1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Saturday, October 10, 2026

আমাদের আসল ব‍্যাখ‍্যা

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

আমাদের আসল ব‍্যাখ‍্যা

মৃণাল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়

আমাদের শরীরটা একটা মেশিন। এবং এটা যেকোনো প্রানীর ক্ষেত্রেই সত‍্যি। আর এই মেশিনটাকে চালনা করে একটা শক্তি, যাকে আমরা আত্মা বলি যেটা বিশ্ব আত্মার একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ। এবং এই শক্তিই বিশ্ব সৃষ্টির শুরু থেকে গোটা বিশ্ব জুড়ে বিদ‍্যমান।

আমাদের এই বিশ্বের সমস্ত জাগতিক বস্তুরই ক্রম বিকাশ (বিবর্তন)আছে। একটা মধ‍্যাবস্থা এবং একটি সুনির্দিষ্ট লয় বা শেষ আছে যদি না সেই বস্তুটি অন‍্য কোনও বস্তু বা শক্তির দ্বারা আক্রান্ত বা বিভ্রান্ত না হয়। ঈশ্বর যদি এই বিশ্ব তৈরি করতেন তবে সবকিছু এত সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ম মেনে ঘটত না। প্রথমে হাইড্রোজেন, তারপরে হিলিয়াম,লিথিয়াম, বোরণ,..... এইভাবে বস্তুর ক্রম বিবর্তন ; কিংবা প্রথমে এককোষী, তারপরে দ্বিকোষী, বহুকোষী-এইভাবে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়মে অবশ‍্যই একটা সুশৃঙ্খল গাণিতিক পরিপূর্ণতা প্রাপ্তি ঘটত না।

কারণ ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। তাই তার কাজের মধ‍্যে অহংকার বশত বা নিছক খেলার ছলে তৈরি এই বিশ্ব পরিচালনার নিমিত্তে সৃষ্ট নিয়ম বা শৃঙ্খলায় ব‍্যতিক্রম থাকতে বাধ‍্য। ঈশ্বরের কাজে যদি বিশৃঙ্খলা না থাকতো তবে তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের জীবনেও এত বেনিয়ম থাকতো না। কারন মানুষতো তারই সৃষ্টি। তাহলে যিনি নিজে চরমভাবে সুশৃঙ্খল তার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব কখনোই এত ব‍্যতিক্রমী হতে পারেনা।এবং সবথেকে বড় সত‍্য যে সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র পৃথিবীতেই প্রানের অস্তিত্ব থাকতো না।

এটা একটা নিখুঁত বিজ্ঞান বা গণিত। এটা এমন একটা বিরল ঘটনা বা এমন একটা সংখ্যা, যেটা ঘটার সম্ভাবনা হয়তো কয়েক কোটিতে একটা কিংবা সমস্ত বিশ্ব জুড়েই কেবলমাত্র একটাই ব‍্যতিক্রমী বা বিরল বৈচিত্র হচ্ছে আমাদের এই পৃথিবী। এবং এই বৈচিত্র্যের মধ‍্যে লুকিয়ে আছে এমন একটি ধ্রুবক সংখ‍্যা যেটির সাথে পৃথিবী ও সূর্যের মধ‍্যবর্তী দূরত্ব, এদের ভর ও আয়তন, এদের পারস্পরিক আহ্নিক ও বার্ষিক গতি এবং পৃথিবীর ক্ষেত্রে তার সূর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকারে পরিভ্রমণ কালে কক্ষতলের সাথে তার নিজস্ব অক্ষের মোটামুটি ২৩.৫° হেলে থাকা- এই ধরনের কিছু গাণিতিক হিসাব গুলির মধ‍্যে কোনো সূত্র নিশ্চয়ই আছে। এবং তার মানও কোনো একটি ধ্রুবক সংখ‍্যা ঠিক যেমন পাই-এর মান ২২/7 ।

আজকে আমরা যাদেরকে জড় পদার্থ বলছি তারা কিন্তু কোনোভাবেই জড় পদার্থ নয়। কারণ একটু বাস্তব বুদ্ধি দিয়ে বিচার বিবেচনা করলেই এটাই স্বচ্ছ জলের মতো পরিস্কার হয়ে যায় যে, প্রত‍্যেকটি বস্তুই পরমাণু দিয়ে তৈরি। এবং আমরা জানি যে পরমাণুর গঠনে নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেকট্রনগুলো নির্দিষ্ট সংখ্যায় নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। এবং নিউক্লিয়াসের মধ্যেও প্রোটন ও নিউট্রনগুলো ক্রমাগত নিজেদের মধ‍্যে বিক্রিয়ার দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে প্রোটন থেকে নিউট্রন বা নিউট্রন থেকে প্রোটনে পরিবর্তিত হয় আজকে যেকোনো প্রানীর শরীর থেকে  আত্মা (energy) বের হয়ে গেলে তাকে মৃত বা জড় বলি কারণ সেখানে স্বইচ্ছায় কোনো নড়াচড়া বা ইন্দ্রিয় জনিত অভিব্যক্তি থাকে না। তাহলে গতি থাকাটা যদি প্রাণ বা জীবনের লক্ষ‍্যন বা বহিঃপ্রকাশ হয় তবে আপাতদৃষ্টিতে যারা জড় তারা তো আদপে জড় নয় বরং উল্টে প্রাণের আধার। এবং তাহলে শক্তির উপস্থিতি বা গতিময়তা এবং ক্রম বিবর্তন থাকার অর্থই হলো প্রাণের অস্তিত্ব এবং সেক্ষেত্রে এই বিশ্বের সমস্ত মহাজাগতিক বস্তুই চলমান প্রাণ যতক্ষণ না তাদের অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন বা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

সূর্য একটি নক্ষত্র এবং সেটির অভ‍্যন্তরে সদা সর্বদা যে পারমাণবিক সংযুক্তিকরণ বিক্রিয়া চলে অর্থাৎ চারটি করে হাইড্রোজেন পরমাণু নিজেদের মধ‍্যে মিলিত হয়ে একটি করে হিলিয়াম পরমাণু এবং সঙ্গে বিপুল পরিমাণে আলো ও তাপ শক্তি উৎপন্ন হয়, তারই প্রত‍্যক্ষ উপস্থিতি পৃথিবীর বুকে প্রাণ সৃষ্টি এবং প্রাণের ক্রম বিকাশের পেছনে একমাত্র চালক শক্তি। আমাদের পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল প্রত‍্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সূর্য নামক নক্ষত্রের অভ‍্যন্তরে পারমাণবিক সংযুক্তিকরণ বিক্রিয়ার দ্বারা উৎপন্ন তাপ এবং আলোর উপর নির্ভরশীল। তাহলে এই তাপ বা আলোক শক্তি যার অবর্তমানে জীবনের গতিময়তা বা প্রাণের অস্তিত্বই সম্ভব নয় সেই শক্তি নিজে কি করে প্রাণহীন হতে পারে? তাহলে নিরাকার যে অসীম শক্তি বা ব্রহ্ম, যিনি আমাদের কল্পনায় ঈশ্বর এবং এই বিপুল অসীম অনন্ত মহাবিশ্বের স্রষ্ঠা, শাসক এবং পালক- তিনি কি করে চেতনা সমৃদ্ধ হতে পারেন। তাঁর উপস্থিতি প্রাণ সৃষ্টির কারণ অথচ তিনি শুধুই একপ্রকার শক্তি ছাড়া আর কিছু নন, সেটা কিভাবে সম্ভবপর হতে পারে ? তাহলে হয় তিনিও এক প্রাণময় স্বত্ত্বা বা ঈশ্বর রূপে আমরা যা কিছু ভাবছি বা বিশ্বাস করি তার আদপেই কোনও অস্তিত্ব নেই। তাহলে এই বিশ্বের সর্বময় কর্তার ধারণা অন‍্য কোনও অস্তিত্বের ব‍্যাখ‍্যা দ্বারাই সম্ভব।

তাহলে ঈশ্বর কি শুধুমাত্র একটা জোর করে জগদ্দল পাথরের মতো চাপিয়ে দেওয়া বুজরুকি? তাহলে এই বিশ্ব পরিচালনার দায়িত্বে নেপথ‍্যে কার উপস্থিতির ইঙ্গিত বহন করছে? তাহলে সবটাই কি নিছকই মনের ভ্রম বা মায়া নাকি বিজ্ঞান নিজেই আসলে ঈশ্বর ? কারণ আমরা জানি যে বিজ্ঞানের নিয়মে পাত্র বিশেষে কোনও পার্থক্য বা বিভেদ নেই। বিজ্ঞান সর্বদাই প্রতিষ্ঠিত সত‍্যের উপরে নির্ভরশীল। এবং এই নিয়ম বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে অপরিবর্তনীয়। আবার বিজ্ঞানের মূল চারটি শাখা অর্থাৎ পদার্থবিদ‍্যা, জীববিদ‍্যা, রসায়ন এবং গণিতের মধ‍্যে প্রথম তিনটি বাহ‍্যিক বিভিন্ন প্রভাব কারণের উপর নির্ভরশীল, যেমন তাপ, আলো, চৌম্বকত্ব, পারিপার্শিক চাপ বা অনুঘটকের উপরে অনেকটাই নির্ভরশীল। অর্থাৎ পুরোপুরি স্বাধীন নয়। যেখানে একমাত্র ব‍্যতিক্রম গণিত। যার উপরে বাহ‍্যিক কোনো কার্যকারণ বিন্দুমাত্র প্রভাব বিস্তার করতে পারেনা। অর্থাৎ একমাত্র গণিতই স্বাধীন স্বত্ত্বা বিশিষ্ট সেই উপস্থিতি যা এককভাবে নিজের অস্তিত্বকে জাহির করতে পারে এবং এই বিশ্বের প্রতিটি প্রাকৃতিক বা মহাজাগতিক ঘটনাই নির্দিষ্ট গাণিতিক সংখ‍্যার দ্বারাই স্থিরীকৃত। যার একচুল বা ডেসিমাল ব‍্যতিক্রম চোখের পলকে সবকিছু ধ্বংস বা ওলট পালট করে দিতে যথেষ্ট। পাই-এর (π) মান সামান‍্যতম পরিবর্তন করে দেখুন তো সবকিছু আগের মতই মেলাতে পারেন কিনা। জল তৈরি করতে গেলে শুধুমাত্র দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু এবং একটি অক্সিজেন পরমাণু প্রয়োজন। অর্থাৎ সর্বদা সবক্ষেত্রেই H2 : O2 = 2:1। এটার একচুল এদিক ওদিক হলেই সেটা হাজার চেষ্টাতেও আর যাই হোক কিন্তু জল কোনমতেই উৎপন্ন হবেনা। ঠিক যেভাবে এই পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তেই মানব সন্তানের প্রথম জন্ম লগ্নে ভ্রূণ যখন মায়ের জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত হয় তখন সেই কোষের নিউক্লিয়াসে মাতা ও পিতার তরফে 23টি করে মোট 46টি ক্রোমোজোমই থাকতে হবে। এবং অন‍্যান‍্য প্রজাতির ক্ষেত্রেও তার সংখ‍্যা নির্দিষ্ট কিন্তু একে অপরের থেকে অতি অবশ্যই আলাদা। একটা নক্ষত্র তার মধ‍্যে উপস্থিত পদার্থ বা হাইড্রোজেন পরমাণুর নিরিখে কতটা হালকা বা ভারি তার উপরে নির্ভর করে তার জীবন চক্র। অর্থাৎ তার অন্তিম পরিণতি কি হবে। শ্বেত বামন, নাকি নিউট্রন নক্ষত্র নাকি কৃষ্ণ গহ্বর।

নিজের স্বত্ত্বা দিয়ে, নিজের চেতনা দিয়ে, নিজের বিচার বুদ্ধি দিয়ে সবকিছুর চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। শুধু অন‍্যের শিখিয়ে দেওয়া বুলিকে প্রাধান্য দিয়ে নাস্তিক কিংবা আস্তিক, এই তর্কে প্রবেশ করে নিজেকে বোকা বানানো বা নিজেকে ঠকানো যাবেনা।

বিশ্বাস তাকেই করতে হয় যাকে সমস্ত পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায়। একজন মানুষ ততক্ষণই বেঁচে আছে যতক্ষণ তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অন্তত একটি সক্রিয় আছে। এবং যে কোনো প্রাণী বা বস্তুর ক্ষেত্রেই সেটা সত‍্যি। যখন থাকে না তখন সেই প্রাণী বা বস্তুটি  আমাদের কাছে মৃত বা অস্তিত্বহীন। ঈশ্বর যদি সত‍্যি হতেন তাহলে তাকেও পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়েই অনুভব করতে পারতাম। তাকে দেখতে পেতাম, তার সাথে কথা বলতে পারতাম, তাকে ছুঁতে পারতাম। তার জন্যে মন্দির, মসজিদ বা গির্জায় গিয়ে দান চড়াতে হতোনা কিংবা নির্জনে গুহায় বসে ধ‍্যান করতে হতোনা। কারণ তিনি তো সর্বত্র সর্বক্ষণই বিদ‍্যমান। দান পেলে যিনি সন্তুষ্ট হন তিনি আর যেই হন না কেন ঈশ্বর তো কোনভাবেই নন।

এই বিশ্বের সব কিছুরই শুরু, বিকাশ এবং শেষ আছে। এই নিয়ম জগতের সবকিছুর জন‍্যেই চিরসত‍্যি। আস্তিকদের মতে ঈশ্বরই একমাএ ব‍্যতিক্রম। আর নাস্তিকদের মতেই শুধু নয়, আস্তিকরাও নিশ্চয়ই এটা মানবেন যে বিজ্ঞানের নিয়মেরও কোনো শুরু বা শেষ নেই। এটা আদি এবং অকৃত্রিম। আমাদের জানা বিজ্ঞান, এখনো পর্যন্ত অবশ‍্যই সম্পূর্ণ নয়। তার নিত্য আরো আরো বিকাশের প্রয়োজন আছে এবং সেটা যে ক্রমাগত আরো সমৃদ্ধও হচ্ছে সেই বিষয়ে নিশ্চয়ই কারারই দ্বিমত নেই।

আজকে রাতের অন্ধকারে একটা ঘর ততক্ষণই অন্ধকার বা আমাদের চেতনায় অদৃশ্য যতক্ষণ না সেখানে আলো জ্বালানো হচ্ছে। আমাদের মনটাও একইভাবে ততক্ষণই অন্ধকার থাকে যতক্ষণ না প্রকৃত জ্ঞানের আলো সেখানে প্রবেশ করে বা তার চেতনায় প্রকৃত জ্ঞানের আলোর প্রজ্বলন ঘটে। আজকে আমাদের সূর্য ততক্ষণই তাপ ও আলো দেবে যতক্ষণ তার মধ‍্যে পারমাণবিক সংযুক্তিকরণ বিক্রিয়া চলবে। এটা ঈশ্বরের কেরামতি নয়, এটা বিজ্ঞান। উদ্ভিদের শরীরে ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক সমৃদ্ধ সবুজ পাতায় যে খাদ‍্য তৈরি হয় বা আমাদের প্রাণীদের শরীরে খাদ‍্যগ্রহন থেকে পাচন এবং নিষ্ক্রমণ -সবটাই বিজ্ঞান। বানর প্রজাতির ক্রম বিবর্তনের মধ‍্যে দিয়ে আধুনিক মানুষের উৎপত্তি, কিংবা পাথরে পাথর ঘষে প্রাগৈতিহাসিক যুগে মনুষ‍্য কর্তৃক আগুন আবিষ্কার একটা যুগান্তকারী বিজ্ঞানের অগ্রগতি মাত্র, কোনো ঐশ্বরিক অবদানে প্রাপ্ত দয়া বা দান নয়। ঈশ্বর জমি দিয়েছেন, কিন্তু সেই জমিতে ফসল ফলানোর বিদ‍্যাটা বিজ্ঞানের থেকেই ধার করতে হয়েছে ।ঈশ্বর হাতে ধরে এসে শিখিয়ে দিয়ে যাননি। আজকে কোনো বাঙালির সন্তান জন্মানোর পরেই যদি লন্ডনের কোনো ইংরেজ বাবা-মা'র কাছে মানুষ হতো তবে সে বাংলায় নয় ইংরেজিতেই প্রথম কথা বলা শিখতো। যেটাকে বলে পরিবেশের প্রভাব।

বিজ্ঞানকে জানার জন‍্য বিজ্ঞানের ছাত্র  হওয়াটা জরুরি নয়। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যা কিছু ঘটছে তাকে সঠিক বিচার, বুদ্ধি ও চেতনা দিয়ে খোলা মনে বিশ্লেষণ করতে হবে। আস্তিক এবং নাস্তিক এই দুই মেরুতে ভাগ করে আলাদা করে দিয়ে দায় বা দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে চলবে না। যুক্তি নির্ভর কারণ প্রদর্শন করতে হবে। বিজ্ঞান যুক্তিতে বিশ্বাসী, ভক্তিতে নয়। শুধুমাত্র অন্ধ বিশ্বাস কিংবা ভক্তি দিয়ে সব কিছুকে বিশ্লেষণ করা যায়না। গা জোয়ারি করা যায় মাত্র কিংবা মেকি ধর্মান্ধদের মতো ভয় দেখিয়ে আখের গোছানো যায় হয়তো।

প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক যুগে অনুন্নত ক্রম বিবর্তিত মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঠিক ব‍্যাখ‍্যায় অসমর্থ হয়ে তার থেকে বাঁচবার উপায় না পেয়ে ভয়কে জয় করার জন‍্যে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো বা শক্তিগুলোকেই ঈশ্বর আকারে রূপদান করেছে। এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরণের পুজাপাঠ, মন্ত্র উচ্চারণ ও যাগ যঞ্জের মাধ‍্যমে তাকে তুষ্ট করতে চেয়েছে এবং লিপিবদ্ধ করে ধর্মগ্রন্থ আকারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত করেছে। আর আমরা আজও সেই ভয় বা ভীতি থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারিনি। আর তাই ঈশ্বরের গোলামী করাটা আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসে দাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব তার বেঁধে দেওয়া বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট নিয়মেই দিব্যি এগিয়ে যাচ্ছে একে অপরের কাছ থেকে দূরে আরও দূরে। অথচ আমরা সবকিছু বুঝেও এই গোলামিটাকেই মেনে নিয়েছি। হাবভাবটা এমনই, যেন নতুন করে ভেবে কি হবে অহেতুক সময় নষ্ট করে? তার থেকে অদৃষ্টের নামে সবকিছু শপে দিয়ে একটাই তো জন্ম, ঠিক কাটিয়ে দেওয়া যাবে। পরের জন্মে গরু হবো নাকি ছাগল, সেটাতো আর জানতে যাচ্ছি না ! আর তাছাড়া ঈশ্বর রূপী কোনও এক কাল্পনিক অস্তিত্বের উপর সবকিছুর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে অনেকটাই নিশ্চিন্তে থাকা যায়। ছেলের চাকরি বা মেয়ের বিয়ে? আরে, সবার ছেলেই তো চাকরি পাচ্ছে বা সবার মেয়েরই তো দিব্বি বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তাহলে আর অহেতুক ভেবে শরীর ও মনকে কষ্ট দিয়ে লাভ কি। ঈশ্বর  তো আছেন, ঈশ্বরই ঠিক সবটা জুটিয়ে দেবেন। বন‍্যায় পাশের গ্রামটা ভেসে গেছে? বহু প্রাণ হানি হয়েছে? হবেনা? নিশ্চয়ই গতজন্মে অনেক পাপ করেছিল তাই ঈশ্বর এই জন্মে শাস্তি দিয়েছেন। নে এবার বোঝ। ঈশ্বরকে মন প্রাণ দিয়ে না ডাকার ফল। আরে আমি তো আর জ্ঞানত কোনও পাপ করিনি তাহলে অহেতুক ভেবে বা ভয় পেয়ে শোক করে লাভ কি?

পরের জন্মের কথা মাথায় আসতেই মনে পড়ে গেল যুগ পুরুষ বিশ্ব শান্তির প্রতীক ভগবান বুদ্ধের জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে লেখা জাতকের গল্পগুলোর কথা। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী আত্মা বা যন্ত্রবৎ প্রাণী শরীরের চালক শক্তি বারংবার স্থুল শরীর পরিবর্তন করে তার প্রতিটি জন্মের কর্মের মাধ্যমে তার ক্রম পরিশুদ্ধি ঘটায় বা নিজের সূক্ষ্মীকরণ ঘটায়। এবং এই সূক্ষ্মীকরণের মধ‍্য দিয়ে পার্থিব বন্ধন বা ষড় ঋপুর বন্ধন থেকে চির মুক্তিলাভের মধ‍্য দিয়ে বিশ্বজনীন আত্মা বা মহাজাগতিক শক্তির নিরন্তর স্রোতে মিশে যায় বা চিরতরে বিলীন হয়ে যায়।

এবার প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক যে তাহলে কি সমগ্র বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে কোনো একজনের একক ইচ্ছায়?? তাহলে কি ঈশ্বরের উপস্থিতিই অমোঘ সত‍্য?? তার ইচ্ছাতেই এই অসীম বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে?? তিনিই আমাদের সকলের ভাগ‍্য নিয়ন্ত্রক?? আমরা তার খেলার পুতুল বা সামগ্রী বা বায়ো রোবট?? তাহলে এই বিশ্বের সমস্ত ছোট বড় মহাজাগতিক বস্তুই যে নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ, যার থেকে বিন্দুমাত্র পদস্খলনও সম্ভব নয়, তাকেই তো আমরা বিজ্ঞান বলে মান‍্যতা দিয়ে থাকি?? 

তাহলে তো এই মহাবিশ্ব পরিচালনা করছে দুটো আলাদা অস্তিত্ব। যার একটি ঈশ্বর এবং অপরটি হলো বিজ্ঞান। ঈশ্বর প্রাণময়। অর্থাৎ তার মধ‍্যে চেতন শক্তি বতর্মান। আর তার সেই চেতন শক্তিরই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপস্থিতি প্রাণী শরীরে বতর্মান। এবং সেই শক্তি শরীরে অবস্থান করলে জীব আর না করলে জড় পদার্থ। আবার বিজ্ঞানের নিয়ম কিন্তু জড় বা জীব সবার ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোয‍্য। সেখানে কোনও পক্ষপাতিত্বের স্থান নেই। প্রাণ বলতে আমরা বুঝি স্থান পরিবর্তন ও অনুভূতিতে সাড়া দিতে সক্ষম এবং সেইসাথে সমান্তরালে বৃদ্ধি এবং ক্ষয়। পাশাপাশি বিশ্ব সতত গতিশীল হওয়ায় জড় পদার্থও প্রতি মুহূর্তেই স্থান পরিবর্তন করছে। তারও ভরের বৃদ্ধি এবং ক্ষয় আছে। এবং সেও বিজ্ঞানের নিয়মে সাড়া দেয়। তাহলে বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট নিয়মকেই যদি আমরা অনুভূতির সাথে এক এবং অনন‍্য হিসেবে ভাবতে পারি তবে জড় এবং প্রাণের মধ‍্যে বেসিক কোনও তফাৎ তো চোখে পরছে না। আমাদের শরীরের সাংগঠনিক একক কোষ। আবার কোষের মধ‍্যেও প্রধান পরিচালক হচ্ছে নিউক্লিয়াস। আবার নিউক্লিয়াসের মধ‍্যে থাকে, মানুষের ক্ষেত্রে তেইশ জোড়া ক্রোমোজোম। এখানেই শেষ নয়। এই ক্রোমোজোম গুলিও আবার ডি,এন,এ এবং  প্রোটিন দিয়ে গঠিত। ডি, এন, এ বা ডি-অক্সি-রাইবোনিউক্লিক অ‍্যাসিড, প‍্যাচালো মই আকৃতির সুতোর মতো আকার বিশিষ্ট। ডি, এন, এ হলো একটি অণু যা কোনো জীবের বিকাশ, পুনঃ উৎপাদন ও জীবিত থাকার নির্দেশাবলী দান করে। অর্থাৎ প্রাণী শরীরও জড় পদার্থের মতোই পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা পরমাণু দ্বারাই গঠিত।

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যেতেই পারে যে এই বিশ্বে জড় পদার্থ বলে আদপেই কিছু নেই। সবটাই প্রাণময় বা প্রাণ শক্তিতে ভরপুর বা চেতনা সমৃদ্ধ। আবার বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ‍্যাত E =  mc^2 সূত্র থেকে আমরা সবাই অবগত আছি যে বস্তু এবং শক্তি একে অপরের পরিপূরক। অর্থাৎ যা কিছু জড় বা পার্থিব জগতে আপাত স্থির তা আসলে শক্তি বা প্রাণ চঞ্চলতায় পরিপূর্ণ।


No comments:

Post a Comment