1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label সৌমেন দেবনাথ. Show all posts
Showing posts with label সৌমেন দেবনাথ. Show all posts

Wednesday, October 2, 2024

কালো ও কালে কালে বহমান জ্বরা

ছবি : ইন্টারনেট

কালো ও কালে কালে বহমান জ্বরা

সৌমেন দেবনাথ 

তাকে সে ভীষণ পছন্দ করে কারণ তার ভেতর হাজারটা গুণ না থাকলেও এমন কিছু গুণ আছে যা তাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু মানুষজন মানতে পারেন না তাদের ভেতর এত মিল হয় কি করে! কেউ না কেউ তোমাকে পছন্দ করবেই কারণ কিছু গুণ তোমার ভেতরও আছে যা অন্যের চোখে পড়বে না, তোমার চোখেই পড়বে। প্রথম প্রথম বিভা এড়িয়ে চলতো, কিন্তু যখন সে বুঝতে পারলো মানুষটার হৃদয় অনেক বড়ো, তখন সে কাছে এসেছে, অনেক কাছে। কাউকে পেতে হলে, একান্ত করে কাছে পেতে হলে তাকে আগে বুঝতে হয়। এজন্য কেউ দ্রুত সন্নিকটে না এলে মন খারাপ করতে নেই, তাকে বুঝতে সময় দিতে হয়, তাকে বুঝতে নিজেরও সময় নিতে হয়।

অফিস থেকেই ফোন করে মৃদুল জানালো, চুলে বেণি করো, দুটি বেণি। 

বিভা মৃদুলের কথাতে হ্যাঁ সম্মতি জানালো। অথচ আজ দুপুরে স্নানের সময় সে চুলে স্যাম্পু করেছে। খোলা চুল ফ্যানের বাতাসে উড়ে উড়ে তাকে বিশেষ বিরক্ত করছে তখনও৷ স্বামীর খুশির জন্য সে এলোকেশে বেণি করতে বসে গেলো। নিজের পছন্দকে বিসর্জন দিলো স্বামীর খুশির জন্য। মানুষটি তাকে বিরক্ত করে, কিন্তু কখনো বিরক্ত হয় না। এই কারণে নিজের ভেতর বিরক্তিবোধ জাগলেও প্রকাশ করে না। সারাটা জীবন ভেবে ভেবে বড়ো হয়েছে, বিরক্ত কারবো, কিন্তু বিরক্ত হবে না এমন একজন মানুষ জীবনে চাই।

তেমন মানুষটি সে পেয়েছেও। একটু পরে ফোন করে জানালো, আসার সময় বাদাম আনবে।

মৃদুল বাসার কাছে চলে এলেও বুঝতে দিলো না, সে আবার স্থানীয় বাজারে গেলো। বাদাম কিনলো। বাদাম পেলেই যে সন্তুষ্ট হয় তাকে অসন্তুষ্ট করার জন্য ন্যূনতম অজুহাতও ব্যক্ত করা ঠিক না।

দিনশেষে মৃদুল বাড়ি এলে নিষ্পলকে চেয়ে থাকে বিভা। মৃদুল বলে, বিভার আভায় হারাবো আমি। নিকষে বিভা কী খোঁজে?

উত্তরে বিভা বলে, চরিত্রের সাথে সৌন্দর্যের তুলনা হয় না। সৌন্দর্য কখনো চরিত্রের চেয়ে দামি হতে পারে না। আর সৌন্দর্য আচরণে, ব্যবহারে; অঙ্গে না।

ঠোঁটে একটু হেসে মৃদুল বলে, কিন্তু নিষ্পলকে চেয়ে আছো কেন? মনে হয় প্রথম দেখছো! প্রথম দেখার মতো কি আশ্চর্য লাগছে আমাকে? আর আমাকে দেখে কি আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে?

বিভা বলে, চোখ থাকলেই হয় না, দৃষ্টিশক্তি থাকতে হয়। সুদৃষ্টিশক্তি। সোনা চেনা সহজ কাজ নয়। চোখ থাকার পরও চোখে দৃষ্টিশক্তির অভাবে মানুষ সোনাকে কাচ ভেবে ফেলে দেন। মানুষটা তুমি খাঁটি। অপেক্ষা করা সুন্দর হয় যখন যার জন্য অপেক্ষা করা হয় সে খাঁটি হয়। একজন খাঁটি মানুষ জীবনে আছে। খাঁটি মানুষের জন্য আশ্চর্যতা ফুরায় না।

মৃদুল বলে, চোখের দিকে অনন্তকাল তাকালেও কি মানুষ চেনা যায়? 

বিভা বলে, মনের কথা বুঝতে মন লাগে। না বলা কথাগুলো অনুভব দিয়ে বুঝে নিতে জানলে আপন মানুষ চেনা যায়। কারণে-অকারণে যে খোঁজ নেয়, আমি জানি সে আমাকেই চায়।

মৃদুল হাসে। প্রাপ্তির হাসি, মিষ্টি হাসি। হেসে নিয়ে বলে, সুযোগ দাও, ফ্রেশ হই। ঘামের গন্ধে আমি নিজেই থাকতে পারছি না। 

বিভা নিষ্পলকে চেয়ে বলে, তোমার ঘামগন্ধ আমার মুখস্ত। আমি তোমার ঘামগন্ধে কোনো দুর্গন্ধ পাই না। আমাদের জন্য তোমার ঘাম ঝরে, তোমার ঘামের দাম আমার কাছে অনেক। অমূল্য স্বর্ণ দিয়ে আমি কী করবো? আমার কাছে অমূল্য তুমি।

মৃদুল এবার বিভার চোখ বরাবর নিষ্পলকে না চেয়ে থেকে পারলো না। হৃদয়ের ভেতর থেকে একটি কথা বের হয়ে এলো, এত ভালোবাসো কেন?

উত্তরে বিভা বলে, শত ব্যস্ততার মাঝে থেকেও যে মানুষটা আমাকে আগলে রাখে তাকে ভালো না বেসে থাকা যায়! 

মৃদুল বলে, আমি যে মাঝে-মধ্যে তোমার উপর রেগে যাই!

বিভা বলে, অতিরিক্ত রাগি মানুষের ভালোবাসাটাও অতিরিক্ত হয়। যে অল্পে রাগে সে অল্পে হাসেও। যে অল্পে রাগে সে অল্পে ব্যথা-বেদনাও ভুলে যায়। 

মৃদুল অবাক হয়ে বলে, যখন রেগে যাই তখন দুঃখ লাগে না?

বিভা না-বোধক মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকার সময়ে দুঃখকে প্রশ্রয়ই দিই না।

মৃদুল বলে, তবে কেন চোখে জল আসে?

বিভা বলে, হৃদয় দিয়ে ভালোবাসলে চোখ দিয়ে জল ঝরবেই।

মৃদুল বিস্ময় ভরা চোখে বিভাকে দেখে আর বলে, আমি কালো, তোমার কোনো আক্ষেপ নেই?

বিভা দৃঢ়চিত্তে বলে, চেহারা কদিনই থাকে! মনের লাবণ্যই স্থায়ী। যার কাছে আমার মূল্য অনেক সেই তো আমার কাছে অমূল্য। যে আমাকে গুরুত্ব দেয়, আমি তার কাছে সুখ পাবোই। তুমি কালো সবার চোখে, কিন্তু আমার চোখে সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ।

একটু হেসে মৃদুল বিভার বাধা ডিঙালো। তারপর ফ্রেশ হতে স্নানাগারে গেলো। টেবিলে খাদ্য-খাবার তরে তরে সাজালো বিভা। খেতে বসে মৃদুল বললো, ইলিশ মাছ তোমার পছন্দ বলে গতকাল ইলিশ মাছ নিয়ে আসতে বললে। অথচ ইলিশ মাছ রান্না করোনি কেন?

বিভা বললো, ইলিশ মাছে তোমার এলার্জি আছে আমাকে তো বলোনি, মা বলেছেন। তুমি খাবে না সেই খাবার আমি খাবো কী করে!

মৃদুল আশ্চর্য হয়ে বলে, বলো কী! আমার কারণে একটা প্রিয় খাবার ত্যাগ করবে? 

বিভা বলে, প্রিয় মানুষের জন্য অনেক প্রিয় বিষয় ত্যাগ করতে হয়। তোমার পথের পথিক আমি। তোমার শখের ভেতরই আমার শখ নিহিত।

মৃদুল দ্রুত উঠে গেলো খাওয়ার টেবিল থেকে। ফ্রিজ থেকে মাছ নিয়ে নিজেই ভাজতে গেলো। বিভা পেছন পেছন এলো আর বললো, এভাবে আমার পছন্দ যার কাছে গুরুত্বপূর্ণ সে কেন আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হবে না? পুরো পৃথিবী লাগে না, সাথে এমন সঙ্গী থাকলে গণ্ডিও যথেষ্ট। 

মৃদুল মাছ ভাজতে ভাজতে বলে, বাইরে আগে অনেক কিছু খেতাম, এখন কিছু খেতে গেলেই তোমার কথা মনে পড়ে। তোমাকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে। তোমাকে নিয়ে তাই অনেক ভাবনাজাল আঁকি।

বিভা বলে, আমাকে যে ভাবনা জুড়ে এতটা রাখতে পারে, সে কেন আমার ভাবনা জুড়ে থাকবে না? সেই তো আমার সকল সুখের কারণ। তুমিই তো আমার সকল সুখের কারণ। তাই তোমাকে খুশি করার কারণ খুঁজি। নিজেকে খুশি রাখার কারণ খুঁজি না। তোমার খুশিতে আমার মনে খুশির জোয়ার সৃষ্টি হয়। 

এই বলে বিভা মৃদুলকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। মৃদুল বলে, এত আদরকাড়া কেন তুমি? এত আদর জানা কেন তুমি? আমি তো আদর দিতে জানি না!

বিভা বলে, এতটা যে যত্নে রাখে আলাদা করে তাকে আর আদর করা জানতে শিখতে হয় না। আমার প্রতি যার এতটা টান একদিন সে আদর দেওয়ার শিক্ষক হয়ে যাবে। প্রকৃত জীবনসঙ্গী প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে পৃথিবীর সব সুখ খোঁজে।

মাছ ভাজা শেষ হলে ওরা আবার খাওয়ার টেবিলে গিয়ে বসলো। তারপর মৃদুল নিজেও এক টুকরো ইলিশ মাছ নিলো। তা দেখে বিভা বললো, ইলিশ খাবে? দেখো এই খাদ্যই ওষুধ, এই খাদ্যই বিষ।

মৃদুল বলে, পছন্দের মানুষের পছন্দ অপছন্দের হলেও পছন্দের করে নিতে জানতে হয়। শুধু নিজের পছন্দের কথা প্রকাশ করতে থাকলে পছন্দের মানুষের কাছে অপছন্দ হয়ে যেতে হয়।

বিভা বাধা দিয়ে বলে, যা খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে তা না খাওয়ায় শ্রেয়। তুমি তোমার তাই তুমি তোমাকেই আগে ভালোবাসবে। সম্পর্কে মধুরতা আনতে স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে নেওয়া ঠিক না। আমার খুশির কারণ হতে গিয়ে তুমি তো তোমার দুখের কারণ ডাকতে পারো না।

মৃদুল বলে, যার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত তার জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি খুবই সামান্য। আর অসুস্থ হলে শুশ্রূষা দেওয়ার মানুষ তো আছে আমার। তোমার সেবায় হবো আমি বলীয়ান।

বিভা দ্বিমত পোষণ করে বলে, সেবা দেওয়ার মানুষ থাকলেই রোগ ডেকে আনতে হবে? কোনো রোগকেই আমন্ত্রণ জানানো ঠিক না।

মৃদুল খেতে খেতে বলে, মন ভালো থাকলে রোগ হয় না। পৃথিবীর সব মানুষ কল্পনাতেই বেশি সুখী। আমি বাস্তবে সুখী।

বিভা গদগদকণ্ঠে বললো, তোমার মন ভালো রাখার সেই শক্তি কি আমার আছে? আমি শুধু তোমার ভালো চাই, কিন্তু নিজের ভালো তো নিজেকেই রাখতে হয়। সবাইকে ভালো রাখতে গিয়ে মুখে যে হাসি তুমি রাখো তা মূলত মিথ্যা হাসি।

খাওয়া বন্ধ করে মৃদুল বললো, ভালোবাসার প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের জন্য জরুরি। সবার ভালো থাকার উপর নিজের ভালো থাকা নির্ভর করে। হাজার কষ্টে থেকেও কাছের মানুষের সুখে রাখার চেষ্টাটাই আসল ভালোবাসা। একা ভালো থাকা যায় না, একা ভালো থাকার চেষ্টা করলে একাই হয়ে পড়তে হয়। অনেকের অনেক ত্রুটিই চোখে পড়ে, সব দেখেও না দেখার ভান করা হয় শুধু সম্পর্ক রক্ষার জন্য। কারণ সম্পর্কটা জীবনের জন্য জরুরি। অনাদরে সম্পর্ক নষ্ট হয়।

বিভা বললো, আমার ভেতর ত্রুটি পেলে জানাবে, নিজের ভুল নিজে ধরা যায় না। আমার আচরণ তোমার মনের বিরুদ্ধে গেলে জানাবে। আমি ভুল করেই যাবো, তুমি ক্ষমা করেই যাবে এটা ঠিক না। তোমার আমার সম্পর্কে কেন অসুস্থতা থাকবে?

মৃদুল বলে, তোমার নিজস্বতা আছে। আমার প্রভাবে কেন তুমি তোমাকে পরিবর্তন করবে? কোনো একটি বিষয়ে তোমার ধারণা আমার সাথে নাও মিলতে পারে, আমার অযাচিত চাওয়া থাকবেই বা কেন? আর আমার অযাচিত চাওয়ার কাছে কেন নিজেকে ভাঙবে? 

বিভা জানায়, আমার জীবনে তুমি বিশ্বস্ত মানুষ। তুমি আমার খারাপ কখনোই চাইবে না। তাই তোমার উপর আমার এত বেশি নির্ভরতা। জানি আমি তোমার প্রয়োজন ও প্রিয়জন।

পরেরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে একটি শাড়ি কিনে এনেছে মৃদুল। অন্যান্য নারীরা শাড়ি দেখলে যেমন পুলকিত হয় বিভা তেমনটি পুলকিত হলো না। বললো, বলেছি তো আমাকে শাড়ি দিলে তুমি শার্ট নেবে। তুমি শার্ট না নিলে আমি শাড়ি নেবো না। আমি সাজবো তুমি দেখবে আমি তা বুঝি না।

শুনে মৃদুল বলে, তোমাদের জন্যই আমি পরিশ্রম করি। তোমায় ভালো রাখা, ভালো থাকতে সহয়তা করা আমার দায়িত্ব। তোমার চোখের কাজল কেনার দায়িত্বও আমার, তোমার চোখে জল যেন না আসে সে দায়িত্বও আমার।

বিভা না-সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, তোমার ঘাড়ে ভারবোঝা হয়ে থাকা কি আমার দায়িত্ব? দুটি মানুষ পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটলে অনেক পথ যেতে পারে। আমায় কাঁধে নিয়ে বেশি দূর যেতে পারবে? আমি তো তোমার কাঁধের বোঝা নই, আমি তোমার সহযাত্রিনী। আমাকে মূল্যবান উপহার দিতে হবে না, কেবল সময়টুকু দিও। তোমার দেওয়া প্রত্যেকটি ক্ষণ আমার জন্য মহামূল্যবান।

অন্যমনস্ক হয়ে মৃদুল বললো, শাড়িটা তবে ফেরত দিয়ে আসবো? খুব পছন্দ হয়েছিলো বলেই এনেছিলাম। তুমি কত খুশি হবে ভাবতে ভাবতে এসেছি, হলে অখুশি। 

শাড়িটা বিভা বুকে চেপে নিলো আর বললো, না ফেরত দিতে হবে না। তবে নতুন শার্ট না কিনলে এ শাড়ি আমি পরবো না। ক্রমাগত ত্যাগ করে যাবে তুমি আর আমি ক্রমাগত সুবিধা নিয়ে যাবো ভালোবাসার দলিলে তা লেখা নেই।

এমন সময় মৃদুলের মা মৃদুলকে ডেকে নিলেন। পারিবারিক ব্যাপারে কথা চললে বিভা সেখানে যুক্ত হয়ে নিজের মত পেশ করে না। আজ বিভাকে জোর করে ডেকে নিলো মৃদুল। কিন্তু বিভা চুপ থাকলো। কোনো কথা কেউ জিজ্ঞাসা না করলে সে নিশ্চুপই থাকে। নিজের ঘরে ফিরে মৃদুল বললো, পারিবারিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তুমি কথা বলো না। তুমি কি পরিবারের সদস্য না?

উত্তরে বিভা বলে, তোমাদের কত ত্যাগ-তিতিক্ষার ফলে এই সংসার দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ এই বাড়ি এসে আমার কথা বলা আমার কাছে অনধিকার চর্চার মতো মনে হয়।

মৃদুল বলে, লক্ষ্মীর মতো কথা বলো। লক্ষ্মীরাই লক্ষ্মী থাকে। রগচটা, বদমেজাজিরা কখনো লক্ষ্মী হয়ে উঠতে পারে না। শুধু ভাগ্যের কারণেই তোমাকে জীবনে পেয়েছি। 

বিভা মৃদুলের চোখ বরাবর চেয়ে বলে, হৃদয় মাঝে ডুব দিতে জানো, ডুব দিতে জানো বলেই ঝিনুক পাও, ঝিনুক না পেলে কি কেউ মুক্তো পায়? 

মৃদুল বলে, চারিদিকে মুক্তোর ছড়াছড়ি থেকে একটি মুক্তো কি করে বাছাই করবো ভাবতাম। কিন্তু মুক্তো বাছাই করতে হয় না, মুক্তো জীবনে চলে আসে। হৃদয় থেকে যারা চায় তারা মুক্তোই পায়। মন থেকে চাইলে মন মনের মতো মানুষ পাবেই পাবে।

বিভা মৃদৃলের বুকে মুখ লুকায়। বড়ো নির্ভরতার আশ্রয় এই বুকের সন্ধিস্থল। বলে, তোমাকে কত যে ভালো লাগে তুমি জানো না, আমি জানাতেও পারবো না। কেন এত ভালো লাগে জানি না। ভালো লাগার কারণ থাকে না। এখন একা থাকলে ভয় করে, একা বাইরে গেলে ভয় লাগে। একটু সময় কথা না বললেই খারাপ লাগে। অন্যদের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না। কেবলই তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে। কাজের মধ্যেও মনের চোখে শুধু তোমার চোখ ভাসে। যে যাকে ভাবে তার মনশ্চক্ষে সে সব সময় থাকে। তুমি আমার তৃষ্ণা জুড়ে।

মৃদুল বলে, এভাবে মায়া জাগানো কথা আর বলো না। এত মায়া দিলে বাইরে যেতে পারবো না, বাইরে গেলেও থাকতে পারবো না। এত মায়া জাগাতে জানো তুমি ভাবতেই পারি না। যে মানুষটা এভাবে মায়া জাগাতে পারে সে মানুষটা খুব ভালো মনের হয়। 

বিভা ঠোঁটে হেসে বলে, তুমি কত ভালো মানুষ তুমি জানো না। তোমাকে আমি চিনে নিয়েছি, তুমি মিষ্টি হৃদয়ের একজন মানুষ। তোমার সাথে নিজেকে জড়িয়ে কাতর হয়ে থাকি। তুমি এখন আমার প্রয়োজন না, তুমি আমার ভালোবাসা; প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়, ভালোবাসা শেষ হয় না। তুমি আমার নিজের মানুষ। একান্তই নিজের মানুষ। নিজের মানুষ সেই যার কারণে নিশ্চিন্তে শান্তির ঘুম হয়।

মৃদুল বলে, কাচ খুঁজতে খুঁজতে মানুষ হিরা পেলে মানুষ আর কাচ খোঁজে না। তুমি আমার হিরা, অমূল্যের চেয়ে অমূল্য। কাচ না পেয়ে পেয়েছি হিরা, আমার ভাগ্য বড়ো সৌভাগ্যের। কতক্ষণ এভাবে বুকটা দখল করে রাখবে? একটু তো চাও আমার দিকে?

বিভা বলে, তোমার বুকে যে প্রশান্তি পাই কোথায় গেলে পাবো আমি? তোমার বুকের মধ্যখানে থাকলে আমি স্বর্গসুখ পাই।

মৃদুল বলে, আমার ঘরে আসার আগে কখনো কি মনে হয়নি মানুষটা ভালো হবে তো? কখনো কি মনে হয়নি যার ঘরে যাচ্ছি তার মন মানসিকতা কেমন হবে?

বিভা উত্তরে বলে, না তেমন মনে হয়নি। আমি ভেবেছি যে মানুষটা আমাকে গ্রহণ করছে আমাকে জেনে-বুঝেই গ্রহণ করছে। কেউ অসুখী হওয়ার জন্য সংসার গড়তে যায় না। মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো, আমার মানুষটা আমাকে অনেক ভালোবাসবে। তাছাড়া স্বামী কখনো স্ত্রীকে ঠকায়? কখনো কেউ কাউকে ঠকিয়ে নিজে জিততে পারে না। তুমি আমার হাত ধরেছো শুধুমাত্র তো মুহূর্তটুকু উপভোগ করার জন্য না। কোনো পুরুষই তার সঙ্গিনীকে কষ্টে রাখে না, এটাই সত্য। 

মৃদুল বিভার কথা শোনে আর আশ্চর্য হয়। মনের অনুভূতিগুলো কত সুন্দর করে প্রকাশ করতে জানে সে। অথচ সে নিজে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না বলে গুমড়ে মরে। বিভাকে বললো, এত ভালোবাসো কেন? মানুষকে অতিরিক্ত ভালোবাসতে নেই। অতিরিক্ত যত্ন করতে নেই। বেশি বেশি গুরুত্ব দিতে নেই। ভালোবাসা বেশি প্রকাশও করতে নেই। মানুষ অতিরিক্ত পেয়ে গেলে বদলে যায়। মানুষ বদলে গেলে মানুষ ভুলে যেতে চায়। বদলে গেলে দীর্ঘদিনের সম্পর্কও ঠুনকো হয়ে যায়। মানুষ অতিরিক্ত পেয়ে গেলে গুরুত্ব দিতে ভুলে যায়। বেশি ভালোবাসা পেলে ভালোবাসার মর্যাদা রাখে না। 

শুনে বিভা বলে, যে সত্যিকারে ভালোবাসে সে বদলে যায় না। যে সত্যিকার ভালোবাসে সে গুরুত্ব দিতে কার্পণ্য করে না। সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ কখনো ছেড়ে যায় না। ভুলে থাকে না। ভুল বোঝে না।হাজারও কষ্টের মাঝে আগলে রাখে। জীবনে যাকে পেয়েছি আমি জানি আমিই তার কাছে পুরো পৃথিবী। হাজারও ব্যস্ততার মাঝে আমি তাই তোমাকেই স্মরণে রাখি, রাখি মনের কোঠরে। 

মৃদুল বলে, কত ভালো তুমি। এমন একজন জীবনসঙ্গীই আমি মনে-প্রাণে চেয়েছিলাম যে আমাকে পাওয়ার পর আমার ভেতরেই পৃথিবীর সব সুখ খুঁজে পাবে। সৌন্দর্যের মাঝে ভালোবাসা না খুঁজে তুমি ভালোবাসার মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজেছো, আর তাই আমার মতো একজন কালো ছেলেকেও কত অনায়াসে গ্রহণ করেছো। কালে বলে সারাটাক্ষণ ভাবতাম হয়তো আমার একজন ভালোবাসার মানুষ জুটবে না। রূপের সৌন্দর্যের অহংকারের কাছে গুণের সৌন্দর্যের পতন। 

বিভা বলে, মনের মানুষটা মনের মতো হতে হয়। সৌন্দর্য দেখে ভালোবাসা ভুল সিদ্ধান্ত। ভালোবাসার মধ্যেই সৌন্দর্য খুঁজলে জীবনটা রঙিন হয়। পরস্পর পরস্পরের বিশ্বাসে থাকলে আর কিছু লাগে না। প্রত্যেকই জীবনে একজন বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি চায়। ব্যক্তিত্ব আর ব্যক্তি মানুষটা ভালো হলে আর কিছু লাগে না। আর আমি কখনো আমার রূপ নিয়ে ভাবিনি। পুরুষ মানুষকে রূপ দিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য আটকানো যায়। এজন্য গুণ দিয়ে আটকাতে হয়, মায়া দিয়ে জড়াতে হয়।

দুইদিন পরে বিভার বাবা বিভাকে নিয়ে বাড়ি গেলেন। বাসায় পৌঁছেই মৃদুলকে ফোন করে কান্না করলো বিভা। মৃদুল বললো, এক পাক্ষিক সময়কালের সংসার জীবন আমাদের মাত্র অতিক্রান্ত হলো। এত মায়া আমার জন্য? এত কান্না আমার জন্য।

বিভা বললো, তোমার জন্য মনের মধ্যে খুব মায়া জন্মেছেগো। এক পাক্ষিক অনেক সময়, একদিন হলেও বন্ধন যদি বন্ধনের মতোই হয় তবুও মায়া জন্মে। এ মায়া ঈশ্বর প্রদত্ত।

মুদুল বলে, হয়তো আমার চাওয়াটা পবিত্র ছিলো, তাই তোমাকে পাওয়া। চাওয়াটা পবিত্র হলে পাওয়াটা অনিবার্য। জীবনে সব কিছু ভুলে থাকা গেলেও তোমার মায়া ভরা মুখের কথা ভুলে থাকা যাবে না। থেকো তুমি আমার সাথে ছায়ার মতো লেগে লেগে।

একটু পরেই পাশের বাসা থেকে জেঠিমা এলেন। এসেই বিভার সামনে বিভার মাকে বললেন, জগতে কি আর ছেলে ছিলো না? ওমন একজন কালো ছেলের সাথে তোমার এমন লক্ষ্মীর মতো সুন্দর মেয়েটাকে কেন বিয়ে দিলে? জুড়ে দিলেই জোড়া লাগে?

জেঠিমাকে সমর্থন করে পাশের বাড়ির শ্যামলের বৌ বললো, পয়সার লোভ করেছে বিভার বাবা-মা। ছেলে চাকরি করে, আর কোনো কিছু না ভেবে তার হাতে মেয়েকে তুলে দিয়েছে। পয়সা তো মেথররেও আছে।

বিভার মা বললেন, নায়কোচিত চেহারার কত ছেলে আছে রিক্সা চালাচ্ছে। মেয়েকে সুন্দর চেহারার রিক্সা চালকের কাছে বিয়ে দেবো? ছেলেটির কর্মগুণ আছে বলেই তার কাছে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। শ্যামলের বৌ বাড়ি যাও, রাত-দিন শ্যামলের সাথে ঝঞ্জাট করো, তুমি এসেছো জ্ঞান দিতে। জগৎ চলে মেধায়, রূপে না। মানুষ কর্মের কারণে মহামানুষও হয়, অমানুষও হয়। সফল মানুষরাই সত্য আর সুন্দর। তোমরা চেহারা দেখো বলে ঠকো, চরিত্র দেখলে জিততে। চেহারা দেখো, আচরণ দেখো না।

শ্যামলের বৌ চলে গেলেও জেঠিমা গেলেন না। বললেন, বুঝলাম ছেলেটির রোজগার ভালো। কিন্তু ওদের কি মানাচ্ছে? কালো, কিন্তু কত কালো! ফরসা আর কালোই কি কখনো মানিক-জোড় হয়? মানিক-জোড় শব্দযুগল কিন্তু অকারণে আসেনি! জুড়ি বা জুটি মানানোর ব্যাপারও আছে। তাছাড়া পরবর্তী প্রজন্মও যদি ওমন কালো হয় কেমন হবে? আগাম না ভেবে কেউ সিদ্ধান্ত নেয়?

বিভার মা জবাবে বললেন, মৃদুল শিক্ষিত, তার সন্তান শিক্ষিত হবেই। আপনার কোন সন্তানটা শিক্ষিত হয়েছে? কালো সন্তানও ভালো, মূর্খ আর বখাটে সন্তানের চেয়ে।

জবাব শুনে মনোক্ষুণ্ণ হয়ে জেঠিমা চলে গেলেন। বিভার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। মন এমনই, চারিপাশ দ্বারা প্রভাবিত হয়, আর ভারাক্রান্ত হয়। যার কাছে যাকে ভালো লাগে তার কাছে সেই সুন্দর, নিজেকে শান্ত করে ঘরে গেলো সে।

বিভা এসেছে জেনে বিভার তিনটি বান্ধবী চলে এলো। রজনী উৎসাহের সাথে বললো, এই দেখ্ তোদের বিয়ের ছবি। তোর বরকে চেনায় যাচ্ছে না, রাতের আঁধারের সাথে যেন মিশে গিয়েছে। আর তোর ছবি দেখ্, মনে হচ্ছে আঁধারের মাঝে পূর্ণিমার আলোর বিচ্ছুরণ। এই মানুষটার সাথে থাকলে তোর আত্মসম্মান থাকবে? আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কারো সাথে থাকার চেয়ে একা থাকাও সম্মানের।

রজনীর কথার সাথে কথা মিলিয়ে দিনা বললো, ঈশ্বর তার সাথে তারই মিলিয়ে দেন যার সাথে যার মিলবে, কথাটি তোর ক্ষেত্রে মিললো না। দাদাবাবুর সাথে থাকতে থাকতে হয়তো ভালো লেগে যাবে, কারণ প্রতিটি হৃদয়েই ভালোবাসা প্রগাঢ় থাকে। কিন্তু তিনি এই যে এত কালো ব্যাপারটা মানা যায় না। ভালোতে ভালোত্ব নাও থাকতে পারে, কিন্তু কালোতে কালোত্ব কমই থাকে। তবুও তোদের জুটিটা মানানসই হলো না।

স্মারণি বললো, তুই সুন্দর ও লম্বা। তোকে অপছন্দ 

করবে এমন পাগল সমাজে নেই। কোথা থেকে এক কৃষ্ণকালো এলো চিল হয়ে, আর তোকে ছোঁ মেরে নিয়ে নিলো, মানা যায় না। তোর কপালটা খারাপ। আসলে সুন্দরীদের কপাল সুপ্রসন্ন হয় না। সৌদামিনীর বিয়েও হলো এক কালো ছেলের সাথে। কালো ছেলেগুলোর সুন্দরী মেয়েদের প্রতি এত লোভ কেন?

বান্ধবীরা চলে গেলে বিভা মন খারাপ করে বসে থাকলো। মৃদুল ফোন দিলে বিভা রাগতস্বরে বললো, মন ভালো নেই পরে কথা বলবো।

মৃদুল বললো, আমার সাথে কথা বলে যদি মন ভালো না হয় আর কারো সাথে কথা বলে কভু তোমার মন ভালো হবে না।

বিভা কর্কশকণ্ঠে উত্তর দিলো, তুমি কি মন ভালো করার মেশিন? তুমি আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আমাকে বিভ্রান্ত করবে না।

হঠাৎ এমন কথা শুনে মৃদুল হতবাক হয়। সর্পিণীদের খোলস আছে, তাই বদলায়। বিভাকে তাই মনে হচ্ছে। তাই সে বলে, তোমার কথার ভেতর আমার জন্য কেমন যেন বিতৃষ্ণা। একদিন চোখের আড়ালে না যেতেই ভুলে গেলে সব ভালোবাসা? একদিন না যেতেই বদলে ফেললে নিজেকে? পাল্টে ফেললে বোল? হালকা হাওয়াতেও বদলে ফেলো নিজেকে? ভুলে যাও সব কথা দেওয়া?

বিভা বললো, তুমি তো একজন যোগ্য মানুষ। আমাকে নিজের সাথে জড়াতে কেন এসেছিলে? চেহারা কি যোগ্যতার মাপকাঠি? তুমি নিজেকে কেন একজন যোগ্য নারী থেকে বঞ্চিত করেছো? রূপ ছাড়া তো আমার মাঝে কিছু নেই, অথচ মানুষ তোমাকে ছোটো করছেন। আমার ভাগ্যকে মানুষ দুর্ভাগ্য বলছেন। তুমি নাকি আমার উপযুক্ত নও।

শেষের কথাগুলো শুনে মৃদুল চমকে গেলো। একটু আগেও চেনা মানুষটার আচরণ অচেনা লাগছিলো, কিন্তু এখন চেনা মানুষটার আচরণ চেনার চেয়ে আরও চেনা লাগছে। সে বললো, আমি কখনোই কারো কাছে স্পেশাল ছিলাম না। একমাত্র তুমিই তোমার জীবনে আমাকে স্পেশাল করে নিয়েছো। তোমার কাছে আমি বিশেষ কিছু না হলে তুমি আমার কাছে থাকতে না। তুমি কষ্ট দিলে সহ্য করতে পারবো না।

বিভা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, ওরা সব রূপ দেখে; তোমার গুণ দেখে না, মন বোঝে না। ওরা তোমার বাইরটা দেখে, তোমার ভেতরটা জানে না। আবরণে সুন্দর মানুষ দিয়ে আমি কি করবো যদি মানুষটার ভেতরটা সুন্দর না হয়? নায়কোচিত চেহারা দিয়ে আমি কি করবো, যদি সে নায়কই না হয়! তুমি তো আমার জীবনের নায়ক।

মৃদুল বললো, এজন্য তোমাকে চোখের আড়াল করতে চাই না। নানা মানুষ কুমন্ত্রণা দেন কানে। কবে না জানি এই কুমন্ত্রণায় তুমি ভুলে যাও। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা আসেন যত্ন করে মন ভেঙে দিতে। অন্যের সুখ যখন সহ্যের বাইরে চলে যায় তখনই এমন করেন তাঁরা। একজনের সুখ অন্যজনের অসুখ, সহ্যাতীত। অন্যের সুখ দেখলেই আসল অসুখ জাগে।

এভাবে একটি দিন আসে সে দিনটাও চলে যায়। প্রতিবেশিনীরা আসেন আর মন ভাঙা কথা বলেন। মন্দ কথা বলতে কেউ কৃপণতা করেন না। ভালো নেই যারা তাঁরাই এমন মন্দ কথা বলতে জানেন। ভালো থাকবেন না তারা যারা এমন অন্যের সম্পর্কে বিষ ঢালেন। 

তিন দিনের মাথায় মৃদুল বিভাকে নিতে এলো। প্রতিশিনীরা জাদুঘরের আশ্চর্য জীব দেখার মতো উৎসুকের সাথে বিভাদের বাড়ি ঝাঁকে ঝাঁকে আসছেন মৃদুলকে দেখতে। যেমন করে নতুন বৌকে দেখতে আসেন গ্রাম্য গৃহিণীরা। মৃদুলকে দেখেন আর মিটিমিটি হাসেন আর হাত দিয়ে মুখ ঢেকে একে অন্যের কানে কানে কী কী বলেন! বোঝায় যায় কালো ব্যাপারটি নিয়ে সবাই গুঞ্জণরত।

কেশবের মা যুগলের মায়ের উপর রেগে গিয়ে বললেন, পৃথিবীতে কালো রং আছে বলেই সাদা রং এত শোভা পায়। কালো তাতে কী! মনে কালি না থাকলেই হলো। পুরুষের রূপ কি সম্পদ! পুরুষের গুণ হচ্ছে সম্পদ। শরীরের রং দিয়ে কখনো সৌন্দর্য বর্ণনা করা ঠিক না। চেহারা যেমনই হোক মন যেন সুন্দর হয়।

যুগলের মা বললেন, কালো বলেই তো দেরি করেনি, দেখতে এসেই বিয়ে করেছে। কোনো প্রকার মত পরিবর্তনের সুযোগ দেয়নি। বিভার বরের বুদ্ধি আছে। যাহোক, যেটা হয়ে গিয়েছে এখন সেটা মানতে হবে৷ বাবা-মায়ের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সন্তানকে মনোদুর্ভোগ নিয়ে বাঁচতে হবে।

মানুষের এমন সমালোচনা, কানাঘুষা মৃদুল দেখে। ব্যাপারটা দিনভর এবং প্রতিদিন হচ্ছে। তার খুব খারাপ লাগতে শুরু করলো। যে কালোত্বের কারণে তার প্রতি পরীক্ষার লেখাতে পর্যাপ্ত নম্বর উঠলেও ভাইভায় নম্বর কম উঠেছে, যে কালোত্বের কারণে জব না হতে হতেও একটা জব হয়েছে, যে কালোত্বের কারণে কর্মক্ষেত্রে ফ্রন্টলাইনের কাজে যুক্ত হতে পারে না, যে কালোত্বের কারণে অনেক মেয়েপক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যাত হতে হতে একটা বিয়ে করতে পেরেছে, সেই কালোত্বের কারণেই সে শ্বশুরবাড়ি অপমানের পর অপমান হচ্ছে। সে আর সহ্য করতে পারলো না। কাউকে কিছু না বলে সন্ধ্যাবেলাতেই শ্বশুরালয় থেকে বের হয়ে পড়লো।

মৃদুলকে না দেখতে পেয়ে বিভা ফোন করলো। ফোন বন্ধ। বাড়ির সবাই জেনে গেলেন মৃদুল কোথাও চলে গিয়েছে। বিভার মা রেগে গেলেন, বিভাকে বললেন, মানুষ দেখতে সুন্দর হলেই সুন্দর আর ভালো হয় না, মানুষের বড়ো পরিচয় তার কর্মে, আচরণে। কারো কথা শুনে মৃদুলকে যদি আঘাত করে থাকিস ভুল করেছিস। পৃথিবীতে আমাদের পর যদি কেউ তোর ভালো চায়, তবে সে মৃদুল। তোর কষ্টে আমাদের পর যদি কেউ কষ্ট পায়, তবে সে মৃদুল। আমাদের পর যদি কেউ তোকে নিরাপত্তা দেয়, তবে সে মৃদুল। মৃদুল ভালো ছেলে। সংসার করতে একজন ভালো মানুষের খুব প্রয়োজন।

বড়দি এসে বললো, মৃদুলের চেহারা নিয়ে কখনো আক্ষেপ করবি না। যার মন যত সুন্দর সে তত বেশি সুন্দর। মৃদুলকে আমরা চিনেছি। সুন্দর মনের মানুষ চিনতে আঁতশ কাচ লাগে না।

বড়দা বললো, ফরসা চেহারার চেয়ে সুন্দর মন অনেক দামি। মনের সৌন্দর্য সুপ্ত থাকে না, স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পায়। মৃদুল নম্র আর ভদ্র। তার কথাবার্তা পরিচ্ছন্ন। যার যত সুন্দর ভাবনা সে তত সুন্দর মানুষ, চেহারা তো আবরণ মাত্র। মানুষের সৌন্দর্য চেহারায় থাকে না, থাকে মনে। চেহারার ফোয়ারার চেয়ে ব্যক্তিত্বের মায়া দামি।

বড়দি আবার বললো, মানুষের বড়ো সৌন্দর্য হলো তার চরিত্র। চেহারার অহংকারে মাটিতে পা না পড়লে এক সময় পায়ের নিচে মাটি থাকে না। চেহারা নষ্ট হয়ে যায়, ব্যাক্তিত্ব থেকে যায়; মৃদুল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। ব্যক্তিত্ব দেখে ভালোবাসতে হয়।

যাকে তাকে ভালোবাসার কথা বলা যায় না। বিভা মাকে, দাদা-বৌদিকে বোঝাতেই পারলো না মৃদুলকে সে কত ভালোবাসে। মৃদুলের হৃদয়টা কত বেশি পরিষ্কার আর সুন্দর সে ছাড়া তো আর কেউ বেশি জানে না। কাউকে ভালোবাসলে রূপ দেখে ভালোবাসতে হয় না, মন বুঝে ভালোবাসতে হয়, সে জানে। যারা সৌন্দর্য দেখে ভালোবাসে তারা মূলত সৌন্দর্যের পাগল হয়, মানুষটার মনকে বোঝে না। রূপ, টাকা আর ক্ষমতার বাহারকে গুরুত্ব না দিয়ে ভালো মনের জীবনসঙ্গীকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। চেহারা যেমনই হোক, ভালোবাসাটায় আসল। মানুষ মন মানসিকতায় উন্নত আর আচরণে সুন্দর এমন খোঁজে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মনে মনে চেহারায় সুন্দরকেই লালন করে। মনের বা গুণের সৌন্দর্যের খোঁজ কেউ রাখতে চায় না। বেশিরভাগ মানুষ বোকা তাই বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই খোঁজে। কিন্তু বিভা তেমন নয়, সে জানে সৌন্দর্য মুখের আবরণে না, মনে। সুন্দর ব্যবহারই আভরণ। আর তাই পারিপার্শ্বিকতার কারণে যে দিনের আলোতেই বাইরে যেত না, সে সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতেই বের হয়ে পড়লো মৃদুলের উদ্দেশ্যে। বিভার অন্তরের টান দেখে বোঝা যায়, পুরুষ মানুষের সৌন্দর্যে নারী আটকে যায় না, আটকে যায় পুরুষের দায়িত্বে। 

বাড়ি এসে দেখে শুকনো মুখে বসে আছে মৃদুল। বিভাকে দেখতেই দৌঁড়ে এসে বুকে চেপে ধরে বললো, এত রাতে বের হয়েছিলে কেন বাসা থেকে?

বিভা বললো, তুমি যেখানে সম্মান পাও না, সেখানে আমি থাকি কী করে? আর সেখানে যাবো না আমি।

মৃদুল প্রতিউত্তরে বলতে থাকে, বিভা, সবাই আমাকে কালো বলে এতে আমার কষ্ট নেই। সত্যকে মেনে নিতে শিখেছি অনেক আগেই। তুমি সুন্দর বলে তোমাকে বিয়ে করেছি, এটা সত্য। আমি চাইনি আমার সন্তানও কালো হোক, আর সারাটা জীবন আমার মতো নির্যাতিত হোক পরিবেশ দ্বারা। তোমাকে হঠাৎ এবং দ্রুত সিদ্ধান্তে সময়ক্ষেপণ না করে বিয়ে করেছি, এটাও সত্য। যাতে নানা মতের প্রভাবে তোমাদের মত পরিবর্তন না হয়। কী করবো বলো? আমার আচরণ সবার কাছে ভালো লাগে, আবার সবাই-ই বলে কালো হলে কী হবে কথাবার্তা ভালো। আমার দ্বারা আমার মহল্লার অনেকেই উপকৃত হয়, সেই তারাই আবার বলে, কালো হলে কী হবে উপকার করার ইচ্ছা আছে। আমার রেজাল্ট ভালো, সেই দিকে কারো নজর নেই, আমি কালো সেই দিকে সবার ভ্রূক্ষেপ। ভালো চাকরি করি, ভালো রোজগার করি তবুও সেদিকে মানুষের নজর নেই, বলে ইনকাম ভালো তাতে কী কালো তো। ভীষণ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বড়ো হয়েছি বলেই তোমাকে বিয়ে করেছি আমি। সন্তান মানুষ না হলেও আক্ষেপ করবো না, তবুও আমার সন্তান যেন পরিষ্কার হয়। অবিবেচক সমাজে যোগ্যতার চেয়ে রূপের মূল্য অনেক। রূপদম্ভের কাছে কর্মগুণের পতন এই সমাজ বাস্তবতায়। আমার খুব খারাপ লাগে যেখানে আমি আমার অধস্তনদের আত্মবিশ্বাস জোগাবো, সেখানে আমার নিজেরই আত্মবিশ্বাস শূন্যের কোঠায়, শুধু কালো বলে। মানুষ সৌন্দর্য দেখে, চরিত্র দেখে না। সুন্দর মানসিকতা কেউ দেখে না, সবাই সৌন্দর্যের পাগল। মানুষের মন সদা ছুটে চলে ফরসাপানে। ব্যক্তিত্বের মাধুর্য দিয়েও যে মানুষকে কাছে টানা যায় অধিকাংশই তা বুঝতে চান না। শুধু চেহারায় ভালো বলে তার হাতে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বাবা-মা, তবুও আমার কাছে বিয়ে দেননি। কালো টাকা রোজগার করে তার হাতে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, তবুও আমার কাছে মেয়ে বিয়ে দেননি। কালো যেন রং না, কালো যেন অভিশাপ। কালো বাজারিকে মানুষ পছন্দ করেন, কিন্তু নির্ভেজাল কালো মানুষকে মানুষ অবজ্ঞা করেন। 

বিভা কোনো কথা না বলে মৃদুলের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতে থাকে। সে মৃদুলকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা পায় না। মৃদুলও এখন কোনো সান্ত্বনায় ভোলে না। প্রকৃতপক্ষে একজন কালো মানুষ জানে পৃথিবীর নিয়ম আর বাস্তবতা কত কঠিন।

...(সমাপ্ত)...

Saturday, October 21, 2023

চোখের আলোয় চেয়ে

ছবি : ইন্টারনেট

চোখের আলোয় চেয়ে 

সৌমেন দেবনাথ 


অণুশ্রীর চোখের তারায় চেয়ে ঐ যে হারিয়েছি, আর নিজেকে ফেরাতে পারিনি। মায়ার বাস নাকি মনের মধ্যে, কিন্তু আমি দেখেছি মায়া যত সব ওর চোখের তারায়। একবার চোখে তাকালে আর চোখ নামানো যায় না। চোখে চোখ পড়লে চোখ ফেরানো যায় না। চোখের তারায় হারিয়ে যাই বলে সে আবার চোখের বাড়তি পরিচর্যা করে। কাজল আঁকে চোখের পাপড়িতে। কাজল কালো চোখে চেয়ে চেয়ে আমার সময় চলে যায় আমি বুঝতেও পারি না। ওমন হরিণ চোখে না তাকিয়ে অন্যদিকে মন দেওয়া কঠিন কাজ। চোখের ভাষায় কত কথা লেগে আছে, লিখলে বড়ো কলেবরের উপন্যাস হয়ে যাবে। দুই ঠোঁট অস্ত্র করে ঐ দুই চোখে প্রেমদাগ না এঁকে দিলে ঠোঁটদ্বয় অস্থির হয়ে থাকে। চোখে আদর এঁকে দিলে চোখ দুটো আরও মায়াবি হয়ে উঠে। আদর পেলে চোখের তারায় ঝিলিক জাগে। দুই চোখের মণি যেন কৃষ্ণ গহ্বর, আমি তার মধ্যে তলিয়ে যাই, হারিয়ে যাই। দুই চোখের চারটি পাপড়িতে কতগুলি পালক আছে আমি বলে দিতে পারি। হঠাৎ একটি পালক খসে পড়লে বুঝতে পারি স্পষ্টভাবে, এমনি আমি তার চোখের একনিষ্ঠ পাঠক। 

চোখ যে আত্মার আয়না আগে পড়লেও বুঝতাম না। শুধু চোখে চেয়েই ভেতরটা পড়ে ফেলা যায়। ওর চোখের অভিব্যক্তি আমার কাছে সহজপাঠের মতো একদম সহজ আর সরল। আমাকে ঘিরে তার আকুলতা ঠোঁটের চেয়ে চোখেই বেশি প্রকাশমান। তার হৃদয়ে প্রবেশের প্রবেশদ্বার তার ঐ দুটি চোখই। যে চোখের তারায় চেয়ে হৃদয়ের অলিগলিতে সাঁতার কাটা যায় অনায়াসে। মুখের ভাষার চেয়ে চোখের ভাষার শক্তি কত যে প্রবল শুধু অণুশ্রীর চোখে চেয়ে বুঝেছি। অভ্যন্তরীণ সত্তাকে বুঝতে চোখের ভাষার গবেষক হতে জানতে হয়। চোখের ভাষার বিশ্লষকরা খুব সুখী হয়। বলতে না পারা কথাগুলো যেহেতু চোখের মণিতে লুকায়িত থাকে, তাই চোখের ভাষা বুঝতে জানলে হৃদয় সত্তার সারথি হয়ে উঠা যায়।

আবেগের ঘনঘটা চোখেই থাকে। তাকানোর ধরনে নিজের গুরুত্ব তার কাছে কত ঘনায়মান বোঝা যায়। অপলকে চায় বলে বুঝতে পারি আমাকেই চায় সে। নয়নতুষ্টি নয়নেই থাকে। আমায় পেয়ে না খুশি হলে অত খুশির বিচ্ছুরণ চোখে চোখে থাকতো না। হৃদয় লোপাটের অস্ত্রই হলো চোখ, চোখের মায়া, চোখের তারার মায়া। যেদিন নির্লিপ্ত নয়নে থাকে ও, বুঝে নিই অকারণেই কোনো কথায় তাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। নিজের ভেতর তখন নিজেই প্রশ্ন করতে থাকি, কোন বেফাঁস কথায় হলো সে আঘাতপ্রাপ্ত। বলে না, কিন্তু বুঝে নিই কেবল তার চোখের অভিব্যক্তির কারণে। খুব সহজে তাই তার মনোকষ্টের পুরুষ থেকে মনোতুষ্টির পুরুষ হয়ে যাই।

সূর্যের তাপে বরফ গলে যায়, তার নয়নে নয়ন রেখে নিজে গলে যাই। তার উপর কোনো রাগ উঠলে ধরে রাখতে পারি না। আমি রাগ করলেই সে শুধু বলবে, চোখ বরাবর চেয়ে কথা বলো। 

ঐ চোখে তাকালে রাগ কর্পূর হয়ে বাতাসে মিশে যায়। এত মায়া যে চোখে সে চোখকে অগ্রাহ্য করা যায় না। রাগ পুষে রাখা যায় না। যে চোখে আমার খুশির তারা সে চোখকে অগ্রাহ্য করাও যায় না। যে চোখে নিহিত আমার ভাগ্যের তারা সে চোখে চেয়ে থেকেই মরে যাবো। 

কৌণিক চোখে তাকালে ইতস্তত হই। কৌণিক চাওয়ার কারণ খুঁজে পাই না যখন তখন চোখ বন্ধ করি। চেয়ে দেখার চেয়ে চোখ বন্ধ করে অনেক কিছু দেখা যায়। যখন চেয়ে দেখে বুঝি না তখন চোখ বন্ধ করে বুঝে নিই। চোখ দিয়ে সবাই তো দেখে, খালি চোখে দেখা আর মনের চোখে দেখা এক না কখনো। উপলব্ধিযোগ্য চোখ খুব দামি। সে চোখের দেখাতে ভুল থাকে না। কৌণিক চোখে দেখার কারণ বুঝে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করি। আবার হাসি জাগে চোখের তারায়, আবার ফুল ফোটে চৌধারায়। এই এক চোখ, আর তাতে কত কত নিগূঢ় কথা।

শুদ্ধ চোখে দেখি তাকে তাই লাগে ঐশ্বরিক। দোষ চোখে দেখি না তাকে, দোসর যে। নিন্দার চোখে দেখলে সব খারাপ লাগে। নিন্দুরাই নিন্দা খোঁজে নান্দনিকের মাঝেও। পরিশুদ্ধ যে আমার কাছে তাকে পরিশুদ্ধ চোখেই দেখি। দেখতে দেখতে একঘেয়ে লাগলে বুঝতে হবে দেখার চোখ আছে, দেখার দৃষ্টি নেই। হৃদয়ের যে অংশীজন তাকে দেখতে হয় হৃদয়ের চোখেই৷ চোখ থাকলেই হয় না, দেখতেও জানতে হয়। সব মানুষের চোখ আছে, সবার দেখার সুদৃষ্টি নেই। সুনজরে না দেখলে সুজনও দুর্জন হয়ে যায়। শুধু সুন্দর করে দেখার অনাভ্যাসে সম্পর্কে দূরত্ব বেড়ে যায়। কত কথা মুখে বলি, কিন্তু বুঝে নিতে চোখই লাগে। শুধু দেখতে জানার বিরল গুণে আপন হয়ে যায় আরও আপন। আপাতত চোখ দিয়ে দেখার গুরুত্ব কমিয়ে আত্মার চোখে দেখতে থাকলে সব হয়ে যায় সুন্দর। যে অণুশ্রীকে আমি দেখি সে অণুশ্রীকে পাওয়ার পরও পেতে হয়েছে। পেলেই পাওয়া না, পাওয়াটা তখনই স্বার্থক যখন হৃদয়টা মেলে। তাকে পাওয়ার পরও পেতে আমার বেগ পেতে হয়েছে। আপাতত দৃষ্টি কমিয়ে যখন অন্তর্দৃষ্টি বাড়ানোর চেষ্টা করেছি তখনই দেখাটা হয়েছে আরও নান্দনিক, আরও অনিন্দ্যশোভন, দৃষ্টিশোভন।

একবার তাকে তীর্যক চোখে বলেছিলাম দুটো কটুকথা।  সে রক্তিম চোখে আমাকে দেখেছিলো একবার। আর তাতেই জ্বলে গিয়েছিলাম আমি। তার ঠোঁটের কথার চেয়ে চোখের কথা কত বেশি শক্তিসম্পন্ন সেদিনই বুঝেছিলাম। সে আমাকে জয় করেনি মিষ্টি কথার ফোয়ারায়, সে আমাকে পরাজিত করেছে সূক্ষ্ম চোখের চাহনি দিয়ে। দৃষ্টিশক্তির মায়াবি মমতায় তলিয়ে না যেয়ে উপায় নেই। এখন এত বেশি কাতর হয়ে আছি তার মায়ায়, পারি না আর শক্ত কথা বলতে। তীক্ষ্ণ চোখ দেখে হৃদয়ের প্রকোষ্টের সব, দুর্বল চোখ দেখে শুধু আপাতত বহির্বর্ণের জ্বাজ্বল্য। হৃদয় হরণা হতে তাই তীক্ষ্ণধী চোখের অধিকারি হতে হয়। চোখ থাকলে দেখা যায়, দৃষ্টি না থাকলে দর্শন হয় না। প্রখর দৃষ্টিসম্পন্নের দৃষ্টিসীমা দূর আকাশসমান। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত। 

একদিন মায়ের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলছিলাম বলে আড়চোখে চেয়ে ইশারায় আমাকে নিবৃত্ত করেছিলো সে। কথার চেয়ে বলে কথা বেশি চোখ। যে চোখের ইশারা এভাবে নিবৃত্ত করতে জানে সে চোখের মায়ায় জড়িয়ে ঠকার সম্ভাবনা নেই। যে চোখ আমায় নির্বাক হয়ে দেখে সে চোখ আমায় ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। যে চোখ আমার অনুপস্থিতিতে পথপানে চেয়ে রয়, সেই চোখে সব সময় ধরা পড়ে যাওয়া ভালো। যে চোখ আমার উদ্বিগ্নতায় চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না, সেই চোখ গভীরেরও গভীর থেকে খোঁজে আমায়। যে চোখ আমার মূর্খতায় ভিজে যায়, সে চোখের কারণে বারবার শুদ্ধ হতে হয়। যদি রূঢ় আচরণ করে ফেলি, সে বলে, কার চোখে দেখছো আমায়, আমায় দেখো তোমার চোখে!

আমি দেখি তাকে আবার আমার চোখে। আমি তার হয়ে যাই আবার তার মতো করে। আমি কখনো যদি তার কাছে কথা লুকানোর চেষ্টা করি সে বলে, চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলো, মিথ্যা বলতে পারবে না।

তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে গেলে সব অশুদ্ধ শুদ্ধ হয়ে যায়, সব মিথ্যা সত্য হয়ে যায়, সব প্রচ্ছন্ন কথা প্রচ্ছন্ন থাকে না, ব্যক্ত হয়ে যায়।

সংসার জীবনে মনোমালিন্য না হওয়াটা অস্বাভাবিক। এখন আমার কথায় ত্রুটি ধরে সে। সূক্ষ্ম চোখ যার সূক্ষ্ম ভুলও তার চোখে পড়বে। জ্ঞানী মানুষ মুখ দিয়ে বকে না, ইঙ্গিতে বকে; চোখের ইঙ্গিতে। ওকে আর আমি ওর মতো করে পাই না, বদলে গিয়েছে যেন। অভিমানে গাল ভার করে থাকে। অভিরাগের চিহ্ন চোখে-মুখে স্পষ্ট। বলি, আমি এখন তোমার চোখের ভাষা বুঝি না কেন? 

সে সরে যায় পাশের ঘরে, কথা বলে না। আমি চোখ বাঁকিয়ে উঁকি মেরে দেখি তাকে। যাকে দেখে আমার কৌতূহল মেটে না, সে কেন কথা না বলে আরও কৌতূহল বৃদ্ধি করে? যাকে দেখে আমার তৃপ্তি মেটে না, সে কেন অতৃপ্তি বৃদ্ধির জন্য আরও দূরে যাবে? আমি ওর কাছে গেলাম। ও মুহূর্তেই রেগে বললো, শুধু বসে বসে দেখবে বলেই কি আমায় বিয়ে করেছো? মানুষ তো ভালো বলে না।

কথাটি শুনতেই থমকে গেলাম। রাগে ফুঁসছে সে। আঙুনরঙা চোখে তাকানো দায়। যে চোখে এত মায়া সে চোখে এত আগুন! তাকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বললাম, আমার অজ্ঞানবশত ভুলের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

রেগে সে জবাব দিলো, সামনে থেকে সরে যাও। 

আহা, তার চোখে অসহ্যের হয়ে গিয়েছি, সামনে থেকে সরে যেতে বলছে। যে চোখের দোসর আমি সে চোখের দুর্বৃত্ত হয়ে গিয়েছি যেন। রেগে আছে কেন প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য ওর সামনে থেকে সরতে ইচ্ছা হলো না। বলি, তোমার চোখে জল, তোমার চোখে জলকুচি আমি ভাবনাতেও রাখি নাই। 

নিমীলিত নয়নে সে বলে, আমাকে বসে বসে দেখে সময় অপচয় করলে কি তোমার জীবন চলবে? ঘরে থাকো, পরজনে তো মন্তব্য করে।

কিছুটা বুঝতে পেরেছি তার রাগের কারণ, তাই বললাম, তোমাকে দেখবো তাতে অন্যের জ্বলে কেন? তোমাকে না দেখে কি আমি কাজে মন দিতে পারবো? আঁখি মেলে দেখবো তোমায় জ্বলে তাতে জ্বলুক অন্যের আঁখি। যে আঁখিতে আঁখি রেখে হয়েছি আমি অবাক সে আঁখিতে আঁখি রাখবোই আমি অনন্তকাল। 

বলে সে, না, দেখবে না; দেখার ভেতর না যত প্রাপ্তি না দেখলেও ততোধিক দেখা সম্ভব সদূর দেখার দৃষ্টি আছে যার। চোখ মেলে দেখার চেয়ে চোখ বন্ধ করে আরও বেশি দেখা যায়। কাছে থেকে যতটা দেখা যায়, দূরে থেকেও তারচেয়ে বেশি দেখা যায়। কাজ করবে মন দিয়ে। আমায় দেখতে গিয়ে, আমায় ভাবতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ো। আমি তোমারই, সুতরাং আমাকে দেখা নিয়ে তোমাকে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই।

বলি, এভাবে বলো কেন? তোমায় দেখি যে চোখে তুমি দেখো না কেন আমায় সে চোখে? চোখ থাকতে তুমি অন্ধ!

চোখ পাকিয়ে ও বললো, এই চোখে চেয়ে চেয়ে তুমি হবে অন্ধ।

চোখ রাঙানিতে না রেগে বললাম, চোখে তুমি ঠুলি পরে আমায় না দেখতে চাও ভালো, কিন্তু আমি তোমার চোখে চেয়ে চেয়ে হারাবোই।

সে আরও রেগে বললো, চক্ষু লজ্জা থাকলে আমার কথায় চোখ টাটাতো। কাজ বাদ দিয়ে ঘরে বসে বৌকে দেখো, একজন বেকুব তুমি। এতে যে আমি কত বিরক্ত হই চোখেও পড়ে না। 

বলি, চোখের দেখা দেখতে আমি নই রাজি। দেখবো তোমায় আমি চোখেই, কিন্তু চোখে চোখে রেখে। চোখের দেখা কোনো দেখা নয়, চোখে চেয়েই দেখবো সময় নিয়ে নিয়ে। 

খুব রেগে বললো সে, তোমার চোখে পর্দার অভাব। এত রাগি, রাগো না তবু। চোখ ধাঁধানো জীবন পেতে আমার চোখে চেয়ে থাকলে হবে না, কাজ করো মন দিয়ে। এভাবে চেয়ে চেয়ে জ্বালা ধরিও না।

বলি, শান-শওকত আমার চোখের বালি, তুমি আমার চক্ষু চড়কগাছ। যতই তুমি রক্তচক্ষু দেখাও, হও চক্ষুশূল; বলবো কথা তোমার চোখপানে চেয়েই। খুঁজবো সুখ আমার তোমার চোখের মায়ার জালে। 

রাগ তার তবুও হয় না প্রশমিত, বলে, বড়ো বড়ো বুলি আওড়ায়ে লাভ নেই। চোখে আঙুল দিয়ে তোমার ভুল ধরিয়ে দিচ্ছি, তুমি শুদ্ধ হও। প্রতিটি কাজ করো যত্ন করে। কাজের সময় তুমি তোমাকে সময় দাও, অবসরে আমি তোমায় সময় দেবো। অণুশ্রীর চোখে চেয়ে সব দেখতে পাবে না, পাখির চোখে দেখো; সমাজটা দেখবে, বুঝবে।

বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বললাম, অণুশ্রীর চোখে চেয়ে আমি যা দেখতে পাই দেখার জন্য আমার আর কিছুর প্রয়োজন নেই। সব বিস্ময় তোমার চোখের ভেতর আছে। দেখি আমি দেখি অবাক হয়ে। 

বলে সে, চোখের মাথা খেয়েছো, তাই এভাবে বলো। চোখ কচলাও, চোখে ধুলো পড়েছে। ভালো হও, আরও ভালো। বয়স হলো চোখ ফুটলো না। শিশুদের মতো কথা বলো।

বলি, খারাপ দেখোনি, তাই আমায় খারাপ ভাবছো। খারাপরা খুব খারাপ, আমার মতো না। তারা চোখ উল্টায় মুহূর্তেই। তারা চোখে ধুলো দিয়ে চলে। চোখের মাথা খেয়ে তারা চোখ খোলে না। বোধের চোখে দেখো, দেখো আমার চোখেও সুখের ধরা। 

বিরক্ত হয়ে সে চলে যেতে যেতে বললো, তোমার মূঢ়তা চোখ বুজে সহ্য করছি। তোমার ভাঁড়ামি দেখেও না দেখার ভান করছি। 

এরপর থেকে ওকে বাড়তি সময় নিয়ে দেখতে পারি না। চোখের তারায় তাকিয়ে বেশি কথা বলতে পারি না, চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে, তোমার রোজগারে আমাদের চোখে-মুখে হাসি ফুটবে, তোমার অলসতায় আমাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ নামবে। 

বলি, তোমায় দেখলে আমার চোখে-মুখে হাসি ফুটবে, তোমায় না দেখলে আমার ভেতর দুর্ভিক্ষ নামবে। 

খুব বিরক্তি প্রকাশ করে ও বললো, তুমি আমার কাছে বিরক্তির অন্য নাম হয়ে উঠছো! 

বলি, তোমার বিরক্তি ভরা মুখটাও আমার দেখতে ভালো লাগে। চোখে তোমার যে বিরক্তি বিভা তাও আমার খুশির আভা। চোখে যে তোমার ক্রোধাগ্নি, আমার লাগে হেমাগ্নি। যে চোখের কণিকায় হারিয়েছি আমি তাতেই আমি অবগাহন করবো। চোখে যদি জাগাও অগ্ন্যুৎপাত তাতেও হবো জেনে রেখো অঙ্গার।

খুব বিরক্ত হয়ে সে সরে গেলো। ওর এবারকার সরে যাওয়া তেমন পছন্দ হলো না। পছন্দ করি তো খুব, তাই গুরুত্ব পাই না। চোখে চোখে রাখি তো, দূরে সরে গেলে যে যন্ত্রণা সে বোঝে না। চোখে চোখে রাখলে অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়তে হয়। শরীর ঘেঁষে রাখি তাই আর শরীরের গন্ধ ভালো লাগে না। চোখের মায়ায় বেঁধে রাখি তো তাই আর চোখের মায়ার মূল্য বোঝে না।

এরপর থেকে একটু দূরত্ব রেখে চলি। কথা একটু ভেবে বলি। প্রশংসা করা কমিয়ে দিয়েছি। দখলে যে তাকে অত আর দরদ দিই না। দেখি না আর ওকে আমার চোখে, দেখি দেখে কিনা আমায় তার চোখে। দূরে থেকে দেখি তার চোখে ছায়া নামে কিনা। চোখে যদি ফোটে দুঃখ দুঃখ ভাব বুঝে নেবো ভুল বুঝতে পেরেছে। হৃদয় দুঃখিত হলে চোখে সে দুঃখিত ভাব ফোটে ছাড়া কী! মন যদি ভারী হয় চোখে সে ভারী ভাব ফুটবেই। আমাকে দেখতে দেখতে তার যে বিরক্তি বেড়েছে দেখি দূরত্ব বজায় রেখে কমে কিনা। 

কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। সে কাজে ব্যস্ত থাকে তার মতো করেই। মুখে হাসি, চোখে হাসি, ঠোঁটে হাসি। নিশ্চয় হৃদয় হাসিতে আন্দোলিত। কী ভাবি, ঘটে কী! আমাকে দূরে রেখেও যার মনে হাসি প্রবল সে তো বড্ড শক্ত মনের। শক্ত মনের মানুষের চোখে অত কথা থাকে কখনো? নানা চিন্তায় আমার চোখ বন্ধ হয়, নানা ভাবনায় ভেঙে পড়ি। আমার চোখে আমি তাকে বিচার করি কী, আর সে তার চোখে আমায় দেখে কী! দূরে দূরে থাকে, একটু আড়চোখে দেখলেও তো পারে! নিষ্ঠুর। তীর্যক চোখে দেখুক, আমার তো তাতেও সমস্যা নেই। আমি যে তার কাছে ধরা সে জেনেছে অনেক আগেই, আর তাই দূরে থেকেও সে প্রশান্তি পায়। কিন্তু তাকে রেখে দূরে আমি পাই না শান্তি, আমি তার উপস্থিতিকাতর। তার উপস্থিতিতে আমার নেই কোনো বিরক্তি। নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, কিন্তু সে আমার চোখের ভাষা পড়ে বুঝে নিয়েছে দূরে আমি তাকে সরাতে পারি না। তাই দূরে থেকেও কত উৎফুল্ল সে। নিজেকে কখনো তার চোখ থেকে লুকাতে পারবো না, তাই তাকে মিছে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এলাম। খুব কাছে গেলাম তার, বললাম, অণুশ্রী, তুমি দূরে থাকো কী করে? মন বন্ধ করে দূরে থাকা যায়? চোখ বন্ধ করে দূরে থাকা যায়? 

বলে সে, কল্পনার চোখে না চেয়ে বাস্তবতার চোখে দেখো আমায়। আমায় নিয়ে পড়ে থাকলে তোমার বাস্তবতা কঠিন হয়ে উঠবে। তোমার মেধার কাছে আমি নিছকই অণু না, পরমাণু। অণুশ্রী তোমার, অণু নিয়ে থেকো না। কাজ করো, দিনান্তে একবার দেখো। আমার চোখের গহ্বরে তলিয়ে গেলে জীবন তোমার কৃষ্ণ গহ্বরে যাবে। চোখ খোলা শুধু আমার পানে না, বাস্তবতার পানেও রাখো। জীবন খুব কঠিন, অন্ধ হয়ে পড়ে থাকলে পারবে না। 

খুব বিরক্ত হয়ে চলে গেলাম বাসা থেকে বাজারে। ইদানীং সে বেশি বেশি বলছে আমায়। জ্ঞান দিচ্ছে যথেষ্ট। চোখে যে শব্দভাণ্ডার পেয়েছিলাম মুখে তার ভিন্ন শব্দগুচ্ছ। কোন নয়নের আলোয় ফেলেছিলাম নয়ন, হৃদয় পড়ে বুঝেও বুঝলাম না; এখন হৃদয় পুড়ে যায়। অত বেশি ওর চোখে চেয়েছি বলেই এত বেশি দুর্বল হয়ে গিয়েছি। আর তাই এত বেশি আমায় কষ্ট দিতে কাঁপে না তার হৃদয়। এখন কেন ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারি না। চোখ তো সেই চোখই আছে, সেই চোখের ভাষা এত দুর্বোধ্য হয়ে গেলো কেন? চোখের মতো চোখ কি আমার নেই? দেখার মতো চোখ কি আমার নেই? না, এতকাল যা দেখেছি আমি সব ভুল দেখা ছিলো?

মানুষ বদলে গেলে বদলে ফেলে তার চলার ধরন, মুখের কথা আর চোখের ভাষা।

...(সমাপ্ত)...

Saturday, April 15, 2023

প্রিয় মানুষের পছন্দ

ছবি : ইন্টারনেট

 প্রিয় মানুষের পছন্দ

সৌমেন দেবনাথ 

মানুষ কখনো একা বাঁচতে পারে না। ঘুরতে গেলেও সাথে একজন না থাকলে ঘোরাটা ঠিক ঘোরাঘুরি হয়ে উঠে না। চলতে-ফিরতে অন্তত একজন মানুষের সান্নিধ্য পেলেই সময় কাটানো মধুময় হয়ে উঠে। স্বপ্নে বিচরণ করতে হলেও একজন লাগে, নতুবা স্বপ্নের মধ্যেও বিচরণ নীরস হয়ে যায়। 

জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে জীবনের বড়ো একটা অংশ একাই থাকতে হয়। দ্বৈত হওয়ার বাসনা, যৌথ হওয়ার চেষ্টা, একত্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা একাকিত্ব জীবনের প্রতিটি ক্ষণেই থাকে। কেউ পায় বন্ধু, কেউ পায় মনের বন্ধু, কেউ পায় বন্ধু-বান্ধবমহল। আর অধিকাংশই থেকে যায় একা। যারা নামে নামে বন্ধু পায় তারা বরং একা থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যারা পায় মনের বন্ধু তারা আনন্দ, বিরহ, কলহ, তর্কাতর্কি, অম্ল-মধুর তিক্ততায় বেঁচে থাকে। বন্ধু-বান্ধব ভাগ্য যাদের সুপ্রসন্ন তারা বেশিই উপভোগ করে, হৈ-হল্লা, হৈ-হট্ট, হৈ-হুল্লোড়, আনন্দ-স্ফূর্তিতে জীবন কাটায়। কিন্তু আবার একান্ত ক্ষণে একজন একান্ত বন্ধুর শূন্যতায় কাতর হয়ে উঠে।

একাকিত্ব থাকলে কি আর ক্যাম্পাস লাইফ উপভোগ করা যায়? একলা শূন্যতার মাঝে বিশাল পূর্ণতা হয়ে কাজলের জীবনে কেউ আসেনি। নিজ জেলা শহরে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কারণে ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে দেখে চমকিত হওয়ারও তার কিছু নেই। দেখতে দেখতে হয়ে গিয়েছে সে পাথর। একটি ছেলে একটি মেয়ের হাত ধরে হাঁটলে সে আর আবেগতাড়িত হয় না। নির্জনে বসে কোনো জুটির আলাপ করা দেখলে আগে যেমন সে হিংসায় জ্বলে উঠতো এখন দেখেও না দেখার ভান করে। পৃথিবীর সব সুখ প্রিয় মানুষের সাথে সময় কাটানোর মধ্যে, যা সে পাইনি; কিন্তু যারা পেয়েছে তাদেরকে সে সাধুবাদ দেয়। 

কাজলের মন জুড়ে যে তৃষ্ণা ছিলো তাতে কয়েক ফোঁটা  পানি পড়লো। আরেফিন নামে তার এক বন্ধু জুটে গেলো। কাজল আরেফিনকে বন্ধুত্বের জায়গাটা পুরোপুরি দেয়নি। মূল্যহীন সম্পর্ককে সে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু কিছুদিন যেতেই সে বুঝলো আরেফিন আসলেই ভালো মানুষ। ওদের মধ্যের বন্ধুত্বটা আগের চেয়ে গাঢ় হতে থাকলো। মনের বন্ধু পেতে হলে কথায় আর চেহারায় মুগ্ধ হতে হয়, কিন্তু শুধুই বন্ধু পেতে হলে কথা রাখলে আর কথায় মুগ্ধ হলেই চলে।

কাজল আর আরেফিনের বন্ধুত্বের মধ্যে অমি প্রবেশ করতে চায়। কিন্তু কাজল আর আরেফিনের সমর্থন পায় না। অবিশ্বাসীদের ভীড়ে বিশ্বাসী মানুষের উপরও বিশ্বাস রাখা যায় না। অমি যদি তাদের বন্ধুত্বে ঢুকে তাদের কথা অন্যত্র প্রকাশ করে তবে বন্ধুত্বটায় না ভেস্তে যায়! চাওয়াটা যদি পবিত্র হয় পাওয়াটা নিশ্চিত হয়। বন্ধুত্বটাকে পাওয়ার ইচ্ছা সবারই যদি প্রবল থাকে সত্যই সম্পর্কটা মজবুত হয়ে যায়। কাজল, আরেফিন আর অমির বন্ধুত্বটা এখন দৃশ্যমান। ক্যাম্পাসে তারা একত্রে ঘোরে, একত্রে বসে আড্ডা দেয়। তিনজনে যে বন্ধুত্ববলয় গড়েছে সেই তিনজনই আবার একা। যে বন্ধুদের সঙ্গ তারা পেয়েছে তাতে হৃদয়ের খা খা কমে না। অন্যের ভালোবাসা দেখলেই কাজল বলে, মানুষের ভালোবাসা দেখে গেলাম আজীবন। লোকের ভালোবাসা দেখলে এখন চোখ দুটো টাটায়। আমাকেও যদি কেউ এমন করে ভালোবাসতো, তবে তাকে কখনোই কষ্ট কী জানতে দিতাম না!

অমি বললো, সাব্বির একেক দিন একেকটা মেয়ে নিয়ে ঘোরে; আসল পুরুষ তো এক নারীতেই সন্তুষ্ট থাকে। মেয়েগুলোও নকল আর লম্পট পুরুষই চেনে।

আরেফিন বললো, ভালোবাসাটা সত্যই সুন্দর যদি দৃষ্টি একজনের দিকেই সীমাবদ্ধ থাকে।

কাজল দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, ভালোবাসা ছাড়া জীবন বাঁচে না। জীবনে ভালোবাসার খুব প্রয়োজন। একজন প্রিয় মানুষ পেলে জীবনে আর কিছুই প্রয়োজন হবে না।  সত্যই তারা ভাগ্যবান যারা ভালোবাসার মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছে। 

আরেফিনও দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, মাঝে মাঝে অজান্তে নিজেকে বলে ফেলি দিনশেষে একজন মানুষের খুব প্রয়োজন। হৃদয়ের খোরাক না পেলে হৃদয় বাঁচে না। পাশে একজন মনের মানুষ থাকলে আর কিছুই লাগতো না।

অমিও একটু বললো, জীবনে তো হাজার জনের প্রয়োজন হয় না, শুধু বিশ্বাসযোগ্য একজন হলেই হয়। যত্ন জানা যত্নশীলা একজন ধরা দিলে আগলে রেখে দিতাম। 

কাজল আক্ষেপ করে বললো, হয়তো খুব বেশি করে চাওয়া জিনিসগুলোই অপূর্ণ থেকে যায়। খুব বেশি ভালোবাসতে চাই তো, তাই কেউ ধরা দেয় না। 

হঠাৎই কাজলের সামনে দিয়ে একটি মেয়ে হেঁটে গেলো যাকে মনে হয় সে চেনে। কিন্তু কোথায় দেখেছে বুঝতে পারলো না। মেয়েটির পিছু নিলো সে। অর্থনীতি বিভাগের দিকে গিয়ে হারিয়ে গেলো। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর মনে করতে পারলো, মেয়েটি তারই এলাকার এবং সে যে কলেজে পড়েছে সেই কলেজের ছাত্রী ছিলো সে।

অন্যদিনের অন্য এক সময়ের ঘটনা। অমির ফোন পেয়ে কাজল বন্ধুদের কাছে চলে এলো। আরেফিন চুপ মেরে বসে আছে। কাজল বললো, যত বেশি প্রত্যাশা ততই বেশি হতাশা। চাহিদা যত কম, জীবন তত সুন্দর আর সহজ।

আরেফিন বললো, মনের বেলাভূমিতে কি সূর্যকিরণ পড়বে না?

কাজল বুদ্ধিজীবীর মতো করে বললো, হৃদয়ে ব্যথা ডেকে এনে ঐশ্বর্যের মতো উপভোগ করিস কেনো?

আরেফিন বললো, পথের শাখা-প্রশাখার শেষ নেই, আমার না পাওয়ার শেষ নেই।

কাজল বললো, বর্তমান সময়ে সম্পর্ক হয় ক্যারিয়ার আর রূপ দেখে। সত্যিকারের ভালোবাসার কি মূল্য আছে? 

আরেফিন দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নির্লজ্জতার পরিচয় দিয়ে এগিয়ে গেলে সব মেলে।

তারপর আর কেউ কথা বললো না, তিনজনই চুপ হয়ে বসে থাকলো। বেশক্ষণ নীরবতা পালন করা শেষে আরেফিন কাজলকে বললো, ক্যাম্পাসের কাউকে না হয় জীবনসঙ্গী হিসেবে পেলাম না, কিন্তু ক্যাম্পাসের মায়া কাটাবো কীভাবে? তোর জেলাতেই শুভ কাজ সারবো, আর তুই তাতে আমায় সাহায্য করবি। 

কাজলের উত্তরের আগে অমি বললো, আর আমাকে ক্যাম্পাস আর এই শহরের আলো-বাতাস থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিবি? আমিও তোর শহরে বিয়ে করবো। সময় পেলে আসবো, সুযোগ পেলে আসবো, উপলক্ষ পেলে আসবো, কারণ ছাড়াই আসবো।

কাজল ওদের কথা শুনে হাসে। নিজেই একা, আর দুইজনের দায়িত্ব সে নেবে কাঁধে কীভাবে? 

পরের দিন কাজল ঐ মেয়েটিকে আবারও দেখলো। আজ লাল পোশাকে এসেছে। লালপরী লাগছে দেখতে। ভীষণ ভালো লাগার মতো চেহারা। অন্য কাউকেই তার সাথে তুলনা চলে না। নির্দিষ্ট একজনের মুগ্ধতায় আটকে গেলে আর কাউকেই দেখলে তেমন ভালো লাগবেও না। এত মেয়ে সামনে দিয়ে ঘোরে, কিন্তু ঐ মেয়েটির মতো আর কাউকে ভালো লাগে না। এলাকার হওয়ার কারণেই এত বেশি আপন লাগে। আপন করতে ইচ্ছা জাগে। কিন্তু বাড়িটা ঠিক কোন গ্রামে, বাবা-মায়ের নাম কি, তারই বা নাম কি কিছুই জানার উপায় পাচ্ছে না সে।

রুমে ফিরেও সারাক্ষণ ভাবে কাজল। খুব সুন্দর ও, ওকে না পাওয়াটা জীবনের বড়ো ব্যর্থতা হবে। প্রেমকলার পূর্ণদেবী বোধ হয় তাকে। হৃদয় সীমানা ঘেঁষে আগমন-প্রস্থান, হৃদয় দুয়ার উদোম করে দেখে সে সারাক্ষণ। 

একদিন কাজল ক্যাম্পাস থেকে সন্ধ্যার আলো-আঁধারির মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে রুমে ফিরছিলো। হঠাৎ এক ছেলে তার গলায় ছোরা ধরে মোবাইল, মানিব্যাগ কেড়ে নিলো। দূরেই দুইজন দাঁড়িয়ে ছিলো, যেহেতু তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি, তাই সে বুঝলো ঐ দুইজনও ছিনতাইকারী দলেরই সদস্য। শক্তি প্রয়োগ করলে মোবাইল, মানিব্যাগ সে বাঁচাতে পারতো, কারণ ছোরা ধরেছে যে ছিনতাইকারী তার শরীর লিকলিকে, নেশায় টলছে, ধাক্কা দিলেই পড়ে যাবে। শুধু হাতের ছোরা আর অনতিদূরের দুই সঙ্গীর কারণে কাজল শক্তি দেখালো না।

মোবাইল খোয়া দিয়ে বিষণ্ন মনে রুমে ফিরলো কাজল। একটি কিম্ভূত চেহারার লাল চোখের ছিনতাইকারীর চেহারা কেবলই তার চোখে ভাসছে। মানুষের মতোই অবয়ব, কিন্তু কী বীভৎসই না কাজ করতে পারে!

পরের দিন ক্যাম্পাসে গিয়ে আরেফিন আর অমিকে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ার কাহিনি শোনালো। আরেফিন আর অমিও ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলো সেই কাহিনিও কাজলকে শুনলো। দুই বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার পেলো কাজল, আর নিজের কাছের জমানো টাকা দিয়ে সে মোবাইল কিনলো। 

কাজল অনেক দিন পর ক্যাম্পাস থেকে বাসায় গেলো। চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে গিয়ে শুনলো, পাশের ইউনিয়ন থেকে একটি মেয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঞ্চ পেয়েছে। একথা শুনতেই সে চমকে গেলো। মোটরসাইকেলে চড়ে পাশের ইউনিয়নে চলে গেলো। বাজারের বিশাল বড়ো বিলবোর্ডে কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন। কে কোন বিশ্বিবদ্যালয়ে চাঞ্চ পেয়েছে তার ছবি সম্বলিত তালিকা। তার বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঞ্চ পাওয়া অর্থনীতির মেয়েটির নাম যে রিতিমা তার আর বুঝতে বাকি থাকলো না।

কাজল বাসায় ফিরে এলো। আজ বড়ো বেশিই রিতিমার মুখটা চোখে ভাসছে। একবার বিলবোর্ডে দেখা ছবিটা চোখে ভাসছে, একবার ক্যাম্পাসে দেখা ছবিটা চোখে ভাসছে। মনের দেখা কেউ আটকাতে পারে না। কী দারুণ নাম, চেহারার চেয়েও সুন্দর নাম। মনে মনে ভাবে সে, সব ভাবনাতেই তোমাকে চাই। তোমার মতো প্রিয় মানুষ যদি পাশে থাকে তাহলে কত ভালোই না লাগবে! প্রতিটি মুহূর্তে তোমাকে সেভাবেই ভালোবাসবো যেভাবে তুমি চাইবে।

ক্যাম্পাসে ফিরে এলো কাজল। সব গোপন কথা বন্ধুদের বললেও রিতিমার কথা বন্ধুদের বললো না। অমি ক্যাম্পাসের মেয়েদের দেখে গবেষণাধর্মী একটি কথা বললো, সাদা জামা পরলে মেয়েদের বেশি সুন্দর লাগে।

কাজল ঘোর আপত্তি জানালো, না, লাল জামা পরলেই মেয়েদের বেশি সুন্দর লাগে।

আরেফিন বললো, তবে খয়েরী রঙের জামা পরলেও মেয়েদের সুন্দর লাগে।

আরেফিনের কথার সাথে সহমত পোষণ করলো কাজল। অমি বললো, মেয়েরা যে কাঁধ ব্যাগ বোগলদাবা করে হাঁটে দেখে আমার ভীষণ খারাপ লাগে।

কাজল আপত্তি জানালো এবারও, আর বললো, তোর খারাপ লাগা তোর কাছে। আমাদের ভালোই লাগে, নারে আরেফিন?

আরেফিন বললো, তবে তারা যে মাথার চুল ছেড়ে দিয়ে হাঁটে দেখে আমার খারাপই লাগে। বেণি করে হাঁটলে দেখতে বেশি ভালো লাগে।

কাজল এবার আরেফিনের কথার সাথে সহমত পোষণ করলো না, বললো, খোলা চুলেই মেয়েদের বেশি ভালো লাগে। এলোকেশীর এলোকেশে বাতাস দোলা দিলে কী দারুণই না লাগে!

এভাবেই রিতিমার পছন্দকে, সাজগোজকে আপন পছন্দ ভেবে বন্ধুদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে। পরের দিন রিতিমাকে ক্যাম্পাসে আবার দেখতে পেয়েছে সে। মনে মনে যাকে ভাবে সেই সামনে দেখা দেয়, এটা সত্যই বড়ো ভালো লাগার।

রিতিমা আজ চুলে বেণি করে এসেছে, আর সাদা জামা পরেছে। কাজল বন্ধুদের সাথে একত্র হওয়া মাত্রই অমিকে বললো, বন্ধু, সাদা জামা পরলে আসলেই মেয়েদের সুন্দর লাগে। 

আর আরেফিনকে বললো, বেণি করলে মেয়েদের আসলেই দারুণ লাগে। এক বেণিতে লাগে পরি, দুই বেণিতে লাগে অপ্সরী।

আরেফিন মৃদু হেসে বললো, তোর চিন্তা-চেতনা মুহূর্তে পরিবর্তন হয়। যখন যেটাকে ভালো দেখিস তখনই সেটাকে ভালো ভালো বলে বর্ণনা করিস। অন্যের মতকেও প্রাধান্য দিতে হয়। 

অমি বললো, কিন্তু সুন্দরী মেয়েগুলো তো সুন্দর চেহারার ছেলেদের সাথে মেশে না, ঘোরে না। খেয়াল করে দেখ প্রত্যেকটি সুন্দর চেহারার মেয়ের সাথে হয় ফটকা, হয় বাটপার, হয় উদ্ভট আচরণকারী, হয় গাঞ্জাখোরদের মতো কেউ না কেউ ঘুরছে।

কাজল দ্বিমত পোষণ করে বললো, তা হবে কেন? তুই মেয়েটিকে দেখছিস সুন্দর চোখে, আর ছেলেটিকে দেখছিস হিংসার চোখে। সুন্দর সুন্দরের সাথেই মেশে, সুন্দরটা কি শুধু বহির্মুখে? 

আরেফিন বললো, একজন সুদর্শন মানুষ অপেক্ষা একজন দায়িত্বনিষ্ঠ মানুষ শতগুণে ভালো। ওসব মেয়েদের শেখাতে হবে না, ওরা ওসব বোঝে।

ওদিন যখন সে ডিপার্টমেন্টের দিকে যাবে তখনই রিতিমাকে দেখতে পেলো। কিন্তু রিতিমা আজ একা নয়। তার সাথে সুন্দর চেহারার একটি ছেলেও আছে। গল্প করছে, না প্রেম করছে কাজল বুঝতে পারলো না। কিন্তু এ দৃশ্য দেখে হৃদয়টা তার ভেঙে গেলো। ক্লাস না করে বিষণ্ণ মনে আরেফিন আর অমির কাছে এলো। কিছু একটা জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও অমি জিজ্ঞাসা করলো না। কিছু সময় আছে এ সময় মানুষকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করতে নেই।

পরের দিন কাজল রিতিমাকে অন্য আর একটি ছেলের সাথে দেখতে পেলো। এই ছেলেটিও সুন্দর। সুন্দর বাচনভঙ্গি, হাস্যোজ্জ্বল। দেখে কাজলের হিংসা হলো। কিন্তু নিজের মনকে বুঝ দিলো এই ভেবে হয়তো তার মতোই রিতিমাও বন্ধুহীন আবদ্ধ থেকে বন্ধুবলয়ে প্রবেশ করেছে।

রিতিমাকে কাজল বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাসে দেখেই, কিন্তু তার সাথে সে কথা বলতেই পারেনি সাহসের অভাবে, নম্রতার প্রাবল্যে। পবিত্র আত্মা প্রেমের পথে বড্ড বড়ো অন্তরায়। 

কাজল, আরেফিন আর অমি তিন বন্ধুই কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন তিন বিভাগের। পাস করে বের হয়ে গেলো। তিন বন্ধুই সার্টিফিকেট পেলো, পেলো না হৃদয়ের রানি। ফাইল ভরা সার্টিফিকেট, হৃদয় ভরা শূন্যতা।

হল ছেড়ে দেওয়ার কারণে, চাকরি না পাওয়ার কারণে ক্যাম্পাসেই তারা কেউ যায় না। ক্যাম্পাস সংলগ্ন মেসে উঠেছে একত্রেই। সাপ্তাহিক চাকরির পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে দেখে একত্রে আবেদন করে, একত্রে ঢাকা গিয়ে পরীক্ষা দেয়, একত্রে ফেরে, একজন আরেকজনের কাঁধে ভর দিয়ে ঘুমায়। বয়স বয়ে যায়, বন্ধুত্বের বন্ধন আরও গাঢ় হয়।

কাজল বাসায় গেলেই রিতিমাদের এলাকায় যায়। রিতিমার পরিবারের খোঁজ নিয়ে জানলো এলাকায় বেশ প্রভাবশালী, পাশাপাশি সম্পদশালীও। এসব বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে হলে তার মতো মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলের প্রথম শ্রেণির একটা সরকারি চাকরি না হলে বড্ড বেখাপ্পা লাগবে। 

মানুষ যা চায় তার সবটা না পেলেও কিয়দংশ পায়-ই। সৌভাগ্যবশত সে একটা চাকরি পেলো ব্যাংকে অফিসার পোস্টে। আরেফিনও ব্যাংকে চাকরি পেলো, তবে সিনিয়র পোস্টে। আর অমির ভাগ্য আরও সুপ্রসন্ন, সে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দিলো সরকারি কলেজে।

মন অনেক কিছু চায়, কিছু তার পায়, কাজলের চাওয়া জুড়ে রিতিমার অবস্থান। বাসায় ফিরে ঘটক মারফত রিতিমার বাসায় সে প্রস্তাব পাঠালো। না পাওয়া অন্য কথা, কিন্তু কেনো সে কম চাইবে?

রিতিমার বাসা থেকে ভালোই সাড়া পেলেন ঘটক। সবাই মিলে ওরা রিতিমাকে দেখতে গেলো। এলাকার ছেলে, শিক্ষিত, চাকরিজীবী সব বিবেচনায় রিতিমার বাবা-মা রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু নারাজি মত এলো রিতিমার থেকে। সুন্দরী আর শিক্ষিত মেয়েদের চাহিদা থাকে আকাশস্পর্শী। কাজলকে অপছন্দের কারণ রিতিমা না বললেও পরে ঘটক মারফত জানতে পেরেছে কাজলের শরীরের রং কিছুটা শ্যামলা। একারণে মেয়ের ছেলেকে পছন্দ হয়নি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাজল নিজের চেহারা দেখতে থাকলো, একটু শ্যামলার কারণে তার ভেতরের আর কোনো গুণ রিতিমার চোখে পড়লো না!

কিছুদিন পরে আরেফিন ঘুরতে এলো কাজলের বাসায়। নিজ ক্যাম্পাসের একটি মেয়ে আছে তার এলাকায় আরেফিনকে বললো। কিন্তু নিজে যে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বললো না। ঘটককে ডেকে আনলো। আরেফিনকে সাথে দিয়ে ঘটককে পাঠিয়ে দিলো রিতিমাদের বাসায়। আরেফিন খুশি হলো বন্ধুর আজকের ভূমিকায়। কিন্তু কাজল সাথে গেলো না বলেও মন খারাপ করলো। দিন শেষে আরেফিন ফিরে এলো। রিতিমা তাকেও অপছন্দ করেছে। কারণ হিসেবে ঘটককে জানিয়েছে একটু খাটো। একটু খাটো বলে সে যে মেয়েদের চেয়েও চেহারায় সুন্দর, মেধাবী, চাকরিজীবী তার এই গুণগুলো ম্লান হয়ে গেলো।

অন্য এক ছুটিতে অমি এলো কাজলের বাসায়। ক্যাম্পাস দেখার আনন্দ, পাশাপাশি কাজলের সাক্ষাৎ পাওয়ার প্রবল আকাঙ্খায় অমি চলে আসে প্রায়ই। অমিকেও একই ভাবে ঘটকের সাথে প্রেরণ করলো রিতিমাদের বাসায় কাজল। রিতিমা অমিকেও প্রত্যাখ্যান করলো, কারণ হিসেবে দেখালো মোটা। মোটা হওয়ার কারণে অমির মতো উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী, বিসিএস ক্যাডার পাত্রকেও রিতিমা প্রত্যাখ্যান করলো! ছেলেগুলো সংসারে ঢুকবে কী করে?

রিতিমার আশা ছেড়ে দিলো কাজল। যার চাহিদার শেষ নেই, যার চাহিদা এত বেশি বৈচিত্র্যে ভরা তাকে পাওয়ার আশা দুরাশার নামান্তর। নিজ দুই বন্ধু মানুষ হিসেবে কতই না ভালো, তাছাড়া তার চেয়ে যোগ্যতায়ও অনেক এগিয়ে, তারাও কীভাবে তার চাহিদার কাছে হারে! তাই মিছে আশা ছেড়ে দিলো সে।

শীতকালীন অবকাশ চলছে অমির। আরেফিনও বৃহস্পতিবার ছুটি নিয়েছে। বুধবার বিকালেই কাজলের বাসার উদ্দেশ্যে রাজশাহী চলে এলো ঘুরতে। বন্ধুত্বের বন্ধন কত বেশি সুদৃঢ় হলে সম্পর্কটা এখনও এত প্রগাঢ় থাকে! ওদিনই কাজল ঘটক মারফত জানতে পারলো শুক্রবার রিতিমার বিয়ে। 

আরেফিন হিংসান্বিত হয়ে বললো, কাকে সে বিয়ে করছে দেখবো! কত লম্বা ছেলে দেখবো তার বর!

অমিও কর্কশকণ্ঠে বললো, আমিও দেখবো কার সাথে তার বিয়ে হচ্ছে, কত সুন্দর চেহারা তার স্বামীর দেখবো!

কাজল অবশ্য হিংসা কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করলো না। শান্ত থাকলো। সত্য সত্য ওরা তিন বন্ধু শুক্রবার বিবাহের অনুষ্ঠানে হাজির হলো। বর সেজে বসে থাকা লোকটি তিন বন্ধুকে দেখে মাথা নত করে থাকলো। কাজল নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে গেলো। ডান দিক থেকে সরে এসে কাজলের কানে কানে আরেফিন বললো, আরে এ ছেলে তো ক্যাম্পাসের ঘুপচিতে বসে গাজা খেতো। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আমার ল্যাপটপটা তো এই ভদ্রলোকটিই ছিনতাই করেছিলো!

বাম দিক দিয়ে কাছে সরে এসে অমি বললো, এই ছেলেই তো ক্যাম্পাসের সন্ত্রাস বাহিনীর লিডার। গাজা খেয়ে টাল থাকতো সারাক্ষণ। আমার ট্যাবটা তো এই বদমাশই ছিনতাই করেছিলো।

কাজল নিশ্চল থেকে সচল হলো, কিন্তু নিশ্চুপই থাকলো। দুই বন্ধুকে টেনে নিয়ে বাইরে বের হয়ে এলো। কোনো প্রকার হট্টগোল করতে দিলো না। তার মোবাইলটাও যে এই ভদ্রজনই কেড়ে নিয়েছিলো তা কাউকেই বুঝতে দিলো না। কারণ তার ঘরেই যে থাকবে তার প্রিয় মানুষটি।

...(সমাপ্ত)...

Friday, January 13, 2023

কালো গোলাপের গল্প

ছবি : ইন্টারনেট

কালো গোলাপের গল্প 

সৌমেন দেবনাথ 

জানালা দিয়ে দূর আকাশে নিষ্পলকে চেয়ে থাকে কল্যাণী। মাঝে মাঝে চোখের পাতা ডিঙিয়ে জল নেমে আসে। খুব কষ্ট মনের মধ্যে, যে কষ্টের কথা কাউকেই বলা যায় না। আয়নায় মুখ দেখে, আয়না সরিয়ে ফেলে। উড়নায় মুখ ঢেকে রাখে। নিজেকে ঘৃণা করতে ইচ্ছা হয়। হাতের দিকে তাকায়, হাত ঢেকে ফেলে। পায়ের দিকে তাকায়, পা ঢেকে ফেলে। এক পলক তাকে কেউ দেখলেই এক সেকেন্ডেই বলে বসে, এত কালো!

বুঝতে শেখেনি যতদিন ততদিনই ভালো ছিলো। বুঝতে শেখার পর থেকেই অন্যদের মতো সে বাইরে ঘোরে না, কারণ বান্ধবীভাগ্য মন্দ। বান্ধবীরা কেউ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করলেও বান্ধবীমহলে বড় বেমানান সে। সাদা চামড়ার মেয়েরা বুঝতে শেখার আগে থেকেই বুঝে ফেলে সে সুন্দরী। পা তাদের মাটিতে পড়ে না। কোথাও ঘুরতে গেলে কল্যাণীকে সাথে নেয় না। আর তাই এখন কল্যাণী নিজেও তাদের সাথে দূরত্ব রেখে চলে। 

একা থাকে, একা থাকলেই কান্না করে। কল্যাণীর মা প্রায় প্রায় কল্যাণীর বাবাকে বলে, তোমার কারণে আমার বড় মেয়ে কালো হয়েছে। মেয়েরা মায়ের রং পায়, আমার দুর্ভাগ্য। 

কল্যাণীর বাবা বলে, মেয়ে আমার। তার মেধা আছে। রূপে জগৎ চলে না। মেধায় জগৎ চলে। নিজের আত্মজাকে নিয়ে আক্ষেপ করবে না।

কল্যাণীর ছোট বোন ফাল্গুনী। সে হয়েছে মায়ের মতো। দুধে আলতা গায়ের রং। তবুও তিনবেলা সাজে। দেখতে পরির মতো লাগে। সারা তল্লাট ঘুরে বেড়ায়। ঘরে মন বসেই না। রূপ থাকলে উচ্ছলতা থাকে। উচ্ছ্বাস থাকে জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রবল। মনে থাকে রূপের অহম। ফাল্গুনীর কথা ভাবে আর নিজেকে ধিক্কার দেয় কল্যাণী। মনের মধ্যে খুব ক্ষোভ কাজ করে। একটু সুন্দর হলেও তো বাকিটুকু কসমেটিকস মেখে সুন্দর হতে পারতো। সুন্দর চেহারার মানুষ সবখানে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের মতো। সুন্দর চেহারার মানুষ সবখানে সাদরে গৃহীত হয়। সুন্দর যে তার দিকে সব আলো। সুন্দর যে সৌন্দর্যের সংগায় এগিয়ে সে। সুন্দর যে তার কদর সবাই করে, তার কদর সবার কাছে। চোখ সুন্দর যার তাকে নিয়ে গান লেখে কেউ, কবিতা লেখে কেউ, কেউ উপন্যাসও লেখে। নাকটা যার একটু লম্বা দুনিয়ার যত প্রশংসা সব তার। ঠোঁট সুন্দর যার তাকে সরাসরি বলে প্রশংসা না করলেও দেখে দেখে মানুষ নয়নের তৃপ্তি নেয়। আর সাইজে একটু লম্বা হলে তো কথায় নেই। সবচেয়ে দামি আর পছন্দের শীর্ষে। কেউ একটু কথা বলতে চাইলেই ভেবে নেয়, সুন্দর বলে কথা বলতে চায়। হঠাৎ চোখে চোখ পড়লেই ভেবে নেয়, সুন্দর বলে মানুষ তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলেই ভেবে নেয়, দেখে চোখে ধাঁধা লেগেছেরে। সুন্দরীদের মনের এই ভাবনা সব সুন্দরীদের জন্য সমান। অধিকাংশ সুন্দর চামড়ার মেয়েদের মস্তিষ্ক বড় অনুর্বর। পরীক্ষায় খারাপ করলেও ভাইভায় রেজাল্ট ভালো করে। পড়া না পারলেও স্যারেরা বকেন না। রেজাল্ট ভালো না করলেও মা বাবা বকেন না। সুন্দরের কান্না, অভিমান, রাগ কেউ সহ্য করতে পারে না। সুন্দরের রোগ, শোক, ব্যাধি কেউ মেনে নিতে পারে না। সুন্দরীদের সব মাফ, সুন্দর যে!

মুগ্ধ করার ন্যূনতম ক্ষমতা থাকলেই মোহিত হয়ে যায় পুরুষ পঙ্গপাল সুন্দরী নারীর প্রেমে। মেধার সূক্ষ্মতা না থাকলেও মনোমুগ্ধ পুরুষ সুন্দরী নারীর সাহচর্য পেলে। বুক ফুলিয়ে রজত বলে, তোমার কাঁচা কাঁচা কথাও আমার বড্ড মিষ্টি লাগে।

শুনে হাসে, না বুঝে হাসে, না জেনে হাসে ফাল্গুনী। আর বলে, তাই!

সুন্দরীর হাসি দেখে পতঙ্গের মতো দিগভ্রান্ত হয় রজত।  বলে, তুমি হাসলেই আকাশটা যেন ঝিকমিক করে উঠে মেঘ ভাঙা রোদ্দুরে।

শুনে আবার হাসে ফাল্গুনী। সুন্দরীরা সব সময় হাসে বেশি। হাসি দিয়ে পাগল করে আশপাশের মূর্খ থেকে গ্রাজুয়েট সবাইকে। আর মানুষও হাসিপ্রিয়। হাসি দেখলেই অবাক হয়ে দেখে। রজত আবার বলে, তোমার হাসি দেখলেই আমার সাজানো-গোছানো ভাবনাজাল উলোট-পালোট হয়ে যায়। 

প্রতিউত্তরে কি বলবে বুঝতে পারে না ফাল্গুনী। রজত আবার বলে, তুমি ডাকলেই বুকের বরফ গলে সহজেই ঝর্ণা হয়ে যায়। 

ভীষণ আশ্চর্য হয় ফাল্গুনী। সুন্দরীরা শুধু প্রশংসা শুনতে চায়। অস্ত্র হিসেবে সেটায় ব্যবহার করে রজত। রজত আবারও বললো, বুকের ভেতরের কোকিলটা তোমাকে দেখলেই ডেকে উঠে।

শুনে কেবলই হাসে ফাল্গুনী। বলে কম কারণ জানে কম। বলেও বেশি কারণ জানেও না কিছু। মেধাবীরা ভবিষ্যৎ বুঝতে পারে। মেধাবীরা আসন্ন বিপদও বুঝতে পারে। 

হাসিতে সন্তুষ্ট রজত ফাল্গুনীর হাসি দেখে, না কি দেখে রজতই ভালো জানে। ফাল্গুনীও যে শুধু রজতকে পেলে হাসে, না অন্যদের দেখলেও হাসে সেটা ফাল্গুনীই জানে। সুন্দরীদের মনে কিসের বাস তারা নিজেও জানে না, পুরুষ জানবে কি করে? ওরা কিসে খুশী, কিসে বশে তাও অনির্ণয়ে। লোভী রজত টোপ দিতেই থাকে, টোপ ফাল্গুনী ধরেও৷ লোভীরা ফাঁদ পাতে, মূর্খরা নিশ্চিন্তে ফাঁদে পা দেয়। রজত ফাঁদ কষে পাতেনি। চতুর চাতুরীও দেখাচ্ছে না, মূর্খও মূর্খামি করছে না। একে অপরের অন্তরের চাওয়াতে একে অপর লীন হয়ে গেলো। হিংস্র প্রাণীর হিংস্রতা কমে গেলো অতীব সুন্দরীর সরলতায়।

রজতের পরিবার ফাল্গুনীকে দেখতে ফাল্গুনীদের বাড়ি এলেন। বড় মেয়েকে বিয়ে না দিয়ে ছোট মেয়েকে বিয়ে দেবেন না পরিষ্কার বলে দিলেন কার্তিক বাবু। কল্যাণীও পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পেয়ে বিয়ে করবে না। ফাল্গুনী কল্যাণীর এমন সিদ্ধান্ত শুনে হতবাক হয়ে নানা কথা শোনায়। মেধাবীরা পড়াশোনা করতে চায়, সুন্দরীরা প্রেম-বিয়ে এগুলোই করতে চায়। মেধাবীরা চাকরি করতে চায়, প্রজন্মকে এক ধাপ উপরে উঠাতে চায়। সুন্দরীরা বিয়ে করে বাচ্চা মানুষ করতে চায়, নিজ প্রজন্মের আশা ছেড়ে পরের প্রজন্মকাতর হয়।

বাধ্য হয়ে কার্তিক বাবু বড় মেয়ের জন্য ছেলে খুঁজতে লেগে গেলেন। ছেলেপক্ষ দেখতে এলে ফাল্গুনীকে লুকিয়ে রাখেন। ফাল্গুনীকে দেখলে কল্যাণীকে কেউ পছন্দ করবে না। কারণ সমাজ রূপ দেখে, গুণ দেখে না। যখন রূপের ভেতর গুণ খোঁজে তখন ভুলটা বোঝে।  কল্যাণীকে তাঁরা অপছন্দ করে চলে গেলেন। কল্যাণী ঘরের কোণে বসে কান্না করতে থাকে। তার সৌন্দর্য না থাকার কারণে তাকে মানুষ অপছন্দ করছে। তার চেহারা ভালো না বলে মানুষ তাকে গ্রহণ করছে না। তাকে কেউ প্রশংসা করে না। তাকে দেখে কৌণিক চোখে দেখে সবাই। নাক সিটকায় কেউ কেউ। তার মায়ের সন্তান না বলেও কেউ কেউ মত প্রকাশ করে। এসব ভাবে আর কাদে সে। নিজেকে ভীষণ ঘৃণা করে। নিজেকে ধিক্কার দেয় সে। 

আরো এক ছেলেপক্ষ তাকে অপছন্দ করে চলে গেলেন। এরি মধ্যে মাস্টার্সের রেজাল্ট বের হয়েছে তার। এবার সে জব সেক্টরে ঢুকবে। চাকরি করা মেয়েদের রূপের দিকে কোন ছেলেপক্ষ তাকায় না। 

রজত ও রজতের পরিবারের পীড়াপীড়িতে ছোট মেয়ের বিয়ে কার্তিক বাবু আগেই দিয়ে দিলেন। মেয়ে নষ্ট হওয়ার চেয়ে মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়া বাবা মা মেনে নেয়। মেয়ে নষ্ট হওয়ার চেয়ে মেয়ের জীবন নষ্ট হওয়া বাবা মা মেনে নেয়। একটি সুন্দরী মেয়ের সর্বশেষ গন্তব্য স্বামীর গৃহ, এটা যেন নিয়ম হয়ে গেছে। মেয়ে সুন্দর হয়েছে, বিয়ে নিয়ে চিন্তা নেই। মেয়ে দেখতে সুন্দর, ভালো স্বামী পাবে এই সুচিন্তা প্রতি বাবা মায়ের মধ্যে। 

কল্যাণী পরীক্ষায় টেকে, কিন্তু চাকরি হয় না। চাকরি না হওয়ার কারণ ঐ অসুন্দর চেহারা। মেধা হেরে যায় সুন্দর চেহারার কাছে। কল্যাণীর আত্মবিশ্বাস শূন্যে ঠেকেছে। পরীক্ষা দিতে চায় না। একা থাকে, মনটা সাজতে চায়, সাজে না। অসুন্দরদের সাজতেও মানা, সাজলে পারিপার্শ্বিকের মানুষ হা করে দেখে। একটি ফুল ছিড়ে খোঁপায় গোঁজে না। অথচ একটি ফুল খোঁপায় গোঁজার তার কত শখ। মানুষের আড়চোখের চাহনিতে সে পড়তে চায় না। 

মা রিতিমা এসে বলেন, তোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কিত, মা।

কার্তিক বাবু শুনে বলেন, ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করো না। ফাল্গুনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করো। নেশাখোরের ঘরে মেয়ে বিয়ে দিয়ে কিভাবে বিনাশঙ্কায় থাকো?

রিতিমা বলেন, বিয়ে তো দিতে পেরেছো! কল্যাণীর ক্ষেত্রে সেটাও পারবে না।

কার্তিক বাবু বলেন, আর কয়টা মাস অপেক্ষা করো, কল্যাণী সফলতা থেকে একটু দূরে।

বাবার কথায় কল্যাণী আবার পড়তে বসে। পড়তে হয় জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য। পড়তে হয় সব সমালোচনার জবাব দিতে। পড়তে হয় নিজেকে জানাতে। পড়তে হয় সামনের সারিতে থাকতে। পড়তে হয় কালো রঙের অভিশাপ ঘোচাতে।

না, পড়লেও হয় না। কল্যাণী সফলতা থেকে অনেক দূরেই। পরীক্ষায় টেকে ভাইভায় টেকে না। কারণ হিসেবে কল্যাণী তার বাবাকে বললো, বাবা, আমি কালো এটাই সমস্যা। বাবা, তুমি না বলেছিলে আমি লেখাপড়া শিখলে আমার কালোত্ব ঘুচবে! বলেছিলে না, শিক্ষিত হলে আমার কালোকে কেউ কালো বলবে না! বাবা, চেহারা আর গুণ দুটো ভিন্ন জিনিস। দুটোই দরকার।

রিতিমা বললেন, পড়াতে পড়াতে মেয়ের বয়সও বাড়িয়ে দিয়েছো। ওর বিয়েও হবে না।

কার্তিক বাবু ঠাঁই দাঁড়িয়ে কেদে দিলেন, তারপর বললেন, মেয়েকে বিয়ে দিতে পারবো না কেন? আমার জমিজমা সব বিক্রি করে দেবো৷ 

ভালো রেজাল্ট করা একটি শিক্ষিত মেয়ের বিয়ে দিতেও বাবাকে জমিজমা বিক্রির কথা ভাবতে হয়, কোন সমাজে বাস আমাদের! এই সমাজ বর্ণবাদবিরোধী। কিন্তু সবাই বর্ণবাদকে লালন করে। যোগ্যতায় জিতে যায়, বর্ণে হেরে যায়। যোগ্যতায় এগিয়ে যায়, বর্ণবাদের সাথে পেরে উঠে না। 

জানালায় বসে খোলা আকাশের দিকে তাকায় কল্যাণী। জায়গাটা খুব প্রিয়। এখানে বসে ইচ্ছামত কাদলেও কেউ দেখে না। সব সময় ইচ্ছামত কান্না করা যায়। কিন্তু হৃদয়ভার কমে না। বেশিরভাগ সময় সে ভুলে যায় যে সে কালো। কিন্তু এই সমাজ আঙুল উঁচিয়ে জানিয়ে দেয়, তুমি কালো। তুমি মেধাবী তাতে কি, তুমি উপরে উঠার স্বপ্ন দেখো না।

আহা, এত বছর লেখাপড়া না করে যদি এত বছর রূপ চর্চাও করতো, তবে সমাজে তার একটা জায়গা হতো, কিছু না হলেও বিয়েটা হতো। 

...(সমাপ্ত)...

                                                        

Sunday, September 25, 2022

বঙ্কিমের সিদ্ধান্ত

ছবি : ইন্টারনেট

বঙ্কিমের সিদ্ধান্ত 

সৌমেন দেবনাথ 

সবার বাড়ির আশপাশে এমন ভাঁড় প্রজাতি আছেই, খেতে পায় না, কিন্তু চোখে চশমা, কালো চশমা, ভাবের চশমা। একটা মেধাবী ছেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, সাইকেল চড়তে পারে না, কিন্তু এই ভাঁড় প্রজাতি মোটরসাইকেল চালায়। পকেটে টাকা নেই, কিন্তু আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। সম্মান করতে জানে না, শ্রদ্ধাবোধ নেই। শান্ত-শিষ্ট, ভদ্রদের এরা আবার অসামাজিক বলে। সমাজে বখাটেপনা করতে পারলেই সামাজিক হওয়া যায় আরকি! এরা ছোট-খাটো ব্যবসায় করে টাকার মুখ দেখলে মাটিতে পা ফেলে না। কলার উঁচিয়ে চলে, আঙুল নাচিয়ে কথা বলে। সমাজপতি হয়ে বিচার করে বেড়ায়। বঙ্কিমের কথা বলবো বলেই এত কথা বলতে হলো। ব্যবসায় করে বেশ টাকা কামিয়েছে। কাচের টুকরো হীরের টুকরো হয়ে গেছে। পোশাকে-আশাকে ফুলবাবু। কথা না বললে কাচ-কাঞ্চন বোঝা যাবে না। চেনা মানুষকে চেনা যায় না। টাকার মহিমায় মানুষ এত পরিবর্তন হতে জানে মুখ দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে মাথায় কিছু নেই। টাকা হলে মানুষের অবয়বে অতীতের চিহ্ন থাকে না, তবে আচার-আচরণে যে স্মারক ভেসে উঠে তা ডাস্টবিনের দুর্গন্ধের চেয়েও খারাপ। টাকা হয়েছে, সে ভেবে নিয়েছে তার সম্মানও হয়েছে। বিয়ে করবে, এ নিয়ে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। মেয়ের কি থাকতে হবে তার বর্ণনার চেয়ে, মেয়ের পিতার কি থাকতে হবে তার বর্ণনা আরো দীর্ঘ। 

কয়েকজনকে সঙ্গী করে মেয়ে দেখতে গেলো। ঘটকের কাছ থেকে যে সুন্দরের বর্ণনা সে শুনেছিলো তারচেয়ে বেশি সুন্দর। দেখলে যে সৌন্দর্য দেখা যায়, বর্ণনা করে তো সে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা যায় না। বিদায়ী সূর্যের হলদেটে রং-রোদ মেয়েটির শ্বেত-শুভ্র দেহকে করে তুলেছে আরো মোহনীয়। পাহাড়ের মত মৌন, চুপ করে বসে আছে। দেখলেই বোঝা যায় শান্ত, ভদ্র। খোলা হাওয়ায় কপালের এলো চুল উড়ে উড়ে বিরক্ত করছে। মুখ থেকে নিঃসৃত দুটি একটি কথা মিষ্টির চেয়েও মিষ্টি। এমন মায়াবী চেহারার মেয়েকে দেখে কার না ভালো লাগবে! কিন্তু বঙ্কিমের ভালো লাগলো না। সবার দেখা আর তার দেখা এক না। সবার চিন্তার পরিসর আর তার চিন্তার পরিসর এক না। আপাতত দেখার বাইরে গিয়েও আরো কিছু দেখেছে সে। মামাকে বললো, মামা, মেয়ের পরিবার ভালো না। মেয়ের বাবার জমি-জমা নেই। বিয়ে করলেই বৌ পাবো, কিন্তু বিয়ে করলে সম্পদ পাবো না, তা হবে না। পৃথিবী খুব নিষ্ঠুর, এক শতাংশ জমি কেউ দেবে না। রূপ থাক বা না থাক, গুণ থাক বা না থাক, টাকা থাকলে পছন্দে অদ্বিতীয়। মেয়ের বাবার টাকা থাকতে হবে, বাদবাকি বিষয় না থাকলেও চলবে।

মামা হতবাক হয়ে বললেন, বলিস কি? সংসার করার জন্য একটা ভালো মেয়েই যথেষ্ঠ। জীবনে একটা ভালো মেয়ে পাওয়া আশীর্বাদস্বরূপ। যার বৌ ভালো না, তার সংসারে কোথাও শান্তি নেই। 

বঙ্কিম বললো, মামা, সম্পদ থাকলেই শান্তি। জীবনে যতটুকু করেছি অনেক কষ্টে। বিয়ে করে জিততে চাই, বিয়ে করে ঠকতে চাই না। বিয়ে করে যারা ঠকেছে, গোটা জীবনেও তারা তা অর্জন করতে পারেনি।

ছবির বাবা জেনে গেলেন তাঁর মেয়েকে তাঁরা পছন্দ করেননি। কেন পছন্দ করেননি তার কিছুটা আভাসও পেয়েছেন। সদ্য বড়লোক হওয়া এক বর্বরের হাতে মেয়েকে যে তুলে দিতে হলো না বাবা হিসেবে এটা যেন তাঁর পরম প্রাপ্তি।

রোজগারের সুযোগ বেড়ে গেলে মনের ভেতরের অনুরাগ, অনুভূতি ভোঁতা হতে থাকে। কাউকে ভালো লাগলেও বলতে দ্বিধা জাগে, তার নানা অসংগতি সামনে আসে। যাকে ঘিরে কোন এক সময় রূপমুগ্ধ একটা স্তবক লিখেছিলো, মনের কথা সামর্থ্য বা যোগ্যতার অভাবে বলতে পারেনি, তাকেও আর ভালো লাগে না, ভালো লাগার বহর বেড়েছে। যেখানে টাকাই শেষ কথা সেখানে রূপে কি আর মন মজে? সুন্দরে এখন মন ভরে না, সুন্দরীর স্বাচ্ছন্দ্যও থাকতে হবে। সুন্দরীর পরিবার যদি ক্ষমতার জ্যাকেটধারী হয়, তবে তো আরো ভালো। স্বচ্ছল জীবনের ঊষালগ্নে মানুষ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। অহমবোধে অযাচিত কথা বলতেও দ্বিধান্বিত হয় না। টাকায় বাঘের দুধ মেলে এই জ্ঞান ধারণ করে চলে; হাড়ে, রক্তে, মাংসে অহংকার বহন করে। মনের অতল তলের জটিল রহস্য আরো জটিল করে তোলে। নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবে কাউকেই আর গুরুত্ব দেয় না। 

এবার ধনী ঘরে মেয়ে দেখতে গিয়েছে সদলে। আচারে-আচরণে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাব। হীরার কণার মত দেখতে স্মারণিকেও পছন্দ হয় না বঙ্কিমের। নাম যেমন বঙ্কিম, পছন্দও তেমন বঙ্কিম। যাকে দেখে রক্ত কণিকায় অজানা শিহরণ জেগে উঠলো, তাকে অপছন্দ করার নানা ফন্দি-ফিকির খুঁজতে থাকলো। ঘন পল্লবের নির্লিপ্ত চোখ, মিষ্টি ঠোঁটের লাজুক ভাবখানা তাকে আকৃষ্ট করলেও অজানা কারণে না না ভাবখানায় প্রকাশ করলো। হাড় খাওয়া কুকুর স্বভাব দোষে মার খেয়ে বাঁশ বাগানে গিয়ে মল খায়। বঙ্কিমের হয়েছে সেই স্বভাব, কোন ভালোই তার ভালো লাগে না, কোন ভালোই তার চোখে পড়ে না। সাথে থাকা বন্ধু প্রদীপ বললো, কমনীয় মুখের স্নিগ্ধতা বড় মায়াকাড়া। বাচনভঙ্গির তীক্ষ্ণতাও অনিন্দ্য। অপছন্দের কারণ কোথায় পাস?

বঙ্কিম বলে, মেয়ে দেখতে আসা মানে মেয়েই দেখা না। সুন্দর বলে পছন্দ করবো, সুন্দর তো বুনোফলও। কমনীয় বলেই অগ্রাধিকার পাবে, বুনোফুলও কি কমনীয় নয়? যান্ত্রিক যুগ, হার্দিক আর আত্মিক হৃদয় দিয়ে চলে না। পৌরাণিক যুগে পরী দেখে মানুষ হতবাক হতো। আধুনিক কালে বৈষয়িক বিষয়ও লক্ষ্য করতে হয়। যেমন সম্পদশালী ভেবে এসেছিলাম তেমন সম্পদশালী এরা নয়। 

প্রদীপ আশ্চর্য হয়ে বলে, সংসারের তাগিদে তুই তবে মেয়ে দেখতে আসিসনি, এসেছিস সম্পদের তাগিদে? এই লোভ, এই লিপ্সা, এই মোহ কখনো শুভ ফুল দেবে না। সম্পদ হয় সবার আশীর্বাদে। 

বঙ্কিম জানে না অল্পে অনেক স্বাদ। সে জানে না, কখনো-সখনো না চাইলেই বেশি মেলে, চাইলেই কমে। স্বপ্নীল রাজ্য গড়া আর স্বপ্নীল রাজ্য পাওয়া এক কথা না। স্বপ্নীল রাজ্য পাওয়ার এই নিচু আশা নীচুতার সামিল। আত্মতৃপ্তিই আত্মোন্নতি ঘটায়। অন্যের সম্পদ প্রাপ্তির এই নিম্নচিন্তা সুস্থতার প্রতীক না।

এরপর আবারও সে মেয়ে দেখতে গেলো। ভীষণ আশা, বিচিত্র আর বৈচিত্র্যময় আশা নিয়ে সে মেয়ে দেখতে যায়। তার পছন্দের মধ্যে দূরদর্শী চিন্তার মিশেল থাকে। মেয়ের চারিত্রিক গুণাবলীর চেয়ে অন্যান্য পারিপার্শ্বিক বিষয়ে তার সন্নিগ্ধ নজর থাকে। অন্যের চোখের দেখাকে সে ক্ষীণ আলোয় পুকুর দেখা বোঝে, নিজের চন্দ্রালোকপ্লাবিত চোখের দেখাতে মহাসমুদ্রের বালুও দেখে থাকে। সিঁথি যেমন লাবণ্যমাখা, তেমন মাধুর্যে সেরা, তেমনি কমনীয় ও মোহনীয়। দেখলেই মৃত মানুষের মত চোখ অপলক হয়ে যায়। কারো জন্য পয়সা পথে পড়ে থাকে না, এমন মেয়েও কারো জন্য পড়ে থাকবে না। যে যত দ্রুত দখলে নিতে পারবে, সে জিতে যাবে। কিন্তু যার নাক সিটকানো স্বভাব তার নাকে কেবল দুর্গন্ধই যায়। যার চোখে ময়লা সে ময়লায় দেখে। যার মন পঁচা, সে পঁচায় দেখে। লোভে যার হৃদয় ঠাসা তার মুগ্ধতা বলে কিছু নেই। প্রদীপের বিস্ময়মাখা প্রশ্ন, কি এবার পছন্দ তো?

বঙ্কিম বলে, মেয়ে তো সুন্দর, মেয়ের বাবাও সম্পাদশালী। কিন্তু মেয়ের বাবার রাজনৈতিক শক্তি নেই। রাজনৈতিক শক্তিহীনতায় সম্পদ ভোগে তৃপ্ততা থাকে না। ভীতি নিয়ে সম্পদ টিকিয়ে রাখা যায় না। 

প্রদীপের আশ্চর্য হওয়ার আর কিছু বাকি থাকলো না। বললো, কি ভাবিস এসব! অন্যের সম্পদে এত নজর ভালো না। সম্পদই যারা চেনে তারা চির অসুখী। শক্তি দিয়ে যারা বাঁচতে চায় তারা শক্তিবান, ধনবান; মনবান না। সামর্থ্য অনুযায়ী বাঁচতে শিখতে হয়, শক্তি প্রয়োগে বাঁচাকে বাঁচা বলে না। বুদ্ধি দিয়ে বাঁচতে হয়, বোধ নিয়ে বাঁচতে হয়। বোধ-বুদ্ধিসম্পন্নরা শক্তিশালীদের চেয়ে বাঁচে মানে-সম্মানে। বিবেকের জয়, এমন শক্তির ক্ষয়। জ্ঞান চিরস্থায়ী, এমন শক্তি নশ্বর, অতি নশ্বর। 

বঙ্কিম আমার কথাতে কর্ণপাত করলো, দৃষ্টিপাত দিলো, কিন্তু সে যে ধারাপাত সারাদিন মনে জপে তা থেকে বের হলো না। মামা, কাকা আর আমাকে নিয়ে সে স্থান ত্যাগ করলো। মামা ফেরার পথে বললেন, পছন্দের লাগাম টান। ভালো লাগারও সীমা থাকা দরকার। সহজে পাওয়া গেলে তার মর্ম বুঝি না। পাবো না যখন তখন আক্ষেপের শেষ থাকবে না।

বঙ্কিমের উক্তি, চারিদিকে মণিমুক্তায় ঠাসা, একটি মণি খুঁজে নেয়া খুবই সহজ। আমি হীরা-চুনি-পান্নার সাথে শক্তি, সাহস, সামর্থ্যও খুঁজছি। বাঁচতে এখন বল বেশি প্রয়োজন। বাঁচতে এখন বাহু প্রয়োজন। বাঁচতে এখন বিবেক কম প্রয়োজন। 

কাকাও একথা শুনে থমকে গেলেন। বঙ্কিমের চিন্তায় এত অসুস্থতা বিরাজ করছে ভেবে মূর্ছা গেলেন। বললেন, মানুষ সুখের জন্য ভালো মন-মানসিকতার একটা মেয়ে খোঁজে। একটি শুদ্ধ মেয়ে একটি পরিবারকে শুদ্ধ করে তোলে।

বঙ্কিম বলে, ভালো মন-মানসিকতা বলে কোন কিছু নেই। উজ্জ্বল মন-মানসিকতার উপর গ্যালভানাইজিংয়ের প্রলেপ পড়ে যায় টাকা না থাকলে। সুখের জন্য সংসারী বৌ এখন খোঁজে না কেউ। অসংসারী বৌও টাকা দেখলে সংসারী হবে, সুখ বিলাবে। আপাতত চোখের দেখা সৌন্দর্যের মধ্যে কোন সুন্দর নেই। আমার আয় আছে, আমার ঘরে আসতে চায় অনেকেই। ঘরে চিনি থাকলে পিঁপড়া আসে। চিনি না থাকলে পতঙ্গও আসবে না। যার টাকা আছে তার মান আছে। যার জ্ঞান আছে তার কোন মান নেই। সমাজ বদলে গেছে। পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থার সাথে চিন্তা-চেতনারও পরিবর্তন ঘটানো দরকার।

সবাই চুপ হয়ে গেলো। প্রদীপ বাইরের মানুষ। কথা বলা তার ঠিক না। দামী কথায় চিড়া ভেজে না। নীতিকথায় সবাই বেজার। উচিত কথায় সম্পর্ক নষ্ট হয়। সে মনে মনে ভাবতে থাকে, মানুষের মন কত বিচিত্র, মানুষের সেই বিচিত্র মনে কত বিচিত্র ভাবনা।

এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। চাওয়ার বাড়-বাড়ন্তর জন্য মনের ঘরটা আজো ফাঁকা বঙ্কিমের। সে এক ধ্যান ধারণ করে আছে, অনায়াসে যা পাওয়া যায় তার মূল্য থাকে না। বিচক্ষণ মানুষ সে, বুঝে শুনে কাজ করবে। মুহূর্তের ভুলে সে জীবনের সবচেয়ে বড় সর্বনাশ করতে চায় না। আবার এটাও সত্য, রঙিন চোখে মাত্রাতিরিক্ত স্বপ্ন থাকলে ফুল চিনতে গিয়ে কাঁটায় জোটে। নিজের প্রতি শতভাগ বিশ্বাস আছে বলেই বলে, শকুন চোখকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও বৈজ্ঞানিক চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। 

এবার সাথে প্রদীপ যেতে চাইলো না। মানী মানুষের সাথে না গেলে মান থাকে না, এ কারণেই প্রদীপের এই না যাওয়ার সিদ্ধান্ত। কিন্তু বঙ্কিম প্রদীপকে সাথে নেবেই। এবার সাথে আরও এক বন্ধু আমির গেলো। আমিরের দৃঢ় সিদ্ধান্ত, বঙ্কিমকে এবার বিয়ে দিয়েই ছাড়বে। মেয়েপক্ষের বাড়ি গিয়ে পৌঁছালো। সম্পদ অঢেল, রাজনৈতিক শক্তিও যৎসামান্য নয়। তথাগতকে দেখে তেমন পছন্দ না হলেও বঙ্কিম রাজি হয়ে গেলো। প্রদীপ বললো, রাজনৈতিক প্রভাব আছে যাদের ক্ষমতার পালাবদল হলে তাদেরই দুর্ভোগ হয় অনেক। 

প্রদীপকে আমির থামিয়ে দিলো, এভাবে বলিস বলেই ওর বিয়ে হয় না। এখানেই বঙ্কিম বিয়ে করবে, কথা পাকাপাকি করেই ফিরবো। বিয়ের সিদ্ধান্তে বেশি ভাবলে বিয়ে হয় না।

মামা বললেন, আমির, মেয়েটাকে তেমন চলনসই মনে হচ্ছে না। বঙ্কিমের তুলনায় বেশ ছোট। দেখতেও একটু শ্যামলা। বঙ্কিমের সাথে মানাবে না। 

আমির বেশ রাগতস্বরে বললো, আর কত মেয়ে দেখবেন? সব পাবেন না একত্রে। একটি মানুষ সব নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। আল্লাহ সবাইকে সব দিবেন না। কিছু খুঁত থাকবে, নিখুঁত কিছুই নেই। সব পূর্ণতা একের ভিতরে থাকবে না। কেউ সম্পূর্ণ না। মেনে নিতে হবে, মানিয়ে নিতে হবে। দোষ দেখলে দোষ বেরই হবে, ত্রুটি দেখলে ত্রুটি বেরই হবে। শুধু চিন্তা-ভাবনার ভেতর পজিটিভিটি আনেন, দেখেন সব সুন্দর। চোখ মেললে সুন্দর দেখা যায় না, দৃষ্টি মেলতে হয়। হৃদয়ের চোখের উন্মীলন না হলে দেখাটা দেখায় থাকে, দর্শন হয়ে উঠে না।

কাকাও আমিরের সাথে একমত। বললেন, মেয়ের বাবা মায়ের সাথে আমাদের রাজি হওয়ার কথাটা জানিয়ে দিই। 

মেয়েপক্ষ ছেলেপক্ষের রাজি হওয়ার বিষয় জানলো। মেয়ের পিসি এসে বঙ্কিমের বাবা সম্বন্ধে জানতে চাইলেন। বঙ্কিমের লেখাপড়া সম্বন্ধে জানতে চাইলেন। বঙ্কিমের ব্যবসায় কি, কিভাবে উন্নতি করলো তা জানতে চাইলেন। বঙ্কিম উত্তর দিতে কম আগ্রহ দেখালো। এমন একটা ভাব সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই। মেয়ের পিসি সবার সামনে বলে ফেললেন, ছেলের ভেতর উগ্রতা আছে। ঘাড়তেড়া অনেক। অবাধ্যও। ব্যবহারে অহমিকা, দাম্ভিকতা বেশ।

বঙ্কিম অপ্রস্তুত ছিলো এমন কথা শুনবে। সে নিজেকে যোগ্য ভাবে, তাই কারো তীর্যক কথা সহ্য করতে পারে না। বললো, ছোট থেকে বড় হয়েছি সংগ্রাম করে। এমন তীর্যক কথা শোনার জন্য নয়। 

পিসি বললেন, গরীব থেকে ধনী হলে মানুষ ছোটই থাকে। তোমার অসভ্য আচরণ তার উজ্জ্বল প্রমাণ। পকেটের দীনতা কাটলেও মনের দীনতা কাটে না। কোন ঘরে বিয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছো? শিক্ষা থাকলে সাহস পেতে না। অশিক্ষিত, মূর্খ; টাকা রোজগার করেছো বলেই মর্যাদাবান? হীন মানসিকতা ধারণ করো, আবার এসেছো এই বাড়ি বিয়ের উদ্দেশ্যে? আমাদের বাড়ি মাসিক বেতনে রান্নার চাকরি করে যে তারও তোমার চেয়ে অনেক টাকা। মূর্খ!

বঙ্কিম নানা কিছু বলতে চাচ্ছিলো। আশেপাশে কয়েকজনের লাঠি হাতে দেখে থমকে গেলেন। আমির বঙ্কিমের হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলো। বাকিরাও পিছন পিছন দ্রুত ফিরলেন। বঙ্কিম ক্ষুব্ধ খুব, এমন আচরণ পাবে যা তার কাছে আশাতীত ছিলো। আমির বললো, স্তর পরিবর্তন করতে নেই। নিচু, মধ্যম, উঁচু স্তরের কথা এমনিতেই আসেনি। নিজের স্তর নিজেকেই মাপতে হয়। নিজের স্তর মাপতে ভুল হলে এমন আচরণই জোটে।

বঙ্কিম বললো, শক্তি দেখিয়ে তাড়িয়ে দিলো! শক্তি আছে বলে এভাবে অসম্মান করবে? গৃহের কুকুরকেও তো কেউ এভাবে তাড়ায় না! তবে আমার মাত্রাতিরিক্ত আশা করা ঠিক হইনি। নিজের ওজন নিজেকেই মাপতে হয়। নিজের ওজন না মেপে চাঁদ ধরতে গেলে হাতে ফোসকায় পড়ে। আমার জন্য মামা, কাকা আপনারা; প্রদীপ, আমির বন্ধু তোরা অপমানিত হলি।

প্রদীপ মনে মনে বলতে থাকলো, বঙ্কিম বন্ধু, তুমি নিজেকে আগে চেনো, তুমি নিজেকে যা ভাবো তুমি তা নও। তোমার গণ্ডিতে তুমি সেরা, তোমার গণ্ডির বাইরে তুমি নগণ্য, কত নগণ্য তা তুমি নিজেও জানো না।

এরপর বঙ্কিম দীর্ঘদিন বিয়ের নাম মুখে আনেনি। বয়স থেমে নেই। নিজের প্রয়োজন যতটা না, সমাজের মুখ বন্ধ করাটা তারচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিয়েটা তাই করা জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রদীপকে ডাকলে কাজের অজুহাত দেখিয়ে সে যেতে রাজি হলো না। আমিরও যেতে চাইলো না। স্বভাবে দোষ আছে যাদের তাদের সাথে মানুষ বেশি মিশতে চায় না। নাও বলতে পারে না, তাই নানা অজুহাত দেখিয়ে নিজেদেরকে রক্ষা করে। দুই চারজন সম্মানিত মানুষ সাথে না থাকলে মেয়েপক্ষের বাড়ি ওজন কমে যায়। দাদুকে সাথে নিলো, আরো সাথে নিলো বড় বোনের ছেলেকে। সিঁথিদের বাড়ি গেলো। কিন্তু গেট খুললো না কেউ। এই অমানবিক আচরণে বিস্মিত হয়ে গেলো বঙ্কিম। বিড়ম্বনায় পড়লো ওরা। রবিন বললো, মামা, এভাবে অপদস্ত হবো ভাবিনি। 

বঙ্কিম বললো, ঊন বাসনা থাকলে অপদস্ত হতে হয় কম। যৎ আশাতে মান হারানোর ভয় কম। প্রাপ্যতায় হাত বাড়ালে প্রাপ্ত হয়। প্রত্যাশার ডালপালা বেশি হয়ে গেলে ন্যূন ঝড়েও পতন হয়। 

দাদু বললেন, বোধোদয় হলো তবে। নিজেকে জানার মত আনন্দ আর নেই। নিজের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে গেলে অপ্রত্যাশিত আচরণ পেতে হয় না। প্রাপ্তির জন্য আহাজারি করতে হয় না, প্রাপ্য যা তাই পাবে। প্রাপ্যের অধিক পাবে না। তুমি যাকে যোগ্য ভাবছো, তার কাছে নেহাতও হতে পারো তুমি। তোমার যোগ্য যে তোমার কাছে আসবেই সে।

ব্যর্থ মনোরথে ফিরে এলো সবাই। উলোট-পালোট হতে থাকলো বঙ্কিমের ভেতর। নিজের আশার যে ঘুড়িটা উর্ধ্ব আকাশে উড়তো রশি টেনে তাকে ভূমিতে নামালো। যত সহসায় সব কিছু সে পাবে ভেবেছিলো, তত সহসায় সব মেলে না বুঝে গেছে সে। চারিদিকের মণিমুক্তার ছড়াছড়ি থেকে একটি মুক্তাকে সে যত সহজে কুড়িয়ে নেবে ভেবেছিলো বাস্তবে তত সহজ না। নিজেকে যত সে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভেবেছিলো, আসলে সে তত স্বয়ংসম্পূর্ণ না। পুকুরের মাছ নদীতে গেলে থৈ পায় না, গ্রামের মানুষ শহরে গেলে রাস্তা পায় না। হঠাৎ কিছু রোজগার করতে জানা মানুষ ধনাঢ্যদের মাঝে গেলে নেহাত হয়ে যায়। উর্ধ্বের নজর অধতে নামালো বঙ্কিম। গরীব বাবার মেয়ে ছবির কথা মনে পড়লো তার। ছবির বাবা তাকে ফেরাবেন না এই অটল বিশ্বাস তার আছে। সাথে কাউকে পেলো না, এবার সে একা গেলো। ছবির বাবাকে বললো, আপনার মেয়েকে আমার পছন্দ।

ছবির বাবা বললেন, ছবি পড়ছে, পড়বে। একটি শিক্ষিত ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দেবো। হোক সে গরীব। শিক্ষিত ছেলের মন বড় হয়।

বঙ্কিম বলে, আমার ঘরে আপনার মেয়ে সুখেই থাকবে। আমার রোজগার ভালো, নগদ টাকাও আছে!

পাশ থেকে ছবির মা বললেন, ছবির বাবা, ছেলের বয়স বেশি। 

ছবি এসে বললো, বাবা, অশিক্ষিত আর বয়স্কর সাথে বিয়ে দেবে বলেই কি এত কষ্ট করে আমায় মানুষ করছো?

বঙ্কিম আর একটি কথাও না বাড়িয়ে পিছটান নিয়ে চলে এলো। একরত্তি মেয়ের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সে বুঝে গেছে, সে কত বেশি নগণ্য। নিজের পছন্দের কথা ভাবতে ভাবতে সে ভুলেই গিয়েছিলো অন্যেরও পছন্দ আছে। সে ধরে রেখেছিলো, অন্যের মতামত তার অর্থের গরমে তার দিকেই ধাবিত হবে। প্রত্যেকের মত প্রত্যেকের মত। নিজের যেমন চাওয়া থাকে অন্যদেরও তেমন চাওয়া থাকে। 

বাইরে ঘটক এসে বঙ্কিমকে ডাকছেন। বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। গ্রাম্য বাজারের মুদি দোকানদারের মেয়ের সাথে তার বিয়ের প্রস্তাব। এ খবর শোনামাত্রই বঙ্কিম মাথার চুল টেনে ছিঁড়তে থাকলো। অতি প্রত্যাশিতদের পতন হয়, তাই বলে এত পতন!

...(সমাপ্ত)...