1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

দুর্গাপুজা উৎসবের অন্তরালের গল্প

ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

দুর্গাপুজা উৎসবের অন্তরালের গল্প 

প্রহ্লাদ ভৌমিক 



   অসংখ্য দেবদেবীর মধ্যে বাঙালি আমজনতার মানসলোকে  দেবী দুর্গার প্রভাব অপরিসীম। এই দুর্গা হিমালয় কন্যা উমা,যিনি দেবাদিদেব শিবের দ্বিতীয় ঘরনী । পুরাণে বলা হয়েছে শিবের প্রথম ঘরনী ছিলেন দক্ষ-কন্যা সতী । পিত্রালয়ে সতী পতি নিন্দা সহ্য করতে না পেরে দেহত্যাগ করেন।

এরপর হিমালয়ের কন্যা হিসাবে তিনি পুনরায় জন্ম গ্ৰহণ করেন। তখন তাঁর নাম হয় উমা । অতি শৈশব থেকেই উমা শিবকে পুনরায় পতি হিসাবে পাবার জন্য আকুলা হয়ে উঠেন । এই আকুতি নিয়েই উমার বয়স বাড়ে । অতঃপর শিবের তপস্যায় ব্রতী হন ।তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব উমাকে পত্নী হিসাবে গ্ৰহণ করেন । মা উমা বাঙালি জনমানসে চির জাগ্ৰত এক আধ্যাতম চেতনার আনন্দময়ী রূপ ।

     "দুর্গাপুজা কথাটি আসলে পুজার লক্ষ্যে দেবী দুর্গা । পুজা এখানে অবশ্যই বৈদিক ক্রিয়াকান্ড।

আবার মহাদেবী দুর্গা রূপে পুজার উল্লেখ ধর্মগ্ৰন্থে । বাংলার অতি জনপ্রিয় প্রসিদ্ধতম উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব কে পন্ডত মহল যতই মার্কন্ডেয় চন্ডীর সাথে যুক্ত করে অসুর নাশিনী দেবীর পুণ্য মহোৎসবের কথা বলুন না কেন বাংলার জনমানস মার্কন্ডেয় চন্ডীর তেমন কোন ধার ধারে না । বাংলার সাধারণ জনগণ প্রতিমায়

দেবীকে অসুর নাশিনী মূর্তিই দেখে থাকেন,কিন্তু ওই পর্যন্তই । তারপর তাঁরা স্থির নিশ্চিত রূপে জানেন যে ওসব আসলে আর কিছুই নয়, উমা মায়ের স্বামীগৃহ কৈলাশ ছেড়ে বৎসরান্তে এক বার কন্যা রূপে সন্তান সন্ততিদের নিয়ে বাপের বাড়ি আগমন, তিনদিন বাপের বাড়িতে উৎসব আনন্দ, তারপরেই আবার চোখের জলে বিজয়া।" বাংলার জনমানসে এই সত্যকে অবলম্বন করেই বাংলায় এত আগমনী ও বিজয়া সঙ্গীতের অমর সৃষ্টি । দুর্গাকে নিয়ে শারদোৎসবের এত বড়ো আয়োজন, দুর্গার এত সার্বজনীনতা । জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আপামর বাঙালি সাগ্ৰহে অপেক্ষা করে থাকে এই কয়টি দিনের জন্য । তাই বাঙালির অন্যতম

প্রধান উৎসব হচ্ছে দুর্গাপুজা ।এ এক অমোঘ উৎসব । কবে থেকে বাংলার সমাজ জীবনে এই শারদোৎসবের সূচনা হয়েছিল  তার কোনও সঠিক তত্ত্ব বা তথ্য আদৌ আছে কিনা  আমার অন্তত তা জানা নেই । এই বিষয়টি নিশ্চিত রূপেই বিস্তর গবেষণার বিষয়, ইতিহাস সন্ধানী

মানুষদের সন্ধানের বিষয় । এখানে আমার লেখার বিষয় হচ্ছে এই দুর্গাপুজা-উৎসবের অন্তরালের গল্প । তাই এই পুজাকে কেন্দ্র করে

পুরাণে দেবী দুর্গাকে যেভাবে নানান আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে সেই গল্প বৃত্তান্তই এখানে বলা বা জানানো ।

     সম্মানীয় পাঠক শ্লোকটির প্রতি লক্ষ্য করুনঃ

   "রামস্যানুগ্ৰহার্থায় রাবণস্য বধায়চ

    যাত্রাবেবা মহাদেবী  ব্রহ্মণা বোধিতা পুরা ।।" 

     শ্রীরামচন্দ্র লংকাপতি রাবণকে বধ করার জন্য আশ্বিনের শারদ শুক্লপক্ষে এই দুর্গার বোধন বা পুজা অকালে অসময়ে করে ছিলেন বলে এই পুজা শারদীয়া পুজা ও দেবীর অকাল বোধন হিসাবেই বেশি খ্যাত । শ্রীরামচন্দ্রের এই অকাল বোধনের কাহিনী কৃত্তিবাস বর্ণিত রামায়নে থাকলেও বাল্মীকির রামায়নে রামচন্দ্র কখনই অকাল বোধনে দুর্গাপুজা করেন নাই।

     পুরাণে উল্লেখ আছে যে সত্য যুগে রাজা সুরথ এবং সমাধিবৈশ্য দুর্গাদেবীর মূর্তি তৈরী করে তিন বছর আরাধনা করেছিলেন । ত্রেতা যুগে লংকাপতি রাবণ বসন্তকালে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপুজা করেছিলেন, যাকে "বসন্তী পুজা" বলা হয় । " চন্ডী"-গ্ৰন্থের বর্ণনায় জানা যায় যে " মধু" ও " কৈটভ" নামে দুই মহাশক্তিধর

পরাক্রমশালী অসুরের হাত থেকে দেবতাদেল রক্ষা করার জন্য  প্রজাপতি ব্রহ্মাও অসময়েই দেবীকে জাগরিত করেছিলেন স্তবে । আবার  ব্রহ্মান্ড পুরাণে  কামদেবের ভস্ম থেকে সৃষ্ট "ভন্ড" নামে জনৈক অসুরকে বধ করার জন্যই নাকি  দেবীকে অসময়ে জাগরিত করা হয়েছিল। এরকম বিভিন্ন মতে বিভিন্ন ভাবে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে দেবী বোধনের  কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে । এমন কাহিনীও আছে যে  দ্বাপরে গোপ কুমারীগণ তাদের কৃষ্ণপ্রেমে নিবেদিত প্রাণ, মন এমন কি শরীর পর্যন্ত সমর্পণ করে  কৃষ্ণকে পতি রূপে পাবার জন্য অগ্ৰহায়ণ মাসে হেমন্ত কালে দুর্গাপুজা করেছিলেন ।

"মহাভারত" -গ্ৰন্থে দেখুন, জৈষ্ঠ্য পান্ডব যুধিষ্ঠিরের দুর্গোৎসব এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রারম্ভে  শ্রীকৃষ্ণের  উপদেশে ও পরামর্শে তৃতীয় পান্ডব অর্জুনের দুর্গা স্তবের কথা বলা হয়েছে ।

এই সব পুরাণ কাহিনী শুনে এ কথা বলা যেতেই পারে যে স্বর্গের দেবতাই বলুন  আর মর্ত্যের মানুষই বলুন, সকলেই কিন্তু দুর্গার আরাধনা  করেছেন নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই।

না, না, থাক, দেবদেবী নিয়ে এভাবে মন্তব্য করা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি মনে হতে পরে । তার চেয়ে বরং বলি , দুর্গার পুজার্চনা, আরাধনা , স্তব যে যাই করেছেন তা মূলত দুর্গতি নাশের জন্যই

করেছেন আর শুভ লাভের জন্য করেছেন ।

 "দুর্গা" মানে যাকে দুঃখে জানা যায় , কিংবা যিনি প্রকৃত পক্ষেই একজন দুর্গ অর্থাৎ সমূহ সংকট থেকে রক্ষা করেন ,ত্রাণ করেন যিনি ।

অর্থাৎ যিনি বিঘ্ন নাশক সূচক , দৈত্যনাশ সূচক রোগ ব্যাধি, পাপনাশ সূচক , আপদে বিপদে রক্ষা করেন এবং অন্যায় -অসত্যকে হনন করেন বলেই ইনি দুর্গা । ইনিই শিবপত্নী, পরমা প্রকৃতি ও বিশ্বচরাচরের আদি কারণ, দুর্গাই মহাশক্তি মহামায়া,  দশপ্রহরণ-ধারিনী ত্রিনয়নী  মা ।"

দুর্গার আবির্ভাব বা উৎপত্তি যাকে সোজা কথায় বলা যায় দুর্গার আবিস্কার নিয়েও বিভিন্ন পুরাণে মত ও বর্ণনার ভিন্নতা রয়েছে। ঋকবেদেও  দেবীরূপে পার্বতী -উমার উল্লেখ আছে।আবার একদল পন্ডিতের দৃঢ় ধারণা " বৈদিক যজ্ঞাগ্নি থেকেই পৌরাণিক দুর্গাদেবীর উৎপত্তি ।"এর কারণ ব্যাখ্যাত হয়েছে যে অগ্নি মহাশক্তি রুপিনী তেজময়ী । অগ্নিতে যে শক্তি , ওই দুর্গার মধ্যেও সেই শক্তি । দুর্গা সর্ব দেবতার সম্মিলিত তেজ  ও শক্তি । তাই দুর্গা অগ্নি স্বরূপা । দার্শনিক  দৃষ্টিকোণ থেকেও উমাকে বলা হয়েছেব্রহ্মদায়িনী । অর্থাৎ যিনি দেবতাগণকে প্রথমে ব্রহ্মজ্ঞান দান করেন । আবার তান্ত্রিক মতে বলা হয়েছে যে কুমারী দেবীর প্রতীক , যে কারণে কুমারী পুজার প্রচলন ঘটেছে । ভারতবর্ষকে এক সময় কুমারী দ্বীপ বলা হতো । অনেকের মতে ওই নাম থেকেই দুর্গার কুমারী নামের উৎপত্তি । আবার এ কাহিনীও পুরাণে বর্ণিত আছে  যে ব্রহ্মার বরে অমরত্ব লাভ করে  মহি-অসুর যখন স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে, মুনিঋষি দেবতাগণ সম্মিলিতভাবে বিষ্ণু ও শিবের শরণা পন্ন হন এবং স্বর্গরাজ্য সহ তাঁদের সকলের নিরাপত্তা ও রক্ষার জন্য মহি-অসুরকে বধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্ৰহণের দাবি জানান । সব শুনে বিষ্ণুদেব ক্রোধে জ্বলে উঠেন এবং তাঁর মুখ মন্ডল আগুনের মতো রক্তিম হয়ে ওঠে আর তখন দেবতাদের শরীর থেকে  ক্রমাগত তেজপুঞ্জ নির্গত হতে থাকে । বিশাল পর্বতের মতো একীভূত ওই তেজপুঞ্জের ভেতর থেকে এক জ্যোতির্ময়ী পরমা সুন্দরী নারী মূর্তির আবির্ভাব ঘটে । এই নয়নাভিরাম জ্যোতির্ময়ী নারীই মহাদেবী, মহিষাসুর মর্দ্দিনী, ইনিই সেই দশপ্রহরণধারিনী  দেবী দুর্গা , ইনিই মহাশক্তি ।এরপর দেবতাগণই তাঁদের সকলের মোক্ষম সব অস্ত্রে সজ্জিত করেন দেবীদুর্গাকে । অস্ত্রসস্ত্রে

সজ্জিতা দেবী দুর্গার  সাথে মহি-অসুরের যুদ্ধ শুরু হয় । যুদ্ধের দশম দিনে ভহি-অসুর বিরাট আকারের মহিষের মূর্তি ধারণ করে দুর্গাকে প্রতি আক্রমণ করে  । শেষে দুর্গা ত্রিশূল বিদ্ধ করে মহি-অসুরকে বধ করেন । তাই দুর্গার নাম করণ হয় "মহিষাসুর মর্দ্দিনী" ।

দুর্গাকে যে চামুন্ডেশ্বরী বলা হয় তার পিছনেও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়কে কেন্দ্র করেই চামুন্ডেশ্বরী মূর্তির কল্পনা করা হয় । ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল বা রাজ্যভেদেও দেবী দুর্গার এক এক নাম,এক এক রূপের প্রকাশ ঘটেছে । কোথাও তিনি দশভূজা ,কোথাও তিনি অষ্টভূজা । বাংলায় যিনি "দুর্গা," 

উত্তরপ্রদেশে তিনিই  "বিন্ধবাসিনী", গুজরাটে  তিনিই "কল্যাণী", মহারাষ্ট্রে "ভবানী", তামিল নাড়ুতে "মিনাক্ষী", কেরালায় "ভগবতী" আবার কর্ণাটকে "চামুন্ডশ্বরী" হিসাবে পুজিতা হন ।

আসমুদ্র ভারতে দেবী দুর্গার বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকাশ যেমন রয়েছে তেমনি অসংখ্য  বৈচিত্র্যপূর্ণ নামেরও পরিচয় পাওয়া যায় । "কৈলাশবাসিনী"  "বিন্ধ্যবাসিনী", "পার্বতীদূবী","উমা", "সিংহবাসিনী","ভবানী অম্বিকা", "ভদ্রকালী" , "শারদলক্ষ্মী","গৌরী" ইত্যাদি নামগুলি যেমন আছে তেমনি পুরাণে আবার দেবীর অষ্টমূর্তীর

কথা উল্লেখ করে "মঙ্গলা","বিজয়া","ভদ্রা" "জয়ন্তী","অপরাজিতা","নন্নিনী","নারসিংহী", এবং "কৌমারী" নামগুলির কথাও বলা আছে ।এছাড়াও নাকি দুর্গার আরও হাজারো নাম আর হাজারো রূপের বর্ণনা রয়েছে । শ্রী শ্রী চন্ডীতে বলা হয়েছে যে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণী শক্তি জগত পরিচালনা করেন। তিনিই শ্রী শ্রী মহামায়া আদ্যাশক্তি তাঁর স্বরূপ তিনি প্রয়োজনে সাকার,নিরাকার আবার এক ও বহু হতে পারেন । তাই দেবীর অসংখ্য নাম- সনাতনী, মহামায়া, পার্বতী,মহেশ্বরী,ত্রয়ী,দুর্গা,লক্ষ্মী, কাত্যায়নী ইত্যাদি ।

প্রজাপতি ব্রহ্মা মহামুনি  মার্কন্ডেয়কে নব দুর্গার কথাও বলেছিলেন দুর্গার নয়টি ভিন্ন  ‌রূপের বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে । আমরা এই নব দুর্গার অস্তিত্ব ও অধিষ্ঠান দেখতে পাই কাশীতে।

এখানে দুর্গার নয়টি আলাদা মন্দিরে নবদুর্গার নয়টি রূপ বৈচিত্র্যের প্রকাশ ঘটানো হয়েছে ।নব রাত্রিকালে প্রতিপদ থেকে মহানবমী এই নয়দিন ব্যাপী চন্ডীর নবদুর্গার শ্লোকে পরপর দূবীর পুজা হয় ।

     পুরাণে এমন আখ্যানেরও উল্লেখ আছে যে দক্ষকন্যা সতী বাপের বাড়িতে পতি নিন্দা সহ্য করতে না পেরে দেহত্যাগ করলে ক্রুদ্ধ মহাদেব তাঁর জটাজাল ছিন্ন করে "বীরভদ্রের",জন্মদান করেন । এই বীরভদ্রই দক্ষ যজ্ঞ পন্ড করতে যখন সেখানে যান তখন তার সঙ্গে গিয়েছিলেন এই নবদুর্গা । তবে এই নবদুর্গার সাথে কাশীতে অধিষ্ঠাত্রী নবদুর্গার কোন সম্পর্ক আছে কী নেই সেরকম কোন তথ্য আমার জানা নেই ।

       পন্ডিতগণের অনেকের মতে মা দুর্গার সঙ্গে যে নব পত্রিকা (কলাবউ ) পুজিতা হন তিনিও নাকি নবদুর্গারই স্বতন্ত্র্য রূপ । এই ভাবে পুরাণ শাস্ত্র,তন্ত্রসার ভাগবত চন্ডীতে  দেবী দুর্গা নানান রূপে ,নানান ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন আর তাকে ঘিরে  তাঁর অরূপ মহিমার নানান লীলা কাহিনী  ও উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে । উল্লেখিত আখ্যানজুড়ে সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে মাতৃবন্দনার উপরেই সকলের আস্থা,বিশ্বাস ও পরম্পরা ।মাতৃবন্দনার এই প্রবণতার মুখ্য কারণই হলো।সমাজ ব্যবস্থা । সেই সময় ছিল মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা । স্বাভাবিক ভাবেই নারীকে মনে করা হতো শক্তি স্বরূপা ।তাই স্তবে,তপস্যায়, পুজার্চনায় দেবীকে তুষ্ট করতে পারলেই  সকল মনোবাসনা ,সকল অভীষ্ট সিদ্ধ ও সফল সম্ভব ।

তাই সেই সময় দেবী বন্দনা,মাতৃবন্দনাই প্রাধান্য পেয়েছিল  বলে মনে করা হয়। নারী সর্বশক্তি স্বরূপা বলেই দুর্গা কল্পনায় কুমারী পুজার প্রচলন ঘটেছিল বলে অনেকেই মনে করেন ।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই ভারতবর্ষে শক্তিপুজা প্রচলিত । বৈদিক যুগেও ছিল শক্তিপুজার প্রচলন । ্ ঋকবেদে তাই বিভিন্ন রূপে দেবীর উল্লেখ আছে , যেমন বিশ্বদুর্গা,সিন্ধুদূর্গা,অগ্নিদুর্গা ইত্যাদি । স্কন্দ পুরাণের মতে "রুরুদৈত্যের পুত্র দুর্গাসুরকে বধ করে দেবী বিশ্বলোকে পরিচিতাহয়েছিলেন দুর্গা নামে । চন্ডীতে দেবী নিজ মুখে বলেছেন-দুর্গম নামক এক অসুরকে বধ করে আমি জগতে প্রসিদ্ধা হবো দুর্গাদেবী নামে ।

    দেবীদুর্গা তাই সর্বশক্তি স্বরূপা ।তাঁর  মহা পুজায় সবাই মহিমান্বিত । দেবীদুর্গা  যেন সকলের অস্তিত্বের শিকড়ে প্রকটিত । তিনি সকলের সকল মনস্কামনার প্রতিরূপ হয়ে দেখা দেন । মাতৃ সাধকদের মতে শিশু যেমন ক্ষুধায় কাতর হলে মা,মা,মা বলে কাঁদতে থাকে ,শিশুর মা জননী ছুটে এসে ধুলোবালি ঝেড়ে শিশু কে সাদরে, সোহাগে কৈলে তুলে ধয়,তাকূ স্তন্যপান করায়, বাৎসল্য স্নেহে ভরিয়ে তোলে ,তেমনি আদ্যাশক্তি দেবী মহামায়াও ঠিক তাই । তাঁর শ্মরণ নেওয়াই শেষ কথা । বাঙালি জনমানসেও তাই সর্বশক্তি স্বরূপা দেবীদুর্গা  আসলেই তিনি মা  । সকলের "মা" বাঙালির চিরায়ত "মা" । মা দুর্গা যেন তাঁর সন্তানরুপী মানব কুলকে এক অপরূপ জগজ্জননী  উপহার দিয়েছেন ।

     এই মা আনন্দময়ী দুর্গার আগমনে মেতে ওঠে বাংলার আকাশ বাতাস , বাংলার প্রতিটি মানুষ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে হৃদয় উজার করে বরণ করে নেন "মা" কে পুজার উৎসবের আঙ্গিনায় । বর্ষার জল ভরা মেঘ ,অবিশ্রান্ত বর্ষণ,খেয়ালে চলা দিনের আলোর লুকোচুরি-এই সব অপসৃত হতে থাকে শরতের ছোঁয়ায়,দেবী দুর্গার আগমনে । তাই কাশ ফুলের সমারোহ, শিউলি, ছাতিম ফুলের সুগন্ধে,মাঠে মাঠে ধানগাছের সবুজের হিল্লোল আর ঘাসের বুকে মুক্তার মতো চড়িয়ে থাকা শিশির বাঙালির ঘরে ঘরে বার্তা পৌঁছে দেয় -পুজা আসছে,উমা আসছে ঘরে । এই আগমন বার্তার পরিতৃপ্ত পরিণতি ঘটে  দেবী পক্ষের সূচনায়, মহালয়ার পুণ্যলগ্নে  দেবীর আগমনী সঙ্গীতের মূর্ছনিয়,চন্ডী শ্লোক উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ।

   দেবী দুর্গার আগমন ও গমনকে কেন্দ্র করেও চার প্রকার  যানবাহনের কথা পুরাণে বলা হয়েছে ‌‌ যেমন গজে,দোলায়, ঘোটকে এবং নৌকায় ।  এই চার প্রকার যান বাহনেরও ভালো মন্দ ফলাফলের কথাও বলা আছে । দেবী দুর্গার আসা যাওয়ার যান বাহনের যে শুভ অশুভ ফলের যোগের উল্লেখ থাকে তার যৌক্তিকতা আছে কি নেই বা বিজ্ঞানসম্মত কি না এই নিয়ে কৌতুহল নিরসনের কোন দায় এই লেখায় নেই ।বরং দুর্গাপুজা  বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব যাঁরা বলেন তাঁদের দলে ভিড়ে গিয়ে বলি দুর্গা পুজা মানেই শারদোৎসব ‌‌ নানান বৈচিত্র্য কল্পনাই উৎসবের ভিত্তি । ধর্ম সমাজ মানুষকে ধারণ করে রাখে ‌ তাই মানুষও পুজা অনুষ্ঠানের ধর্মের মাধ্যমে গভীর ব্যাঞ্জনার সৃষ্টি করে সমাজ জীবনেও বৈচিত্র এনেছে । গণতান্ত্রিক শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সচেতন মানুষ পুজাকে টেনে নিয়ে এসেছে রাজা জমিদার ও ধনিক শ্রেণীর দেব দেউল থেকে মুক্ত প্রাঙ্গণে বারোয়ারী মন্ডপে ,পুজার সার্বজনীনতায় । ধনী দরিদ্রের ব্যবধান ঘুচিয়ে পুজা আজ জনজীবনের সংযোগকে আরও নিবিড়তর হৃদয়ের উষ্ণতায় সুসংবদ্ধ করেছে । পুজাকে ঘিরেই পরিণত রূপ পেয়েছে শারদোৎসবের ‌

      দুর্গাপুজার সঙ্গে ধর্মীয় ভক্তি ভাবনায় দেবী চিন্তনের শাস্ত্রীয় সম্পর্ক কতখানি তার মূল্যায়ধ করার দায়ও আমার নেই ‌। কারণ ধর্ম বিষয়টা পুরোপুরি বিশ্বাস আত আধ্যাত্ম চেতনার কিংবা আরও অন্য কিছু ‌। দুর্গা মাহাত্ম ঘিরে ধর্মীয় আবেগ যাই থাকুক না কেন,  বাংলার দুর্গা, বাঙালির দুর্গা ঘুরে ফিরে নানা ভাবে বাংলা সাহিত্যে এসেছে । ‌‌ বঙ্কিমচন্দ্রই কমলাকান্ত হয়ে দুর্গোৎসব নামে দেবী দুর্গার কল্পনা করেছেন ।যদিও এখানে দেবী দুর্গা বিবর্তিত হয়েছে দেশ মাতৃকারূপে । দুর্গা বন্দনা এখানে দেশ বন্দনা । দেবী ভক্তি এখানে দেশ ভক্তি,স্বদেশ প্রীতি-এ এক অনন্য রূপের অসাধারণ বিবর্তন । নজরুল ইসলামের "আনন্দময়ীর আগমনে" কবিতায় " দেখ মা দনুজদলনী..,অশিব নন্দিনী চন্ডীরূপ"  অথবা "আজ রণরঙ্গিনী জগৎ মাতার মহীরণ" আসলে দেবীরূপে বিশ্ববন্দনা । যেখানে যেভাবেই দুর্গা এসেছেঞ- মাতৃ স্বরূপাতেই এসেছেন । তাই দুর্গার কাছে মানুষ চিরকালই কৃপাপ্রার্থী ।

        মা দুর্গার স্মরণেই এবারের দুর্গোৎসব হোক শুভ বোধের উৎস । নারীকে পূর্ণ মাতৃজ্ঞানে মর্যাদা দেওয়া হোক  শারদোৎসবের আর এক লক্ষ্য ।

-----------

 গ্ৰন্থসূত্রঃ

(১)স্কন্দমাতা-প্রণব গৌতম ‌(২)দেবী জয়ন্তী-

স্বামী আত্মবোধনানন্দ (৩) দেবী দুর্গার রূপ বৈচিত্র-প্রশান্ত দা ।(৪) অনুপম বন্দ্যোপাধ্যায়

(৫) আদ্যাশক্তি দেবী মহামায়া- ব্রহ্মচারী নিত্যানন্দ (৬) স্বামী অচ্যুতানন্দ(৭) বর্তমান-শারদ সংখ্যা ‌(৮)নবকল্লোল -শারদ সংখ্যা ।

(৯) শারদীয়া দেশ (১০) বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।



No comments:

Post a Comment