব করতে সাহায্য করে। এই পুরো এলাকাটি ঘুরতে আমাদের ঘন্টা দুয়েক সময় লাগলো।

ফিরে আসা এবং নতুন আবিষ্কার

পম্পেই থেকে ফেরার পথে আমরা কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনার বাড়ি দেখলাম। নেপোলিতে খেলার সময় এই বাড়িতেই থাকতেন তিনি। সন্ধ্যায় নেপোলি ফিরে এসে আমরা শহরের আরও কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখলাম, যেমন - Sansevero Chapel Museum, San Gregorio Armeno, Museo Archeologico Nazionale di Napoli এবং আরও কিছু স্থান।

সূর্যাস্তের আলোয় নেপোলি শহরের সৌন্দর্য ছিল এক ভিন্ন মাত্রার। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে, আমরা একটি স্থানীয় দোকানে গিয়ে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার খেলাম। রাতের আঁধারে নেপোলি শহরের অলিগলিতে হেঁটে, তার উষ্ণতা অনুভব করে আমরা অ্যাপার্টমেন্টে ফিরলাম। পরদিন নতুন করে আরও কিছু অনাবিষ্কৃত স্থানের সন্ধানে বেরোনোর জন্য তৈরি হয়ে নিলাম।












...(সমাপ্ত)...