1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

কালাকৃষ্ণ দাস ও আকাইহাট আশ্রম

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)
 

কালাকৃষ্ণ দাস ও আকাইহাট আশ্রম

ড. কালী চরণ দাস ও প্রবীর আচার্য 


       হরিদাস দাসের গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান অনুযায়ী কালা কৃষ্ণ দাস বাবাজির জন্ম চৌদ্দশ আটাত্তর (১৪৭৮) খ্রিস্টাব্দে কুলীন ব্রাহ্মণ বংশে। কাটোয়া দাঁইহাট এর মাঝামাঝি আকাইহাট নামক স্থানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মহাপ্রভুর জন্ম ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ কালাকৃষ্ণ দাস মহাপ্রভুর চেয়ে সাত বছরের বড়। শ্রীখন্ডের নরহরি সরকার মহাপ্রভুর চেয়ে আট বছরের বড়। কালাকৃষ্ণ দাস নিত্যানন্দ শাখার বৈষ্ণব। চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে তাঁর পরিচয় দেওয়া হয়েছে--

রাঢ় দেশে জন্ম কৃষ্ণদাস দ্বিজবর।

নিত্যানন্দের তেঁহ পরমকিংকর।।

কালা কৃষ্ণদাস বড় বৈষ্ণব প্রধান। 

নিত্যানন্দ চন্দ্র বিনা নাহি জানে আন।। --চৈতন্যচরিতামৃত 


       মহাপ্রভু যখন দাক্ষিণাত্য ভ্রমণে বের হন তখন সার্বভৌম এবং নিত্যানন্দ কালাকৃষ্ণ দাসকে মহাপ্রভুর সঙ্গে পাঠিয়ে ছিলেন তাঁর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। 

কৃষ্ণদাস নামে এই সরল ব্রাহ্মণ। 

ইহা সঙ্গে করি লহ ধর নিবেদন।। --চৈতন্যচরিতামৃত। 

        দাক্ষিণাত্যের মল্লার দেশের বেতাপানিতে  শ্রীরঘুনাথজিকে দর্শন করে সে রাত্রি মহাপ্রভু ওখানেই থেকে যান। সেখানে ভট্টথারী নামে বামাচারী বৈষ্ণবের দল কৃষ্ণদাসকে ভুলিয়ে নিয়ে গেলেন তাঁদের আড্ডায়। 

স্ত্রীধন দেখাঞা তারে লোভ জন্মাইল।

আর্য সরল বিপ্রের বুদ্ধিনাশ কৈল।।  ---চৈতন্যচরিতামৃত 

        সকালে মহাপ্রভু সব জানতে পেরে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে গেলেন। বামাচারী বৈষ্ণবের দল মারমার করে মহাপ্রভুকে তেড়ে এলেন। কিন্তু মহাপ্রভুর তেজোদ্দীপ্ত মূর্তি দেখে তাঁরা ভয়ে পলায়ন বিদ্যা চমৎকার করলেন। মহাপ্রভু কৃষ্ণদাসের চুলের মুঠি ধরে তাঁকে ফিরিয়ে আনলেন। পয়োস্বিনী নদীতে স্নান করিয়ে তাঁকে শুদ্ধ করলেন। নীলাচলে ফেরার পর তিনি কালাকৃষ্ণ দাসের কীর্তি সকলকে শোনালেন। মহাপ্রভু কৃষ্ণদাসের প্রতি কঠোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। 

এবে আমি ইঁহা আনি করিলাম বিদায়।

যাঁহা ইচ্ছা যাহ আমা সনে নাহি আর পায়।। --চৈতন্যচরিতামৃত 

         কৃষ্ণদাস মহাপ্রভুর পা ধরে অনেক কান্নাকাটি করতে শুরু করলেন। মহাপ্রভু করুণায় বিগলিত হয়ে গেলেন। তিনি  কৃষ্ণদাসকে পাঠালেন নবদ্বীপে সংবাদ প্রেরণ করতে। শচীদেবী এবং বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীকে জানাতে যে তিনি দাক্ষিণাত্য ভ্রমণ সেরে নীলাচলে ফিরে এসেছেন। কালাকৃষ্ণ দাস নবদ্বীপে সংবাদ দেওয়ার পর আকাইহাটে ফিরে আসেন। একটি কুটির নির্মাণ করে মৃন্ময় রাধাবল্লব মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে সাধন-ভজনে মন দেন। পরবর্তীকালে তিনি বৃন্দাবন থেকে রাধাগোবিন্দ মূর্তি এনে মৃন্ময় মূর্তির পরিবর্তে তা প্রতিষ্ঠা করেন। 

         শ্রীখন্ডের নরহরি সরকার ঠাকুর এবং মুকুন্দ সরকার ঠাকুর দুই ভাই ছিলেন মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ পার্ষদ। কোনও এক সময় নিত্যানন্দ প্রভু এবং নরহরি সরকার শ্রীখন্ডের বড়ডাঙ্গায় প্রেমাবশে নৃত‍্য করছিলেন। তখন খোল বাদকের অভাব পড়ায় নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর নূপুর খুলে কালা কৃষ্ণ দাসের কাছে অভিজ্ঞান স্বরূপ প্রেরণ করেন। ওই নূপুর পেয়ে কালা কৃষ্ণ দাস খোল বাজানোর জন্য বড়ডাঙ্গায় উপস্থিত হন। 

আকাই হাটেতে ছিল কৃষ্ণদাস ঠাকুর। 

ঘরেতে বসিয়া পাইল প্রভুর নূপুর।। --চৈতন্যচরিতামৃত 

         মতান্তরে কথিত আছে বড়ডাঙ্গায় নৃত‍্য করছিলেন  মহাপ্রভুর দ্বিতীয় কলেবর নামে খ্যাত শ্রীখন্ডের মুকুন্দ সরকারের পুত্র শ্রীরঘুনন্দন এবং তার সঙ্গে ছিলেন অভিরাম গোস্বামী নামে এক তেজস্বী বৈষ্ণব। নৃত‍্যকালে রঘুনন্দনের  নূপুর তাঁর পা থেকে ছিটকে এসে পড়ে আকাইহাটে কালাকৃষ্ণ দাসের কুটিরের পাশে। সেই নূপুরের ঘায়ে যে কুণ্ড তৈরি হয় সেটি নাকি নূপুরকুণ্ড। সেই নূপুর কুণ্ড ছোট্ট একটি পুষ্করিণীর ন‍্যায় আশ্রমে বিরাজ করছে। কথিত আছে মহাপ্রভুর চর্বিত তাম্বুল প্রসাদ মুকুন্দের স্ত্রী গ্রহণ করেন এবং তাঁর গর্ভসঞ্চার হয়। সেই গর্ভেই জন্ম হয় রঘুনন্দনের। তাই রঘুনন্দন কে মহাপ্রভুর দ্বিতীয় কলেবর বলা হয়। 

         মতান্তরে শ্রী মহাপ্রভু স্বয়ং বড়ডাঙ্গায় নৃত্য করছিলেন বলে কথিত আছে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নরহরি সরকার ঠাকুর। তবে নীলাচলে চলে যাওয়ার পর মহাপ্রভুর ফিরে এসে বড়ডাঙ্গায় নিত্য করার কথাটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। 

         ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থ থেকে জানা যায় ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে খেতুরী  মহোৎসবে যোগ দিতে যাওয়ার পথে নিত্যানন্দ ঘরনী জাহ্নবা দেবী কাটোয়া আসেন। তিনি আকাইহাটে কালাকৃষ্ণ দাসের আশ্রমে আতিথ্য গ্রহণ করে রাত্রিবাস করেন। তিনি  কালাকৃষ্ণ দাসের আশ্রমে একটি মাধবীলতা রোপণ করেন। বর্তমানে সেই মাধবীলতা মাধবীকুঞ্জ নামে আশ্রমের ভিতর মন্দিরের পাশে  বিরাজমান। 

         দীনেশচন্দ্র সেনের বৃহৎ বঙ্গের ইতিহাস থেকে জানা যায় খেতুরীর মহোৎসব হয় ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে। হিসেব অনুযায়ী কালা কৃষ্ণ দাস এর বয়স তখন (১৫৮২–১৪৭৮) = ১০৪ বছর। অর্থাৎ জাহ্নবা দেবী যখন আকাইহাট আসেন, সম্ভবত তখন কালা কৃষ্ণ দাস জীবিত ছিলেন না। 

        কৃষ্ণ দাস ছিলেন মহাপ্রভুর দক্ষিণের খোলবাদক। হরিদাস দাসের গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধানে কৃষ্ণদাসকে দ্বাদশ গোপালের অন্যতম বলা হয়েছে। সেসময় প্রতিবছর বাংলা থেকে বৈষ্ণব ভক্তগণ রথযাত্রার সময় দলবেঁধে নীলাচলে মহাপ্রভু কাছে যেতেন। তাদের সঙ্গে কৃষ্ণদাসও যেতেন। বলা হয় এই কৃষ্ণদাসই মহাপ্রভুর দক্ষিণ ভারত ভ্রমণসঙ্গী এবং দক্ষিণের খোল বাদক। অর্থাৎ যিনি মহাপ্রভুর দক্ষিণের খোলবাদক ছিলেন, তিনিই রঘুনন্দনের সঙ্গেও পরবর্তীকালে বড়ডাঙ্গায় খোল বাজাতেন। তিনিই আবার মহাপ্রভুকে স্নান করাতেন।

ঘট ভরি মহাপ্রভুর অভিষেক কৈল। 

তাঁর অভিষেকে প্রভু মহাতৃপ্ত হৈল।। 

        সেসময় করুই গ্রামটি খুব সম্পন্ন গ্রাম ছিল এবং তার রাজা ছিলেন দেববর্মণ। রাজা দেববর্মণ কালা কৃষ্ণ দাসের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি আকাইহাটের জঙ্গলময় পরিবেশ থেকে তাঁর গুরুদেব এবং গুরুদেবের কুলদেবতা রাধাগোবিন্দ বিগ্রহকে সরিয়ে নিয়ে যান করুইগ্রামে। সেখানে ভূ-সম্পত্তি দান করে গুরুদেবকে স্থাপন করেন এবং রাধাগোবিন্দ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। তাই করুই গ্রামের মাঝে জোড়া শিব মন্দিরের সামনে কালা কৃষ্ণ দাসের পাটবাড়ি ও রাধা গোবিন্দ মন্দির আছে। সেখানে কালা কৃষ্ণ দাস প্রতিষ্ঠিত প্রায় দু ফুট উঁচু কালো পাথরের কৃষ্ণমূর্তি এবং অষ্টধাতুর রাধারানী সেবা পূজা পান। হরিদাস দাসের গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধানে আকাই হাটের বিগ্রহ স্থানান্তরকরণের সমর্থন আছে। এমনকি সেখানে মহাপ্রভুর নূপুরের অবস্থানের কথাও উল্লেখ আছে। 

        আকাই হাটের শূন‍্য মন্দিরে পরবর্তীকালে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ নতুন করে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন মাধাইতলার নিতাইরমণ দাস বাবাজি। ওই সময় আকাইহাট পাটবাড়ি সংস্কারের উদ্দেশ্যে অর্থ সংগ্রহের জন্য নিতাই রমন দাস বাবাজি একটি ছাপানো প্রচারপত্র বিলি করেন। করুইগ্রামের রাধাগোবিন্দের বর্তমান সেবাইতরা নিজেদেরকে কালা কৃষ্ণ দাস এর উত্তরসূরি বা বংশধর বলে দাবি করেন। অর্থাৎ কৃষ্ণদাস পরবর্তীকালে গার্হস্থ্য আশ্রমে প্রবেশ করেছিলেন। সেবাইতদের অন‍্যতম নন্দদুলাল ঠাকুর দাবি করেন তথাকথিত সেই নুপুর তাঁদের মন্দিরে গোপনে গচ্ছিত আছে। তাঁরা সেই নুপুরের নিত্য সেবাও নাকি করেন। করুইয়ের সেবাইতরা সেই নূপুরের একটি ছবিও আমাকে দিয়েছিলেন। দীপ্রকলম পত্রিকার কালিদাস রায় সংখ্যায় সেই নূপুরের ছবি ছাপা হয়েছিল।

      আকাইহাট পাটবাড়িতে মাধবী কুঞ্জের পাশেই কালাকৃষ্ণ দাসের সমাধি আছে। শিব চতুর্দশীর দুইদিন আগে কৃষ্ণা দ্বাদশীতে কালা কৃষ্ণ দাসের তিরোধান  উপলক্ষে করুইয়ের আশ্রমে বাৎসরিক উৎসব ও মালসাভোগ হয়। আবার আকাইহাটের পাট বাড়িতেও ওই একই দিনে তিরোধান উৎসব পালিত হয়। অর্থাৎ কালা কৃষ্ণ দাসের তিরোধানের তিথিটা জানা গেলেও সালটা কিন্তু জানা যায় না। 

        কালা কৃষ্ণ দাস সম্পর্কে আরেকটি মতানৈক্য এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে। মহাপ্রভু তাঁকে ত্যাগ করলে তিনি চলে যান পূর্ববঙ্গের পাবনা জেলার সোনাতলি গ্রামে। সেখানে একটি আশ্রম তৈরি করেন এবং বিয়ে করে সংসার ধর্ম পালন করেন। গৌরাঙ্গ দাস নামে এক পুত্রও জন্মায়। সোনাতলি গ্রামে অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথিতে তাঁর তিরোধান উৎসব পালিত হয়।

        আবার গৌরপদতরঙ্গিনী নামক গবেষণাধর্মী বৈষ্ণব গ্রন্থে সমসাময়িককালে ঊনিশ জন কৃষ্ণদাসের কথা বলা হয়েছে। তাঁরা সকলেই তেজস্বী বৈষ্ণব ছিলেন। ভক্তিরত্নাকর, গৌরপদতরঙ্গিনী, প্রেমবিলাস, অনুরাগবল্লি, চৈতন্যচরিতামৃত, গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান প্রভৃতি প্রাচীন বৈষ্ণব গ্রন্থগুলিতে কালা কৃষ্ণ দাস সম্পর্কে বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে। সেগুলি থেকে তথ্য চয়ন করে কালা কৃষ্ণ দাসের একটি মোটামুটি প্রামাণ্য জীবনী এখানে উপস্থাপিত করা হল। 

তথ্যসূত্র : 1. গৌর গৌরবাড়ি গৌরপাড়া : ড. কালী চরণ দাস।  2. দীপ্রকলম : কালিদাস রায় সংখ্যা : সম্পাদক, প্রবীর আচার্য।  3. পুরালোক বার্তা : সম্পাদক, সোমনাথ রায় :  2011-12 সংখ্যা।  4. বৃহৎ বঙ্গের ইতিহাস :  ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন।  5.উল্লিখিত বিভিন্ন প্রাচীন বৈষ্ণব গ্রন্থ সকল। 


No comments:

Post a Comment