1 / 7
2 / 7
3 / 7
4 / 7
5 / 7
6 / 7
7 / 7

Showing posts with label মৃণাল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়. Show all posts
Showing posts with label মৃণাল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়. Show all posts

Saturday, October 10, 2026

আমাদের আসল ব‍্যাখ‍্যা

 ছবি :কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(Artificial Intelligence)

আমাদের আসল ব‍্যাখ‍্যা

মৃণাল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়

আমাদের শরীরটা একটা মেশিন। এবং এটা যেকোনো প্রানীর ক্ষেত্রেই সত‍্যি। আর এই মেশিনটাকে চালনা করে একটা শক্তি, যাকে আমরা আত্মা বলি যেটা বিশ্ব আত্মার একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ। এবং এই শক্তিই বিশ্ব সৃষ্টির শুরু থেকে গোটা বিশ্ব জুড়ে বিদ‍্যমান।

আমাদের এই বিশ্বের সমস্ত জাগতিক বস্তুরই ক্রম বিকাশ (বিবর্তন)আছে। একটা মধ‍্যাবস্থা এবং একটি সুনির্দিষ্ট লয় বা শেষ আছে যদি না সেই বস্তুটি অন‍্য কোনও বস্তু বা শক্তির দ্বারা আক্রান্ত বা বিভ্রান্ত না হয়। ঈশ্বর যদি এই বিশ্ব তৈরি করতেন তবে সবকিছু এত সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ম মেনে ঘটত না। প্রথমে হাইড্রোজেন, তারপরে হিলিয়াম,লিথিয়াম, বোরণ,..... এইভাবে বস্তুর ক্রম বিবর্তন ; কিংবা প্রথমে এককোষী, তারপরে দ্বিকোষী, বহুকোষী-এইভাবে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়মে অবশ‍্যই একটা সুশৃঙ্খল গাণিতিক পরিপূর্ণতা প্রাপ্তি ঘটত না।

কারণ ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। তাই তার কাজের মধ‍্যে অহংকার বশত বা নিছক খেলার ছলে তৈরি এই বিশ্ব পরিচালনার নিমিত্তে সৃষ্ট নিয়ম বা শৃঙ্খলায় ব‍্যতিক্রম থাকতে বাধ‍্য। ঈশ্বরের কাজে যদি বিশৃঙ্খলা না থাকতো তবে তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের জীবনেও এত বেনিয়ম থাকতো না। কারন মানুষতো তারই সৃষ্টি। তাহলে যিনি নিজে চরমভাবে সুশৃঙ্খল তার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব কখনোই এত ব‍্যতিক্রমী হতে পারেনা।এবং সবথেকে বড় সত‍্য যে সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র পৃথিবীতেই প্রানের অস্তিত্ব থাকতো না।

এটা একটা নিখুঁত বিজ্ঞান বা গণিত। এটা এমন একটা বিরল ঘটনা বা এমন একটা সংখ্যা, যেটা ঘটার সম্ভাবনা হয়তো কয়েক কোটিতে একটা কিংবা সমস্ত বিশ্ব জুড়েই কেবলমাত্র একটাই ব‍্যতিক্রমী বা বিরল বৈচিত্র হচ্ছে আমাদের এই পৃথিবী। এবং এই বৈচিত্র্যের মধ‍্যে লুকিয়ে আছে এমন একটি ধ্রুবক সংখ‍্যা যেটির সাথে পৃথিবী ও সূর্যের মধ‍্যবর্তী দূরত্ব, এদের ভর ও আয়তন, এদের পারস্পরিক আহ্নিক ও বার্ষিক গতি এবং পৃথিবীর ক্ষেত্রে তার সূর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকারে পরিভ্রমণ কালে কক্ষতলের সাথে তার নিজস্ব অক্ষের মোটামুটি ২৩.৫° হেলে থাকা- এই ধরনের কিছু গাণিতিক হিসাব গুলির মধ‍্যে কোনো সূত্র নিশ্চয়ই আছে। এবং তার মানও কোনো একটি ধ্রুবক সংখ‍্যা ঠিক যেমন পাই-এর মান ২২/7 ।

আজকে আমরা যাদেরকে জড় পদার্থ বলছি তারা কিন্তু কোনোভাবেই জড় পদার্থ নয়। কারণ একটু বাস্তব বুদ্ধি দিয়ে বিচার বিবেচনা করলেই এটাই স্বচ্ছ জলের মতো পরিস্কার হয়ে যায় যে, প্রত‍্যেকটি বস্তুই পরমাণু দিয়ে তৈরি। এবং আমরা জানি যে পরমাণুর গঠনে নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেকট্রনগুলো নির্দিষ্ট সংখ্যায় নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। এবং নিউক্লিয়াসের মধ্যেও প্রোটন ও নিউট্রনগুলো ক্রমাগত নিজেদের মধ‍্যে বিক্রিয়ার দ্বারা পরিবর্তিত হয়ে প্রোটন থেকে নিউট্রন বা নিউট্রন থেকে প্রোটনে পরিবর্তিত হয় আজকে যেকোনো প্রানীর শরীর থেকে  আত্মা (energy) বের হয়ে গেলে তাকে মৃত বা জড় বলি কারণ সেখানে স্বইচ্ছায় কোনো নড়াচড়া বা ইন্দ্রিয় জনিত অভিব্যক্তি থাকে না। তাহলে গতি থাকাটা যদি প্রাণ বা জীবনের লক্ষ‍্যন বা বহিঃপ্রকাশ হয় তবে আপাতদৃষ্টিতে যারা জড় তারা তো আদপে জড় নয় বরং উল্টে প্রাণের আধার। এবং তাহলে শক্তির উপস্থিতি বা গতিময়তা এবং ক্রম বিবর্তন থাকার অর্থই হলো প্রাণের অস্তিত্ব এবং সেক্ষেত্রে এই বিশ্বের সমস্ত মহাজাগতিক বস্তুই চলমান প্রাণ যতক্ষণ না তাদের অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন বা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

সূর্য একটি নক্ষত্র এবং সেটির অভ‍্যন্তরে সদা সর্বদা যে পারমাণবিক সংযুক্তিকরণ বিক্রিয়া চলে অর্থাৎ চারটি করে হাইড্রোজেন পরমাণু নিজেদের মধ‍্যে মিলিত হয়ে একটি করে হিলিয়াম পরমাণু এবং সঙ্গে বিপুল পরিমাণে আলো ও তাপ শক্তি উৎপন্ন হয়, তারই প্রত‍্যক্ষ উপস্থিতি পৃথিবীর বুকে প্রাণ সৃষ্টি এবং প্রাণের ক্রম বিকাশের পেছনে একমাত্র চালক শক্তি। আমাদের পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল প্রত‍্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সূর্য নামক নক্ষত্রের অভ‍্যন্তরে পারমাণবিক সংযুক্তিকরণ বিক্রিয়ার দ্বারা উৎপন্ন তাপ এবং আলোর উপর নির্ভরশীল। তাহলে এই তাপ বা আলোক শক্তি যার অবর্তমানে জীবনের গতিময়তা বা প্রাণের অস্তিত্বই সম্ভব নয় সেই শক্তি নিজে কি করে প্রাণহীন হতে পারে? তাহলে নিরাকার যে অসীম শক্তি বা ব্রহ্ম, যিনি আমাদের কল্পনায় ঈশ্বর এবং এই বিপুল অসীম অনন্ত মহাবিশ্বের স্রষ্ঠা, শাসক এবং পালক- তিনি কি করে চেতনা সমৃদ্ধ হতে পারেন। তাঁর উপস্থিতি প্রাণ সৃষ্টির কারণ অথচ তিনি শুধুই একপ্রকার শক্তি ছাড়া আর কিছু নন, সেটা কিভাবে সম্ভবপর হতে পারে ? তাহলে হয় তিনিও এক প্রাণময় স্বত্ত্বা বা ঈশ্বর রূপে আমরা যা কিছু ভাবছি বা বিশ্বাস করি তার আদপেই কোনও অস্তিত্ব নেই। তাহলে এই বিশ্বের সর্বময় কর্তার ধারণা অন‍্য কোনও অস্তিত্বের ব‍্যাখ‍্যা দ্বারাই সম্ভব।

তাহলে ঈশ্বর কি শুধুমাত্র একটা জোর করে জগদ্দল পাথরের মতো চাপিয়ে দেওয়া বুজরুকি? তাহলে এই বিশ্ব পরিচালনার দায়িত্বে নেপথ‍্যে কার উপস্থিতির ইঙ্গিত বহন করছে? তাহলে সবটাই কি নিছকই মনের ভ্রম বা মায়া নাকি বিজ্ঞান নিজেই আসলে ঈশ্বর ? কারণ আমরা জানি যে বিজ্ঞানের নিয়মে পাত্র বিশেষে কোনও পার্থক্য বা বিভেদ নেই। বিজ্ঞান সর্বদাই প্রতিষ্ঠিত সত‍্যের উপরে নির্ভরশীল। এবং এই নিয়ম বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে অপরিবর্তনীয়। আবার বিজ্ঞানের মূল চারটি শাখা অর্থাৎ পদার্থবিদ‍্যা, জীববিদ‍্যা, রসায়ন এবং গণিতের মধ‍্যে প্রথম তিনটি বাহ‍্যিক বিভিন্ন প্রভাব কারণের উপর নির্ভরশীল, যেমন তাপ, আলো, চৌম্বকত্ব, পারিপার্শিক চাপ বা অনুঘটকের উপরে অনেকটাই নির্ভরশীল। অর্থাৎ পুরোপুরি স্বাধীন নয়। যেখানে একমাত্র ব‍্যতিক্রম গণিত। যার উপরে বাহ‍্যিক কোনো কার্যকারণ বিন্দুমাত্র প্রভাব বিস্তার করতে পারেনা। অর্থাৎ একমাত্র গণিতই স্বাধীন স্বত্ত্বা বিশিষ্ট সেই উপস্থিতি যা এককভাবে নিজের অস্তিত্বকে জাহির করতে পারে এবং এই বিশ্বের প্রতিটি প্রাকৃতিক বা মহাজাগতিক ঘটনাই নির্দিষ্ট গাণিতিক সংখ‍্যার দ্বারাই স্থিরীকৃত। যার একচুল বা ডেসিমাল ব‍্যতিক্রম চোখের পলকে সবকিছু ধ্বংস বা ওলট পালট করে দিতে যথেষ্ট। পাই-এর (π) মান সামান‍্যতম পরিবর্তন করে দেখুন তো সবকিছু আগের মতই মেলাতে পারেন কিনা। জল তৈরি করতে গেলে শুধুমাত্র দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু এবং একটি অক্সিজেন পরমাণু প্রয়োজন। অর্থাৎ সর্বদা সবক্ষেত্রেই H2 : O2 = 2:1। এটার একচুল এদিক ওদিক হলেই সেটা হাজার চেষ্টাতেও আর যাই হোক কিন্তু জল কোনমতেই উৎপন্ন হবেনা। ঠিক যেভাবে এই পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তেই মানব সন্তানের প্রথম জন্ম লগ্নে ভ্রূণ যখন মায়ের জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত হয় তখন সেই কোষের নিউক্লিয়াসে মাতা ও পিতার তরফে 23টি করে মোট 46টি ক্রোমোজোমই থাকতে হবে। এবং অন‍্যান‍্য প্রজাতির ক্ষেত্রেও তার সংখ‍্যা নির্দিষ্ট কিন্তু একে অপরের থেকে অতি অবশ্যই আলাদা। একটা নক্ষত্র তার মধ‍্যে উপস্থিত পদার্থ বা হাইড্রোজেন পরমাণুর নিরিখে কতটা হালকা বা ভারি তার উপরে নির্ভর করে তার জীবন চক্র। অর্থাৎ তার অন্তিম পরিণতি কি হবে। শ্বেত বামন, নাকি নিউট্রন নক্ষত্র নাকি কৃষ্ণ গহ্বর।

নিজের স্বত্ত্বা দিয়ে, নিজের চেতনা দিয়ে, নিজের বিচার বুদ্ধি দিয়ে সবকিছুর চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। শুধু অন‍্যের শিখিয়ে দেওয়া বুলিকে প্রাধান্য দিয়ে নাস্তিক কিংবা আস্তিক, এই তর্কে প্রবেশ করে নিজেকে বোকা বানানো বা নিজেকে ঠকানো যাবেনা।

বিশ্বাস তাকেই করতে হয় যাকে সমস্ত পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায়। একজন মানুষ ততক্ষণই বেঁচে আছে যতক্ষণ তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অন্তত একটি সক্রিয় আছে। এবং যে কোনো প্রাণী বা বস্তুর ক্ষেত্রেই সেটা সত‍্যি। যখন থাকে না তখন সেই প্রাণী বা বস্তুটি  আমাদের কাছে মৃত বা অস্তিত্বহীন। ঈশ্বর যদি সত‍্যি হতেন তাহলে তাকেও পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়েই অনুভব করতে পারতাম। তাকে দেখতে পেতাম, তার সাথে কথা বলতে পারতাম, তাকে ছুঁতে পারতাম। তার জন্যে মন্দির, মসজিদ বা গির্জায় গিয়ে দান চড়াতে হতোনা কিংবা নির্জনে গুহায় বসে ধ‍্যান করতে হতোনা। কারণ তিনি তো সর্বত্র সর্বক্ষণই বিদ‍্যমান। দান পেলে যিনি সন্তুষ্ট হন তিনি আর যেই হন না কেন ঈশ্বর তো কোনভাবেই নন।

এই বিশ্বের সব কিছুরই শুরু, বিকাশ এবং শেষ আছে। এই নিয়ম জগতের সবকিছুর জন‍্যেই চিরসত‍্যি। আস্তিকদের মতে ঈশ্বরই একমাএ ব‍্যতিক্রম। আর নাস্তিকদের মতেই শুধু নয়, আস্তিকরাও নিশ্চয়ই এটা মানবেন যে বিজ্ঞানের নিয়মেরও কোনো শুরু বা শেষ নেই। এটা আদি এবং অকৃত্রিম। আমাদের জানা বিজ্ঞান, এখনো পর্যন্ত অবশ‍্যই সম্পূর্ণ নয়। তার নিত্য আরো আরো বিকাশের প্রয়োজন আছে এবং সেটা যে ক্রমাগত আরো সমৃদ্ধও হচ্ছে সেই বিষয়ে নিশ্চয়ই কারারই দ্বিমত নেই।

আজকে রাতের অন্ধকারে একটা ঘর ততক্ষণই অন্ধকার বা আমাদের চেতনায় অদৃশ্য যতক্ষণ না সেখানে আলো জ্বালানো হচ্ছে। আমাদের মনটাও একইভাবে ততক্ষণই অন্ধকার থাকে যতক্ষণ না প্রকৃত জ্ঞানের আলো সেখানে প্রবেশ করে বা তার চেতনায় প্রকৃত জ্ঞানের আলোর প্রজ্বলন ঘটে। আজকে আমাদের সূর্য ততক্ষণই তাপ ও আলো দেবে যতক্ষণ তার মধ‍্যে পারমাণবিক সংযুক্তিকরণ বিক্রিয়া চলবে। এটা ঈশ্বরের কেরামতি নয়, এটা বিজ্ঞান। উদ্ভিদের শরীরে ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক সমৃদ্ধ সবুজ পাতায় যে খাদ‍্য তৈরি হয় বা আমাদের প্রাণীদের শরীরে খাদ‍্যগ্রহন থেকে পাচন এবং নিষ্ক্রমণ -সবটাই বিজ্ঞান। বানর প্রজাতির ক্রম বিবর্তনের মধ‍্যে দিয়ে আধুনিক মানুষের উৎপত্তি, কিংবা পাথরে পাথর ঘষে প্রাগৈতিহাসিক যুগে মনুষ‍্য কর্তৃক আগুন আবিষ্কার একটা যুগান্তকারী বিজ্ঞানের অগ্রগতি মাত্র, কোনো ঐশ্বরিক অবদানে প্রাপ্ত দয়া বা দান নয়। ঈশ্বর জমি দিয়েছেন, কিন্তু সেই জমিতে ফসল ফলানোর বিদ‍্যাটা বিজ্ঞানের থেকেই ধার করতে হয়েছে ।ঈশ্বর হাতে ধরে এসে শিখিয়ে দিয়ে যাননি। আজকে কোনো বাঙালির সন্তান জন্মানোর পরেই যদি লন্ডনের কোনো ইংরেজ বাবা-মা'র কাছে মানুষ হতো তবে সে বাংলায় নয় ইংরেজিতেই প্রথম কথা বলা শিখতো। যেটাকে বলে পরিবেশের প্রভাব।

বিজ্ঞানকে জানার জন‍্য বিজ্ঞানের ছাত্র  হওয়াটা জরুরি নয়। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যা কিছু ঘটছে তাকে সঠিক বিচার, বুদ্ধি ও চেতনা দিয়ে খোলা মনে বিশ্লেষণ করতে হবে। আস্তিক এবং নাস্তিক এই দুই মেরুতে ভাগ করে আলাদা করে দিয়ে দায় বা দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে চলবে না। যুক্তি নির্ভর কারণ প্রদর্শন করতে হবে। বিজ্ঞান যুক্তিতে বিশ্বাসী, ভক্তিতে নয়। শুধুমাত্র অন্ধ বিশ্বাস কিংবা ভক্তি দিয়ে সব কিছুকে বিশ্লেষণ করা যায়না। গা জোয়ারি করা যায় মাত্র কিংবা মেকি ধর্মান্ধদের মতো ভয় দেখিয়ে আখের গোছানো যায় হয়তো।

প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক যুগে অনুন্নত ক্রম বিবর্তিত মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঠিক ব‍্যাখ‍্যায় অসমর্থ হয়ে তার থেকে বাঁচবার উপায় না পেয়ে ভয়কে জয় করার জন‍্যে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো বা শক্তিগুলোকেই ঈশ্বর আকারে রূপদান করেছে। এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরণের পুজাপাঠ, মন্ত্র উচ্চারণ ও যাগ যঞ্জের মাধ‍্যমে তাকে তুষ্ট করতে চেয়েছে এবং লিপিবদ্ধ করে ধর্মগ্রন্থ আকারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত করেছে। আর আমরা আজও সেই ভয় বা ভীতি থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারিনি। আর তাই ঈশ্বরের গোলামী করাটা আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসে দাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব তার বেঁধে দেওয়া বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট নিয়মেই দিব্যি এগিয়ে যাচ্ছে একে অপরের কাছ থেকে দূরে আরও দূরে। অথচ আমরা সবকিছু বুঝেও এই গোলামিটাকেই মেনে নিয়েছি। হাবভাবটা এমনই, যেন নতুন করে ভেবে কি হবে অহেতুক সময় নষ্ট করে? তার থেকে অদৃষ্টের নামে সবকিছু শপে দিয়ে একটাই তো জন্ম, ঠিক কাটিয়ে দেওয়া যাবে। পরের জন্মে গরু হবো নাকি ছাগল, সেটাতো আর জানতে যাচ্ছি না ! আর তাছাড়া ঈশ্বর রূপী কোনও এক কাল্পনিক অস্তিত্বের উপর সবকিছুর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে অনেকটাই নিশ্চিন্তে থাকা যায়। ছেলের চাকরি বা মেয়ের বিয়ে? আরে, সবার ছেলেই তো চাকরি পাচ্ছে বা সবার মেয়েরই তো দিব্বি বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তাহলে আর অহেতুক ভেবে শরীর ও মনকে কষ্ট দিয়ে লাভ কি। ঈশ্বর  তো আছেন, ঈশ্বরই ঠিক সবটা জুটিয়ে দেবেন। বন‍্যায় পাশের গ্রামটা ভেসে গেছে? বহু প্রাণ হানি হয়েছে? হবেনা? নিশ্চয়ই গতজন্মে অনেক পাপ করেছিল তাই ঈশ্বর এই জন্মে শাস্তি দিয়েছেন। নে এবার বোঝ। ঈশ্বরকে মন প্রাণ দিয়ে না ডাকার ফল। আরে আমি তো আর জ্ঞানত কোনও পাপ করিনি তাহলে অহেতুক ভেবে বা ভয় পেয়ে শোক করে লাভ কি?

পরের জন্মের কথা মাথায় আসতেই মনে পড়ে গেল যুগ পুরুষ বিশ্ব শান্তির প্রতীক ভগবান বুদ্ধের জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে লেখা জাতকের গল্পগুলোর কথা। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী আত্মা বা যন্ত্রবৎ প্রাণী শরীরের চালক শক্তি বারংবার স্থুল শরীর পরিবর্তন করে তার প্রতিটি জন্মের কর্মের মাধ্যমে তার ক্রম পরিশুদ্ধি ঘটায় বা নিজের সূক্ষ্মীকরণ ঘটায়। এবং এই সূক্ষ্মীকরণের মধ‍্য দিয়ে পার্থিব বন্ধন বা ষড় ঋপুর বন্ধন থেকে চির মুক্তিলাভের মধ‍্য দিয়ে বিশ্বজনীন আত্মা বা মহাজাগতিক শক্তির নিরন্তর স্রোতে মিশে যায় বা চিরতরে বিলীন হয়ে যায়।

এবার প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক যে তাহলে কি সমগ্র বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে কোনো একজনের একক ইচ্ছায়?? তাহলে কি ঈশ্বরের উপস্থিতিই অমোঘ সত‍্য?? তার ইচ্ছাতেই এই অসীম বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে?? তিনিই আমাদের সকলের ভাগ‍্য নিয়ন্ত্রক?? আমরা তার খেলার পুতুল বা সামগ্রী বা বায়ো রোবট?? তাহলে এই বিশ্বের সমস্ত ছোট বড় মহাজাগতিক বস্তুই যে নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ, যার থেকে বিন্দুমাত্র পদস্খলনও সম্ভব নয়, তাকেই তো আমরা বিজ্ঞান বলে মান‍্যতা দিয়ে থাকি?? 

তাহলে তো এই মহাবিশ্ব পরিচালনা করছে দুটো আলাদা অস্তিত্ব। যার একটি ঈশ্বর এবং অপরটি হলো বিজ্ঞান। ঈশ্বর প্রাণময়। অর্থাৎ তার মধ‍্যে চেতন শক্তি বতর্মান। আর তার সেই চেতন শক্তিরই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপস্থিতি প্রাণী শরীরে বতর্মান। এবং সেই শক্তি শরীরে অবস্থান করলে জীব আর না করলে জড় পদার্থ। আবার বিজ্ঞানের নিয়ম কিন্তু জড় বা জীব সবার ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোয‍্য। সেখানে কোনও পক্ষপাতিত্বের স্থান নেই। প্রাণ বলতে আমরা বুঝি স্থান পরিবর্তন ও অনুভূতিতে সাড়া দিতে সক্ষম এবং সেইসাথে সমান্তরালে বৃদ্ধি এবং ক্ষয়। পাশাপাশি বিশ্ব সতত গতিশীল হওয়ায় জড় পদার্থও প্রতি মুহূর্তেই স্থান পরিবর্তন করছে। তারও ভরের বৃদ্ধি এবং ক্ষয় আছে। এবং সেও বিজ্ঞানের নিয়মে সাড়া দেয়। তাহলে বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট নিয়মকেই যদি আমরা অনুভূতির সাথে এক এবং অনন‍্য হিসেবে ভাবতে পারি তবে জড় এবং প্রাণের মধ‍্যে বেসিক কোনও তফাৎ তো চোখে পরছে না। আমাদের শরীরের সাংগঠনিক একক কোষ। আবার কোষের মধ‍্যেও প্রধান পরিচালক হচ্ছে নিউক্লিয়াস। আবার নিউক্লিয়াসের মধ‍্যে থাকে, মানুষের ক্ষেত্রে তেইশ জোড়া ক্রোমোজোম। এখানেই শেষ নয়। এই ক্রোমোজোম গুলিও আবার ডি,এন,এ এবং  প্রোটিন দিয়ে গঠিত। ডি, এন, এ বা ডি-অক্সি-রাইবোনিউক্লিক অ‍্যাসিড, প‍্যাচালো মই আকৃতির সুতোর মতো আকার বিশিষ্ট। ডি, এন, এ হলো একটি অণু যা কোনো জীবের বিকাশ, পুনঃ উৎপাদন ও জীবিত থাকার নির্দেশাবলী দান করে। অর্থাৎ প্রাণী শরীরও জড় পদার্থের মতোই পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা পরমাণু দ্বারাই গঠিত।

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যেতেই পারে যে এই বিশ্বে জড় পদার্থ বলে আদপেই কিছু নেই। সবটাই প্রাণময় বা প্রাণ শক্তিতে ভরপুর বা চেতনা সমৃদ্ধ। আবার বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ‍্যাত E =  mc^2 সূত্র থেকে আমরা সবাই অবগত আছি যে বস্তু এবং শক্তি একে অপরের পরিপূরক। অর্থাৎ যা কিছু জড় বা পার্থিব জগতে আপাত স্থির তা আসলে শক্তি বা প্রাণ চঞ্চলতায় পরিপূর্ণ।


Sunday, September 21, 2025

যমজ ভূত

 

ছবি : ইন্টারনেট

যমজ ভূত 

মৃণাল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়

লাল কুটুস আর নীল পুটুস দুই যমজ বোন। দুই বোনের চেহারায় অদ্ভুত মিল। অবশ‍্য সেটাই তো হওয়ার কথা। যমজ বোন তো। দুজনেরই শরীর বলতে শুধু  গুনে গুনে দুশ ছ’টা করে হাড়। তাহলে তো ভারি মুশকিল। আলাদা করে চিনবো কি করে? কোনও চিন্তা নেই, এরও সমাধান আছে। উপেন্দ্র কিশোর রায়ের গুপি গাইন আর বাঘা বাইনের গল্পের সেই ভূতের রাজার কথা মনে আছে তো? তো সেই রাজা ওদেরকে এক জোড়া করে লাল আর নীল চোখ উপহার দিয়ে ছিলেন, কারণ উনিও ওদের দুজনকে আলাদা করে চিনতে ভুল করেছিলেন। ফলে নিজের সমস‍্যা দূর করতে গিয়ে বাকিদের সমস‍্যারও সমাধান হয়ে গেল। কি হলো তোমরা কি ভয় পেলে নাকি? আরে ওরা নামেই ভূত কিন্তু তোমাদের মধ‍্যে থাকা অনেক দুষ্টু বাচ্চার থেকে হাজার গুন ভালো। কারোর কোনও ক্ষতি করেনা। কোনও বাচ্চা বেশি দুষ্টুমি করলে একটু চোখ গুলো বড় বড় করে ভয় দেখায় আর ক্কচিৎ কদাচিৎ কান দুটো একটু ধরে আলতো করে মুলে দেয়। ওরা গ্রামের পূর্ব দিকে জহর দাদুদের বড় সান বাঁধানো দিঘির পশ্চিম পাড়ের কোণায় যে সমান মাপের দুটো পাশাপাশি তাল গাছ আছে, ঐখানেই সারাদিন লম্বা পা দুটো ঝুলিয়ে বসে থাকে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব ঋতুতেই। অনেকক্ষণ ধরে পা ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে যখন আর ওদের ভালো লাগেনা তখন ওরা পরস্পরের হাড় গুলো নিয়ে ডাং-গুটি খেলে। তবে সবার ভালো করতে গিয়ে একটা অপকর্মও করে ফেলে না বুঝে। বিশেষ করে ভরা ভাদ্র মাসে। যখন গাছের তাল গুলো গ্রীষ্মের প্রখর তাপে পেকে একেবারে কালো কুচকুচে আর নরম টুসটুসে হয়ে ওঠে তখন ওরা গাছের তলায় কেউ পাকা তাল পরে আছে কিনা খুঁজে দেখতে এলে উপর থেকে তাল পেরে নীচে ফেলে দেয়। ভালোর কথা ভেবেই করে কিন্তু আচমকা অজান্তেই পাকা তাল মাথায় পড়ে অনেকেই অল্প বিস্তর আহত হয়।

কি হলো, ঋকু বাবু তুমি কি ভয় পাচ্ছো?

“নাগো গল্প দাদু, আমি মোটেও ভয় পাচ্ছিনা”।

তাহলে চোখ বন্ধ করে ঠোঁট নাড়িয়ে কি বিড়বিড় করছো?

“না, মা বলেছিল, যখনি ভয় পাবি তখনই –

‘ভূত আমার পূত পেত্নি আমার ঝি,

রাম লক্ষণ সাথে আছে ভয়টা আমার কি’-

এই ছড়াটা মনে মনে বলবি। দেখবি ভূত তোর কিচ্ছু করতে পারবে না”।

মিনু বাদে বাকি সবাই ঋকুর কথা শুনে সমবেতভাবে হেসে উঠলো।

গল্প দাদু চার বছরের মিনুকে কাছে ডেকে নিয়ে কোল ঘেঁসে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

কি, এখন আর ভয় পাচ্ছো নাতো?

মিনু গল্প দাদুর গায়ে আরও একটু ঠেসে বসে, আদো আদো গলায় জবাব দিলো, “একটু, একটু”।

ঠিক আছে একটু একটু ভয় গল্প শুনতে শুনতে একটু একটু করেই কেটে যাবে।

এই কুটুস আর পুটুস মাত্র তেরো বছর আগেও এই গ্রামেই বাস করতো ওর মা বাবার সাথে। ওর একটা দাদুও ছিল, অনেকটা আমারই মতো। চুল দাড়ি সব সাদা ধবধবে। শরীরের পৈতেটাও ধবধবে সাদা। উপাধি মুখুজ্জে তো, তাই।

আরে আমার দিকে সবাই ঐভাবে ড‍্যাবড‍্যাব করে তাকিয়ে ওদের দাদুর সাথে আমারও মিল খুঁজে বের করার চেষ্টা করছো নাকি?

“আরে, ছাড়ো তো দাদু। তুমি গল্প বলো। এখানে তো আমরা সবাই জড়ো হয়েছি তোমার কাছ থেকে ভূতের গল্প শুনবো বলেই। আর প্রতি শনিবারই বিকেলে আমরা সেটা করি। তাহলে ভয় পেলে চলবে কেন? আর ভূত বলে কিছু হয়না, বুঝেছিস ঋকু আর মিনু। ওটা আমাদের মনের ভুল। তাই নাগো গল্প দাদু?” সদ‍্য বারো বছর পার করা চাপাডালি গ্রামের ‘ব্রজগোপাল স্মৃতি’ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ‍্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পাঠরত সবুজ বললো।

সবুজ দাদুভাই যেটা বলেছে সেটা কিছুটা হলেও সত‍্যি তো বটেই। তবে তেনারা একেবারেই নেই এই কথাটা মনে হয় জোর গলায় বলার মতো পরিস্থিতি এখনো আসেনি। যাকগে, ঐসব আপাতত ভুলে গিয়ে কুটুস আর পুটসদের গল্প শোনো সবাই।

তো যেটা বলছিলাম। ওদের দাদুর একদম সাদা ধবধবে পৈতে। আসলে খুব সাত্ত্বিক মানুষ ছিলেন এই ব্রজকিশোর বাবু। ওনারই বাবা হচ্ছেন ব্রজগোপাল বাবু যার নামে গ্রামের উচ্চ মাধ্যমিক বিদ‍্যালয়টি। এদের পরিবারটি আগাগোড়াই খুব শিক্ষিত। গত তিন প্রজন্ম ধরে এই মুখুজ্জে বাড়ির বড় ছেলেরাই বিদ‍্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ অলঙ্করণ করে আসছেন নিজেদের কৃতিত্ত্ব এবং যোগ‍্যতার নিরিখে। বর্তমানে ব্রজসুন্দর, মানে কুটুস আর পুটুসের বাবা এই বিদ‍্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

“কিন্তু তাহলে তো গল্প দাদু কুটুস আর পুটুস ভূত না হয়ে শাকচুন্নী হবে। কারণ বামুনের মেয়েরা অপঘাতে মরে গেলে শাকচুন্নী হয়ে যায়। মায়ের মুখ থেকে তাইতো শুনেছি”। বেশ বিজ্ঞের মতো বলে ওঠে বছর চোদ্দোর প্রভাত ঘোষ। আমাদের গ্রামেরই ভরত মুদির তিন মেয়ের পরে জন্মানো একমাত্র ছেলে। লেখাপড়ায় খুব ভালো। ছোট থেকে প্রতিবছর ক্লাসে ফাস্ট হয়। স্কুলের শিক্ষকদের সবারই খুব প্রিয় নবম শ্রেণির এই প্রভাত।

হ‍্যা তোমার মা যেটা বলেছেন সেটা খুবই সত‍্যি। কিন্তু সেটা বামুন বাড়ির বিবাহিত মহিলারা যদি কম বয়সে সধবা অবস্থায় কোনও দৈবী দুর্ঘটনায় মারা যান তাহলে তাদের ক্ষেত্রে ওরকমটা সাধারণত হয়ে থাকে বলেই শুনেছি। ভূত নিয়ে যারা অনেক পড়াশুনা বা গবেষণা করেন তারা এরকমটাই বলেন। কিন্তু এরা তো একেবারেই ছোট অবস্থায় একসাথে ঐ জহর দাদুদের পুকুরে সবার অজান্তে স্নান করতে গিয়েই ছয় বছর আগে ভরদুপুরে জলে ডুবে মারা গেলো। সাত বছরের দুটো ফুলের মতো ফুটফুটে জলজ‍্যান্ত মেয়ে। বেঁচে থাকলে ওরা এখন তেরো বছরের হতো। প্রথমে তো কেউ খুঁজেই পাচ্ছিলো না তন্ন তন্ন করে গ্রামের সব জায়গায় সবাই মিলে গোটা বিকেল ধরে খুঁজে দেখার পরেও। মেয়ে দুটো কি হাওয়ার উবে গেলো নাকি? সবার মুখে একটাই প্রশ্ন। খোঁজ মিলল দুদিন পর যখন ওদের শরীর দুটো ফুলে গিয়ে ধবধবে ফ‍্যাকাশে অবস্থায় ভেসে উঠলো পশ্চিমের ঐ জোড়া তালগাছ দুটোর ঠিক নীচে দিঘির ঘন কালচে নীল জলে।

“ওরাই যে ঐ তালগাছ দুটোয় মরে গিয়ে আস্তানা গেড়েছে সেটা কি করে প্রমাণিত হলো? কেউ কি দেখেছে ওদের?” জানতে চাইলো এগারো বছরের প্রতিমা, সবুজের খুড়তুতো বোন।

হ‍্যা। আসলে তারপর থেকেই সন্ধ‍্যার পরে রাত বিরেতে ঐ তালগাছ দুটোর তলা দিয়ে যারাই যাতায়াত করেছে তারাই কিছু না কিছু অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছে। যেমন ধরো কোথাও একফোটা হাওয়া নেই অথচ ঐ দুটো তালগাছের পতায় যেন ঝড় বইছে, এতো হাওয়া !! আবার কেউ কেউ জোড়া হাসি বা জোড়া কান্নার সমবেত আওয়াজও নাকি শুনতে পেয়েছে তলা দিয়ে যাতায়াতের সময়। তবে যা কিছু ঘটেছে সবটাই গভীর রাতে। দিনের বেলায় আজ পযর্ন্ত কোনকিছু ঘটতে দেখেনি বা শোনেনি কেউ। তোমরা আবার ভূতের হাসি শুনবে বলে ওপাশে কখনও একলা চলে যেওনা কিন্তু। ভূতেদের মতি গতি বলে কথা। এমনিতে তো খুব একটা খারাপ নয় বলেই শুনেছি। কিন্তু বলা তো যায়না, হয়তো একা পেয়ে গাছ থেকে নেমে এলো একসাথে ডাং গুলি খেলবে বলে। ওদের হাড় গুলো নাহয় ইচ্ছে মতো যখন তখন খুলে নেওয়া যায় কিন্তু তোমাদের বেলায় তো সেটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। এবার ওরা তো আর সেটা বুঝবে না। ভাববে তোমরা ওদের সাথে খেলতে চাইছো না। অর্থাৎ ওদেরকে অবহেলা করছো। সুতরাং রাগ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। এবার অনেক করে আব্দার করার পরও যদি না খেলো তাহলে রেগে গিয়ে বেশি কিছু না হোক, হতেই পারে কান দুটো একটু বেশিই জোড়ে মুলে দিল। এবার তুমি যদি কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ফিরে এসে বলো যে কুটুস বা পুটুস তোমার দু-কান মুলে দিয়েছে তাহলে বাড়ির বড়রা বিশ্বাস করবে ? উল্টে একা একা কেন বনে বাদারে ঘুরে বেড়াচ্ছো তার জন‍্যে আরও একবার কানমলা খেতে হবে। আর মায়েদের হাতের কানমলা আমার মনে হয় কচি ভূতেদের কানমলার থেকেও অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। কি ঋকু বাবু মায়ের কানমলা প্রতিদিন গড়ে এক দুবার করে পরে তো?

“আমি আর কখনও তাল খুঁজতে ঐ গাছ দুটোর আশেপাশে যাবোনা গো গল্প দাদু”।

সেকি, তুমি কি এরমধ্যে একা একা ওখানে গিয়েছিলে নাকি?

“সবাই বলো, মা’কে বলে দেবে নাতো? আসলে গত পরশু স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় ঘুর পথে একটু গিয়েছিলাম গো”।

খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছো ঋকু দাদুভাই। এইসময় গাছে তাল থাকেনা তাই। নাহলে নির্ঘাৎ মাথায় একটা পাকা তাল পড়তোই পড়তো।

উপস্থিত সবাই আবারও একসাথে হো হো করে হেসে উঠলো।

“তোর তো খুব সাহস রে ঋকু দাদা। এখনো নিজের চুলটাই ঠিকমতো আঁচড়াতে শিখিসনি, জ‍্যাঠিকে আঁচড়ে দিতে হয়, আর তুই গেছিস তাল কুড়োতে? তাও একলা!! পুকুরে পড়ে গেলে কি হতো। সাতারও তো জানিসনা। জলে পড়ে গেলে ঐ ভূত দুটোর মতো তুইও ভূত হয়ে যেতিস। আমি জ‍্যাঠিকে ঠিক বলে দেবো, দাড়া বাড়ি যাই আজকে সন্ধ‍্যাবেলা”। আদো আদো গলায় পাকা গিন্নির মতো দুই বছরের বড় জ‍্যাঠতুতো দাদাকে রীতিমতো শাসনের সুরে বলে গল্প শুনতে আসা দলের সবথেকে ছোট সদস‍্যা মিনু।

সবাই মিলে মিনুকে বারণ করলো, সে যেন বাড়ি ফিরে গিয়ে তার জ‍্যাঠির কাছে ঋকু দাদার নামে নালিশ না করে। অবশ‍্য ঋকু দাদাকেও বোনের কাছে কথা দিতে হলো যে, সেও ভবিষ্যতে আর কখনও এই ধরনের ভুল করবেনা।

“ওঃ এই ঋকু আর মিনুর জন‍্য না আজকের গল্পটাই ঠিক জমছে না। গল্প দাদুর কথা শুনবো না এদের দুজনের কথা শুনবো। এই তোরা না আর পরের দিন থেকে আমাদের সাথে আসবি না, বুঝেছিস? তোদের এখনও ভূতের গল্প শোনার মতো বয়সই হয়নি। মাঝখান থেকে ক্রমাগত বকবক করে গল্পের আসরটাই নষ্ট করে দিচ্ছিস”। রীতিমতো রাগত স্বরে একটু কড়া করেই বলতে বাধ‍্য হলো তেরো বছরের একটু সিরিয়াস, মাধব কাকার ছেলে রাহুল। মাধব কাকা গ্রামের হাটে রেডিমেড জামাকাপড় বিক্রি করেন। হাটে নিজস্ব একটা ছোট দোকানও আছে। পাশের শহরেও বিভিন্ন বাঁধা দোকানে জামাকাপড় যোগান দেন। অবস্থা মোটামুটি সচ্ছল।

গল্প দাদু রাহুলকে সমর্থন করেই আপাতত সবাইকেই চুপ থাকতে বললেন। কারণ ওদিকে বিকেলও অনেকটাই গড়িয়ে এসেছে। সন্ধ‍্যের আগে যে করেই হোক গল্পটা শেষ করতে হবে। সুতরাং আর কথা নয়। একদম মুখে আঙ্গুল দিয়ে বসে মন দিয়ে সবাই শুধু গল্পের বাকি অংশটা শুনবে।

গল্প দাদু পুনরায় তার গল্প বলা শুরু করলেন।

দিঘির পাশেই বিশাল চারকোনা ফুটবল মাঠের পূব ধারে মা চন্ডির থান আছে। তোমরা বড়রা নিশ্চয়ই দেখেছো।

“আমিও দেখেছি গো গল্প দাদু। ওটার চারপাশে রঘুদের খুশি ছাগলের বাচ্চা তিনটে ঘাস খাচ্ছিলো”। স্বাভাবিকভাবেই ঋকু চোখ বড় বড় করে বলে নিজেকেও বড় প্রমাণ করার চেষ্টা করলো।

রঘুই বা চুপ থাকবে কেনো? সেওও মুখ বেঁকিয়ে জবাব দিল, “কেন রে, শুধু আমাদের খুশির বাচ্চা গুলোই ওখানকার ঘাস খায়? এই গ্রামে আর কারও ছাগল নেই বুঝি“।

মিনুও ছাড়নেবালা নয়। “এই রঘু দাদা, তুই ঐভাবে কেন বলছিস রে? আমার ঋকু দাদা কখনও মিথ‍্যে কথা বলেনা তোর মতো”।

“কি, আমি মিথ‍্যে কথা বলি?” রঘু রাগে ফেটে পড়লো।

এই রে, আবার শুরু হয়ে গেল? ছোটরা, সবাই ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে বসো। যে ঠোঁট থেকে একবারের জন‍্যও আঙ্গুল সরাবে সে সোজা উঠে নিজের বাড়ি চলে যাবে। এবং পরের দুই সপ্তাহ গল্প শোনার জন‍্য এখানে আসতে পারবে না। মনে থাকে যেন।

উপস্থিত ছোট থেকে বড় সবাই ঠোঁট থেকে আঙ্গুল না সরিয়ে ঘাড় নেড়ে নীরবে সম্মতি দিলো।

তো, ঐ চন্ডির থানের ঠিক পাশেই “দশঘরা ব‍্যায়াম সমিতি” ক্লাবঘর। দুটোই বহু পুরোনো। আমাদের বাপ কাকাদের নিজেদের হাতে তৈরি। আসলে শুরুর দিকে সেইসময় মনে হয় গ্রামে মোট দশ ঘরের বাস ছিল। আর ব্রিটিশ আমলে দেহ ও মন শক্ত এবং পেশিবহুল করার জন‍্য সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়েই বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে প্রত‍্যন্ত এলাকায় প্রচুর শারীরিক কসরতের জন‍্য বিশেষ করে কুস্তির আখড়া ছিল। আমাদের গ্রামের নামটা তখন মনে হয় চাপাডালি ছিলনা। এই নামটা স্বাধীনতা পাওয়ার পরবর্তী কালে নেওয়া। তখন হয়তো এই গ্রামের নাম দশঘরা’ই ছিল। আর গত এগারো বছর হলো ঐ চন্ডির থানেই ক্লাবের সদস‍্যরা দুর্গাপূজা করে আসছে। আমি আবার যেহেতু ক্লাবের সভাপতি তাই সেই সুবাদে পুজো কমিটির সভাপতিও বটে। প্রচুর দায়িত্বও তার জন‍্য সামলাতে হয়। বারংবার বারণ করা সত্বেও বাকিরা কিছুতেই আমাকে এই দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি দিচ্ছেনা। তবে গত পাঁচ বছর আগে পুজো চলাকালীন যা যা কান্ড ঘটলো, অবশ‍্য শুধু কান্ডই বা বলছি কেন বলা উচিত একেবারে লন্ডভন্ড কান্ড, সে আর ভাষায় প্রকাশ করার যোগ‍্য নয়। এখানে যারা বড়রা আছো তারা নিশ্চয়ই কিছুটা হলেও মনে করতে পারছো।

“হ‍্যা গল্প দাদু আবছা আবছা মনে আছে”। চটজলদি উত্তর দেয় প্রভাত।

সেইদিন আমরা বড়রাই পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না তো ছোটরা। সত‍্যি ঐ দৃশ্য জীবনে ভুলবার নয়। পরিস্কার আবহাওয়ায় বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে কোথা থেকে যে ঐরকম অসময়ের কালবৈশাখী ঝড় উদয় হলো সেটা ভাবলেই অবাক হতে হয়। দিঘির চারপাশে যে কটা গাছগাছালি ছিল সবগুলোই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ঐ জোড়া তালগাছ দুটো এক ফোটা হেলেনি। নবমীর সন্ধী পুজো চলছিল। আমরা গ্রামের ছেলেমেয়ে, কচি বুড়ো প্রায় সবাই পরম ভক্তি সহকারে পুজো দেখছিলাম। ঠাকুর মশাই সবাইকে তৈরি থাকতে বলেছিলেন যে পুজো শেষ হলেই অঞ্জলি শুরু হবে। তার জন‍্য সবাই যেন মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। আর প্রস্তুতি !! কোথা থেকে বিনা মেঘে ভূতুড়ে ঝড় শুরু হয়ে গেল। আর সেকি একটু আধটু ঝড়। সবকিছু প্রায় উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়ার যোগাড়। ভয়ে দিকবিদিক জ্ঞান শূন‍্য অবস্থায় পালাতে গিয়ে কতজন যে নিজের অজান্তেই ঐ দিঘির জলে পড়ে হাবুডুবু খেয়েছিল তার সঠিক কোনও হিসেব নেই। পল্টু পুরোহিতের তো প্রায় বস্ত্রহীন অবস্থা। সে বেচারা আশেপাশে কোনো অবলম্বন না পেয়ে অসুরের পা আকড়ে পড়েছিল। পরে তার মুখ থেকে ঐ মুহুর্তের যে বর্ণনা শুনেছিলাম সে তো রীতিমতো গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। ঐ প্রবল লন্ডভন্ড করা ঝোড়ো তান্ডবের মধ‍্যে মা দুর্গা আর অসুরের মধ‍্যে নাকি রীতিমতো যুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। ভয়ঙ্কর হুঙ্কার করে নাকি মা দুর্গা এবং অসুর পরস্পরের দিকে তেড়ে তেড়ে যাচ্ছিলেন আর রাগে ফুঁসছিলেন। তাহলে সিংহটা কি করছিল সেইসময়? সেই বর্ণনা তো আরও ভয়ঙ্কর। সেই জঙ্গলের রাজা মা দুর্গার বাহন পশু শ্রেষ্ঠ সিংহ নাকি আধমরা পেট ফাটা মহিষটাকে কামড়ে ছিড়ে ছিড়ে আয়েস করে খাচ্ছিল। একবার নাকি ভুল করে পল্টুর কালো রোগা পায়েও একটা কামড় বসিয়েছিল মহিষের পা ভেবে। অবশ‍্য পরক্ষণেই নাকি হাত জোড় করে ভুল হয়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আবার মহিষটার সামনের পায়ের অর্ধেক মাংস খুবলে নিয়ে পরম তৃপ্তিতে খেতে শুরু করে দেয়। পল্টুর মিথ‍্যে কথা বলার অভ‍্যাস আছে জানতাম। কিন্তু তাই বলে মা দুর্গা বা অসুর এবং সিংহকে নিয়ে এইরকম একটা আজগুবি গল্প বানাবে সেটা মেনে নিতে মন চাইছিল না। শত হলেও ওরা গত চার পুরুষ ধরে এই পুরোহিতগিরি করেই সংসার চালায়। সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ গুলোও মোটামুটি পরিস্কার এবং সঠিক। তারমানে পেটে বিদ‍্যা এবং তার চর্চা দুটোই আছে। তাই গ্রামের সবাই যেখানে একসাথে উপস্থিত সেখানে সকলের সামনে গড়গড় করে মুখস্ত বলার মতো এই ধরণের একটা অলৌকিক বর্ণনা দেবার সৎ সাহস দেখাবে, সেটাও মেনে নিতে একটু অসুবিধা হচ্ছিলো বৈকি। আর পুজো মন্ডপের ভেতরকার যা লন্ডভন্ড ছত্রখ‍্যান পরিস্থিতি ছিল তাতে করে অবিশ্বাস্য হলেও বিশ্বাস না করে উপায়ও ছিলনা। মা দুর্গার হাতের সমস্ত অস্ত্রগুলোই অসুরের শরীরের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। অসুরের একটা চোখ কে যেন উপরে নিয়েছে। অসুরের কাঁধের কাছেও বেশ খানিকটা খুবলে তুলে নেওয়া হয়েছে । আর মহিষটার দৈহিক বর্ণনা যত কম দেওয়া যায় ততই ভালো। তার শরীরের অর্ধেক অংশই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পল্টুকে যখন সবাই মিলে উদ্ধার করা হয় তখন সে ছিল অজ্ঞান অবস্থায়। অনেক কষ্টে যখন তার জ্ঞান ফেরানো হলো তখন তো সে প্রথমে কাউকে চিনতেই পারছিল না। বড়দেরকে ‘তুই’ বলে সম্মোধন করছিল আর অকারণে “আমাকে মেরো ফেলনা মা, আমি কোনও অন‍্যায় করিনি দিব‍্যি দিয়ে বলছি”- এইসব অসংলগ্ন কথা নিজের মনেই বলে যাচ্ছিল। বেচারা !! বিশাল একটা মানসিক দুর্যোগ যে ওর উপর দিয়ে বয়ে গেছে গত প্রায় ঘন্টা খানেক ধরে সেটা ওর চোখেমুখেই স্পষ্ট। এই ঘটনা, সে অবিশ্বাস্য বা বিশ্বাস্য যাই হোক না কেন, ওর যে ভুলতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল তা বলাই বাহুল‍্য।

গল্প দাদুর অদ্ভুতুড়ে গল্প শুনে উপস্থিত কারোর মুখেই আর টু শব্দটি নেই। চোখগুলো সব ছানাবড়ার মতো গোল গোল আর পলকহীন। মিনুকে এই মুহূর্তে গল্প দাদুর কোলে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

ঐদিকে গল্প দাদু বলেই চলেছেন। সেদিন কপাল ভালো যে গ্রামের কেউ প্রাণে মরেনি। তবে একটা অজানা ভয় যে সবাইকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল সেটা প্রত‍্যেকের আচার আচরণেই স্পষ্ট। এর দু-চার দিনের মধ‍্যেই সবকিছু মোটামুটি সামলে ওঠার পর এর কার্যকারণ নিয়ে আমরা কয়েকজন গ্রামের বিচক্ষণ বয়স্ক মানুষেরা ক্লাবঘরে সন্ধ‍্যার আগ দিয়ে ঠিক এই সময়েই একত্রিত হলাম। কারণটা যে কি, বা কারা এর সাথে সরাসরি জড়িত সেটা বুঝতে কাররই আর বাকি ছিলনা। কারণ সেইদিনের ঐ আসুরিক ঝড় শুধুমাত্র ঐ জহরদের দিঘির আশেপাশের অঞ্চলেই ঘটেছিল। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে যে ঐরকম একটা অকাল ঝড়ের তান্ডব আর কোথাও ঘটেনি। তার মানে কারণটা লুকিয়ে আছে ঐ অক্ষত দুটো তালগাছের মধ‍্যেই। আর সেখান থেকেই স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে লাল কুটুস আর নীল পুটুসের আলোচনা। সভায় সেইসময় ব্রজসুন্দরও উপস্থিত ছিল। তারই অকালে মরে যাওয়া যমজ দুই ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়ে এই গোটা ঘটনাটার জন‍্য মূলত দায়ী এটা ব্রজসুন্দরের কাছে কতটা দুঃখজনক সেটা তার দুছোখের দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। সে একজন শিক্ষিত মানুষ। ফলে তার কাছে ভূত প্রেতের অস্তিত্বও যে কতটা মান‍্যতা পায় সেটা নিশ্চয়ই আলাদা করে বলার প্রয়োজন পরেনা। কিন্তু পুরো ঘটনাটার কার্যকারণ ব‍্যাখ‍্যা করলে দ্বিতীয় আর কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগকেও তো প্রাধান্য দেওয়া যাচ্ছনা। প্রথমত ঐ জোড়া তালগাছ দুটোর অক্ষত অবস্থায় থেকে যাওয়া এবং প্রচুর ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের দিঘির জলেই সম্পূর্ণ অজান্তেই পড়ে যাওয়া। কোনওধরনের প্রাণ হানি ঘটেনি এটাই রক্ষে। এবার যাতে করে ভবিষ্যতে এইধরনের ভয়াবহ ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি নাহয় তার জন‍্য কি করণীয় সেটাই ছিল ঐ বিশেষ সভার মূল আলোচ‍্য বিষয়। এখন ভূতেদের সাথে কথা বলে তাদের কাছ থেকে কারণ জিজ্ঞাসা করে তাদের দুজনকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করা, সে তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কম্ম নয়। আবার প্রশাসনকে জানালে তারা গাছ দুটো কেটে দিয়ে আপদ বিদায় করে দেওয়ার পরামর্শই দেবেন এবং সেটাতে সন্তান হীন ব্রজসুন্দরের আপত্তি আছে। আর যাই হোক মেয়ে দুটো যে রূপেই হোক আছে তো এই গ্রামেই। অগত‍্যা চার ক্রোশ দূরের বেলডিহি গ্রামের রামস্মরণ ওঝার ডাক পড়লো। ভূত তাড়ানোর ক্ষেত্রে তার যথেষ্ট নাম ডাক আছে এলাকায়। কিন্তু এখানে শর্ত কিছুটা আলাদা। আর সেটা হলো, ভূত তাড়ানো নয়, উল্টে ঐ দুই ভূতকে শান্ত করে গ্রামের আর কোনও অমঙ্গল যাতে ভবিষ্যতে আর না হয় তার জন‍্য বুঝিয়ে রাজি করানো।

রামস্মরণ এসে ওর যা কিছু করণীয় করে দিয়ে চলে গেল। কিন্তু যাবার আগে যা বলে গেলো, তাতে করে কুটুস এবং পুটুস সেদিন নিজেদের বাড়ির সামনেই উঠোনে খেলছিল। হঠাৎ করেই একজন বয়স্ক করে কেউ এসে ওদেরকে কোলে করে নিয়ে যায় দিঘির ধারে গল্প শোনাবে বলে। এবং একটা ঝোড়ো হাওয়া হঠাৎ করেই ওদেরকে জলে ঠেলে ফেলে দেয়। ওরা আর উঠে আসতে পারেনি।

তাহলে কি আরও একজন কেউ আছে এই গ্রামে ??

আজকে সন্ধ‍্যায় মিনুকে কোলে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যান স্বয়ং গল্প দাদু।

...(সমাপ্ত)...


Wednesday, October 2, 2024

শ্মশান ফেরত

ছবি  : ইন্টারনেট

শ্মশান ফেরত

মৃণাল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়

সকাল, 9-40 থেকে সকাল, 11-23

প্রচন্ড জোড়ে হুটারে আওয়াজ করতে করতে  তীব্র গতিতে অ‍্যাম্বুলেন্সটা বালুরঘাট  সদর হাসপাতালের দিকে ছুট লাগালো। সমরেশ বাবুর হাত ও পায়ের তালু পুরো ঠান্ডা  হয়ে  গেছে। হার্ট বিটটা এখনো চলছে, কিন্তু  খুবই ধীর  গতিতে। ইমার্জেন্সি কল করার পর বাড়িতে পাড়ার মোড়ের  অলোক’দার  ‘কিওর এন্ড  কেয়ার ‘ ওষুধের দোকানের  জেনারেল  ফিজিসিয়ান ডক্টর সৌমিক  রায় দেখেই  বললেন,” মেজর কার্ডিয়াক অ‍্যারেষ্ট। রোগী পুরো আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। বলা যায়না হয়তো কোমা স্টেজেও চলে যেতে পারেন। তাই আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে যত শীঘ্র সম্ভব রোগীকে  এক্ষুনি হসপিটালে সিফ্ট করাতে হবে।“ এবং  সেই মতই  অলোক’দা ওনার চেনাশোনা  একজনকে  ফোন করে  যত শীঘ্র সম্ভব অ‍্যাম্বুলেন্সটা জোগাড়  করে  দিলেন। আপাতত হাসপাতালে ক্লোজ অবজার্ভেশনে রাখা হয়েছে। মনিটরিং চলছে। অক্সিজেন এবং স‍্যালাইন দুটোই চলছে। ইমিডিয়েট যেটা দরকার, সেটা হলো রোগীর পাল্স রেটটাকে নরমালে আনা। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রধান সমস‍্যা হলো লাঙ্স এবং হার্ট, কোনোটারই অবস্থা মোটেও সুবিধার নয়।

“আচ্ছা, উনি কি খুব স্মোক করতেন? কারণ ওনার লাঙ্সের যা অবস্থা সেটা একজন সাধারণ পুরুষ মানুষের এই বয়সে হওয়ার কথা নয়।“ ইমার্জেন্সি বিভাগের সিনিয়র নার্স মায়া’দি প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন। তিনি আরও বললেন, “ দেখুন, ভদ্রলোকের বয়স খুব একটা বেশি না হলেও কি হবে, উনি মনে হয় গত পাঁচ-দশ বছর ধরে নিজের শরীর স্বাস্থ‍্যের দিকে একেবারেই নজর দেননি। তবে ডক্টর ঘোষাল এবং ডক্টর চ‍্যাটার্জী দুজনেই এই মুহূর্তে আমাদের হসপিটালের মোস্ট এফিসিয়েন্ট ডাক্তারদের মধ‍্যে দুজন। দুজনেরই দেশী, বিদেশী প্রচুর ডিগ্রী। ওনারা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যাতে করে রোগীকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়। তবে যে ঢাক্কাটা উনি এ যাত্রায় খেয়েছেন তাতে করে শতকরা একশ ভাগ সুস্থ, এই জীবনে আর হতে পারবেন বলে মনে হয় না। ঐ যে কদিন বাঁচবেন, অবশ‍্য ঈশ্বরের কৃপায় যদি বাঁচেন, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের লাইফ সাপোর্ট নিয়েই ওনাকে বাঁচতে হবে। এখন রোগী যদি চিকিৎসায় ঠিকমতো সাড়া দেন তাহলেই মঙ্গল, শরীরের যা হাল করে রেখেছেন। ওনার বাড়ির লোক কে আছেন? একটু এদিকে শুনবেন প্লিজ। কিছু জিনিস বলে দিচ্ছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেগুলো বাড়ি থেকে আনিয়ে নিতে হবে।“

সমরেশ বাবুর সাথে  হসপিটালে  গেছেন পাড়ারই  রথীন বাবু,  সমীর  আর তাপস। এরা সবাই স্থানীয় লেবুতলা স্পোর্টিং ক্লাবের  সদস্য। সমরেশ  বাবুও গত  প্রায় তেইশ বছর  ধরে  এই  ক্লাব  তৈরির  একেবারে  শুরুর থেকে  এই ক্লাবের  পার্মানেন্ট  মেম্বার। গত  দু- বছর  ধরে  উনিই  ক্লাবের  সেক্রেটারি। আর  মাত্র  উনিশ  দিন বাদে দুর্গা পুজো। গত ছয় বছর  ধরে লেবুতলা  স্পোর্টিং  ক্লাবের দুর্গা পুজো  এলাকায়  যথেষ্টই সুনাম  অর্জন  করেছে।আর তার মধ‍্যেই  এরকম  একটা  ঘটনা সবাইকে  স্বাভাবিক ভাবেই  খুব  চিন্তায়  ফেলে  দিয়েছে। সমরেশ বাবু একজন অবসরপ্রাপ্ত  স্কুল শিক্ষক। মাত্র ছয় বছর হলো রিটায়ার করেছেন। এলাকায় খুবই নাম ডাক। নির্ভেজাল ভালো মানুষ বলতে যা বোঝায়, সমরেশ বাবু একদম সেই রকম। কোনও অহংকার নেই। যে কোনো মানুষের বিপদে-আপদে সদাই পাশে। আশেপাশের সবাই ‘সমরেশ মাষ্টার’, বললে এক ডাকে চেনে। তার উপরে অভিঞ্জতাও প্রচুর। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই গোটা পাড়ায় একটা  থমথমে  ভাব।

বৌমা  বলছিল , মানে সমরেশ’ বাবুর বউ- যে,  “ গতকাল রাত্রে  যথাসময়েই  দুটো  রুটি,  ছোট  এক  বাটি  পাতলা মুসুর  ডাল  আর ছোট  এক  বাটি  ঝিঙে- আলুর  পোস্ত  খেয়ে  একটু আধা ঘন্টার মতো গতবারের ক্লাবের পুজোর  হিসেবপত্র  নিয়ে বসেছিলেন। তখনই মনে হলো যে, কোথায় যেন হিসাবটা ঠিক মেলাতে পারছেন না। যতবারই গুনছেন প্রায় সাত হাজার টাকার মতো হিসেব কিছুতেই মিলছে না। আমাকেও বললেন সে কথা। আমি অবশ‍্য ততটা গুরুত্ব দিইনি। শুধু বললাম যে, এখন থাক। সকালে সবাইকে ডেকে ব‍্যাপারটা মিটিয়ে নিও। হতেই পারে দু-একটা খরচের হিসেব পরে টুকবে বলে হয়তো তোমাদের কোষাধ্যক্ষ, নির্মল বাবু টুকতে ভুলে গেছেন। কিন্তু আপনাদের দাদা কিছুতেই সেটা মানতে রাজি নন। বারবার একই কথা,

“এটা হতেই পারেনা। এটা কি করে সম্ভব? গতবার পুজো শেষ হওয়ার পরে প্রতিবছরের মতই সবাই মিলে আয়-ব‍্যায়ের পূর্ণাঙ্গ হিসেব চেক্ করে সর্বসম্মত ভাবে ক‍্যাশবুক ক্লোজ করা হয়েছে।তখন কারোর চোখে পরলোনা!! আর এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সাত হাজার বিয়াল্লিশ টাকা আমাদের ফান্ডে উদ্বৃত্ত থেকে যাওয়ার কথা। কিন্তু ব‍্যালেন্স দেখাচ্ছে মাত্র তেপ্পান্নো টাকা। তাহলে বাকি প্রায় সাত হাজার টাকা গেলো কোথায়?”

আমি আর কি বলবো, শুধু বললাম, “ সে যেখানেই যাক, আছে নিশ্চই কোথাও। তুমি অহেতুক এত টেনশন কোরোনা। ঠান্ডা মাথায় সকালে সবাই মিলে বসে ভেবেচিন্তে একটা সমাধানের রাস্তা নিশ্চই খুঁজে বের করা যাবে। এখন ঐসব ছাই-পাশ রেখে ঘুমিয়ে পরো।“

“ না গো, বাপ্পার মা। তুমি বুঝতে পারছো না। তুমি যতটা সহজ  ভাবছো, এটা মোটেই ততটা সহজ হবে না। আমি একজন পদার্থ বিদ‍্যার শিক্ষক হয়ে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার মাত্র ছয় বছরের মধ্যেই হিসেবে কি এতটাই কাঁচা হয়ে যাব যে, এই সামান্য হিসেবটা মেলাতে পারবো না!! কোথাও তো কিছু একটা নির্ঘাত গড়বড় হয়েছে। এবং এই ব‍্যাপারে আমি শতকরা একশত ভাগ নিশ্চিত।“

সকাল, 10-42

হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই যিনি আবাসিক মেডিকেল অফিসার, মিহির বোস, সমরেশ বাবুকে দেখলেন।

“এতো প্রচন্ড ক্রিটিক‍্যাল অবস্থা!! পালস তো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেশারও নেমে গেছে প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। রুগীকে এখনই ইমারজেন্সি বিভাগে ভর্তি করতে হবে। আমার তো দেখে মনে হচ্ছে উনি অলরেডি কোমায় চলে গেছেন। ওনার সাথে ওনার  বাড়ির লোক কে কে আছেন? হ্যাঁ শুনুন আপনি কি ওনার বাড়ির লোক? তাহলে এই ফর্মটা ফিলাপ করে দিন। বন্ডেও সই করতে হবে।“

“ডাক্তার বাবু আমরা ওনার প্রতিবেশি। ওনারা স্বামী  স্ত্রী,দুজনে এখানে থাকেন। একটিই মাত্র ছেলে। থাকে ব‍্যাঙ্গালোরে। ছেলেকে ফোন করা হয়েছে। হয়তো বিকেলের মধ্যেই চলে আসবে। যা যা দরকার আমাদের কে বলুন।আমরাই সব ব‍্যবস্থা করে দেব।ওসব ফর্মালিটিস নিয়ে একদম ভাববেন না।“

“আপনারা এখানে ওনাকে নিয়ে এসেছেন ঠিক আছে কিন্তু আমরা উনার আবারও সুস্থ হওয়ার ব্যাপারে কোনরকম নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।রোগী কোমায় চলে গেছেন। এক দু-দিনও লাস্টিং করতে পারেন আবার কয়েক মাস বা কয়েক বছরও বিছানায় শুয়ে থাকতে পারেন। আমাদের এসব রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ কিছুই করার থাকেনা। আমরা ওনাকে অবজারভেশনে রাখবো, চব্বিশ ঘন্টা ধরে মনিটরিং চলবে। এবার যদি ওনার কপালে বাঁচা লেখা থাকে তবেই উনি বাঁচবেন আর না হলে সবটাই উপরওয়ালার মর্জি। ওনার মত রোগীর ক্ষেত্রে মেডিকেল সায়েন্স পুরোপুরি ফেলিওর। এরকম হলো কিভাবে, বয়স তো এ যুগে বসে খুব একটা বেশি নয়? কত হবে বড়জোর পয়ষট্টি।“

“হ‍্যা স‍্যার, বছর ছয়েক হোলো স্কুল জীবন থেকে রিটায়ার করেছেন। খুবই নিয়মের মধ্যেই থাকতেন। তারপরেও মানুষের শরীর তো, কিছুই বলা যায়না। এই ভালো তো পরক্ষণেই খারাপ। কখন যে কার কি হয়ে যাবে কেউ বলতে পারে না। ওনার স্ত্রী’র কাছে যেটা শুনলাম, তাতে করে গতকাল রাতে ডিনার করার পরে উনি ক্লাবের গতবারের দুর্গা পুজোর হিসাবপত্র নিয়ে বসেছিলেন। আসলে উনিই গত দু-বছর ধরে আমাদের ক্লাবের সেক্রেটারি। তো সেখানে, বৌদির কথামতো উনি প্রায় হাজার শাতেক টাকার হিসেব কিছুতেই মেলাতে পারছিলেন না। এখন সেই কারণেই অতিরিক্ত টেনশন থেকেই হলো কিনা।“

“হতেই পারে, তবে এই ধরনের রোগীদের নিয়ে খুবই সমস্যা।বুঝতেই তো পারছেন। খুব বেশী দিন তো হাসপাতালের বেড আটকে ওনাকে এখানে রেখে দেওেয়া সম্ভব নয়। দু-পাঁচ কিংবা দশ দিনের মধ্যে চলে গেলে উনিও বাঁচবেন আবার ওনার পরিবারের লোকেরাও বাঁচবেন। শুনতে হয়তো খারাপ লাগছে। আমার ও বলতে ইচ্ছা করছে না তথাপি বলতে বাধ্য হচ্ছি। আসলে একটু আগেই বললাম না, এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে মেডিকেল শাস্ত্রে কোন চিকিৎসা নেই। বুঝতেই তো পারছেন দীর্ঘদিন শুধু স‍্যালাইন আর ভিটামিন ইঞ্জেকশন দিয়ে একটা পূর্ণবয়স্ক মানুষকে কতদিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব? এরকম ভাবে দু- চার মাস বিছানায় পড়ে থাকলে ওনার চেহারার অবস্থা দেখে ওনার বাড়ির লোকেদেরই খারাপ লাগবে। ঠিক আছে এটা তো সরকারি হাসপাতাল। বুঝতেই পারছেন পরিসেবা কতটুকু পাবেন। আর যে কোন ভালো নার্শিংহোমও এই ধরনের রোগী ভর্তি করিয়ে বেড আটকে রাখবে না। ঠিক আছে কয়েক দিন তো থাকুক। তার পরে ওপরওয়ালার মর্জি আর ওনার ভাগ‍্য।“

“ডাক্তারবাবু, এই ধরনের রুগীরা কি একেবারেই সার্ভাইব করে না?”

“ঐ যে বললাম। সবই ওপরওয়ালার মর্জি। হয়তো দশ হাজারে একজন। আপনাদের কে কিছু জিনিস এনে দিতে হবে। আমি সিনিয়র নার্সকে বলে দিচ্ছি সেগুলোর লিষ্ট তৈরি করে দিতে। একটু দয়া করে তাড়াতাড়ি আনিয়ে দেওেয়ার ব‍্যাবস্থা করুণ।“

“স‍্যার, বলছিলাম যে কোন কার্ডিওলজিষ্ট কে দিয়ে একটু দেখানোর ব‍্যবস্থা করা যাবেনা?”

“হ‍্যা হ‍্যা ওসব নিয়ে ভাববেন না। রুটিন চেকআপ বা চিকিৎসা আমাদের তরফ থেকে যা যা করার সবটাই করবো। কিন্তু ঐ যে, সার্ভাইবাল রেট প্রতি দশ হাজারে মাত্র একজন।“

চার দিন বাদে, বিকাল, 4-36

“নাঃ।অনেক চেষ্টা করেও চার দিনের বেশী বাঁচানো গেল না। গোটা পাড়া জুড়ে শোকের ছায়া। বড্ড ভালো মানুষ ছিলেন সমরেশ বাবু। কখনো কারো সাতে- পাঁচে থাকতেন না। এরকম একটা ভালো মানুষ হঠাৎ করে সেরকম মেজর কোন কারণ ছাড়াই এইভাবে অসময়ে চলে যাবেন কেউ মন থেকে মেনে নিতেই পারছে না। ভগবান কেও বলিহারি, এত খারাপ লোক, অসুস্থ অক্ষম, বয়সের ভাড়ে বেঁকে যাওয়া লোকজনদের ছেড়ে বেছে বেছে সুস্থ সবল ভালো মানুষ গুলোকে কেন যে সময়ের আগেই তুলে নেন, তিনিই জানেন!!”

“সবই অদৃষ্ট রথীন’ দা, কার যে কখন ওপর থেকে ডাক আসবে কেউ জানেনা। ভগবানের আইন বোঝা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কম্ম নয়।“

“ঠিকই বলেছ ভায়া। আসলে ঠিক দুর্গা পুজোর মুখে তো। তাই কেমন যেন বড্ড খারাপ লাগছে। সমরেশ’ বাবুর খুবই ইচ্ছে ছিল বিশাল ধুমধাম করে দুবছর বাদে রজত জয়ন্তী পালন করবেন। সেই ইচ্ছাটা সমরেশ বাবু আর পূরণ করে যেতে পারলেন না। এটাতেই বড্ড খারাপ লাগছে রে সমীর। “

“কি করবে বলো কারোর জন‍্যেই তো কিছু থেমে থাকেনা। কত কাছের লোককেই তো বিগত দুবছরে এক এক করে চলে যেতে দেখলাম। বরই ভয় হয়, কবে যে ওপারের ডাক চলে আসে। দু- দুটো মেয়ে। একটারও এখনো বিয়ে দিতে পারিনি।“

“ছাড় ওসব কথা। এখন অনেক কাজ। সমরেশ -বাবুর সৎকারটাতো করতে হবে। চল চল হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হবেনা। বডি নিতে হবে। মনে করে ডেথ সার্টিফিকেট-টা সঙ্গে নিয়ে নিস নাহলে ঘাটে দাহ করানো যাবেনা।“

রাত্রি, 11-17

“আজকাল কোথাও একটু ফাঁকা নেই!! এতো রাতেও আট জনের পেছনে লাইন। কি হারে লোকে মরছে ভাব।“

“হবেনা?? লোক সংখ্যা দেখো।শুধুমাত্র বালুরঘাট শহরের লোকসংখ‍্যাই এখন প্রায় সত্তর হাজার। আশেপাশের লোকেরাও তো এই শ্মশানেই আসে। তাহলে ভীড় হবেনা?“

“যাক গে কিছু করার নেই। বাপ্পা শরীর ঠিক আছে তো বাবা? কোন রকম অসুবিধা হলে তৎক্ষণাৎ আমাদের বলবি। এই তো সবে বোধহয় পঁচিশ কি ছাব্বিশ। এই বয়সেই ছেলেটার ওপরে বিশাল দায়ীত্ব পরে গেলরে। ওর মা-কে যে ব‍্যাঙ্গালোরে নিয়ে যাবে নিজের কাছে সেও তো সম্ভব নয়। ওর মায়ের তো এখনো বছর দেড়েক বোধহয় চাকরি আছে।“

“না রথীন জ‍্যেঠু আমি ঠিক আছি। মা-কে নিয়েই ভাবছি গো। একা একা এখানে থাকা কি সম্ভব? একটা ভালো সবসময়ের লোক খাওয়া পড়া দিয়ে রাখতে হবে। তোমরাও একটু দেখো তো জ‍্যেঠু। সমীর’ দা, তাপস’ দা, পলাশ কাকু তোমাদের কেও বলছি।একটু খুঁজে দেখ। ভালো বিশ্বস্ত বয়স্ক মহিলা দেখতে হবে,যার কোন পিছুটান নেই।“

“ও নিয়ে ভাবতে হবেনা।তোমার জ‍্যেঠিমা এই ব‍্যাপারে একেবারে যাকে বলে দক্ষ লোক। ইতিমধ‍্যেই একজনের কথা ভেবেও রেখেছে। কাজ গুলো সব নির্বিঘ্নে মিটে যেতে দাও। তুমি তো মিনিমাম পনেরো দিনের আগে ব‍্যাঙ্গালোরে ফিরতে পারবে না। এখনো হাতে যা সময় আছে তার ভেতরে সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার মা খুবই ভালো মানুষ।যে কেউ ওনার সাথে অ‍্যাডজাস্ট করে নিতে পারবে।“

“আজকে গরমও খুব।“

“পচা ভাদ্র, হবে না!!”

“যা বলেছিস তাপস। আরে ওদিকে দেখ।আর কটা বাকি?”

“রথীন’ দা, সমরেশ’ দার আগে এটাই লাস্ট। আগেরটা মিনিট দশেক হলো চুল্লীতে ঢুকে গেছে। ঐ যে ঠাকুরমশাই ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছেন।“

“বাপ্পা শীঘ্রই উঠে আয় বাবা। আগে তো মুখাগ্নিটা করতে হবে। আরে তাপস, সমীর, বলাই, পলাশ চল চল হাত লাগা সব।“

“ওনার ছেলেকে ডাকুন তাড়াতাড়ি। এখনো আরও পাঁচটা লাইনে রয়েছে। আমার আর আজকে রাত্রে বাড়ি ফেরা হবেনা বলেই মনে হচ্ছে।দুনিয়ার সব লোকের আজকেই যেন মরবার তাড়া লেগে গেছে। এক বছরও হয়নি। সদ‍্য বিয়ে করা বৌটার প্রথম পোয়াতি। হ‍্যা পাটকাঠি গুলো একসাথে মুঠো করে সামনেটায় আগুন ধরাও। এবার যখন যেভাবে বলবো জ্বলন্ত পাঠকাঠি গুলো মৃতদেহের মানে তোমার মৃত বাবার মুখের কাছে ছোঁয়াবে। নাও একবার চারপাশে ঘুরে এসে মুখের কাছে জ্বলন্ত পাঠকাঠি গুলো ঠেকিয়ে বলো- ওং, পিতৃ শান্তি কামনাও.........”

“ওরে এই বাপ্পা। কি করছিস থাম। জ‍্যান্ত বাপটাকে শেষে পুড়িয়ে মারবি নাকি?? আরে পুরোহিতটাকে আগে থামা। মরার আগেই সৎকার করে দিচ্ছে ব‍্যাটাচ্ছেলে !!”

“কি হলো, এত চিৎকার করছো কেন? কে পুড়িয়ে দিল??”

“কে কে?? রত্না? আমাকে শ্মশানে নিয়ে এসেছো কেন??”

“কি আবোল তাবোল বলছো? মাথাটাই গেছে।“

পরের দিন বিকাল, 6-58

“এই নিয়ে গত চার মাসে তিন বার হলো ডাক্তার বাবু। লোকটা কি শেষে পাগল হয়ে যাবে ?”

“আরে না না। এত ঘাবড়ানোর মত কিছু হয়নি। মাথায় যে কোন কারণে হোক স্ট্রেস পরেছে।ফলে নার্ভ গুলো একটু দুর্বল হয়ে গেছে। কটা ভিটামিন ট‍্যাবলেট আর একটা একেবারেই হালকা ডোজের ঘুমের ওষুধ লিখে দিলাম। তবে খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন জাতীয় খাবার রাখতে হবে। আমি খাবারেরও একটা চার্ট করে দিলাম। দিন পনেরো একটু নিয়ম মেনে চললেই উনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন। আপনি একদম ওনাকে নিয়ে টেনশন করবেন না।কারণ আপনারও যে বয়স হয়েছে সেটা কিন্তু মাথায় রাখতে হবে। এবং এই মুহূর্তে উনি যেন কোনো এমন ধরনের কাজ না করেন যেখানে টেনশন আছে। এটা আসলে কোন রোগ নয়। কিন্তু ঘুমের মধ্যে অনেক সময় হার্টফেলও হয়ে যেতে পারে। সো, প্লিজ অলওয়েস বি কেয়ারফুল।“

 ...(সমাপ্ত)...

Saturday, October 21, 2023

ঈশ্বর প্রাপ্তি

ছবি : ইন্টারনেট 


ঈশ্বর প্রাপ্তি

মৃণাল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়

ঘড়িতে তখন  ঠিক কাটায় কাটায়  রাত এগারোটা বেয়াল্লিশ। প্রতিদিন রাত বারোটা নাগাদ সদর দরজাটা বন্ধ করা অভ‍্যাস। কিন্তু আজকে কি মনে হলো একটু আগেই দরজা বন্ধ করার কাজটায় অন্তর থেকেই একটা তাগিদ অনুভব করলাম। যা দিনকাল পড়েছে একটু অতিরিক্ত সাবধান হওয়ার প্রয়োজনও আছে বৈকি। তাছাড়া অনেকক্ষণ ধরেই পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। এবং আওয়াজটা যেন ক্রমশ এদিকেই এগিয়ে আসছে বলে মনে হলো। যদিও আমার বাড়িটা একটু গলির ভেতরে তাই পুলিশের গাড়ি কোনোভাবেই আমার বাড়ির দোড়গোড়া পযর্ন্ত আসতে পারবে না। উঠোন পেরিয়ে সদর দরজাটা একটু খুলে আশপাশটা একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নেওয়াটা আমার বহুদিনের অভ‍্যাস । আজও তার কোনরকম ব‍্যাতিক্রম হলোনা। সবে সদর দরজা খুলে বাইরে মাথা বের করে দেখতে যাবো আর ধুমকেতুর মতো একটা কেলেপানা প‍্যাকাটি মার্কা লোক আমাকে একরকম প্রায় ঠেলেই সরিয়ে দিয়ে এপাশে উঠোনের মধ‍্যে ঢুকে পড়ে পরিমরি করে দরজার ছিটকিনি আর হুড়কোটা বন্ধ করে দিয়ে আমার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে কঁকিয়ে কাঁদো কাঁদো সরে বলে উঠলো, “ স‍্যার আপনার পা’য়ে পরি আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন না । আমি আপনাদের কারোর কোনো ক্ষতি করবো না, বিশ্বাস করুন। বাপ-মায়ের দিব্বি দিয়ে বলছি। শুধু কিছুক্ষণের জন‍্যে আমাকে দয়া করে আপনাদের আশ্রয়ে থাকার অনুমতি দিন। মেইন রাস্তা থেকেই পুলিশ আমাকে গাড়ি নিয়ে ধাওয়া করেছিল। কোনরকমে দুটো গলি পার হয়ে আপনার বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে আপনাকে একপ্রকার ঠেলে সরিয়ে দিয়েই ঢুকে পড়েছি। স‍্যার আপনার সেইভাবে কোনও ব‍্যথা লাগেনি তো? আসলে ভয় হচ্ছিল, ওরা যদি আমাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দেয়। আর গুলি যদি একবার শরীরে লাগে তাহলে তো সব শেষ। আমার সাথে সাথে আরও পাঁচটা বিভিন্ন বয়সের মানুষও না খেতে পেয়ে মরে ভূত হয়ে যাবে। আপনার পায়ে পরছি, দয়া করে আমাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেবেন না স‍্যার। আমিতো মরবই সাথে সাথে আমার পরিবারের বাকি পাঁচজনও না খেতে পেয়ে ক্ষিধের জ্বালা সহ‍্য করতে না পেরে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একে একে মরে যাবে। অবশ‍্য তার আগেই আমার আজকের এই পরিচয় জানতে পারলে এমনিতেই লজ্জা আর ঘেন্নায় মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ির ভেতরেই হয়তো একসাথে আত্মহত‍্যা করে বসবে।“

“ তুই গুলি খেয়ে মরবি নাকি তোর বাড়ির লোক আত্মহত্যা করে একসাথে মরবে তাতে আমার কি?” একটু মনে জোড় সঞ্চয় করে শুকনো হেড়ে গলায় বলে উঠলাম। বের হ, বেরিয়ে যা বলছি। ব‍্যাটা চোর, তোর মতলব আমি বুঝতে পারছিনা ভাবছিস? পেছনে পুলিশের গাড়ি লেগে রয়েছে বলে সাধু গিরি হচ্ছে। সেয়ানা চোর। যেই দেখবি পুলিশ তোকে না পেয়ে চলে গেছে ওমনি নিজের আসল রূপ ধরে আমাদেরকে মেরে ধরে আমাদের সর্বস্ব লুটপাট করে, চম্পট দিবি । ওটি হবেনা বাছাধন, সেই গুড়ে বালি। সর, সরে যা, আমার পা ছাড় বলছি। আমি এক্ষুনি চিৎকার করে পাড়ার লোক জড় করে তোকে পুলিশের হাতে তুলে দেবো।“

“ স‍্যার, দয়া করে আমার সাথে ওরকমটি করবেন না। আমি আপনাকে আমার কথা সব খুলে বলবো। আপনি চোর বলতে যেটা জানেন বা বোঝেন আমি ঠিক সেই ধরনের চোর নই। আমি স্বভাব চোর নই বাবু, আমি অভাবে পরে দু মুঠো খাবার জোগাড় করার তাগিদে আজ রাতের অন্ধকারে চুরি করার উদ্দেশ্যে প্রথম রাস্তায় নামতে একপ্রকার বাধ‍্যই হয়েছি।“

আমি লোকটার হাত থেকে কোনরকমে প্রায় জোর করে পা ছাড়িয়ে আবারও কিছু বলতে যাবো, তার আগেই মিনুর মা স্বশরীরে আমাদের মাঝখানে এসে উপস্থিত।

“ কি হলো গো, এত হৈচৈ কিসের? দরজা বন্ধ করতে এসে তখন থেকে কাকে এতো বকাবকি করছো? মেয়েটাকে কিছুতেই ঘুম পাড়াতে পারছিনা তোমাদের চিৎকার চেঁচামেচির জ্বালায়। ও মা’গো, অন্ধকারে তোমার পা জড়িয়ে কেলে মার্কা এটা আবার কে? জন্তু না মানুষ?”

লোকটা এবার আমার পা ছেড়ে দিয়ে তরিঘরি সোজা গিয়ে মিনুর মায়ের পায়ের উপরে হুমড়ি খেয়ে পরে মিনুর মায়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরে আরও দ্বিগুন স্বরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল। মিনুর মা’কে কোনরকম কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিজের মতো বলতে শুরু করে দিল, “গিন্নি’মা, আমাকে বাঁচান। বাবুকে কতবার করে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে আমি চুরি করতে বেড়িয়েছি ঠিকই কিন্তু চোর বলতে যেমনটা সবাই বোঝে আমি একেবারেই সেরকমটি নই। আমার কোনো খারাপ মতলব নেই। কিন্তু বাবু কিছুতেই আমার কথা বিশ্বাসই করতে চাইছেন না। দয়া করে স‍্যারকে একটু বুঝিয়ে বলুন না গিন্নিমা আপনার কথা স‍্যার ঠিক শুনবেন।“

ব‍্যাটার কথা শুনে হাসবো না কাঁদবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা। মিনুর মা’কে আবার গিন্নিমা!বহুত সেয়ানা চোর। বাড়িতে ঢোকার পর থেকে স্রেফ অভিনয় করে যাচ্ছে। জীবনে প্রচুর চোরের গল্প শুনেছি। মহান ও মারাত্মক সব চোরেদের গল্প সাহিত্যে পড়েছি কিন্তু এরকম আজব চোর চোখে তো দেখা দূরে থাক, কোনও গল্পেও কস্মিনকালে পাঠ করেছি বলেও মনে পরছে না। আসার পর থেকেই মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে। ও নাকি আজকেই প্রথম চুরি করতে বেড়িয়েছে! শোনো চোরের কথা। চুরি করে করে হাত পাকিয়ে ফেলেছে, আর বলে কিনা আমি স্বভাবে চোর নই স‍্যার, আমি অভাবে চোর! এটাও এই মধ‍্যরাতে আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? নাটকের দলে থাকলে ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটার হতে পারতো।

“ আরে আগে আমার পা ছাড়, তারপরে তো দুজনে মিলে ভাববো তোকে নিয়ে জামাই আদর করবো নাকি থানায় ফোন করে তোকে আইনের হাতে তুলে দেবো। পা ছাড়, ছাড় বলছি।“ মিনুর মা জোরে ধমকে চেঁচিয়ে উঠলো।

এই সবকিছুর মাঝে ছোট্ট মিনু যে কখন ঢুলুঢুলু চোখে গুটিগুটি পা’য়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে আমাদের কথার মাঝখানে চলে এসেছে, সেটা আমাদের দুজনের কেউই টের পাইনি। মিনুর আদো আদো কথাতেই ওর দিকে তিনজনই একসাথে ফিরে তাকালাম।

“ বাবা, এই কাকুটা এখানে কি করছে? কাকুটা মায়ের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে কেন? কাকুটাকে কি মা কান মুলে দিয়ে বকেছে?”

“ আরে!! মিনুর মা, তুমি ওকে ঘুম পাড়াওনি? “

“ কি করে ঘুম পাড়াবো বলত পারো? মাঝরাতে তুমি আর এই কেলে পানা লোকটা যা শুরু করেছো তাতে করে কেউ ঘুমোতে পারে? তাও তো পিঠে থাপড়ে থাপড়ে ঘুম পাড়ানোর হাজার চেষ্টা করলাম। দেখে তো মনে হলো মেয়ে বোধ হয় ঘুমিয়ে পরেছে। কিন্তু তোমার আদরের মেয়েও যে মা’কে ঠকাতে শিখে গেছে সে তো বেশ ভালোমতোই বোঝা যাচ্ছে।“

“ তাহলে ঘুম থেকে উঠে চলে এলো কিভাবে?”

“ মিনু মা, শিগ্গির ঘরে চলো। এই লোকটাকে কাকু বলে ডেকোনা। এই লোকটা পচা। একটা দুষ্টু লোক। এতো রাত অবধি ছোট বাচ্চাদের জেগে থাকতে নেই মা। তুমি আমার ছোট্ট পুতুল না? চলো চলো, অনেক রাত হয়ে গেছে, এবার ঘুমিয়ে পরতে হবে। নাহলে কালকে তোমার শরীর খারাপ করবে। চলো চলো, আমরা দুজনেই ঘুমিয়ে পরবো।“ মিনুর মা মিনুকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে সবে পা বারাতে যাবে আর ঠিক সেই সময় লোকটা কথা ছুড়ে দিয়ে বলে উঠলো-

“আসলে গিন্নি’মা, আমার মনে হয় আমাদের চিৎকার চেঁচামেচিতেই ওর ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ছোটো তো তাই ভয় পেয়ে বিছানা ছেড়ে এখানে চলে এসেছিল।“

“ একদমই তাই। ঠিকই বলেছো। আরে!! তোমার তো সাহস কম নয়। তুমি আমাদের মাঝখানে কথা বলছো যে বড়? ধন‍্য চোর বটে হে তুমি। আমরা জোড়ে কথা বলবো না আস্তে বলবো, সেটাও কি তোমাকে জিজ্ঞেস করে তোমার অনুমতি নিয়ে বলতে হবে? এটা আমাদের বাড়ি, আমরা এখানে যেভাবে খুশি কথা বলবো, তাতে তোমার কি? ”

“ না বলছিলাম যে, ছোট্ট বাচ্চা তো। আমাদের চিৎকারে ওর কাঁচা ঘুমটা ভেঙ্গে গেল, তাই।“

“ এই, তোমার মতলবটা কি বলোতো? তুমি একটা ছিচকে চোর, অথচ এমন ভাব দেখাচ্ছ যেন মায়ের থেকে মাসীর দরদ বেশি। ও আমার মেয়ে, আমি বুঝবো ও ঘুমাবে কি ঘুমাবে না। ওকে নিয়ে তোমায় বেশি ভাবতে হবেনা। বেশি চালাকি করলে না লোকাল থানায় ফোন করে পুলিশ ডেকে এনে তোমাকে সোজা পুলিশের হাতে তুলে দেবো।বুঝতে পারবে যে কত ধানে কত চাল। ভদ্র ভাবে কথা বলছি তো তাই ভাবছো এদের সাথে মিষ্টি করে ভাব জমিয়ে তারপরে ভালো মানুষির সুযোগ নিয়ে নিজের ইচ্ছে মতো যা খুশি তাই করা যাবে,তাই না?“

“ না না গিন্নি’মা, আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। আসলে আমারও আপনার এই মিনুর বয়সিই একটি মেয়ে আছে। গত দুদিন হলো বাড়িতে উনুন ধরেনি। বাড়িতে দশটা টাকা নেই যে মেয়েটার মুখে একটু ভাত তুলে দেবে ওর মা । বাড়িতে আমি বাদে আরো মোট পাঁচ পাঁচটা পেট। আমি, আমার বউ, বৃদ্ধ অশক্ত বাবা, মা আর অবিবাহিত একটা আইবুড়ো বছর চল্লিশের পক্ষাঘাতগ্রস্ত দিদি আর আমার চার বছরের মেয়ে, বিন্নি। ধুম জ্বরে গত তিনদিন ধরে আমি বাড়ি ছেড়ে বের হতে পারিনি। বউটা কোথা থেকে এর ওর বাগান থেকে চেয়ে চিন্তে কতগুলো কচুর ডগা তুলে এনেছিল। ঐ কটাই সেদ্ধ করে নুন দিয়ে চটকে বড় পাঁচজন খেয়েছিলাম। গলার চুলকুনিতে পাঁচ জনাই যন্ত্রণায় ছটফট করেছি। ভাগ‍্যিস চার বছরের মেয়েটাকে দিইনি। ছোট্ট মেয়ে, খেয়ে নিলে হয়তো মরেই যেত।“

“ কেন বানিয়ে বানিয়ে মিথ‍্যে কথা বলে আমাদের সহানুভূতি আদায় করার চেষ্টা করছো তখন থেকে। তোমার মতলব বুঝতে আমার আর বাকি নেই। ভালো কথায় চিড়ে ভিজবে না কিন্তু হে ছোকরা, এই বলে দিলাম। তুমি বানিয়ে বানিয়ে যতই গাঁজাখুরি গল্প শোনাও না কেন ওসব ধোপে টিকবে না। পুলিশের হাতে তো তোমাকে আজ তুলে দেবই।“

“ বিশ্বাস করুন স‍্যার , মেয়ের দিব‍্যি দিয়ে বলছি। আমি একটা কথাও বানিয়ে বলছি না। খিদের যন্ত্রনায় মেয়েটা ছটফট করছে গো বাবু। বাপ হয়ে সহ‍্য করি কি করে। বউটাও তো বাচ্চাটার জন্ম দেওেয়ার পর থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে। কান্না করলে মেয়েটার মুখটা বুকের মধ‍্যে চেপে ধরে। কি পায় জানিনা, মেয়েটা খালি পেটেই ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে।“

“ রাখতো, যত্তসব বানানো মিথ‍্যে সাজানো গল্প!! তুই কি ধরনের চোর হে, এসে অবধি তখন থেকে শুধু কেঁদেই চলেছিস? আর কি সুন্দর অনায়াসে বিনা দ্বিধায় একের পর এক মিথ‍্যা কথা বলে চলেছিস। একটুও আটকাচ্ছে না কোথাও!!”

“ আঃ, তুমি থামবে? তুমিও তো ওরই মতো একজন মেয়ের বাবা। এবং শুনছই তো ওর মেয়েও তোমার মেয়েরই বয়সি। ওর দুঃখের কথা শুনে তোমার একটু কষ্ট হচ্ছেনা? তুমি কিরকম পিতা!! আজকে তুমি যদি ওর জায়গায় থাকতে তবে তুমি কি করতে?”

“ ওঃ হোঃ, মিনুর মা। তুমি বুঝতে পারছোনা। তুমি কার সাথে কার তুলনা করছো? ও হলো একটা চোর। আইনের চোখে একজন অপরাধী। ও লোকের বাসায় চুরি করে ওর সংসার চালায়। আমি তো চোর নই। আমি কষ্ট করে লেখাপড়া শিখে নিজের চেষ্টায় চাকরি পেয়ে আজ একটা সরকারি ব‍্যাঙ্কের ম‍্যানেজার। আমার হাত দিয়ে প্রত‍্যেক দিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়।। আমিও তো ইচ্ছা করলেই লোকের টাকা চুরি করে বিদেশি ব‍্যাঙ্কে টাকা রেখে আরাম ও আয়েশ করতে পারতাম। কিন্তু আমি তো আমার সততাকে বিসর্জন দিইনি। ওর মতো অশিক্ষিত হয়ে থেকে অসৎ পথে আয়ের রাস্তা বেছে নিইনি। পেটে বিদ‍্যা নেই তো কি হয়েছে,ওর যা বয়স তাতে করে ও তো একটা ছোটখাট ব‍্যবসা করে সামান্য আয় করেও সন্মানের সাথে মাথা উঁচু করে সমাজের বুকে বেঁচে থাকতে পারতো। প্রয়োজনে একটা টোটো কিনে রাস্তায় চালিয়ে টাকা রোজগার করতো। সৎ ইচ্ছা থাকলে উপায়ও প্রচুর আছে। আমার ব‍্যাঙ্কই তো কম সুদে কত লোককে লোন পাইয়ে দিচ্ছে। গরীবের ছেলে, টাকা পয়সার অভাবে লেখাপড়া শিখতে পারেনি তো কি হয়েছে, প্রয়োজনে গায়ে গতরে খেটে উপার্জন করতে পারতো। কিন্তু ও সেটা করেনি। বরং ও রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। আজকে চুরি করছে, কালকে ব‍্যাঙ্ক ডাকাতি করবে। হতেই পারে সেটা আমারই ব‍্যাঙ্কের শাখাতেই। আর আমি নিশ্চিত আজকে আমার বাড়িতে এসেছে আমাকে ভয় দেখিয়ে আমার ব‍্যাঙ্কের সম্পর্কেই খোঁজখবর নেওয়ার জন‍্যে, ভালো মানুষ সেজে।“

“ একদম সঠিক কথা বলেছেন স‍্যার। আপনি একজন হস্তরেখাবিদ হলেও ভালো উন্নতি করতে পারতেন জীবনে। আমার পেটে সত‍্যিই ছিটেফোটাও বিদ‍্যে নেই। নাহলে সরকারি কলেজ থেকে ইলেক্ট্রনিক্স-এ বি টেক কমপ্লিট করেও চাকরি জোগাড় করতে পারবোনা কেন বলুন? আমাদের দেশে এই মুহূর্তে সরকারি চাকরি কোথায় আছে একটু বলবেন স‍্যার? বাবা ছিলেন নকুল চন্দ্র কলেজের সিনিয়র ক্লার্ক। হঠাৎ করেই মুত্রথলিতে ক‍্যানসার ধরা পরলো। চাকরিটাও পুরো করতে পারলেন না।অবসরের দুবছর আগেই স্বেচ্ছা অবসর নিতে বাধ‍্য হলেন। যে কটা টাকা পেয়েছিলেন ক‍্যানসারের চিকিৎসায় সব শেষ। দিদিটার দুটো কিডনিই আচমকা অকেজো হয়ে গেল। পয়সা নেই, কার থেকে কিডনি ডোনেশন নেব? বিনা পয়সায় কে দেবে তার একটা অমূল‍্য কিডনি? কিন্তু ছোট থেকে একসাথে বড় হয়েছি। দিদি আমার থেকে বছর দশেকের বড়। আমার গায়ে কখনো আঁচড়টিও লাগতে দিতনা। সেই দিদিকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখা যায়? আপনিই বলুন না স‍্যার, আমার জায়গায় আপনি থাকলে পারতেন? আমি পারিনি স‍্যার। নিজের একটা কিডনি দিয়ে দিদিকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছি। একটা করে কিডনি নিয়ে দুজনেই আর কতদিন বাঁচবো জানিনা স‍্যার। কিন্তু তারপর থেকে আর ভারী কাজ করতে পারিনা। ঐ যে একটু আগেই বললেন না, গায়ে গতরে খেটে রোজগার করার কথা। চেষ্টা করেছিলাম স‍্যার, কিন্তু শরীর সাথ দেয়নি। ভেবেছিলাম একটা ছোটখাট ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান দেবো। জমি কিনে দোকান বানানো সম্ভব নয়। প্রচুর পুঁজির দরকার। এমনকি একটা ব‍্যস্ত জায়গায় একটা দোকানঘর ভাড়া নিয়ে একটা ইলেকট্রনিক্স গুডস-এর দোকান চালু করতে গেলেও কমকরে না হলেও প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকার ধাক্কা। অনেকের কাছেই ঘুরেছি। বছর খানেক আগে আপনাদের ব‍্যাঙ্কের শাখাতেও গিয়েছিলাম স‍্যার। কিন্তু তখন যিনি ম‍্যানেজার ছিলেন, বললেন যে সমাজের একজন গণ‍্যমান‍্য ভালো মানুষকে দিয়ে সুপারিশ করিয়ে আনতে হবে, নাহলে বাড়ির দলিল ব‍্যাঙ্কের কাছে বন্দক রাখতে হবে। হহ্নে হয়ে অনেক খুঁজেছি, কিন্তু ভালো মানুষ পাইনি স‍্যার, যিনি আমার হয়ে দু-টো ভালো কথা ম‍্যানেজার বাবুর কাছে গিয়ে বলবেন। বাবা, দিদির দৈনিক চিকিৎসার খরচ চালানোর জন‍্যে বহু আগেই বাড়ি মহাজনের কাছে বন্দক দিয়ে টাকা চড়া সুদে ধার করতে হয়েছিলেন। আসল শোধ করা তো দূরের কথা সুদটাই জমতে জমতে প্রায় আসলের সমান হয়ে গেছে। মহাজন শাসিয়ে রেখেছে আর মাস দুয়েকের মধ‍্যে টাকা না দিলে বাড়িটাও জোড় করে লিখিয়ে নেবে। তখন কোথায় কোন গাছ তলায় সপরিবারে দাড়াবো বলতে পারেন? সেই গাছতলায় থাকার জন‍্যেও হয়তো কোনো এলাকার ক’অক্ষর জ্ঞান শূন্য গো-মূর্খ দাদার দালালকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিতে হবে। সব জায়গা থেকে প্রতিহত হতে হতে দেওেয়ালে একসময় পিঠ ঠেকে গিয়েছিল স‍্যার। খিদে বরই ভীষণ বস্তু। যার অভাব আছে শুধুমাত্র সেই বোঝে তার কি ভয়ঙ্কর জ্বালা। সখ করে কেউ চোর হয়না স‍্যার। আমার ভাগ‍্য আর সরকারের স্বজন পোষন নীতিই এর জন‍্যে দায়ী। কিন্তু এসবের হাত থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ আপনার কি জানা আছে স‍্যার”

“ যা যা বললে তার সবটাই বিশ্বাস করে নিলেও একটা উওর কিন্তু এখনো খুঁজে পেতে বাকি যে, এত অভাবের মধ‍্যেও বিয়ের ইচ্ছাটাকে মনে না আনলে বাড়ির লোক সংখ‍্যাটা তো আরো দুটো বৃদ্ধি পেতোনা।“

“ একদমই যথার্থ বলেছেন স‍্যার। আসলে বেলা, মানে আমার স্ত্রী, তারও একটা কিডনি নেই। আমার একটা কিডনি যখন সরকারি হাসপাতালে দিদির শরীরে প্রতিস্থাপিত হচ্ছিল তখন পাশের বেডের এই মেয়েটিরও একটি কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়ার জন‍্যে শরীর থেকে অপারেশন করে বাদ দেওয়া হচ্ছিল। তখনই আলাপ। দুজনের জীবনেই অনেক মিল, অনেক সংগ্রাম। ওর মা,বাবা খুব ছোটবেলায় রোড অ‍্যাক্সিডেন্ট-এ মারা যান। মামার বাড়িতে বছর তেরো বয়স থেকেই বসবাস। সেখানে মামা মামির কাছে কতটা আদর যত্নে ছিল সেটা সবিস্তারে না বললেও সহজেই বোধগম‍্য। বাড়ির কাজের লোকের থেকেও দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা ছিল ওর। এছাড়া আমার বাড়িতেও বিশ্বস্ত একজন লোকের খুব দরকার ছিল যে সর্বদাই হাসিমুখে আমার মা,বাবা এবং দিদির সেবা করতে পারবে। বিয়ে করার সময় আমি তখনও চুরি করার কথা মনেও আনিনি। চন্ডীপাঠ থেকে জুতো সেলাই, সবধরনের কাজই করেছি। বেলাও হাজার কাজের মাঝখানে সময় করে আশেপাশের বৌদি, কাকিমাদের কাছ থেকে সেলাইয়ের অর্ডার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মেয়েদের পোশাক বানিয়ে দিত। কিন্তু ধীরে ধীরে অতিরিক্ত কাজ করার ধকল আমার শরীর নিতে পারলো না। অবশ‍্য ডাক্তার বাবু আগেই বলেছিলেন, যে, কিডনিটা ডোনেট করার পর আর বেশি কায়িক পরিশ্রম করতে পারবো না। তার মধ‍্যেই বেলা মেয়ের জন্ম দিল। ফলে সংসারে অভাবটা যেন আরো প্রকট হয়ে উঠলো। সংসার আর মেয়ে সামলে বেলাও আর সেলাই-এর কাজে সময় দিতে পারতো না। সেলাইয়ের অর্ডার নিয়ে সময়মতো সেগুলো যোগান দিতে পারছিল না। যার জন‍্যে চেনা লোকজনও আমাদের খারাপ আর্থিক অবস্থার কথা জেনেও আর সেলাইয়ের অর্ডার দিতো না। ফলে বিকল্প একটা আয়ের রাস্তা খুঁজে পাওয়াটা খুবই প্রয়োজন হয়ে পরেছিল স‍্যার। নাহলে পরিবারের কাউকেই আর বাঁচাতে পারবো না। ভাবতে গিয়ে আয়ের এর থেকে সহজ আর কোন বিকল্প রাস্তা খুঁজে পেলাম না স‍্যার। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখা একটা ছেলে ভাগ‍্যের বিড়ম্বনায় চোর হওয়ার লক্ষ্যে রাতের অন্ধকারে রাস্তায় নেমে পরলাম। বাড়ির কেউ আজকে আমার এই সিদ্ধান্তের কথা জানেনা। কাউকে বলার সাহস হয়নি কারণ জানি এই প্রচেষ্টার জন‍্য বাড়ির প্রত‍্যেকেই আমাকে ধিক্কার দিত। তাই সবাই ঘুমিয়ে পরার পর নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছি।“

 এইমুহূর্তে কি বলবো তার কোন সঠিক ভাষাই খুঁজে পাচ্ছিনা।। অবিশ্বাস করতেও ইচ্ছা করছিল না। কারণ, এতো গুলো কথা হঠাৎ করে একটা সত‍্যিকারের অশিক্ষিত চোরের পক্ষে বানিয়ে বলা কোনমতেই সম্ভব নয়। 

“ আমাকে তো রীতিমতো চিন্তায় ফেলে দিলে হে তথাকথিত চোর ভাই। কারোর জীবন এতটা পরীক্ষার সম্মুখীন হতে পারে ঈশ্বরের ইচ্ছায়!! ভাবতেই তো কেমন যেন অবিশ্বাস্য লাগছে। ঈশ্বর কারোর উপর যে এতটা নির্দয় হতে পারেন সেটা তোমার সাথে এইরকম অদ্ভুতভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ না আসলে তো কখনও কল্পনাতেও আনতে পারতাম না। কিন্তু তিনি যখন তোমাকে এইভাবে আমার কাছে পাঠিয়েছেন তখন তার পেছনে একটা ভালো উদ্দেশ্য তো নিশ্চই আছে। আমি তোমাকে এইভাবে রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেবোনা। তোমাকে মাথা তুলে ঘুরে দাড়াতে হবে। বলো, তোমার মধ‍্যেকার সেই পুরোনো স্বপ্নটাকে তুমি আবার জাগিয়ে তুলতে পারবে?আমি তোমাকে সাহায্য করবো। আমার ব‍্যাঙ্ক থেকে আমি তোমাকে বিজনেস লোন পাইয়ে দেব। তোমার স্ত্রীকে আমি সেলাই মেশিন কেনার জন‍্যেও লোন পাইয়ে দেবো। কিন্তু তোমাকে কথা দিতে হবে যে তুমি তোমার এই ক্ষণস্থায়ী পরিচয়টাকে চিরদিনের জন‍্যে মুছে ফেলে আবার আলোর জগতে ফিরে আসতে পারবে।“

-----

মাঝখানে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। বেলা এবং ওর স্বামী রতন, মানে মিনুর সেই চোর কাকু, এখন অনেকটাই সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে ঘুরে দাড়াতে সক্ষম হচ্ছে ধীরে ধীরে নিজেদের শ্রম ও ব‍্যাঙ্ক থেকে প্রাপ্ত লোনের সঠিক প্রয়োগের মিলিত প্রচেষ্টায়। আজকে আমার ব‍্যাঙ্কের শাখায় এসেছিল ধার নেওয়া লোনের প্রথম কিস্তি শোধ করার জন‍্য। আর ও যেটা খুব ভালো পারে, ব‍্যাঙ্কের ম‍্যানেজারের মানে আমার চেম্বারের দরজা ঠেলে অনুমতি নিয়ে ঢুকে সটান সকলের সামনেই দ্বিধাহীনভাবে আমার পা জড়িয়ে ধরে মুখস্থ বলার মতো করে বলতে শুরু করলো,

“ স‍্যার, একসময় ভাবতাম যে ঈশ্বর বলে এই বিশ্ব সংসারে সত‍্যিই কিছু নেই। কিংবা যদি থেকেও থাকেন তাহলে অতি অবশ্যই তিনি একচোখা। আমরা যারা সৎপথে মোটামুটি একটু খেয়ে পড়ে নিজেদের একমাত্র অবলম্বন,আত্মসন্মানটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই, ঈশ্বর তাদের সেই সামান্য চাহিদা টুকুও কেড়ে নিতে চান। ঈশ্বরের আশীর্বাদ যেন শুধুমাত্র সমাজের ভন্ড, লোভী, আর অসৎ মানুষ গুলোর জন‍্যেই। কিন্তু বিশ্বাস করুন স‍্যার, আমার গত দেড় বছরের উপলব্ধি আমাকে এটা শিখিয়েছে যে এতদিন আমি ভুল বুঝেছিলাম। ঈশ্বর আজও আছেন এবং তিনি আমাদের মাঝখানেই আমাদের রূপেই ছড়িয়ে রয়েছেন। আমার সেই ঈশ্বরের পায়ের ধূলো কি একটু মাথায় ছোঁয়াতে পারি স‍্যার?”

আজ ভক্তের সাথে ভক্তের ঈশ্বরও কেঁদে ফেললেন।।

...(সমাপ্ত)...