1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

অচেনা দুধপাথরি

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

অচেনা দুধপাথরি

সুমেধা চট্টোপাধ্যায়


কাশ্মীরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মণিমুক্তগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি জায়গা এখন মানুষের পদধূলি-ধন্য হয়ে গেছে। গড়পরতা ভ্রামণিকরা গুলমার্গ, সোনমার্গ, পহেলগামের বাইরে খুব বেশি যায় না। কিন্তু একটু অন্যরকম জায়গা যারা দেখতে চান এবং একটু নিরিবিলিতে প্রকৃতি উপভোগ করতে পছন্দ করেন তারা একটু পায়ে পায়ে ঘুরে দেখতেই পারেন ইউসমার্গ, দুধপাথরি, কোকেরনাগ অথবা গুরেজ ভ্যালি।

 এবছর এক বসন্ত দিনে আমার সুযোগ হয়েছিল "দুধপাথরি" ছুঁয়ে দেখার, তার রূপে স্নাত হওয়ার। কাশ্মীর ভ্রমণে আমরা একটা পুরো দিন রেখেছিলাম দুধপাথরির জন্য। অপরূপ কাশ্মীর, এ যেন প্রাচ্যের স্বর্গ। সেই যে স্কুলের দিনগুলিতে ভূগোল বইতে পড়া 'ভূস্বর্গ', তাকেই যেন ছুঁয়ে দেখা। নীলাভ দেওয়ালের মতো চারিদিকের প্রকৃতিকে ঘিরে আছে বরফে ঢাকা সুউচ্চ পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে দেবদারু, পাইন,ফার এবং ওক গাছেরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, যেন সেই প্রাচীন কাল হতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরী সবাই। নিশ্চুপ,নিশ্চল। ঝিরঝির করে বয়ে চলা বুনো ঝোরা আর উপত্যকার বুক চিরে শুয়ে থাকা স্বচ্ছতোয়া নদী। এই নদী এখানে শালিগঙ্গা নামে পরিচিত। ভরা শীতে ইনি শ্বেত বসনা হয়ে পড়েন; অর্থাৎ জল প্রায় বেশির ভাগটাই জমে যায়। বড় পাথরে জলতরঙ্গের সুর তুলে উচ্ছল কিশোরীর মতো ছুটে চলেছে সে। পাহাড়ের ফাঁকে কোথাও একটু সমতলে জমিতে ছোট্ট ছোট্ট ঘরবাড়ি,বাগান,ফসলের মাঠ। এমন আঁকা প্রকৃতি যে আর্টিস্টরা হাতে রং-তুলি তুলে নিতে বাধ্য।

ছবি : সুমেধা চট্টোপাধ্যায়

 শ্রীনগর থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে প্রকৃতির এই আশ্চর্য সৃষ্টি দুধপাথরি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৯০০০ ফিট। এই এলাকাকে কাশ্মীরের 'দুগ্ধ উপত্যকা' বলা হয়।

 'দুধপাথরি' শব্দটির অর্থ দুধ ভর্তি পাথর বা দুধের উপত্যকা। আমরা যখন শ্রীনগর থেকে রওনা দিয়ে উপত্যকার কাছে পৌঁছলাম বেশ জোরে বৃষ্টি নামল। একটি দোকানে গরম গরম আলুর পরোটা এবং কফি সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা সেজে নিলাম যুদ্ধের সাজে, অর্থাৎ বর্ষাতি এবং বড় গামবুট আমাদের দোসর হল। যে রেস্তোরায় আমরা জলযোগ সারলাম সেখানকার পিছনদিকের জানলা থেকেও আমরা এক অপরূপ ভ্যালির দৃশ্য দেখেছিলাম। হাল্কা বৃষ্টি পড়ছে। সবুজ চাদরের মাঝে কারও দু'একটি ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। চারিদিক একদম স্বর্গসদৃশ প্রায়। তুলে নিলাম জানলার ফাঁক দিয়ে কয়েকটি ছবি। তারপর বর্ষাতি-গামবুট সহ আমরা চললাম দুধপাথরির দিকে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে দুধের সরের মতো বরফের আচ্ছাদন। মনে হচ্ছে গৃহিনীর ক্ষণিকের অসাবধানতায় দুধ উতলে সর পরে আছে চারিদিকে। এঁকেবেঁকে গাড়ি চলেছে। আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোক ঢোকার মুখে একজনের সঙ্গে কথা বলে নিলেন। বেশি গাড়ির ভিড় তখনও না থাকায় পারমিশন নিয়ে শেষ পর্যন্ত গাড়ি নিয়েই চললেন।

ছবি : সুমেধা চট্টোপাধ্যায়

 ''দুধপাথরি" নামের পিছনে লুকিয়ে আছে একটা মজার গল্প। স্থানীয় উপকথা মতে, অনেককাল আগে এই কাশ্মীর উপত্যকায় বাস করতেন এক ধর্মপ্রাণ মানুষ। একাধারে কবি, গীতিকার ও সুফি সাধক সেই মানুষটার নাম শেখ নূর-উদ্দিন নূরানী। একদা বিশেষ এক প্রয়োজনে এই পথ দিয়েই চলেছিলেন সুফি পীর শেখ নূর। নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় পথের মধ্যে ঘাসেঢাকা এক অজানা মাঠে থামতে বাধ্য হন তিনি। নামাজের আগে অজু করতে জল দরকার। এদিকে আশেপাশে নদী বা ঝরনা কিচ্ছুটি নেই। ভারি বিপদে পড়লেন ঋষি নূর। জল খুঁজতে গিয়ে মাঠের শক্ত মাটিতে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন তিনি। সেই আঘাতে আশ্চর্যভাবে মাটি ফেটে বেরিয়ে আসে দুধের ধারা।

 কথিত আছে যে, দুধ বেরোতে দেখে বিস্মিত হয়ে বলে ওঠেন শেখ নূর, বলেন, এ দুধ দিয়ে কী করব আমি! দুধ পান করা যেতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে অজু করা তো যাবে না। সাধকের মুখে এ কথা শোনামাত্র দুধের সেই ধারাই বদলে যায় স্বচ্ছতোয়া জলে। পাহাড়ের উপরে ঘাসজমির মধ্যে দিয়ে সেই দুধেল জল না কি আজও বয়ে যায়। আর এই ঘটনার পরই এই ঘাসেঢাকা উপত্যকার নাম হয়ে যায় "দুধপাথরি"।

 গরমের দিনে পরিস্কার আকাশে প্রকৃতি যেন তার রঙের বাক্স উপুড় করে দেয় এই দুধপাথরি উপত্যকায়। হাতছানি দিয়ে ডাকে পুরু সবুজ ঘাসের গালিচা আর ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা রঙের বুনো ফুল। মৃদুমন্দ বয়ে চলেছে পাথুরে নদী। তার বরফগলা ঠান্ডা জল ক্লান্ত শহুরে শরীরকে স্নিগ্ধ করে। দূরে দিঘল গাছের সারির মাথায় নানা রঙের খেলা শুরু হয় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তে।

 আমরা অবশ্য অন্য একটি রূপ দেখলাম দুধপাথরির। কনকনে ঠান্ডা। মাঝে মাঝে হাল্কা তুষারপাত। বেশ কয়েক ইঞ্চি পুরু বরফ। দূরে পীরপঞ্জালেও জমেছে মন খারাপের মেঘ। শালিগঙ্গা নদীর ধার পর্যন্ত নেমে যাওয়া যায় অনেক নীচে। বরফ গলা জলে বেগবতী শালিগঙ্গা যেন ভরা যৌবনবতী। তাকিয়ে থাকলে ঘোর লেগে যায়। অনেকে আবার নদী পার হয়ে অন্য পারে যাচ্ছে। আমরা ঐ সুঁচ-বেঁধা ঠান্ডার মাঝে আর ওপারে যাই নি। তবে মন-প্রাণ ভরে আকণ্ঠ পান করেছিলাম এই দুধের উপত্যকার সৌন্দর্য। যেন প্রতি বাঁকেই অপেক্ষারত বিস্ময় এবং প্রকৃতির উজাড় করে দেওয়া শোভা। শালিগঙ্গা থেকে ফিরতি পথে এক জায়গায় বরফের উপর দেখি লাল-শিফন পরিহিতা এক মহিলা নুডল স্ট্র‍্যাপ ব্লাউজ পরে রিল বানাচ্ছেন। লোকজন বেশি নেই। রীল বানানোর আদর্শ জায়গাই বটে। আমরা সেই বরফেই বেশ খানিক তফাতে রেইনকোট খুলে ছবি তুললাম। বৃষ্টি অনেকটা হাল্কা, কিন্তু গা ভিজে যাচ্ছে। তবে চারিদিকের অপার সৌন্দর্য মন কেড়ে নেয়। তাই অন্য কোনও প্রতিকূলতাই আর স্পর্শ করে না মনকে।

ছবি : সুমেধা চট্টোপাধ্যায়

 

একদিকে হিমাচল প্রদেশ আর অন্যদিকে জম্মু-কাশ্মীর, এর ঠিক মাঝখানে মগ্ন মৈনাকের মতো ঘুমিয়ে আছে পীরপঞ্জাল রেঞ্জ। ভৌগলিকভাবে হিমালয়ের এই পীরপাঞ্জাল রেঞ্জেরই অংশ দুধপাথরি, যার একদিকে ছড়িয়ে আছে চিরসবুজ পাইন আর দেবদারু গাছের জঙ্গল, আর অন্যদিকে ঘাসের গালিচা। পশুচারণের উপযুক্ত এই তৃণভূমিতে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় কাশ্মীরী ভেড়ার পাল। গ্রীষ্মে উপত্যকা ছেয়ে যায় ডেইজি এবং বাটারকাপের মতো হলুদ সাদা বুনো ফুলে। সে এক অদ্ভুত মনোরম দৃশ্য!

 আমার চোখে দুধপাথরি মনে হয়েছিল যেন পরীদের গ্রাম। মানুষেরা এখানে পরিযায়ী। আসে, চলে যায়। নীড় বাঁধে না।গরমের দিনগুলোতে ভেড়ার পাল নিয়ে রাখালের দল এ পথে যাওয়া আসা করে ঠিকই, কিন্তু শীতের কয়েকমাস প্রচন্ড তুষারপাতের ফলে এই অঞ্চল মনুষ্যবসবাসের একেবারে প্রতিকূল হয়ে ওঠে। গরমকালের এই ছমাসই দুধপাথরিতে বেড়াতে যাওয়ার সময়।

 বিদেশী পর্যটকদের অনেকেই দুধপাথরীকে 'মিনি কাশ্মীর' হিসেবে বর্ণনা করেন। কি অদ্ভুতভাবে আমরা যখন এই উপত্যকায় প্রবেশ করছি তখন আমাদের সকলেরই মনে হয়েছিল কাশ্মীরে আসার পয়সা উসুল হয়ে গেল শুধু দুধপাথরি এসেই। সমগ্র কাশ্মীরের সোউন্দর্যের প্রতিভূ হয়েই আমাদের মনে জায়গা করে নিল এই দুধের উপত্যকা। পশ্চিমে অবস্থিত বিখ্যাত তুসামিদান। অল্প দূরেই রয়েছে স্বচ্ছ জলের লেক নীল নাগ। লেকের জলে সত্যিই যেন নীল গুলে দিয়েছে কেউ। আশেপাশে গভীর জঙ্গল, ইতস্তত ঘাসজমি আর দূরের পাহাড় নিয়ে আদর্শ পিকনিক স্পট এই নীল নাগ। আমরা অবশ্য ঐদিকে আর যাই নি।

 শালিগঙ্গার দিকে যেতেই চোখে পড়েছিল দুধপাথরির JKTDC র আবাস। কেমন যেন ভয় করে উঠল! জন-মানব শূন্য। নি:সারে বৃষ্টি পড়ছে। বরফের আচ্ছাদনের মাঝে বাংলো যেন গা ছমছমে হানা বাড়ি। শুনলাম গরম কালে ভালোই লোকজন থাকে এখানে। এবার যেহেতু বরফ অনেকটাই দেরিতে পড়া শুরু হয়েছে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে, তাই এই মার্চ শেষ বা এপ্রিলেও চলছে বরফের মরসুম - শীতকাল।

ছবি : সুমেধা চট্টোপাধ্যায়

 ফেরার সময়ে বেশ খানিকটা যানজটে পড়তে হল। ততক্ষণে অনেক গাড়ি ভিতরে ঢুকে এসেছে। আমাদের সারথি জহুর ভাই বলেই রেখেছিল দুধপাথরি থেকে ফেরার পথে এখানকার লোকাল কুইজিন 'সর্ষো দা সাক' আর 'মক্কি দি রোটি' খাওয়াবে। ফিরতি পথে এই খাবারের অসংখ্য ঝুপড়ি চোখে পড়ল। মক্কি' শব্দটির অর্থ 'ভুট্টার গুঁড়োর রুটি'। ভুট্টার গুঁড়ো দিয়ে হলুদ রঙের রুটির মতো বেলে নিয়ে তা তাওয়ায় সেঁকে বেশ কুড়মুড়ে এক ধরণের রুটি বানানো হয়। সঙ্গে আমাদের দিয়েছিল স্থানীয় আচার এবং সর্ষে শাকের একটি অত্যন্ত সুস্বাদু পদ। ঝুপঝুপে বৃষ্টির মধ্যে এই গরম গরম রুটি ও শাকের তরকারি যেন অমৃতসমান মনে হল। স্বাদকোরকগুলি যেন শীতঘুম শেষে জেগে উঠল আড়মোড়া ভেঙে। তাদের প্রাণে খুশির জোয়ার এল যেন। দুধপাথরিকে পিছনে ফেলে এবার এগিয়ে যাওয়ার পালা। খাবারের জায়গাটির পিছনেও উঁকি মারছে পীরপঞ্জাল। চারিদিক দিয়ে ঘিরে এই উপত্যকার অতন্দ্র প্রহরায় যেন সে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে দুধের সর তখনও বিদ্যমান। জহুর ভাই বললেন, 'আঘলি বার গরমি মেইন আনা, পুরা ভ্যালি দুসরা দিখেগা।' পরিতৃপ্ত এবং সৌন্দর্য-সম্পৃক্ত মনে আমরা দুধের উপত্যকাকে বিদায় জানালাম।

 কেউ যদি কখনও দুধপাথরি যাওয়ার কথা ভাবেন, তাহলে আমাদের ড্রাইভার জহুর আহমেদকে যোগাযোগ করতে পারেন। চলভাষঃ 9622439599


No comments:

Post a Comment